বাবাকে মৃত্যুর মুখে রেখে ধ্যানে বসেছে কিঙ্কর। পেছনে ধেয়ে আসছে অসুরের দল, ভাইকে রক্ষা করতে লড়াইয়ের ময়দানে নেমেছে বোন। এদিকে আসছেন অমর পরশুরামও, তিনি কি পারবেন সময়-মতো পৌঁছতে? নাকি তার আগেই ঘটে যাবে অঘটন? উপকূলের বুকে আঘাত হানতে চলেছে প্রকাণ্ড এক ঘূর্ণিঝড়। প্রকৃতি নির্দয়, তবে এতটা নির্মম কি? নাকি এর পেছনেও রয়েছে কোনো অপশক্তি, যার কারণে পালন-কর্তাকেই আসতে হচ্ছে বারবার এবং আরো একবার; যতদিন না তার উপযুক্ত কায়া সৃষ্টি করছেন সৃষ্টিকর্তা। শক্তি আর অপশক্তির লড়াইয়ের যুগ-যুগান্তরের উপাখ্যান: শিবোহাম।
শুভঙ্কর শুভ একজন সমসাময়িক বাংলা লেখক, যিনি মূলত পুরাণভিত্তিক সাহিত্য রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর লেখায় সনাতন পুরাণের জটিলতা, দেবদেবীর চরিত্র এবং মিথলজিকাল থিমগুলো আধুনিক পাঠকের কাছে সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। শুভঙ্কর শুভ মূলত অনুবাদ কাজের মাধ্যমে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেন। তাঁর অনুবাদিত কাজের মধ্যে "রিটার্ন অব রাবণ" সিরিজ উল্লেখযোগ্য। পরে তিনি মৌলিক রচনায় মনোনিবেশ করেন এবং পুরাণভিত্তিক সাহিত্য রচনায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর আগ্রহের বিষয়গুলোর মধ্যে মিথলজি, ফ্যান্টাসি, সাই-ফাই ও থ্রিলার উল্লেখযোগ্য।
📚 তাঁর উল্লেখযোগ্য বইসমূহ: শিবোহাম শুভঙ্কর শুভর প্রথম মৌলিক উপন্যাস, যা ২০২১ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়। এই বইয়ে শিবের অন্তর্নিহিত দর্শন ও সত্ত্বার অনুসন্ধান তুলে ধরা হয়েছে। এটি পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং লেখকের মৌলিক রচনার সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
রুদ্রাক্ষ: সনাতন পুরাণ ২০২৪ সালে প্রকাশিত এই বইটি লেখকের দ্বিতীয় মৌলিক উপন্যাস। এখানে সৃষ্টির আদিকথা, দেবতা ও অসুরদের দ্বন্দ্ব, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিবের বিভিন্ন কাহিনি এবং পুরাণের গভীর দার্শনিক দিকগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। বইটি দুই ভাগে বিভক্ত: প্রথম ভাগে কাহিনিভিত্তিক উপস্থাপনা, দ্বিতীয় ভাগে দেবদেবীর বর্ণনা। পাঠকদের মতে, এটি সনাতন পুরাণ সম্পর্কে জানার জন্য একটি অনন্য গ্রন্থ।
পদ্মনাভ: সনাতন পুরাণ (দ্বিতীয় পর্ব) এটি "রুদ্রাক্ষ" বইটির ধারাবাহিকতা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে আরও গভীরভাবে পুরাণের বিভিন্ন দিক, দেবতাদের কাহিনি এবং দর্শনীয় দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বইটি পুরাণপ্রেমী পাঠকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
A man becomes a Mahadev, only when he fights for good. A Mahadev is not born from his mother's womb. He is forged in the heat of battle, when he wages a war to destroy evil. — Amish Tripathi, The Immortals of Meluha - শিবোহাম - কিঙ্কর, জন্মের সময় মা হারানো এক ছেলে। বোন শুভনিতা এবং বাবাকে নিয়ে তার সংসার। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই নানা অলৌকিক ব্যপার প্রত্যক্ষ করা কিঙ্কর মাত্র দশ বছর বয়সেই পড়ে এক চরম পরীক্ষায়।
এদিকে কিঙ্করের আসল ক্ষমতাকে নিজ নিজ কাজে ব্যবহার করতে কাজে নামে বিভিন্ন দেবতা আর অসুরেরা। তাদের এই লড়াইতে জড়িয়ে পরেন দেবগুরু, অসুরগুরু থেকে পরশুরাম পর্যন্ত। এখন যে অপশক্তির বিনাশের জন্য এই ধরণীতে কিঙ্করের আগমন তার শেষ পরিণতি কি হবে তা জানার জন্য পড়তে হবে লেখক শুভঙ্কর শুভ এর মিথোলজিক্যাল ফ্যান্টাসি ধারার উপন্যাস "শিবোহাম"। - "শিবোহাম" লেখক শুভঙ্কর শুভ এর লেখা প্রথম উপন্যাস। এই ধরনের মিথোলজিক্যাল ফ্যান্টাসি ধারার উপন্যাস বিশেষ করে অমীশের শিব ট্রিলজি আমার বেশ পছন্দের থাকায় এই বইতেও আশা ছিলো সেরকমই দুর্দান্ত কিছুর। কিন্তু বইতে হিন্দু পুরাণের পার্ট অনেক বেশিই মনে হলো থ্রিলার বা ফ্যান্টাসির পার্টের চেয়ে। এই বইয়ের অনেকগুলো সময়কালের ভেতরে মূল সময়কাল ছিলো ১৯৬০ এবং ১৯৭০ আর পটভূমি সীতাকুণ্ড আর চন্দ্রনাথের মন্দির। লেখক সে সময়ের ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক দুর্যোগকে যেভাবে এই গল্পের লোরের সাথে মিলিয়েছেন এ ব্যাপারটা ভালো লাগলো। - "শিবোহাম" বইয়ের মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে কিঙ্কর নামের এক দশ বছর বয়সী বাচ্চাকে ঘিরে। ব্যক্তিগতভাবে মনে হলো বইতে হিন্দুধর্মের আচার ব্যবস্থা থেকে দেব-দেবীর নানা ধরনের কর্মকান্ড অনেক বেশি ফোকাসড পেয়েছে মূল কাহিনির থেকে। অনেক সময় কোন