বন্ধুদের সাথে ঈদের পরের দিন পাঞ্জাবি পরে আড্ডা দিচ্ছিলো রুমি। গার্গী শাড়ি পরে সেজেগুজে গিয়েছিলো বান্ধবীর বিয়েতে। কেন হুট করে একটা গাড়িতে করে দেশের একেবারে প্রান্তে যাত্রা শুরু করলো ওরা? ছেলেটার গ্লোভ কম্পার্টমেন্টে একটা সিগ-সয়্যার হ্যান্ডগান কেন, মেয়েটার সুদৃশ্য হ্যান্ডব্যাগে কেন পোরা একটা বেরেটা অটেমেটিক? আজকের দিনের আগে ওরা তো একজন আরেকজনকে চিনতোও না! কিসের মাঝে হাজির হলো ওরা? এ কী অদ্ভুত নাটক শুরু হয়েছে, যাতে লৌকিক আর অলৌকিক মেতে উঠেছে তুমুল এক যুদ্ধে? ওদিকে কঙ্গোয় চলছে ভিন্ন নাটক। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ দ্য কঙ্গোর মুক্তিকামী বাহিনীর মিশন ঠিকঠাক-ই চলছিল, যতদিন না ক্যাম্পে আতিথেয়তা নিলো দু’জন মার্কিন সাংবাদিক। নিউ ইয়র্ক টাইমসের অ্যাঞ্জেলা ও চার্লি। হুতু অধ্যুষিত এলাকা দিয়ে এসকর্ট করে ওদের নিয়ে যাওয়ার সময় বাঁধলো বিপত্তি। বেঁধে গেল অসম লড়াই। ক্যাম্প থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে, হুতুদের এলাকায় আটকা পড়লো ইরফান ও তার ভারতীয় বন্ধু প্যাটেল। এর মধ্যেই চললো আমেরিকান বান্ধবীর খোঁজ। শেষ পর্যন্ত অ্যাঞ্জেলাকে উদ্ধার করতে পারবে কি ওরা? নিজেরাও কি প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারবে লক্ষ্মীছাড়া দেশটা থেকে? কঙ্গোয় প্রবল সামরিক যুদ্ধ আর হুতু-তুতসিদের চিরায়ত দ্বন্দ্ব থেকে লৌকিক-অলৌকিকের দ্বন্দ্বে ঢুকে পড়ার যাত্রা তো কেবল হলো শুরু। এ এক অনবদ্য যুগলবন্দি!
লেখকদ্বয় দাবী করেছেন যে এই ধরনের লেখা আগে লেখা হয়নি।দুজনের দুটো আলাদা উপন্যাসিকা এক মলাটের ভিতর।যদি আলাদা মলাটের ভেতর এদের ছাপানো হতো পড়তে সমস্যা হতো না,কারণ তারা স্বাধীন স্বতন্ত্র চরিত্র ও প্লট সংবলিত দুটো উপন্যাস।কিন্তু শুধু একটা লোকেশন,একটা ডায়ালগ আছে যেটা একদম সূক্ষ্ম সুতায় বাঁধে লেখা দুটোকে,এবং কেউই লেখা সম্পূর্ণ করেনি,ক্লিফহ্যাঙ্গারে শেষ করেছে কারণ এটি ট্রিলজির প্রথম কিস্তি মাত্র। স্বীকার করতে হবে যে আমি অন্তত এধরণের লেখা আগে পড়িনি।কনসেপ্টের জন্য ১০/১০.আর তাদের যে অনলাইন প্রচারণা ছিলো সেটার জন্যও ১০/১০.এত সস্তা চটুল জিনিসের হাইপ তোলা স্থুল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজির ভীড়ে বই পড়তে উদ্ধুদ্ধ করে এধরণের প্রচারণা আসলেই ভাল্লাগে। এখন আসি বইয়ের কন্টেন্টের কথায়।প্রথম লেখাটি হচ্ছে নাবিলের "যুগল"। তার বাজিকর সিরিজের দ্য এজেন্সির সাথে অনেকে পরিচিত।এবারও সেখানকার কিছু চরিত্র ধার করা হয়েছে,দ্য এজেন্সির সাথে যোগ হয়েছে দ্য সার্ভিস,তাই বাজিকর সিরিজের ফ্যান কেউ থাকলে এটাকে স্পিন-অফ হিসাবে ধরে নিতে পারেন।দ্য সার্ভিসের ট্রেনিং এ উত্তীর্ণ হওয়া দুই এজেন্ট রুমি ও গার্গী,ছুটিতে আর লকডাউনে বাড়িতে আটকে পড়ে অকস্মাৎ একই মিশনে ডাক পায়,এর আগে কোনদিন তাদের দেখা হয়নি।গাড়িতে মিশনের উদ্দেশ্যে যেতে যেতে টুকটাক কথা,স্মৃতিচারণ,ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে তাদের পরিচয় আগাচ্ছে,মিশন নিয়ে হালকাঝাপসা কথা হচ্ছে,স্টোয়িসিজম নিয়ে তর্ক হচ্ছে।কিন্তু মিশনে পৌছানোর পর গার্গীর জন্য একটি চমক অপেক্ষা করছিলো যার জন্য সে মোটেই প্রস্তুত ছিলোনা। বইয়ের ভালো দিক-লেখকের অনেক বইতে একটা গলদ চোখে পড়ে,premise set করতে সে ওস্তাদ,পরিবেশের বর্ণনা খুবই অসাধারণ হয় (যার প্রমাণ তার লেটেস্ট সসেমিরা),কিন্তু ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টে ঘাটতি থেকে চায়,বিশেষ করে পার্শ্ব চরিত্র এবং নারী চরিত্রে মনোযোগ একটু কম পড়ে।তবে যুগলে আগের বইয়ের তুলনায় সেই দোষগুলা পুরোদমে কাটিয়ে উঠেছে।রুমি কোনো মাচো অ্যাজেন্ট নয়,বই পড়া,দার্শনিক,পরিশ্রমী সাধারণ ছেলে,তাই অনেক বেশি বাস্তব সে নায়ক হিসেবে।আর গার্গী চরিত্রের জন্য আমি তার লেখার সব দোষত্রুটি মাফ করে দিতে রাজি।অবশেষে তিনি ছাপ ফেলার মতো একটি নারী চরিত্র তৈরি করতে পেরেছেন!!(and i am proud of him for that,its not easy coming from a home of boys & studying in a boys school and then developing an insight on the struggles of women.took him a few years,but he finally got there.)
