এ গল্প এগারো বছরের এক বাচ্চা, জহিরের; ‘চোরের ছেলেও চোর’- এই অপবাদে যাকে গ্রামবাসীরা অচ্ছুত ভেবে তাড়িয়ে দিয়েছে। গল্পটা আংশিক হলেও জাহাঙ্গীরের। এককালের কুখ্যাত চোর, যাকে কি না ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে এমন এক অপরাধে, যা সে করেইনি। গত আট বছর ধরে সৎভাবেই চলছিল মানুষটা। তবে কি ভালোর কোন দাম নেই? গল্পটা শহীদুল মাস্টারের, যে জহিরকে পরম মমতায় আগলে রাখতে চায়। গল্পটা তরফদার চেয়ারম্যান আর ওসি ফারুকেরও, যাদের দুর্নীতির লোভ ক্রমশ বাড়ছে। গল্পটা মিঠাপুকুর নামের এক গ্রামের সকল গ্রামবাসীর, যারা জানে না কোন বিপদ ধেয়ে আসছে তাদের দিকে। গল্পটা মানুষরূপী কিছু হায়েনার। গল্পটা বাংলাদেশের। সময়কাল ১৯৭১।
মানুষের ইতিহাসে যুদ্ধ এমন এক অস্বস্তিকর সত্য, যার অস্তিত্বকে কখনও অগ্রাহ্য করা যায় না। যুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস/গল্প/নন ফিকশনের একটা আলাদা আবেদন আছে। আমরা যুদ্ধের ইতিহাস জানতে চাই; মানুষের অসহায়ত্বের গল্প যেমন আমাদের হৃদয়ে বিষাদের বান ডেকে আনে, ঠিক তেমনি আবার জয়ের উপাখ্যান শুনে আমরা নতুন করে আশায় বুক বাঁধি।
ওয়ার ফিকশনের ধারায় 'কিশোর উপন্যাস' আমার কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের তালিকায় লুইস লাওরি'র 'নাম্বার দ্য স্টারস' আর জন বয়েন-এর 'দ্য বয় ইন স্ট্রাইপড পাজামাস' এর কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হয়। ঠিক তেমনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পাঠকনন্দিত কিশোর উপন্যাস আমরা পেয়েছি। মুহম্মদ জাফর ইকবালের "আমার বন্ধু রাশেদ" এবং হুমায়ূন আহমেদের "সূর্যের দিন" - এই দুটো বইয়ের নাম চলে আসে ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকার শীর্ষে।
'ক্ষ্যাপা' মূলত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস। তবে পাঠকের ক্ষেত্রে যেহেতু বয়সের বাছবিচার চলে না, তাই বইটিকে সার্বজনীন বলা যেতে পারে। গল্পের প্রেক্ষাপট মিঠাপুকুর নামের ছোট্ট সুন্দর এক গ্রাম। মূল চরিত্র এগারো বছরের জহির দিয়ে; রাজনীতির কুটিল চালে যার নিজের বাবাকে হারাতে হয়েছে, বিসর্জন দিতে হয়েছে স্বাভাবিক শৈশব। নির্যাতন আর অনটনের শিকার হয়ে যাকে রাতকানা রোগ অথবা পঙ্গুত্বকে বরণ করতে হয়, লুকিয়ে থাকতে হয় সাধারনের দৃষ্টিসীমার আড়ালে।
১৯৭১ সালে মিঠাপুকুর নামের ছোট্ট একটা গ্রামে হঠাৎ করেই নেমে আসে মানুষরূপী হায়েনার আগ্রাসন। রাতারাতি বদলে যায় সবকিছু। সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে সমাজ থেকে নির্বাসিত, অচ্ছুত চোরের ছেলে জহির-ই নিজের অদম্য সাহস আর বুদ্ধিবৃত্তির জোরে বাঁচিয়ে দেয় মিঠাপুকুর নামের গ্রামটাকে।
এটুকু বলতে গিয়েই বোধহয় অনেকটুকু স্পয়লার হয়ে গেলো। তবে হ্যাঁ, আমার কাছে মনে হয়, এধরনের গল্পে প্লট বা স্পয়লার- কোনটাই তেমন মুখ্য নয়। একটা অস্থির সময়কে কতটুকু স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো, চরিত্রায়ন কতটুকু শক্তিশালী এবং পরিণতি কীভাবে ঘটলো- এই তিনটা বিষয় আমার কাছে প্রাধান্য পায়। সেই মাপকাঠিতে লেখক সফল।
বইয়ের প্লট খুব বেশি জটিল কিছু নয়, জোর করে কোন ইতিহাস দেখানোর চেষ্টা করা হয়নি। লেখক শুরু থেকেই সাদামাটা একট গল্প বলতে চেয়েছেন, স্পষ্টভাবে পাঠকের মানসপটে তুলে ধরতে চেয়েছেন গ্রামীণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। প্রকৃতির বর্ণণার পাশাপাশি বেশ সফলভাবেই বর্ণিত হয়েছে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের গল্প। কিশোর উপন্যাসের বর্ণণাভঙ্গি স্বতন্ত্র হওয়ার দাবী রাখে, বৈঠকি আলাপের কায়দায় সেখানেও বৈচিত্র্য লক্ষণীয়।
তবে আলাদাভাবে যে কথাটা বলতেই হয়, তা হচ্ছে বইয়ের পরিণতি। শুরুটা পরাজিত মানুষকে দিয়ে হলেও শেষপর্যন্ত ক্ষ্যাপা পুরোদস্তর জয়ের গল্প। আমাদের দেশের, গণমানুষের বিজয়ের গল্প। যুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের পরিণতিতে মৃত্যু অথবা ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ না এনে বিজয়ের আনন্দ ছড়িয়ে দেয়ার এই সফল প্রচেষ্টাকে স্বাগতম।
গোছানো লেখা; তবে খুব একটা নতুনত্ব নেই গল্পে। গল্পের পরিবেশ ও চরিত্রগুলো জীবন্ত। মূল চরিত্র জহিরকে শুরু থেকেই তার বয়সের তুলনায় কথায় ও কাজে অনেক বেশি পরিণত মনে হয় (যা একটু দৃষ্টিকটু লেগেছে আমার কাছে।) লেখক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পের গতি ধরে রাখতে পেরেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটদের লেখায় যেমন যুদ্ধের ভয়াবহতা ও নির্মমতাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা থাকে, লেখক সেই পথে না হেঁটে যুদ্ধের যথাযথ বর্ণনা দিয়েছেন বলে তাকে সাধুবাদ।
১৯৭১ সাল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এক বছরে । এবং সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল সমাজের সব শ্রেণির মানুষ৷ শিক্ষক, চোর-ডাকাত এবং নানান পেশার মানুষ। অন্যদিকে এই দেশে জন্মে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীতেও যোগদান করেছিল সমাজের বিভিন্ন শ্রেনির মানুষ।
ক্ষ্যাপা গল্পটিও তেমনই, ১৯৭১ এর শুরুর দিকে একটি গ্রামের গল্প। গ্রামের নাম মিঠাপুকুর। যেখানে জহির নামের একজন ১১ বছরের বাচ্চাছেলের কথা বলা হয়েছে। যার বাবা এক সময় চুরি করত এবং চুরি ছেড়ে দিয়ে ভাল হয়ে যাওয়ার পরও সমাজের শোষকশ্রেণীর কিছু মানুষের খপ্পরে পরে চুরি না করেও ফেঁসে যায়। চোরের ছেলে হওয়ার কারনে গ্রামের মানুষের রোষানলে জহিরকেও পরতে হয় এবং বিভিন্নভাবে অত্যাচারের শিকার হতে হতে জীবনের উপর আশংকা তৈরী হয়। এরই মাঝে হাতে গোনা অল্প কয়েকজন থাকে যাদের সহানুভূতি পায় জহির। সেই শোষকশ্রেণীর মানুষদের হাত থেকে বাঁচতে জহির আশ্রয় নেয় জঙ্গলে, নদী থেকে মাছ, বনের চেনা অচেনা ফলমূল খেয়ে সে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে থাকে একা একা। এর মাঝে মাঝে মধ্যে গ্রামে ফিরে আসার চেষ্টা করে কিন্তু কিছু মানুষের অত্যাচারে মৃতপ্রায় অবস্থায় কোন রকম আবারো ফিরে যায় সেই একাকী জঙ্গলে। এমন সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলাদেশে আক্রমণ করে এবং দলমত,বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে নির্বিচারে হত্যা শুরু করতে থাকে। মিঠাপুকুরেও এই ধংসযজ্ঞ চলতে থাকে। গ্রামের সেই শোষকশ্রেণীর কিছু মানুষ সেনাবাহিনীর সেই তাণ্ডবলীলায় প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করতে থাকে। অথচ যে গ্রামের মানুষগুলো জহিরকে দিনের পর দিন অত্যাচার করে গেছে, তার বাবা নির্দোষ জানার পরেও, সেই জহিরের সহায়তায় গ্রামের কিছু স্বাধীনচেতা মানুষ হানাদার বাহিনীর আখরায় হামলা করে এবং গ্রামকে পাক-হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করে। 'ক্ষ্যাপা' বইটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাসিকা কিন্তু সব বয়সীদের ভাল লাগবে বইটি পরে।