পুরাণের ঘটনার সাবপ্লট এতটাই ফোকাস পেয়েছে যে মূল কাহিনি একেবারে ফোকাসের বাইরে চলে গিয়েছে। হিন্দু পুরাণের যে সকল আচার ব্যবহারের কথা বইতে এসেছে তার অনেকগুলো সম্পর্কে আমার খুব একটা আইডিয়া না থাকায় বইয়ের কিছু অধ্যায় বলতে গেলে খাবি খেয়ে পড়তে হয়েছে। বইতে অবশ্য বেশ কিছু ব্যপারে টিকা দেয়া ছিল, তবে আরো অনেক জায়গায় এধরনের টিকার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছিলাম, যাতে আমার মতো হিন্দু পুরাণে যাদের আইডিয়া কম তারা সহজভাবে বুঝতে পারে। বইয়ের কিছু ঘটনার বর্ণনা এবং কিছু পৌরাণিক চরিত্রকে আরো ইন্টারেস্টিং ভাবে ব্যবহার করা যেতে পারতো বলেও মনে হয়েছে। - "শিবোহাম" বইয়ের প্রোডাকশন অবশ্য খুবই ভালো হয়েছে। বইয়ের প্রচ্ছদ এবং নামলিপি বেশ ইউনিক এবং কাহিনির সাথে মানানসই। বইয়ের সম্পাদনা এবং প্রুফ রিডিংও খুবই ভালোমানের। যাদের মিথোলজিক্যাল ফ্যান্টাসিতে আগ্রহ রয়েছে তারা বইটি পড়ে দেখতে পারেন, হয়তো আমার থেকেও বইটি বেশি ভালোভাবে উপভোগ করতে পারবেন। তবে বইটি পড়ার আগে হিন্দু পুরাণ এবং দেব-দেবী সম্পর্কে বেসিক কিছু আইডিয়া থাকা অত্যাবশ্যক।
শিবোহাম বইটির জন্য অনেকদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম। অবশেষে গতকাল পেয়ে পড়া শুরু করে দিয়েছিলাম। পুরাণ আমার সবসময় ফেভারিট। ধর্মীয় বিভিন্ন মিথ গুলো আমাকে টানতো ছোটবেলা থেকেই। হোক সেটা দেবাসুরের যুদ্ধ। ছোটবেলাতে ভাবতাম দেবতারা সবসময় ভালো এবং নিশ্চয়ই অসুররা খারাপ। তবে সত্যি তো এটাই দেবতারাও মাঝে মাঝে অসুরদের নিজেদের স্বর্থের জন্য ঘোল খাইয়েছে। যাই হোক শিবোহাম সম্পূর্ণ মিথোলজিক্যাল থ্রিলার। বইটিতে অনন্ত নাগ, চিরঞ্জীবী পরশুরাম সহ আরো অনেকজনের আগমন ঘটেছে। বইটিতে অনেক জায়গায় প্রচুর ব্যাখ্যার দরকার পড়েছে যার জন্য পুরাণের কিছু আখ্যান বিস্তারিতভাবে দিতে হয়েছে। আসলে মিথ জিনিসটাই এমন যদি অর্ধেক অংশ দেয় তাহলে যারা জানে তারা বুঝবে কিন্তু যারা জানে না তাদের জন্য অসহ্য হয়ে উঠবে।হিন্দু ধর্ম অনুসারে চারটি যুগ রয়েছে। যেগুলো হলো, সত্যযুগ, ত্রেতাযুগ, দ্বাপরযুগ এবং সব শেষে কলি যুগ। কলিতে এসে সব অপকর্ম অন্যান্য যুগের চেয়ে অনেক বেশি হারে বাড়তে থাকে। পুরাণ মতে এই যুগে আগমন ঘটবে বিষ্ণুর দশমাবতার কল্কির। আর লেখক চেয়েছেন কলির আগামনকে দেখাতে যে যাকে বিনাশ করতে কল্কির আগমন হবে।
#স্পয়লার_এলার্ট
শিবোহাম শব্দের অর্থ আমিই শিব। বইয়ের মূল চরিত্র কিঙ্কর। যার বয়স দশ বছর। তার জন্মের আগেই শহর ছেড়ে রাতারাতি তার বাবা-মা এবং বড় বোন চলে আসে পাহড়ে। যেখানে চন্দ্রশেখরে পূজা করা হয় মহাদেবের। জিতেন্দ্রকে চন্দ্রশেখরের প্রধান পুরোহিত বানান শঙ্কর, যিনি জিতেন্দ্রের স্ত্রী সুমিতার কাকা। দায়িত্ব দিয়ে যিনি নিজেই গায়েব হয়ে যান। যাওয়ার আগে বলে যান নির্দিষ্ট সময়ে আবার দেখা দিবেন। ছোটো কিঙ্করেকে জন্ম থেকেই অনেকে অপয়া তকমা দিয়েছে জন্মের সাথে সাথেই মায়ের মৃত্যুর পর। তবে মৃত্যুর আগে কিঙ্করের পিতা জিতেন্দ্র জানতে পারলো অলৌকিক কিছু। দশবছর পর জিতেন্দ্র যখন মৃত্যু শিয়রে তখন কিঙ্কর মুখোমুখি হয় অমোঘ সত্যের। দেবতা কিংবা অসুর দুই দলই জোট বেঁধেছে। চাই কিঙ্করকে। আবার সমুদ্র মন্থন করে কেউ চাই অমৃত আবার কেউ চাই হলাহল। যেই হলাহল স্বয়ং নীলকন্ঠ তাঁর কন্ঠে ধারণ করে আছেন। মন্থনের জন্য চাই রজ্জু এবং মন্থন দন্ড সবই প্রস্তুত। নিয়তি তার নিজের খেলা খেলতে শুরু করে দিয়েছে। এই খেলায় শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়াবে তা একমাত্র নিয়তি ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না…
লেখকের লেখা এবারই প্রথম পড়েছি। নতুন লেখক হিসেবে ভালো লিখেছেন। বিশেষ করে মিথের সংমিশ্রণটা ভালো ছিলো। লেখক সম্ভবত সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ মন্দিরকে মন্দিরকে এবং মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে তার উপন্যাসের বুনন করেছেন। যদিও বইয়ের কিছু ঘঠনার সূচনা দেখাবার জন্য এর চেয়ে ভালো স্থান হয় না। যারা মিথ ভালোবাসেন তারা পড়ে দেখতে পারেন।
মিথলজিকাল ফ্যান্টাসি বলা যায়। পুরাণে বর্ণিত ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখা। পৃথিবীতে যে যুগে যুগে কলির আগমণ আর কলিকে দমন করতে বিষ্ণুর অবতার আসে সেটাই গল্পের মধ্যে দেখানো। মহেশখালী বিচ্ছিন্ন হওয়া, ১৯৬০ এর ঘূর্ণিঝড়, '৭০ এর সাইক্লোন, দেশের তৎকালীন অস্থিরতা প্রত্যেক টা ঘটনার সাথে দেবতা, অসুরদের কার্যকলাপকে একসাথে করে দেখানো। গল্পের থিমটা অনেক ভালো লেগেছে। আর পুরাণের জটিল কাহিনী, এত চরিত্রের মধ্য থেকে ছোট একটা অংশ নিয়ে কাজ করতে হলেও অনেক দক্ষতা প্রয়োজন। লেখক নতুন হলেও কাজটা যথেষ্ট ভালোভাবেই করেছে। আমার মত যাদের পুরাণ নিয়ে কোনকিছু পড়া নাই তাদের জন্য ঘটনাগুলো তুলনামূলক সহজ মনে হবে।