এবার আসি বইয়ের দ্বিতীয় ভাগে।কিশোর পাশা ইমনের লেখা "বন্দি"। বন্দির পটভূমি হলো ডেমোক্রেটিক রিপাব্লিক অফ কঙ্গো।আফ্রিকা দেখেই নড়েচড়ে মনোযোগ গেড়ে বসলাম।হুতো আর তুতসিদের মধ্যে দাঙ্গার নিউজ কাভার করতে তুতসিদের ক্যাম্পে গেছে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক অ্যাঞ্জেলা।কিন্তু তার সাংবাদিকের নাক অন্য কি জানি একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছে,কিন্তু ধরতে পারছেনা।নিউজ কাভার করার পর হুতু অধ্যুষিত এলাকা দিয়ে তাদের এসকর্ট করে নিয়ে যাওয়ার জন্য সাথে দেয়া হয় দুই বাদামী চামড়ার মার্সেনারি-ভারতের প্যাটেল ও বাংলাদেশের ইরফান।কিন্তু যাওয়ার সময় আচমকা অ্যাটাক এবং অ্যাঞ্জেলা অপহৃত হয়।এরপর প্যাটেল আর ইরফানের চরিত্রের আসল কাজ শুরু হয়- অ্যাঞ্জেলাকে উদ্ধার করা।কিন্তু সমস্যা হলো হুতুদের এলাকায় হুতুরাই তাকে ধরে নিয়ে গেছে-ব্যাপারটা এত জলের মধ্যে স্বচ্ছ নয়।একেকটা ট্রেইল ফলো করতে করতে ইরফান ও প্যাটেল আরো অনেকগুলো রাজনৈতিক প্যাঁচের মুখোমুখি হয়,দাঙ্গার আড়ালে আসলে অন্য এক খেলা চলছে দুই বিরোধী জেনারেল ও সরকারের মধ্যে। বইয়ের ভালো দিক--যারা কেপির বইয়ের সাথে পরিচিত তারা একটা জিনিস খেয়াল করবেন,তার লেখার শুরুটা হয় খাপছাড়া,অগোছালো,পাগলাটে,কিন্তু যত লেখা আগাতে থাকে আস্তে আস্তে সুতোর জট ছাড়তে থাকে আর শেষ হতে হতে সুতোগুলো রীলে পরিপাটি করে জড়ানো হয়ে যায়।এই ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই হয়েছে।আর গল্পের মধ্যে হলিউড ফ্লেভার আছে খুব,প্রত্যেকটা শুটআউট সিন মনে হয় যে বড় পর্দার জন্য লেখা (অবশ্য সেটা না হলে আর কিসের থ্রিলার লেখক)।আর পার্শ্বচরিত্রে মনোযোগ দেয়াটা সবসময়ই আমার পছন্দের,তাই যদিও তার নায়করা আকর্ষণীয় পুরুষালী ধরণের,আমার প্রিয় চরিত্র এখানে সামান্য এক getaway driver সান্তিয়াগো,কারণ আমার মনে হয়েছে সান্তিয়াগোর দৃশ্যগুলো ছাড়া বইয়ের শেষের দিকটা নিরামিষ হয়ে যেতো।আর সিরিয়াস দৃশ্যে কমিক্যাল কথাবার্তা থ্রিলারের আমেজ মোটেও কাটায় না,বরং ঘনীভূত করে।
অনেক কথা বলা হয়ে গেলো,তবে এখানে তো একটা নয়,দুটো বই।তাই এতগুলো কথা খরচ করাই যায়।অপেক্ষায় থাকলাম দ্বিতীয় ও তৃতীয় কিস্তির,আশা করি সেগুলোও হাইপটা ধরে রাখতে পারবে।
এই সময়ের রহস্য সাহিত্যের তরুণ দুই তুর্কী, যারা এই জনরায় রাজত্ব করবে আগামী কয়েক দশক, এক হয়েছে যুগলবন্দীতে। নাবিল মুহতাসিমের যুগল হচ্ছে এস্পিওনাজ আর অকাল্ট ফিকশনের দুর্দান্ত ককটেল। আর কেপির বন্দি হচ্ছে ননস্টপ মিলিটারি অ্যাকশন। ভালো না লাগার কোন কারণ নেই। এই বইয়ের সবচেয়ে বড় ব্যাপার, কেপির পাঠকেরা পরিচিত হবে নাবিল মুহতাসিমের সাথে আর নাবিলের পাঠকেরা চিনবেন কেপি নামের পাগলাটে/ক্ষ্যাপা এক লেখককে।
নাবিল মুহতাসিম ও কিশোর পাশা ইমনের দুটো নভেলা যুগল ও বন্দি নিয়ে যুগলবন্দি বইটা। প্রথমে নাবিল মুহতাসিমের যুগল নভেলার কথা বলি। সুলেখক নাবিল মুহতাসিমের ডিটেকটিভ ঘরনার গল্প সসেমিরা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি রিসেন্টলি। আবারও যুগলেও মুগ্ধ হলাম। এজেন্সি নামক বাহিনীর একজন পুরুষ ও মহিলা দুজন মিলে নামে একটা মিশনে। মিশনটা রূপ নেয় তদন্তে। এক রাতের কাহিনী যার বেশিরভাগ-ই গাড়ির মধ্যে। এত ছোট স্পেসেও দারুণ গল্প বলেছেন লেখক। লেখকের লেখনশৈলীই উপভোগ্য। যেকোনো গল্প রসিয়ে বলতে পারেন। ডিটেক্টিভ গল্পের মাঝেও শেষের দিকে ফ্যান্টাসির ছাপ দারুণভাবে এনেছেন। যুগল নভেলাটা সবমিলিয়ে বেশ উপভোগ্য লেগেছে। সিরিয়াল কিলিং নিয়ে লেখা যাদের ভালো লাগে তাদের জন্য মাস্ট রিড।
