বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থান হলো একটি জনগোষ্ঠীর জেগে ওঠার মহাকাব্য। এর ভাঁজে ভাঁজে আছে যুগ যুগ ধরে মানুষের যূথবদ্ধ প্রয়াস। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক মহাকাব্যিক চরিত্র, অনেক কারিগর, অনেক বীর। তাঁদের একজন সিরাজুল আলম খান। তাঁকে নিয়ে অনেক আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক, কৌতূহল এবং বিভ্রান্তি। একসময় তিনি হয়ে উঠলেন রাজনীতির রহস্যমানব। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী পর্বটি জটিল ও স্পর্শকাতর। এ সময় তিনি হাজির করলেন নতুন ডিসকোর্স—জাসদ। দলটি তরুণদের একটা বড় অংশকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল রাজনীতির উথালপাথাল সেÊাতে। বিপ্লব তখন একটি স্বপ্ন, রোমাঞ্চ, ক্রেজ। একসময় সে আগুনও গেল নিভে। ইতিহাসের এই টালমাটাল পর্বের অন্তরঙ্গ বিবরণ এ বইয়ে তুলে ধরেছেন অনুসন্ধানী গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
জন্ম ১৯৫২, ঢাকায়। পড়াশোনা গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনে মুহসীন হল ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বিএলএফের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দৈনিক গণকণ্ঠ-এ কাজ করেছেন প্রতিবেদক ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকোংহে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মাস্টার্স ইন এনজিও স্টাডিজ’ কোর্সের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক। তাঁর লেখা ও সম্পাদনায় দেশ ও বিদেশ থেকে বেরিয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা অনেক বই।
১."এখন সত্য ইতিহাস লেখা যাবে না।লিখবেন না,লিখলে মেরে ফেলবে।"মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে আবু জাফর শামসুদ্দীনকে বলা তাজউদ্দীন আহমদের এই কথার মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতির কদর্য ও ভয়াবহ রূপটি ধরা পড়ে।
এদেশের রাজনীতিতে ষাট ও সত্তর দশক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।এ সময় নিয়ে ধোঁয়াশাও প্রচুর।লেখক মহিউদ্দিন আহমদ ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লিখছেন,"প্রতিনায়ক" তারই ফলশ্রুতি। বইটি তিনটি অংশে বিভক্ত(নিউক্লিয়াস, মুজিববাহিনী,জাসদ।)বইয়ের প্রধান শক্তি হচ্ছে, বইটি যাদের নিয়ে লেখা তাদের সরাসরি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচিত।বইয়ের প্রধান দুর্বলতাও হচ্ছে এটি সরাসরি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচিত।অনেকে বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনায় নিজেদের ভূমিকা পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন বা হয়তো সুবিধামতো বয়ান দিয়েছেন।লেখক নিজে বিশ্লেষণ করেছেন কম।
২.প্রতিনায়ক এদেশের ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায় উন্মোচিত করেছে বা করার চেষ্টা করেছে।ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধুর সশস্ত্র বিপ্লবের প্রচেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধে মুজিববাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকা ও ১৯৭১ পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং এতে সিরাজুল আলম খানের ভূমিকা বইয়ের প্রধান আলোচ্য বিষয়।অনেক অনালোচিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তির কথা এ বইতে আলোচিত হয়েছে।১৯৭১পরবর্তী সিরাজুল আলম খানসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের আচরণ দেখে ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত হতে হয়।অবাক হয়ে ভাবতে হয়,তারা একটু দায়িত্বশীল আচরণ করলে আমাদের ইতিহাস কতো অন্যরকম হতে পারতো!!
