এই বইয়ে ২৪টি logical fallacy বা যুক্তির ভ্রান্তি নিয়ে গল্প করা হয়েছে, মজার সব উদাহরণ দিয়ে। বইয়ের মূল চরিত্র হাসিব, যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেই শখের বশে যোগ দেয় গ্রামের স্কুলে, শিক্ষক হিসেবে। গণিত-বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও সে দ্রুতই বুঝতে পারে- ছাত্রছাত্রীদের যুক্তিবোধ শাণিত করাটাই আগে জরুরি। তাদের ফড়িংয়ের মতো অস্থির মন যেন কুযুক্তির ফাঁদে পড়ে পথ না হারায়, এজন্য তাদেরকে সে শোনায় যুক্তির নানা ভ্রান্তির গল্প। গল্প শোনাতে শোনাতে সেও কি একটু একটু করে নিজেকে আবিষ্কার করে?
বইটিতে উদাহরণের মাধ্যমে, সাধারণ পাঠকের বোধগম্য করে বিভিন্ন প্রচলিত লজিকাল ফ্যালাসি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন - Ad Hominem বা অপ্রাসঙ্গিক ব্যাক্তি আক্রমণ, Red Herring বা প্রসঙ্গ ঘোরানো, No True Scotmans বা লেখকের ভাষায় প্রকৃত বাঙালী ভ্রান্তি, Hasty Generalization বা ঢালাও সিদ্ধান্ত সহ ২৪টি logical fallacy বা ভ্রান্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
'আমি ব্যাগ কোথায় রাখব, সেটা তুই বলার কে? যতসব চাষাভূষা-মূর্খ লোকজন আমাকে ঠিক-বেঠিক শেখাতে আসছে!' এই ধরনের কথাবার্তা আমরা হামেশাই শুনে থাকি আশেপাশে, এমনকি মাঝে মাঝে নিজেরাও বলি। যুক্তির ভ্রান্তির একটি ধরন আরকি, যার নাম Ad Hominem বা অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তি আক্রমণ! বেশিরভাগ মানুষ যা করে তাই ঠিক, অতএব সবার তা-ই করা উচিত, এই ভাবনাটা একটা অতি পরিচিত ভাবনা। আমাদের সকলেরই কমবেশি ধারণা তাই। কিন্তু, সূর্য যে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে, এই ভ্রান্ত ধারণাটাও তো এককালে বেশিরভাগ মানুষের ছিল। তাই বলে এটা কি ঠিক হয়ে গেল? কিংবা একজন দেখতে সালমান খানের মতো মানেই এই না যে সে ভবিষ্যতে সালমান খানের মতো সুপারস্টার হবে! আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা প্রায় সময়ই কথার ভাঁজে কিংবা তর্কে জিততে যুক্তি প্রয়োগ করে থাকি। যেহেতু যুক্তি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান থাকে ভাসা ভাসা, তাই প্রায়ই সেই যুক্তিগুলো আসলে থাকে ভুল যুক্তি বা logical fallacy. আমরা নিজেদের যুক্তি ঠিক রাখতে প্রায়ই প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেই বা মূল বিষয়কে পাশ কাটিয়ে অন্য একটা প্রসঙ্গ এনে নিজেদের যথার্থতা প্রমাণের চেষ্টা করি। ভুল উপমা দিয়ে কোন কিছু ব্যাখ্যা করতে যাই কিংবা অতিরিক্ত শব্দ লাগিয়ে বক্তব্য পাল্টে ফেলি। এমন নানা ধরনের যুক্তির ভ্রান্তি