বাপ্পী খানের অন্ধকার সিরিজ যারা পড়েছেন তারা জানেন উনার লেখা কেমন এবং কতটা সাবলীল, এখানেও ব্যতিক্রম নয়, অন্ধকার সিরিজের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জনরায় লেখা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাসিকায় গ্রাম বাংলার প্রকৃতি, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচার অতন্ত্য সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। হালকা ধাচের সাদামাটা প্লট নিয়ে গ্রামবাংলার প্রকৃতির পাশাপাশি সাধারন মানুষের জীবনধারা লেখক সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। একটানা পড়ে যাওয়ার মত একটা বই এবং মুক্তিযুদ্ধের দুঃখ কষ্টের সময়ের শেষে জয় যে আমাদেরই সেই শান্তিটা বইয়ের শেষে পাওয়া যায়। বইটার সবথেকে পজিটিভ দিক হচ্ছে পড়ার সময় মনে হচ্ছিল কারো মুখ থেকে গল্পটা শুনছি।
. এ গল্প এগারো বছরের এক বাচ্চা, জহিরের; ‘চোরের ছেলেও চোর’- এই অপবাদে যাকে গ্রামবাসীরা অচ্ছুত ভেবে তাড়িয়ে দিয়েছে। গল্পটা আংশিক হলেও জাহাঙ্গীরের। এককালের কুখ্যাত চোর, যাকে কি না ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে এমন এক অপরাধে, যা সে করেইনি। গত আট বছর ধরে সৎভাবেই চলছিল মানুষটা। তবে কি ভালোর কোন দাম নেই? গল্পটা শহীদুল মাস্টারের, যে জহিরকে পরম মমতায় আগলে রাখতে চায়। গল্পটা তরফদার চেয়ারম্যান আর ওসি ফারুকেরও, যাদের দুর্নীতির লোভ ক্রমশ বাড়ছে। গল্পটা মিঠাপুকুর নামের এক গ্রামের সকল গ্রামবাসীর, যারা জানে না কোন বিপদ ধেয়ে আসছে তাদের দিকে। গল্পটা মানুষরূপী কিছু হায়েনার। গল্পটা বাংলাদেশের। সময়কাল ১৯৭১।
When a man is denied the right to live the life he believes in, he has no choice but to become an outlaw. - Nelson Mandela - ক্ষ্যাপা - জাহাঙ্গীর, মিঠাপুকুর গ্রামের এক সিদেঁল চোর। জীবনের এক ট্রাজিক ঘটনার কারণে চুরি ছেড়ে এখন একমাত্র ছেলে জহিরকে নিয়ে তার টানাপোড়েনের সংসার। কিন্তু তাদের এই সংসার ভয়াবহ বাঁক দেয় সত্তরের দশকের শুরুর দিকে।
তরফদার, মিঠাপুকুর গ্রাম সহ অত্র এলাকার চেয়ারম্যান। এলাকার ওসি ফারুকের সাথে তার ভালোই দহরম-মহরম। কিন্তু এক ঘটনায় তাদের ভ্রাতৃত্বের ভিতরেও চিড় ধরে। তাদের কাজের সাথে ঘটনাক্রমে জড়িয়ে পড়ে জাহাঙ্গীর আর জহির। মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শুরুর দিকে কি সেই ঘটনায় তাদের সহ গোটা মিঠাপুকুর গ্রামের ভাগ্য বদলিয়ে যায় তা জানার জন্য পড়তে হবে লেখক বাপ্পী খান এর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর অ্যাডভেঞ্চার থ্রিলার ভিত্তিক নোভেলা "ক্ষ্যাপা"। - "ক্ষ্যাপা" মূলত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর অ্যাডভেঞ্চার থ্রিলার ভিত্তিক নভেলা। ছোটবেলায় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবাল এর কিশোর উপন্যাসগুলো আমার বেশ ভালো লাগতো, এই নভেলার শুরুটাও আমাকে সে ধরনের স্বাদ দিয়েছে। যদিও লেখকের লেখনশৈলীর কারনে পুরোটা পড়ার পরে সম্পুর্ন ভিন্ন একটি স্বাদ পাওয়া যায়। - "ক্ষ্যাপা" ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময় নিয়ে লেখা। কিন্তু পড়তে গিয়ে গল্পটির বর্ণনাভঙ্গি কারনে মুক্তিযুদ্ধকালের সে সময়কার চিত্রপট একেবারে ভেসে উঠছিলো। তবে একটি তথ্যগত খটকা লাগলো, বইতে "মুক্তিবাহিনি" এর কথা বারবার বলা হয়েছে। জানামতে মুক্তিবাহিনি গঠিত হয় জুলাইতে, এপ্রিলের ঘটনার প্রেক্ষাপটে "মুক্তিবাহিনি" শব্দটি আনায় একটু খটকা লাগলো আমার। অবশ্য বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের বেশকিছু মানুষের ট্রিবিউট চোখে পড়লো, ব্যাপারটা বেশ ভালো লেগেছে। - "ক্ষ্যাপা" বইটির চরিত্রায়নের দিক থেকে সে সময়কালের হিসেবে চরিত্রগুলো বেশ বিশ্বাসযোগ্য। এর ভিতরে সবচেয়ে দারুন চরিত্র হচ্ছে জহির, খুবই ভালো লেগেছে এই চরিত্রটিকে। ১১২ পেইজের বই যেহেতু, চমৎকার স্টোরিটেলিং এর জন্য এক বসাতেই শেষ করা যাবে বইটি। বইয়ের আরেক প্লাস পয়েন্ট এর ফিনিশিং, গতানুগতিক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর অ্যাডভেঞ্চার থ্রিলারের থেকে একেবারে ভিন্নমাত্রার এক ফিনিশিং দিয়েছেন লেখক। - "ক্ষ্যাপা" এর প্রোডাকশনের দিক থেকেও বইটি বেশ ভালোই বলা যায় দামের তুলনায়। বইয়ের প্রচ্ছদটি খুবই চমৎকার এবং কাহিনির সাথে মানানসই। কয়েকটি টাইপো দেখলাম বইতে, সেগুলো আশা করি ঠিক হয়ে যাবে পরবর্তী মুদ্রণে। - এক কথায়, একটি অনবদ্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর অ্যাডভেঞ্চার থ্রিলার নভেলা হচ্ছে "ক্ষ্যাপা"। যাদের কিশোর থ্রিলার, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক থ্রিলার পড়তে আগ্রহ তাদের কাছে বইটি ভালো লাগবে। লেখকের কাছ থেকে সামনে এ ধারার আরো বই আশা করছি।
মুক্তিযুদ্ধ সবসময় আমার কাছে একটা আবেগের জিনিস। আপনি যেভাবেই উপস্থাপন করেন না ক্যান ভালো আমার লাগবেই। এটাও একদম মন্দ লাগে নি। যদিও জহির ছেলেটা বয়স অনুপাতে যা খেল দেখিয়েছে তা হজম করতে খানিকটা হিমসিম খেয়েছি। ছেলেটাকে আরেকটু বয়স্ক আর ভায়োলেন্ট বানাইলে ক্ষ্যাপা নামটা যুতসই হতো। তবে লেখক মশাই লাস্টে যে টুইস্টটা দিয়েছেন ঐটা দুর্দান্ত লেগেছে। সংলাপটাও খুব মন ভালো করা।
