মিরপুরের পরিত্যাক্ত এক বাড়িতে টিভি রিপোর্টার নাফিস কী এমন খুঁজে পেল, যা তার বিশ্বাসের সব ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে? সবার অলক্ষ্যে কোন অশুভ নরখাদক হানা দিচ্ছে ব্যস্ত নগরী ঢাকায়? কেন? ওদিকে ময়মনসিংহে পা রাখতেই রফিক শিকদারের মনে জেগেছে অজস্র প্রশ্ন। অদ্ভুত সব রহস্য দেখা দিচ্ছে তার চারপাশে। অতীত-বর্তমানের কোন যোগসূত্র তাকে টেনে এনেছে এখানে, তার দাদার মাজারে? তবে কি তার জীবনে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সব এক সুতোয় গাথা? তিন অদ্ভুত ভাই হাবিল-নাবিল-কাবিলই বা কী চায়? হেম্মেজের রহস্যময় আচরণ বারবার সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। সব বিপত্তি পেড়িয়ে মায়াবাঘ এর আক্রমণের জবাব খুঁজতে রফিক ছুটে গেল খুলনায়। ওদিকে রাজশাহীতে নদীর তীরে একের পর এক উধাও হচ্ছে মানুষ। হারিয়ে যাচ্ছে প্রাণীরা। সত্যকলামের ‘অপ্রাকৃত’ বিভাগেও জমা হয়েছে ময়মনসিংহের বন-পাহাড়ে ঘটে যাওয়া এক নারকীয় তাণ্ডবের ঘটনা। সাফওয়াত হাসপাতালে, আইরিনের ভাবনায় আগামীদিনে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা ৷ আর সবার প্রচেষ্টাকে বিফল করতেই নরক থেকে হাজির হয়েছে সেই প্রাচীন অভিশাপ, যার কারণে প্রাণ হারাতে হয়েছিল অতীতের কোন রফিক শিকদারকে। আসলেই কি তাই? না কি সবকিছুর পেছনে লুকিয়ে আছে ভিন্ন কোন আততায়ী? কী তার উদ্দেশ্য? অন্ধকার সে রাতের যুদ্ধে রফিক কী বেঁচে ফিরতে পারবে? বাপ্পী খানের লেখা ‘হার না মানা অন্ধকার’ ও ‘ঘিরে থাকা অন্ধকার’ এর সাফল্যের পর অন্ধকার ট্রিলজির শেষ বই ‘কেটে যাক অন্ধকার’; যেখানে ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অদ্ভুত কিছু অতিপ্রাকৃত আখ্যান।
একটা ট্রিলজি সফলভাবে শেষ করা বেশ কষ্টসাধ্য। কাহিনী ঝুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেখানে এই অন্ধকার ট্রিলজি বেশ সফলভাবেই ইতি ঘটানো হয়েছে কেটে যাক অন্ধকার বইটা দিয়ে।
বাকি দুটো বইয়ের মত আবারও রফিক শিকদার আবারও সত্য কলাম পত্রিকা। আবারও রফিককে মুখোমুখি হতে হয় অতিপ্রাকৃত রহস্যের। তবে এবার রফিক একা নয়। রফিকের সাথে রয়েছে একটা টিম। আর এবারের লড়াই ‘ব্যক্তিগত’। লড়তে হবে দাদার আমলের অভিশাপের বিরুদ্ধে। পারবে রফিক অ্যান্ড কোং? নাকি অতিপ্রাকৃত সত্তার বিরুদ্ধে বিলীন হয়ে যাবে?
প্রথম দুটো বইয়ের কাহিনী ধরেই তৃতীয় বইয়ের সূত্রপাত। তৃতীয় বইটা বেশ বিস্তারিত। আরও ভালোভাবে রফিক ও তার কেসগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড বর্ণনা করা হয়েছে। সত্যকলামের গল্পগুলোর মধ্যে এবার সবথেকে ভালো লেগেছে সাক্ষী আর কালামের গল্প। আগের বই দুটো যারা পড়েছেন তাদের জন্য কেটে যাক অন্ধকার একটা নস্টালজিয়া। কেটে যাক অন্ধকার পড়ার আগে ওই দুটো আবারও পড়ে নিলে বেশি উপভোগ্য হবে। কারণ প্রথম দুই বইয়ে যে ক্লু লেখক দিয়েছিলেন সেসব মিলেছে এই তৃতীয় কিস্তিতে এসে। তৃতীয় কিস্তির সবথেকে চমকদার অংশ হল এর এন্ডিং। একেবারে চমকে যেতে হয়। দারুণভাবে ফোরশ্যাডো করেছেন লেখক, এতদিন যা জেনে আসছেন সেসব আপনার ভুল ধারণা এমন জানতে পারলে কেমন অনুভূতি হবে? নিশ্চয়ই বোকা বনে যাবেন। এমনটাই হয়েছে শেষে। সেইসাথে বিস্তারিত ফাইট সিন। বইটা আরও দুর্দান্ত হয়েছে গুণী শিল্পী ওয়াসিফ নূরের আর্টের কারণে। পড়া সিনগুলো জীবন্ত দেখাচ্ছিল। অবশেষে লেখককে ধন্যবাদ দারুণ ট্রিলজির জন্য। অন্ধকার কি কাটল অবশেষে?
সুন্দরভাবেই অবশেষে অন্ধকার ট্রিলজির সমাপ্ত হলো। তবে প্রথম দুটোর মধ্যে যেমন টান-টান একটা উত্তেজনার মাঝে ছিলাম, এখানে তেমনটা ছিলাম না। হয়ত আগের দুই কাহিনীর সাথে যোগসূত্র স্থাপন করবার জন্যই লেখক সময়টা বেশি দিয়েছেন। উত্তেজনার মাঝে না থাকলেও পরে কী হতে যাচ্ছে, এটা নিয়ে আগ্রহ বরাবরই ছিল। কিয়াসু মিশিকে আবারও ফিরে পেয়ে ভালো লেগেছে। সোমরাখাকে যতটা শক্তিশালী হিসেবে পোর্ট্রে করা হয়েছিল, তেমনটা খুব একটা মনে হয়নি কাহিনীর মূল এন্টাগোনিস্টের আবির্ভাবের কারণে। একবাক্যে বলা যায়, শেষের দিকে লেখক পাঠকদের জন্য বেশ বড়সড়ই একটা টুইস্ট রেখেছেন। রফিক শিকদার আর মৃত্তিকা জুটি হয়ত আবারও পাঠকদের সামনে আসবে। তবে সেটা কবে, তা বলা যাচ্ছে না। লেখক একটা আভাস দিয়েছেন তাদেরকে ফিরিয়ে আনার। দেখা যাক সামনে কী হয়। শরিমন দাদীর পোষা নেকড়ের আসল পরিচয় জানতে পেরে পাঠকেরা চমকে যাবেন বলেই আশা করছি। চমৎকার এই ট্রিলজির জন্য লেখককে ধন্যবাদ।
“Sometimes human places, create inhuman monsters.” ― Stephen King, The Shining - কেটে যাক অন্ধকার - রফিক শিকদার, ঘিরে থাকা অন্ধকারের ঘটনাবলির পরে তার এক প্রিয়জনকে বাঁচানোর জন্য ছুটে যায় ময়মনসিংহে, তার পৈতৃক এলাকায়। সেখানে গিয়ে সে জানতে পারে তার অতীত ইতিহাস এবং এক কালো শক্তির সাথে তার বংশের বিরোধের কথা। সেই কালো শক্তির উৎস খুঁজতে সে ছুটতে থাকে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। - এদিকে ঢাকায় শুরু হয়েছে এক নরখাদকের তান্ডব। টিভি রিপোর্টার নাফিস এ ঘটনার সুরাহা করার জন্য রফিক শিকদারের খোঁজ করা শুরু করলে সেও জড়িয়ে পরে রফিকের কেসে। এখন কে এই কালো শক্তির উৎস আর রফিক এবং তার দলবল কী পারবে এই কালো শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে? তা জানার জন্য পড়তে হবে লেখক বাপ্পী খান এর “অন্ধকার” ট্রিলজির “হার না মানা অন্ধকার” এবং “ঘিরে থাকা অন্ধকার” এর পরবর্তী পর্ব “কেটে যাক অন্ধকার”। - কেটে যাক অন্ধকার বইটি মূলত