যা আমরা দৈনন্দিন জীবনে করে থাকি, তা নিয়ে চমৎকার আলোচনা আছে চমক হাসানের এই বইটিতে। চমক হাসান বাংলাদেশে অঙ্ক ভাইয়া নামে পরিচিত এক নাম, দারুণ গান করেন তিনি। আর লেখার ভঙ্গিটাও একদম সরস। মাত্র ১ ঘণ্টায় এই বইটি পড়ে ফেলেছি আমি কারণ, একের পর এক যুক্তির ভুল এবং তার পেছনের কারণগুলো পড়তে যেমন মজা পাচ্ছিলাম, তেমনি নিজের জীবনে এসবের ভুল প্রয়োগ সম্পর্কে জেনে আরেকটু সচেতনও হচ্ছিলাম। লেখক নিজেই বলেছেন, ' গণিত আমার অত্যন্ত প্রিয়, আমার প্রথম ভালোবাসা। আর গণিতের যেখানে ভিত্তি, সেটা হচ্ছে যুক্তি। যুক্তি ব্যাপারটা ভালো করে না জানলে গণিত-বিজ্ঞানের চর্চা ঠিকমতো করা যায় না।' খুবই যুক্তিপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত। বইটি শুরু হয়েছে হাসিব নামক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাসকৃত এক যুবকের ট্রেন ভ্রমণ দিয়ে, যে শোমসুপুর হাই স্কুলে অংকের মাস্টার হিসেবে যোগ দিতে যাচ্ছে। সেখানে তার কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রীকে অঙ্ক, যুক্তিবিদ্যা এবং বিতর্ক সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে নানাবিধ উদাহরণ এর মাধ্যমে। বইটির মূল উপজীব্যই হচ্ছে সেটা। যদি পৃথিবীর সবাই হুটহাট করে কথা না বলে ফেলে, বলার সময় একটু ভেবে বলত, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে শিখত, তবে পৃথিবীটা আরেকটু সুন্দর হত। এটা লেখকের আশাবাদ, একই সাথে আমাদেরও। চমৎকার বিষয়বস্তু এবং কার্টুনের মাধ্যমে যুক্তিগুলো সহজে বোঝানোর জন্য বইটি অভিনবত্বের দিক দিয়ে উঁচু অবস্থানে থাকবে, একই সাথে পাঠক আগ্রহী হয়ে উঠবেন প্রাত্যাহিক জীবনে করা নানা ভুলগুলো শুধরাতে এবং মজার মজার সব ভ্রান্ত যুক্তি শুধরিয়ে বক্তব্যকে আরো শাণিত করতে৷
বইঃ যুক্তিফাঁদে ফড়িং লেখকঃ চমক হাসান প্রকাশনঃ আদর্শ পৃষ্ঠাসংখ্যাঃ ১০২ প্রথম প্রকাশঃ মার্চ, ২০২১ রেটিংঃ ৪.৫/৫
২৪ টা লজিক্যাল ফ্যালাসি বা যুক্তির ভ্রান্তি নিয়ে সাজানো বই। এই ফ্যালাসিগুলো গুগল ঘাটলেও পাওয়া যায়। তবে সেগুলো পড়তে বেশ কাঠখোট্টা লাগে। চমক ভাই সে বিষয়গুলোই সহজ ভাষায় লিখেছেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করি এমন বাক্য এনেছেন। আর গল্পগুলো বলার জন্য একটা চরিত্র আর ছোটাখোটো প্লটও দাড় করিয়েছেন। এর ফলে যখন বইটি পড়বেন তখন যুক্তির ভ্রান্তি জানার পাশাপাশি আরেকটি গল্পের সাথে যুক্ত হয়ে যাবেন। বাংলা ভাষায় এ ধরণের বই দুষ্কর বলতে গেলে। সবমিলিয়ে আমার বেশ ভালোই লেগেছে।
পরীক্ষা শেষে এটা দিয়েই বছরের পড়া শুরু করেছিলাম। দারুণ একটা বই দিয়েই বছরের পড়ার যাত্রাটা শুরু হলো!
