বঙ্গবন্ধুর লেখা 'আমার দেখা নয়া চীন' বইটা পড়ার সময় খুব উপভোগ করেছিলাম। তখন মনোজ বসুর লেখা এই বইটির কথা জানতাম না। তবে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথায় শান্তি সম্মেলনে ভারতীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে মনোজ বসুর সাথে দেখা হওয়া এবং উভয়েরই বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করার কথার উল্লেখ পেয়েছিলাম। যখন এই বইটির কথা জানলাম, তখন থেকেই প্রভূত আগ্রহ ছিল যে কেবল ৫ বছর আগে আলাদা হওয়া দুটো রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের চোখে ১৯৫২ সালের ওই শান্তি সম্মেলনটি কেমন ভিন্ন রূপে ধরা পড়েছিল সেটা জানার। ভারত এবং পাকিস্তান তখন আলাদা দুটো দেশ, দুই দেশই কমিউনিস্ট ভাবধারার নয়াচীনে গেছে শান্তি সম্মেলনে অংশ নিতে। সেই দুই দেশের দুই প্রতিনিধি একই সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুটো বই লিখেছেন৷ আমার কাছে বিষয়টা খুবই আগ্রহোদ্দীপক লেগেছিল। মনোজ বসুর লেখার সাথে আমার এই প্রথম পরিচয়। যদিও তাঁর বিখ্যাত বেশ কিছু উপন্যাস আছে জানি, এবং চলচ্চিত্রায়ণ ও হয়েছে, সেটাও জানা আছে। তবে প্রথম পরিচয়টা হল ভ্রমণকাহিনীর মাধ্যমেই। বেশ মজার একটা লেখনশৈলী, পড়লে অনেক ক্ষেত্রে মুখে একটা স্মিত হাসি ফুটে উঠে৷ দীর্ঘ এই ভ্রমণকাহিনীতে শান্তি সম্মেলনের দিনগুলির বর্ণনা অনেক বিস্তৃতভাবে দিয়েছেন লেখক। আলোচনায় এসেছে নয়াচীনের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নতির কথা, মানুষের ভাবনার বদলের কথা। পরিচ্ছন্নতার কথা বেশ কয়েকবারই বলেছেন লেখক, পতিতাবৃত্তি দূর হয়ে যাওয়াতে প্রকাশ করেছেন বিস্ময়। ভারতীয় হিসেবে চীনের সাথে সম্পর্ক শতাব্দীপ্রাচীন। সেই গৌতম বুদ্ধের সময় থেকে। চীনের মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথও এক শ্রদ্ধেয় নাম। আতিথেয়তায় 'ভারতীয়' এই বিষয়টি প্রবল প্রাধান্য পেয়েছে চীনাদের কাছে, অবশ্যই ইতিবাচকভাবে। ক্যানটন, পিকিং, সাংহাই, হ্যাংচো প্রভৃতি শহর ঘুরে দেখেছেন লেখক, সমৃদ্ধ করেছেন অভিজ্ঞতার ঝুলি নানা স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য অবলোকনের মাধ্যমে, দিয়েছেন সেসবের প্রাণবন্ত বর্ণনা। চীনা চায়ের কদর করেছেন, যদিও প্রথম দিকে দুধ চিনি ছাড়া চা খেতে বেশ অসুবিধেই হত তাঁদের। পরের দিকে অভ্যাস হয়ে যায়। চীনা মেয়েদের পরিবর্তন এবং তাদের প্রায় সম অধিকার পাওয়াটা বিস্মিত এবং আনন্দিত করেছে লেখককে। লেখকের স্মৃতিতেও বঙ্গবন্ধু এবং তাঁদের উভয়ের বাংলায় বক্তৃতা দেয়ার কথাটা উঠে এসেছে। দুই দেশের মানুষ অথচ ভাষা এক, এই বিষয়টি অবাক করেছিল অন্যান্য প্রতিনিধিদের। ছোট শিশুদের আন্তরিকতা ছাড়াও মাও সে তুং, সান ইয়াৎ সেন প্রমুখ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের অবদানের কথা স্মরণ করেছেন। প্রকৃত চীনের দেখা পেতে গ্রাম ও ভ্রমণ করেছেন, যেখানকার প্রকৃতির সাথে বাংলার মিল খুঁজে পেয়েছেন কেবল মাঝে মাঝে উঁচু হয়ে থাকা পাহাড়গুলো ছাড়া! লেখক অল্প কথায় পরিবর্তন এবং মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন এভাবে, " পাঁচ তারার আলোয় বিভাসিত নতুন চীন চাক্ষুষ দেখে এলাম। স্থবিরত্বের খোলস ঝেড়ে ফেলেছে। চিরকালের বোঝা বওয়া ন্যুব্জপৃষ্ঠ মানুষগুলোর অপরূপ বীরমূর্তি! লোহার নাল-বাঁধা পঙ্গুপদ ছিল যে মেয়েগুলো- তাদের দাপাদাপিতে অস্থির আজ চীনের ভূমিতল।" ইতিহাস, ঐতিহ্য, মানুষ এবং পরিবর্তন এই সবকিছুই সুন্দরভাবে অনুধাবন করেছেন এবং পরবর্তীতে সেসমস্ত অভিজ্ঞতার ডালি সাজিয়ে রচনা করেছেন এই গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণকাহিনী 'চীন দেখে এলাম।' মনোজ বসুর সাথে প্রথম পরিচয় এবং ভ্রমণ তাই ভালোই হল। জার্নিম্যান বুকস এর প্রকাশিত বইটি দারুণ সুন্দর। শুভ্র প্রচ্ছদে প্রাচীন স্টাইলের ফন্টে মোটা পৃষ্ঠায় সাজানো বইটি আমার পড়তে অনেক আনন্দ লেগেছে।