৩.ষাটের ও সত্তর দশকের রাজনীতিকে এখন মনে হয় প্যান্ডোরার বাক্স।ধীরে ধীরে এ বাক্স খুলবে ও আমরা সত্য ও পুরোপুরি নির্মোহ ইতিহাস জানতে পারবো একদিন,এটাই প্রত্যাশা।
ইতিহাসের বাঁক বদল স্বাভাবিক ঘটনা। সেই বাঁক বদল নায়ক বানায় কাউকে। আবার, সময়ের প্রয়োজনে নায়ক পরিণত হন প্রতিনায়কে। সহযোদ্ধারা চিনেও না চেনার ভান করেন , আস্থাভাজন শিষ্যেরা নিন্দেমন্দ করে এবং জনতার কাছে তারকা পতনের মতো স্রেফ একটি ঘটনা হয়ে থেকে যান প্রতিনায়ক। এমনই একজন প্রতিনায়ক সিরাজুল আলম খান। যাঁকে নিয়ে লিখতে গিয়ে স্বাধীন বাংলার স্বপনের কথা লিখতে হয়েছে। বলতে হয়েছে এমন এক বিপ্লবের কথা যা কোনোদিন পূরণ হয়নি। অথচ কতশত তাজা প্রাণ সেই বিপ্লবের ডাকে বলি হয়েছে তার খতিয়ান ইতিহাস রাখেনি। এদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সিরাজুল আলম খানকে উপজীব্য করে লেখা মহিউদ্দিন আহমদের এই বই।
সিরাজুল আলম খানকে নিয়ে বাংলায় মোট দুইটি বই লেখা হয়েছে। প্রথম বইটি লিখেছেন শামসুদ্দীন পেয়ারা। দুসরা বই এটি। পেয়ারা সাহেবের বইয়ের পরিধি সীমিত। প্রতিতুলনায় মহিউদ্দিন আহমদ বিস্তারিত আকারে কাজ করতে চেষ্টা করেছেন।
জীবনীগ্রন্থের মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ব্যক্তি। কিন্তু মহিউদ্দিন সাহেব খাঁটি জীবনী রচনা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সিরাজুল আলম খানকে বাদ দিয়ে অনেকক্ষেত্রেই বিভিন্ন দিকে বইয়ের মনোযোগ চলে গেছে। যা কাজের কথা না।
মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো অনেকে মুখ খোলেননি। সত্য কথা বলেন না। আবার, অনেকে অর্ধসত্য বলেন। পড়তে গিয়ে পাঠক সহজেই এসব বুঝতে পারবে। যেমন: সিরাজুল আলম খান নিজেও তো সবকিছু বলেননি। গণবাহিনী গঠন ও এই বাহিনীর কার্যকলাপের দায় নিতে চাননি। এমনকি না জানার ভান করেছেন অনেককিছু। লেখক মহিউদ্দিন আহমদও তার 'গুরু' সিরাজুল আলম খানের পক্ষেই থেকেছেন। আরও সৎ ও সাহসী হওয়ার চেষ্টা করেননি। আহমদ ছফার প্রতি লেখকের মনোভাব নেতিবাচক। সেই মনোভাব থেকে তাঁকে নাহক আক্রমণ করার একটি প্রবণতা লক্ষণীয়।
'জাসদের উত্থান-পতন' লিখতে গিয়ে বেশকিছু ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন মহিউদ্দিন আহমদ। সেই আলাপচারিতা ভাঙিয়ে ভদ্রলোক অনেকগুলো বই লিখে ফেললেন। একই তথ্য ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বিভিন্ন বইতে দিচ্ছেন। এ যেন কুমিরের ছানা দেখানোর গল্পের মতো। তা-ও মন্দের ভালো। মহিউদ্দিন আহমদের লেখা গতিশীল। তাই রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী যে-কোনো পাঠক পড়লে আনন্দ পাবেন।
ইতিহাসের প্রচলিত কিংবা জনপ্রিয় ধারার বাইরে আরেকটি ধারা আছে, মোটা দাগে ইতিহাস। প্রায় সবাই যা ইতিহাস বলে জানে সেটাইকেই এই ধারায় ফেলা যায়। প্রচলিত ইতিহাস সাধারণত পড়ানো হয়, জনপ্রিয় ইতিহাস প্রচার করা হয় আর এসব কেটে ছেঁটে যা সবার মধ্যে ঢুকে যায় তাই হলো মোটা দাগে ইতিহাস। আর সরলীকৃত সেই ইতিহাস গল্পের মতো। সেখানে ঘটনা থাকে। নায়ক থাকে, খলনায়ক থাকে। প্রতিনায়কও থাকে।