দৈনন্দিন জীবনের চলার পথে, বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের লজিক্যাল ফ্যালাসি এর সম্মুখীন হই। আবার অনেকসময় তর্কের খাতিরে নিজেরাও অনেক যুক্তি দিয়ে থাকি, যা হয়তো লজিকাল ফ্যালাসি বা ভ্রান্ত যুক্তিতে পড়ে। কিন্তু আমাদের অজ্ঞতার জন্য আমরা তা আমরা বুঝতে পারি না।
বইটিতে উদাহরণের মাধ্যমে, সাধারণ পাঠকের বোধগম্য করে বিভিন্ন প্রচলিত লজিকাল ফ্যালাসি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন - Ad Hominem বা অপ্রাসঙ্গিক ব্যাক্তি আক্রমণ, Red Herring বা প্রসঙ্গ ঘোরানো, No True Scotmans বা লেখকের ভাষায় প্রকৃত বাঙালী ভ্রান্তি, Hasty Generalization বা ঢালাও সিদ্ধান্ত সহ ২৪টি ভ্রান্ত যুক্তি নিয়ে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় আলোচনা করা হয়েছে।
যেমন - একজন নেতা গর্ব করে বলল, ‘বাঙালি কোনোদিন চুরি করে না।’ পাশ থেকে একজন বলল, ‘স্যার, ওমুক তো বিখ্যাত চোর, সেও তো বাঙালি।’ নেতা এবার বলল, ‘উঁহু, সে প্রকৃত বাঙালি না; প্রকৃত বাঙালি কোনো দিন চুরি করে না।’ এই ‘প্রকৃত’ কথাটা বলে সে তার আগের অবস্থানকে সুবিধামতো বদলে নিল। No True Scotmans ফ্যালাসিতে এমন ব্যাপারই বারবার দেখা যায়। নেতা যখন ঢালাওভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, তখন একজন উল্টো উদাহরণ দিয়েছেন। ফলে তার বক্তব্য ভুল প্রমাণিত হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি তার বক্তব্যকে কায়দা করে বদলে নিলেন। সমস্যা হলো, বাঙালি কী জিনিস সেটা ভাষা দিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না করতে পারলেও মানুষের একটা ধারণা আছে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বা বাংলা অঞ্চলের সংস্কৃতির ধারক-বাহক মানুষকে সাধারণভাবে মানুষ বাঙালি হিসেবে চেনে। কিন্তু ‘প্রকৃত বাঙালি’ কী জিনিস, এটা খুব অস্পষ্ট। এটা যে যার মতো করে ভেবে নিতে পারে। যার যা পছন্দ না, সেটাকে সে ‘প্রকৃত বাঙালি’র বৈশিষ্ট্যের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারে।
এমন ২৪টি logical fallacy বা যুক্তির ভ্রান্তি নিয়ে , মজার সব উদাহরণ দিয়ে যুক্তিফাঁদে ফড়িং বইটি লেখা হয়েছে, যার প্রয়োগ আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রায়ই দেখতে পাই। এই ধরনের একটা বইয়ের প্রয়োজনীয়তা অনেকদিন ধরেই অনুভব করছিলাম। লেখককে সাধুবাদ এইধরনের একটি গুরুতপুর্ন বিষয়ের উপর বইটি লেখার জন্য। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে, ভ্রান্ত যুক্তি থেকে সতর্ক থাকতে সবারই এইধরনের লজিকাল ফ্যালাসি এড়িয়ে চলা উচিত, আর এসম্পর্কে প্রারম্ভিক ধারনা নেয়ার জন্য এই বইটি দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।
মূলত লজিকাল ফেলেছি নিয়ে বলেছেন ভাইয়া, যুক্তির ভ্রান্তি, তবে! লজিক ��ুলান আর কাউন্টার এন্সার আমাকে খুশি করতে পারেনি। তিন তারা দিতে বাধ্য, নিজে পড়ে প্রিয়জনকে উপহার দিয়েছি চমকপ্রানবান মানুষের হাতে।
আপনি 'ক' রাজনৈতিক দলের করা একটা ভুলের সমালোচনা করলেন। 'ক' দলের কর্মীরা বলল আপনি আমাদের সমালোচনা করেন, তার মানে আপনি 'খ' দলের সমর্থক। এটা হচ্ছে False Dichotomy বা ভ্রান্ত দ্বিবিভাজন। একটা না হলেই আরেকটা হবে এই সিদ্ধান্তে আসা। অথচ হতেই পারে আপনি 'ক' কিংবা 'খ' কোনো দলকেই সমর্থন করেন না। কোনো দলের কাজই আপনার পছন্দ না। আবার 'ক' দলের কোনো কর্মী একটা অন্যায় করল। তখন ওই দলের বাকিরা বলল ও তো 'ক' দলের প্রকৃত কর্মী না। প্রকৃত কর্মীর সংজ্ঞা এখানে স্পষ্ট না। এখানে স্রেফ প্রকৃত কর্মী নামক কাল্পনিক একটা টার্ম এনে তার করা অন্যায়ের দায়ভার এড়িয়ে যাওয়া হল। এটাকে বলে No True Scotsman ফ্যালাসি।