এবার বন্দি নভেলাটা নিয়ে বলি। কঙ্গের তিন গ্রুপের মধ্যকার যুদ্ধে আটকা পড়ে আমেরিকান নারী সাংবাদিক। তাকে রক্ষা করতে নামে দুজন ভাড়াটে সৈনিক ইরফান ও প্যাটেল। বন্দি হচ্ছে সাসপেন্স নভেলা। কঙ্গের যুদ্ধ, বন্দীদশা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া সবমিলিয়ে শেষ পর্যন্ত সাসপেন্স অক্ষুন্ন ছিল। একটানে পড়ে ফেলার মত। শেষে দুটো নভেলার মধ্যে সূক্ষ্ম একটা সুতা টানা হয়েছে।
থ্রিলার পাঠকরা পড়ে ফেলুন যুগল বন্দি। উপন্যাসিকা দুটো ভালো লাগবে।
যুগল। রুমি এবং গার্গি। অবশ্য প্রচলিত যে অর্থে যুগল অথবা কাপল বুঝায় তা মোটেই নন এই দু'জন। ঈদের তিনদিনের ছুটির পাঞ্জাবি খুলার আগেই রুমিকে এবং বান্ধবীর বিয়ের আসর থেকে গার্গিকে বেরিয়ে আসতে হয়। প্রেমের টানে নয়, বরঞ্চ 'দ্য এজেন্সি' এর ট্রেইনিং প্রাপ্ত এ��েন্ট হিসেবে যার যার প্রথম অভিযানে একত্রে তাঁরা চলে যান বাংলাদেশের অপর প্রান্তে।
এই নভেলা বা উপন্যাসিকাতে এশিয়াজুড়ে নারকীয় ভাবে ঘটে যাওয়া সিরিয়াল কিলিং দমাতে দ্য এজেন্সির রুকি দুই এজেন্ট কে কেন পাঠানো হল? সাধারণত সিরিয়াল কিলারদের ধরতে ডিটেক্টিভরা ছুটেন। এস্পিওনাজ সংস্থা কেন? তাও আবার বাংলাদেশের সেরা দ্য এজেন্সির! কাহিনীর বেশিরভাগ গাড়িতে দুই এজেন্টের কথোপকথন এবং ফ্ল্যাশব্যাকে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু দু'জন ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষের এই কথাবার্তা পাঠক বেশি পছন্দ করতে পারেন। তাছাড়া নাবিল মুহতাসিমের লেখনীতে হিউমারের পাশাপাশি সন্তপর্নে এমন অন্ধকার জগতে রুমি এবং গার্গিকে পা রাখতে হবে যেখানে অলৌকিক এবং লৌকিক মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
নাবিল মুহতাসিম আমার পছন্দের লেখকদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর স্বাপদ সনের গ্রাফিক নভেল অ্যাডাপ্টেশন বহুদিন মনে থাকবে। বাজিকর ট্রিলজি মনে হয় আমি কখনো ভুলবো না। এই আখ্যানের মধ্য দিয়ে ভ্রমণ করতে গিয়ে বারবার আহাদ, বাবু, শমশের, মাস্টার সিফাতের কথা মনে পড়ে যায়। নাবিল নিজস্ব স্টাইলে হিউমারের পাশাপাশি দুর্দান্ত একশনের চিত্রায়ন করে থাকেন। সাথে থাকে তাঁর সার্কাজম এবং ডার্ক এন্ড গ্রিটি লেখালেখির সমন্বয়। সকল বাধা অতিক্রম করে অনভিজ্ঞ রুমি ও গার্গি যুগলের প্রথম অভিযানেই বাজিমাত করতে হবে।
বন্দি। রুয়ান্ডার যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে কঙ্গোতে। ঝামেলা প্রকট হল যখন মার্কিন দুই সাংবাদিককে নিরাপদে পৌছে দেয়ার দায়িত্ব পেলেন মার্সেনারি ইরফান এবং প্যাটেল। হুতু এবং তুতসি জাতির মধ্যকার ভয়ানক লড়াইয়ের মাঝে বাংলাদেশের ইরফান এবং ভারতের প্যাটেলকে নেমে পড়তে হচ্ছে এক উদ্ধার অভিযানে। বাঙালির আবেগ তো একটু বেশি। এই দু'জন কয়েকটি আর্মি ফোর্সের সাথে গুরুতর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। যুদ্ধের সময়ের বিভিন্ন মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি ইরফান ও প্যাটেলের শুধুমাত্র বন্ধুত্ব এবং নীতির কারণে এতবড় ঝুঁকি নেয়ার পর টিকে থাকার বা ঐ বিধ্বস্ত দেশ থেকে পালানোর সুযোগ কতটুকু?
