Jump to ratings and reviews

হেমলকের নিমন্ত্রণ

কয়েকজন মহাপ্রতিভাবান মানুষ অদ্ভুত এক পাগলামি শুরু করেছিলেন। তাদের মধুর সেই পাগলামিতে জন্ম হয়েছিল সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণতন্ত্র, থিয়েটার, চিকিৎসা, দর্শনসহ মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় সবকিছু। সেই পাগলামিকে একটি মাত্র মিষ্টি গল্পে নিয়ে এসেছেন কথা সাহিত্যিক সুজন দেবনাথ। সক্রেটিস একজন তুমুল প্রেমিক। তিনি স্ত্রীর সাথে খুনসুটিমাখা ঝগড়া করছেন, চুপিচুপি যাচ্ছেন শহরের সবচেয়ে বুদ্ধিমতী মেয়ে আসপাশিয়ার কাছে, আবার বয়স্ক এক নারীর কাছে শিখছেন প্রেম। সেই প্রেম থেকে প্লেটো খুঁজছেন শরীরের আকর্ষণ ছাড়া সাধু-সন্ন্যাসী ধরনের নতুন এক প্রেম। তার নাম প্লেটোনিক প্রেম। ইতিহাসের জনক হেরোডটাস লিখতে শুরু করছেন পৃথিবীর প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ। থেলিস নামে এক লোকের ভাবনা থেকে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন জিনিস, নাম বিজ্ঞান। শুরু হচ্ছে অলিম্পিক গেমস, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম সভ্য উপায়ে মানে মারামারি কাটাকাটি না করে বীর হওয়ার লড়াই। এথেন্সের মানুষ আবিষ্কার করছে গণতন্ত্র। পাহাড়ের উপরে বসছে পৃথিবীর প্রথম সংসদ। পিথাগোরাস বের করেছেন জ্যামিতির সূত্র, গোল্ডেন রেশিও। সেই রেশিও দিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর ভবন পার্থেনন ডিজাইন করছেন শিল্পী ফিডিয়াস। চিকিৎসাবিদ্যার জনক হিপোক্রাটিস ডাক্তারদের জন্য লিখতে বসলেন ‘হিপোক্রাটিক শপথ’। সক্রেটিস খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে দুষ্টুমি মিশিয়ে ‘সুন্দর জীবন’-এর গল্প বলছেন। তার দুষ্টুমিভরা প্রশ্ন থেকে প্লেটো শিখছেন জীবনের অর্থ। জন্ম হচ্ছে দর্শন ও নৈতিকতা। ম্যারাথন ময়দান থেকে এক দৌড়ে যুদ্ধের খবর আনতে গিয়ে মারা যাচ্ছেন ফিডিপিডিস। সেই থেকে শুরু হচ্ছে ম্যারাথন দৌড়। লাখো সৈন্যের মোকাবেলায় মাত্র তিনশ জনকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন স্পার্টার রাজা লিওনিদাস। এথেন্সের থিয়েটারে এসেছেন প্রথম অভিনয় শিল্পী থেসপিস। মঞ্চে উঠেছেন ট্রাজেডি নাটকের জনক ইস্কিলাস, অভিনয় করছেন ‘প্রমিথিউস বাউন্ড’। সফোক্লিস লিখতে বসেছেন সর্বকালের সেরা ট্রাজেডি ‘রাজা ইদিপাস’। হোমারের কবিতা আবৃত্তি করছেন ইউরিপিডিস। তিনি পাহাড়ের গুহায় বসে লিখছেন ‘ট্রয়ের মেয়েরা’। কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফানিস ভয়ংকর মিথ্যা কথায় সক্রেটিসকে আক্রমণ করে লিখছেন প্রহসন নাটক ‘মেঘ’। সেই ক্ষোভে প্লেটো তার সব নাটক কবিতা পুড়িয়ে দিয়ে কবি থেকে হয়ে যাচ্ছেন কঠিন দার্শনিক। তার আদর্শরাষ্ট্র থেকে নির্বাসন দিচ্ছেন কবি-সাহিত্যিকদের। কিছু মানুষের গোঁড়ামির জন্য হত্যা করা হচ্ছে সক্রেটিসকে। তিনি আসামী হয়ে দাঁড়াচ্ছেন আদালতে, পালানোর সবরকম সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি পালাচ্ছেন না, শান্তভাবে চুমুক দিচ্ছেন হেমলক পেয়ালায়। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময়ে মানুষের জ্ঞানের জন্মের রোমাঞ্চকর বিষয়গুলো জীবন্ত করে একটি অত্যন্ত সুখপাঠ্য গল্প বাংলাভাষীদের জন্য নিয়ে এসেছেন সুজন দেবনাথ। সেই মিষ্টি গল্পটির নাম-‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’।

550 pages, Hardcover

First published February 1, 2021

Loading...
Loading...

About the author

সুজন দেবনাথ

3 books10 followers

Ratings & Reviews

What do you think?

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
189 (67%)
4 stars
66 (23%)
3 stars
17 (6%)
2 stars
6 (2%)
1 star
1 (<1%)
Displaying 1 - 30 of 81 reviews
Profile Image for Shakil Mahmud.
90 reviews29 followers
April 16, 2021
'হেমলকের নিমন্ত্রণ' নাম শুনেই এতক্ষনে বুঝে গেছেন এই বইয়ের মূল চরিত্র হচ্ছেন সক্রেটিস। সক্রেটিস ছাড়াও তার সময়ের অন্যান্য দার্শনিক এবং ক্ল্যাসিকাল গ্রিসের সাহিত্য, ট্রাজেডি ও কমেডি নাটক, বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণতন্ত্র, দর্শন, চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে এক চমৎকার উপন্যাস লিখেছেন বাংলাদেশী কুটনীতিক সুজন দেবনাথ। এটা আসলে ঠিক উপন্যাস না। আবার পুরোপুরিভাবে হিস্টোরিক্যাল ফিকশনও বলা যায় না। কারন, বইয়ের শুরুতেই লেখক বলে দিয়েছেন যে, এই কাহিনীতে তিনি কোন কাল্পনিক চরিত্র আনেননি। তারমানে সমস্ত চরিত্রই আসল এবং ঐতিহাসিক। ইতিহাসের কাহিনী ক্রম ঠিক রেখে একটা গল্পের ধাচে লেখক আসলে ইতিহাস গ্রন্থই লিখেছেন বলা যায়। এবার বইটি নিয়ে কিছু বলা যাক।

প্রাচীন গ্রিস বিভক্ত ছিল অনেকগুলো নগররাষ্ট্রে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নগররাষ্ট্র হল এথেন্স, স্পার্টা, থিবস ইত্যাদি । আমরা সবাই মোটামুটি এটা জানি যে এথেন্স হলো বিশ্বের গণতন্ত্রের সূতিকাগার। স্পার্টা বিখ্যাত ছিল যোদ্ধা জাতি হিসেবে। সেখানে গণতন্ত্র নামে কোন বস্তুর অস্তিত্ব ছিলনা। ছিল শুধু রাজতন্ত্র। কিন্তু এথেন্স ছিল জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্পকলা, ভাস্কর্য, নাটক, সাহিত্য এসব দিক দিয়ে শীর্ষে। এথেন্স কে বলা হত জ্ঞানের নগরী। এই বইয়ের কাহিনী যেই সময় থেকে শুরু হয়, সেই সময় এথেন্সে চলছিলো গণতান্ত্রিক নেতা পেরিক্লিসের (Pericles) সময়কাল। পেরিক্লিস ছিলেন তখনকার গণতন্ত্রের প্রধান নেতা এবং ক্ল্যাসিকাল এথেন্সের সব রকমের জ্ঞান-বিজ্ঞান, নাটক, দর্শন, সাহিত্য চর্চার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তার সময়টাই মূলত ছিলো এথেন্সের স্বর্নযুগ যাকে Age of Pericles বলা হয়ে থাকে। গ্রিসের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান দেবী এথিনার মন্দির 'পার্থেনন' পেরিক্লিসেরই অমর কীর্তি।

পেরিক্লিসের আমলেই এথেন্সে উত্থান ঘটেছিলো প্রতিভাবান এক ব্যাক্তির, যাকে বলা হয় সর্বকালের সেরা দার্শনিক, যিনি জ্ঞান অন্বেষণ নিয়ে শুরু করেছিলেন এক অদ্ভুত পাগলামি - তার নাম সক্রেটিস। সক্রেটিসের জ্ঞানান্বেষণ পদ্ধতি ছিল সবার থেকে ভিন্ন - তিনি প্রশ্নের মাধ্যমে জ্ঞানের গভীরে পৌছাতেন। তার এই প্রশ্ন-প্রশ্ন খেলা কে বলা হয় "সক্রেটিক মেথড", যা এখনও এই আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ছাত্রীদের কে পড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয় । সক্রেটিস এথেন্সের রাস্তায় হেঁটে হেঁটে যুবক তরুনদের ধরে ধরে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন আর তাদের মাথায় নতুন নতুন আইডিয়ার জন্ম দিতেন। সক্রেটিস তাই নিজেকে "জ্ঞানের ধাত্রী" বা "Midwife to knowledge" বলে পরিচয় দিতেন। জ্ঞান বিষয়ে সক্রেটিসের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি হচ্ছেঃ "আমি শুধু একটি জিনিসই জানি। সেটি হচ্ছে - আমি আসলে কিছুই জানিনা।"

বিশ্বের সেরা দার্শনিক হবার পরেও সক্রেটিসের উপরে এথেন্সের লোকজন ছিলো ভীষণ ক্ষ্যাপা । কারন তাদের ধারণা ছিল সক্রেটিস এথেন্সের তরুন সমাজকে নষ্ট করে ফেলছে, তাদের মাথায় প্রশ্নের বীজ ঢুকিয়ে দিচ্ছে, তাদেরকে বিনা প্রশ্নে কোনোকিছু মেনে না নিতে শিখাচ্ছে যেটা কিনা মুরুব্বিদের কাছে চরম বেয়াদবি। এজন্য এথেন্সের বুড়োরা সক্রেটিসকে দুই চোখে দেখতে পারতো না, তাকে দেখলে পাগল বলে এড়িয়ে যেতো বা তাড়িয়ে দিতো। সক্রেটিসের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন দুইজন যারা তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাথে ছিলেন - ক্রিতো আর চেরোফোন। উচ্চবংশের ছেলে প্লেটো ছিলেন সক্রেটিসের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র। প্লেটো ছিলেন জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্যের এক দুর্দান্ত প্রতিভা। তিনি কবি হিসেবে অল্প বয়সেই অনেক খ্যাতি লাভ করেছেন। যদিও পরে সক্রেটিসের দর্শনের স্পর্শে তিনি কবিতা/নাটক সব ছেড়ে দার্শনিক হয়ে যান। এছাড়াও সমগ্র এথেন্সের জ্ঞান পিপাসু সমস্ত যুবকদের কাছে সক্রেটিস ছিলেন আইডল। তার সময়েই এথেন্সে দর্শন, নাটক, ইতিহাস এসবের চরম উন্নতি ঘটে। তার সময়েই এথেন্স আর স্পার্টার মধ্যে ইতিহাস বিখ্যাত 'পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধ' নামক ২৭ বছরের এক দীর্ঘ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

এই বইয়ে আরো জানা যায় কিভাবে ট্র্যাজেডি নাটকের উৎপত্তি ঘটলো, কিভাবে এথেন্সের তথা বিশ্বের প্রথম থিয়েটার 'ডিওনিসাস থিয়েটার' বানানো হলো, গ্রিস অঞ্চলের বিখ্যাত বসফরাস প্রনালীর নাম কিভাবে এলো, ক্লিসথেনিস কিভাবে প্রথম গণতন্ত্র আবিস্কার করলেন , Ostracism বা নির্বাসন এর ধারণা টা কিভাবে এলো, গ্রিসের নারী কবি শাপোর কারনে কিভাবে নারীর সাথে নারীর প্রেম বা Lesbianism তত্ত্বটির উদ্ভব ঘটলো ইত্যাদি সব চমকপ্রদ তথ্য। এ বইয়ে রক্ত-মাংসের মানুষ হয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন আড়াই হাজার বছর আগের সক্রেটিস, সক্রেটিসের ছাত্র প্লেটো, পৃথিবীর প্রথম ইতিহাস গ্রন্থ "The Histories"এর প্রণেতা হেরোডটাস, বিজ্ঞানের জনক থেলিস, পৃথিবীর প্রথম ট্রাজেডি নাট্যকার এস্কিলাস, অন্যতম বিখ্যাত ট্রাজেডি নাট্যকার সফোক্লিস ও ইউরিপিডিস, পৃথিবীর প্রথম প্রহসন বা স্যাটায়ার নাট্যকার এরিস্টোফানিস, বিশ্বের চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক হিপোক্রাটিস প্রমুখ ইতিহাস বিখ্যাত লোকেরা। ওই সময়ের ক্ল্যাসিকাল গ্রিসের এসব বাঘা বাঘা ব্যাক্তিদের কাহিনী লেখক যথাযথ পরিমান তথ্য সহকারে গল্পের ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন এই বইতে। আরো একটি বিশেষ তথ্য জানা যায় যে, বিজ্ঞানের জনক থেলিসই প্রথম গ্রিক দেবদেবীর তত্ত্ব বাদ দিয়ে প্রকৃতির দর্শন শুরু করেন। সক্রেটিস তার গুরু বিখ্যাত দার্শনিক এনাক্সাগোরাসের পরামর্শে থেলিসের লিখা বইগুলো পড়েই দর্শনের দীক্ষা নেন, যা থেকে তিনি অনেক চিন্তা ভাবনা করে পরবর্তীতে দর্শনের নতুন এক শাখার জন্ম দেন, যা আমাদের কাছে এখন সুপরিচিত - এথিক্স বা মোরালিটি বা ন্যায়-নৈতিকতা। গ্রিক দেবদেবী জিউস, এথেনা, আফ্রোদিতি, পোসাইডন, প্রমিথিউস, হারকিউলিস প্রমুখ এর বিভিন্ন মিথের কথাও উঠে এসেছে এই বইতে।

এবার তৎকালীন গ্রিসের নারীদের নিয়ে কিছু বলা যাক। প্রাচীন গ্রিসে নারীদের বেসিক্যালি কোন ক্ষমতা ছিলোনা সন্তান জন্ম দেয়া আর দাসীগিরি করা ছাড়া। নিজের ঘরের লোকজন ছাড়া বাইরের কারো সামনে বের হওয়া এবং বাজারে বা শহরে বের হওয়া ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গণতান্ত্রিক এথেন্সের সংসদে সবার ভোট দেয়ার অধিকার থাকলেও সংসদের আশেপাশে নারীদের পা দেওয়াও ছিল নিষিদ্ধ। এমনকি নগরের প্রধান বিনোদন কেন্দ্র ডিওনিসাস থিয়েটারে নাটক দেখাও ছিল নিষিদ্ধ। সোজা বাংলায় - খাচায় বন্দী পশুর সাথে নারীদের খুব একটা তফাত ছিলনা। নারীদের এই শোচনীয় অবস্থার ভেতরেও সেই সময়ে এথেন্সে এক নারী দার্শনিকের আবির্ভাব ঘটে ছাইয়ের স্তুপ থেকে ফিনিক্স পাখির জন্ম নেয়ার মতো, যিনি ছিলেন ওই সময়ের এথেন্সের একমাত্র নারী যিনি একাধারে জ্ঞান, রাজনীতি ও দর্শন চর্চা করতেন। আসপাশিয়া নাম্নী সেই জ্ঞানী দার্শনিক নারী ছিলেন মারাত্নক সুন্দরীও বটে। তিনি ছিলেন সক্রেটিসের জ্ঞান চর্চার প্রধান একজন সংগী এবং শুভাকাঙ্খী। তখনকার নারীবিদ্বেষী এথেন্সের কাছে স্বাভাবিকভাবেই এই নারীকে হতে হয়েছে পর্যদুস্ত এবং নানা হেনস্তার শিকার। এই সুন্দরী প্রজ্ঞাবান নারীর রূপ এবং গুণে প্রভাবিত হয়ে তাকে নিজের ঘরনী করে নেন সেই সময়ের এথেন্সের প্রধান নেতা পেরিক্লিস। এই নারী ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন পেরিক্লিসের একটি ভাষণ লিখার কারনে। স্পার্টার সাথে যুদ্ধে যারা মারা গেছেন তাদেরকে দাফন করার অনুষ্ঠানে পেরিক্লিস এক সুবিখ্যাত, হৃদয়স্পর্শী ভাষণ প্রদান করেন, প্লেটোর মতানুযায়ী সেই ভাষণের নাম "Pericles' Funeral Oration"। পেরিক্লিসের সেই দুর্দান্ত ভাষণ লিখে ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন এই বিদূষী মহিলা।

যুগে যুগে যত মনীষীই জ্ঞানের পিছে ছুটতে গিয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণা গুলোকে প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জ করেছেন, তাদের সবাইকেই হতে হয়েছে চরম হেনস্তার শিকার। যুগে যুগে তারা হয়েছেন বঞ্চিত এবং লাঞ্চিত এবং ষড়যন্ত্রের শিকার। সক্রেটিসের গুরু এনাক্সাগোরাসও হয়েছিলেন ষড়যন্ত্রের শিকার। এনাক্সাগোরাসের দোষ ছিলো একটাই - তিনি বলেছিলেন সূর্য চন্দ্র এগুলোতে কোন দেবতার কারসাজি নেই। সূর্য হচ্ছে মূলত গলিত উত্তপ্ত ধাতুর এক বিশাল পিন্ড। এদিকে গ্রিকরা সূর্য চন্দ্র এগুলোকে দেবতা ভাবতেন। তাদের চোখে এনাক্সাগোরাসের এই মতামত ছিল ব্লাসফেমি এবং এই ব্লাসফেমির মামলায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হতে হয় এনাক্সাগোরাসকে। একইভাবে খোদ সক্রেটিসও শিকার হন ষড়যন্ত্রের এবং হেমলকের বিষ খেয়ে মরতে হয় সর্বকালের সেরা দার্শনিককে। এরকম আরো অনেক ইন্টারেস্টিং তথ্যে ঠাসা এই সুবিশাল ৫৫০ পেজের বইটি।