লেখক বাপ্পী খানের “অন্ধকার” ট্রিলজির শেষ পর্ব। সিরিজের প্রথম দুই পর্ব “হার না মানা অন্ধকার” এবং “ঘিরে থাকা অন্ধকার” এর মতোই এই বইটিও সুপারন্যাচারাল ঘরানার। প্রারম্ভের এক অধ্যায় পরেই কেটে যাক অন্ধকার শুরু হয় এর আগের পর্ব যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেই জায়গাতেই। সিরিজের আগের বই মোটামোটি ক্লিফহ্যাঙ্গারে শেষ হওয়ায় সে কাহিনির পরবর্তী অংশ পেয়ে সেই সময় থেকেই কাহিনিতে হুক হয়ে যাই। এরপরে কখনো রফিক শিকদারের জবানীতে আবার কখনো সত্য কলামের কোন কলামে দেখা পাওয়া যায় নানা অতিপ্রাকৃত সত্তার, গল্পও এগিয়ে যায় নিজের গতিতে। - কেটে যাক অন্ধকার এ এর আগের দুই পর্বের মতোই চমৎকার লেখনশৈলী এবং ভয়ের আবহের ব্যাপারগুলো রয়েছে। ঘটনার আশপাশের পরিবেশের বর্ণনা এই পর্বে গল্পের কাহিনীতে ঢুকতে বেশ সাহায্য করেছে। ঘিরে থাকা অন্ধকার এর মতো এখানেও কয়েকটি পর্বের শুরুতে প্রাসঙ্গিক কবিতা ব্যবহার করার ব্যাপারটা ভালো লাগলো। ট্রিলজির শেষ পর্ব হিসেবে অসাধারণভাবে আগের বইয়ের কিছু ঘটনার যোগসূত্র দেখানো হয়েছে। এই পর্বেও সত্য কলামের ঘটনাগুলো বেশ মোটাদাগে ইন্টারেস্টিং ছিল। - কেটে যাক অন্ধকার বইটির চরিত্রের ভেতরে এবারের স্ট্যান্ড আউট চরিত্র রফিক শিকদার। পুরো গল্প বলতে গেলে টেনে নিয়ে গেছে এই চরিত্র। তবে এবারের পর্বে শুধু রফিক শিকদারই নয়, তিন ভাই হাবিল-কাবিল-নাবিল, নাফিস, হেম্মেজ সহ প্রায় প্রতিটি পার্শ্ব চরিত্রই স্পেস পেয়েছে নিজেদের চরিত্রের ছাপ বসাতে। গল্পের প্রয়োজনে বেশ কিছু অতিপ্রাকৃতিক সত্তার বর্ণনা, অ্যাকশন দৃশ্য এবং নানা ধরণের আচার-উপাচারের বর্ণনা দেয়া হয়েছে যা বেশ স্বার্থকভাবেই ফুটে উঠেছে চোখের সামনে। বইয়ের শেষটাও বেশ চমকপ্রদই লাগলো। - কেটে যাক অন্ধকার বইয়ের কারিগরি দিকের দিকে তাকালে ওভারঅল প্রোডাকশন ভালোই লেগেছে। এখানে বিশেষভাবে প্রশংসা করতে হয় বইয়ের ভেতরে করা কিছু দারুন ইলাস্ট্রেশনের, যার কারণে গল্প ভিজ্যুয়ালাইজ করতে সুবিধা হয়েছে। বইয়ের প্রচ্ছদের ইলাস্ট্রেশনও গল্পের সাথে মানানসই। তবে বইয়ের সম্পাদনায় কিছুটা ঘাটতি চোখে পড়লো। কিছু ছোটখাট টাইপো ছিল, অনেক জায়গায় "উ-কার" অপ্রয়োজনীয়ভাবে এসে পড়েছে। গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চরিত্রের নাম অদল-বদল হয়ে গিয়েছে যা পড়ায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে। এ সকল বিষয়গুলো পরবর্তী সংস্করণে ঠিক করা হবে আশা করি। - এক কথায়, “অন্ধকার” ট্রিলজির শেষ পর্ব হিসেবে আমার মতে কেটে যাক অন্ধকার পুরোপুরি স্বার্থক। যাদের বাংলা মৌলিক সুপারন্যাচারাল বই পড়তে পছন্দ তাদের এই সিরিজটি মিস করা উচিত হবে না, তবে অবশ্যই সিরিয়ালি পড়া লাগবে সিরিজের বইগুলো। ট্রিলজি শেষ হলেও লেখকের কাছ থেকে এই ইউনিভার্সের আরো গল্প সামনে পাবো, এই আশা করছি।
অন্ধকার ট্রিলজিটা বেশ ভালো ভাবেই শেষ হল বইটাতে। আগের দুইটা বইয়ের রহস্যময় ঘটনাগুলোকে এক সুতোয় বাঁধার প্রচেষ্টা সফল হয়েছে বলা যায়। চমৎকার এক টানে পড়ে ফেলার মত। মুদ্রণপ্রমাদ বেশী চোখে পড়েছে, খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বেশ কয়েকবার "হেম্মেজ" আর "রেজ্জেক" এর নাম অদলবদল হয়ে গিয়েছে। এবারের ���লাস্ট্রেশনগুলোও কিছুটা দায়সারা গোছের হয়েছে। রক্তচোষা বাদুরের অংশটা ইন্টারেস্টিং, পানিমুড়ার অংশটা দুর্দান্ত, মিউটেন্ট মাকড়সার অংশটা জমেনি, শেষের ফাইট দুর্ধর্ষ হয়েছে।
কেটে যাক অন্ধকার, অন্ধকার ট্রিওলজির শেষ আখ্যান ---------------------------------------------- ---------------------------------------------- আমাদের দেশের মৌলিক হরর থ্রিলারের মধ্যে আমার পড়া হয়েছে তানজিম রহমানের অক্টারিন, আর্কন এবং জাবেদ রাসিনের তমিস্রা সিরিজ৷ সবগুলোই বেশ উপভোগ্য ছিল৷ এই ধারারই আরেকটি সফল ট্রিওলজি হলো অন্ধকার৷
লেখকের পূর্বের দুটো বই অনেকদিন ধরে পড়ে ছিল৷ সময়ের কারণে পড়ে উঠা হয় নি৷ সবার প্রতিক্রিয়া দেখে তিন নাম্বারটা কিনে, বিঞ্জে পড়া শুরু করলাম নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ে৷ দুই তিন ধরে মাথায় শুধু হরর রিলেটেড ঘুরছে৷ শেষ পর্বের শেষ লাইনটা পড়ার পর কিছুটা মুক্ত মনে হলো। মনে হলো, কোন এক অশুভ শক্তির বাঁধন থেকে যেন মুক্তি পেলাম (জাস্ট কিডিং)
এই সিরিজের সবচাইতে ভালো লাগার বিষয় হলো প্রতিটা পর্বই একটা আরেকটা টেক্কা দিয়ে উতরে গেছে৷ আর শেষ পর্বের শেষ অধ্যায়টা তো পুরাই আগুন!
লেখকের প্রতি আহ্বান থাকবে, দয়া করে এই সিরিজটাকে শেষ করবেন না। আমি এই সিরিজের ১০ টা পর্ব হলেও মাইন্ড করবো না৷ সবই পড়বো। আর রফিক শিকদার চরিত্রটার তো প্রেমে পরে গেছি৷
আমার ব্যাক্তিগত রেটিংঃ ৯.৫/১০ (শেষ পর্ব) পুরো ট্রিওলজিঃ ৮.৭৫/১০
রেজ্জেকের এক পা নেই, বলা কাহিনিটাও কেমন জানি আকাশকুসুম । যদিও বইটার সবগুলা গল্পই এমন, তবু তার কাহিনিটার সাথে সত্যকলামের কেউ সরাসরি জড়িত ছিল না। তার উপর নাফিস এমনই একজনকে বাড়িটায় দেখলো। এমন একজনই সাফাওয়াতের পানিতে কী একটা মিশিয়ে দিলো। আইরিনের সেলফি শেষে সোমরাখার সাথে লড়াইয়ের সময়ও সে থাকলো না। সবমিলিয়ে আমি শিউর ছিলাম এই রেজ্জেকই কালপ্রিট। যদিও রেজ্জেকের আসার সাথে সাথে মাজারের জাদু খতম হয়ে যাওয়ার কথা, বাঘটা তবু ভেতরে আসলো না কেন! আমার জন্য চমক ছিলো কিয়াসু, মিশি আর কাউলা। মিশি আর কাউলার ফিরে আসাটা চমৎকার ছিল।
এই সিরিজে আরও বই থাকতে পারতো
This entire review has been hidden because of spoilers.