আশেপাশের সব গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে তুখোড় চোর বলা যায় জাহাঙ্গীরকে। সর্দার হওয়ার যোগ্যতা রাখে তার চুরিবিদ্যার দক্ষতা আর বুদ্ধির দিক দিয়ে। কিন্তু এক সময় চুরি ছেড়ে দিয়ে একেবারে সাধারণ জীবনে ফরে যায় সাথে নিজের ছোট্ট ছেলে জহিরকে নিয়ে। কিন্তু একসময় অপরাধ না করেও এক গোলমেলে মামলায় ফেঁসে যায় জাহাঙ্গীর। জনতার রোষ থেকে বাঁচতে পালিয়ে যায় জহির। শুরু হয় জঙ্গলে একলা বেঁচে থাকার যুদ্ধ। কিন্তু এতো ছোট ছেলে এত প্যাচালো সমাজের নিয়ম বুঝে না। বারবার সমাজে ফিরে যেতে চায়। শুধুমাত্র চোরের ছেলে বলেই তার উপর যত ক্ষোভ মানুষের, তাই বারবার তাড়িয়ে দেয়। এরমাঝে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মিলিটারি থেকে উদ্ধার পেতে তার কাছেই জঙ্গলে এসে হাজির হয় এক সময় তাকে মেরে ফেলতে চাওয়া লোকজনও। এক সময়ের সিঁধেল চোরের ছেলে যে বাবার মাটি কাটার দক্ষতা পেয়েছে সেটা আগেই প্রকাশ পেয়েছিল। আর এখন এই গুণ! কে কাজে লাগিয়েই উদ্ধারের পরিকল্পনা মিলিটারি ক্যাম্পে আটক থাকা তরুণ-তরুণীদের। ছোট্ট একটা কিশোর উপন্যাস। হয়তো তেমন নতুন কোন এডভেঞ্চার ও নেই। কিন্তু একটা জায়গায় বিশাল একটা পার্থক্য আছে। সিঁধেল চোরের ছেলে চুরি না করেও অপরাধী। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের একদম শুরুতেই বাঁচাতে এগিয়ে যায় তাদেরকে যারা তাকে গৃহহীন করেছিল। এরপরেও সমাজে তার পরিচয় চোরের ছেলেই। হয়তো শাসক, শাসনামলের পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু আমাদের মন থেকে কাওকে উপরে উঠতে দেয়ার বা সম্মান দেয়ার মত উঁচু মানসিকতা আমরা সেভাবে অর্জন করতে পারিনি। অনেকদিন পর সুন্দর একটা কিশোর উপন্যাস পড়লাম।
ভালো লেগেছে বইটি। একটানা পড়ে শেষ করলাম। আমার কাছে সবথেকে বেশি ভালো লেগেছে কিশোর জহিরের সাহসিকতা এবং বইটির এন্ডিং পার্ট। বাপ্পী ভাইয়ের লেখনশৈলী চমৎকার এবং সুখপাঠ্য। যার জন্যে একবসায় বইটি পড়েছি। হ্যাপি রিডিং
'ক্ষ্যাপা' জহির নামক একটি বাচ্চা ছেলের গল্প। শৈশবেই সমাজের কঠিন রূপ দেখেও হাজার প্রতিকূলতার বিপরীতে বেড়ে ওঠার গল্প। একই সাথে এটা মুক্তিযুদ্ধেরও গল্প। সর্বোপরি এটা শান্তশিষ্ট মিঠাপুকুরের অস্থির কিছু সময়ের গল্প।
'ক্ষ্যাপা' মূলত একটা কিশোর অ্যাডভেঞ্চার নভেলা। বাপ্পী খান মূলত পরিচিত সুপারন্যাচারাল থ্রিলার লেখার জন্য। তার লেখা 'অন্ধকার ট্রিলজি' ইতিমধ্যেই পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। কিন্তু বাপ্পী খান এবারে একদম অন্যভাবে একটি গল্প প্রেজেন্ট করেছেন আমাদের জন্য। সেই চমৎকার লেখনশৈলী বজায় রাখতে পেরেছেন যদিও। তবে ট্রিটমেন্টটা ভিন্ন। একটা সার্থক কিশোর অ্যাডভেঞ্চার লেখায় যা যা দরকার সবই আছে এই নভেলায়। লেখকের থেকে এরকম এক্সপেরিমেন্টাল লেখা আরো আশা করবো আমি। 😊 নভেলাটি সব ধরণের পাঠকের জন্যই রেকমেন্ড করবো আমি।
গল্পটি হয়তো আরও সাত কিংবা আট বছর আগে পড়লে দারুণ উপভোগ্য হতো। লেখক এগারো বছরের জহিরকে হিরোয়িক অ্যাঙ্গেল থেকে যে-ভাবে উপস্থাপনা করেছেন; তা দেখে ভালোর বিপরীত খারাপও লেগেছে বটে। বিশেষ করে সমাপ্তি তো একেবারেই মনঃপূত হয়নি। জহিরের বাবার শেষ পরিণতি কী হয়েছিল এবং তার জীবনের লক্ষ্য আরও দারুণ কোনো মোড় নিতে পারত বলে মনে করছি।
লেখকের বর্ণনা শৈলী বরাবরের মতো সাবলীল। তবে বইটি অসমাপ্ত মনে হয়েছে। চরিত্রায়ন ভালো। জহিরের বাপ জাহাঙ্গীরকে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হিসেবে উপস্থাপনা করলে গল্পটা পরিপূর্ণ পেত।
যা-ই হোক, হালকা চালের কোনো বই পড়তে চাইলে; পড়তে পারেন।
"তেইল্যাচোরা" বইয়ে ওবায়েদ হক তার গল্প গঠন আর লেখনীর দ্বারা চোর এবং চুরির প্রতি একটা সিম্প্যাথী আদায় করে নিয়ে ছিলেন।
একইকাজ ভিন্ন লেখক "ক্ষ্যাপা" গল্পেও করতে গিয়ে দুর্বল লেখার কারণে পুরা ব্যাপারটা হয়ে দাড়িয়েছে প্যাথেটিক! খামাখা চোরকে গ্লোরিফাই এবং তার কাজকে জাস্টিফাই করে পাঠকের ঐ চরিত্রের উপর সিম্প্যাথী টানার চেস্টা করেছেন। যেন সেই চোরের পুত্র গল্পের নায়ক "জহির" এর প্রতিও পাঠকের সিম্প্যাথী ক্রিয়েট হয়৷ এই কাজ করতে গিয়ে তিনি যে ক্রাইমকে জাস্টিফাইড করে ফেলেছেন, এটা মাথায় রাখেন নি।
জহিরের বাবা খ্যাতিমান চোর জাহাঙ্গীরের নিজের বিপদের সময় উপলব্ধি হয় "এই পৃথিবী ফেয়ার না।" লেখক তখন লিখেছেন: "তবুও জাহাঙ্গীরের মতো মানুষের আক্ষেপ বা আকুতি শোনার জন্য কেউ কখনও থাকে না। এটাই যেন জগতের নীতি।" ভাই। What you did in your whole life... চুরি/ডাকাতি। ওটা ফেয়ার?? 🐸
আবার বইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ে লেখক জহিরের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন "বাপের যোগ্য ছেলে"। দৃস্টিকটু লেগেছে৷ যেন বাপ বিরাট কোনো বীর ছিল।। 🙃 ক্রিমিনাল ছিল।
গল্পে জহিরের বয়স দেখানো হয়েছে ১১ বছর। সেটা ১৬/১৭ বছর হইলে গল্পটা খানিকটা Trust worthy হতো। ১১ বছর বয়সে মানুষ নরমালি ক্লাস ফোর/ফাইভে পড়াশুনা করে। সেই বয়সের বাচ্চা যুদ্ধের জন্য একটা দলকে লিড দিচ্ছে। পরিকল্পনা করে দিচ্ছে। ব্যাপারটা মেনে নেয়ার মত না।
জানি না সমস্যাটা আমার নিজের কিনা। কিন্তু অতিমাত্রায় Illogical গল্প নিতে পারি না।
আবার এটাও সত্যি যে লেখনী আর গল্পগঠন দিয়ে হরর/ফ্যান্টাসি জনরার গল্পও পাঠকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে, তার মন জয় করা যায়। লেখনী এখানে বড় ফ্যাক্ট।
সবমিলিয়ে হতাশ। হয়ত আরো ৫/৭ বছর আগে বইটি পড়লে এত খারাপও লাগতো না।
আশেপাশের সব গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে তুখোড় চোর বলা যায় জাহাঙ্গীরকে। সর্দার হওয়ার যোগ্যতা রাখে তার চুরিবিদ্যার দক্ষতা আর বুদ্ধির দিক দিয়ে। কিন্তু এক সময় চুরি ছেড়ে দিয়ে একেবারে সাধারণ জীবনে ফরে যায় সাথে নিজের ছোট্ট ছেলে জহিরকে নিয়ে। কিন্তু একসময় অপরাধ না করেও এক গোলমেলে মামলায় ফেঁসে যায় জাহাঙ্গীর। জনতার রোষ থেকে বাঁচতে পালিয়ে যায় জহির। শুরু হয় জঙ্গলে একলা বেঁচে থাকার যুদ্ধ। কিন্তু এতো ছোট ছেলে এত প্যাচালো সমাজের নিয়ম বুঝে না। বারবার সমাজে ফিরে যেতে চায়। শুধুমাত্র চোরের ছেলে বলেই তার উপর যত ক্ষোভ মানুষের, তাই বারবার তাড়িয়ে দেয়। এরমাঝে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মিলিটারি থেকে উদ্ধার পেতে তার কাছেই জঙ্গলে এসে হাজির হয় এক সময় তাকে মেরে ফেলতে চাওয়া লোকজনও। এক সময়ের সিঁধেল চোরের ছেলে যে বাবার মাটি কাটার দক্ষতা পেয়েছে সেটা আগেই প্রকাশ পেয়েছিল। আর এখন এই গুণ! কে কাজে লাগিয়েই উদ্ধারের পরিকল্পনা মিলিটারি ক্যাম্পে আটক থাকা তরুণ-তরুণীদের। ছোট্ট একটা কিশোর উপন্যাস। হয়তো তেমন নতুন কোন এডভেঞ্চার ও নেই। কিন্তু একটা জায়গায় বিশাল একটা পার্থক্য আছে। সিঁধেল চোরের ছেলে চুরি না করেও অপরাধী। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের একদম শুরুতেই বাঁচাতে এগিয়ে যায় তাদেরকে যারা তাকে গৃহহীন করেছিল। এরপরেও সমাজে তার পরিচয় চোরের ছেলেই। হয়তো শাসক, শাসনামলের পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু আমাদের মন থেকে কাওকে উপরে উঠতে দেয়ার বা সম্মান দেয়ার মত উঁচু মানসিকতা আমরা সেভাবে অর্জন করতে পারিনি। অনেকদিন পর সুন্দর একটা কিশোর উপন্যাস পড়লাম।