সত্যিকার অর্থে আমাদের সাহিত্য, সিনেমায় 'প্রতিনায়ক' বিষয়টা খুব একটা উঠে আসে না। আমরা নায়ক এবং খলনায়ক পর্যন্তই বুঝি। আমাদের বলতে এখানেও মোটা দাগে বাংলা সাহিত্য বা সিনেমার কথা বলছি, উপমহাদেশের কথাও বলা যায়। কিন্তু ক্লাসিক সাহিত্যে প্রতিনায়কের অভাব নেই এবং তারা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রিক মিথলজি থেকে শুরু করে রামায়ণ, মহাভারতে প্রতিনায়করা মূলত নায়ক এবং খলনায়কের চেয়েও জটিল। আর বরাবরই তারা কাজ করেন পাদপ্রদীপের আলোর বাইরে বসে। বাস্তবেও তাই হয়। ফলে মোটা দাগের ইতিহাস তো দূর, প্রচলিত ইতিহাসেও তারা ভেতরের পাতার এক কলামের সংবাদ হয়ে থেকে যান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, জনযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যদি বাদও দেওয়া হয়, এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিহাসে সিরাজুল আলম খান একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আসলে সিরাজুল আলম খান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ। ষাটের দশক থেকে রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এই ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর ছায়াতলে থেকে এক সময় বহু কাজ করেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাসদের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে এর সবকিছুর সঙ্গেই তার যোগাযোগ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নানা সংকট এবং পট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি হারিয়ে গেছেন। কিংবা আড়ালে থেকে জটিল এবং গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ করা সিরাজুল আলম খান আবার আড়ালে পড়ে যান। তবে এবার স্বেচ্ছায় নয়, অনিচ্ছায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিহাস নিয়ে কাজ করার সময়েই মহিউদ্দিন আহমদের মনে হয়েছিল কয়েকজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেও ইতিহাস রচনা প্রয়োজন। ২০২১ সালে এই চিন্তার প্রতিফলন আমরা দেখি সমনামী দুই ব্যক্তিকে নিয়ে লেখা তার দুই বইয়ে। সিরাজ সিকদারকে নিয়ে লেখা 'লাল সন্ত্রাস' এবং সিরাজুল আলম খানকে নিয়ে এই বই 'প্রতিনায়ক'। সমসাময়িক দুই ব্যক্তিকে নিয়ে একই সময়ে আসা দুই বইয়ের মধ্যে তুলনা না চাইতেই চলে আসে তবে সেদিকে না গিয়ে কেবল এটুকু বলি, দুটো বই লেখার ধরন ভিন্ন। 'লাল সন্ত্রাস' বইয়ে একটা জার্নি আছে, সেখানে 'প্রতিনায়ক' অনেক বেশি তথ্য নিয়ে হাজির হয়।
সিরাজুল আলম খান কী ছিলেন, কেন ছিলেন, কী কেন করেছেন তা আমি এখানে বলব না। এসব প্রশ্নের উত্তর লেখক এই বইয়ে এনেছেন কিনা তা ভাবতে গেলে মনে হয়, এনেছেন অবশ্যই তবে তা সরাসরি ধরা দেবে না। লেখক নিজেও কিছু প্রশ্ন করেছেন এবং তার উত্তর তিনি খুঁজেছেন ইতিহাস এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের কাছ���৷ আলোচ্য বইয়ে লেখকের নিজের বক্তব্য, বিশ্লেষণ কম (তবে যেটুকু আছে, সেই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ)। মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব থেকে শুরু করে যুদ্ধ, যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে জাসদ থেকে শুরু করে এরশাদের সময়কাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সিরাজুল আলম খানের সংযোগ তুলে ধরেছেন।