আলোর বিপরীতে থাকা অন্ধকার নিয়ে মানুষের জল্পনা কল্পনার শেষ নেই।অশুভ শক্তির আধারও এই অন্ধকার।আর অনেকগুলো অন্ধকার আখ্যানের সমন্বয়েই বাপ্পী খানের অন্ধকার ট্রিলজি।
হার না মানা অন্ধকার বইটার কাহিনী শুরু হয় রফিক শিকদারকে দিয়ে।ছোটবেলায় বাবা মাকে হারিয়ে সৎ চাচার কাছে মানুষ হওয়া রফিকের জীবনে ঘটতে থাকে একের পর এক অব্যখ্যাত অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা।এই ঘটনাগুলো নিয়েই চাচার পত্রিকা সত্যকলামের একটা শাখা খুলে ফেলে রফিক।নাম দেয় অপ্রাকৃত।রফিকের জীবনে ঘটে চলা অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাগুলো নিয়েই হার না মানা অন্ধকার।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: অন্ধকার ট্রিলজির প্রথম বই।এটা বের হয় ২০১৯ সালে।আমি অবশ্য এবছরই পড়েছি। বাপ্পী ভাইয়ার নিশাচর পড়া ছিল।ভালোই ছিল।কিন্তু একটা ব্যাপার বেশ চোখে লেগেছিল।লিখনশৈলী।লেখায় জড়তা ছিল অনেক। তাই ছোট্ট বইটা পড়ার আগেও কয়েকবার ভাবতে হয়েছে।কিন্তু বইটা পড়ার পর যে ব্যাপারটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেটা হচ্ছে লিখনশৈলী।লেখায় অভূতপূর্ব উন্নতি।লেখার দিক দিয়ে পছন্দের তালিকায় চলে যান তখনই। হার না মানা অন্ধকার ১১০ পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা বই।এক বসাতেই পড়ার মতো। বইটা আমার ভালোই লেগেছে।বিশেষ করে শেষের গল্পটা পড়ে ভয় পেয়ে যাই।বাপ্পী ভাইয়ার চমৎকার লিখনশৈলী বইটাকে আরও উপভোগ্য করে তুলেছিল।সবগুলো গল্পই বলতে গেলে ভালো লেগেছে। রেটিং:৪/৫
ঘিরে থাকা অন্ধকার রফিকের জীবনে ঘটে চলা অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাগুলো এখনো চলছে।তারই সাথে সাথে চলছে তার পত্রিকা সত্যকলাম।ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পত্রিকাটি।দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত ঘটনা সমাধান সহিত প্রকাশিত হচ্ছিল।সেই ঘটনাগুলো এবং পুরনো ঘটনাগুলোর পরিণতি নিয়ে এক চমৎকার আখ্যান ঘিরে থাকা অন্ধকার।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: ১৯২ পৃষ্ঠার বইটি সকালে শুরু করে বিকালে শেষ করে ফেলেছিলাম।আগের বইটা যেখানে শেষ হয়েছিল,সেখান থেকেই শুরু হয়েছে এই বইয়ের কাহিনী।লিখনশৈলী তার আকর্ষণ ধরে রেখেছিল।এই বইটা যেদিন পড়ি সেদিনও ঝড় হচ্ছিল।বইয়ের কাহিনীর সাথে পরিবেশও বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল।হার না মানা অন্ধকারে থাকা অনেক ঘটনা এই বইয়ে পরিণতি পেয়েছে।আবার অনেক ঘটনা নতুন বাঁক নিয়েছে।সবমিলিয়ে এই বইটিও ভালো লেগেছে।বিশেষ করে কিয়াসুর ঘটনা আর তারপর সেই ঘটনার পরবর্তী ঘটনাগুলোও।এই সিরিজের প্রিয় একটি চরিত্র ছিল কিয়াসু। বাপ্পী ভাইয়া এই বইয়ে তার অন্ধকার আখ্যানগুলোর সংযোগ ছাড়াও আরও একটা ব্যাপার ফুটিয়ে তুলেছিলেন।স্বকীয় বিভিন্ন অতিপ্রাকৃতিক উপাদান,বিভিন্ন আচার-উপাচার ও কাউলাডাকসহ নিত্য নতুন টার্মগুলো।তাছাড়া তার ডিটেইলে বর্ণনা কাহিনীকে চোখের সামনে মেলে ধরেছে নিখুঁতভাবে।নৃশংস বর্ণনাগুলোও ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন।এটা পছন্দের জায়গা ছিল।নৃশংস ঘটনাগুলোর নৃশংস বিবরণ। সবমিলিয়ে এই বইটিও ভালো লেগেছে আমার। রেটিং:৪/৫
কেটে যাক অন্ধকার হার না মানা অন্ধকার এবং ঘিরে থাকা অন্ধকার পড়ার পর স্বভাবতই দুটো প্রশ্ন মাথায় উঁকি দেয়।ঘটনাগুলোর পরিণতি কি হতে চলেছে এবং সেগুলো কিভাবে সংযুক্ত।সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর এবং ‘অপ্রাকৃত’ পত্রিকায় প্রকাশিত আরও কিছু নতুন ঘটনা নিয়েই কেটে যাক অন্ধকার।সাথে নতুন একটা অন্ধকার আখ্যান শুরুর ইঙ্গিত।
পাঠ প্রতিক্রিয়া: যখন শুনেছিলাম পূর্বের কাহিনীগুলোর সাথে এই বইয়ের বেশ জোরালো সম্পর্ক রয়েছে তখন ভাবলাম এতো এতো ঘটনার মধ্যে লেখক কিভাবে সংযোগ রেখা টানবেন,কিভাবেই কাহিনীর সমাপ্তি টানবেন...আগ্রহ বাড়ছিল।তবুও শুরু করতে করতে আরেকটা মাস পেরিয়ে গেলো।অবশেষে দুইদিন আগে শুরু করলাম বইটা।মজার ব্যাপার কাল সারাদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল। প্রথম থেকেই লেখকের চমৎকার লিখনশৈলীতে মোহাচ্ছন্ন হয়ে রইলাম।তারপর ঘটনার ঘনঘটা,দুর্দান্ত ডিটেইলিং,ভয় জাগানিয়া বিবরণ আর নিখুঁত সব শব্দের প্রয়োগ গল্পের ভেতর ঢুকতে সাহায্য করে।অপ্রাকৃতে প্রকাশিত গল্পগুলো খুবই ভালো লেগেছে।আবার সুন্দরবনের রক্তচোষাদের কাহিনীটাও ভালো ছিল।তবে বিশেষ করে সুরিয়ার কাহিনীটা অর্থাৎ ‘সাক্ষী’ নামের গল্পটা সবসময় প্রিয় হয়ে থাকবে। শেষদিকে কাহিনী ঝুলে পড়েছিল বলে মনে হয়েছে।পুরো বইয়ে গতি বেশ ভালো ছিল।কিন্তু শেষে কেন যেন ধীর মনে হয়েছে।��র শেষটা হালকা প্রেডিক্টেবলও ছিল। আহরণী,মেঘারণীসহ যেসকল ফ্যান্টাসিকাল টার্ম আর রীতির উল্লেখ করেছেন সেগুলো সুন্দর ছিল।এ কারণে লেখক বাহবা পেতেই পারেন।
চরিত্রগুলোর কথা বলতে গেলে রফিক শিকদারকে প্রধান চরিত্র হিসেবে গতানুগতিক মনে হয়েছে।সৎ,একনিষ্ঠ,উদারমনা। অন্যান্য চরিত্রগুলোর মাঝে হেম্মেজ আর নাবিলকে খুবই ভালো লেগেছে।চরিত্রায়ণ মোটামুটি ভালোই ছিল। নাফিসের কথা মনে আছে?নিশাচরের প্রধান চরিত্র এই বইটা শুরু হয় নাফিসকে দিয়ে।ব্যাপারটা ভালোই লেগেছে। রেটিং:৪.২৫/৫