কেউ একজন একটা ভাল কথা বলল। আপনি বললেন, ও তো ঠিক মত কথাই বলতে পারে না, ওর কথা কে পাত্তা দেয়? দেখেন এখানে কিন্তু সুন্দর করে কথা বলার সাথে ঠিক কথা বলার কোনো সম্পর্ক নেই। আপনি একটা অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তি আক্রমণ করলেন। এটাকে বলে Ad Hominem ফ্যালাসি।
'যুক্তিফাঁদে ফড়িং' বইয়ে এমন ২৪টি লজিক্যাল ফ্যালাসি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, দেয়া হয়েছে সহজ প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। এই বইটা মোটেও একাডেমিক বইয়ের মত করে লেখা না। যুক্তির ভ্রান্তিগুলো সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য বইটা লেখা হয়েছে গল্পের মত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে হাসিব নামের এক তরুণ একটা গ্রামের স্কুলে পড়াতে যায় এক বছরের জন্য৷ সেখানকার শিক্ষার্থীদের সে পরিচয় করায় যুক্তি, যুক্তির ভ্রান্তি আর বিতর্কের সাথে - এমন একটা প্লটে সাজানো হয়েছে পুরো বইটা।
এই সময়টায় ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য যেমন সাধারণ মানুষ তাদের কথা ও কাজকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারছে সবার মাঝে, তেমনি ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের মনের যুক্তিহীন অন্ধকার দিকগুলোও। এটা একটা ভাল সময় যৌক্তিকভাবে সচেতন হওয়ার, যাতে আমরা যা দেখি যা শুনি, তাতেই গা ভাসিয়ে না দিই। যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে পারি জীবনের সব ক্ষেত্রেই। এই জন্যে হাসিব খুব সহজ আর প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের শেখায় প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেয়া, বক্তব্যকে কনটেক্সট ছাড়া নিজের সুবিধামত ব্যাখ্যা করা, হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়া, উল্টোপাল্টা দোহাই দেয়া, ইমোশনাল ম্যানিপুলেশনসহ নানানরকম যুক্তির ভ্রান্তি। শেখায়
- Hasty Generalization - Appeal To Hypocrisy - Straw Man Fallacy - False Analogy - Circular Reasoning - Post Hoc - Correlation-Causation - Slippery Slope - Appeal To Pity - Argument From Ignorance - Argument From Silence - Sunk Cost Fallacy - Bad Reasons Fallacy - Appeal to Probability
এবং শেষমেশ পরিচয় করায় বিতর্কের মজার জগতের সাথে। বাচ্চারা শেখে একটা ভুল ব্যাপার অনেকদিন ধরে চলে আসছে বলে সেটাই ঠিক - একে বলে Is Ought To ফ্যালাসি। সবাই কিছু একটা করে বলে সেটাই ঠিক - এটা হচ্ছে Bandwagon ফ্যালাসি। ফেসবুকে কখগ এর অনেক ফলোয়ার, কখগ এটা বলেছে, তার মানে এটাই সত্যি - এটা Appeal To Questionable Authority, কারো কথা অন্ধভাবে বিশ্বাস করার আগে দেখতে হবে আসলেই সে সেই ব্যাপারে বিশ্বাসযোগ্য কীনা, মতামত দেয়ার যোগ্য কীনা। সব মিলিয়ে এটা পড়তে ভাল লাগে এমন একটা বই, এবং যেকোনো বয়েসী মানুষের জন্য একটা প্রয়োজনীয় বই।