অনেক বেশি চরিত্র, আবার একই চরিত্রকে একেক জায়গায় একেক নামে সম্বোধন এর কারণে বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল। আর যেটা মনে হয়েছে যে অতীতের চেয়ে বর্তমানকে বেশি হাইলাইট করলে ভালো লাগতো। তবে অনেক টার্ম আছে যেগুলা আমার মত পুরাণের ব্যাপারে অজ্ঞ পাঠকদের বুঝতে কষ্ট হবে। সেগুলো গল্পের মাঝেই বা শেষে কোথাও বর্ণনা দেয়া থাকলে ভালো হত। সব মিলিয়ে প্রথম মৌলিক উপন্যাস হিসেবে যথেষ্ট ভাল। তবে এটা সবার জন্য না। মিথোলজিতে আগ্রহ না থাকলে বিরক্তি আসতে পারে।
সামান্য কিছু অসঙ্গতি ও মাঝে কিছু ধর্মতত্ত্বের কচকচি বাদ দিলে শিবোহাম বাংলাদেশের মিথলজি বেজড ফ্যান্টাসি ফিকশনে চমৎকার সংযোজন। কাহিনীর পুরোটাই গুছিয়ে সুন্দর ও সন্তোষজনকভাবে শেষ করার জন্য লেখকের বিরাট ধন্যবাদ প্রাপ্য, যা অনেক প্রথিতযশা লেখকেরও আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে সময় সময়। লেখকের ভবিষ্যৎ বইয়ের জন্য সাগ্রহ অপেক্ষা থাকবে।
ইতিহাস অনুযায়ী নাম না জানা এক পর্তুগীজ ভ্রমণকারী, আরাকান অঞ্চলে গিয়ে একটি বিবরণী পেশ করেছিলেন। সেই বিবরণীতে লেখা ছিল, ১৫৫৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি দ্বীপের সৃষ্টি হয়, যার নাম—মহেশখালী। বর্তমানে পাহাড় ও সমুদ্রের সংযোজনে এই দ্বীপটি এখন পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বেশ সু-পরিচিত। মনে এখন প্রশ্ন আসতে পারে—কেন আমি বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ নিয়ে এত বকবক করছি?
কারণ, উক্ত দ্বীপে ‘আদিনাথ’ নামে একটি শিব মন্দির রয়েছে। মৈনাক পর্বতের চূড়ায় এই মন্দিরটি অবস্থিত। লেখক ❛শিবোহাম❜ উপন্যাসে এই আদিনাথ মন্দির ও মৈনাক পর্বতের মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন অভূতপূর্ব একটি গল্প। তবে এই মিথষ্ক্রিয়ায় তালিকায় গল্পের প্রয়োজনে যুক্ত হয়েছে এশিয়ার আরও কয়েকটি শিব মন্দির। সবেচেয়ে বেশি আলোচনা অথবা যে প্রেক্ষাপটকে ঘিরে পুরো উপন্যাস আলোড়িত হয়েছে তা হচ্ছে—চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত শিব মন্দিরকে ঘিরে। মন্দির প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি লেখক ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর হওয়া ভোলাতে সাইক্লোন কেন হয়েছিল; তার পেছনে যে কারণটি ব্যাখা করেছেন—তা মিথ ব্যতীত আর কিছুই নয়। আর এটিই উক্ত উপন্যাসের মূল গল্প। শুধু কি তাই?
এই গল্প নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে কিছু বিষয় জেনে নেওয়া যাক। বর্তমানে বিষ্ণুর দশম অবতার—কল্কিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন উপন্যাস লেখা হয়। অতীতে যেমন হয়েছে, বর্তমানে তেমনই হচ্ছে। আশা করি এই ধারা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে; অন্তত যতদিন না অবতার কল্কি কে (কে?) তা আইডেন্টিফাই করা হচ্ছে! যাহোক, ❛শিবোহাম❜ উপন্যাসে এই কল্কির জন্মকর্ম নিয়ে লেখক এমন একটি গল্প রচনা করেছেন—যেটা সামসময়িক পটভূমিতে লেখা অন্যান্য স্টোরি লাইন থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। এই উপন্যাস শেষ না করা পর্যন্ত আপনি এই কাহিনির কোনোকিছু সঠিকভাবে মেলাতে পারবেন না। কী হচ্ছে আর কেন হচ্ছে—এমন এক পাকচক্রে ঘুরপাক খেতে থাকবেন পুরো উপন্যাস জুড়ে। লেখক বেশ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে প্রতিটি অধ্যায়ের সুতো শেষে গিয়ে জোড়া দিয়েছেন তবে।
সাধারণত আমরা কল্কি অবতার নিয়ে যেসব কাহিনি পড়ে থাকি সেখানে আর্কি-মিথলজির মিশ্রণ থাকে। যুক্তি খণ্ডনের চেষ্ঠায় লেখককে সদা নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়। কিন্তু ❛শিবোহাম❜ উপন্যাস এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়েছে। যদিও প্রায়ই পাঠক এই উপন্যাসকে শুধুমাত্র ফ্যান্টাসির চোখে দেখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তবে ফ্যান্টাসি থেকেও এই উপন্যাসে পুরাণের যে শক্তপোক্ত প্রয়োগ—তা ছিল অবাক করার মতো। স্বয়ং সনাতনধর্মের ত্রিদেব, নানান দেব-দেবী, বিষ্ণু অবতার পরশুরাম, অসুর গুরু শুক্রচার্যকে সরাসরি চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করা কোনো চাট্টিখানি কথা নয়! এবং এখানে সেটাই করা হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ চরিত্রের বলতে গেলে এই উপন্যাসে হাতে গোনা!