সম্মিলিত পাঠ প্রতিক্রিয়া: অন্ধকার সিরিজ আমার পড়��� প্রথম বাংলা ট্রিলজি।এই বইগুলোর একটা ব্যাপার আমার খুবই ভালো লেগেছে।লেখক বইয়ের কাহিনী সাজিয়েছেন পুরো দেশজুড়ে।সেটাই স্বাভাবিক।অশুভ ঘটনা তো আর শুধু এক জায়গাতেই ঘটে না। তো লেখক যে যে ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন সেই ঘটনাগুলোয় ঘটনাস্থল অনেক সুন্দর করে তুলে ধরেছেন।ময়মনসিংহের গারো পাহাড়,সিলেটের খাসিয়াপল্লী,সুন্দরবন,রাজশাহী,রাঙামাটিসহ আরও অনেক অঞ্চল,সেখানকার মানুষের জীবনযাপন,খাদ্যাভ্যাস সবই বর্ণনা করেছেন নিপুণভাবে। যেন আমিও ঘুরে এসেছি সেই অঞ্চলগুলো।দেখি এসেছি কতো অজানা জিনিস। তিনটি বই মিলিয়ে বিস্তৃত এক অন্ধকার আখ্যান রচনা করেছেন বাপ্পী খান।চমৎকার শুরুর পর ফিনিশিংটাও চমৎকারভাবেই করেছেন লেখক।সাথে প্রিক্যুয়েল এর ঘোষনাও দিলেন।যেটা সম্ভবত রফিক শিকদারের দাদা রফিক মাহাই শিকদারকে নিয়ে।
প্রোডাকশন: প্রোডাকশনের ব্যাপারে বলতে গেলে সবগুলো বইয়ের প্রোডাকশনই ভালো।তবে শেষ বইটাতে বেশ কয়েকবার পড়তে গিয়ে আটকে যেতে হয়েছে।হেম্মেজ হয়ে গেছে রেজ্জেক।হাবিল হয়ে যায় কাবিল,কাবিল হয়ে যায় হাবিল।এমনকি খেই না পেয়ে প্লটহোল ভেবে বসেছিলাম।পরে দেখি না,এখানে হাবিল হবে। তাছাড়া বাদ বাকি বাঁধাই,কাগজ,ফন্ট,লাইন গ্যাপ সব পড়ার ক্ষেত্রে আরামদায়ক অনুভূতি সৃষ্টিতে সহায়ক ছিল। ওয়াসিফ নূরের অলংকরণগুলো নিয়ে আলাদা করে না বললে অন্যায় হবে।খুবই সুন্দর লেগেছে আমার অলংকরণগুলো।তবে ঘিরে থাকা অন্ধকারের চাইতে শেষ বইয়ে অলংকরণ কম মনে হয়েছে। প্রথম দুই বইয়ের চাইতে কৌশিক জামানের করা কেটে যাক অন্ধকারের প্রচ্ছদ সুন্দর লেগেছে।প্রচ্ছদের রং কালো দিলে বোধহয় আরও সুন্দর লাগতো।অন্য বইগুলোর সাথে ভালো মানাতো।
অন্ধকার ট্রিলজি লেখক:বাপ্পী খান প্রকাশনী:বাতিঘর প্রকাশনী জনরা:সুপারন্যাচারাল /অকাল্ট
বিভূতির তারানাথ কিংবা হালের সৌমিক দের কালীগুনীন ভালো লাগলে এইটাও পড়ে ফেলুন।তবে অন্ধকার ট্রিলজি নিজের জায়গা থেকে স্বকীয়।
(একটা মজার ব্যাপার।বইটা শুরু করেছিলাম বিকালের দিকে।সেরাতে হেম্মেজকে স্বপ্ন দেখলাম।সরু লিকলিকে জিবওয়ালা লোকটার কথা পরে যতোবারই পড়েছি স্বপ্নে দেখা দৃশ্যটার কথা মনে পড়েছিল।পরদিন রাতে ‘রুপান্তরের কালিমা’ নামক গল্পটির অংশবিশেষ স্বপ্ন দেখি।একটা লোকের মাংস খসে পড়ার দৃশ্য।আর সবশেষে গতরাত বই শেষ করে ঘুমানোর পর এক ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছি।খুবই ভয় পেয়েছিলাম।যদিও স্বপ্নে কি দেখেছি এখন মনে পড়ছে না। এই অভিজ্ঞতা মনে থাকবে।:)
প্রথম দুইটা বইয়ের ক্ষেত্রে যেমনটা বলেছিলাম, আপনাকে অনেক প্রশ্ন আর অনেক অতিপ্রাকৃত কোনো একটা কিছুর মুখোমুখি হতে হবে! অন্ধকার ট্রিলজির শেষ বই কেটে যাক অন্ধকারেও যেমন অনেক প্রশ্নের উত্তর জানবেন, তেমনই আরও অনেক প্রশ্ন নতুন জন্ম নিবে!
আটাশ বছর আগে কী এমন ঘটেছিল যার জন্য অশুভ এক শক্তিকে বিনাশ করতে গিয়ে মৃত্যু হয় রফিক শিকদার এর দাদা রফিক মাহাই শিকদার এর!
কিন্তু ঘটনা তখনও ঘটে চলেছে!
এবার নতুন কোনো চক্রান্ত শুরু করতেই যেন এদিকে ঢাকার এক পরিত্যক্ত শেওলা ধরা বাড়িতে আস্তানা গেড়েছে এক অদ্ভুত লোক! কী তার পরিচয়? বন্ধুর হত্যার প্রতিশোধ নিতে টিভি রিপোর্টার নাফিস কী এমন খুঁজে পেল, যা তার বিশ্বাসের সব ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে? কেনই মানুষের ক্ষত বিক্ষত লাশ পাওয়া যাচ্ছে? সে কি সেই অপশক্তি, যে চৌদ্দ বছর পর পর বেরিয়ে আসে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য? কেন?
অন্যদিকে জমজ তিনভাই এর জীবনে কী ঘটেছিল? তাদের বেঁচে থাকার লড়াই কেমন? প্রতিবার কেউ যখন কোনো অপশক্তির হাত থেকে কোনোভাবে বেঁচে ফেরে তখন কি আস্তে আস্তে কিছু শক্তি তার ভিতরেও জমা হয়? কিন্তু রফিক শিকদারের মনে অনেক প্রশ্ন! সেই সাথে প্রশ্ন আমরা যারা বইটা পড়ছি তাদেরও!
অদ্ভুত সব রহস্য দেখা দিচ্ছে তার চারপাশে। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের কোন যোগসূত্র রফিক শিকদারকে টেনে এনেছে এখানে, তার দাদার মাজারে? রফিক শিকদার যেন এসব ঘটনাচক্রে পড়ে হিসাব মেলাতে পারছে না তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কি সব একসূত্রে গাঁথা? সব বিপত্তি পেরিয়ে মায়াবাঘ এর আক্রমণের জবাব খুঁজতে রফিক ছুটে যায় সুন্দরবনে! ওদিকে রাজশাহীর নদীর তীরে একের পর এক মানুষ, পশুপাখি হারিয়ে যাচ্ছে। যেন অদৃশ্য কিছু মাংসাশী প্রাণী একে একে সবাইকে খেয়ে ফেলছে!
সত্য-কলামেও একে একে প্রকাশিত হচ্ছে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন নারকীয় ঘটনা। এদের পিছনে কারা আছে? কী-ই বা তাদের উদ্দেশ্য? কী-ই বা তাদের পরিচয়?
মায়াবাঘের আক্রমণে সাফওয়াত হাসপাতালে, আইরিনের ভাবনায় আগামী দিনে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা। আবার পুরনো দিনের অতীত ছেড়ে রফিক শিকদারের কাছে হাজির হয়েছে মৃত্তিকা! কেন? আর এসব বেঁচে থাকার ইচ্ছেগুলোকে বিফল করতেই যেন নরক থেকে হাজির হয়েছে সেই প্রাচীণ অভিশাপ, যার কারণে প্রাণ হারাতে হয়েছিল অতীতের সেই রফিক শিকদারকে! সত্যিই কি তাই?