এই বইয়ের সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিরাজুল আলম খান, জাসদ, ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার। প্রতিটি বিষয়ে লেখক, তৎকালীন ঘটনাবলীর সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের মুখ থেকে ফ্যাক্ট তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। যেহেতু একটা সময়ে জাসদের কার্যক্রম ছিল গোপন, এমনকি খোদ সিরাজুল আলম খান শুরু থেকে 'রহস্যময়' জীবনযাপন করতেন, সেই সময়ে তার আশেপাশে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য না পেলে তাকে নিয়ে লেখা অসম্ভব। লেখক যাদের সাথে কথা বলেছেন তাদের কেউ এখনও সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত। অনেকেই অনেক কিছু সরাসরি বলতে চাননি। আবার কেউ বলেছেন।
এই সবকিছু নিয়ে সিরাজুল আলম খানকে খুঁজে বের করে তুলে ধরার মহিউদ্দিন আহমদের চেষ্টা 'প্রতিনায়ক', যা পড়লে অনেকেই খেই হারাবেন। কেননা পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যারা সরাসরি যুক্ত তারাই পুরোটা বুঝতে পারবেন। অ্যামেচার পাঠককে আরও অন্তত খান তিরিশেক বই পড়তে হবে। সেই সময়ের রাজনীতির হাল হকিকত জানতে হবে। বইটা পরবর্তী সময়ের গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে কেননা মহিউদ্দিন আহমদ এখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এসেছেন যা তার সরাসরি সাক্ষাৎকার থেকে গৃহীত এবং কখনও কখনও এই সাক্ষাৎকার 'জেরা'য় পরিণত হয়েছে। জনাব আহমদ বারবার বলেছেন, 'আপনারা মুখ না খুললে তো ইতিহাস হারিয়ে যাবে।'
মহিউদ্দিন আহমদের বইয়ে অনেক কিছুরই ব্যাখ্যা থাকে না। তিনি কেবল ঘটনা তুলে ধরেন। ঘটনার পাশাপাশি কিছু প্রমাণ রেখে দেন, কখনও সাক্ষাৎকার। সেখান থেকে পাঠককে নতুন কিছু খুঁজে বের করতে হয়, সংযোগগুলো বুঝতে হয়। এই বইতে সিরাজুল আলম খানের পাশাপাশি শেখ ফজলুল হক মনির প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। এসেছে কর্ণেল তাহের মেজর জলিলদের কথা। কিন্তু সিরাজুল আলম খান কেন্দ্রিক বই হয়েও এখানে ক্রাচের কর্নেলের মতো কোন এক ধারার বয়ান আসেনি। এই বইটি হতে পারত একজন রাজনৈতিক কর্মী কিংবা লেখকের দৃষ্টিতে একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনী কিন্তু লেখক এখানে প্রতিনায়কের ইতিহাসই রেখেছেন যা কেবল সিরাজুল আলম খানের ইতিহাস নয় বরং বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দল এবং দেশের রাজনীতির বেশ দীর্ঘ সময়ের ইতিহাস।
বইটার শুরুর দিকে বাংলার স্বাধীনতার বেশ কিছু স্রোত সম্পর্কে আলাপ আছে। ৬৫ এর দিকেই যে আহমদ শরীফ একটা ইশতেহারে আমার সোনার বাংলা গানটাকে মেনসন করছেন, সেইটা খুবই ইন্টারেস্টিং। তবে বইটা শুরুর দিকে খানিকটা ঝুলেঝুলেই আগায়, প্রচুর নাম বিক্ষিপ্তভাবে উড়ে উড়ে আসে। তবে ধীরে ধীরে রিদম পায়। রিদম পাবার পর খুবই সুখপাঠ্য। সিরাজুল আলম খান নামক রহস্যময় ক্যারেকটার এর গভীরে পৌঁছাতে সক্ষম হইছে কিনা বইটা জানিনা, আরো ভালোভাবে, আরো গোছালো কাজ হইতে পারতো। তবে সিরাজুল আলম খান সম্পর্কে অনেক কিছুই বইটা টাচ করতে পারছে। জাসদ, ছফা, এদের লিবিয়ান লিংক, কর্নেল তাহের বিষয়ক কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। তাহেরের ক্রিটিকাল বিশ্লেষণ করার সময় আসছে। স্তুতিকেন্দ্রিক লেখালেখির বাইরে তাহেরের তখনকার ভূমিকার নির্মোহ মূল্যায়ন হওয়া জরুরি।
যাইহোক, লেখকের বইগুলো পড়া উচিৎ, আন্ধা বিশ্বাসে না, তবে অনেক বইয়ের একটা হিসাবে প্রাসঙ্গিক ইনসিডেন্ট ধরে ধরে। এটাও কোনো রেটিং দিলাম না। এই ধরণের বইয়ের রেটিং দেয়া এখন থেকে এভয়েড করবো।
ব্যক্তিগত অভিমত হলো বইটা বিগিনারদের জন্য নয়। ৬০ ও ৭০ এর দশকের বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে একটুআধটু ধারনা থাকলে এই বইটা পড়ে আরাম পাবেন, লেখকের দেওয়া সুতাগুলো সহজে ধরতে পারবেন পাঠক। যারা বাংলাদেশের শুরুর দিকের ইতিহাস জানতে আগ্রহী তারা লিস্টে রাখতে পারেন।