এই উপন্যাস আপনি দুই ভাবে পড়তে পারবেন। প্রথমত, আপনি যদি সনাতনধর্মের অনুসারী হয়ে ও অনুসরণ করে থাকেন তবে—কল্কি অবতারের রহস্য, দেব-দেবীরের কিছু দায়িত্ব, সব শেষে দেবতাদের নিষ্ক্রিয় অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে পুরো গল্পটি আপনার যুক্তি দিয়ে বিচারবিবেচনা করতে পারবেন। সাথে আরও নতুন অনেক বিষয় সম্পর্কে অবগত হবেন। যদিও পুরোটাই ফিকশন, তবে কাল্পনিক চিন্তাভাবনা নিয়ে আগ্রহ থাকলে আর ভাবতে অনেক পছন্দ করলে গল্পটি অমূলক মনে নাও হতে পারে। এটা ব্যক্তি বিশেষে হয়ে থাকে কারণ দিনশেষে সব ফিকশন।
দ্বিতীয়ত, আপনি শুধুমাত্র বইটি পড়ার উদ্দেশ্যে পড়লে—ত্রিদেব (ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব), পরশুরাম ও বাসুকির ব্যাকস্টোরি, কল্কি অবতারের প্রয়োজনীয়তা, চ্যাবন মুণির গল্প, উপনয়ন কী, মদহ্ কে, শঙ্করাচার্যের দায়িত্ব হতে কেন অব্যাহত নিয়েছে; এসব বিষয়ে সামান্য জ্ঞান রাখলে বইটি পড়তে সুবিধা ও সহজ হবে। না-হয় বেশ কিছু জায়গায় বিরক্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ রয়েছে।
◆ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
❛শিবোহাম❜ উপন্যাস কাহিনি শুরু থেকে আঁকড়ে ধরার মতো না। কেমন যেন অসচ্ছল ভাব। কয়েকটি সময়কাল নিয়ে এগিয়ে চলা গল্প এক্ষেত্রে দায়ী—তা আমি বলব না। দোষটা সময়কালের না বরং লেখকের গল্প সাজানোতে। বিশেষ করে ‘অজ্ঞাত সময়, কলির স্মৃতিচারণ’ দেওয়া অধ্যায়গুলো। লেখক যেহেতু শুরু থেকে ধীরে সুস্থে গল্প বলবেন বলে ঠিক করে রেখেছেন, তবে সেটাকে আরেকটু গুছিয়ে করা যেত বলে মনে করছি।
প্রথমত লেখকের গল্প বলার ধাঁচ সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম; এমনকি লিখনপদ্ধতিও। এই নতুনত্বের সাথে খাপ খাওয়াতে আমাকে সময় দিতে হয়েছে অনেকটা। তার ভেতর গল্পের রেলগাড়ি কিন্তু থেমে থাকেনি, সেটাও চলমান ছিল। উপন্যাসের শুরুতে ১৯৭০ সালের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বর্তমান সময় হিসেবে দু-তিনটে চরিত্র পরিচিতির মাধ্যমে অতীতের একটি ঘটনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এর পরে ১৯৬০ সালের প্রেক্ষাপট থেকে শুরু হয় এই গল্পের সূত্রপাত। মাঝে রয়েছে বইয়ের অ্যান্টাগনিস্ট ‘কলির স্মৃতিচারণ’-এর আখ্যান।
বইটি পুরোপুরি উপভোগ করছি একশ পৃষ্ঠার পর থেকে। তাও মাঝেমধ্যে থেমে থেমে শেষ করতে হয়েছে। এই উপন্যাসের ইতিবাচক দিক হচ্ছে—এর গল্প আর লেখকের ভাবনা। লিখনপদ্ধতি আর সেটা উপস্থাপনের জন্য যে বর্ণনা শৈলী প্রয়োগ করেছেন—দারুণ। প্রথমে আড়ষ্ট ভাব দেখা গেলেও ধীরে ধীরে সেটা কেটে যায়।
এ-ছাড়া উপন্যাসে দেব-অসুর মিলিয়ে অমৃতের সন্ধানে করা ‘সমুদ্রমন্থন’ নিয়ে আলোচনা রয়েছে পর্যাপ্ত। পূর্বে কেন প্রয়োজন ছিল আর বর্তমানে এসে সমুদ্রমন্থন করা কেন প্রয়োজন—তা নিয়ে ❛শিবোহাম❜ উপন্যাসের মূল উপাখ্যান। প্রয়োজনীয়তার দিক থেকে দেখতে গেলে উপন্যাসের প্রতিটি বিষয় একটির সাথে অন্যটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ‘ইস্টার এগ’ নিয়ে যদি বলি, এই উপন্যাসে সেটার কমতি নেই। জন্ম থেকে মৃত্যু আর প্রতিটি চরিত্রের করা কার্যসম্পাদনের মাধ্যমে তা ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। গল্পের চরিত্র কিঙ্করের জন্ম সাজানো হয়েছে কৃষ্ণের আদলে, তবে শৈশব দেখানো হয়েছে ‘অপয়া’ হিসেবে। বেশ ইন্টারেস্টিং।
এই উপন্যাসের সমাপ্তিতে রয়েছে লুকানো রহস্যের যত উত্তর। তাই ধৈর্যশীল ও পুরাণ নিয়ে জ্ঞান অধিকন্তু জানাশোনা থাকলে তবে বইটি পড়ার আমন্ত্রণ জানাব। আর যদি নিছক ফ্যান্টাসি জনরায় লোভে বিচরণ করতে যান, তবে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে যাবেন।
● গল্পের শুরু এবং কিছু প্রশ্ন—
জন্মের দশ বছর পর কিঙ্কর জানতে পারে তার জন্ম রহস্যের আখ্যান। বাবা জিতেন্দ্র, শয্যাশায়ী অবস্থায় একদিন তাকে ডেকে, পুরো কাহিনি শোনাতে শুরু করেন। অবুঝ কিঙ্কর স্তব্ধ হয়ে শুনতে থাকে সেই কাহিনি। সে-দিন কীভাবে তারা মা মারা যায়, কেন বোন শুভনিতা তাকে আগলে রাখে; বিপদে পড়লে বারবার তাকে রক্ষা করে—এসব। পরশুরামের কথা দেওয়া, ��্বর্গ—মর্ত্যে মিশে যাওয়া, পাতালের অসুরদের আক্রমণ; সবকিছুর কারণ কিঙ্কর ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে। কেন তাকে নিয়ে দেব আর অসুরদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, তাকে হাসিল করার চক্রান্ত-সহ নানান কিছু। তখনই কিঙ্কর নিজের ভেতর থাকা সুপ্ত শক্তির উৎসের সাথে পরিচিত ঘটে। জানতে পারে কে সে আর কী তার জন্মের রহস্য!