না কি সবকিছুর পিছনে অন্য কিছু সুযোগ খুঁজছে? রফিক শিকদারের জীবনে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা এবং প্রতিটা ঘটনার কারণ না মেলানো পর্যন্ত আপনি থামতে পারবেন না। বইয়ের প্রতিটা ঘটনাই জটিল জটিল সব রহস্য দিয়ে ঘেরা। আর রফিক শিকদার এর মতো আপনিও ছুটবেন সেই রহস্য উদঘাটনে। কখনো তান্ত্রিক সোমরাখার পিছনে, কখনো মায়াবাঘের পিছনে, কখনো রক্তচোষা কোনো প্রাণীর পিছনে।
আমরা যেমনটা মাঝে মাঝে শুনি বা দেখি, বিভিন্ন জায়গায় ঘটে যাওয়া কোনো বিশ্বাস, সেসব বিশ্বাস এক চমৎকার বর্ণনার মাধ্যমে উঠে এসেছে। আর আপনার কখনোই মনে হবে না, বইটা পড়ে আমার সময় নষ্ট হয়েছে। গা হিম করা অনেক অতিপ্রাকৃত ঘটনাই আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে, প্রকৃতির রহস্যময়তা কত গভীর!
#নিজের_কিছু_কথা
এসব অতিপ্রাকৃত, হরর গল্প পড়ার জন্য আমার বরাবরই টানটা অনেক৷ আর এই গল্পগুলো পড়ে আমি সর্বোচ্চ মজা নেওয়ার চেষ্টা করি রাতে!
লেখক বাপ্পী খান অনেক চমৎকার করে এসব গল্প বলে গেছেন, এবং এর প্রতিটা রহস্য আপনাকেই রফিক শিকদার হয়ে উন্মোচন করতে হবে! অতিপ্রাকৃত ঘটনা, বন-জঙ্গল, পাহাড়, ঝর্ণা, সুন্দরবন সবকিছু মিলিয়ে সিরিজটা দারুণ হয়েছে। তবে আমার মনে হয়, সামনেও রফিক শিকদার এর নতুন কোনো কাহিনী আসতে পারে!
অনেকগুলা আলাদা এবং দূরবর্তী অলৌকিক ঘটনাকে এক করার চেষ্টায় লেখক যা করলেন তা হয়েছে জগাখিচুড়ী। খেতে পারা যায় কিন্তু হজম করতে কষ্ট। অলিক কাহিনী বিষ্বাসযোগ্য করে লিখতে হয়, হরর পড়তে গিয়ে হাসি পেয়ে যাওয়াটা কাজের কোন কথা না নিশ্চই! মোটামুটি আর কি, চলে।
অজানাকে জানার বাসনা মানুষ্যমনের এক আদিম প্রবৃত্তি। সাথে যদি যুক্ত হয় বিপদের আশংকা তাহলে যেন আরও বেশি হাতছানি দিয়ে ডাকে। অজানা রহস্য ভেদের তাড়না ব্যক্তিকে ধাবিত করে অজানা-অচেনা পথে। তারপর? ফলাফল কি সর্বদা শুভ হয়...
অন্ধকার জগৎকে জানার প্রয়াস চলে আসছে সে অতীতকাল থেকেই। অনেকে তো জীবন বাজি দিয়ে হলেও পিছপা হয় না। কিন্তু অন্ধকার জগতের প্রাণীগুলোর দেখা পাওয়া কি এতটাই সোজা? এ নিয়ে তো তর্ক-বির্তকও কম নয়। রয়ে যায় বিশ্বাস-অবিশ্বাসের টানাপোড়েনও। এত শ্রাস্ত্র এত গ্রন্থ এত লোকগাথা সবই কি মিথ্যে? জোর গলায় যেমন মেনে নেওয়া যায় না তেমনি একদম অস্বীকারও তো করা যায় না। যতক্ষণ না মুখোমুখি হতে হয় অন্ধকার জগতের অস্তিত্বের সাথে...
আখ্যান —
"সত্য-কলাম"- এর কর্ণধার রফিক শিকদার, ট্যাবলয়েড পত্রিকার অবস্থা দিনকে দিন অবনতিই হচ্ছে। বিষয়টি ভাবাচ্ছে তাকে। চাচার স্মৃতি জড়িয়ে আছে সত্য-কলামের সাথে তাই যেভাবেই হোক পত্রিকাটি বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না। হঠাৎই একদিন অতীতের স্মৃতি তাড়িত করে, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা নিয়ে ফিচার করার। তারপর, শুরু হয় একের পর এক অশুভের সাক্ষাৎ...
ঢাকায় একের পর এক যুবকের বিখণ্ডিত লাশ পাওয়া যাচ্ছে। রিপোর্টার নাফিসের সন্ধানে বের হয়ে আসে কল্পনাতীত এক সত্য!
অতীতের বহু রহস্যের সমাধান মেলে ময়মনসিংহে। রফিক জানতে পারে তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ একসূত্রে গাঁথা, কীভাবে? রহস্যময় তিন ভাই কী জানে আর হেম্মেজই বা কী করছে সেখানে? মায়াবাঘ কেন তাড়া করছে তাকে?
রাজশাহীতে অদৃশ্য জীবের আগমন ঘটেছে। নিমিষেই খেয়ে ফেলছে জীবিত মানুষকে, পড়ে থাকছে কংকাল! সাথে যুক্ত হয়েছে ময়মনসিংহে পানি দেও এর তান্ডব।
অন্ধকার জগতের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে রফিক। কী অপেক্ষা করছে সামনে...
পাঠপ্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা —
'অন্ধকার' শব্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে অচেনা-অজানা রহস্য। " কেটে যাক অন্ধকার ", " অন্ধকার সিরিজ "- এর তৃতীয় বই। বেশ কিছু অতিপ্রাকৃত গল্পের সমাহার বলা চলে। তবে দু'একটা গল্পের সাথে বিজ্ঞানের যোগসূত্র দেখানো হয়েছে। সিরিজের বিশেষ দিক হলো প্রচলিত ভূত-প্রেত নয় বরং বিভিন্ন জাগতিক-মহাজাগতিক জীবদের নিয়ে লেখা। বিষয়টা ভালো লেগেছে অন্যরকম একটা স্বাদ পেয়েছি। বইয়ের ইলাস্ট্রেশনগুলো দারুণ। কিছু ইলাস্ট্রেশন দেখে তো গা শিরশির করে উঠেছে।
ট্রিলজির কাহিনি বলতে গেলে একটি সার্কেল। যার একদিক থেকে শুরু হয়ে অন্যদিক থেকে মিলে গেছে। একটি বই পড়লে বাকিগুলো পড়তেই হবে নাহলে গল্পের মূল কাহিনি বুঝায় যাবে না। অবশ্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা বুঝার উপায় নেয়। প্রথমে তো রেজ্জেকের গল্প শোনার পর আফসোস থেকে গিয়েছিল। রাজস্থানের রহস্যের খোলাসা হলো না। কিন্তু টুইস্ট তো বাকি। তবে প্রথম থেকেই নরখাদককে নিয়ে সন্দেহ ছিল। শেষে যেয়ে তৃপ্তি পেয়েছি মন মতো উত্তর। কাবিল-হাবিল-নাবিল নিয়ে আরও গল্প থাকলে ভালো হতো। যদিও ট্রিলজি লেখা কিন্তু " কেটে যাক অন্ধকার "- এর শেষে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায় যেন নতুন কোনো বইয়ের আভাস। গল্পগুলো বেশ ভালোই লেগেছে তবে রাজশাহীর গল্পটা একটু খাপছাড়া ঠেকেছে।
রহস্য টুইস্টে ভরপুর। অধিকাংশ সময়ই পড়া হয়েছে রাতে তাই আরও উপভোগ করেছি। একবার তো আয়নায় ছায়া দেখে চমকে উঠেছিলাম, জিকোর আয়না রহস্যের কথা ভেবে। রফিকের তাবিজ নিয়ে ফ্যান্টাসি ছিল এমন ম্যাজিক্যাল কিন্তু তাবিজের ইতিহাস জেনে ওর দশহাতের কাছেও যেতে চাই না বাবা।
লেখনশৈলী ও বর্ণনা —
দৃশ্যপটগুলো স্পষ্টভাবেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বিশেষ করে গ্রামীণ পরিবেশের বর্ণনা। মনে হচ্ছিল ঝর্ণার পাশে বসে আছি তো আবার মনে হচ্ছে সুন্দরবনে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এককথায় ঝরঝরে লেখনী। বিভিন্ন তন্ত্রের বিবরণও সহজ ভাষায় করা হয়েছে। অতিরিক্ত কোনো আলোচনাও নেয়।
চরিত্রায়ন —
ট্রিলজিতে বেশ কিছু চরিত্রের দেখা মেলে। রফিক মূল চরিত্র এছাড়া আছে চাচাতো বোন আইরিন, সাফওয়ান, কাবিল-হাবিল-নাবিল (তিন রহস্যময় ভাই), হেম্মেজ, কিয়াসু,মিশি, মৃত্তিকা আরও অনেকে।
বইয়ের অধিকাংশ গল্পই রফিকের ডাইরি থেকে। সত্য-কলাম, মৃত্তিকার ডাইরি আর আইরিনের ব্লগ থেকেও আছে।