বইটি তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত - ১. নিউক্লিয়াস ২.মুজিববাহিনী ৩. জাসদ।
তিনটি অধ্যায়ের মধ্যে প্রথম অধ্যায় তথা 'নিউক্লিয়াস' এর বেশিরভাগ অংশই মাথার উপর দিয়ে গেছে।এই অধ্যায়ে এত বেশি পরিমান সাল এবং রাজনৈতিক নেতা কর্মীর নাম আছে যে আমি রীতিমতো হাবুডুবু খেয়েছি সেগুলো হজম করতে। এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তু বুঝতে হলে ওই সময়ের রাজনীতি নিয়ে লিখা আর অন্তত গোটা দশ/পনেরোটা বই পড়া লাগবে। নাহলে আমার মতো এইরকম মাথার উপর দিয়েই যাবে।
পরের দুটো অধ্যায় সেই তুলনায় ছিল অনেক স্মুথ। বিশেষ করে শেষের জাসদের অংশটুকু।
যাকে কেন্দ্র করে এই বই লেখা - কারো কাছে 'কাপালিক', কারো কাছে 'দাদাভাই' নামে পরিচিত সিরাজুল আলম খানের বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্থান এবং পতনের গল্পটা থ্রিলার গল্পের চেয়ে কিছু কম নয়। মুজিবের বিশ্বস্ত ডান হাত হিসেবে যেমন নাটকীয় ভাবে ঘটেছিলো তার উত্থান, তার চেয়েও করুণভাবে ঘটেছে তার রাজনৈতিক জীবনের পতন। দাদাভাই এর নাটকীয় জীবনের সাথে বাংলাদেশের ৬০ এর দশক থেকে ৮০ এর দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের আরো অনেক না জানা চমকপ্রদ ঘটনাবলী উঠে এসেছে এই বইতে।
সিরাজুল আলম খানের রাজনীতি ও রাজনৈতিক জীবনকে বেশ সুন্দর করেই তুলে আনা হয়েছে। অনেক মানুষের সাক্ষাৎকার যুক্ত করায় বিভিন্ন পয়েন্ট অব ভিউ দেখা যায়। যেটা সামগ্রিক একটা দৃশ্য তৈরি করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাপূর্ব ও পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী সবারই একবার হলেও এই বই নেড়েচেড়ে দেখা উচিত।
বইয়ের শুরুতে মহিউদ্দিন আহমদ 'ইতিহাসের সত্যি কথা' নামে যে নিবন্ধ লিখেছেন ঐটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ লাগলো।
Sirajul Alam Khan Dada was the freedom fighter of 1971, but he was the Rajakar of 1990 mass movement. He committed political suicide by becoming the Dalal of dictator Ershad.
মহিউদ্দিন আহমদের আগেকার বইগুলো যারা পড়েছেন, তাদের কাছে এটাতে তেমন কোন নতুনত্ব পাওয়া দুষ্কর। বিশেষ করে জাসদের উত্থান পতন বইটাতে একানকার অনেক কিছুই উঠে এসেছিলো।
মহিউদ্দিন আহমদের আলোচিত গ্রন্থ প্রতিনায়ক পড়বার পরে বইটি সম্পর্কে আমার কিছু মতামত ৫ দফায় পেশ করা হলো- 🥱 ১. প্রতিনায়ক সিরাজুল আলম খানকে কেন্দ্র করে লেখা হলেও সে ভরকেন্দ্র সর্বদা সিরাজুল আলমের দিকে ঝুঁকে ছিল না, থাকার কথাও নয়, যেহেতু এটা কোন উপন্যাস নয় যে বইয়ের ৮৫ ভাগ প্রোটাগনিস্টের দখলে থাকবে । তবে বইয়ের প্রারম্ভিক অংশ সহ অধিকাংশ জায়গাতেই সিরাজুল আলম খান অনুচ্চারিতই থেকে গেছেন, অনেক জায়গাতেই উনি রয়ে গেছেন আলোচনার বাইরে, ফলে এটাকে আদৌ সিরাজুল আলম কেন্দ্রিক বই বলা চলে কিনা তাতে সন্দেহ থেকে যায়। তবে বইটির নাম যেহেতু প্রতিনায়ক, সেই অ��্থে সিরাজুও আলম খানকেই প্রোটাগনিস্ট হিশেবে ধরা যায়। ২. বইটি একটি সাক্ষাৎকার নির্ভর বই, প্রায় ৮০ ভাগ অংশ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সাক্ষাৎকারে পূর্ণ, যা কিনা ইতিহাস জানার ব্যাপারে বেশ সহায়ক, রাজনৈতিক বক্তব্যগুলো কীভাবে একেকজনের কাছে গিয়ে বদলে যায়, কীভাবে