অন্য দিকে পরশুরাম বারবার চিন্তিত অনন্তকে নিয়ে। যে কি-না বিষ্ণুর বাসুকি নাগের একটি রূপ। যাকে কলি বারবার তার বশে নিয়ে আটকে রাখে, কেন? দেবরাজ ইন্দ্রের লুকোচুরি করে পাতালে যাওয়া-আসার কারণ কী? কী চক্রান্ত চলছে দেবতা আর অসুরদের মধ্যে? কিঙ্করকে কেন তাদের প্রয়োজন?
প্রশ্ন অনেক, উত্তর এক। কী সেটা?
══
বর্তমান কাহিনির সামান্য ঝলক, অতীতের কাহিনি থেকে কলির আবির্ভাবের কারণ এবং দেবতাদের নিষ্ক্রিয় হওয়া শক্তির উৎস খোঁজার মধ্যে দিয়ে জড়িয়ে যাওয়া পরশুরাম আর অনন্তের যাত্রা; সবকিছু গুছিয়ে নিতে লেখক শুরুতে যথেষ্ট সময় নিয়েছেন। শুরু থেকে খেই হারালেও একদা জোর করে ঘটনাপ্রবাহের সাথে তাল মেলাতে হয়েছে। ধীরে ধীরে লেখকের গল্পের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি।
● গল্প বুনট » লিখনপদ্ধতি » বর্ণনা শৈলী—
গল্প বুননে লেখকের নিজস্ব একটা ধারা রয়েছে। যেটা তিনি পুরো উপন্যাসে প্রয়োগ করেছেন। লিখনপদ্ধতি ভিন্ন এক অনুভূতি দিয়েছে। আপনি মাঝেমধ্যে বিরক্ত হবেন তবে ছেড়ে দিতে পারবেন না। কিছু জায়গায় আমাকে ডাবল রিড দিতে হয়েছে, কিছু ঘটনা ভালো করে মানসপটে ফুটিয়ে তোলার জন্য। সাব-প্লট এই উপন্যাসে অনেক। তবে লেখকের বর্ণনা শৈলীর প্রশংসা করতে হয়, বিশেষ করে লড়াইয়ের সিনগুলোতে। একইসাথে যখন ম্যাজিকের (দেবতাদের জাদু) ব্যবহার যে শব্দচয়ন আর বাক্য গঠনের দারুণ মিশেল ঘটিয়েছেন তা খুবই ভালো লেগেছে। একেবারে প্রাঞ্জল বর্ণনা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের যে তাণ্ডব তিনি লেখার মাধ্যমে জীবন্ত করেছেন, তা বেশ গাঢ়ভাবে অনুভব করতে পেরেছি। উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে—সংলাপ। শুরুতে বলেছি এখানে সাধারণ মানুষের বিচরণ খুবই সল্প, সবকিছু দেব-দেবী চরিত্রদের দখলে। সেক্ষেত্রে সংলাপে যে দেব প্রদত্ত ভাব তা কোথাও যেন মিসিং ছিল। বলছি না ঐতিহাসিক কোনো ফ্লেভারে অথবা মহাভারতীয় স্টাইলে সংলাপ ব্যবহারের প্রয়াস করতে, সেই আশা নিয়ে বইটি আমি পড়তে বসিনি। তবে যখনই পুরাণের কথোপকথনে সাধারণ মানুষদের মতো দেবতাদের আচার-আচরণ দেখানো হয়েছে, তা কিছুটা অত্যাশ্চর্য লেগেছে। এই দিকটি আরেকটু ডেভেলপ করা গেলে মন্দ হতো না।
গল্প, সাব-প্লট এর বাইরে লেখকের ধর্ম সংক্রান্ত নিজস্ব কিছু দার্শনিক জ্ঞান বাঁটার সুপ্ত ইচ্ছা লক্ষ করেছি। ওই দিকটি পুরাণ নিয়ে জ্ঞান না থাকা পাঠকদের কিছুটা বিরক্তিকর লাগতে পারে।
● যেমন ছিল গল্পের চরিত্ররা—
চরিত্র যেখানে দেব-দেবী—সেখান নতুন করে আর কীই-বা বলার আছে। যথারীতি লেখক এখানেও দেবরাজ ইন্দ্রকে সেই কূটনীতি পরিচালনার রথের সারথি হিসেবে উপস্থাপনা করেছেন। তবে এখানে ইন্দ্রের একটি স্বার্থ রয়েছে। শুধু ইন্দ্রের না অন্যান্য সকল দেবতাদেরও। দেবী রূপে গঙ্গা আর মহামায়াকে দেখানো হয়েছে। তবে স্ক্রিন টাইম বেশি পেয়েছে পরশুরাম, অনন্ত (শেষ নাগ) এবং মদহ্ নামক এক রাক্ষস।
কিঙ্করকে তৈরি করা হয়েছে কল্কি রূপে। কিন্তু সেটা ভিন্নভাবে। কলি যুগের কলিকে সরাসরি নিয়ে আসা প্রশংসার্হ। এ-ছাড়া অসুর গুরু শুক্রাচার্যের কাহিনি এই উপন্যাসে আলাদা এক মাহাত্ম্য সৃষ্টি করেছে। এখন বলি বইয়ের নামকরণ অর্থাৎ ‘শিবোহাম’ কী? মূল রহস্য কি খোলাসা করা ঠিক হবে? মনে হয় না।
তবুও বলি, কাহিনির প্রয়োজনে লেখক টেনে আনতে ভুলেননি ত্রিদেবকে। সূর্য দেবতার সাংসারিক জীবন, শিবের হলাহল পানের কারণ, বিষ্ণুর অবতারের ব্যাখা, চ্যাবন মুনির সাথে ইন্দ্রের লেনাদেনা, নারদের ‘নারায়ণ’ বলা রহস্য, পাতালের নারদ খ্যাত ‘চক্রি’ চরিত্রের পরিচয় তো রয়েছে। বাদ নেই কৃষ্ণের অন্তর্ধান ও অগ্নিদেবতার সাথে সলাপরমর্শের অধ্যায়ও।
● শেষের গল্প বলা প্রয়োজন—
শুরুটা কষ্টেসৃষ্টে হলেও শেষটা—এই আক্ষেপ অনেকটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। এখানে লেখক কিছু ছলনার আশ্রয় নিয়েছেন। গল্পটা এমন জায়গায় শেষ যে অভিযোগের সুযোগে একেবারেই নেই। তবে তিনি চাইলে আবারও একই কাহিনির পুনরাবৃত্তি করতে পারবেন। কারণ ৭০ সালের পর এমন দুর্যোগ বঙ্গদেশে আরও অনেক হয়েছে। হয়তো নতুন কোনো কল্কি অবতার নিয়ে এমন গল্প আবারও তৈরি করতে পারবেন।