প্রাচীন গ্রিসের ওই সময়টার প্রতি অনেক আগ্রহ থাকায় আমি এই বইটি সংগ্রহ করি। গ্রিসের সেই ক্ল্যাসিকাল সময়ের ঘটনাবলী জানতে যারা আগ্রহী, তাদের জন্য এই বইটি হাইলি রিকোমেন্ডেড।
Profile Image for Shotabdi.
855 reviews239 followers
March 26, 2024
২.৫/৫

বড় ব্যাপ্তির ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখতে গেলে মোটামুটি একটি বা দুটি প্রধান চরিত্রকে ঘিরে কাহিনী এগুতে হয়। তারা হতে পারে কাল্পনিক বা ঐতিহাসিক চরিত্র। সুনীলের টাইম ট্রিলজিতে এরকমই আছে। নয়তো এলোমেলো হয়ে যায় ঘটনাবলি।
এখানে সুজন দেবনাথ মূল চরিত্র হিসেবে নিয়েছেন সক্রেটিসকে। বলা ভালো, সক্রেটিসই এই উপন্যাসের প্রাণপুরুষ। তাঁর কাহিনীই ব্যাপৃত হয়েছে উপন্যাস জুড়ে। পাশাপাশি চলে এসেছেন হোমার, সফোক্লিস, ইউরিপিডিস, আসপাশিয়া, পেরিক্লিস, প্লেটো, এনিতাস ইত্যাদি সমস্ত ঐতিহাসিকভাবে সত্য চরিত্র। এসেছে মিথোলজির নানা কাহিনী, এসেছে ইশপের কথা।
কাহিনীর বিন্যাস এবং তথ্যে উপন্যাসটিকে বেশ ভালোই বলা চলে।
কিন্তু ভাষা, উপস্থাপনা এবং সঠিকভাবে চরিত্র অঙ্কনে লেখক শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ। একটা সার্থক উপন্যাস কেবল সত্যি ঘটনা আর তথ্যের সমাবেশেই হয়ে যায় না। সুন্দর উপযোগী ভাষা এবং চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য ঠিকভাবে যুগোপযোগীরূপে ফুটিয়ে না তুললে সেটাকে সাহিত্যের পদমর্যাদা দেয়া যায় কি না সে ব্যাপারেই আমার সন্দেহ হয়।
গোটা উপন্যাস পড়তে গিয়ে আমি সেই উপস্থাপনের কারণে বারবার বিরক্ত হয়েছি। সক্রেটিসের মুখের কথা শুনে মনে হচ্ছিল সে যেন পাড়ার কোন ফাজিল ছেলে। তার বন্ধু বান্ধবসহ তারা যেন কোন ইঁচড়েপাকা ছেলেছোকরাদের দল।
প্রাচীন গ্রিসের কাহিনীতে বাংলা উপন্যাসে কেউ প্রাচীন গ্রিসের ভাষা আশা করে না, সেটা সম্ভব ও না। তাই বলে একালের ভাষা ব্যবহারও যে উপন্যাসকে হালকা করে ফেলে সে ব্যাপারে লেখকের বোধহয় একটু সচেতন থাকা উচিত ছিল।
জ্ঞানকুমার, নালিশ কুমার, নছল্লা করা ইত্যাদি একেবারেই বাজে শব্দচয়ন গোটা উপন্যাসের আবহ নষ্ট করেছে বলেই আমার মনে হয়েছে।
এটা নন ফিকশন হিসেবে লিখলে লেখক বোধহয় আরো ভালো করতেন।
Profile Image for Akash Saha.
163 reviews29 followers
October 12, 2021
'হেমলকের নিমন্ত্রণ ' - নামটি শুনলে যে কেউ বুঝে নিবে বইটি সক্রেটিসের জীবনের উপর। লেখক সুজন দেবনাথ অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় এত তথ্যমূলক উপন্যাসটি লিখেছেন। সক্রেটিসের জন্ম থেকে শুরু করে দার্শনিক হয়ে উঠার গল্প শুনিয়েছেন লেখক তার সাবলীল লেখনীর মাধ্যমে। সমকালীন সময়ের গ্রিক নগররাষ্ট্র সম্পর্কে, তাদের জীবন সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে বইটি পড়ে। এছাড়া সক্রেটিসের দর্শন, তার মৃত্যু পাঠকের মনে চিন্তার খোরাক যোগাবে।

বইটি লিখতে লেখক অনেক পরিশ্রম করেছেন, প্রচুর রেফারেন্স আনা সত্ত্বেও বইটি টিপিক্যাল ইতিহাসের বই এর মতো নয়, সাধারণ মানুষের কথ্য ভংগীতে লেখা হয়েছে ৫৫০ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি। তবে কথ্যভাষায় লিখলেও কিছু শব্দ কানে বেধেছে, যেগুলো ঠিক বইয়ের পাতায় মানায় না। বাকিটুকু পার্ফেক্ট বলা চলে, গ্রিক দর্শন নিয়ে পাঠককে আগ্রহী করতে যথেষ্ট।
Profile Image for Yeasmin Nargis.
309 reviews11 followers
April 19, 2025
"Know Thyself"
এই সহজ-সরল বাক্যটি সক্রেটিসের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। ডেলফির অ্যাপোলো মন্দিরের প্রবেশপথে খোদিত এই উক্তি কেবল একটি নৈতিক উপদেশ নয়, বরং জ্ঞানের pursuit-এর এক গভীরতম স্তর।প্রাচীন গ্রিসে "Know Thyself" সর্বপ্রথম ধর্মীয় ও দার্শনিক সূত্রে ব্যবহৃত হয়। এটি ব্যক্তিকে ঈশ্বরের সামনে নিজের সীমাবদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দিত। কিন্তু সক্রেটিস এটিকে রূপান্তরিত করেন একটি যুক্তিবাদী, আত্ম-অনুসন্ধানমূলক আদর্শে। তাঁর মতে, প্রকৃত জ্ঞান শুরু হয় স্বীয় অজ্ঞতার স্বীকৃতি দিয়ে।
"আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না" এই স্বীকারোক্তিই সক্রেটিসের দর্শনের ভিত্তি।
"The unexamined life is not worth living." – Socrates
জীবন যদি প্রশ্নহীন হয়, তবে তা কি সত্যিই বেঁচে থাকার যোগ্য? সক্রেটিসের এই উক্তি শুধু তাঁর নিজের জীবনবোধই নয়, বরং সমগ্র মানবসভ্যতার এক চিরন্তন সত্যকে প্রকাশ করে। সুজন দেবনাথের ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ কেবল একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়, এটি এক গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান, যেখানে সত্য, ন্যায়, জ্ঞান, রাজনীতি ও মানবতার দ্বন্দ্বময় সম্পর্ককে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সক্রেটিস যে একজন দার্শনিক, যিনি প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিলেন, যিনি সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসকে পরীক্ষা করতে বলেছিলেন। কিন্তু এই প্রশ্নই তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। প্লেটো তাঁর শিক্ষক সম্পর্কে লিখেছিলেন—
"No one is more hated than he who speaks the truth."
সক্রেটিস সত্য বলার অপরাধে রাষ্ট্রের শত্রু হয়ে ওঠেন। গণতন্ত্রের মোড়কে যে রাজনৈতিক জটিলতা কাজ করে, যে সমাজ নিজের আরামদায়ক মিথ্যার চাদর সরিয়ে আসল সত্যকে দেখতে ভয় পায়, সেই সমাজ সক্রেটিসকে ‘যুবসমাজকে বিপথে পরিচালনার’ অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়।কিন্তু সত্য কি কখনো ধ্বংস হয়? সক্রেটিসের মৃত্যু কি তার চিন্তার মৃত্যু, নাকি নতুন জ্ঞানের উন্মেষ?
প্লেটো, হেরোডটাস, থেলিস, হিপোক্রেটিসদের মতো জ্ঞানী ব্যক্তিরা কীভাবে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করলেন, কেমন ছিল তখনকার এথেন্সের সামাজিক, রাজনৈতিক ও দার্শনিক প্রেক্ষাপট—এই উপন্যাস সেইসব দার্শনিক অনুসন্ধানের দলিল।
"He who opens a school door, closes a prison." – Victor Hugo
এই উপন্যাস দেখায়, কীভাবে এথেন্স জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল, কীভাবে দর্শন, সাহিত্য, ইতিহাস, গণিত, চিকিৎসা, এবং গণতন্ত্রের মতো ধারণার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু সেই আলো কি চিরস্থায়ী? নাকি অন্ধকারের ভয় থেকেই যায়?
সক্রেটিসের স্ত্রী জেনথিপি চিৎকার করে বলেছিলেন,
“এই শহর জানে না কী হারাতে যাচ্ছে!”
সেই শহর এথেন্স, যাকে আমরা আজকে জ্ঞান আর দর্শনের তীর্থভূমি বলি তারই হাতে পতিত হয় এক মহান মনীষী। সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো সে যুবকদের পথভ্রষ্ট করে, সে দেবতাদের অস্বীকার করে, নতুন দেবতার ধারণা প্রচার করে। সেই এথেন্স, যেখান থেকে গণতন্ত্রের সূচনা, সেখানেই প্রথমবার গণতন্ত্রের রূপে দেখা দিলো সীমাবদ্ধতা। বিচার হলো, সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই। মানুষের আবেগ আর মতবিভাজনের রাজনীতি ছাপিয়ে গেলো যুক্তি আর প্রজ্ঞাকে।জুরি বোর্ডের রায় এলো: মৃত্যুদণ্ড।
সক্রেটিস পালাতে পারতেন। তার বন্ধু ক্রিতো টাকা দিয়ে পাহারা কেনার ব্যবস্থা করেছিল। অনেকেই অনুরোধ করেছিল সে যেন পালিয়ে যায়।
কিন্তু সক্রেটিস বলেন,
"আমি যে আইন ও ন্যায়ের কথা বলে জীবন কাটালাম, তার বিরুদ্ধেই যদি যাই, তবে আমার জ্ঞান বৃথা। আমি সত্যের পথে হাঁটব, মৃত্যু এলেও তা গ্রহণ করব।"
জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে হেমলক বিষ হাতে তুলে নিলেন সক্রেটিস। শিষ্যরা কাঁদছে, কান্নারত প্লেটো কেবল সব লিখে রাখছে সক্রেটিস কী বলছে, কী ভাবছে। আর সক্রেটিস? শান্ত, স্থিরভাবে বললেন,
“মৃত্যু এক প্রকার মুক্তি। যদি আত্মা থাকে, তবে আমি আরও জ্ঞানীদের সঙ্গে মিলবো। আর যদি না থাকে, তবে অন্তত শীতল ঘুমে বিশ্রাম পাবো।”
হেমলক পান করে বিদায় নিলেন ইতিহাসের এই শ্রেষ্ঠ গুরু। কোনো রাজা, সৈন্য, ধনীর মতো নয় বরং প্রশ্ন আর যুক্তির আলোয় আমাদের বাঁচার পথ দেখিয়ে গেলেন। তার মৃত্যুর পরে, যারা তাকে অপবাদ দিয়েছিল, তারাই অনুশোচনায় জর্জরিত হলো। সক্রেটিসের দর্শন, প্লেটোর হাত ধরে পৌঁছে গেল দুনিয়ার প্রতিটি কোণে। এই সেই সক্রেটিস —
যার কথা আজও লেখা হয়, পড়া হয়, ভাবা হয়।
যার জীবন বলে —
"সত্য কখনো পরাজিত হয় না, হয়তো শুধু সাময়িকভাবে থেমে যায়।"
গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ
📌 ১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
উপন্যাসটি গ্রীক ক্লাসিক্যাল যুগের সঠিক তথ্য ও ঘটনাবলী অনুসারে রচিত।লেখক অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থা ফুটিয়ে তুলেছেন। সক্রেটিসের বিচার, এথেন্স-স্পার্টা সংঘাত, গণতন্ত্রের উত্থান-পতনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো অত্যন্ত বাস্তবধর্মীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
📌 ২. চরিত্রায়ণ
লেখক সক্রেটিস, প্লেটো, হেরোডটাস, পেরিক্লিস, আসপাশিয়া, থেলিস, হিপোক্রেটিস প্রমুখ চরিত্রকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও জীবন্ত করে তুলেছেন।চরিত্রদের ব্যক্তিগত জীবন, দার্শনিক চিন্তা ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটে উঠেছে।সক্রেটিস কেবল এক মহাপুরুষ নন, বরং একজন চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী ও মানবপ্রেমী ব্যক্তি হিসেবে পাঠকের সামনে উঠে আসেন।
📌 ৩. জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্মেষ
দর্শন, সাহিত্য, গণিত, ইতিহাস, চিকিৎসাবিজ্ঞান, থিয়েটার প্রাচীন গ্রীসের প্রতিটি জ্ঞান শাখার বিকাশ এখানে তুলে ধরা হয়েছে। সক্রেটিসের যুক্তিবাদী চিন্তা ও তার প্রভাব কিভাবে পরবর্তী যুগের চিন্তাবিদদের গড়ে তুলেছে, তা স্পষ্টভাবে বর্ণিত।প্লেটোর ‘আদর্শ রাষ্ট্র’ ভাবনা, হেরোডটাসের ইতিহাস রচনা, থেলিসের বিজ্ঞানের প্রচলন ও চিকিৎসা শাস্ত্রে হিপোক্রেটিসের অবদান অত্যন্ত চিত্তাকর্ষকভাবে উপস্থাপিত।
📌 ৩. বন্ধুত্বের মহান চিত্র
সক্রেটিসের বন্ধুদের সাথে তার সম্পর্ক কেবল সামাজিক নয়, ছিল অন্তরঙ্গ ও গভীর দার্শনিক স্তরের। তারা সক্রেটিসের চিন্তা, দর্শন, জীবনদর্শনের অনুরাগী। তাকে তারা শুধু শিক্ষক বা মেন্টর হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন এক আলোকবর্তিকা হিসেবে।ক্রিতো, সক্রেটিসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডের রায় শোনার পর ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। তিনি সক্রেটিসকে কারাগার থেকে পালাতে অনুরোধ করেন, অর্থের ব্যবস্থা, গোপন জায়গা, সব কিছু ঠিক করে রাখেন শুধু বন্ধু বাঁচুক, এই আশায়।চেরোফোন, সক্রেটিসের একনিষ্ঠ অনুসারী, দেলফির ওরাকলের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন—
“এই পৃথিবীতে কি কেউ আছেন সক্রেটিসের চেয়ে জ্ঞানী?”
ওরাকল জবাব দেয়—
"না, সক্রেটিস-ই সর্বজ্ঞ।"
এলসিবিয়াডিস – সক্রেটিসের রূপ-প্রতিভা-সমৃদ্ধ ছাত্র, যিনি তার জীবনকে সক্রেটিসের প্রভাবে পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন। তার ভেতর সক্রেটিসের প্রতি এক প্রেম, এক অপরাধবোধ, এক তীব্র টান ছিল—যা ধীরে ধীরে এক জটিল ট্র্যাজেডিতে রূপ নেয়।সিমন – মুচি হলেও জ্ঞান অন্বেষণের আশায় সক্রেটিসের সংলাপে অংশ নিতেন। বন্ধুত্ব এখানে শ্রেণি ভেদাভেদ ভুলিয়ে দেয়।প্লেটো – যিনি সক্রেটিসের মৃত্যুর পর তাঁর দর্শনকে বইয়ের পাতায় অমর করে রাখেন। এই বন্ধুত্ব কালজয়ী। গুরু আর শিষ্যের এই সম্পর্ক ভবিষ্যতের জ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণ করে।
🟠 আসপাশিয়া ও পেরিক্লিস: ইতিহাসের দুই বিপ্লবী চরিত্রের বিশ্লেষণ-
প্রাচীন এথেন্সের ইতিহাসে আসপাশিয়া ও পেরিক্লিস শুধু দুটি নাম নয়, তারা এক যুগের প্রতীক। একদিকে একজন নারী, যিনি সমাজের রীতিনীতি ভেঙে বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন; অন্যদিকে একজন রাজনীতিবিদ, যিনি গণতন্ত্রের স্বর্ণযুগের স্থপতি হয়েও প্রেম ও যুক্তির কাছে মাথা নত করেছিলেন। তাদের সম্পর্ক শুধু প্রেমের নয়, বরং এক ধরনের মৈত্রী, সহযোগিতা এবং আদর্শিক সংঘাতেরও।
আসপাশিয়া: নিষিদ্ধ প্রতিভা
আসপাশিয়া ছিলেন মিলেতাসের এক বিদেশী নারী, কিন্তু এথেন্সের সমাজে তার উপস্থিতি ঝড় তুলেছিল। আসপাসিয়া শুধু রূপবতী ছিলেন না তিনি ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা এক নারী। দেবী এথিনা কিংবা হেলেনের মতো রূপে নয়, তিনি আলোচিত ছিলেন তার প্রখর বুদ্ধিমত্তা, বাগ্মিতা এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য।সে সময় নারীদের গৃহকোণে আবদ্ধ থাকার রীতি ছিল, কিন্তু আসপাশিয়া শিক্ষিতা, বাক্পটু ছিলেন। তাঁকে "বিউটি উইথ ব্রেইন" বললে কম বলা হয় তিনি ছিলেন রূপ ও জ্ঞানের এক অসাধারণ সমন্বয়।
তিনি সক্রেটিস, পেরিক্লিসসহ বহু দার্শনিক ও রাজনীতিবিদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কেবল প্রেমিকা বা উপপত্নী হিসেবে নয়, বরং একজন ‘Intellectual companion’ হিসেবে। মনে করা হয়, পেরিক্লিসের বিখ্যাত বক্তৃতার অনেকটাই তিনি লিখে দিতেন। অথচ ইতিহাস তাকে সেই প্রাপ্য স্বীকৃতি দেয়নিএটাই পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা।
পেরিক্লিস: গণতন্ত্রের রূপকার, প্রেমে সাহসী বিপ্লবী
পেরিক্লিস শুধু এথেন্সের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কই ছিলেন না, ছিলেন এক অসাধারণ রাজনৈতিক কৌশলবিদ ও প্রেমিক পুরুষ। তার প্রেম ও রাজনীতি ছিল সমান্তরাল দুই রণক্ষেত্র, যেখানে তিনি যুগপৎ লড়েছেন।সক্রেটিসের ভাষায়, পেরিক্লিস ছিলেন এক ঝানু রাজনীতিবিদ। আইন নিজের হাতে না বদলে, নিজের স্ত্রীকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে আসপাসিয়াকে ঘরে তোলা একদিকে নিষ্ঠুর, অন্যদিকে এক সাংঘর্ষিক সাহস। এতে স্পষ্ট, আসপাসিয়ার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল আবেগপ্রবণ নয়, বরং জ্ঞানগর্ভ ও আত্মিক।
পেরিক্লিস বুঝেছিলেন, ক্ষমতায় থাকা মানে সবসময় মঞ্চের আলোয় থাকা। আসপাসিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। ধর্মান্ধতা ও গোঁড়ামির মুখে তার আশেপাশের মানুষজনকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তবু তিনি আসপাসিয়াকে ছাড়েননি, শেষ মুহূর্তে তাকে রক্ষা করেছিলেন। এটি তার নৈতিক সাহস এবং প্রেমের প্রতি দায়বদ্ধতার নিদর্শন।এথেন্সের গণতন্ত্র পেরিক্লিসের হাত ধরে যে আলো দেখেছিল, সেই পথচলায় তার সহচরী ছিলেন আসপাসিয়া। অর্থাৎ, ইতিহাসের এই জুটি শুধু ভালোবাসায় নয়, দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক আলোকধারায়ও যুগলচর।
আসপাসিয়া ও পেরিক্লিস একজন ছিলেন নারীমুক্তির প্রতীক, অন্যজন গণতন্ত্রের রূপকার। একদিকে রূপ, মেধা, এবং বুদ্ধির সম্মিলন; অন্যদিকে শক্তি, প্রেম ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা। তারা দুজন যেন সেই গ্রিক ট্র্যাজেডির দুটি মুখ যেখানে ভালোবাসা, সমাজ ও রাজনীতি সব একে অপরকে ছুঁয়ে যায়।তাদের সম্পর্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রেম শুধু আবেগ নয়, তা দায়িত্ব, ত্যাগ, ও আত্মিক যোগাযোগের এক মহৎ রূপ।
🟠''হেমলকের নিমন্ত্রণ” নামটি নিজেই একটি দার্শনিক প্রতীক। হেমলক যা সক্রেটিস পান করেছিলেন মৃত্যুর বরণ করতে এখানে এক নিঃশব্দ প্রশ্নের প্রতীক। মৃত্যু এখানে কেবল জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং একটি উত্তরণ। লেখক যেন আমাদের বারবার জিজ্ঞেস করেন আমরা কি সত্যিই বেঁচে আছি? নাকি সমাজ, নিয়ম আর দায়িত্বের খাঁচায় আবদ্ধ এক কৃত্রিম জীবনের ভেতর বেঁচে থাকার অভিনয় করছি?
এই উপন্যাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দার্শনিক দিক হলো—জীবনের অর্থহীনতা ও তার মধ্যেই অর্থ খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা। লেখক কোথাও বলেন না, “জীবন অর্থহীন”, কিন্তু পুরো উপন্যাসে ছড়িয়ে থাকা একাকিত্ব, ভাঙন, অভিমান আর প্রশ্নগুলো সেই নিরব সত্যটাকেই প্রকাশ করে।
মানুষের ভেতরের দ্বিধা, আত্মপরিচয়ের সংকট, সম্পর্কের ভাঙন ও জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার বেদনা—এইসব উপাদান উপন্যাসটিকে দার্শনিক রূপ দেয়। ধর্ম, নৈতিকতা, প্রেম, সামাজিকতা—সবকিছুকে ছুঁয়ে লেখক এমন এক অনির্ধারিত শূন্যতার দিকে পাঠককে ঠেলে দেন, যেখানে নিজেকে আবিষ্কার করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
🟠পাঠপ্রতিক্রিয়া:
২৫০০ বছর আগের এক দার্শনিকের নাম সক্রেটিস।যাকে নিয়ে লেখা কাহানি " হেমলকের নিমন্ত্রণ "। একবাক্যে বললে, "হেমলকের নিমন্ত্রণ" শুধু একটি উপন্যাস নয়, এটি সময়ের সীমানা ভেঙে ফেলা এক জাদুকরী অভিজ্ঞতা। এই উপন্যাস পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে আমি যেন এথেন্সের অলিন্দে হাঁটছি, সক্রেটিসের সংলাপ শুনছি, বন্ধুদের উদগ্রীব আকুতি, আদালতের রুদ্ধশ্বাস পরিবেশ, আর শেষের সেই চিরন্তন নীরবতা অনুভব করছি।
সুজন দেবনাথ যে ভাষার জাদুতে আমাদের এতদূর টেনে নিয়ে যেতে পেরেছেন, তা অবিশ্বাস্য! কাহিনির ঘোর থেকে এখনও বের হতে পারিনি। মনে হয়েছে সক্রেটিস আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে, তার চোখে চিরন্তনের দীপ্তি, ঠোঁটে অটল সত্যের ভাষ্য। মনে হয়েছে, এই তো আমি সেখানে ছিলাম তার পাশে, তার শিষ্য হয়ে, তার বন্ধু হয়ে।
বন্ধুত্ব, ন্যায়, আত্মজিজ্ঞাসা, মৃত্যু এই চারটি স্তম্ভকে কেন্দ্র করে নির্মিত প্রতিটি অধ্যায় যেন দর্শনের নতুন এক জানালা খুলে দেয়। সক্রেটিসের "Know thyself" বারবার ফিরে এসেছে নিজের জীবনের প্রতিফলন হিসেবে।
শেষ অধ্যায়ে এসে হৃদয়টা ভার হয়ে আসে। চোখে জল, মনে প্রশ্ন, আর আত্মায় যেন কোনো চিরন্তন নীরবতা নেমে আসে। এই বইটি শুধু আমার পাঠক মনকে নাড়া দেয়নি, আমার অস্তিত্বে প্রশ্ন তুলেছে, আমি কে? আমি কতটুকু নিজেকে জানি?
হেমলকের নিমন্ত্রণ আমার জীবনের সেরা বইগুলোর একটি হয়ে থাকবে, যে বই শুধু পড়া হয় না অনুভব করা হয়। সুজন দেবনাথ তাঁর গবেষণা ও লেখনীর মাধ্যমে শুধু এক ঐতিহাসিক কাহিনি বলেননি, বরং একটি চিরকালীন প্রশ্ন তুলেছেন "আমরা কি সত্যের জন্য প্রস্তুত?" ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ শুধু সক্রেটিসের জীবন ও মৃত্যুর গল্প নয়, এটি আমাদের সভ্যতার এক দর্পণ, যেখানে আমরা নিজেদের অস্তিত্ব, ন্যায়বিচার ও মানবতার প্রকৃত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারি।
"To fear death, gentlemen, is no other than to think oneself wise when one is not." Socrates
Profile Image for Tahjiba Adrita.
107 reviews35 followers
January 26, 2022
বইটির সঙ্গে আমার পরিচয় একদম হুট করেই। একদিন বিকালে বাতিঘরে এই বই সেই বই ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে এই বইটি হাতে পরে যায়। "হেমলকের নিমন্ত্রণ" নাম দেখে মনে হয়েছিল বইটি কোনো ভারতীয় লেখকের লেখা,কেন মনে হয়েছিল আমি জানি না। কিন্তু ফ্ল্যাপের লেখা পড়ে আর প্রকাশনী দেখে বুঝলাম আরেহ না এতো বাংলাদেশী লেখক।এরপর একটু নড়ে চড়ে উঠলাম, প্রথম কয়েক পেইজ পড়ে বুঝলাম বই টা সম্ভবত সক্রেটিস কে নিয়ে লেখা। প্রথম কয়েক পেইজ পড়ে বাকি পেইজগুলো পড়ার আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় ধুম করেই বইটি কিনে ফেলি।তখনো খুব বেশী এক্সপেকটেশন ছিলো না বইটি নিয়ে,কিন্তু পেইজের পর পেইজ শেষ হয় আর বইটির প্রতি আকর্ষণ যেনো আরো বেড়ে যায়। এত অসাধারণ তথ্যবহুল লেখা বর্তমান সময়ে খুব কম চোখে পড়েছে।লেখক অনেক গবেষণা করে উপন্যাস টি লেখেছেন।অনেক তথ্যবহুল একটি লেখা কিন্তু উপন্যাসের মান কমেনি একটুও।একমুহূর্তের জন্যেও বিরক্তি আসেনি।কী এক অদ্ভুত আকর্ষণ, এই আকর্ষণ কী লেখকের লেখনী শক্তির নাকি সক্রেটিসের নিজের এই প্রশ্নের উত্তর জানি না আমি। সক্রেটিস বলেছিলেন "know thyself /নিজেকে জানো" কিন্তু সক্রেটিস কে জানতে হলে কী করতে হবে?সক্রেটিস কে জানতে হলে জানতে হবে সক্রেটিস এর সময় কে,সক্রেটিস এর পারিপার্শ্বিক কে,জানতে হবে এথেন্স কে যে শহরে হেঁটে বেড়িয়েছেন তিনি। এথেন্স শহর,সেই সময় সবকিছু মিলিয়েই তো সক্রেটিস। সক্রেটিস হচ্ছেন আসলে নিজেই একটা সময়,যে সময়ের হাত ধরে এসেছে আমাদের বর্তমান সময়।আমার মনে হতো দর্শন বুঝি খুব বিরক্তিকর কোন বিষয়,এই উপন্যাস পডে বুঝলাম দর্শন কত সুন্দর,কত জীবন ঘনিষ্ঠ। দর্শন ছাড়াও এই উপন্যাসে এসেছে বিজ্ঞান,সাহিত্য,স্থাপত্য,চিকিৎসা সব বিষয়ের কথা।এসেছে রাজনীতি গণতন্ত্র। সব মিলিয়েই আসলে সক্রেটিস এর সময়কাল।