ইতিহাস ঘটার সময় থেকেই ইতিহাসের রূপরেখা পালটে যেতে শুরু করে তা বোঝার ক্ষেত্রে এই সাক্ষাৎকারগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অতি-সাক্ষাৎকারের কবলে হারিয়ে গেছে লেখকের নিজস্ব বক্তব্য, ঘটনাপ্রবাহও এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল৷ লেখক যে সকল তথ্য জোগাড় করেছিলেন, যা কিছু নিজে দেখেছিলেন তার প্রেক্ষিতে সরল ইতিহাস আকারে তিনি লিখে যেতে পারতেন, মাঝে মাঝে ঘটনাপ্রবাহের সাথে মিল রেখে ঐ সকল ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তির সাক্ষাৎকারের বিভিন্ন অংশ উল্লেখ করতে পারতেন, তাতে বইয়ের পরিধি কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও সমস্যা হতো না। কিন্তু লেখক সাক্ষাৎকারগুলোতেই বেশি ফোকাস দিয়েছেন, নিজের বক্তব্যকে আড়ালে রেখেছেন। মাঝে মাঝে, দুই একটা জায়গায়, যে প্রসঙ্গে কথা হচ্ছে তার রেফারেন্সে যে সাক্ষাৎকারটা দেওয়া হয়েছে, প্রসঙ্গের সাথে সাক্ষাৎকারের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। ৩. যে সময়ের ঘটনা সে সময়ে মহিউদ্দিন আহমেদ নিজেও রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন, একাত্তরে বিএলএফ বাহিনী এবং পরে গণকণ্ঠের সাথে যুক্ত হন। রাজনীতির বিভিন্ন ঘটনা তিনি নিজেও দেখেছেন, পরিচয় ছিল সিরাজুল আলম খানের সাথেও। কিন্তু লেখকের নিজের স্বচক্ষে দেখা বিষয়গুলোর উপস্থিতি আমরা বইটির মধ্যে সেই অর্থে পাই না। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন করার সময় উনার যেটুকু যা বক্তব্য পাওয়া যায়, তার বেশি উনি মুখ খোলেননি। সিরাজুল আলম খানের মতো উনিও কি কিছুটা রহস্য পছন্দ করেন? নাকি নিজেকে বিতর্ক থেকে একটু দূরে রাখতে চেয়েছেন? ৪. সেই সময়ের বিভিন্ন ঘটনার সাথে জড়িত জীবিত প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিলেও, বাদ পড়ে গেছেন হাসানুল হক ইনু। 'জাসদের উত্থান-পতন' বইয়েও ইনুর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি, করা হয়নি কোন যোগাযোগ। যেটার উল্লেখ আমরা পাই প্রতিনায়কে প্রকাশিত একটি পত্রিকাকে দেওয়া ইনুর সাক্ষাৎকার থেকে। কথা হচ্ছে জীবিত থাকা সত্ত্বেও ইনুর সাক্ষাৎকার না নেওয়া কারণ কী? ইনুর সাথে লেখকের কোন দ্বন্দ্ব নাকি ইনুর প্রতি অবহেলা? ৫. মহিউদ্দিনের লেখার সাথে এটা প্রথম পরিচয়। ইতিহাস সম্পর্কে আরও একটু ধারণা থাকলে বইটি পড়তে সুবিধা হতো, সেটুকু নিজের প্রতিবন্ধকতা৷ সেটা দূরে সরিয়ে রাখলে প্রতিনায়ক একটি অসাধারণ বই। লেখকের অন্যান্য বইগুলোও সংগ্রহ করার ইচ্ছা আছে।
এই বইটার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের একটা অল্টারনেট দৃষ্টিভঙ্গির অধ্যায় শেষ হল । যে অধ্যায় মূল স্রোত থেকে আলাদা হয়ে গেছে কোন কারণে, বিশেষ অনিবার্যতায় ।
সিরাজুল আলম খান বাংলাদেশের রাজনীতির রহস্যপুরুষ, দাদা, কাপালিক অনেক নামে পরিচিত কিংবদন্তি । বেঙ্গল লিবারেশন ফোর্সের অন্যতম কাণ্ডারি এই লোক মুজিববাদের প্রবক্তাদের একজন । বাংলাদেশের পতাকা, মুক্তিযুদ্ধকালীন স্লোগান, সংবিধান, রণনীতি সবখানেই তিনি ছিলেন, তীব্রতার সাথেই । পরবর্তী জীবনে মুজিববাদের সব থেকে বড় সমালোচকদেরই একজন । শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি মুজিবের সাথে থাকা এই মানুষ রাজনীতিতে নতুন ধারা আনতে চেয়েছিলেন । যার ফলশ্রুতিতে ছাত্রলীগে ভাঙন, আর জাসদের উত্থান ।