● খুচরা আলাপ—
❛শিবোহাম❜ উপন্যাসে ‘ত্রি’ সংজ্ঞার ব্যাখা এবং নাক্ষত্রিক দেহের প্রয়োজনীয়তা বেশ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। আমরা বিভিন্ন মাত্রা অথবা ডাইমেনশন নিয়ে কমবেশি অনেকে জানি, লেখক সময়ের তৃতীয় ও চতুর্থ মাত্রার একটি ব্যাখা সাধারণ দেহ থেকে আত্মা আলাদা করে নাক্ষত্রিক অবয়ব ধারণের মাধ্যমে তা ফুটিয়ে তুলেছেন। যা প্রশংসনীয়।
এ-ছাড়া ষড়রিপু, কুণ্ডলিনী বা প্রচ্ছন্ন শক্তি নিয়ে ব্যাখা স্বরূপ মানবদেহে ঊর্ধ্ব থেকে নিম্ন দিকে ধাপে ধাপে যে সাতটি স্থানকে কেন চক্র বলে এবং কী সেই চক্রের কাজ তা নিয়ে স্বল্প কিন্তু প্রয়োজনীয় বিবরণ রয়েছে। অজানা এমন অনেক বিষয় সম্পর্কে এই বই অনেক সহযোগিতা করেছে আমাকে। সত্ত্বগুণ, তমোগুণ, রজোগুণ এবং সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আলোকপাতের কমতি লেখক রাখেননি।
সবচেয়ে যে বিষয়টি এই উপন্যাস শেষ করার পর আগ্রহী করে তুলেছে তা হলো, দেবতারা কি তাদের স্বভাব ও চরিত্র অনুযায়ী আসলেই ভালো ছিল? অথবা এইভাবে বলা যায়, তারা সমুদ্রমন্থন থেকে অসুরদের সাথে ছলনা করে যে অমৃত পান করেছে—তা কতটা যৌক্তিক ছিল? কলির আগমনে স্বয়ং দেবতাদের হস্তক্ষেপ কি অস্বীকার করা যায়? অথচ আজ যত অনাচার হচ্ছে তার পেছনে অসুরদের কতটুকু দায়ী করা সম্ভব?
উপন্যাসে শিব মন্দির স্থাপনা নিয়ে নেপালের তৎকালীন এক রাজার কাহিনি এখানে লেখক যুক্ত করেছেন। মূল ঘটনা কী তা আমারও অজানা, হয়তো নেটে ঘাঁটাঘাঁটি করলে এই নিয়ে কোনো কাহিনি পাওয়া যবে। তবে লেখক যে কাহিনি এই রাজার মন্দির বানানোর পেছনে বসিয়েছেন—সেটা ভিন্ন কিছু হলে ভালো হতো। এই দিকটা গতানুগতিক লেগেছে।
◆ লেখক নিয়ে কিছু কথা—
লেখকের প্রথম লেখা কোনো গল্প বা বলা চলে পুরোপুরি উপন্যাস পড়ে ফেলা। তিনি যে দুর্দান্ত গল্প বলতে পারেন সেটা বলব না তবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে বিশ্বাসযোগ্য একটি গল্প উপস্থাপন করতে পারেন। যা এই উপন্যাস পড়ে মনে হয়েছে। লেখকের পুরাণ সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান। রিসার্চ যে ভালোই করেছেন তা প্রতি পৃষ্ঠায় স্পষ্ট ভেসে উঠেছে। গল্পে সরাসরি দেবতাদের নিয়ে চরিত্রায়ন বেশ চ্যালেঞ্জিং হলেও তিনি তাতে অনেকটা সফল।
আগামীতে এমন মিথলজিক্যাল ফ্যান্টাসি বেজড আরও উপন্যাস লেখক থেকে আশা করছি। আরও দারুণ কনটেন্ট দেওয়ার সামর্থ্য লেখক অবশ্যই রাখেন। শুভকামনা।
● বানান ও সম্পাদনা—
কিছু প্রচলিত বানান ভুলের দেখা পাওয়া গিয়েছে। কিছু শব্দের মাঝে স্পেসের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি। এছাড়া টুকটাক টাইপো তো আছে। সম্পাদনার বেশি ঘাটতি না থাকলেও দুয়েক জায়গায় ছিল; তবে সেটা গ্রাহ্য করার মতো না। ভালোই।
● প্রচ্ছদ—
বর্ডার বাদ দিয়ে এই প্রচ্ছদ করলে, এই বছরের পড়া বইগুলোর মধ্যে অন্যতম পছন্দের একটি প্রচ্ছদ হতো। নামলিপিতে পুরাণের একটা ভাইব রয়েছে সাথে গল্পের মূল যত উপজীব্য বিষয় সে-সব দারুণভাবে সিম্বলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রচ্ছদ শিল্পী। সুন্দর।
● মলাট » বাঁধাই » পৃষ্ঠা—
বিবলিওফাইলের প্রকাশিত ২৫ নম্বর বই। এই বইয়ের মূল আকর্ষণ ���চ্ছে ফন্ট স্টাইল। শুনেছি এটা ওনাদের নিজস্ব ক্রিয়েশন। উক্ত ফন্টে পড়ে ভালোই লাগল। পেজ সেটাপে প্রথমে মনে হলো, খুব কম লাইন এক পৃষ্ঠায় রেখেছে কিন্তু বইয়ের কনটেন্ট অনুযায়ী যা যথাযথ লেগেছে। দাম অনুযায়ী মানের দিক দিয়েও ভালো।
≣∣≣ বই : শিবোহাম • শুভঙ্কর শুভ ≣∣≣ জনরা : মিথলজিক্যাল ফ্যান্টাসি থ্রিলার ≣∣≣ প্রথম প্রকাশ : মার্চ ২০২১ ≣∣≣ প্রচ্ছদ : আশিকুর রহমান বিশাল ≣∣≣ প্রকাশনা : বিবলিওফাইল ≣∣≣ মুদ্রিত মূল্য : ২৮০ টাকা মাত্র ≣∣≣ পৃষ্ঠা : ২২০