এই উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রতি পর্বের শুরু তে মনীষীদের উক্তি আর যে কোনো তথ্যে বিস্তারিত ফুটনোট,এই দুইটি বই টির সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দেয়।অনেক জায়গায় অনেক চরিত্র বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে, অগোছালো লাগতে পারে কিন্তু লেখকের গল্প বলার ক্ষমতা দিয়ে এই ব্যাপার উপেক্ষা করা যায়।লেখক এমন এক গল্প বলেছেন যেখানে সক্রেটিস কে একজন জলজ্যান্ত মানুষ হিসেবে কল্পনা করতে পাঠক বাধ্য যেখানে সক্রেটিস হাসে,কথা বলে,হেঁটে বেড়ায়,জ্ঞান বিতরন করে।অনেক বড় উপন্যাস তাও কেন যেনো মনে হচ্ছে অনেক তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো। উপন্যাস টি নিয়ে আরো আলোচনা দরকার,প্রথম উপন্যাস হিসেবে লেখক নিসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার।

উপন্যাস টি শেষ হওয়ার পরে প্রশ্ন মনে ঘুরপাক খাচ্ছে এত যুগ পরে এসেও আদৌ কী আমরা জাগতিক নিয়মের বাইরে অন্যরকম কিছু কে সহজে মেনে নিতে পারি? ভিন্নমত পোষণ কারীদের কে কী সমাজ এখনো মেনে নিতে পারে? যারা একটু ভিন্ন ভাবে চিন্তা করে তাদের কী আড়ালে আমরা এখনো পাগল ডাকি না? আসলে গলদ টা কোথায়? আমরা কী পরিবর্তন মেনে নিতে পারি না? নাকি বদলাতে আমাদের ভয় হয়?
Profile Image for Kripasindhu  Joy.
682 reviews6 followers
January 29, 2025
এই বই পড়তে গিয়ে বেশ কিছু জায়গায় বিরক্তি জন্মেছে।
প্রথমটা হলো, গল্প বলার ধরনে। গল্প না বলে ইতিহাসের বই লিখছেন বলেই বেশি মনে হয়েছে। ঐতিহাসিক উপন্যাসে রূপান্তর করতে পারেননি। গল্পের ভেতরে কিভাবে ইতিহাস আনতে হয় সেই কাজে লেখক দক্ষ নন। এইজন্য অনেক সময় দেখা গিয়েছে পাতার পর পাতা শুধু ইতিহাস-বিষয়ক ফিচার লেখা হয়েছে।

দ্বিতীয়টা হলো, ভাষা। কাহিনি হলো আড়াই হাজার বছর আগের কিন্তু ভাষা হালকা-পাতলা, পটকার মতো। ভূমিকাতেই লেখক জানিয়েছেন তিনি একবিংশ শতাব্দীর মতো করে লিখেছেন। লেখার ধরন এই বইটাকে আরও খারাপ করে দিয়েছে।

একেবারে শুরুর দিকেই পদার্থবিজ্ঞানের একটি বিষয় নিয়ে উদাহরণ দিয়েছেন। যার অস্তিত্ব সেই সময়ে ছিলই না। বিষয়টা অনেকটা একশ বছর আগের কোনো মানুষের হাতে আইফোন তুলে দেওয়া।
আরেকটি হলো, নাটুকেপনা আর ন্যাকামী। সক্রেটিস হলো নালিশ কুমার! প্লেটো হলো চওড়া বাবু! এটা উপন্যাস নাকি বাচ্চাদের জন্য লেখা কোনো রূপকথা?

লেখক যে এই বইটি লেখার জন্য পরিশ্রম করেছেন তা বেশ স্পষ্ট। কিন্তু ভাল করার অনেক কিছুই ছিল। প্লট সম্ভাবনাময়। যদি একে উপন্যাস হিসেবে লিখতেন তবে সাহিত্যের জন্য এটি বড় সম্পদ হতে পারতো।
Profile Image for Musharrat Zahin.
465 reviews565 followers
June 7, 2024
এই বইটা নিয়ে এর আগে তেমন কোনো লেখা আমার চোখে পড়েনি। এইবারের বইমেলায় হুট করেই বইটা হাতে নিই, আর দুই-চার পাতা পড়ে ঠিক করে ফেলি যে বইটা আমি নিচ্ছি৷ 'হেমলকের নিমন্ত্রণ' নাম দেখে কেন জানি মনে হয়েছিল লেখক হয়তো ভারতীয় কেউ হবেন। কিন্তু যখন জানতে পারি যে এইটা বাংলাদেশি লেখকের লেখা, বেশ অবাক হয়েছিলাম। কারণ অনেকদিন পরে এমন ইন-ডেপথ গবেষণা করে লেখা একটা বই পড়লাম। ছোটবেলা থেকেই পাঠ্যবইগুলোয় দেখতাম বিশ্বে যা কিছু প্রথম আবিষ্কার হয়েছে, তার প্রায় সবকিছুই যেন গ্রীকদের করা। এই যেমন গণতন্ত্র, দর্শন, অলিম্পিক, ম্যারাথন, বীজগণিত, এথিক্স, জিমনেশিয়াম, জিমন্যাস্ট, লজিক, লাইব্রেরি, জাদুঘর, উপন্যাস, চিকিৎসাবিদ্যাসহ আরো নানান জিনিসের কারিগর এই গ্রিকরাই। তাই এই বইটার পরিসর এত বড় যে সবকিছু নিয়ে একটু একটু করে লিখতে গেলেও আলাদা একটা বই লেখা হয়ে যাবে। আবার লিখতে যেয়ে খেয়াল হলো নানান ব্যস্ততায় প্রায় এক মাস নিজের জন্য কিছু লেখা হয়নি। তাই মনমতো শব্দও মাথায় আসছে না, রিভিউ লেখার প্যাটার্নের খেইটাও খোয়া গেছে। 

.

.

.