কিশোর পাশা ইমন আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন লেখক। রেসকিউ মিশন একদম যেন চোখের সামনে উন্মোচিত করে দিলেন নভেলাটির মাধ্যমে এই গল্পকথক। বাংলাদেশে সমসাময়িক লেখালেখির জগতে একশন সিনগুলো অনিন্দ্য সুন্দর চিত্রায়নের করে ফুটিয়ে তুলতে পারা লেখকদের মাঝে কেপি লিস্টের উপরের দিকে থাকার কথা। তাছাড়া কেপির গল্পে আকস্মিক উইট চমৎকার। ইরফান সিরিজ আমি পড়িনি। তবে এই নভেলাটি ছিলো মার্সেনারি / আর্মি একশনে ভরপুর।
নাবিল এবং কেপি দু'জনেরই দাবী যে এই বইটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য কর্ম। কারণ আপাত দৃষ্টিতে নভেলা দুটি ভিন্ন মনে হলেও কোথায় জানি এই দুটির মধ্যে এক সুক্ষ্ম সংযোগ আছে। ইরফান কি বাজিকর বিশ্বে কোন ক্রশওভারের মাধ্যমে প্রবেশ করবেন? নাকি বাজিকর বিশ্বের নবীন কেউ ইরফানের বিশ্বে হাজির হবেন। দু'জন লেখকই এরকম আরো দুইটি বই নিয়ে হাজির হওয়ার কথা। হয়তো পরবর্তি বইগুলোতে বিষয়টা আরো পরিষ্কার হবে। ইরফান ডিটেক্টিভ আবার 'দ্য এজেন্সি' এর এসপিওনাজ এজেন্টরাও ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন দ্বন্দ্বে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় জড়িয়ে পড়েন।
এই সময়ের দু'জন সেরা লেখিয়ের একশন, অ্যাডভেঞ্চার, সাসপেন্সে ভর্তি একধরণের পরাবাস্তবতার অনুভূতি দেয়া গল্পকথনের মাধ্যমে সমান্তরালে দুটি নভেলার হয়ে গেছে যুগলবন্দি।
❝Short stories are tiny windows into other worlds and other minds and other dreams. They are journeys you can make to the far side of the universe and still be back in time for dinner.❞ ― Neil Gaiman - ❝যুগলবন্দি❞ - রুমী, বিশেষ এক গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বে থাকা এক যুবক ইদের পরদিন দায়িত্ব পায় তার নতুন সহকর্মীকে একটি মিশনে নিয়ে যাওয়ার। গার্গী নামের সেই সহকর্মীকে নিয়ে রওনা দেয়ার পরে কথায় কথায় উঠে আসে তাদের অতীত জীবনের নানা ঘটনা। কিন্তু তারা প্রাথমিকভাবে তাদের মিশনকে যে রকমের মনে করেছিলো ঘটনাস্থলে গেলে সেখানে ঘটনা সম্পূর্ণ অন্যদিকে মোড় নেয়। - এদিকে কঙ্গো নামের দেশটিতে চলছে হুতু-তুতসি জাতির ভেতরে এক সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ। এর ভেতরে এসে ফেঁসে যায় মার্কিন সাংবাদিক অ্যাঞ্জেলা। এদিকে তাদের বিপদে হাত বাড়ায় মার্সেনারি ইরফান এবং প্যাটেল। ঘটনাক্রমে তারা জানতে পারে দেশটিকে ঘিরে এক ভয়াবহ চক্রান্ত।
এখন রুমী আর গার্গী তাদের মিশন সফল করতে গিয়ে কোন ধরণের বিপদে পড়ে? ইরফান, প্যাটেল আর অ্যাঞ্জেলার পেছনে কেন কঙ্গোর একটি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী উঠেপড়ে লাগে? তা জানার জন্য পড়তে হবে লেখক নাবিল মুহতাসিম এবং কিশোর পাশা ইমন এর কন্সপিরেসি/অ্যাকশন থ্রিলার ধারার দুইটি নভেলা মিলিয়ে লেখা ❝যুগলবন্দি❞ বইটি। - ❝যুগলবন্দি❞ বইটি মূলত লেখক নাবিল মুহতাসিম এবং কিশোর পাশা ইমন এর সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের দুইটি নভেলার সমন্বয়। এর ভেতরে যুগল গল্পটি লিখেছেন লেখক নাবিল মুহতাসিম এবং বন্দি গল্পটি লিখেছেন কিশোর পাশা ইমন। তাদের লেখনশৈলী সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা থাকায় যেধরণের গল্প পড়তে চাচ্ছিলাম ঠিক সে ধরণের গল্পই বলা হয়েছে এতে। যুগল বইতে খুবই ধীরে ধীরে সাসপেন্স ক্রিয়েট করা হয়েছে, শেষে গিয়ে অবশ্য সেই সাসপেন্সের ফল দারুণভাবে পাওয়া যায়। সেদিক থেকে বন্দি গল্পটা প্রথম থেকেই দুরন্ত গতির, অ্যাকশন প্যাকড একটি থ্রিলার। - ❝যুগলবন্দি❞ বইয়ের যুগল অংশের চরিত্রগুলোর ভেতরে রুমী আর গার্গী দুই চরিত্রই নিজ নিজ জায়গায় সেরা। ছোট নভেলার ভেতরেও ভালোভাবে ফুটে উঠেছে এই দুই চরিত্র। সেদিক থেকে বন্দী বইয়ের প্রোটাগোনিস্ট ইরফান পূর্বপরিচিতই ছিল বলা যায়। এই গল্পের কয়েকটি চরিত্রকে কেন যেন একটু রিপিটেটিভ মনে হলো। যুগল বইয়ের যে দিকটা সবথেকে ভালো লেগেছে সেটা হচ্ছে গল্পের সাথে নানা ধরনের কাল্টের সংযোগ। আর বন্দি বইয়ের আফ্রিকার দেশটির রাজনৈতিক অবস্থা এবং অ্যাকশন সিকোয়েন্স স্ট্যান্ড আউট ছিলো। - ❝যুগলবন্দি❞ বইয়ের বাহ্যিক প্রোডাকশন বেশ ভালোই ছিল। প্রচ্ছদটি গল্পের হিসেবে অবশ্য একটু বেশিই মিনিমাল লাগলো। বইতে বেশ কিছু টাইপিং এরর দেখলাম, একটু ভালোভাবে সম্পাদনা করলেই সামনের সংস্করণে আশা করি আর থাকবে না। - এক কথায়, এক মলাটে দুই ধাঁচের থ্রিলার পড়ার স্বাদ পাওয়া যাবে ❝যুগলবন্দি❞ বইটিতে। তাই যারা এ ধাঁচের থ্রিলার পড়তে আগ্রহী তারা বইটি পড়তে পারেন। লেখক নাবিল মুহতাসিম এবং কিশোর পাশা ইমন এর লেখা যাদের ভালো লাগে তাদের জন্য বইটি মাস্টরিড টাইপের একটি বই।যেহেতু ট্রিলজি হিসেবে বইয়ের দুটো ঘটনার সুত্রগুলো একসাথে মিলবে তাই এর পরবর্তী খন্ডগুলো পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
❝ওর দোষ নেই। এমন পরিস্থিতিতে তো প্রথম নয় ও—এই যে বিবস্ত্র হয়ে পড়ে থাকা—নিজের সবচেয়ে দামী সম্পদ অন্যের হাতে তুলে দেবার অপেক্ষায় স্রেফ শুয়ে শুয়ে চেয়ে দেখা, এ তো ওর পুরোনো অভিজ্ঞতা। হায় রে, ট্রমার বাচ্চা ট্রমা! চামড়ার দাগের মতো শুকিয়ে গিয়ে অভিজ্ঞতা বাড়ায় না মনের ক্ষত, দগদগে হয়ে থেকে সারা জীবনের জন্য অথর্ব করে রাখে মানুষকে।❞
- ‘ইটস ওকে—ইটস ওকে—ইটস ওকে—’ রুমির বারবার বলা কথাটাকে যদি গ্রিক মিথের আর্কিমিডিসের ‘ইউরেকা’-এ�� সাথে বৈসাদৃশ্য খুঁজতে বসেন; তবে হতাশ হওয়ার আশংকা শতভাগ। কারণ আবিষ্কার আর নিজেকে বলবান হওয়ার নীরব জ্ঞান দানের মধ্যে তফাতটা বিস্তর। ‘বিভং’ উপন্যাসেও ‘বিভং, বিভং’ করে জপতে থাকা রুপুর সাথে রুমির ‘ইটস ওকে’ হয়তো কিঞ্চিৎ মেলানো সম্ভব। তবুও রুমির এই ‘ইটস ওকে’ বলার পেছনে গূঢ় এক রহস্য লুকিয়ে আছে। তাই তো উপন্যাসের শেষে এসে বারবার ওই একই বাক্য আওরে যাচ্ছে সে। কিন্তু কী সেই রহস্য?