জাসদে এমন অনেক মানুষ এসেছিল যারা দেশের জন্য অন্তঃপ্রাণ । দেশের প্রতি তাদের ভালবাসা, ত্যাগ চিরস্মরণীয় । মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান কেউ কেউ ভুলে গেলেও তা ছোট হয়ে যায়নি ।
এমন অনেক লোকও এসেছিল যারা আসলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব চির ধরিয়েছিল । স্বাধীনতা উত্তর একটা দেশে এটা অমূলকও নয়। প্রতিটি বাঁকে ছিলেন সিরাজুল আলম খান । কখনো সম্মুখসমরে, কখনো পাদপ্রদীপের বাইরে, কখনো ঠিক পথে, কখনো ভুলে । কিন্তু ১৯৬০ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ইতিহাসের প্রতি দিকপরিবর্তনে তিনি ছিলেন । যেভাবেই হোক । এমন ডাকসাইটে নেতা খুব আসেনি দেশে, যাঁদের কথা শুনে দেশের একঝাঁক তরুণ মরতেও রাজি ছিল । তার রাজনৈতিক গুরুও তেমন একজন মানুষ ছিলেন । যোগ্য রাজনৈতিক উত্তরসূরীর মত তিনিও মানুষকে মোহিত করতে পারতেন বলেই প্রতীয়মান হয় । তাকে ব্যবহার করা লোক যে ছিল না, তা নয় । তাদের অনেকেই এখন সরকারে আছে, বিরোধীতে আছে ।
এই বই তাই ইতিহাস অনুসন্ধিৎসুদের জন্য একটা খনির মত । সিরাজুল আলম খান দেশের তিন সিরাজের একজন । বাকি দুইজন সিরাজ শিকদার আর শাহজাহান সিরাজ ।
এই মহীরূহ না থাকলে দেশের ইতিহাস অন্যরকম হত । পড়তে পারেন ।
সিরাজুল আলম খান। বাংলার ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক চরিত্র। চালচলনে খ্যাপাটে, বোহিমিয়ান, লম্বা চুল-দাড়ি-গোঁফ, অতি সাধারন বেশভূষা, কম কথা বলেন, কখন খান কখন ঘুমান তার ঠিকঠিকানা নেই। তাঁর এই বিশিষ্টতার আকর্ষন-বিকর্ষন শক্তি দুই-ই ছিলো। অনেকেই তাঁকে এড়িয়ে চলতেন। আবার অনেকেই সম্মোহিত হতেন। তাঁকে নিয়ে চালু ছিলো অনেক মুখরোচক গল্প, অনেক আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক, কৌতুহল, বিভ্রান্তি। কারন তাঁর চালচলন আর দশজনের মতো ছিলো না। অনেকের কাছে তিনি রাজনীতির রহস্যমানব, অনেকের চক্ষুশূল। অনেকেই তাঁকে ডাকতো 'কাপালিক' বলে। বঙ্কিমচন্দ্রের একটি চরিত্র 'কাপালিক'।
তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে আস্থাভাজন শিষ্য। এক কথায় বললে বঙ্গবন্ধুর ডান হাত ছিলেন সিরাজ। ১৯৬৯ সালে ছাত্রলীগের মধ্যে দুটি স্রোতধারা দেখা যায়। একটির কেন্দ্রে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শেখ ফজলুল হক মনি, অন্যটির মধ্যমণি ছাত্রলীগের আরেক সাবেক নেতা সিরাজুল আলম খান। একসময় ছাত্রলীগের এই সিরাজপন্থী গ্রুপ থেকে তৈরি হলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল। সংক্ষেপে জাসদ। কিন্তু এই রুপান্তর কি এতটাই সাবলীল ছিলো? ১৯৬৪ সালের পুরো সময়টা সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, আবুল কালাম আজাদ ছিলেন কারাগারে। তাঁদের মধ্যে একটা 'ককাস' গড়ে উঠেছিলো, যা পরে 'নিউক্লিয়াস' নামে চাউর হয়। এই 'ককাস' ছাত্রলীগের রাজনীতিতে একটি প্রভাববলয় তৈরী করতে পেরেছিলো।
তিনজনের একটি চক্র বা সেলের হাজির করা, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী জটিল ও স্পর্শকাতর সময়ে এই নতুন ডিসকোর্স তরুনদের একটা বড় অংশকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় রাজনীতির উথালপাথাল স্রোতে। সিরাজুল আলম খান হয়ে উঠেন একঝাঁক তরুনের স্বপ্নের সওদাগর। বিপ্লব তখন হয়ে উঠে একটি স্বপ্ন, রোমাঞ্চ, ক্রেজ। প্রতিনায়ক বইটিতে লেখক 'নিউক্লিয়াস', 'মুজিববাহিনী' ও 'জাসদ' এই তিনটি পর্বে তুলে এনেছে অসংখ্য ঘটনার বিবরন, অজানা তথ্য, অনেক ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের বেশ কিছু সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সিরাজুল আলম খানের প্রতিনায়ক হয়ে উঠার গল্প, তাঁর নাটকীয় উত্থান ও বিয়োগান্ত পরিণতির অন্তরঙ্গ বিবরন।