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এথেন্সে ছিল জ্ঞানের ছড়াছড়ি। মনে হচ্ছিল সবাই কোনো না কোনো বিষয় আবিষ্কার করে যাচ্ছে। সবাই পাল্লা দিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের একের পর এক সৃষ্টিশীল কর্ম তৈরি করে যাচ্ছে! নাটক, সাহিত্য, গণতন্ত্র, ইতিহাস, দর্শন, চিকিৎসা, ভাস্কর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন, রাজনীতি– সবকিছুর আঁতুড়ঘর যেন এই এথেন্স। 



এই শহরেই জন্ম নেন সক্রেটিস। কিন্তু তাঁর চিন্তাভাবনা, আচার-আচরণ সাধারণ মানুষের চাইতে একেবারেই ভিন্ন। বাবা ভাস্কর্য বানালেও, তাঁর এসব নিয়ে কোন মাথাব্যথাই নেই। তাঁর প্রিয় কাজ হল মানুষের সাথে প্রশ্ন-প্রশ্ন খেলা। শুধু একা খেলেই সে ক্ষান্ত হয় না, তাঁর সমবয়সী অন্যদেরও সে এই খেলা শিখিয়ে দেয়। দেব-দেবীদের মানা গ্রীকদের কাছে তখন সক্রেটিস আতংকের নাম। কারণ তাঁরা কোনোভাবেই সক্রেটিসের যুক্তির কাছে পেরে ওঠেন না। তাই তরুণদের কাছে তিনি জনপ্রিয় হলেও তাদের বাবাদের কাছে আতঙ্কের নামও সক্রেটিস। তাদের দাবি ছেলেদের নষ্ট করে ফেলছে সক্রেটিস। প্রশ্ন করার এই খেলাটার নাম তিনি দিয়েছিলেন ‘সক্রেটিস মেথড’। এটা যেন বয়স্ক সবার ঘুম হারাম করে ফেলছে। 



এখন যে গণতন্ত্রের গান গাওয়া হয়, তার শুরুটাও হয়েছিল গ্রীসেই। অবশ্য সেটা সক্রেটিসেরও আগের আমলে। তবে সক্রেটিসের আমলে আমরা দেখতে পাই গণতন্ত্রের পূজারী পেরিক্লিসকে৷ সেই সময়ের এথেন্স কিভাব্র পরিচালনা করা হতো, সেটাও ছিল একটা দেখার মতো জিনিস। এথেন্সের সবাই গণতন্ত্রক্ত সাদরে গ্রহণ করলেও সক্রেটিস কখনোই গণতন্ত্রের সাথে একমত ছিলেন না। কারণ মানুষ বুদ্ধি দিয়ে বিচার করার চেয়ে আবেগ দিয়ে চিন্তা করতে বেশি পছন্দ করে। অন্য কেউ কিছু বোঝালে সেটাতেও হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলায়। সক্রেটিস বলেন, গণতন্ত্র হলো মূর্খদের শাসন। গণতন্ত্রে চাইলে সংখ্যাগরিষ্ঠরা অযোগ্য কাউকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিতে পারেন, তাই সক্রেটিস গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়। ফলে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি থাকে কি সেখানে থাকে। এই গণতন্ত্রই হয়তো পেরিক্লিসের ডাউনফল কিংবা সক্রেটিসের মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 



এই বইয়ে সেই সময়কার গ্রিক নারীদের কথাও বলা হয়েছে। তখন তারা সবার আড়ালেই থাকতেন। পুরুষেরা জ্ঞান চর্চা করলেও নারীদের সেই সুযোগটা ছিল না। গণতান্ত্রিক এথেন্সের সংসদে সবার ভোট দেয়ার অধিকার থাকলেও সংসদের আশেপাশে নারীদের পা দেওয়াও ছিল নিষিদ্ধ।  কিন্তু তাদের ব্যতিক্রম ছিলেন আশপিয়া। ওই সময়ের এথেন্সের একমাত্র নারী যিনি একাধারে জ্ঞান, রাজনীতি ও দর্শন চর্চা করতেন। সবাইকে আশপিয়াকে তাঁর সৌন্দর্যের জন্য চিনলেও, সক্রেটিস তাঁকে চিনতেন সবচেয়ে জ্ঞানী নারী হিসেবে। সক্রেটিস নিজের চেয়েও বড় করে আশপাশিয়াকে দেখে। আশপাশিয়ার কাছ থেকে প্রায়ই সেই জ্ঞানার্জনের জন্য আসে। আশপিয়ার জ্ঞানের প্রেমে পড়েই তাঁকে বিয়ে করেন পেরিক্লিস। সেই থেকে পেরিক্লিসের সব সিদ্ধান্তের পেছনেই আশপিয়ার বড় অবদান থাকে। তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন পেরিক্লিসের একটি ভাষণ লিখার কারনে। স্পার্টার সাথে যুদ্ধে যারা মারা গেছেন তাদেরকে দাফন করার অনুষ্ঠানে পেরিক্লিস এক সুবিখ্যাত, হৃদয়স্পর্শী ভাষণ প্রদান করেন, সেই ভাষণের নাম "Pericles' Funeral Oration"। পেরিক্লিসের সেই দুর্দান্ত ভাষণ আপনি ইন্টারনেটে খুঁজে পাবেন। 



সক্রেটিসের সবচেয়ে বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, "আমি শুধু একটি জিনিসই জানি। সেটি হচ্ছে - আমি আসলে কিছুই জানিনা।" কী শক্তিশালী একটা বাক্য। সক্রেটিসের সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলেন দুইজন যারা তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাথে ছিলেন - ক্রিতো আর চেরোফোন। উচ্চবংশের ছেলে প্লেটো ছিলেন সক্রেটিসের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র। প্লেটো ছিলেন জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্যের এক দুর্দান্ত প্রতিভা।  তার সময়েই এথেন্সে দর্শন, নাটক, ইতিহাস এসবের চরম উন্নতি ঘটে। এই সময়েই এথেন্স আর স্পার্টার মধ্যে ইতিহাস বিখ্যাত 'পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধ' নামক ২৭ বছরের এক দীর্ঘ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বইয়ে এই যুদ্ধের বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে। 



প্রাচীন গ্রিস কিন্তু কেবল এথেন্স না, স্পার্টা, থিবসসহ অন্যান্য নগররাষ্ট্রও ছিল। যুদ্ধে বা রাজতন্ত্রে স্পার্টা এগিয়ে থাকলেও, জ্ঞান ও গণতন্ত্র চর্চায় এথেন্স ছিল সবচেয়ে এগিয়ে। এথেন্স ছিল জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্পকলা, ভাস্কর্য, নাটক, সাহিত্য এসব দিক দিয়ে শীর্ষে। এথেন্সকে বলা হত জ্ঞানের নগরী। আর পেরিক্লিস ছিলেন সেই নগরীর নায়ক। তিনিই এথেন্সে সব রকমের জ্ঞান-বিজ্ঞান, নাটক, দর্শন, সাহিত্য চর্চা চালু রেখেছিলেন। গ্রিসের বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান দেবী এথিনার মন্দির 'পার্থেনন' তাঁর সিদ্ধান্তেই বানানো। তবে এথেন্সের ধনী শ্রেণির কাজ বলতে তখন কিছুই ছিল নাহ। যা করার সব দাসেরাই করে ফেলতো,জলপাই বাগান চাষ করে,জলপাই তেল বিক্রি করে দেবী এথিনা আর দেবতা জিউসের দয়ায় এথেন্স ছিল স্বাবলম্বী।



কী নেই এই বইয়ে? এখানে আছে ট্রয় নগরীর কথা, কেন এই যুদ্ধের এমন পরিণতি হয়েছে সে কথাও আছে। আছে পিথাগোরাস ও তাঁর শিষ্যদের কথা, ম্যারাথন দৌড়ের উৎপত্তির কথা, ট্র্যাজেডির জনক সফেক্লিস এবং তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইউরিপিডিসের কথা। প্রাচীন গ্রিসে অ্যাপলোকে চিকিৎসার দেবতা মনে করা হতো। গ্রিসের মানুষরা ভাবতেন যে দেবতার বংশের বাইরে কেউ সাধারণ মানুষের চিকিৎসা করতে পারবেন না। কিন্তু প্লেগের সময় সেই প্রথা ভেঙে এগিয়ে আসেন হিপোক্রেটস। তিনি তাঁর শিষ্যদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীক্ষিত করেন। সেই সময় তিনি তাঁর শিষ্যদের যেই শপথ বাক্য পাঠ করান, সেই একই শপথ বাক্য আজো মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা প্রথম ক্লাসে পাঠ করেন। 



'গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ' হিসেবে খ্যাত “অলিম্পিক গেমস” এর শুরুটা কিভাবে হয় সেই ইতিহাসও আছে এখানে। এই বইয়ে আরো জানা যায় কিভাবে ট্র্যাজেডি নাটকের উৎপত্তি ঘটলো, কিভাবে বিশ্বের প্রথম থিয়েটার 'ডিওনিসাস থিয়েটার' বানানো হলো, ক্লিসথেনিস কিভাবে প্রথম গণতন্ত্র আবিস্কার করলেন , Ostracism বা নির্বাসন এর ধারণা টা কিভাবে এলো, গ্রিসের নারী কবি শাপোর কারনে কিভাবে নারীর সাথে নারীর প্রেম বা Lesbianism তত্ত্বটির উদ্ভব ঘটলো ইত্যাদি সব চমকপ্রদ তথ্য। 



এই বইয়ে আরও উঠে এসেছে কিভাবে সক্রেটিস তার গুরু বিখ্যাত দার্শনিক এনাক্সাগোরাসের পরামর্শে থেলিসের লিখা বইগুলো পড়েই দর্শনের দীক্ষা নেন, যা থেকে তিনি অনেক চিন্তা ভাবনা করে পরবর্তীতে দর্শনের নতুন এক শাখার জন্ম দেন, যা আমাদের কাছে এখন সুপরিচিত - এথিক্স বা মোরালিটি বা ন্যায়-নৈতিকতা।  এথেন্সকে পুণ: নির্মাণ করা স্থপতি ফিডিয়াস, সক্রেটিসের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা দেওয়া এনিতাস,ম্যালিয়াস থেকে শুরু করে গ্রিক দেবদেবী জিউস, এথেনা, আফ্রোদিতি, পোসাইডন, প্রমিথিউস, হারকিউলিস ইত্যাদির কথাও উঠে এসেছে এই বইতে।



আরও হোমারের ইলিয়াড ও ওডিসির কথা যে কিভাবে গ্রিকের মানুষেরা এটা ধর্মগ্রন্থের মতো মান্য করতেম, প্রমিথিউসের ঘটনা নিয়ে এস্কিলাসের লেখা বিশ্বের প্রথম ট্র‍্যাজেডির, এসেছে এস্কিলাসের ছাত্র সফোক্লিসের কথা যিনি মঞ্চাভিনয়ের পাশাপাশি রচনা করেন মৌলিক ট্র‍্যাজেডি 'কিং ইডিপাস'। আছে সেই ডেলফির মন্দিরের কথা, যেখানে মানুষ সত্যের সন্ধানে যায়। আর এখানেই সক্রেটিসকে সেই সময়ের সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। আছে ইতিহাসের জনক হেরাডোটাসের কথা, যিনি নাকি গ্রিসের সমস্ত ইতিহাস মুখস্থ করে ফেলেছেন। এমনকি ম্যারাথন যুদ্ধের বর্ণনায়ও তার মুখে ফুলঝুরি। সক্রেটিস শুনে অবাক হয়ে বললেন এসব ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের জন্য লিপিবদ্ধ করো। বিশাল মোটা পেপিরাস কাগজে হেরাডোটাস লিখে ফেললেন ইতিহাসের প্রথম বই The Histories।


এই যে আমরা সক্রেটিস নিয়ে এত জানতে পারছি, তার সমস্ত কৃতিত্ব তাঁর ছাত্র প্লেটোর। শেষ বয়সে এসে তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ছাত্রটির দেখা পেলেন। মূলত প্লেটোর লেখায় আমরা পরিপূর্ণভাবে সক্রেটিসকে চিনতে পারি। প্লেটো না লিখলে হয়তো সক্রেটিস অনাবিষ্কৃত রয়ে যেত।

.

.

.

সক্রেটিসের শেষ পরিণতিটা খুবই পীড়াদায়ক। সক্রেটিসকে নিয়ে এমন এক কমেডি নাটক লিখলেন কমেডির জনক এরিস্টোফেনিস, যার কারণে সবাই সক্রেটিসকে ঘৃণা করা শুরু করে দিলো। সবাই ধরে নিলো যে নাটকের কথাই ঠিক। সক্রেটিস আসলে এমনই। যেই এথেন্সের জন্য তিনি এত ভাবেন, সেই এথেন্সের মানুষই তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো। 'দ্য ডেথ অব সক্রেটিস' পেইন্টিংটা আগে দেখার কারণে তাঁর মৃত্যু নিয়ে একটা আইডিয়া ছিল। বইয়ে পড়ার পর দৃশ্যটা চোখের সামনে আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। একটা মানুষ এক জীবনে এতটা ভাগ্যবান হতে পারলেই নিজের মৃত্যুর সময় এতগুলো কাছের মানুষকে একসঙ্গে পায়। 



প্রাচীন গ্রিস থেকেই কিন্তু দর্শন নিয়ে কথাটা শুরু হয়। যদিও আমার কাছে দর্শন জিনিসটাই খুবই বিরক্তিকর লাগতো। কিন্তু এই বইটা পড়ার পর সম্পূর্ণ চিন্তাধারাটাই বদলে যায়। সক্রেটিসের জনপ্রিয় উক্তি, "Know Thyself" কী ছোট্ট কিন্তু জটিল একটা বাক্য! আমার কাছে এই বইয়ের সবচেয়ে প্রিয় দিক হলো প্রতি পর্বের শুরুতে মনীষীদের উক্তি, যে কোনো তথ্যে বিস্তারিত ফুটনোট আর রেফারেন্স অংশটা। এগুলো ঘাঁটতে যেয়ে আমি আরো দারুণ কিছু বই আর বিষয়ের সন্ধান পাই। 



লেখকের লেখার ধরন দারুণ! এত সুন্দর করে ছোট ছোট বাক্যে যেভাবে পুরো বইটি লিখে গেছেন তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। এই বইয়ের যেই জিনিসটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে সেটা হল প্রতিটা পর্বের শুরুতে থাকা বিভিন্ন উক্তি এবং পেইজের নিচে থাকা ফুটনোট ও বইয়ের শেষে থাকা রেফারেন্স। এইটা থেকে যে আরও কত বইয়ের সন্ধান পেয়েছি। বইটা পড়েই বোঝা গেছে যে কী পরিমাণ পরিশ্রম করে উনাকে এই বই লিখতে হয়েছে। বইটা পড়ার পুরোটা সময় আমি ডুবে ছিলাম সেই আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছরের পুরোনো এথেন্সে। বইয়ের বিষয়গুলো এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে যেন মনে হচ্ছিল টাইম ট্রাভেল করছি। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে এথেন্সের আগোরা, ম্যারাথন যুদ্ধের খবরটা দৌড়ে নিয়ে আসা, জেনথিপির গালিগালাজ, থিয়েটারের নাটক, সিমনের জুতার দোকান, আসপাশিয়া ও পেরিক্লিসের বাড়ি, হিপোক্রেটিসের দীক্ষা দেওয়ার দৃশ্য, দেবী এথিনার মন্দির, সবশেষে এক পেয়ালা হেমলক এবং সক্রেটীয় যুগের সমাপ্তি। এইটাই লেখকের সার্থকতা। 
Profile Image for Mahrufa Mery.
218 reviews118 followers
December 31, 2022
এই বছরের পড়া শেষ এবং সেরা বই! পরে রিভিউ দিবনে। হ্যাপি থার্টি ফার্স্ট!
Profile Image for Zakaria Minhaz.
282 reviews29 followers
June 11, 2024
#Book_Mortem 172

#হেমলকের_নিমন্ত্রণ

আমার একটা অদ্ভুত ইচ্ছে আছে। মৃত্যুর পর সৃষ্টিকর্তার কাছে যদি কিছু চাওয়ার সুযোগ পাই, তাহলে এই পুরো পৃথিবীটা কীভাবে একের পর এক ঘটনার মাধ্যমে আজকে রূপ ধারণ করেছে তা দেখতে চাইবো। এক সময়ের পৃথিবীতে এক দুইজন মানুষের সিদ্ধান্তই আজকের পুরো পৃথিবীর রূপরেখা গড়ে দিয়েছে। এখনকার পৃথিবীতে সেটা সম্ভব হয় না অনেক কারনেই। আমার দেখতে ইচ্ছে করে সেইসব সময়গুলোকে যার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে আজকের পৃথিবী।

যাহোক প্রাচীন পৃথিবী সম্পর্কে আমার এই জানার আগ্রহের একটা অংশ পূরণ হলো হেমলকের নিমন্ত্রণ বইটির মাধ্যমে। লেখক সুজন দেবনাথের সুন্দর এবং প্রাঞ্জল লিখনশৈলীর মাধ্যমে গল্পে গল্পে পৃথিবীর অনেক "প্রথমের" শুরু সম্পর্কে বেশ চমৎকার একটা ধারণা পেলাম। মনে হচ্ছিল যেন আমি চলে গিয়েছি আড়াই হাজার বছর আগের সেই এথেন্সে। কল্পনায় বসে রয়েছি এজিয়ান সাগরের পাড়ে। হেঁটে বেড়িয়েছি আগোরার পথ ধরে, এলোপেকি পাহাড়ে বসে উপভোগ করেছি ভরা পূর্ণিমা রাতের সৌন্দর্য, হাত তালি দিয়েছি ডিওনিসাসের থিয়েটারে বসে। কিছু বই থাকে না যেগুলো পড়ার পর মনের খোরাক মিটেছে টাইপ অনুভূতি হয়, এটা তেমনি একটা বই। এমন বইয়ের রিভিউ লেখা কষ্টের কাজ, তবুও শুরু করা যাক।