❛যুগল❜ উপন্যাসের শুরুটা ঠিক যে লৌকিক সমীকরণের ওপর ভর করে হয়েছিল; শেষটা আর সেইভাবে হয়নি। ইদের পরের দিনের ঘটনা। বন্ধুদের সাথে পাঞ্জাবি পরে আড্ডা দিচ্ছিল রুমি। গার্গী শাড়ি পরে সেজেগুজে গিয়েছিল বান্ধবীর বিয়েতে। হুট করে কেন তারা দু'জন তেঁতুলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো; সেই গল্প লুকিয়ে আছে এই ❛যুগল❜ উপন্যাসিকার অন্তরালে। লং ড্রাইভের কথোপকথনে উঠে আসে রুমির এজেন্সিতে কাটানো দিনগুলো আর করোনায় গৃহবন্দির লম্বা সময়ের কথা। গার্গী প্রথমে সাড়া না দিলেও, অন্তর্দর্শনে ঠিকই নিজের অতীতের স্মৃতিগুলো নাড়াচাড়া করতে থাকে সে। মেলাতে থাকে রুমির স্টোয়িসিজমের থিওরির সাথে নিজের করা কাজগুলোর বর্ণনা। স্টোয়িক রুমি আর অতীতের ক্ষত পুষে রাখা গার্গীর এই যাত্রা যে মুহূর্তে পালটে যাবে; ভাবেনি দু’জনের একজনও।
পুরো নভেলাতে কয়েকটি চরিত্রের পরিচিত দেখানো হলেও মূলে ছিল রুমি আর গার্গী। অতীত কাহিনির সমন্বয়ে সমাপ্তিতে দুটো চরিত্রের অকস্মাৎ উপস্থিতি পুরো নভেলার ভোল পালটে দেয়। সহজ এক লৌকিক মিশন কখন যে অলৌকিকতার নাগপাশে বন্দি হয়ে যায়; তা লেখকের গল্পে বলার ঢঙে না ডুবলে আন্দাজ করা কঠিন। সাধারণ একটা কাহিনির পরিণতি যে লেখক এইভাবে দিবেন তা একেবারেই অকল্পনীয়। গল্পের কারণে কিছু তথ্য এবং পারিপার্শ্বিক আবহের সূক্ষ্ম বর্ণনা পুরো নভেলাকে দারুণ প্রভাবিত করেছে। শুরুটা ধীরগতির আর গতানুগতিক হলেও শেষটা দ্রুতগতির এবং দুর্দান্ত। ❛যুগল❜ নামের সার্থক রসায়ন লেখক দারুণভাবে দিয়েছেন।
──────
❛বন্দি❜
‘বন্দিত্বে খোলে যুক্তি আর যুক্তি দিয়ে মুক্তি’ —এই উক্তি পড়ে নিশ্চয় কোনো মনীষীর নাম খুঁজে বেড়াচ্ছেন? লাভ নেই। এই উক্তি আমার আর সেটার ধারণা এসেছে ❛বন্দি❜ নভেলা শেষ করে। কেপি ইমনের ‘ইরফান সিরিজ’ যারা পড়েছেন তাদের জন্য সুখবর। ইরফানকে লেখক এইবার টেনে নিয়ে এসেছেন সূদুর কঙ্গোতে। যেখানে হুতু-তুতসিদের মধ্যে চিরায়ত দ্বন্দ্বযুদ্ধ লেগে আছে বেশ কিছু বছর ধরে। ইরফান এই মিশনে একা না। হুতুদের হয়ে মার্সেনারি হিসেবে কাজ করা ভারতীয় বন্ধু প্যাটেলও তার সাথে আছে। দু’জন মিলে এই মিশনের সাথে জড়িয়ে পড়ে ওতপ্রোতভাবে; আর সেটার একমাত্র কারণ নিউ ইয়র্ক টাইম্সের সাংবাদিক অ্যাঞ্জেলার অপহরণ। যা করেছে তুতসি প্রধান। কিন্তু এই কাজ কি শুধু প্রতিশোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না-কি এর পেছনে আছে বড়ো কোনো ষড়যন্ত্র?
কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে ঠিকই সাপের দেখা পেয়েছে ইরফান আর প্যাটেল। অতএব তাদের এখন একটাই উদ্দেশ্যে—যে ভাবেই হোক অ্যাঞ্জেলাকে উদ্ধার করে আমেরিকায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। তবে কাজটা মুখে বলা যতটা সহজ করা ততটাই কঠিন। তাও আবার কঙ্গোর তিন জেনারেলের নাকের ডগা দিয়ে পার হওয়া। কিন্তু ইরফান পিছিয়ে যাওয়ার ছোকরা না। অগত্যা প্যাটেলকেও ইরফানের সঙ্গী হতে হলো। দু’জন মিলে নেমে গেল এক অসম সাপে নেউলের লড়াইয়ে।
পেজ টার্নার গল্পে ছড়ি ঘোরাতে ওস্তাদ লেখন কেপি ইমন। এই নভেলটা সেটা আরও একবার প্রমাণ করে দিলো। শুরু থেকে গল্পটা দ্রুতগতিতে এগিয়েছে। যখন যেখানে গল্পের মোড় নেওয়া প্রয়োজন সেটা লেখক দক্ষ হাতে সামাল দিয়েছে। ❛বন্দি❜ পুরোপুরি অ্যাকশন প্যাক থ্রিলার। যেখানে মার্সেনারি হয়ে একটা দেশের কুচক্রী মহলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গভীরতা আর বিশ্বের চোখে কালো পর্দার আড়ালে করা কাজের নিদারুণ সত্য উঠে এসেছে। সাবলীল বর্ণনাভঙ্গি আর শালীন-অশালীন সংলাপে ভরপুর নভেলা ❛বন্দি❜। স্বল্প সময়ের মধ্যে আঁটোসাটো এক কাহিনির মধ্যে ডুবে থাকতে চাইলে ❛বন্দি❜ আপনার জন্য। নামের সাথে গল্পের প্রেক্ষাপটেরও দারুণ মিল লক্ষণীয়। সব মিলিয়ে ভালো। ওহ হ্যাঁ, এমন নভেলাতে ফাইটিং লজিক কিছুটা কম খোঁজা ভালো। হিরোয়িক কাজকারবার উক্ত উপন্যাসিকায় রয়েছে; তবে সেটা অস্বীকার্য করলেও চলে।
──────
❛যুগলবন্দি❜
পুরো নভেলাটি বিচার করলে দুটো ভিন্ন আঙ্গিকের গল্পের দেখা মিলে। প্রথমটার সাথে যদিও দ্বিতীয় গল্পের কোনো মিল নেই শুধুমাত্র নামের সামঞ্জস্য ব্যতীত। আগামীতে হয়তো আলাদা দুটো কাহিনির চরিত্র এক সুতোয় এসে মিলে যাওয়ার শক্তপোক্ত কারণ আছে। আর এই কারণটি হলো, ❛যুগল❜-এ রুমি-গার্গী এজেন্সির হয়ে কাজ করা এবং ❛বন্দি❜-তে ইরফান-প্যাটেল মার্সেনারি হয়ে দেশের উদ্দেশ্যে প্রত্যাবর্তন করা। তারা কেন মার্সেনারির কাজ ফেলে দেশে ফিরবে সেই গল্প তো বই পড়ে জেনে নিবেন। আশা করছি আগামীতে এই দুই কাহিনির চার চরিত্রের ক্রসওভার দারুণ কোনো সিকোয়েন্সের মধ্যে দিয়ে হবে।
দুটো কাহিনির গল্প যেমন দু’রকম তেমনটা লিখনপদ্ধতিও। লেখকদ্বয় নিজেদের স্বতন্ত্রতা একেবারে আপন বাচ্চা কোলে নেওয়ার মতো আগলে রেখেছেন। নাম না দেখেও গল্পগুলো পড়লে পার্থক্য সহজে বোঝা যায়। নাবিল ভাইয়ের পারিপার্শ্বিক আবহের বিস্তারিত বর্ণনা সহজে চোখে পড়ার মতো। অন্য দিকে কেপি ভাইয়ের মারকাট ভঙ্গিমা। অবশ্যই কাহিনির ক্ষেত্রে।
তুলনার দিকে আমি কখনোই যাব না। দুটো গল্প আমার দু’রকম ভালো লেগেছে। তবে নিজের পছন্দের দিকটা উল্লেখ করলে ❛যুগল❜ এগিয়ে থাকবে কাহিনির গভীরতার জন্য। তথ্যের মিশেলে লেখা আবার বরাবর-ই পছন্দের। এটা সম্পূর্ণ নিজস্ব মতামত। কারও হয়তো দ্বিতীয় গল্পটা বেশি পছন্দ হবে মারদাঙ্গা অ্যাকশনের কারণে। যাহোক, ❛যুগলবন্দি❜ হালকা চালের হলেও তাৎপর্যপূর্ণ উপন্যাস বটে।
বইয়ে বানান বিভ্রাট রয়েছে। প্রথম নভেলায় কিছু জায়গায় সম্পাদনার অভাব লক্ষণীয় যা দ্বিতীয় গল্পে গরহাজির। এ-ছাড়া প্রচ্ছদ সাদামাটা। প্রোডাকশন দাম অনুযায়ী ঠিকঠাক। কাল্টের করণীয় কার্যাবলী আর যুদ্ধের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা রহস্যের হদিস পেতে ❛যুগলবন্দি❜ অবশ্যই পাঠ্য।
≣∣≣ বই : যুগলবন্দি • নাবিল মুহতাসিম ও কেপি ইমন ≣∣≣ জনরা : মিস্ট্রি অ্যাকশন থ্রিলার ≣∣≣ প্রথম প্রকাশ : এপ্রিল ২০২১ ≣∣≣ প্রচ্ছদ : পার্থ প্রতীম দাস ≣∣≣ প্রকাশনা : বাতিঘর প্রকাশনী ≣∣≣ মুদ্রিত মূল্য : ২২০ টাকা মাত্র ≣∣≣ পৃষ্ঠা : ১৬০