ক্ষ্যাপা বইটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাসিকা। বইটিতে মিঠাপুকুর নামক গ্রামের গল্প বলা হয়েছে। গল্পের মূল চরিত্র এগারো বছর বয়সী জহির, যে তার বাবার সাথে গ্রামের চরে থাকতো। গ্রামের দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান ও ওসির ষড়যন্ত্রে সে তার বাবাকে হারায়। গ্রামের মানুষের রোষানলেও তাকে পরতে হয়,কারণ তারা মনে করে চোরের ছেলে তো চোর ই হবে। চেয়ারম্যান ও তার দলের লোকদের থেকে বাঁচতে জহির আশ্রয় নেয় গ্রাম থেকে দূরের জংগলের চরে। বনের ফলমূল, নদীর মাছ ধরে পুড়িয়ে খেয়ে সে মাসের পর মাস বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে। এসময়েই দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সারাদেশের নির্বিচারে হত্যা শুরু করে। মিঠাপুকুরেও এর ব্যতিক্রম হয় না। গ্রামে তাণ্ডবলীলা, হত্যা, লুটপাট করে সেনাবাহিনী তরফদার চেয়ারম্যানের প্রত্যক্ষ সহায়তায়। যে গ্রামের মানুষেরা জহিরকে অচ্ছুত মনে করতো,সে জহিরই তাদেরকে রক্ষায় সহায়তা করে। শহীদুল মাস্টার, হাবলু, তালিবের পরিকল্পনায় পাক হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা করে জয়ী হয়।
বাপ্পি খান সরল গল্প সহজ করেই বলেন। বইটিতে লেখক গ্রাম বাংলার পরিবেশ, প্রকৃতি, তখনকার গ্রামের মানুষের জীবন, যুদ্ধের ভয়াবহতা খুব ভালোভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। তার আগের বইগুলোর (নিশাচর,অন্ধকার ট্রিলোজি) মতো এই বই পড়েও বিরক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই বইটি লেখকের অন্যবইগুলো থেকে একদম ভিন্ন,লেখকের সবগুলো বই পড়া থাকলে এই পার্থক্যটা সহজেই ধরতে পারবেন।
বাপ্পী খানের লেখনশৈলী সুন্দর, স্মুথ। এক বসায় শেষ করেছি। গল্প বলার ঢং-টাও বেশ গোছানো। চরিত্র, পটভূমিগুলোও আকর্ষণীয় ছিলো। তিন তারা দিতে হলো গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব। একটা এগারো বছরের ছেলের পক্ষে কয়েকদিন জঙ্গলে কাটানো কোনোমতে চোখ বন্ধ করে মানা গেলেও যুদ্ধের সময় মাথা ঠাণ্ডা রেখে গুলতি ছুঁড়ে পাক বাহিনীকে হারানো, একাই যুদ্ধের প্ল্যানিং করা- ঠিক হজম হয়নি। বইয়ের টার্গেট অডিয়েন্স কিশোররা হলেও এই জনরার বইগুলো সব বয়েসী পাঠকরাই পড়ে, অন্তত তাদের কথা মাথায় রেখে হলেও কিছুটা ভিন্নভাবে জহিরকে তৈরি করলে গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যেতো অনেকখানি।
তবে 'ক্ষ্যাপা' অবলম্বন করে নাটক বানালে মন্দ হবে না। শিশু-কিশোররা উত্তেজনায় শিস দেবার মওকা পাবে প্রচুর।
লেখক এর লেখার মাধুর্য যথেষ্ট বেশি। বোঝাই যাচ্ছে লেখক কি কারনে ভূমিকাতে বলে রেখেছ��ন উপন্যাসটা লিখতে তার কি রকম কষ্ট হয়েছে। যাই হোক ক্ষ্যাপা জহিরের চরিত্রটা আসলেই অসাধারণ হয়েছে। মাঝে মাঝে চোখের কোনে পানিও এসেছে....
বাতিঘরে এরকম পুষ্ট মৌলিক কিশোর উপন্যাস বোধ হয় এই প্রথম.... সব মিলিয়ে অনেক ধন্যবাদ লেখক....... অপেক্ষায় থাকবো❤🖤
ক্ষ্যাপা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা চমৎকার একটি কিশোর উপন্যাস। আমাদের এই গল্পে ক্ষ্যাপা হলো বইয়ের চরিত্র 'জহির', একজন তস্করের ছেলে।
বাবা এককালের অচ্ছুত চোর হলেও জীবনের একটি দুঃসময়ে চুরি ছেড়ে সৎ মানুষে পরিণত হয়। দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে ছেলে জহিরকে মানুষের মত মানুষে গড়ে তুলতে। কিন্তু সমাজ তাকে ভালো থাকতে দিলো কই? মিঠাপুকুর গ্রামের চেয়ারম্যান তরফদার, নিজের দোষ তার ঘাড়ে চেপে তাকে কয়েদখানায় পাঠিয়ে দেয়। বিনা দোষে জাহাঙ্গীরের কারাবাস হলো। একক্ষেত্রে ভালোই হলো পরে এই গ্রামে কী হতে যাচ্ছিলো তা তার দেখতে হয়নি।
তরফদারের উস্কানিতে 'চোরের ছেলে চোর' হবে বলে সমাজ জহিরকেও সমাজচ্যুত করতে দেরি করেনি। বাবার মত কাজে পটু জহির যখন নিরবলম্ব তখন একমাত্র স্কুলের মাস্টার শহীদুল্লাহ্ তাকে করুন দৃষ্টিতে দেখে। এরপর শুরু হয় তার বনবাস।
কিন্ত ঐ যে বললাম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নভেলা। একদিন ঘুরঘুর করে আকাশ থেকে কী যেন নামল। হ্যা, হেলিকপ্টার। আর নেমে এল বলীয়ান সব হিংস্র হানাদারবাহিনী। এসেই হত্যাযজ্ঞ শুরু। সে সাথেই পালটা দিয়ে শুরু হলো তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে আমাদের মুক্তিবাহিনীর তোড়জোড়।
১১২ পেইজের ছোট্ট বইটিতে এত্ত সুন্দর করে সাজানো এই গল্প। গল্প তো নয় বরং সত্যি সব মনে হচ্ছিলো। একবসাতেই খেল খতম। ভয়ে ছিলাম এই বুঝি সমাপ্তিতে জহির মারা যাবে। গল্পে জহির আর শহীদুল্লাহ্ নাম দেখে বুঝেছিলাম জহির রায়হান আর শহীদুল্লাহ্ কায়সারের স্মৃতিতে লেখা। তাছাড়া বাপ্পি খানে লেখা আগে পড়া হয়নি তবে এটা পড়েই লেখনশৈলী চমৎকার লেগেছে। বইয়ের নাম আর প্রচ্ছদ এক্কেবারে ফিট। কিন্ত কিছু জায়গায় বানান ভুল লক্ষ করেছি। এই যেমন নানা কে না না, সম্মান কে সন্মান এমন। কিন্ত গল্প পুরোপুরি উপভোগ করেছি। দারুন ফিনিশিং দিয়েছে বটে।
বাপ্পী খানের লেখা দারুণ একটা বই "ক্ষ্যাপা" ৷ এর আগে মূলত লেখক অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়েই লিখেছেন ৷ তার "অন্ধকার ট্রিলজি" বেশ জনপ্রিয় একটি বুক সিরিজ ৷ কিন্ত এইবার নিজেকে ভেঙেচুরে তিনি লিখেছেন "ক্ষ্যাপা" ৷ গল্পটি মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের, একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ এবং মানুষের জীবন যুদ্ধের গল্প ৷ শেষের দিকে এসে ভয়ে ছিলাম যে এন্ডিংটা চিরাচরিত গল্পের মতো হবে কিনা, কিন্ত লেখক তৃপ্ত করেছেন আমার পাঠক হৃদয়কে ৷ মুক্তিযুদ্ধের দুই মহান সেনা "জহির রায়হান" এবং শহীদুল্লাহ কায়সার"কে উৎসর্গ করে চরিত্রায়ন করা হয়েছে এই বইটিতে ৷ সাধারণত মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামীণ পরিবশ, কিশোর তরুণ চরিত্র - এইসব বললে জাফর ইকবাল স্যারের লেখার কথা মাথায় আসে বেশী ৷ কিন্ত বাপ্পী খানের "ক্ষ্যাপা" র প্লট সেম প্যাটার্নের হলেও লেখার ধরনে বিন্দুমাত্র জাফর ইকবাল স্যারের ছায়া পাওয়া যায়নি । "ক্ষ্যাপা" এক বৈঠকে পড়ে ফেলার মতো একটি ছোট উপন্যাস ৷ নির্মেদ এবং প্রাঞ্জল ভাষার এই উপন্যাসটি ছেলেবুড়ো সবার মনোযোগ ধরে রেখে পাঠককে আনন্দ দিতে সক্ষম ৷ লেখকের নিজের হৃদয়ের খুব কাছের এই উপন্যাসটি পড়লে একটা বিকেল মন্দ কাটবে না এইটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি ৷