আমি পৃথিবীতে এসেছি শুধুই ভালোবাসার জন্য, কখনোই ঘৃণা করার জন্য নয়। -- সফোক্লিস

চমৎকার একটা ভূমিকার পর বইয়ের প্রথম বাক্যটা পড়েই আমি আসলে বইটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম বইটির গদ্যশৈলী হয়তো একটু গুরুগম্ভীর প্রকৃতির হবে। কোথায় কী! এ যে একেবারে তরল, হালকা চালের রসিকতা সম্পন্ন লেখা। এভাবেই কি হিউমার সম্পন্ন একটা গল্পের মাধ্যমে তাহলে আমি জানতে যাচ্ছি পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞান, গণতন্ত্র, দর্শন, ইতিহাস, স্থাপত্য, ট্রাজেডি, কমেডি, চিকিৎসা শাস্ত্রের ব্যাপারে? এত সহজ আর সুন্দরভাবে কি পুরোটা বই জুড়ে লেখক লিখে যেতে পারবেন? দুটো প্রশ্নের উত্তরই, হ্যা। বইয়ের প্রতিটি চরিত্রই ঐতিহাসিক এবং বাস্তব। এই বাস্তব চরিত্রদের মাঝে কখনো সক্রেটিস, কখনো বা ইউরিপিডিস কিংবা পেরিক্লিস, ফিডিয়াস, হেরোডোটাস, সফোক্লিস, হিপোক্রাটিসদের বয়ানে লেখক একে একে তুলে এনেছেন গণতন্ত্র শুরুর ইতিহাস, চিকিৎসা শাস্ত্রের ইতিহাস, পৃথিবীর প্রথম ঐতিহাসিক গ্রন্থের ইতিহাস, অলিম্পিক, ম্যারাথন শুরুর ইতিহাস। পাশাপাশি এথেন্সের তৎকালীন আর্থিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশও উঠে এসেছে বইতে। এসেছে গ্রীক দেবতাদের কথা, ট্রয় কিংবা পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধের কথা, হোমারের ইলিয়াদ এবং অডেসির কথাও। প্রতিটা অধ্যায় শুরু হয়েছে সে সময়কার বিভিন্ন মনীষীদের চমৎকার সব উক্তি দিয়ে। একেকটা উক্তি মনের অন্দরকে নাড়িয়ে দেয়ার মত।

শুরুর দিকের বড় একটা অংশ হিউমার দিয়ে সাজিয়েছেন লেখক। সক্রেটিস ও তার বন্ধুদের খুনসুটি আর প্রশ্ন প্রশ্ন খেলা শুরুর এক চতুর্থাংশের মূল উপজিব্য। এসব হাস্যরসের ফাঁকেই আমরা জেনে যাই, পৃথিবীর প্রথম থিয়েটার এবং মঞ্চ নাটক শুরু হওয়ার ইতিহাস সম্পর্কে। চেরোফোনের উৎসাহী কণ্ঠে জানতে পারি পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এথেন্স নগর গড়ে উঠার গল্প। আর ইউরিপিডিস আমাদেরকে জানান ট্রয়ের যুদ্ধের ঘটনা। এ সময়ে বইয়ে এমন অনেকগুলো বাক্য আছে যা মার্ক করে রাখার মতো। তবে তার মাঝে: ভালোবাসার সবচেয়ে শুদ্ধতম রূপ হলো, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা--- এই বাক্যটা আমার সবচেয়ে প্রিয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজেকে জানা আর সবচেয়ে সহজ কাজ হলো অন্যকে উপদেশ দেওয়া। -- থেলিস

ধীরে ধীরে বইয়ের টোন কিছুটা গাম্ভীর্য ধারণ করতে শুরু করে। গল্পে চলে আসে এথেন্সের রাজনৈতিক ব্যাপার স্যাপার। আর সক্রেটিস থেকে ফোকাস সড়ে যায় পেরিক্লিসের দিকে। পেরিক্লিস আর আশপাশিয়ার ভালোবাসার গল্পের মাঝে, বক্তৃতার স্বরে পেরিক্লিস আমাদেরকে জানিয়ে দিয়ে যান ডেমোক্রেসি শুরুর প্রেক্ষাপট। পরিচয় হয় সলোন নামের এক মহামানবের সাথে। ইতিহাসের শাস্ত্রের জনক হেরোডোটাসের সাথেও পরিচয় হয় আমাদের। তার বয়ানে আমরা জানতে পারি পারস্য এবং গ্রীসের মধ্যে হওয়া প্রথম  "ম্যারাথন" যুদ্ধ সম্পর্কে। যে যুদ্ধে ফিডিপিডিসের দৌড়ের সম্মানে আজও ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। গল্পে গল্পে জানা হয় অলিম্পিক প্রতিযোগিতা সম্পর্কে। আমার জানা ছিল না গ্রীক পূরাণের বীর হারকিউলিসের কল্যানে খেলার মাঠের নাম স্টেডিয়াম হয়েছে! স্পার্টার বীর রাজা লিওনিদাসের ৩০০ সেনা নিয়ে পারস্যকে রুখে দেয়া যুদ্ধের গল্পও বলে ফেলেন লেখক। হেরোডোটাস আর সফোক্লিসের আড্ডায় জেনে নেই গ্রিক ট্রাজেডির জনক এস্কিলাসের আদ্যোপান্ত। এছাড়াও এথেন্সকে রূপসী নগরে সাজানোর সব পরিকল্পনা আর তার কারিগরদের ব্যাপারেও গল্পে গল্পে জানিয়ে যান লেখক। বইয়ের মধ্যম ভাগের এই অংশের সবচেয়ে মজাদার অংশ হলো চেরোফোন আর সক্রেটিসের ডেলফির ওরাকলের কাছে যাওয়ার অংশটুকু।

মানুষ মাত্রই ভুল করে। কিন্তু যে মানুষ ভুল বুঝতে পারামাত্র সংশোধন করে, সেই হলো ভালো মানুষ। মানুষের একমাত্র অপরাধ হলো অহংকার। -- সফোক্লিস।

গ্রীসের দেবতা ভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা বাদ দিয়ে নতুন ধরণের এক চিকিৎসা ব্যবস্থার চিন্তা এসেছে এক কস দ্বীপের এক তরুণের মাথায়। তার নাম হিপোক্রাটিস। চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক এই ভদ্রলোক। এমনকি আজও সকল ডাক্তারদেরকে উনার লেখার শপথবানী পাঠ করতে হয় ডাক্তারি পাশ করার পর। পৃথিবী বদলে দেয়া তার ডাক্তারি সম্পর্কে সবটাই লেখক জানিয়ে গিয়েছেন যথারীতি গল্পের মাধ্যমে। পৃথিবীর প্রথম ইতিহাস গ্রন্থের লেখক হেরোডোটাস কীভাবে নিজের সেই বইয়ের মাধ্যমে প্রাচ্য আর পশ্চিমের মাঝে এখনো বহমান সংঘাতের সূচনা করে দিয়ে যান, সেটাও জানা যাবে বইয়ের এই পর্যায়ে। সৃষ্টিসুখের উল্লাস ছেড়ে আমরা চলে আসি স্পার্টা আর এথেন্সের মধ্যকার দীর্ঘ এক যুদ্ধের শুরুর পরিস্থিতিতে। স্পার্টার আক্রমণে কীভাবে শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, দর্শন আর জ্ঞানের মহিমায় উদ্ভাসিত এথেন্স ধীরে ধীরে নিঃশেষ হতে থাকে সেটাও পাঠক জেনে যাবে এখানে। স্পার্টার পাশাপাশি এথেন্সে আঘাত হানে ভয়াবহ প্লেগ। যে প্লেগে এথেন্স হয়ে যায় লাশের নগরী। মারা যায় তাদের সকল সূর্য সন্তানেরা। যে পেরিক্লিস দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে এথেন্সকে পৃথিবীর সেরা নগরে পরিণত করেছিলেন, সেই পেরিক্লিসের বিরুদ্ধেই চলে যায় এথেন্সের নাগরিকরা। একের পর এক বন্ধু বিয়োগ আর মামলায় বিপর্যস্ত পেরিক্লিস পড়েন সর্বনাশা প্লেগের থাবার নিচে। এই সময়টার কি করুণ এক বর্ণনা যে লেখক লিখেছেন! পেরিক্লিসের শেষ সময়টার সে বর্ণনা পড়ার সময়ে কখন যে চোখ ভিজে উঠেছে তা টেরই পাইনি।

তোমার সাথে যেটি করলে তুমি কষ্ট পাও,
সেটি কোনোদিন অন্যের সাথে কোরো না। -- সক্রেটিস

ধীরে ধীরে চলে এলাম আমরা বইয়ের শেষ ধাপে এবং সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি সক্রেটিসের মৃত্যুর অংশ। বইয়ের মাঝামাঝিতেই আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় এক চরিত্রের সাথে। যার কারনেই এই শেষ অংকের করুণ দৃশ্যের সূচনা হয়। সক্রেটিস কেন হেমলক পান করতে রাজী হলেন, কেন মেনে নিলেন প্রহসনের এই বিচার, কেনোই বা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জেল থেকে পালাতে রাজী হলেন না তার সবটাই উঠে এসেছে এখানে। মরে গিয়েও অমর হয়ে রইলেন সক্রেটিস নিজের কর্মের দ্বারা। আড়াই হাজার বছর পরেও ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে। এর বড় একটা কৃতিত্ব দার্শনিক প্লেটোর। প্লেটোর জন্ম থেকে উত্থান সবটাই অল্প কথায় চমৎকারভাবে জানিয়েছেন লেখক। বইয়ের শেষ অংশ পড়ে মন খারাপ হলেও, বইটা আসলে বিরাট একটা তৃপ্তি এনে দিয়েছে আমার পাঠক মনটাকে। নিঃসন্দেহে আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বইগুলোর মাঝে অন্যতম সেরা বই এটা।

ব্যক্তিগত রেটিং: ১০/১০ ( লেখকের গদ্যশৈলীর দরুণ এমন ইতিহাস সমৃদ্ধ বইও হয়ে গিয়েছে একটা গল্পের বইয়ের মতো। লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ এমন বই উপহার দেয়ার জন্য। উনার কাছ থেকে এমন আরো অন্যান্য দেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হলো। সকল ধরণের পাঠকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য বই এটা। কেউ এই বইটা ফেলে রাখবেন না প্লিজ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পড়ে ফেলুন। শুধু গল্প বা ইতিহাসের জন্য না, নিজের আত্ম-উন্নয়নের জন্য, নিজেকে আরো পরিশুদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্যও বইটা পড়া উচিত। এই বইটাকে মনে ধারণ করতে পারলে হিংসা, ঘৃণা, রাগ আর অহংকারকে দমিয়ে রাখা শিখতে পারা সম্ভব বলে মনে করি )

প্রোডাকশন: বইটির প্রোডাকশন অত্যন্ত চমৎকার। পেইজ কোয়ালিটি হতে বাঁধাই সবই ভালো। বর্তমানে থাকা বইয়ের নতুন এডিশনের প্রচ্ছদের তুলনায়, আমার কাছে থাকা আগের এডিশনের প্রচ্ছদটা আমার খুব খুব পছন্দের। বইয়ের শেষ লাইনটা পড়লে এই প্রচ্ছদটার মাহাত্ম্য আরো বেড়ে যায়। এমন একটা বই হিসেবে বইটির দামও বেশ সহনীয় বলেই মনে করি। প্রকাশনীকেও ধন্যবাদ বইটির জন্য।

🪤 লেখক: সুজন দেবনাথ
🪤 প্রচ্ছদ: নিবেদিতা নাথ এবং জামাল আহমেদ
🪤 প্রকাশনী: অন্বেষা প্রকাশন
🪤 পৃষ্টা সংখ্যা: ৫৪৮
🪤 মূদ্রিত মূল্য: ৮০০ টাকা
Profile Image for K M Abrar.
35 reviews30 followers
May 4, 2025
সক্রেটিসের নাম শুনলেই মাথায় কঠিন দর্শনের কথা চলে আসাটা অস্বাভাবিক না। সক্রেটিসের জীবনী নির্ভর উপন্যাস দেখে ভেবেছিলাম মনে হয় হেমলকের নিমন্ত্রণ কঠিন কোনো উপন্যাসই হয় নাকি। কিন্তু আমার ভুল বুঝতে বেশি সময় লাগেনি। এতো দারুণ করে লেখক সক্রেটিস কে বইয়ে তুলে ধরেছেন মনে হয়েছে যেনো ওই সময়ে আমি নিজেই সক্রেটিসের সামনে উপস্থিত ছিলাম। মাস্ট রিড একটা বই।
Profile Image for Farhan.
20 reviews5 followers
April 29, 2025
"আমরা জীবনভর সক্রেটিসের কাছ থেকে মধু নিলাম। আর বিনিময়ে তাকে দিলাম হেমলক বিষ।"
Profile Image for Md. Rahat Khan.
50 reviews4 followers
June 7, 2024
অনবদ্য একটা উপন্যাস পড়ে শেষ করলাম। ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস বরাবরই পড়তে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। হেমলকের নিমন্ত্রণ বইটা অনেক দিন ধরে পড়ার ইচ্ছা ছিল। অবশেষে শেষ হল।

দর্শনের জনক সক্রেটিসের শহর এথেন্স তথা প্রাচীন গ্রীসের গৌরবময় ইতিহাসকে তুলে আনা হয়েছে বইতে। এথেন্স প্রাচীন গ্রীসের একটি নগরী। যাকে বলা হয় শিক্ষার নগরী, আলোর নগরী। এথেন্স পৃথিবীকে কি দেইনি? পৃথিবীতে প্রথম গনতন্ত্র , জাতীয় সংসদ,ভোটের প্রথা চালু থেকে শুরু করে বিজ্ঞান শাস্ত্রে, চিকিৎসা শাস্ত্রে, থিয়েটার, ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্যের দ্বারা  সম্মৃদ্ধ করেছে বিশ্বকে। এখানেই জম্মেছেন দর্শনের জনক সক্রেটিস, প্লেটো, নাটকে ট্রাজেডির জনক এস্কিলাস, সফোক্লিস, ইউরোপিডিস, ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস, গনতন্ত্রের জনক ক্লিসথেনিস, কমেডির জনক এরিস্টোফানিস, বিজ্ঞানী থেলিসের জম্ম এই এথেন্সে। ম্যারাথনের যুদ্ধ, অলিম্পিকের যাত্রার শুরু এখানে।

গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের পাশাপাশি কলঙ্কজনক অধ্যায়ও রয়েছে এথেন্সের। তখনকার সময়ের মানুষের ধর্মান্ধতা ছিলো আকাশছোঁয়া।  যার বলি হয়েছে অনেকে। বাদ যায়নি সক্রেটিসও। যুবক সম্প্রদায় নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ নাকচ হওয়ার পর আনা হয় ধর্মদ্রোহিতার মত অভিযোগ। সক্রেটিস দেবতা মানেন না। সবাইকে এ ব্যাপারে উৎসাহ দিচ্ছেন। আদালতে বিচারকদের ভোটে তার মৃত্যুদন্ড হয়। এথেন্সের আইনি নিয়মে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি নিজেই  সিদ্ধান্ত নেন কোন উপায়ে সে মরতে চায়। সক্রেটিস নির্বিকারভাবে  সিদ্ধান্ত নেন তিনি হেমলক গাছের বিষ পানে মারা যাবেন। হেমলকের বিষে নীল হয়ে জীবনের সূর্য অস্ত যায় সক্রেটিসের।

বিশাল পরিসরের এই উপন্যাসে বিস্তর অনুষঙ্গের সমাবেশ ঘটিয়েছেন লেখক। তার গল্প বলার ভঙ্গিটা চমৎকার লেগেছে। প্রেম-ভালোবাসা-দ্রোহের আবেশ ঘটিয়েছেন সুনিপুনভাবে।  কল্পনার মিশেলে বাস্তবতাকে তুলে এনেছেন বিস্মতির অতল গহ্বর থেকে।
Profile Image for Mahbuba Dominique.
12 reviews30 followers
May 22, 2025
বইটি বেশ তথ্যবহুল এবং ঘটনাগুলোও ইন্টারেস্টিং। কিন্তু যেমন উৎসাহ নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম, তেমনভাবে শেষ করতে পারলাম না। লেখক বইটিকে humorous বানাতে গিয়ে একই কথা ঘুরে ফিরে বারবার লিখছেন। এটা না করলে ৫৩০ পৃষ্ঠার মূল কাহিনীর বই অনায়াসে ৪০০ পৃষ্ঠারও কমে শেষ করতে পারতেন।
Profile Image for Muntasir Dhip.
165 reviews3 followers
July 24, 2024
আপাতত কিছু বলতে পারছি না। শুধু এতটুকুন বলে রাখি " সেরাআআআ"
Profile Image for Sakib A. Jami.
392 reviews53 followers
August 17, 2023
প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কোনো এক সময়। যে সময়ে বদলে গিয়েছিল পৃথিবীর ভাগ্য। প্রাচীন এই সময়ে একে একে জন্ম নিয়েছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের একের পর এক সৃষ্টিশীল কর্ম! বদলে দিয়েছিল মানুষের বিনোদনের ক্ষেত্র। সৃষ্টি হয়েছিল জ্ঞানের বিশাল ভান্ডার। সেই সময় গ্রীক দেশের এথেন্স শহর তেমন কিছু মানুষের পদচারণায় মুখর ছিল। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সূচনা হয়েছিল এখানে। জন্ম নিয়েছিল নাটক, সাহিত্যের মতো বিনোদনের ক্ষেত্র। ইতিহাসের সাথে পরিচিতি ঘটেছিল মানুষের। যে গণতন্ত্রের গল্প করা হয়, তারও যেন হাতেখড়ি সেই সময়টাতেই। দর্শন বিদ্যার অমূল্য পরিবর্তন ঘটেছিল তখন। নামকরা দার্শনিকদের মিলনমেলা ছিল। যাদের হয়তো বইয়ের পাতাতে জানা যায়, তারা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যেই জীবন্ত কিছু সৃজনশীল মানুষের গল্প “হেমলকের নিমন্ত্রণ”—এ আপনাকে স্বাগত।