প্রোডাকশন —
বাতিঘরের প্রোডাকশন দিনকে দিন আরও ভালো হচ্ছে। বইয়েই বাইন্ডিং যথেষ্ট স্ট্রং কিন্তু পেজ উল্টিয়ে পড়তে কোনো সমস্যা হয়নি। অফহোয়াইট পেজের কোয়ালিটিও ভালো। ফন্ট সাইজও ঠিকই আছে।
বানান ও সম্পাদনা —
বানানে অল্পবিস্তর কিছু ভুল রয়েছে। 'গ্লাস', 'ব্যথা' দুটি বানানে ও 'উ' কার (ু) এর ব্যবহারে একাধিক ত্রুটি রয়েছে। বইয়ে ২৪৯-২৫১ পেজে বেশ কিছু জায়গায় 'হেম্মেজ'- কে 'রেজ্জেক' লেখা হয়েছে। এছাড়াও দু'এক জায়গায় নামে সমস্যা আছে।
প্রচ্ছদ ও নামলিপি —
প্রচ্ছদ বেশ নান্দনিক। প্রচ্ছদে ফুটে উঠেছে বেশ কিছু কল্পপট। নামলিপিও দারুণ।
চমৎকার একটা বই। গভীর নিঃশব্দ রাতে পড়ার মজাই আলাদা। রাত যত বাড়ে গল্পের আমেজও তত বাড়ে। অতিপ্রাকৃত প্রিয় পাঠকদের জন্য হাইলি রিকমন্ডেড।
ঘিরে থাকা অন্ধকার কেটে যাক অন্ধকার লেখক- বাপ্পী খান প্রকাশক - অভিযান জেনার - অতিপ্রাকৃত মূল্য - 300 এবং 350/-
ট্রিলজির ফার্স্ট পার্ট যখন পড়েছিলাম, তখন একটাই জিনিস মনে হচ্ছিলো যে গল্প বলা টা যেন থেমে না যায়। ছোটবেলায় দিদা ঠাকুমারা যেসব গল্প গুলো বলতেন সেগুলো বিশ্বাস অবিশ্বাস এর মাত্রা ছাড়িয়ে শুধু ভালো লাগাটাই আমাদের কাছে থেকে যেত। এই ট্রিলজির প্রত্যেকটি পার্টই তাই, পড়তে পড়তে শুধু মনে হবে লেখক যেন গল্প বলা থামিয়ে না দেয়। অন্ধকার ট্রিলজির সেকেন্ড পার্ট ঘিরে থাকা অন্ধকার, লেখক ফার্স্ট পার্ট যেখানে শেষ করেছিল সেখান থেকেই খুব সুন্দর মিল রেখে শুরু করেছেন।
পটভূমি -
#ঘিরে_থাকা_অন্ধকার সিলেটের গহীন বনে দীর্ঘদিন পর জ্ঞান ফিরে পাওয়া মানুষটা কে? কিয়াসু কেন সেই মানুষটার প্রতি এত আগ্রহী? কিয়াসুর জীবনের অন্ধকার উপাখ্যান জানতে চান? ওদিকে রাজস্থানের যে ঘটনা 'সত্য কলামে' ঠাঁই নিয়েছে তা কি আদৌ ঘটেছিল? কুড়িগ্রামের সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলে রাতের গভীরে নেমে আসা 'নিষিবু'র অভিশাপ কতটা সত্যি? বরিশালের ঝালকাঠিতে প্রতি অমাবস্যার রাতে অজ্ঞাত আক্রমণের জন্য দায়ী কে? এর জন্য স্থানীয় মন্ত্রীর কেন এত মাথা ব্যাথা? ওদিকে সাফওয়াত ও আইরিন সুন্দরবনের গভীরে এক চরে বন্দি। দূর থেকে ভেসে আসছে হিংস্র মায়াবাঘের হুংকার। কী করবে তারা? এমন অজস্র প্রশ্নকে পেছনে ফেলে সবার একটাই জিজ্ঞাসা --- রফিক শিকদার কোথায়?
#কেটে_যাক_অন্ধকার মিরপুরের পরিত্যাক্ত এক বাড়িতে টিভি রিপোর্টার নাফিস কী এমন খুঁজে পেল, যা তার বিশ্বাসের সব ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে? সবার অলক্ষ্যে কোন অশুভ নরখাদক হানা দিচ্ছে ব্যস্ত নগরী ঢাকায়? কেন? ওদ��কে ময়মনসিংহে পা রাখতেই রফিক শিকদারের মনে জেগেছে অজস্র প্রশ্ন। অদ্ভুত সব রহস্য দেখা দিচ্ছে তার চারপাশে। অতীত-বর্তমানের কোন যোগসূত্র তাকে টেনে এনেছে এখানে, তার দাদার মাজারে? তবে কি তার জীবনে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সব এক সুতোয় গাঁথা? তিন অদ্ভুত ভাই হাবিল-নাবিল-কাবিলই বা কী চায়? হেম্মেজের রহস্যময় আচরণ বারবার সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। সব বিপত্তি পেরিয়ে মায়াবাঘের আক্রমণের জবাব খুঁজতে রফিক ছুটে গেল খুলনায়। ওদিকে রাজশাহীতে নদীর তীরে একের পর এক উধাও হচ্ছে মানুষ। হারিয়ে যাচ্ছে প্রাণীরা। সত্যকলামের ‘অপ্রাকৃত’ বিভাগেও জমা হয়েছে ময়মনসিংহের বন-পাহাড়ে ঘটে যাওয়া এক নারকীয় তাণ্ডবের ঘটনা। সাফওয়াত হাসপাতালে, আইরিনের ভাবনায় আগামীদিনে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টা ৷ আর সবার প্রচেষ্টাকে বিফল করতেই হাজির হয়েছে সেই প্রাচীন অভিশাপ, যার কারণে প্রাণ হারাতে হয়েছিল অতীতের কোনো রফিক শিকদারকে। আসলেই কি তাই? না কি সবকিছুর পেছনে লুকিয়ে আছে ভিন্ন কোনো আততায়ী? কী তার উদ্দেশ্য? অন্ধকার সে রাতের যুদ্ধে রফিক কী বেঁচে ফিরতে পারবে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
যে প্রশ্নগুলো লেখক তৈরি করেছেন বইয়ের তিনটি পার্ট ধরে, সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে কেটে যাক অন্ধকার বইটি তে, ভয়, উত্তেজনা, শিহরণ, বিষন্নতা, প্রেম, সবকিছুই লেখক পরিমাপ মতো রেখেছেন গল্প গুলিতে, বাপ্পী খান সাহেবের লেখনী মার্জিত এবং সুখকর। আলাদা ভাবে বলতেই হয় তার লেখা কবিতা গুলি এক আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে বইগুলিতে। প্রথম দুটো বইয়ের সব ঠিকঠাক থাকলেও শেষ ভাগে কয়েকবার কিছু নাম উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে, বাকি আমার কোনো সমস্যা লাগেনি। যারা অলৌকিক গল্প পড়তে আমার মতই ভালোবাসেন তারা এই সিরিজটা অবশ্যই একবার পড়ে দেখুন, ভালই লাগবে। লেখক এর একটা কবিতার কয়েকটা লাইন দিয়েই এই লেখা শেষ করবো -
অদৃশ্য আততায়ীর ভয়? তাহলে জীবনে বেঁচে থেকে কী লাভ? সেটাই পরাজয়। প্রতিটা জীবনেই, প্রতি মুহূর্তেই আছে মৃত্যুরূপী আমন্ত্রণ। ফাঁকি দিয়ে কী হবে? রুখে দাঁড়িয়ে লড়তে হবে। হয়তো কঠিন, কিংবা অসম্ভব। তবুও লড়তে জানতে হয়। আপণ পর চিনে এগিয়ে যাও। নিজের যুদ্ধ নিজের শক্তিতেই হবে। অন্যের হাতে নয় নিয়ন্ত্রণ।
রফিক শিকদারের কথা মনে আছে? ঐযে চৌদ্দ বছর আগে একবার ধানমন্ডি লেকের পাশে যার ওপর হামলা করেছিলো দেও? যার বন্ধু জিকো খাসিয়া পল্লী থেকে ফিরে এসেছিলো এক অপদেবতার অভিশাপ নিয়ে? পাথুরার রহস্য ভেদ করতে যাওয়ার পথে রাঙামাটিতে যার পরিচয় হয়েছিলো এক অন্ধ চিত্রশিল্পীর সঙ্গে? এক বিষধরের সঙ্গে লড়াইয়ের পরে যে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলো? আরে বাবা হ্যাঁ, "সত্য কলাম"-এর সম্পাদক রফিক শিকদারের কথাই বলছি, যার অনিশ্চিত এক যাত্রা শুরু হয়েছিলো " হার না মানা অন্ধকার"-এ, আর "ঘিরে থাকা অন্ধকার" পেরিয়ে তার সেই যাত্রা শেষ হয়েছে "কেটে যাক অন্ধকার"-এ! কিন্তু রফিক শিকদারের যাত্রা কি এখানেই শেষ? নাকি এক অনিশ্চিত যাত্রা শেষ করে এখান থেকেই শুরু হবে আরেক অনিশ্চিত যাত্রা?! আচ্ছা, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। আগে "কেটে যাক অন্ধকার" নিয়ে একটু আলোচনা হয়ে যাক!