বই - ক্ষ্যাপা লেখক - বাপ্পী খান প্রচ্ছদ - কৌশিক জামান প্রকাশনী - বাতিঘর মূল্য - ১৫০ টাকা
অতিরঞ্জিত গল্পের অতিনাটকীয় উপস্থাপনা। মুক্তিযুদ্ধের খাঁটি আবেগের সাথে জোর করে আরও কিছু আবেগ ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা ছিল মনে হলো। আর চোর হচ্ছে চোর। সেটা তরফদারই করুর আর জহিরের বাপ। সুন্দর করে চুরি করতে পারা মোটেও ভালো কিছু না। বাচ্চারা কী শিখবে এটা থেকে 😒
বইঃ ক্ষ্যাপা লেখকঃ বাপ্পি খান মন্তব্যঃ ক্ষ্যাপা বইটা ভাইয়ের লেখা ভিন্ন ধারার একটা বই, বইটা আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল, তখনকার আবহাওয়া এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নিমর্ম অত্যাচার সম্পর্কে জানতে পারব বা বুঝতে পারব। এখানে ক্ষ্যাপের গল্পের প্রধান চরিত্র "জহির"। যার বয়স ১১ বছর। সে চোরের ছেলে হওয়ার কারণে সমাজ তাকে কিভাবে দেখা এবং কিছু অসাধু লোকজনের নিজের একমাত্র পিতাকে হারিয়ে ফেলে কিভাবে টিকে থাকে এই জীবন যুদ্ধে আর নিজ গ্রাম থেকে পাকিস্তান বাহিনীকে তাড়াতে যেভাবে সে সাহায্যের বাড়িয়ে দেন এইগুলা জানতে অবশ্যই বইটা পড়তে হবে। ১১২ পেজের এই বইতে আপনার সুন্দর গ্রামের পরিবেশ,গ্রামের মানুষের সরলতা, কিছু অসাধু মানুষের নিজের স্বার্থের জন্য কুটনিতি এবং একটা কিশোরের সংগ্রামী জীবন ও তার সাহস সম্পর্কে জানতে পারবেন। অবশেষে বলব বইটা সবাই পড়া উচিত। অসাধারণ একটা বই 🖤
❝যুদ্ধে লাভ ক্ষতির হিসেবে রেখে লাভ নেই। জেতাটাই মুখ্য। তাহলেই তো হারানো সঙ্গীদের প্রতি সম্মান জানানোর একটা সুযোগ পাওয়া যায়....❞
একাত্তরে বাংলার মানুষের মাঝে নেমে এসেছিলো এক বিভীষিকা যা পুরো দেশকে তছনছ করে দিয়েছিল। শোষকদের হাতে কি করে নির্মম ভাবে অত্যাচারিত, লাঞ্চিত হয়েছিল বাঙালিরা। এবং সেই শোষকদের বিরুদ্ধে রুখেও দাঁড়িয়েছিল এই বাঙালিরা। শত বাধা-বিপত্তিতেও ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়, স্বাধীনতা, মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার শক্তি। এই স্বাধীনতার ইতিহাস আমরা সবাই কম বেশিই জানি। বইয়ের গল্পটাও সেই অধিকার আদায়ের লড়াই নিয়েই।
পর্যালোচনাঃ জাহাঙ্গীর মিঠাপুকুর গ্রামের ঘাঘু চোর। কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনার পর চুরি ছেড়ে ভালো একটা জীবন শুরু করেছিলো। কিন্তু কথায় আছে না ভালোর কোনো দাম নেই। যতই ভালো হও পুরোনো কর্মের জেরে খারাপের থেকেও খারাপ কিছু হয়েই যায়।
জহির বইয়ের মূল চরিত্র। জাহাঙ্গীর চোরার ছেলে। ‘চোরের ছেলেও চোর হবে’- এই অপবাদ তার ক্ষেত্রেও কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। আর এই অপবাদ দিয়েই গ্রামবাসিরা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এগারো বছরের এর দুরন্তপনা কিশোর তার সাহসিকতা আর বুদ্ধিমত্তাই যেন গল্পের মূল।
তরফদার অত্র এলাকার চেয়ারম্যান। ভালোর মাঝে খারাপের ছোঁয়া না থাকলে কি গল্প জমে। এখানেও সেই তরফদারকে সঙ্গ দিতে যুক্ত হয় আরেক দূর্নীতিবাজ ওসি ফারুক যিনি বাংলায় থাকলেও মনে প্রান একজন সাচ্চা পাকিস্তানি।
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ সমাজ থেকে বিতাড়িত একটি কিশোরের বেঁচে থাকার গল্প, পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয়ার গল্প লেখক বেশ সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন। বইয়ে কিছু কিছু বর্তমান সময়ের সাথে কিছু অপরিচিত কিছু শব্দ আছে যা ব্যবহারের সময় লেখক সেটাকে ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন এই বিষয়টা বেশ ভালো লেগেছে। তাছাড়া লেখাটা বেশ সহজ সাবলীল ভাষাতেই লিখেছেন। বইয়ের প্রথমার্ধ বেশ স্লো ছিলো কিছু কিছু জিনিসের বর্ননা বিরক্তিও লাগছিল তবে শেষার্ধে লেখক সেই খারাপ লাগা পুষিয়ে দিয়েছেন। শেষ করার পর মনে হয়েছে লেখক আরও বড় করতে পারতেন, যুদ্ধ নিয়ে আরেকটু লিখলে মন্দ হতো না। শেষের রোমাঞ্চকর টান টান উত্তেজনা পূর্ণ ফিনিশিং সবাইকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।
লেখক এর আগে অতিপ্রাকৃত নিয়ে লিখেছেন সেখানে বেশ সফলও হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন একটি ভিন্ন ধাঁচের লেখার জন্য ��েখকে সাধুবাদ জানাই এবং লেখাটা প্রশংসনীয়। অল্প সময়ে ভালো কিছু পড়তে চাইলে বইটা অবশ্যই পাঠ্য। বইয়ের সাথে ছোট্ট জহিরের সাথে ভালো সময় কাঁটবে।
বানান, মলাট ও বাধাইঃ বইয়ে কিছু বানান ভুল চোখে পড়ার মতো ছিলো যা পড়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি সমস্যা করেনি। আর বাধাই মোটামুটি ধরনের বেশি ভালো বলার উপায় নেই।
যুদ্ধ মানিই মৃত্যু, হতাহত, শহীদ। যুদ্ধে অবশ্যই হার- জিত আছে। যুদ্ধে কারা মারা গেলো, কোন দলের কতজন শহীদ হলো সেটা গৌণ। বিজয়ই একমাত্র মুখ্য বিষয়। তাহলেই তো হারানো শহীদ সহযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান জানানোর একটা সুযোগ পাওয়া যায়।
কাহিনী সংক্ষেপ👉
সাল ১৯৭১। দেশের বাতাসে যুদ্ধ যুদ্ধ গন্ধ। তবে মিঠাপুকুর নামক এক গ্রামে যুদ্ধ নামক সেই আবহাওয়ার কোনো পূর্বাভাস নেই। গ্রামের মানুষের জীবনের গতি স্বাভাবিক , শুধু মাত্র জহির নামে এগারো বছরের এক বাচ্চা ছেলের জীবন বাদে। কারণ তার বাবাতো এককালের কুখ্যাত চোর। "চোরের ছেলে তো চোরই হবে!" অপবাদে গ্রামের মানুষের নিষ্ঠুর অত্যাচারে তার জীবন তছনছ।
জহিরের বাবা একসময়ে চুরি করলেও কালক্রমে চুরি ছেড়ে দিয়ে সাধারণ জীবনযাপন শুরু করে। কিন্তু সমাজের এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী মানুষ নিজের স্বার্থের জন্য জহিরের বাবা জাহাঙ্গীরকে মিথ্যা চুরির অভিযোগে ফাঁসিয়ে জেলে পাঠিয়ে দেয়। জহিরকে দেয়া হয় 'চোরের ছেলে চোর' নামে মিথ্যা অপবাদ। জহির এক নিষ্পাপ শিশু, তার বাবা যে নিরপরাধ সেটা সে কিভাবে প্রমান করবে! তার কথা কে বিশ্বাস করবে? কারণ সমাজের প্রভাবশালী মানুষেরাই তো অপরাধগ্রস্থ - লোভী - জানোয়ার!