সক্রেটিস! নামটির সাথে বোধহয় পরিচয় নেই, এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। আপনি জানেন কী জানেন না, এই মানুষটির কথা স্কুল-কলেজে ঠিকই পড়ে থাকবেন। বিখ্যাত দার্শনিক হিসেবে যাঁকে সবাই আদর্শ মনে করে। সেই সক্রেটিসের জীবন কেমন ছিল, জানেন? সক্রেটিস দেখতে খুব একটা ভালো না। তাই ছোটবেলায় তার বন্ধু ছিল না। আমাদের শিশুদের হয়তো আমরা মনের অজান্তেই শিখিয়ে দিই— কদাকার, কুৎসিত যেকোনো কিছু থেকে দূরে থাকতে হয়। হয়তো সেই শিক্ষা নিয়েই দেখতে শুনতে ভালো না, এমন মানুষের থেকেও আমরা দূরে থাকতে চাই। সক্রেটিসের বদলে যাওয়ার শুরু সেখান থেকেই।

যেখানে কেউ আপন মনে করে না, কোনো বন্ধু নেই— সেখান থেকে সবচেয়ে বেশি শিষ্য যার; তিনি সক্রেটিস। মানুষের অবয়বের দুর্বলতা কমিয়ে দিতে পারে কথা বলার শক্তি। সক্রেটিস সেই শক্তিতে শক্তিমান। কথার খেলায় সবসময় বিজয়ী সক্রেটিসের পাশে জুটে গেল কিছু বন্ধু। যারা সক্রেটিস ছাড়া কিছু বুঝে না। কথার খেলায় কিংবা প্রশ্নের খেলায় জীবন সম্পর্কে যে ধারণা অর্জন করা যায়, পাঠ্যপুস্তক পড়েও হয়তো সেই শিক্ষা লাভ করা যায় না। শিক্ষার যে ব্যতিক্রম এ ধারা, তার সূচনা করেছিলেন সক্রেটিস। তরুণদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় এক নাম। তাঁর কোনো বিদ্যালয় ছিল না। গ্রিসের অলিতে-গলিতে, রাস্তায়-পথেঘাটে— সব জায়গা ছিল শিক্ষার ক্ষেত্র। যেখানে পারতেন সেখানেই আসর জমিয়ে ফেলতেন। তরুণরা ছুটে আসত, গল্পের খেলায়, কথার খেলায় বা প্রশ্নের খেলায় নিজেকে নিমগ্ন রাখত। এ যেন জীবন বদলে দেওয়ার কারিগর।

তরুণরা পছন্দ করলেই গুরুজনেরা পছন্দ করবে কেন? তাদের প্রশ্ন করা যায় না। বয়সে কম কেউ যদি প্রশ্ন করে নাস্তানাবুদ করে, তাহলে সে ভালো থাকবে কেন? চরম বেয়াদব! আর এই বেয়াদবদের তৈরি করছে কে? সক্রেটিস! তাই তরুণদের কাছে জনপ্রিয় হলেও তাদের বাবাদের কাছে আতঙ্কের নামও সক্রেটিস। তাদের দাবি ছেলেদের নষ্ট করে ফেলছে সক্রেটিস। ‘সক্রেটিস মেথড’ যেন সবার ঘুম হারাম করে ফেলছে। ও হ্যাঁ, সক্রেটিস ও তার সাথীদের প্রশ্ন প্রশ্ন খেলার একটা নাম আছে। যাকে ‘সক্রেটিস মেথড’ বলা হয়। সক্রেটিস ও তাঁর মেথড নিয়ে সবচেয়ে বেশি পাশে ছিল দুই বন্ধু চেরোফোন ও ক্রিতো। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পাশে ছিল ক্রিতো। বন্ধুর হাত কখনো ছাড়েনি সে।

গ্রিসের সেই সময় নারীদের জন্য সুখকর ছিল না। ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষেধ ছিল। বাইরে শুধু পুরুষদের বিচরণ থাকবে। আর নারীরা থাকবে অন্দরমহলে। সিস্টেমের অংশ সবাই হয়ে গেলেও কেউ কেউ সেই সিস্টেম ভেঙে বেরিয়ে আসার তোড়জোড় করে। আশপাশিয়া মেয়েটা তেমনই। সে এথেন্সের কেউ না। বাইরে থেকে আগত বলেই হয়তো নিয়মের এই কারাগার ভাঙতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তার সাথে কীভাবে যেন মিশে গিয়েছিল সক্রেটিস। বরং নিজের চেয়েও বড়ো করে আশপাশিয়াকে দেখে সে। আশপাশিয়ার কাছে শিক্ষার জন্য আসে। যেই সক্রেটিসের চারিপাশে মানুষ ঘোরে, সেই সক্রেটিস ঘোরে আশপাশিয়া নামের এক মেয়ের আশেপাশে। এই আশপাশিয়ার স্বপ্ন অনেক বিশাল। নিজেকে উপরে দেখতে চায়। তাই হয়তো এথেন্স শহরের মাথা পেরিক্লিসকে নিজের বন্ধনে বেঁধে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। একই সাথে সে-ও হয়ে উঠেছে এথেন্স শহরের অলিখিত কর্ত্রী।

আজ যে গণতন্ত্রের জয়গান গাওয়া হয়, তার সূচনা হয়েছিল কোথায়? সুদূর অতীতে খোঁজ নিতে গেলে দেখা যাবে সময়টা সেই আড়াই কী তিন হাজার বছর পূর্বের কোনো এক সময়কে নির্ধারণ করছে। রাজা-রানী-প্রজা ছাড়া কোনো রাজ্য চলতে পারে না। একনায়কতন্ত্র যেন মূল কথা, যেখানে সাধারণ মানুষের কথা শোনার সময় আছে কার? সেই ধারা ভেঙে এথেন্স প্রচার করল গণতন্ত্রের বাণী। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে জনমত নির্বিশেষে সকলের সম্মতিক্রমে। গনতন্ত্র যেন প্রতিষ্ঠা পেল। আর সেই গণতন্ত্রের নেতা হয়ে পেরিক্লিস সবার চেয়ে সম্মানিত। গণতন্ত্রের পূজারী সে। কোনোভাবেই এর অমর্যাদা করবে না। কিন্তু মানুষ বরাবরই আবেগী জাতি। বুদ্ধি দিয়ে বিচার করার চেয়ে আবেগ দিয়ে চিন্তা করতে বেশি পছন্দ করে। কিংবা অন্য কেউ কিছু বোঝালে সেটাতেও ফলে সহমত জ্ঞাপন করে। ফলে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি থাকে কি না, সেখানে একটা বড়ো ধরনের প্রশ্নবোধক চিহ্ন থেকে যায়। পেরিক্লিস হয়তো শেষ সময়ে বুঝেছেন, গণতন্ত্রের সুফলের পাশাপাশি কুফল নেহাত-ই কম নয়। তাই তো তার অনেক কাছের মানুষকে হারিয়ে যেতে হয়েছে গণতন্ত্রের রোষানলের স্বীকার হয়ে।

‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ হিসেবে খ্যাত “অলিম্পিক গেমস”—এর শুরুটা কোথায়, জানেন? সেখানেও গ্রিসের নামটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চার বছর পরপর এই গেমসের সূচনা গ্রিসেরই এক রাজ্য থেকে। সেখানে প্রতি চার বছর অন্তর একটি খেলার আসর বসত। অতীতে কাউকে বীর হিসেবে বিবেচনা করা হতো যু দ্ধের পারদর্শিতা দেখে। সেখানে এক অন্যরকম কিছুর চিন্তাতেই অলিম্পিকের উৎপত্তি। যু দ্ধ, র ক্ত ছাড়াও যে বীর হওয়া যায়; অলিম্পিক যেন সেই চিহ্ন রাখতে তৈরি। এই খেলায় সেরা সবসময় স্পার্টা। এথেন্সের নামগন্ধ নেই কোথাও। তবুও কোনো এক আসরে এক ব্যতিক্রম ব্যক্তির আবির্ভাব হলো। তাকে নিয়ে গিয়েছিল পেরিক্লিস। না, কোনো খেলায় নয়। গল্প বলে আসর জমিয়ে দিয়ে সেদিন এথেন্সের নাম উজ্জ্বল করেছিল একজন। তিনি হেরেডোটাস। তার বিখ্যাত রচিত গ্রন্থে পরিচিতি পেয়েছিল এক নতুন ধারা। আজ যে আমরা ইতিহাস সম্পর্কে জানি, সেই ইতিহাসের ধারণার সূচনা ঘটেছিল তখন। ইতিহাসের প্রবর্তক হিসেবে হেরেডোটাস বিশ্বে আজও অমলিন।

অসুখের সাথে মানুষের সখ্যতা বেশ পুরনো। নানান অসুস্থতায় প্রাচীনকাল থেকে দেবতাদের অভিশাপ জ্ঞাপন করত মানুষ। তেমনি সুস্থতাকে বলা হতো দেবতার আশীর্বাদ। প্রাচীন গ্রিসে সবকিছুতে দেবতাদের আনাগোনা ছিল। দেবতাদের নাম নিয়ে কিছু করা হতো না। গ্রিসে দেবতা অ্যাপলোকে চিকিৎসার দেবতা মনে করা হতো। আরও মনে করা হতো দেবতার বংশের কেউ ছাড়া মানুষের চিকিৎসা করা যাবে না। সেই ধারা ভাঙতেই যেন এসেছিলেন হিপোক্রাটিস। সেবার প্লেগের ভয়াল থাবায় যেন মৃত্যুর মিছিল বাড়ছেই। হিপোক্রাটিস তাই দেবতার উত্তরসূরি থেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের শিক্ষার উপকরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তৈরি হয় ইতিহাসের প্রথম চিকিৎসা বিদ্যালয়। দেবতাদের আশীর্বাদে নয়, নিয়মমাফিক চললে আর নিজের স্বাস্থের দিকে নজর দিলেই সুস্থতা আসন্ন। নিজে ও তার শিষ্যদের প্রচেষ্টায় প্লেগের ভয়াবহতা একসময় কমে আসে। জনপ্রিয় হয়ে ওঠে হিপোক্রাটিস। ডাক্তারদের জন্য তৈরি করে দিলেন ‘হিপোক্রাটিক শপথ’।

যুদ্ধ একসময় খুবই সাধারণ ছিল। পাশাপাশি রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ যেন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। এথেন্সের সাথে একসময় পারস্যের যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে একজন খবরি ছিল। যার কাজ যুদ্ধের খবর পৌঁছে দেওয়া। ম্যারাথন ময়দানে সেদিন যুদ্ধের বিজয়ের কথা এথেন্সবাসীকে পৌঁছে দিতে দৌড় শুরু করেন ফিডিপিদিস। সেই দৌড় যেন জীবনের তার শেষ দৌড়! মৃত্যুর কোলে ঢলে যাওয়ার মুহূর্তে হয়ে যান ইতিহাস। ম্যারাথন দৌড়ের সূচনা সেখানে থেকে। এই গল্পে একজন সফেক্লিস আছেন। তিনি সফল ট্র্যাজেডির জনক। তার রচনায় দর্শক বিভোর থাকত। তারও আগে ট্র্যাজেডির জনক এস্কিলিস-এর গল্প এখানে শোভা পায়। আছে সফেক্লিসের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইউরিপিডিস। লিখেছেন নারীদের জীবনের কথা, ‘ট্রয়ের মেয়েরা’। তাদের নাটকে কত যে গল্পের উপলক্ষ্য পেয়েছে মানুষ! একসময় নিঃশেষ হয় জীবন, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই মিললে যে অমরত্বের সুধা পান করা হয়।

প্লেটোকে বলা হয় সময়ের চেয়ে আগানো ক্ষুরধার মস্তিষ্কের লেখক। যে লিখলেই লিখতে পারে। যখন তখন লিখতে পারে। ছোটো থেকেই মস্তিষ্কে শান দিতে দিতে কীভাবে যেন সক্রেটিসের ভক্ত হয়ে গেল সে। শেষ সময় পর্যন্ত ছিল সক্রেটিসের সাথে। সক্রেটিসকে নিয়ে অনেক লেখা লিখে অমর করে তুলেছেন গুরুকে। সক্রেটিসের শত্রু চারিপাশে। সেই শত্রুতার রেশ ধরেই মঞ্চস্থ হলো নাটক ‘মেঘ’। এক কুৎসিত সক্রেটিসকে যেখানে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। অপমান অপদস্ত করে লেখা সেই নাটক থেকে মানুষ ভুলে গেল সক্রেটিস আসলে কে। সক্রেটিসকে নিয়ে লেখা সেই নাটকের রচয়িতা কমেডির জনক এরিস্টোফেনিস। এমন নাটক দেখে রাগে দুঃখে নিজের সব লেখনী পুড়িয়ে ফেলে প্লেটো। প্লেটো এমন এক আদর্শ নগরীর কল্পনা করে, যেখানে থাকবে না কোনো কবি-সাহিত্যিক। কলমের সবচেয়ে শক্তি অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। সময়কে ধরে রেখে সত্য ঘটনা মানুষের সামনে তুলে ধরা। সেই কলম যদি সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, তবে কি কলমের উপর ভরসা থাকে? একজনের জীবন দুর্বিষহ করে তুলতে পারে কারো লেখনী। মিথ্যার পাহাড় গড়ে তুলতে পারে।

সক্রেটিস বারবার খুঁজেন সুন্দর জীবনের মানে কী? একে তাকে প্রশ্ন করেন, কিন্তু উত্তর মেলে না। জীবনের খোঁজে ছুটে চলেন প্রতিনিয়ত। আর সেই জন্য নিজের সংসার নিয়ে খুব একটা মাথা ব্যথা নেই তাঁর। জেনিথিপি প্রতিনিয়ত গালমন্দ করে স্বামীকে। তবুও কোনো বিকার নেই স্বামীর। এমন এক সংসার তবুও টিকে আছে। অদৃশ্য ভালোবাসার বন্ধনে মোড়া— যা দেখা যায় না, অনুভব করা যায়। সক্রেটিসের জনপ্রিয়তা আকাশ ছোঁয়া। কেউ জনপ্রিয় হলে, তার শত্রুরও অভাব হয় না। সক্রেটিসেরও আছে। এনিতাসের দাবি, তার ছেলেকে নষ্ট করেছে সক্রেটিস। মামলা হলো। সবসময় নীতি নৈতিকতার কথা তোলা সক্রেটিস কই এভাবে পালিয়ে যাবে? আদালতে দাঁড়িয়ে ঠিক একই সক্রেটিস। যে কখনো মাথা নত করবে না। কিন্তু শত্রুপক্ষ মানবে কেন? বৃদ্ধ সক্রেটিসের যে দিন ঘনিয়ে আসছে।

এই গল্পে আছে ট্রয় নগরীর যুদ্ধ। এক নারীর রূপের ঝলকে ধ্বংস হয়ে গেল গোটা এক নগরী। সত্য, মিথ্যার কারসাজি উঠে এসেছে লেখকের লেখায়। আছে পিথাগোরাস ও তার শিষ্যদের কথা। যাদের জ্যামিতিক আবিষ্কার আজ পাঠ্য বইয়ে শোভা পায়। থেলিস নামক একজনের ভাবনার ফসল হিসেবে জন্ম নিয়েছে বিজ্ঞান। গ্রিসের এতসব ইতিহাস লেখক রচনা করেছেন রয়ে সয়ে। কখনো আবেগে ভাসিয়েছেন, কখনো হাসিমুখে মেনে নিতে হয়েছে সবকিছু। আমি বারবার একটা কথা মনে করি, একজন লেখক অনেক বই লিখতে পারেন। তবে তার সৃষ্টিকর্মে এমন কিছু লেখার প্রয়োজন হয়, যা তাকে অমরত্ব দেবে। “হেমলকের নিমন্ত্রণ” লেখক সুজন দেবনাথকে সেই অমরত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট। দারুণ এক উপাখ্যান।

শেষটা দারুণ বললেও কম হবে। ইতিহাস নিয়ে ঘটার সুবাদে শেষ ঘটনা জানি। অনেকেই জানেন। তারপরও লেখক যেভাবে বর্ণনা করেছেন, চোখের সামনে যেন দৃশ্য উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল। শেষ অনুভূতি বিষাদময়। একজন মানুষ কতটা জনপ্রিয় হলে, শেষ সময়ে এতজনকে পাশে পেতে পারে! জীবনের সার্থকতা তো এখানেই। মৃত্যু এখানে শেষ নয়। মৃত্যুর পরও প্রিয় মানুষেরা বাঁচিয়ে রাখার যে তীব্র প্রয়াস জানান দেয়, তাতেই মৃত্যু হেরে যায়।

লেখকের লেখনী দারুণ। ছোটো ছোটো বাক্যে পুরো বইটি বর্ণনা করেছেন। কিছুটা হুমায়ূন আহমেদের ছোঁয়া লক্ষণীয়। লেখনশৈলীতে, শব্দচয়নেও। আমি বিষয়টা ইতিবাচক হিসেবেই দেখি। সহজ, সাবলীল গদ্যে পড়তে আরাম লাগে। “হেমলকের নিমন্ত্রণ” বইটি লিখতে লেখক অনেক পরিশ্রম করেছেন। তার ছাপ পুরো বই জুড়ে লক্ষনীয়। অনেক তথ্য উপাত্তের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে ননফিকশন জাতীয় বই পড়ার অনুভূতি হচ্ছিল। এমনভাবে ইতিহাস রচনা করলে পড়তে মন্দ লাগে না।

বইটির চরিত্রগুলো সব বাস্তব। যারা আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে পৃথিবীতে নিশ্বাস ফেলেছেন। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের ক্ষেত্রে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। আজও তাদের স্মরণ করা হয় কোনো না জন্য ক্ষেত্রে। এমন মানুষদের নিয়ে লেখা খুব একটা সহজ নয়। সেই সহজ কাজ করেছেন লেখক। বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছেন। তবে আশপাশিয়াকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, শেষে এসে কোথায় যেন হারিয়ে গেল! হয়তো প্রয়োজন ছিল না বলেই। কিন্তু আরও কিছু জানার আগ্রহ ছিল। শেষ সময়ে এসে কীভাবে জীবনের লড়াইটা একা একা লড়ে গিয়েছে, জানতে চাইছিলাম।

আমি মুগ্ধ হয়েছি প্রকাশনীর প্রডাকশন কোয়ালিটিতে। সাড়ে পাঁচশ পৃষ্ঠার বইয়ের মূল্য আটশ’ টাকা। বিশাল এই বইয়ে আমার সর্বসাকুল্যে হয়তো দুইটা ছাপার ভুল বা বানান ভুল চোখে পড়েছে। পৃষ্ঠার মান, বাঁধাই সব যেন অসাধারণ কিছু। অন্বেষা প্রকাশনী এই দিকে সেরা কাজ দেখিয়েছে। অভিযোগ করার কিছু নেই। প্রচ্ছদ যেন দেশের যে তীব্র বিষাদ, তারই প্রতিচ্ছবি।

পরিশেষে, টাইম ট্রাভেল বলতে কিছু হয় না। তবুও কিছু সময় হয়তো অজান্তেই টাইম ট্রাভেল হয়ে যায়। কিছু বইয়ের পাতাতে হারিয়ে যেতে হয় সময়ের চেয়েও আগের কোনো সময়ে। আড়াই হাজার বছর পূর্বের এক সময়ে আমিও হারিয়ে গিয়েছিলাম। এক নিমন্ত্রণে ভুলে গিয়েছিলাম সময়ের বেড়াজাল। সক্রেটিস, প্লেটো, ইউরিপিডিস, ক্রিতোদের সাথে আমিও ঘুরেছি এথেন্সের পথেঘাটে। হেমলকের এ নিমন্ত্রণ যে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই...