প্রাচীন সভ্যতা থেকে বর্তমান সভ্যতার মূলে রয়েছে দর্শন, বিজ্ঞান ও গণিত। এগুলো প্রতিষ্ঠার পিছনে মূল যে বিষয় তা হলো পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি। ভুল যুক্তি বা কুযুক্তিগুলো জ্ঞান-বিজ্ঞান বিস্তারের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাসে এমন কিছু লজিক্যাল ফ্যালাসিও রয়েছে, যেগুলো কিছুকালের জন্য থমকে দিয়েছিল সভ্যতার চাকা। তবে 'যুক্তিফাঁদে ফড়িং' বইটি ইতিহাসের বড়ো বড়ো ফ্যালাসি নিয়ে নয় বরং প্রাত্যহিক জীবনে যেসকল ভ্রান্তির মুখোমুখি হই তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বইটিতে যেসকল বিষয় ব্যাখ্যা করা হয়েছে তা হলো—
যুক্তি ও ভ্রান্তির পার্থক্য, কীভাবে মূল বিষয়কে বাদ দিয়ে ব্যক্তি আক্রমণ করা হয়, বিভিন্ন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কুযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে নিজেদের উদ্দেশ্য সফল করে নেয়, হুট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া কেন ভুল, যুক্তি দেখিয়ে সাধারণ ঘটনাকে বড়ো করা কিংবা বিপদজনক মনে করা কেন উচিত নয়, সকলে একমত হলেও কেন সেখানে ভুল থাকতে পারে, কেন প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়েও চিন্তা করতে হবে, কীভাবে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করা হয়, কেন ফ্যালাসি থাকলেও সবসময় সিদ্ধান্ত ভুল হয় না ইত্যাদি বিষয়ের চমৎকার ও সাবলীল ব্যাখ্যার উপস্থাপন হয়েছে বইটিতে।
বইটির মূল চরিত্র হলো হাসিব। যিনি সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেড়িয়েছে। কিছুদিন মাটির খুব কাছাকাছি থাকার জন্য শখের বসে শিক্ষক হিসেবে গাঁয়ের স্কুলে যোগ দেয় সে। পাঠদানের এক পর্যায়ে দেখলেন সেখানকার ছেলেমেয়েদের ফ্যালাসি সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা নেই অথচ গণিতবিজ্ঞান শিখতে হলে যুক্তি ও ভ্রান্তি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক। সেই থেকেই শুরু হয় ফ্যালাসি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা। তাদের ফড়িংয়ের মতো অস্থির মন যেন কুযুক্তির ফাঁদে পড়ে পথ না হারায়, এটাই তাঁর একান্ত প্রয়াস।
বইটির যে দিকগুলো আমার ভালো লেগেছে—
মজার ছলে শিক্ষাদান ও ছাত্র-শিক্ষকের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, যার ফলে শিক্ষার্থীদের আরো আগ্রহী হয়ে উঠা। যুক্তি ও ভ্রান্তি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান পৌঁছানোর মাধ্যমে সকলের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। এছাড়াও বর্ণনা কৌশল এত চমৎকার হয়েছে যে পড়ার সময় এতটুকুও বোরিং লাগেনি।
সমালোচনা: যদিও বইটি যুক্তি নিয়ে লেখা কিন্তু যুক্তি কী, কীভাবে যুক্তি এলো এই টপিকগুলোর উপস্থিতি নেই, যার জন্য কিছুটা অতৃপ্তি রয়েই গেল। এবং আরো কিছু ফ্যালাসি নিয়ে আলোচনা করা হলে বেশ ভালো লাগতো, মানে বইটা এত ভালো লেগেছে যে, পড়া শেষে মনে হয়েছে বইটা যেন ছোটো হয়ে গেল।
বইটি কাদের জন্য? ছোটো থেকে বড়ো যেকোনো শ্রেণি বা পেশার মানুষ বইটি সানন্দে পাঠ করতে পারবে। বইটি পাঠ করে কোনো পাঠকই আশাহত হবেন না বলে আমার বিশ্বাস। আর একটা কথা, চাইলে আজই আপনার বুকশেলফে বইটি নিয়ে আসতে পারেন।
চমক ভাই এক চমৎকার মানুষ। এধরনের বই আমাদের দেশে খুব একটা পাব্লিশ হয় না, সাধারণ পাব্লিকের বোধগম্য করে লিখা একটা বই। বিভিন্ন ধরনের ফ্যালাসির উদাহরণসহ ব্যাখ্যা দেয়া হইছে বইটাতে। যেখানে একজন শিক্ষক তার ছাত্র-ছাত্রীদের ফ্যালাসি সম্পর্কে শেখাচ্ছে সহজ ভাষায়। কিছু জায়গায় লেখক আরো ভালো শব্দের বা আবহের ব্যবহার করতে পারতো। আশা করি সময়ের সাথে তার লিখার ধার আরো শাণিত হবে।