গ্রামের মানুষের নিষ্ঠুর অত্যাচার থেকে বাঁচতে জহির পালিয়ে যায় জঙ্গলে। সেখানে ফল , শাক সবজি আর পাশের নদীর মাছ ধরে খেয়ে বেঁচে থাকে শুধু, তার তো শুধু বেচেঁই থাকতে হবে! তার বাবাকে দেখতে যেতে হবে শহরে। কিন্তু তার শহরে যাওয়ার টাকা কই? তাই সে গ্রামের বাজারে জঙ্গল থেকে ফলমূল শাকসবজি আর নদীর মাছ নিয়ে পাশের গ্রামের বাজারে বিক্রি করে টাকা জমায়।
কিন্তু গ্রামেও তো তার একজন আপন মানুষ আছে। গ্রামের সবাই যখন তাকে নিষ্ঠুর অত্যাচার করে বারবার এসে সে বাঁচিয়ে দিয়েছে। চোরের ছেলে বলে যখন গ্রামের স্কুলে ভর্তি হতে পারে নাই তখন শহিদুল মাস্টারই তো জহিরকে বাড়ি গিয়ে পড়িয়েছে। শহীদুল মাস্টার যে তার এত খেয়াল রেখেছে তার সাথে দেখা না করে কিভাবে থাকে জহির! তো যেই ভাবা সেই কাজ, শহিদুল মাস্টারের জন্য নতুন জামা কিনে জহির চলে যায় গ্রামে। কিন্তু শহিদুল মাস্টারের সাথে দেখা হওয়ার আগেই গ্রামের মানুষ আবার জহিরকে জামা চুরির অপবাদ দিয়ে শুরু করে অত্যাচার মারধোর। তখন আবার শহিদুল মাস্টার এসে ওকে কোনো রকমে বাঁচিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
তার কিছুদিন পরে হটাৎ এক কাঠফাটা রোদের দুপুরে হেলিকপ্টারে করে গ্রামে প্রবেশ করে পাকিস্থানি সেনা। গ্রামে শুরু হয় গ্রামে গণহত্যা। প্রভাবশালী মানুষেরা নাম লেখায় রাজাকারের খাতায়, পাকিস্তানি সেনাদের সাহায্য করে মানুষ হত্যা করতে। গ্রামের কিছু সাধারণ মানুষ তখন শহিদুল মাস্টারের সাথে পালিয়ে যায় জঙ্গলে। গিয়ে জহিরের কাছে সাহায্য চায়। কিন্তু জহির কি সাহায্য করবে? যারা এতদিন তার উপর এত অত্যাচার করলো তাদের আজ বড়ো বিপদ! কিন্তু জহির তো মাত্র ১১ বছরের বাচ্চা ছেলে, ও কি করবে অস্র সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের? পারবে কি ওর গ্রামকে পাকিস্থানি সেনা মুক্ত করতে?
ফ্ল্যাপ👉
এ গল্প এগারো বছরের এক বাচ্চা, জহিরের; 'চোরের ছেলেও চোর’- এই অপবাদে যাকে গ্রামবাসীরা অচ্ছুত ভেবে তাড়িয়ে দিয়েছে।
গল্পটা আংশিক হলেও জাহাঙ্গীরের। এককালের কুখ্যাত চোর, যাকে কি না ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে এমন এক অপরাধে, যা সে করেইনি। গত আট বছর ধরে সৎভাবেই চলছিল মানুষটা। তবে কি ভালোর কোন দাম নেই?
গল্পটা শহীদুল মাস্টারের, যে জহিরকে পরম মমতায় আগলে রাখতে চায়।
গল্পটা তরফদার চেয়ারম্যান আর ওসি ফারুকেরও, যাদের দুর্নীতির লোভ ক্রমশ বাড়ছে। গল্পটা মিঠাপুকুর নামের এক গ্রামের সকল গ্রামবাসীর, যারা জানে না কোন বিপদ ধেয়ে
আসছে তাদের দিকে।
গল্পটা মানুষরূপী কিছু হায়েনার।
গল্পটা বাংলাদেশের।
সময়কাল ১৯৭১।
পাঠ প্রতিক্রিয়া👉:
ক্ষ্যাপা উপন্যাস পড়ার সময় বার বার একটা নামই মাথায় আসতেছিল শুধু, বুধা! হ্যা, সেলিনা হোসেনের বিখ্যাত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কিশোর উপন্যাস বুধা।
বুধা আর জহিরের চরিত্র ভালো ভাবে খেয়াল করলে দুজনের অনেক মিল পাওয়া যায়। জহির আর বুধা দুজনেই বাবা মা হারা( জহিরের বাবা থেকেও নেই), উভয়েরই কিছু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আছে। বুধা কথা বলতে পারে না, বাক প্রতিবন্ধী আর জহির গ্রামের মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে এক হাতের ব্যবহারযোগ্যতা হারিয়েছে, জঙ্গলে পুষ্টিকর খাবারের অভাবে হয়েছে রাতকানা। যাইহোক বুধাকে ক্ষ্যাপা উপন্যাসের সাথে তুলনা করা অবাঞ্চনীয় ।
তবে ক্ষ্যাপা উপন্যাসকে মূলত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কিশোর উপন্যাসই বলা যায়। অত্যন্ত সহজ সরল ভাষায় অল্প কিছু চরিত্র নিয়ে ছোট একটা বই ক্ষ্যাপা যা দুরন্ত এক কিশোরের গল্পঃ শুনাবে। একবসায় শেষ করার মতো একটা বই। কিশোর উপন্যাস হিসেবে কল্পনা করলে বইটাতে তেমন কোনো ঘাটতি নজরে পরে না। কিন্তু থ্রিলার ক্যাটাগরিতে ফেললে বইটা থ্রিলার চাহিদা পূরণে অযোগ্যই বলা যায়। সে যাই হোক আমি এটাকে কিশোর উপন্যাস মনে করেই পড়েছি , আর মুগ্ধ ও হয়েছি। বইটি নিয়ে কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না বলে হতাশ হইনি। এক কিশোরের চোখে সমাজের নিষ্ঠুরতা আর মুক্তিযুদ্ধ দেখে আসার জন্য বইটি নিঃসন্দেহে পড়ে ফেলা যায়। Happy Reading 📚
যুদ্ধভিত্তিক গল্প বা উপন্যাস বরাবরই আমাকে অনেক টানে। মানুষের অসহায়ত্ব, সংগ্রাম ও বীরত্বের চিত্র ফুটে উঠে এই ধরণের গল্পগুলোতে। পাশাপাশি সেই সময়ের ইতিহাস ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। ভালো একটা যুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস পড়ার পর বা কোন মুভি দেখার পর সেটার আবেশ অনেক দিন ধরে রয়ে যায়। তাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন কোন ভালো ফিকশনের খোঁজ পেলেই আমি পড়ে দেখার চেষ্টা করি। বিশেষ করি আমার বন্ধু রাশেদ , গ্রামের নাম কাঁকনডুবি ও সূর্যের দিনের মতো অনবদ্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস পড়ার পর এই ধারায় ভালো বইয়ের খোঁজে ছিলাম অনেক দিন ধরেই। সেই হিসেবেই ‘ক্ষ্যাপা’ বইটি নিয়ে লেখকের প্রথম পোস্টই আমার নজর কাড়ে এবং সিদ্ধান্ত নেই বইটি সংগ্রহ করবো।
‘ক্ষ্যাপা’ মূলত একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাসিকা। কিশোর অ্যাডভেঞ্চার বললেও ভুল হবে না।। গল্পের মূল চরিত্র জহির নামের ১১ বছরের এক দুরন্ত ছেলে যাকে এই অল্প বয়সেই অনেক নির্মমতার শিকার হতে হয়েছে। কিছু অসৎ লোকের কুটিল পরিকল্পনায় বাবাকে হারিয়ে এবং গ্রাম থেকে নির্বাসিত হয়ে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই শুরু করে ছেলেটা। দেশেল উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও মিলিটারিদের আগমন কোন কিছু সম্পর্কেই অবগত না জহির। সে শুধু ব্যস্ত জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে। ১৯৭১ সালে ছোট্ট শান্ত মিঠাপুকুর গ্রামের এই হতভাগ্যা কিশোরটির বুদ্ধিমত্তা , সাহসিকতা ও বীরত্বের গল্প ‘ক্ষ্যাপা’।