▪️বই : হেমলকের নিমন্ত্রণ
▪️লেখক : সুজন দেবনাথ
▪️প্রকাশনী : অন্বেষা প্রকাশনী
▪️পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৫৫০
▪️মুদ্রিত মূল্য : ৮০০
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৫/৫
Profile Image for Maysha Rashid.
32 reviews10 followers
December 10, 2025
এথেন্স আলোর নগরী যতটা আলো নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলো তত গুণ অন্ধকারের সাথেই শেষ হলো সক্রেটিসের হেমলক পান ও হেমলকের নিমন্ত্রণ!!
Profile Image for Asib Gazi.
87 reviews1 follower
September 22, 2024
প্রাচীন গ্রিস এবং তৎকালীন দর্শন,সাহিত্য,বিজ্ঞান নিয়ে সহজ ভাষায় দ্রতগতীর বই। লেখনীতে হুমায়ূন আহমেদের টোন আছে তাই পড়তেও আরাম। জটিল বিষয়গুলো সহজভাবে উপস্থাপন করেছেন এজন্য লেখককে ধন্যবাদ।
40 reviews3 followers
June 12, 2021
সোনালি যুগের গ্রিক ফিলোসফারদের মুন্সিয়ানা কোন জায়গায়? জ্ঞান তৈরির প্রসেস আবিষ্কারে। আমরা তাদের কথা পড়বার সময় দেখি, তাদের বহু বহু আবিষ্কার পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু সেই আবিষ্কারের প্রসেস আমরা এখনো ব্যবহার করি। অলৌকিক এর বাইরে গিয়ে কোনো ঘটনার কারণ নির্ণয়ের যে ধারা তারা শুরু করেছিলেন, সেইটা হাজার হাজার বছরেও বিলুপ্ত হয় নাই, হবেও না। এইখানেই তাদের সার্থকতা।

এই বইটা গ্রিক দর্শনের বই না। কারিকুলামে আমরা সক্রেটিস প্লেটো এরিস্টটলের বিভিন্ন উক্তি পড়তাম। কারিকুলামের দোষ হলো, এদের মানুষ হিসাবে দেখাতে পারায় সে ব্যর্থ। কিন্তু এই বইটাতে এরা ক্যারেকটার, রক্ত মাংসের মানুষ। সক্রেটিস হাঁটছেন, আলাপ করছেন, প্লেটো শুনছেন, জেনথিপি ক্ষেপে যাচ্ছেন, ওইদিকে সফক্লিস লিখছেন, ইউরিপিডিস লিখছেন, পার্থেনন তৈরি হচ্ছে ফিদিয়াসের নেতৃত্বে, এথেন্স কে সোনালি সময় উপহার দিচ্ছেন পেরিক্লিস, আস্পাশিয়া কী চমৎকার করে তাকে পরামর্শ দিচ্ছেন। আবার স্পার্টার সাথে যুদ্ধ, এথেন্সে প্লেগ, চিকিৎসা শাস্ত্র জন্ম নিচ্ছে হিপোক্রেটিস এর হাতে, হিস্টরিয়া লিখছেন হিরোডটাস। বইটা পুরো সেই মোটামুটি একশো বছর সময়কালকে গল্পের মতন বলে যায়। বিশেষত পার্থেনন তৈরি হবার অংশটা আমি বারবার পড়বো। স্পয়লার দিলাম না, আরো অনেক কিছুই আছে।

বাংলা ভাষায় কি এরকম বই আরেকটা আমি পড়েছি? না। তাই বইটা পড়তে হবে, উপহার দিতে হবে। চমৎকার বই।
Profile Image for Mirza Imran.
54 reviews13 followers
June 13, 2021
"ছোট প্রেম সংসার গড়ে আর বড় প্রেম সংসার ভাঙে। বড় প্রেম বিরহের জন্য উপযোগী, সংসারের জন্য নয়। সংসার হলো দুটি মানুষের প্রতিদিনের ঝগড়া-ঝাটি, রাগ-ক্রোধ, অভিমান মিশানো একঘেয়ে অম্ল-মধুর জিনিস। তার জন্য দরকার সাধারণ, একঘেয়ে ছোট্ট প্রেম। বড় প্রেমে এগুলো খাপ খায় না। বড় প্রেম হলো হঠাৎ উচ্ছ্বাস, যা দুজনকে ভাসিয়ে নেয়, আশেপাশের মানুষকে নাড়িয়ে দেয়। এই প্রেম দিয়ে ভালো সাহিত্য হয়, কিন্তু ভালো সংসার হয় না। এই প্রেম দুটি জীবনকে পুড়িয়ে দেয়, প্রত্যাশার আগুনে জ্বালিয়ে দেয় সংসার। হেলেন আর প্যারিসের প্রেমে পুড়ে যায় ট্রয় নগর। বড় প্রেম কোন কিছুকে ধরে রাখে না, ধরে রাখে ছোট প্রেম। তাই অনেক আশা নিয়ে শুরু হওয়া বড় বড় প্রেমের সংসার সুখী হয় না, সুখী হয় ছোট প্রেমের সংসার।

ছোট প্রেম নিজে ছোট বলে অন্যায় রাগ-ক্রোধকে জায়গা দিতে পারে, আর জায়গা দিতে দিতে ছোট প্রেমের ব্যক্তিত্ব বড় হয়ে ওঠে, সে সেক্রিফাইস করতে শিখে যায়। আর বড় প্রেম নিজে বড় বলে একটি ছোট্ট অভিমানকেও জায়গা দিতে পারে না, ছাড় না দিতে দিতে বড় প্রেমের ব্যক্তিত্ব ছোট হয়ে যায়, সেক্রিফাইস কি জিনিস সেটাই ভুলে যায়। তাই ছোট প্রেম সংসার গড়ে আর বড় প্রেম সংসার ভাঙে।"
Profile Image for Peal R.  Partha.
216 reviews13 followers
April 13, 2025
‘আমি কাউকে কিচ্ছু শেখাতে পারি না,
আমি শুধু তাদের দিয়ে চিন্তা করাতে পারি।’ —সক্রেটিস

সক্রেটিসের উক্তির মতো সত্যি কি ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ আপামর বাঙালি পাঠক ও পড়ুয়াদের চিন্তার জগতে আলোড়ন তুলতে পেরেছে? না-কি এত সরল গদ্য হওয়া সত্ত্বেও গ্রিক সভ্যতার টুকরো ঝলক, এথেন্স নগরে জ্ঞানীদের উত্থান-পতন, দর্শন, ধর্ম, গণতন্ত্র, থিয়েটার, ভাস্কর্য, গণিত, সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও চিকিৎসাশাস্ত্রের গল্পচ্ছলে উঠে আসা আলোচনাও বৃথা হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে?

—এ প্রশ্ন সর্বপ্রথম আমি নিজেকেই করেছি। কারণ পুরো বইটি অসংখ্য ‘প্রশ্ন’র ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ানো। দেশিয় পাঠক সমাগমের জায়গাগুলো ঘুরে-ফিরে যা দেখলাম; তাতে উত্তর পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। এ বই নিয়ে নতুন করে ভূমিকা দেওয়ার কিছু নেই। ইতোমধ্যে যারা টুকটাক বইয়ের খবরাখবর রাখেন, দর্শনের বই খোঁজেন, গ্রিক সভ্যতার অল্প-বিস্তর (বিশেষ করে মহাকবি হোমার’র ইলিয়াড ও অডিসি) এবং জ্ঞানের নগরী ‘এথেন্স’ নিয়ে জানাশোনার প্রয়োজন হলে বইটি নির্দ্বিধায় হাতে তুলে নিন। কিন্তু তার পূর্বে নিজের দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা চিন্তা, ভাবনা, রীতি ও অভ্যাস—কিছুটা একপেশে রাখতে পারেন আপাতত; এতে পুরো বইয়ে উঠে আসা ‘জ্ঞান চর্চা’ আপনাকে দেখার জন্য নতুন চোখ, ভাবার জন্য নতুন মগজ দান করতে সক্ষম হবে। পড়া শেষে একটা ‘তুলনা’র চার্ট বানিয়ে, সেখানে পয়েন্ট দিয়ে উল্লেখ করতে পারেন ২.৫ বছর পূর্বের এথেন্সের সাথে বর্তমান সময়ের কোথায় কোথায় মিল রয়েছে, কী কী পরিবর্তন হয়েছে, না-কি সময় এখনও অতীতেই থমকে আছে। আমি জানি অনেকেই এসব করবে না। কারণ লাভ নেই। অলাভজনক কাজ মানুষ এমনিতে এড়িয়ে চলে।

বই পড়ে কী হয়, বই পড়ে জীবন পরিবর্তন হয় কি-না — এসব বালক মনের আবেগী আলাপ যাদের এখনও মাথায় ঘুরপাক খায় — তারা দর্শন, রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি নিয়ে সময় নষ্ট না করাই উত্তম। নিজেকে জ্ঞানী দেখানোর অহরহ উপায় আছে, ‘বই পড়ে কী হয়’ এমন আলাপ করে নিজেকে জ্ঞানী তৈরির চেষ্টা না করাটাই এক্ষেত্রে যুক্তিযুক্ত। হয়তো এমন ভাষা-ব্যবহার অনেকের কাছে কর্কশ, ক্ষোভ অথবা অহং-সুলভ মনে হতে পারে; তবে যাদের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলা — ওদের ওই ভদ্র কথাবার্তা মূল্যায়ন করার মতো জ্ঞান এখনও হয়নি। বাস করে তারা আধুনিক যুগে কিন্তু ধ্যান-ধারণায় পড়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক কোনো সময়ে। অথচ ২.৫ হাজার বছর আগের ‘এথেন্স’-এ এসব নিয়ে কতশত কাণ্ডকারখানা ঘটে গেছে তা একে একে উঠে এসেছে এই ইতিহাস নির্ভর গ্রন্থটিতে।

এমন জ্ঞানীদের জন্য সক্রেটিস বলে গিয়েছেন — ‘নিজেকে জানো।’ তার জন্য কোনো মন্দির, গীর্জা কিংবা প্যাগোডায় যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। জানার জন্য একটি মন দরকার, ভাবার জন্য একটি উর্বর মস্তিষ্ক দরকার।

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ নিয়ে অভিযোগের কোনো কিছু নেই আদতে। এ নিয়ে যে দুয়েকটা অভিযোগ দেখেছি—তা অমূলক। বইটির ভাষা, বর্ণনা—এত সহজ করে লেখা যে ‘সোফির জগৎ’-র মতো এটাও খুব কম বয়স থেকে পাঠ করা সম্ভব। তবে এর জন্য একটি সুচিন্তক মস্তিষ্ক থাকা খুব জরুরি। গাঁজাখুরি না, টিনের চশমা পরা না, অন্যের তালে নাচনেঅলা না। লেখক সেইসব দিক বিবেচনা করে বইটি লিখেছেন। যেন সবাই পড়তে পারে, পড়ে বুঝতে পারে, বুঝে নিজের চরকায় কিছু তেল ঢেলে নিতে পারে। তবে কেবল পড়লেই তো হয় না, পড়ার পর কিছু কিছু জ্ঞান/উপদেশ/সত্য নিজের জীবনে প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। নতুবা পাঠ ও সময় দুটোই বৃথা। এবং আমি শতভাগ নিশ্চিত, বইটি অনেক পাঠক কেবল বিনোদন বা পড়ার জন্য পড়েছে। পুরো বইয়ে যে অন্তনির্হিত অর্থ, জ্ঞান এবং সমাজের ভুলগুলোকে তুলোধুনা করা হয়েছে—ওসব নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবেনি তারা। কারণ, যে গোলকধাঁধায় তাদের বেড়ে ওঠা, যে সমাজে তাদের পদচারণা, যাদের ঘিরে তাদের জীবনযাত্রা অতিবাহিত হয়—তাদের সাথে আর যা-ই হোক, একটা বই পড়ে নিজেকে পরিবর্তন করা যায় না। কিন্তু সেই পরিবর্তন একান্ত নিজের সাথে অবশ্যই করা যায়। তবুও সেটা করার পক্ষে ভোটাভুটি হলে তারা সেটাকেই বেছে নিবে—যেটা তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরম্পরা হিসেবে পালন করে এসেছে।

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ বইটি মূলত দর্শনের জনক সক্রেটিস-কে উপজীব্য করে লেখা হলেও, এখানে মূল নায়ক ‘এথেন্স’ নিজেই। দর্শন কী বা দার্শনিক কে... এ প্রশ্নটা ব্যাখ্যা অনেকভাবে দেওয়া আছে। এ বইয়ে লেখা হয়েছে এভাবে:

....
‘মানুষ প্রথমে দেহের সৌন্দর্য দেখে ভালোবাসে। সবাই এভাবেই শুরু করে। এরপর আর একটু জ্ঞান বাড়লে, আর শরীরের সৌন্দর্য নয়, মনের সৌন্দর্য খোঁজে। সেটি আর একটু উচ্চ পর্যায়ের ভালোবাসা। মানুষ যখন আরও একটু বুঝতে শেখে, তখন সে জ্ঞানকে ভালোবাসতে শুরু করে। এক সময় সে হয়ে যায় জ্ঞানের প্রেমিক। আর জ্ঞানের প্রতি প্রেমই হলো সবচেয়ে উচ্চ পর্যায়ের ভালোবাসা। জ্ঞানের প্রেমিক হলেন দার্শনিক বা ফিলোসফার। ফিলিন (philein) মানে ভালোবাসা আর সফি (sophie) মানে জ্ঞান। যিনি জ্ঞানকে ভালোবাসেন তিনিই হলেন ফিলোসফার (Philosopher)।’
...

আমি এখন অবধি কোনো প্রতিক্রিয়া লিখছি না, এ বই নিয়ে পাঠক প্রতিক্রিয়া লিখবে স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যান্য বইয়ের মতো সক্রেটিস-কে একটি চরিত্র হিসেবে ট্রিট করে সে কী করেছে, কেন করেছে, তার করা কাজগুলো ভালো লেগেছে না মন্দ—এসব নিয়ে লেখার কোনো অর্থ নেই। বইয়ে তো এসব বলাই আছে। সত্য এই যে, সক্রেটিসকে যেভাবে লেখক তুলে এনেছেন সেটাকে বহুজন কোনো ফ্যান্টাসি বইয়ের কালজয়ী চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত করে বলতে পারে—বাহ! এই না হলে চরিত্রের মতো চরিত্র। কিন্তু সেই চরিত্রকে ধারণ আদতে করতে পারে ক’জন? বা করেছে আদৌ?