"ঘিরে থাকা অন্ধকার" যেখানে শেষ হয়েছিলো, "কেটে যাক অন্ধকার" মূলত সেখান থেকেই শুরু হয়েছে। "ঘিরে থাকা অন্ধকার"-এর শেষে ছিলো বেশ বড় রকমের একটা ধাক্কা, যেই ধাক্কার মধ্য দিয়ে পাঠকমনে নানান প্রশ্নের উদ্রেক করে দিয়েছিলেন লেখক। "কেটে যাক অন্ধকার"-এর শুরুতে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিললেও এরপর একের পর এক ধাক্কা এমনভাবে আসতে থাকে যেন রাস্তায় উল্টোদিক থেকে দ্রুত গতিতে আসতে থাকা একটা বাসকে পাশ কাটাতে না কাটাতেই সেই বাসের পেছন পেছন তীব্র গতিতে ধেয়ে আসতে থাকা আরেকটা ট্রাকের সম্মুখীন হতে হচ্ছে! অর্থাৎ একটা ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই আরেকটা বড় ধাক্কা! আবার এই ধাক্কাগুলো নিয়ে কোনো রকম অভিযোগ-ও করা যাবে না। কারণ লেখক সবকিছু আগে থেকেই বলে দিয়েছেন; এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখিয়েও দিয়েছেন। ভুলটা আমাদের মতো পাঠকদেরই, আমরা লেখকের বলে দেওয়া এবং চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া বিষয়গুলোকে গুরুত্বহীন কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ ভেবে পেছনে ফেলে চলে এসেছি। আর তারপর অনেকদূর গিয়ে ধাক্কা খাওয়ার পরে বুঝেছি, আমাদের গুরুত্বহীন ভেবে পার করে আসা বিষয়গুলো তো আসলে গুরুত্বহীন ছিলোই না, বরং ওগুলোই ছিলো সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ! আর লেখক যে এই উপন্যাসে শুধু ধাক্কাই দিয়েছেন তা নয়, ধোকাও দিয়েছেন প্রচুর! লেখকের এই ধাক্কা এবং ধোকা অব্যহত ছিলো উপন্যাসের একদম শেষ লাইন পর্যন্ত। এবং উপন্যাসের শেষ লাইনটা পড়ে যেকোনো পাঠক পিলে চমকাতে বাধ্য। কারণ সেই লাইনটাতে আছে রীতিমতো চেয়ার থেকে ফেলে দেয়ার মতো ট্যুইস্ট! শুধু তাই না, রফিক শিকদারের যাত্রা এখানেই শেষ, নাকি তার সামনে আরো অনেকটা অনিশ্চিত পথচলা বাকি- সেটাও বোঝা যাবে অন্ধকার ট্রিলজির এই শেষ খণ্ডের শেষ লাইনে এসে।
এক কথায় দুর্দান্ত একটা উপন্যাস বাপ্পী খানের "কেটে যাক অন্ধকার"। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, এই উপন্যাসটি এই ট্রিলজির আগের দু'টো উপন্যাসকে সবদিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে। সব ঘটনা কীভাবে একই সুতোয় বাধা থাকতে পারে সেটা প্রথমে "হার না মানা অন্ধকার", তারপর "ঘিরে থাকা অন্ধকার" আর সবশেষে "কেটে যাক অন্ধকার" না পড়লে বোঝার উপায় নেই!
ট্রিলজির প্রতিটি বইতেই যেটা চোখে পড়ার মতো, তা হলো শব্দবাহুল্য; অল্প কথায় পাঠককে যা বোঝানো সম্ভব, সেখানে মাঝে মাঝেই অতিকথন করা হয়েছে। তবে তিনটা বই প্রায় পরপর পড়ায় লেখার উন্নতিটা চোখে পড়েছে। এই শন্দবাহুল্য এবং শেষ দিকে বড় ভুল সত্ত্বেও চার তারা দিয়েছি একটা কারণেই; দুর্দান্ত স্টোরিলাইন। এবং তিনটি বইয়ের জন্যেই কথাটি প্রযোজ্য। কমপ্লিকেটেড প্লট এবং শেষ টুইস্টটার জন্যে উপরের ব্যাপারগুলো এবারের মতো এড়িয়ে যাওয়াই যায়। লেখকের উপর এক্সপেটেশান বেশ বেড়ে গিয়েছে বলেই নতুন বই হিমঘুম পড়ার আগ্রহ পেয়েছি।
ভালো লাগছে, জটিল প্লটে এরকম কাহিনী উপহার পাচ্ছি আমরা। লেখককে আন্তরিক অভিনন্দন।
ফ্যান্টাসি নিয়ে আমার যতটা বাড়াবাড়ি হররের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো। এই ট্রিলজিকে যদিও ন্যাচারাল হরর জনরার অন্তর্ভুক্ত করা যায় মেবি যেখানে ন্যাচারাল বিভিন্ন জিনিসপত্র গল্পের প্রধান উপকরণ। যাইহোক, অসাধারণ এক জার্নি শেষ হলো ট্রিলজির শে��� বইটার মাধ্যমে। প্রথমটা ৩★ দ্বিতীয়টা ৪★ আর শেষেরটা একদম পারফেক্ট ৫★। লেখক আগের বইগুলোতে ছেঁড়ে দেয়া প্রতিটা সুঁতো জোড়া দিয়েছেন সুনিপুণভাবে। মৌলিক থ্রিলারে বইতে এতো ভরপুর টুইস্ট আমি আগে পাইনি। সম্ভবত এমন টুইস্টে ভরপুর বই ছিলো হারলান কোবেনের গন ফর গুড। জাস্ট মাইন্ড ব্লোয়িং! আরেকটা জিনিস নোটিশ করলাম সেটা হলো বাপ্পী খানের লেখনশৈলীর দারুণ উন্নতি। "কেটে যাক অন্ধকার" বাংলা মৌলিক থ্রিলারের উপরের কাতারে থাকবে লেখনী এবং স্টোরিটেলিংয়ের দিক থেকে। আক্ষেপের জায়গা বলতে হাবিল ভাইদের আর মাজার সম্পর্কে আরেকটু বিস্তারিত না জানতে পারাটা। যদিও এই সিরিজের প্রিক্যুয়েল আসার একটা সম্ভবনা শুনেছিলাম। প্রিক্যুয়েলে মাজার নিয়ে স্পেসিফিকেলি বিস্তারিত জানার অপেক্ষায় থাকবো। আর হ্যাঁ যদি কখনো রিডিং ব্লক আসে তাহলে এই ট্রিলজি পারফেক্ট টোটকা হিসেবে কাজ করবে। হ্যাপী রিডিং...