বইয়ের প্লট বেশ সাদামাটা। খুব বেশি নতুনত্ব যে আছে গল্পে এমনও না। সত্যি বলতে , প্রথম দিকে লেখকের বর্ণনাভঙ্গীও খুব একটা টানছিল না আমাকে। কিন্তু কিছু পৃষ্ঠা অতিক্রম করার পরে সেই সমস্যা আর হয়নি। খুবই সাবলীল ভঙ্গিতে লেখক গল্পটা বলেছেন। কাহিনীও এগিয়েছে সুন্দর গতিতে। নানান প্রতিকূলতার মাঝে জহিরের জঙ্গলে থাকার ও শেষের দিকে কৌশল সাজানোর বর্ণনাগুলো এক কথায় চমৎকার লেগেছে। গ্রামীণ জীবনকেও বইয়ের পাতায় সুন্দরমতো তুলে ধরেছেন লেখক। আগেও যেমনটা বললাম ,গল্পটা বেশ সাদামাটা। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসিকা হলেও যুদ্ধ নিয়ে বা তৎকালীন পরিস্থিতি নিয়ে তেমন কোন আলোচনা নেই বইতে এবং আমার কাছে তাই যথার্থ মনে হয়েছে। লেখক যেরকম গল্প বলেছেন সেখানে এই বর্ণনাগুলো আনতে গেলে জোরপূর্বক হয়ে যেত ব্যাপারটা। লেখক এখানে জহির এবং অন্যান্য গ্রামবাসীদের মাধ্যমে বাঙালিদের লড়াকু মানসিকতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আবেগটাকে সফলভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। বইটি নিয়ে লেখকের এই কথাটাই একদম যথার্থ - 'এই যুদ্ধের গল্পে কোন রাজনৈতিক দল নেই, কোন 'চেতনা' কিংবা স্বার্থকেন্দ্রিক হিসাব নিকাশের হাহাকার নেই।'
ক্ষ্যাপা বইয়ের অন্যতম শক্তিশালী দিক এর চরিত্রগুলো। স্বল্প পরিসরে লেখক দারুনভাবে চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তুলেছেন। উপন্যাসিকার কেন্দ্রীয় চরিত্র জহিরকে দারুণ লেগেছে, অনেক দিন মনে রাখার মতো একটি চরিত্র। শহিদুল মাস্টারকেও অনেক ভালো লেগেছে। বাদ বাকি চরিত্রগুলোও নিজেদের জায়গায় ঠিকঠাক ছিল। জহির আর শহিদুল মাস্টারের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে হারানো দুই মহান বুদ্ধিজীবী জহির রায়হান ও শহিদুল্লাহ কায়সারকে ট্রিবিঊট দেওয়ার ব্যাপারটা চমৎকার লেগেছে। বইয়ের নামকরণটাও একদম যথার্থ ও বেশ সুন্দর।
ক্ষ্যাপা বইয়ের সমাপ্তি নিয়ে আলাদা করে আসলে বেশি কিছু বলার নেই। সমাপ্তি কেমন হবে সেটা আগে থেকে আঁচ করা কঠিন কিছু হবে না হয়তো। কিন্তু প্রেডিক্টেবল হওয়াটা এখানে কোন ইস্যু না । বরং যেভাবে লেখক সমাপ্তি টেনেছেন তা আমার কাছে পারফেক্ট লেগেছে।
‘ক্ষ্যাপা’ বইটির চমৎকার প্রচ্ছদ করেছেন কৌশিক জামান। প্রচ্ছদের রঙটা খুবই সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। কাহিনীর সাথে একদম মানানসই এই প্রচ্ছদটি যে কারো নজর কাড়তে সক্ষম হবে। তবে ছোট বই হিসেবে মুদ্রণ প্রমাদের পরিমাণ অনেক ছিল , যা মাঝেমধ্যে পড়ার ফ্লো নষ্ট করেছে।
সর্বোপরি, ‘ক্ষ্যাপা’ একটি সার্থক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাসিকা। লেখক বাপ্পী খানকে ধন্যবাদ নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বের হয়ে এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারায় কাজ করার জন্য। ভবিষ্যতে লেখকের থেকে আরও কিশোর উপন্যাসের আশা রাখছি।
অন্ধকার ট্রিলজি পড়া আছে? হ্যাঁ, লেখক বাপ্পী খানের যেই ট্রিলজির প্রথম বই "হার না মানা অন্ধকার", দ্বিতীয় বই "ঘিরে থাকা অন্ধকার" এবং তৃতীয় আর শেষ বই "কেটে যাক অন্ধকার", যেটা এবারের বইমেলায় বেরিয়েছে। কিংবা নিশাচর? লেখকের আগের এই বইগুলো যদি আপনার পড়া হয়ে থাকে, তবে এবারের বইমেলাতেই প্রকাশিত তার আরেকটি বই "ক্ষ্যাপা" পড়ার পর আপনি অবাক না হয়ে যাবেন না! কে বলবে, যেই লেখক নিশাচর, হার না মানা অন্ধকার, ঘিরে থাকা অন্ধকার এবং কেটে যাক অন্ধকার লিখেছেন, সেই একই লেখক ক্ষ্যাপা-ও লিখেছেন?! লেখকের নাম আগে থেকে জানা না থাকলে ব্যাপারটা বোঝা খানিকটা মুশকিল-ই বটে! কারণ এই "ক্ষ্যাপা" উপন্যাসিকাটি লেখকের আগের কাজগুলোর তুলনায় একেবারেই আলাদা!
"ক্ষ্যাপা" মূলত একটি কিশোর উপন্যাসিকা। এই উপন্যাসিকার প্রধান চরিত্র এগারো-বারো বছর বয়সী এক কিশোর, যার নাম জহির। জহির আগে তার বাবার সঙ্গে একটা চরে থাকতো। কিন্তু নিয়তি তার কাছ থেকে তার বাবাকে কেড়ে নেয়, বদলে দেয় তার ঠিকানাও। তার ঠিকানা হয় সেই চর থেকে খানিকটা দূরের একটা ঘন জঙ্গলে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ধরে সেই জঙ্গলের গাছপালা থেকে ফলমূল পেড়ে, নদী থেকে মাছ ধরে সেগুলো খেয়েই বেঁচে থাকে সে। ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে ওঠে আদিম জীবনযাপনে। লোকালয়ে ফেরার চেষ্টা যে সে একেবারেই করে নি, তা নয়। কিন্তু সেই চেষ্টার ফলাফল ছিলো এতটাই হৃদয়বিদারক যে লোকালয়ের বাসিন্দাদের প্রতি একরাশ ঘৃণা এবং অভিমান নিয়ে তাকে আবারও ফিরে আসতে হয় সেই বনে। সে বুঝতে পারে বনের ফলমূল, নদী থেকে ধরা মাছ আর গুলতি দিয়ে শিকার করা পাখির মাংস খেয়ে আর বনের হিংস্র পশুপাখির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকাটাই তার নিয়তি। কিন্তু কে জানতো যে খুব শীঘ্রই বাইরে থেকে এই বাংলার ওপর হামলে পড়া একদল হিংস্র পশুর সঙ্গেও তার জড়িয়ে পড়তে হবে এক অসম লড়াইয়ে? তাও আবার সেই গ্রামবাসীদের বাঁচাতেই, যাদের সীমাহীন অবিচারের কারণে আজ সে ঘরছাড়া! সেই অসম লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের বন্দুক, কামান ইত্যাদি ভারি ভারি অস্ত্রের বিরুদ্ধে দূরন্ত এবং ক্ষ্যাপা কিশোর জহিরের অস্ত্র কেবল একটা সিঁদকাঠি আর একটা গুলতি! আর আছে তার অদ্ভূত রণকৌশল! ওহ হ্যাঁ, সময়টা তো বলি-ই নি! সময়টা ১৯৭১ সাল....