লেখক নাবিল মুহতাসিম এবং কিশোর পাশা ইমনের সম্মিলিত লেখায় একটা ট্রিলজি সিরিজ হতে যাচ্ছে। এই খবর হয়তো অনেকেই পেয়ে গেছেন। প্রথম বই 'যুগলবন্দি' পড়া হয়েছে আমার। বইটাতে দুই লেখকের দুটি নভেলা আছে। মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৬০। দুটি নভেলা শুরুর অংশেই লেখকদ্বয় আলাদা আলাদা বক্তব্যে প্ল্যানটা ব্যক্ত করেছেন। যুগল অংশটি লিখেছেন আমার পছন্দের লেখক নাবিল মুহতাসিম। মূল গল্পটা বাংলাদেশী দুই ট্রেইন্ড স্পাই/স্পেশাল অপস কে নিয়ে। ঈদের পরদিন তাদের একটা আন্ডারকভার মিশনে যেতে হয়। সেখানে যাত্রাপথে দুই ক্যারেক্টারের ব্যকগ্রাউন্ড স্টোরি বের হয়ে আসে। আর শেষ অংশটায় একটা একশন দৃশ্যের সাথে এই বইয়ের গোড়ার কাহিনী এক কাল্টের বিবরণী তুলে ধরে শেষ হয়। অন্যদিকে বন্দি অংশটায় কেপি ইমন দারুণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন কঙ্গোতে গৃহযুদ্��ের দৃশ্যে। হুতু-তুতসিদের চিরায়ত দ্বন্দের মাঝে দুই এশিয়ান মার্সেনারি কর্তৃক দুই আমেরিকান সাংবাদিক রেস্কিউ মিশন সাথে যুদ্ধের ভেতরকার রাজনীতির চিত্র নিয়ে ছোট নভেলাটা বেশ দারুণ লেগেছে আমার।
দুটি কাহিনীর আপাতদৃষ্টিতে কোনো যোগাযোগ নেই। তবে খুবই সুক্ষ ইঙ্গিত দিয়ে বোঝানো আছে, পরের বইতে খেলা হবে! আমি মূলত মাল্টিভার্স, এন্থোলজি, ক্যামিও, ক্রসওভার ব্যাপারগুলোর ফ্যান বরাবরই। আমি চাই দেশীয় কাজে এগুলো আসুক। দুই প্রতিভাধর লেখক মিলে জেনে বুঝে কাজটা করছেন এটা আমার জন্য বেশ আনন্দের।
বইটাতে নাবিল মুহতাসিমের অংশে মূল ঘটনার গভীরতা বেশি ছিলো, অন্যদিকে কেপি ইমনের অংশে ছিলো ভিন্ন দুনিয়া জোড়া লাগানোর দায়িত্ব। আমার বেশি ভালো লেগেছে বন্দি অংশটা। নাবিল মুহতাসিমের এই বইতে গল্পটা পড়তে গিয়ে কিছু ব্যাপার খেয়াল করলাম। তিনি লেখার মাঝে কোনো বিশেষ শব্দ/টপিক নিয়ে কিছুটা মুদ্রাদোষে দুষ্ট! আর একটা সংলাপের মাধ্যমে বলা ছোট ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরিটা পড়তে বেশ বেগ পেতে হয়েছে ৪০পৃষ্ঠা অব্দি। একটু বেশিই আনুষঙ্গিক বর্ণণা সংলাপের মাঝে। সিরিজটা নিয়ে বেশ আশাবাদী আমি। আশা করছি ভালো কিছু পেতে যাচ্ছি!
সত্যি বলতে আমার কাছে দুটো ষ্ট্যান্ডঅ্যালোন এভারেজ নভেলা ছাড়া আলাদা কিছু মনে হয় নি এই বই। সিরিজের আরো দুটো বই বের হবে তখন হয়তো কানেকশন বোঝা যাবে, কিন্তু শুরুতেই লেখকদ্বয় "বাংলা ভাষায় এই প্রথম একাধিক লেখকের একই কাহিনী নিয়ে বই" নিয়ে এমন হাইপ না তুললেও পারতেন। আর এই কনসেপ্টটাও ইউনিক না আমার জানামতে, ২০১০-১১ এর দিকে ৩ ব্লগার লেখক ( হাফিজুর রহমান রিক ওরফে রিয়েল ডেমন, নিরব, আরেকজন সম্ভবত একুয়া রেজিয়া) মিলে কফিশপ নামের একটা গল্প লিখেছিলেন, এক একটা ছোটগল্প এক একজনের লেখা, সবগুলো মিলে বড় একটা কাহিনী। বাংলাদেশ থেকে সুদূর আমেরিকায় বয়ে নিয়ে আসা বইয়ের প্রতি এক্সপেকটেশন আরো বেশি ছিল।
বন্দি গল্পটায় পুরোদস্তুর মাসুদ রানার ভাইব। যদিও ইরফানকে চিনি আগে থেকেই। শেষে এসে সুতো টেনে দিয়েছেন আগের ৫ট গল্পের সঙ্গে। যদিও লৌকিক-অলৌকিকের কথা আছে ফ্ল্যাপে, এ গল্পে অলৌকিক কিছুর ছাপ নেই।
যুগল ছাপিয়ে গেছে বন্দিকে। দুর্দান্ত এক চরিত্র গার্গী। অসাধারণ। গল্পটাও চমৎকার।
যাই হোক, এ এক অন্যরকম যাত্রা। ছয় পর্বের গল্পের দুই পর্ব পড়া হলো। এবার বাকিগুলোর জন্য অপেক্ষা।
নাবিল মুহতাসিমের ‘যুগল’ এবং কিশোর পাশা ইমনের ‘বন্দি’ নামক দুটো আপাত সম্পর্কহীন নোভেলা নিয়ে এই ‘উপন্যাস’। আরো দুইটা বই আসবে ভবিষ্যতে। তখন নাকি বোঝা যাবে এটা উপন্যাস কেন হলো। এখানে আমি নোভেলা সংকলন হিসেবে ট্রিট করবো বইটাকে।
যুগল অংশটা ভালো ছিল। চরিত্রগুলোও বেশ মনে দাগ কাটার মতন। গার্গীকে (নারী চরিত্র) নিয়ে আরেকটু লেখা পেলে আরও চমৎকার লাগতো।
যাহোক, ‘বন্দি’ অংশ নিয়ে আমার কিছু প্রশ্ন আছে। লেখক বলেছেন বন্দির টাইমলাইন ইমিডিয়েটলি ইরফান সিরিজের পঞ্চম গল্পের পর থেকে শুরু। তাহলে কি ‘মিথস্ক্রিয়া’ (লেখকের প্রথম উপন্যাস, ওখানেও ইরফান চরিত্র ছিল।) বন্দি-র পরের সময়কালে ঘটেছিল? যদি তাই হয়, তবে প্যাটেল কেন আয়ুব বাচ্চুকে উদ্দেশ্য করে বললো যে, “হি ওয়াজ আ লিজেন্ড, হি ট্রুলি ওয়াজ”? এবি তো তখনও জীবিত ছিল। ক্লিয়ার না এই জিনিসটা। অবশ্য সেই ২০১৬ র পরে আর মিথস্ক্রিয়া পড়ে দেখা হয়নি। আমার স্মৃতি অনেক কিছু মিস করেও যেতে পারে।