পাঠ-প্রতিক্রিয়া: শেষ করেছি দুর্দান্ত ট্রিলজির শেষ বই। ভয়ে ছিলাম যে শেষের দিকে এসে কাহিনি ঝুলে না যায়। কিন্তু আমাকে ভুল প্রমাণ করে চমৎকার ভাবে শেষ হয়েছে বইটি। শেষের দিকে এতো এতো টুইস্ট যে একটু পর পর অবাক হচ্ছি। ১ ২ টা জিনিস আগে থেকে প্রেডিকশন করলেও অনেক টুইস্ট দিয়ে অবাক করেছেন বাপ্পী ভাইয়া, উনার দারুন লেখনীতে। বড় কলরবে আগের ২টা বইয়ের রহস্য গুলো এক সুত্রে এনে দারুণ সমাপ্তি দিয়েছে বাপ্পী ভাই,যার জন্য ট্রিলজিটা সার্থক হয়েছে।
এবার আসি নেগেটিভ দিকগুলো নিয়ে। এই বইটিতে অলংকরণ গুলো নজর কাড়া ছিলো না দুই একটা ছাড়া।অলংকরণ এর দিক দিয়ে আমি 'ঘিরে থাকা অন্ধকার 'বইকে এগিয়ে রাখব। বইয়ে অনেক বানান ভুল যা অনেক দৃষ্টিকটু লেগেছে। লেখকের উৎসর্গতে বানান ভুল যা অনেক পাঠকের কাছে বিরক্তিকর লাগবে। আবার অনেক জায়গায় চরিত্রের নামও উল্টাপাল্টা হয়ে গিয়েছে। যার জন্য অনেক খারাপ লেগেছে। আশা করি সামনে সেগুলো ঠিক করা হবে। শুভকামনা বাপ্পী ভাইয়ের জন্য। এখন হিমঘুম পড়া শুরু করব।
কাহিনী নিয়ে বলার কিছু নেই, একে একে আগের দুই বইয়ের সবকিছু মিলিয়ে শেষে আবারো একটা প্রশ্ন রেখে যাওয়া। কিছুটা অবিশ্বাস্য হলেও, এ আখ্যান তো বিশ্বাস করার নয়। তবে, লেখক শুরুতে যে বীক্ষণ সম্পাদনা সংস্থা এর প্রশংসা করলেন বানান সংশোধনে ভূমিকা রেখেছে বলে, বিষয়টা হজম করতে কষ্ট হয় বইকি এতো এতো বানান ভুল পাবার পর!
কিছু জিনিস পড়ার পর মনে হয় কেনো এখানে শেষ হয়ে গেলো। হয়ত সামনে আরো কিছু আছে। কিন্তু এরপর ফ্ল্যাপ ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না। প্রকৃতির অন্ধকারতম কিছু জায়গা নিয়ে লেখক এত সুন্দর আবহ তৈরি করেছে যে আপনি চাইলে ২/৩ দিন এই মোহতেই থাকতে পারবেন।
প্রথম ২ খণ্ড পড়ে যে আশা জেগেছিল, শেষ পর্বে এসে সেটা হোঁচট খেলো। প্রচুর গোঁজামিল, অসংলগ্ন এবং ছাড়া ছাড়া গল্প, মনে হলো লেখক জোর করে শেষ পর্বটা লিখেছেন।
ট্রিলজির শেষ বই হিসেবে এস্পেক্টেশন বেশিই ছিলো এবং অনেকাংশেই তা পূর্ণ হয়েছে বলা যায়।
⚠️ প্রথমেই ইতিবাচক দিক বলি- লেখকের গল্প বলার ভঙ্গিমা দারুণ ছিলো, বিশেষ করে মূল কাহিনীর পাশাপাশি ছোটো ছোটো ঘটনাগুলোর বর্ণনা আমার বেশ ভালো লেগেছে। এছাড়া ডিটেইলিং ও ইলাস্ট্রেশনগুলো ভালো ছিলো যার জন্য ঘটনাগুলোর দৃশ্যপট একেবারে চোখে ভাসছিলো মনে হয়। সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এর এন্ডিং। লেখক কোনো রকম ক্লিপ হ্যাংগার না ঝুলিয়েই আগের সমস্ত অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে স্বার্থকতার সাথে ট্রিলজির সমাপ্তি টেনেছেন।
⚠️ এবার নেতিবাচক বিষয়গুলো- লেখকের বর্ণনা সর্বাপরি ভালো ছিলো কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় বর্ণনায় বাহুল্য পরিলক্ষিত হয়, তবে ঘটনার ঘনঘটায় খুব একটা সমস্যা হয়নি। আর গুরুত্বপূর্ণ এক জায়গায় চরিত্রের নাম ওলট-পালট হয়ে যায় যা মোটেও ভালো লাগেনি। আর প্রচ্ছদ ঠিকঠাক লাগলেও নামলিপিটা ভালো লাগেনি। কেন জানি আগের দুটি বইয়ের নামলিপি মিস করেছি।
লেখক সবগুলো প্লট, সাবপ্লটকে একত্রিত করে চূড়ান্ত পরিণতিতে নিয়ে গেছেন। এবারেরটায় রহস্য কম ছিল, কিন্তু মনের গভীরে একটা চাপা অস্বস্তি ছিল। রফিকরা বংশ পরম্পরায় যে অভিশাপ বহন করে চলেছে সে অভিশাপ কোন রূপে তাদের সামনে আসবে? আসার পর কি হবে? এসব প্রশ্ন মনকে শান্ত হতে দেয়নি।
সোমরাখার সাবপ্লটটা ভাল একটা টুইস্ট দিয়ে শুরু হলেও ওভারল কাহিনীটা একেবারেই সাদামাটা ছিল। যে বাপ অনেক বছর ধরে ব্যাঙ হয়ে দেয়ালের মাঝে অপেক্ষা করছে, সে বাপের মৃত্যুর শোধ নিতে সোমরাখা বাঘ হয়ে গেল বিষয়টা একেবারেই দুর্বল যুক্তি। আবার সাবপ্লট সামাল দিতে যেয়েই মেইন প্লটের এন্ডিংটা দুর্বল লেগেছে। এটাও একটা বাজে দিক।
বেহু পূর্ণক্ষমতায় আসতে পারেনি, তার অপর অংশ খুনালার সাথে একীভূত হতে পারেনি, সবই মানলাম। কিন্তু তারপরও তার সাথে লড়াইটা আরও জমতে পারত। কাহিনী ক্লাইম্যাক্সে যাবার পর যেন বেলুনের মত ফুস করে বাতাস বেরিয়ে গেল। রফিক মাহাইয়ের অতীন্দ্রিয় তলোয়ারটা শুরুতে ফোকাস করে শেষে আর দেখানোই হলনা। আশায় ছিলাম, ওটা দিয়েই হয়ত বেহুকে ধ্বংস করা হবে।
বেহুর মত নির্মম, চতুর দেবতা আরও কিছু দুরভিসন্ধিমূলক চাল চালতে পারত, যেমন রফিককে বেকায়দায় ফেলার জন্য মৃত্তিকা কিংবা আইরিনকে কিডন্যাপ করা, তারপর কোন বিশেষ গুপ্ত স্থানে রফিককে একা আসতে বলা।
বিশেষ কোন তন্ত্রসাধনা করে বেহুর ক্ষমতা কমিয়ে ফেলা হয়েছে এমন দেখালে ভাল হত৷ আগে থেকেই সে দুর্বল ছিল এমন দেখানোতে কাহিনী হালকা হয়ে গেছে। যাহোক ৪/৫ দিলাম। বাপ্পী খানের এন্ডিং টুইস্টগুলো জম্পেশ হয়। এবারেও চমক দিতে তিনি বাকি রাখেননি। যা বুঝলাম, গল্প এখনো চলবে। লেখক অনেক প্রশ্নের উত্তর দিলেও, জন্ম দিয়েছেন নতুন কিছু প্রশ্নের। আর শেষে সিক্যুয়েলের আভাসও দিয়েছেন।