আগেই বলেছি, এই বইটি লেখক বাপ্পী খানের আগের বইগুলো থেকে একেবারেই আলাদা। আলাদা কেবল প্লটের দিক থেকেই না, বরং লেখার ধরনের দিক থেকেও। এখানে গল্পটা পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিলো যেন গল্প আসলে পড়ছি না, বরং কারো মুখ থেকে গল্পটা শুনছি। শুধু তাই না, "থ্রিলার মানেই ট্যুইস্ট, ট্যুইস্ট ছাড়া থ্রিলার হয় না"- এই জাতীয় ধ্যান ধারণাকে ভুল প্রমাণ করার মতো একটা বইও এই "ক্ষ্যাপা"। এই বইটিতে শুরু থেকে শেষ অবধি কোনো ট্যুইস্ট নেই, তবুও পুরো বই জুড়ে আছে ভরপুর থ্রিল! আর হ্যাঁ, কোনো ট্যুইস্ট না থাকলেও এই বইটির শেষ পর্যায়ে গিয়ে যেকোনো পাঠকেরই বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে পড়তে বাধ্য! কারণ ঐযে বললাম- জহিরের অদ্ভূত রণকৌশল!
বাপ্পী চৌধুরীর অন্ধকার ট্রিওলজির কথা কে না জানেন?আমার তো অনেক প্রিয় একটা সিরিজ৷ তবে আজকে আলোচনা করতে চাই এমন একটা নভেলা নিয়ে যা আমাদের চেনা বাপ্পী চৌধুরীকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করবে৷
তো ক্ষ্যাপা, নাম শুনলেই বোঝা যায় ক্রোধে উল্লসিত কোন প্রোটাগনিস্টের অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে৷ ক্ষ্যাপা মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন এগারো বছর বয়সী জহির নামের অচ্ছুৎ এক কিশোরের গল্প যাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় কোন এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে৷
আমার কেন যেন উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বভূষণ পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলামের কথা মনে পড়লো৷ যার বয়স ছিল মাত্র তেরো বছর৷ এ প্রজন্মের অনেকেই জানেন না যে দেশ স্বাধীন করতে যাদের আত্মত্যাগ নিবিষ্ট, সেখানে নেই কোন বয়সের প্রভেদ,শ্রেণী,পেশা,কিংবা ধর্মের প্রভেদ৷ সর্বোতভাবে অর্জিত হয় এ দেশের স্বাধীনতা৷
উপন্যাসের বর্ণনাশৈলী, চরিত্রায়ন,গ্রামের রুপবৈচিত্রের সুন্দর পোট্রে, এডভেঞ্চার, যুদ্ধের গতিশীলতা, ভয়াবহতা, কোন কিছুই কম ছিল না এতে৷
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা আমার পড়া একটা দারুন উপন্যাসিকা হলো এই "ক্ষ্যাপা" বাঙালির মুক্তির সংগ্রাম কে পাশ কাটিয়ে একটা পরিবারহীন, আশ্রয়হীন কিশোর জহির এর প্রতিদিনকার যুদ্ধের গল্প। সে সময় নিন্মবিত্ত লোকগুলোর নানা প্রতিকূলতার সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধের একটা চিত্র এখানে দেখা যায় একজন দাগী চোর জাহাঙ্গীর এর মধ্য দিয়ে। আমি এই বইয়ের "তরফদার চেয়ারম্যান" চরিত্রটাকে দশে দশ দিবো শুধুমাত্র ক্ষমতাসীনদের শোষণ চিত্র শতভাগ ফুটিয়ে তোলার জন্য। অন্ধকার সিরিজের লেখক এই সহজ সাবলীল একটা প্রেক্ষাপটের মাধ্যমে নির্মম বাস্তবতা এতো সুন্দরভাবে তুলে ধরার জন্য সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
"চোরের বাচ্চা চোরই হবে" শুধু এই একটা অনুমানের ভিত্তিতে ছোট্ট এক কিশোরের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে গ্রামের লোভী গোষ্ঠী। এই বই পড়ার পর আমার মনে হয়েছে চুরি করা একটা অপরাধ হলেও চুরির কৌশল অবশ্যই একটা আর্ট যা পরিস্থিতির প্রয়োজনে দারুন কাজে আসতে বাধ্য। 💙💙
এই বই নিয়ে আসলে তেমন কিছু বলার নেই৷ লেখকের অন্ধকার ট্রিওলজি আমার খুবই প্রিয় (নিচে আসছে শেষ পর্বের অনুভূতি)। তো স্বাভাবিকই, লেখকের নির্দিষ্ট ধারার লেখনীর ছাপ পাবো ভেবেছিলাম৷ কিন্তু কয়েক পৃষ্ঠা পড়েই ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম৷ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার উপন্যাসিকিটা গ্রাম বাংলার একটি দূরন্ত বাচ্চা ছেলের গল্প৷ তেমন কোন উত্থানপতন না থাকলেও বেশ উপভোগ্য ছিল বইটি৷ শেষের দিকের চমৎকার একটা ফিনিশিং সবাইকেই মুগ্ধ করবে৷ তেমন কোন নেতিবাচক কিছু পাই নি৷ তবে কেন যেন মনে হয়েছে, আরও কিছু করা যেতো বা লেখা যেতো৷ তবে সব মিলিয়ে আমার ভালো লেগেছে৷
কঠিন বা অপরিচিত কোনো শব্দের ব্যবহার এলেই শব্দটাকে ব্যাখ্যা করার ধরণটা চোখে পড়ার মতো। ভালো লেগেছে বিষয়টা। মুক্তিযদ্ধের সচারাচর যেসব গল্প আমরা পড়ে থাকি এটা তার থেকে ব্যতিক্রম। মনে হয় যেন আমার সামনে বসে কেউ নিজের অভিজ্ঞতার গল্প বলছে। শেষের অধ্যায়ে এসে উত্তর মিলেছে সব থেকে বড় প্রশ্নের। পাক বাহিনীর হেলিকাপ্টার ব্যবহারটা কেমন যেন লাগলো। অজপাড়াগাঁয়ে এমন হেলিকাপ্টার নিয়ে যেতো কিনা আমার জানা নেই। গল্পের শুরুতে এলাকার উন্নয়নের জন্য গম পাঠানোর বিষয়টাও বুঝিনি। এরকম ছোটখাটো কয়েকটা বিষয় বাদ দিলে নভেলাটা দারুণ এবং সাবলীল। এক বসায় পড়ে ফেলার মতো।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোট্ট একটি গল্প। মুক্তিযুদ্ধের গল্পে নতুনত্ব কম থাকে। তবুও এই গল্পে লেখক জহিরে চরিত্রটির মাধ্যমে অন্যরকম একটা মিশেল দিয়েছে। এই গল্পের চরিত্রগুলোর নাম ভুলে গেছি। তবে শহীদুল মাস্টারের কথা মনে আছে। তিনি গল্পের নায়ককে নায়ক হতে উৎসাহ এবং নির্দেশনা দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের গল্পে আমরা যেমন যুদ্ধে ঘটে যাওয়া সব ভয়াবহতা জানতে চাই তেমনি বিজয়ও দেখতে চাই। লেখক সেরকমটাই করেছেন। সাজানো গোছানো সুন্দর একটি গল্প। পাশাপাশি একটা বাবা-মা হাড়ানো ১১বছর বয়সী ছেলের একা একা বেঁচে থাকার গল্প।