আবার শেষে একজন চরিত্রের আচরণ বেশ খাপছাড়া লেগেছে।
[স্পয়লার এলার্ট] কিডন্যাপড, রেইপড, নিজের সামনে কলিগকে মরতে দেখা মেয়ে হুট করে কেন আরেকজনকে চুমু খাইতে যাবে? ট্রমাটাইজড হলে মানুষ অনেক কিছুই করে, বাট কেবলমাত্র রেইপড হওয়া রমণী আরেক পুরুষের গলায় জিহ্বা ঠেলে দেবার চেষ্টায় লেগে আছে, এটা বেশ দৃষ্টিকটু। আমার কাছে মনে হয়েছে অন্তত। অবশ্য মানব মনস্তত্ত্ব বড়ই অদ্ভুত। অসম্ভব কিছুই না।
অভারল ভালো লেগেছে। নোভেলা সংকলন হিসেবে বই খানা চমৎকার। ভবিষ্যতে সব সুতো এক হলে বোঝা যাবে উপন্যাস হিসাবে বইটা কেমন।
কাহিনী সংক্ষেপঃ রুমি আর গার্গী। দ্যা সার্ভিস এর ট্রেনিংপ্রাপ্ত দুই এজেন্ট। কেউ কাউকে চেনেনা। হটাৎ করে তাদের দুইজনকে মিশনএ পাঠান হল রংপুর থেকে সুদুর সৈয়দপুর বাংলাবান্ধা বর্ডার এর কাছে এক বাংলোয়। কি আছে সেখানে? মিশন টাই বা কি?আর গার্গীর গম্ভীরতা এবং রুমির হটাৎ করে গার্গীর প্রতি আকর্ষণ কি রহস্য এর পিছনে? গল্পটি কেন্দ্রীভূত হয়েছে একটি গাড়িতে দুই যুগলের যাত্রায় তদের কথোপকথন আর অতীত রোমন্থনে। সবশেষে রয়েছে গন্তব্যে পৌঁছে সব রহস্যের উন্মোচন।
বন্দি কাহিনী সংক্ষেপঃ কঙ্গো । হুতু আর তুতসি জাতিদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস এর সাংবাদিক অ্যানজেলা আর ক্যামেরাম্যান চার্লি এসেছে সেই নিউজ কভার করতে। মার্সেনারি সৈনিক ভারতীয় পেটেল আর বাংলাদেশি ইরফান তাদেরকে নিরাপদ স্থানে পৌছানর সময় হুতুরা হামলা করে। চার্লি নিহত হয় আর এনজেলা অপহৃত হয়। পেটেল আর ইরফান প্রতিজ্ঞা করে তাকে উদ্ধার করার। আসলেই কি হুতুরা এর পিছনে না আছে অন্ন কন চক্রান্ত? শুরু হয় দুর্দান্ত অ্যাকশান। অসাধারন একটা কাহিনী । কেপি ইমন ভাইএর জাদুর লেখনী! 😊❤️👍
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ একজন লেখকের লেখার সার্থকতা কোথায়? যখন বই শেষ করার পরও ভাল লাগার অনুভূতি বা মুগ্ধতায় পাঠক আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। সেই অর্থে লেখকদ্বয় সার্থক। উপন্যাসিকা দুইটা শুরু থেকেশেষ পর্যন্ত টান টান উত্তেজনায় ধরে রেখেছিল। যারা থ্রিলার পছন্দ করেন তাদের জন্য অবশ্য সুখপাঠ্য!
যুগলবন্দি বইটা হচ্ছে এক মলাটে দুটো উপন্যাসিকা। প্রথমটির নাম যুগল, নাবিল মুহতাসিমের লেখা। মোটামুটি ভালো হলেও, কাহিনী আহামরি কিছু না। ২য় উপন্যাসিকাটির নাম বন্দি, কেপি ইমনের লেখা। ডার্ক হিউমারে লেখার চেষ্টা করা এই কাহিনীটা আমার কাছে মোটেও ভালো লাগে নি। দুর্বল স্টোরি, সাদামাটা এন্ডিং। বইগুলো উপন্যাসিকা হওয়ায় কাহিনীর ট্রানজিশন খুব দ্রুত হওয়ার কারণেই হোক, আর জীবনে অসংখ্য থ্রিলার পড়ে ফেলায় এটাকে আহামরি না মনে হওয়ার কারণেই হোক, বইটা আমার কাছে খুব একটা ভালো লাগে নি। এভারেজ মনে হয়েছে। ধন্যবাদ।
চমৎকার! বইতে মুলত নাবিল মুহতাসিম (যুগল) আর কিশোর পাশা ইমনের (বন্দি) দুটো নভেলা আছে। এইদুটো মিলেই যুগলবন্দি। ভিন্ন স্বাদের দুটো নভেলা। কিন্তু শেষে গিয়ে সুক্ষ্ম একটা যোগসূত্র আছে। একটা সিরিযের প্রথমাংশ এটি। আস্তে আস্তে পুরোটা প্রকাশ পাবে। বাংলা সাহিত্যে এইরকম ক্রিয়েটিভ কাজ হয়নি আগে। গার্গী ও রুমি জুটির পাশাপাশি কঙ্গোর ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে কামলা খাটা ইরফান ও প্যাটেলের জুটিও নজর কেড়েছে। সব মিলিয়ে দুর্দান্ত একটা কাজ!
প্রথম নভেলা 'যুগল' ছিল অসাধারণ কিন্তু দ্বিতীয়টা ভালো যদি আরেকটু প্র্যাক্টিকাল হতে পারত লেখা যেমন একটা দৃশ্যে দেখা যায় ইন্ডিয়ান সেনার চেহারা এতই সুন্দর মেয়ে প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ে যায় আর তারা উপরে চলে যায় প্রাইভেট পার্টি সারতে🙄মানে এটা কি ছিল! কিন্তু প্রথম নভেলা এত্ত ভালো লেগেছে তাই টোটালে ৪ স্টার
যুগল - ৪ স্টার বন্দী - ৩ স্টার (প্লট আর পেস ভালো ছিল)