বহুদিন বইটই নিয়ে বিস্তারিত লেখা হয় না বলে বুঝতে পারছি না কোথা থেকে শুরু করব। তাই কী কী ভালো লেগেছে আর কী কী মন্দ লেগেছে, সেটা বলেই চুপ মেরে যাই। যা ভালো লেগেছে প্রথমত, জনরা ও প্লট। ভূত-প্রেত টাইপ হরর বাদ দিয়ে অলৌকিক যেকোন কিছুতে আমার ব্যাপক আগ্রহ। এই বইয়ে গল্পটা যখন আশেপাশের দেব-দেবী আর শক্তিধর চরিত্রগুলোর সাথে চেনা-জানা দুনিয়ার সাধারণ কিছু চরিত্রের সাথে মেলবন্ধ ঘটানো নিয়ে, তখন পুরো ব্যাপারটা যে আমার বেশ পছন্দ হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ধ্বংসের হাত থেকে দুনিয়াকে বাঁচানো ক্লিশে একটা ব্যাপার হতে পারে। এ কাহিনীর চূড়ান্ত গন্তব্যও এটা, তবে ক্লিশে মনে হয়নি। বরং বাস্তবিক কিছু জায়গা-ঘটনার সমাবেশে উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত, পুরাণ আর বাস্তবতার মিশেল। আমার মতে এটা বইয়ের সবচেয়ে স্ট্রং পয়েন্ট। পুরানের ঘটনাগুলোর সাথে যেভাবে বাস্তবিক ঘটনার (যেমন: ঘূর্ণিঝড়গুলো, মহেশখালীর মূল ভূ-খণ্ড থেকে ভেঙে আলাদা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি) মেলবন্ধ ঘটিয়েছেন, তা চমৎকার লেগেছে। তৃতীয়ত, গল্প বলার ধরন। শিবোহাম পড়ার আগে লেখকের টুকরো কিছু লেখা পড়া হয়েছিল। এবং প্রত্যেকবারই মনে হয়েছে, শুভংকরদার লেখার ধাঁচ আলাদা। মনে হয় আসরে বসে কেউ গল্প শোনাচ্ছে। এই বইয়েও সে ভাব অনেকটাই বজায় থাকলেও তাতে গতানুগতিক ফ্লেভার চলে এসেছে কিছুটা। চতুর্থত, ভালোর দল পুরোপুরি ভালো নয়, খারাপের দল পুরোপুরি খারাপ নয়-এই ব্যাপারটা তুলে ধরা। দেবতা আর অসুরদের কর্মকাণ্ডে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে এই জিনিসটা। শেষমেশ এবং একেবারেই ব্যক্তিগত পয়েন্ট, চরিত্রগুলোর নামকরণ। এই ব্যাপারটা অন্য কারও সাথে ঘটে কিনা জানি না। কিন্তু আমার কাছে একটা গল্পের চরিত্রগুলোর নামকরণ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অনেকসময় নাম সুন্দর হলেও চরিত্রের সাথে ঠিক খাপ খায় না। আবার অনেক সময় খুব সাদামাটা নামও সুন্দর খাপ খেয়ে যায়। অনেক চমৎকার বইয়ের স্বাদ অনেকটাই ফিকে লেগেছিল শুধু চরিত্রগুলোর নাম ভালো লাগেনি বলে। ঠিক কীভাবে, কী থেকে এই জাজমেন্টটা আসে, আমি জানি না। যাইহোক, এ বইয়ের চরিত্রগুলোর নাম চমৎকার লেগেছে, সেই সাথে মানিয়েও গিয়েছে ভালো মতো। যা ভালো লাগেনি প্রথমত, দুই টাইমলাইনের ব্যালেন্স। বর্তমানে কিঙ্করের ঘটনাবলী আর অতীতে দেবতাদের কার্মকাণ্ড-এ দুই অংশে কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। মূল প্লট যেখানে কিঙ্করকে ঘিরে, সেখানে আমার মনে হয়েছে অতীত অংশ তুলনামূলকভাবে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। আর তাছাড়া, দুই অংশ একটু পর পর সুইচ করলে মজা পেতাম, যেখানে মাঝে মাঝে অতীত অংশ অনেক্ষণ ধরে চলছিল। দ্বিতীয়ত, গল্পের টোন। ব্যক্তিগতভাবে আমার ডার্ক টোনের কাহিনী পছন্দ। তাই বলে সব জায়গায় নয়। কিন্তু এই বইয়ে এত এত ধ্বংসযজ্ঞ, এত মৃত্যু ছিল, তারপরও সেগুলোর কোন ইফেক্টই পাইনি বলে মনে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গার লড়াইগুলো আরও ডিটেইলড হলে দারুণ হতো, এবং সে সুযোগও ভালোই ছিল বলে মনে হয়েছে। ও হ্যাঁ, খল চরিত্রগুলোকেও তেমন স্ট্রং মনে হয়নি, যেটা দরকারী ছিল। তৃতীয়ত... পুরাণের এত এত চরিত্র আর ঘটনার মাঝে কয়েকবার খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। এর কারণটা ছিল ভারতীয় পুরাণ সম্পর্কে আমার জ্ঞান প্রায় শূন্যের কোথায়। এখানে লেখককে দোষ দেয়া যায় কিনা নিশ্চিত নই। কারণ এর চাইতে বেশি বর্ণনা দিতে গেলে বই আরও লম্বা হতো, গতি আরও কমে যেতো। অবশ্য এখানে লাভটা যা হয়েছে, ভারতীয় পুরাণ নিয়ে আগ্রহের পারদটা বেশ চড়েছে!
যাইহোক, ভালো-মন্দ মিলিয়ে বইটা উপভোগ্য ছিল। লেখকের আগামী বইয়ের প্রত্যাশায় রইলাম!