রাজনীতির তথাকথিত রহস্যপুরুষ সিরাজুল আলম খানের রাজনৈতিক জীবনের প্রশ্ন ঘেরা কিছু ঘটনার উত্তর বইটিতে খোঁজার চে��্টা করা হয়েছে। ছয়দফা বাস্তবায়ন, ১৯৬৯ এর গনআন্দোলনে সিরাজুল আলম খানের ছিল উজ্জ্বল ভূমিকা। ছাত্রলীগের সেক্রেটারির দায়িত্ব পালনকালে তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল আলাদা মেরুকরন। শেখ মনি ও সিরাজের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গির চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ পায় ছাত্রলীগের ভাঙ্গনের মধ্য দিয়ে, তৈরি হয় জাসদ এবং পরবর্তীতে গণবাহিনী। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সিরাজুল আলম খান ছিলেন মুজিববাহিনীর চার নেতার একজন। স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরির জন্য তিনি নিউক্লিয়াস নামে একটি গোপন সংগঠন তৈরি করেন। বইটিতে লেখক জানাচ্ছেন নিউক্লিয়াসের আগেও অনেকে স্বাধীনতার জন্য সংগঠন করেছেন, প্রচেষ্টা নিয়ছিলেন। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশগ্রহনকারীর সাক্ষাৎকার থেকে লেখক চেষ্টা করেছেন প্রশ্নবোধক কিছু ঘটনার সাথে সিরাজুল আলম খানের সংশ্লিষ্টতা বের করতে। সিরাজুল আলম খানের সাক্ষাৎকারও আছে বইটিতে যদিও স্বভাব অনুযায়ী তিনি খোলসা করে কিছু বলতে চাননি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী দেশপ্রেমিক প্রজন্মটির বড় অংশ হারিয়ে গিয়েছিল যে ক'জন মানুষের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও জেদের কারনে সিরাাজুল আলম খান তাদেরই একজন।
মহিউদ্দিন আহমেদের আগের বই দুটোর থেকে ভালো লেগেছে। যদিও একই ফরমেটে লেখা- মানে এলোমেলো ডুকেমেন্টস। তবে অনেকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কারণে অনেক অজানা তথ্য উঠে এসেছে। এই বই সিরাজুল আলম খানকে নিয়েও লেখা হলে যুদ্ধ পূর্ব্বর্তী, পরবর্তী এবং যুদ্ধের সময়ের রাজনীতি ভালোই ধরা পরে। একই বিষয়ে অনেকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কারণে একই তথ্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কিংবা ভিন্ন আঙ্গিকে ধরা পরেছে। যেহেতু মহিউদ্দিন আহমেদ কোনো কনক্লুসন দেন নি, কাজেই বিভিন্ন জনের আলোচনা থেকে ইতিহাস বুঝে নেওয়ার দায় পাঠকের উপরেই থেকে যায়।
ভালোই, সিরাজ সাহেবকে নিয়ে অনেক প্রচলিত ভুল ধারণার পাশাপাশি উনার অনেক কীর্তিমান ঘটনাবলীর সঙ্গে পরিচয় হওয়া যাবে। মানুষ টা আসলেই রহস্যে ভরপুর ছিল।
তবে একটা বিষয় আমার কেমন জানি লাগছে। সেটা হলো ঘটনার বিবরণে কোনো রসকষ পাওয়া যায় না। পড়তে গেলে একঘেয়েমি চলে আসে। অনেক সময় নিয়ে অল্প অল্প করে পড়তে হয়েছে এই বইটা।
বইটিতে মূলত বিভিন্ন জনের সাক্ষাৎকার, বয়ান তুলে ধরা হয়েছে। অনেক জায়গায় আনেক কিছু আমার ঠিক বোধগম্য হয়নি। সেটা হতে পারে আমার ব্যর্থতা। তবে বইটা পড়ে অনেক কিছুই জেনেছি নতুনভাবে।
ইতিহাসের অনেক ছোটখাটো বিষয় জানতে পারলাম। ধন্যবাদ লেখক কে এতো তথ্যবহুল একটা বই উপহার দেওয়ার জন্য। ওই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটের হলগুলোতে রাজনৈতিক চর্চার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।