নাক চেপে বাসক পাতার রসের মত শেষ করলাম । আগামী কয়েকদিন বদহজমে কিছু পড়তে পারব না । কষ্টের টাকা দিয়ে না কিনলে DNF করে রাখতাম । পুরাণের কিছু ঘটনা ছাড়া সাহিত্যমানের কিছুই নাই । উপকারের দিক হইল বুঝতে পারছি এসব রিভিউ রেটিং এ আমার আরও ব্রুটাল হওয়া উচিত । ২ স্টার যে দিলাম এটাও Nice Guy Syndrome এর কারণে বেশি দিয়ে ফেললাম নাকি বুঝতেছিনা ।
মিথলজিকাল ফ্যান্টাসি বলা যায়। পুরাণে বর্ণিত ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখা। পৃথিবীতে যে যুগে যুগে কলির আগমণ আর কলিকে দমন করতে বিষ্ণুর অবতার আসে সেটাই গল্পের মধ্যে দেখানো। মহেশখালী বিচ্ছিন্ন হওয়া, ১৯৬০ এর ঘূর্ণিঝড়, '৭০ এর সাইক্লোন, দেশের তৎকালীন অস্থিরতা প্রত্যেক টা ঘটনার সাথে দেবতা, অসুরদের কার্যকলাপকে একসাথে করে দেখানো। গল্পের থিমটা অনেক ভালো লেগেছে। আর পুরাণের জটিল কাহিনী, এত চরিত্রের মধ্য থেকে ছোট একটা অংশ নিয়ে কাজ করতে হলেও অনেক দক্ষতা প্রয়োজন। লেখক নতুন হলেও কাজটা যথেষ্ট ভালোভাবেই করেছে। আমার মত যাদের পুরাণ নিয়ে কোনকিছু পড়া নাই তাদের জন্য ঘটনাগুলো তুলনামূলক সহজ মনে হবে।
অনেক বেশি চরিত্র, আবার একই চরিত্রকে একেক জায়গায় একেক নামে সম্বোধন এর কারণে বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল। আর যেটা মনে হয়েছে যে অতীতের চেয়ে বর্তমানকে বেশি হাইলাইট করলে ভালো লাগতো। তবে অনেক টার্ম আছে যেগুলা আমার মত পুরাণের ব্যাপারে অজ্ঞ পাঠকদের বুঝতে কষ্ট হবে। সেগুলো গল্পের মাঝেই বা শেষে কোথাও বর্ণনা দেয়া থাকলে ভালো হত। সব মিলিয়ে প্রথম মৌলিক উপন্যাস হিসেবে যথেষ্ট ভাল। তবে এটা সবার জন্য না। মিথোলজিতে আগ্রহ না থাকলে বিরক্তি আসতে পারে।
এই বইটির সব থেকে ভালো লেগেছে লৈখনশৈলী, বাক্য গঠন, শব্দের ব্যবহার। এডিটং ও লেখকের কাজ দুইটাই দূর্দান্ত হয়েছে৷ খালি চোখে ভুল ধরার মত না৷ গল্পের প্লটটাও সুন্দর ছিল৷ এই বইমেলায় যত গুলোর লেখকের প্রথম মৌলিক পড়লাম তার ভেতর শিবোহাম আমার ভালো লেগেছে বেশি৷ লেখকের জন্য শুভ কামনা রইলো।
অনেক আন্ডারেটেড একটা বই। এরকম একটা মাইথোলজিকাল ফ্যান্টাসি বাংলা ভাষায় - বলা যায় one of a kind. বইটার রাইটিং একটা ইন্টেলিজেন্ট রাইটিং আমি বলব। এর কিছু কারন আছে। প্রথমে একটা ফ্যান্টাসি গল্প কি রকম হয়? অনেক গুলা চরিত্র থাকে। সেগুলার বিল্ড আপ দেওয়া হয় ধীরে ধীরে। অনেক কনভারসেশন থাকে তাদের সাইকোলজি থাকে, সবার একটা ব্য��ক স্টোরি থাকে, প্রতিটা চরিত্রে আলাদা আলাদা মোটিফ থাকে, যা যা হ্যাপেনিং প্রতিটি চরিত্রের সেটার সাথে কোনো না কোনো হাত থাকে। সেই সাথে ফ্যান্টাসিতে সব কিছু জিনিস কিন্তু স্পুন ফিটিং করে দেওয়া হয় না। এই কারনেই ফ্যান্টাসি পড়তে কিন্তু যথেষ্ট ধৈর্য দরকার হয়। ধীরে ধীরে এর রস আস্বাদন করতে হয়। এই সবগুলো জিনিসই এই বইটাতে আছে। এই জিনিসগুলোই বইটাকে একটা ভালো ফ্যান্টাসি বই বানায়। তারপরে আসি নন লিনিয়ার স্টোরি টেলিং। এখন নন লিনিয়ার স্টোরি টেলিং নতুন কিছু না। প্রথম চ্যাপ্টার প্রেজেন্ট দ্বিতীয় চ্যাপ্টার পাস্ট এরকম ফরম্যাট অহরহই দেখি। কিন্তু এই বইয়ে নন লিনিয়ার স্টোরি টেলিংটা একটু অন্যরকম। কারণ এখানে টাইম জাম্প গুলা একটু বেশিই নন লিনিয়ার। কোথা থেকে কোথায় চলে যায় সেটার খেই না ধরলে গোলায় যেতে পারে।
যেহেতু এটা একটা ফ্যান্টাসি তাই একটু বড় পরিসরে লেখা দরকার ছিল। সেই সাথে একটু ডিটেলিং এর ঘাটতি মনে হয়েছে কয়েক জায়গায়। ফ্যান্টাসিতে অ্যাকশন জিনিসটা অনেক বড় পরিসরে থাকে। এখানে সেই পরিসরটা ছোট। মানে যা আছে সেগুলো যথেষ্ট ভালো। তবে অ্যাকশনের পরিসর টা আরেকটু বেশি হলে ভালো হতো।
বর্তমান ভাইরালের যুগে সাহিত্যও ভাইরাল হয়। কিন্তু যেগুলা ভালো সাহিত্য সেগুলোর জন্য ঢাকঢোল পিটাইতে হয় না। ভালো চাইতো পাঠককে খুঁজে নেয়। তাই একজন পাঠকের দায়িত্ব এরকম ভালো সাহিত্যের খোঁজ পেলে আরও দশজন পাঠকেকে পড়তে উৎসাহিত করা। বইটি পড়ুন, হাইলি রেকমান্ডেড।