সক্রেটিস ছিলেন জ্বলজ্যান্ত একজন মানুষ। কোনো পৌরাণিক বীর কিংবা ফ্যান্টাসি চরিত্র না। ২.৫ হাজার বছর আগে যিনি এথেন্সে দর্শনের মতো একটি বিষয়কে জ্ঞানের সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছেন। সক্রেটিসের শৈশব আমাদের আটপৌরে জীবনের অনেক সাধারণ বালকদের মতো। তাঁর চেহেরা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা হতো, টিটকারি হতো—অথচ যে ‘ট্রমা’-র কথা আমরা বলি, যে শৈশব খারাপ হলে সে খারাপ মানুষে পরিণত হয়; সক্রেটিস কিন্তু সেটা হয়নি। বরং তাঁর ভেতর সেই বোধ জাগ্রত হয়েছে; যা অনেক বালক, যুবক কিংবা বুজুর্গের ভেতর হতে দেখা যায় না আজও। সক্রেটিস জীবনভর মানুষ নিয়ে পড়ে ছিলেন, মানুষকে জেনেছেন, মানুষকে পথ দেখিয়েছেন কীভাবে জ্ঞানের পথে হেঁটে সত্যের অনুসন্ধান করতে হয়। কীভাবে জীবনের মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে হয়।

আড়াই হাজার বছর আগের এথেন্সের সময়টা লেখক ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ গ্রন্থে তুলে এনেছেন খুব সুনিপণ ও দক্ষতার সহিত। এখানে দিনরাত স্বল্প পরিধেয় কাপড় পরে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ানো, উদাসীন জীবন অতিবাহিত করা, জ্ঞান ফেরি করা সক্রেটিস ছাড়া উঠে এসেছে তাঁর বন্ধু ক্রিতো, চেরোফোন, সিমন, ইউরিপিডিস নিয়ে বিস্তারিত কথা। বাদ যায়নি তাঁর উত্তম শিষ্য ফিদো, প্লেটো, জেনোফোন-সহ উল্লেখযোগ্য অনেকের জীবনের সাথে কীভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন সক্রেটিস—তার সবকিছু। সবার নাম এখানেই লিখছি না, নিচ্ছি না। এ এক বিশাল আলাপ, উপাখ্যানের মতো। এছাড়া পৃথিবীতে যত কিছুর জনক ও জনপ্রিয়তা রয়েছে—সকল কিছু উঠে এসেছে খ্রিষ্টপূর্বের সেই সময়ে। হোক সেটা ট্রাজেডি গল্প, কমেডি, অলিম্পিক, জিমনেশিয়াম, গণতন্ত্র, আইন, পার্থেননের মতো চোখ ধাঁধানো স্থাপনা ইত্যাদি। এখন হয়তো ক্ষণিকের জন্য আপনার মনে একটা প্রশ্নের উত্থাপন হতেই পারে (আমি জানি হয়নি), সবকিছু যদি তখনই সৃষ্টি হয় তাহলে এর পরবর্তী সময়ে যত ধর্ম, দর্শন, জীবনবৈচিত্র্য এসেছে সেগুলো কী? কেন মানবসমাজ এত এত নতুন কিছুর সৃষ্টি করেছে? এর উত্তরে সক্রেটিস বলেছেন:

‘আমি শুধু একটি জিনিসই জানি,
সেটি হলো— আমি কিছুই জানি না।’

অথবা, সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার সেই আলোচিত বাণী এখানে উত্তর হিসেবে প্রতিস্থাপন করা যায়: ‘জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই।’

মানুষ ভাবে তারা সব বোঝে, সব জানে। মিথ, ধর্মকে তারা ইতিহাসের সাথে গুলিয়ে-মিলিয়ে ফেলে। অথচ এসব সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। এ নিয়ে বিস্তর আলাপ পুরো বই জুড়ে স্পষ্টভাবে বর্ণিত রয়েছে। এর পরেও যদি নিজের মনোজগতে সেইসব বিষয় নিয়ে কোনো প্রশ্নের উৎপত্তি না-হয় তবে সেই পাঠক সত্যিকার অর্থে সুখী। যার কোনো কিছু নিয়ে ভাবনা নেই, চিন্তা নেই। এর বিবেচনায় সক্রেটিস মানুষকে তিন স্তরে ভাগ করেছেন।

‘যারা উত্তম— তারা নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে কথা বলে,
যারা মধ্যম— তারা যা ঘটেছে, সেই ঘটনা নিয়ে কথা বলে,
যারা অধম— তারা শুধু অন্য মানুষকে নিয়ে কথা বলে, গুজব বানায়।’

বর্তমানে আপনি ওপরের তিনটি থেকে ঠিক কোন স্তরে রয়েছেন তার বিবেচনা এখনই না-হয় করে ফেলুন। সক্রেটিস বলেনি সবাইকে জ্ঞানী হতে হবে, দার্শনিক হতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি-মানব এসব হতে পারে কেবল তা-ও বহু সাধনা, ত্যাগ আর তপস্যা করে। অবশ্য ২.৫ হাজার বছর আগের এথেন্সে জ্ঞানী মানুষদের অভাব ছিল না। চারদিকে তাদের ছড়াছড়ি ছিল। ওখানের মানুষ জ্ঞান সকাল-বিকাল খেত, পরত.. জ্ঞান নিয়ে ঘুমাত। অথচ যারা সত্যিকার অর্থে জ্ঞানের প্রচার করত—তাদের সাথে কতটা নির্মম অন্যায় ও অত্যাচার করেছে—তার উদহারণ ছিলেন অনেকেই। সক্রেটিস তাঁদের মধ্যে অন্যতম। এথেন্স এখানেই নায়ক আবার এথেন্সই এখানে খলনায়ক।

জ্ঞানী হলেই যে জ্ঞানের বোঝা সবাই বইতে পারে এমনও না। তবে অজ্ঞানীরা ‘জ্ঞান’-কে ভীষণ ভয় করে। কারণ জ্ঞান চর্চা করে সকলে যদি জ্ঞানী হয়ে যায় তাহলে সমাজের ধান্ধাবাজরা তাদের গোপন অভিসন্ধি কখনোই প্রয়োগ করতে পারবে না, তাদের উদ্দেশ্য সাধন করতে পারবে না।

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’-এ বহু বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। জ্ঞানের পাশাপাশি গণতন্ত্রের ফলাফল, নারীদের পরাধীনতা এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে জ্ঞানীদের আহত ও নিহত করার বিষয়গুলো খুবই স্পষ্টভাবে উল্লেখিত। তখনও এর প্রচলন ছিল, এখনও এর প্রচলন রয়েছে। যুগে যুগে এমনটাই থাকবে। দুরভিসন্ধি, দুষ্কৃতিকারী, দুর্নীতিকারীরা চায় সমাজের মানুষ জ্ঞানী না হোক, শিক্ষিত না হোক, নারীরা বাইরে বের না হোক—যেন তারা নিজেদের কর্ম নির্বিঘ্নে সম্পাদন করে যেতে পারে। একটা সুন্দর রাষ্ট্রকে গড়ে তুলতে পারে দ্বিতীয় নরক হিসেবে। এতে সক্রেটিস, পেরেক্লিস, ফিডিয়াস, পিথাগোরাস, এনাক্সাগোরাস’র মতো মহামানবরা অপমানিত হতে থাকুক, লাঞ্ছিত হতে থাকুক আর তাদের দমানোর কোনো পন্থা খুঁজে না পাওয়া গেলে—ধর্মের দোহাই দিয়ে তাকে মেরে ফেলা হোক। এভাবেই চলছে যুগের পর যুগ। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও জ্ঞানচর্চার জন্য মানুষের অবান্তর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, কুযুক্তির ব্যাখ্যা দিতে হয়।

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’-এ দু’জন নারী মহিয়সীর কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে; যারা সক্রেটিস’র জীবনে গুরুর ভূমিকা পালন করেছেন। একজন ডিওটিমা—নারী দার্শনিক ও মন্দিরের পুরোহিত আরেকজন নিষিদ্ধ পল্লীর কেরামেকোস’র বাসিন্দা আশপাসিয়া। তাদের গুরুত্ব এ গ্রন্থে বিশেষভাবে দর্শিত। সেই সময়ে এথেন্সে ঠিক কী প্রকার জীবন অতিবাহিত করত—তার একটি রেখাচিত্র উঠে এসেছে বইয়ে। তবে বিশেষভাবে সক্রেটিসের সহধর্মিণী জেনথিপি’র কথা না বললে ভীষণ অন্যায় হবে। সক্রেটিস পূর্বে যা ছিলেন এবং পরবর্তীতে আমরা যে সক্রেটিসকে পেয়েছি—তার পিছনে জেনথিপির অবদান কোনো অংশে কম নয়। গ্রন্থে প্রেম আর ভালোবাসা নিয়ে দারুণ সব উক্তি এসেছে, কথাবার্তা এসেছে। কিছু প্রেম থেকে গেছে অমর হয়ে, শুধু মানুষগুলো হারিয়ে গেছে।

এথেন্স সেই সময়কার গ্রিসের সব কয়টি রাষ্ট্রের উদাহরণ হিসেবে থাকলেও তাদের ভেতরকার অনেক কিছুতেই তারা ছিল বেশ পিছিয়ে। স্পার্টার সাথে চলা দীর্ঘ ২৭ বছর যুদ্ধের সময় যেসব ধারক-বাহকরা এথেন্সে নিয়ে গিয়েছিল সবার শীর্ষে; তাদের মৃত্যুতে এথেন্স একটা সময় হয়ে পড়ে সাধারণ কোনো নগরে। এর জন্য দায়ী করার মতো বহু বিষয় থাকলেও জনগণের অবিবেচক মতামত ও তাদের স্থূল চিন্তাকে এখানে অ্যান্টাগনিস্ট হিসেবে দেখানো হয়েছে। যতই সেখানে এনিতাসের মতো কুচক্রী সুযোগসন্ধানীরা থাকুক না কেন।

‘ঐশ্বর্য বা দাসত্ব কারও গৃহে থাকে না,
থাকে আত্মার ভেতরে।’ —জেনোফোন

কোনো জটিল বিষয় বোঝার জন্য প্রশ্নের পর প্রশ্ন করাকে বলে ‘সক্রেটিস মেথড’। যা আজকাল কেউ পছন্দ করে না। যেমনটা এথেন্সে করত না বুড়োরা। আমাদের সময়কার বুড়োরা তরুণদের সেভাবে পছন্দ করে না। তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে বলে পোলাপান বেয়াদপ, অসভ্য। বড়োদের মান্য করে না। কেন করে না এর ব্যাখ্যা রয়েছে বইতে। এমন রিলেটেবল জিনিসপাতি পুরো গ্রন্থেই ছড়াছড়ি। নিজেকে জানার জন্য বা পরিস্থিতি বোঝার জন্য এর থেকে সহজ কিছু আর হতে পারে বলে মনে হয় না।

দেখুন, হাজার হাজার বছর পরও পরিবর্তন খুব বেশি হয়েছে বলব না। বিজ্ঞানের আবিষ্কার বলুন কিংবা মহকাশের পথে-প্রান্তরে ভয়েজার পাঠিয়ে যা রয়েছে—তার একটি রূপরেখা উন্মোচন কিন্তু সেই ২.৫ হাজার বছর আগেই করা হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে সেগুলো কেবল রূপান্তর হয়েছে বাস্তবে। তখনও খ্রিষ্টধর্ম প্রতিষ্ঠা হয়নি, যিশুখ্রিষ্টের জন্ম হয়নি। ইউরোপ-এশিয়ার দ্বন্দ্বের শুরুটা ঠিক তখন থেকেই। অনার্য-আর্য, দেবতা-অসুরের ভিত্তি গড়ে উঠেছে তখনই। হেরাডটাসের ‘ইতিহাস’ সৃষ্টির হয়েছে এথেন্সে। সেখানে এশিয়া মাইনরের কথা উঠে এসেছে, তারা কীভাবে হোমার’র মহাকাব্যকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছে আর গ্রিকরা কীভাবে করেছে সেইসব নিয়ে অল্পবিস্তর আলোচনা রয়েছে। এত এত তথ্য-উপাত্ত, প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আমাদের বিশ্বাস, অবস্থান কতটা করুণ তা ভাবা যায় না। অথচ আমাদের আরও বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সক্রেটিস, পেরেক্লিসের মতো যারা এগিয়ে গেছে—তাদের নিয়ে আমরা বিদ্রুপ করি, হিংসা করি, ঘৃণা করি কতশত দোহাই দিয়ে তাদের মতামত খারিজ করার চেষ্টা করি। এই হলো আমাদের জ্ঞান আর জ্ঞানের পরিসীমা।

বিস্তর আলাপ করেছি। লেখকের ভাবনার সাথে, পুরো একটি গ্রন্থ নিয়ে এই আলোচনা কেবল প্রতিক্রিয়া নয়। একটি বই পড়ে কী জেনেছি, কী বুঝেছি, নতুন কী শিখতে পেরেছি—এ আলাপ সেইসবের অংশ। কেবল বিনোদন, আনন্দ আর সময় পাস করার বহু মাধ্যম আছে, তবুও যুগে যুগে মানুষ কেন জ্ঞান অন্বেষণের জন্য বইয়ের পিছনে ছোটে; তার প্রমাণ ‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’। প্লেটো যদি সেই সময় সক্রেটিসের একনিষ্ঠ ভক্ত না হতো, না লিখত তাঁকে নিয়ে—হয়তো এমন জ্ঞান, দর্শন, বিজ্ঞান হারিয়ে যেত কবেই। বর্তমানে সুজন দেবনাথ’র মতো লেখকরা যদি জ্ঞানের বিষয়বস্তুকে সহজবোধ্য করে উপস্থাপন না করত—তা-ও এসব চর্চা হারিয়ে যেত। কতিপয় কিছু পাঠক-মানুষ হয়তো এ নিয়ে বিচ্ছিন্ন আলাপ করতে দেখা যেত সক্রেটিসের মতো কোনো পথে-প্রান্তরে বসে। আজকাল তো সব আলাপ আবার পশ টেবিল খুঁজে বেড়ায়। জ্ঞান যে সেই সময় রাস্তায় ধুলো-বালির সাথে গড়াগড়ি খেতো—বহু চিন্তাবিদ তা ভুলেই বসে আছে।

এছাড়া মানুষের মানবিকতা নিয়ে সক্রেটিস ব্যাখ্যা দিয়েছেন বহু, সেখানে সফোক্লিসের মতো মহান ট্রাজেডি নাট্যকারের একটি নাটক দেখে ইউরিপিডিস-কে বলেছেন,

‘সাফোক্লিসের চিন্তা-ভাবনা খুবই পুরোনো। ইদিপাস খুনি, তাই তাকে তাড়িয়ে দিতে হবে। অথবা খু ন করতে হবে। খু নে র বদলে খু ন। প্রতিশোধ নিতে হবে। আমি যে সুন্দর জীবনের কথা বলি এটি সেই সুন্দর জীবন নয়। সুন্দর জীবনে প্রতিশোধ বলতে কিছুই নেই। আছে ক্ষমা, আছে মানবিকতা।’

এসব ছাড়া সক্রেটিস নাটক, কবিতা এসব বিষয়কে খুবই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। ওসবে সত্যের থেকে মিথ্যা মেশানো থাকে সবচেয়ে বেশি। এবং তা দিনের আলোর মতো সত্য। প্লেটো তো এরিস্টোফানিস’র লেখা ‘মেঘ’ নাটক থিয়েটারে দেখে এসে তার সকল কবিতা, নাটক আগুনে পুড়িয়ে নিজেকে শুদ্ধ করেছিল। মানুষ ওসব দেখে প্রভাবিত হয় ভীষণ, তারা সেইসব দেখে সত্য-মিথ্যার বিচার করতে পারে না। আর এসব থেকে মুক্ত হতে প্রয়োজন জ্ঞান নিয়ে চর্চা, নিজেকে জানা। প্লেটো তার এক উক্তিতে বলেছেন:

‘মানুষ হলো সেই জীব
যে সারা জীবন শুধু জীবনের অর্থ খুঁজে যায়।’

অথচ জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া কোনো রকেট সায়েন্স না। ইচ্ছা হলেই জানা যায়। কিন্তু তবুও মানুষ জানতে চায় না।

‘তুমি যা চাও, তা না পেলে কষ্ট পাও:
যেটি চাও না, সেটি পেলেও কষ্ট পাও;
যেটি চাও সেটি পেলেও কষ্ট, কারণ চিরকাল রাখতে পারবে না;
তাই যত সমস্যা সব তোমার ভেতরেই।’ —সক্রেটিস

এ বই নিয়ে আমার আরও আলোচনা করার আছে, হয়তো আমি বিচ্ছিন্ন সময়ে সেইসব করি। প্রতিটা অধ্যায় ধরে, অধ্যায়ের শুরুতে দেওয়া কোট ধরে, টীকা ধরে—সব নিয়ে বৃহৎ আলোচনার ইতি টেনে দিতে হচ্ছে। টানার পূর্বে একটা প্যারা লিখে শেষ করে যেতে চাই।

‘হেমলকের নিমন্ত্রণ’ পড়তে গিয়ে হুমায়ূনী লেখার ফ্লেভার পেলাম। এদিকে তাঁর চরিত্র হিমু খালি পায়ে হাঁটে সক্রেটিসের মতো। সক্রেটিস যেমন মানুষদের জানতে চেয়েছেন, উদ্ভট সব কাজ করেছেন... হিমুকে দিতে হুমায়ূন আহমেদ সেইসব করিয়েছেন৷ এই মিলকরণটা পছন্দ হয়েছে। পার্থক্য রয়েছে কিন্তু যখন দুটো বিচ্ছিন্ন সুতো এক জায়গায় এসে জট পাকিয়ে ফেলে, তখন নতুন কিছুর সৃষ্টি অবশ্যই হয়। এ সরলীকরণ অনেকের হয়তো পছন্দ হবে না তবে জটিল বিষয় হুমায়ূন আহমেদ যেমন সহজে বুঝাতে পারতেন, সুজন দেবনাথ একই কাজ করে দেখিয়েছেন অত্যন্ত চতুরতার সাথে৷

বইটি শতভাগ রেকোমেন্ডেড। জীবনে একবার হলেও বইটি পড়বেন। পড়বেন আর ভাববেন, ভাববেন আর পড়বেন। নিজের ভেতর সক্রেটিসকে সম্ভব হলে ধারণ করবেন অথবা পেরিক্লিসকে অথবা আশাপাসিয়াকে। কারণ,

‘একটি মাত্র শব্দ আমাদের সকল ব্যথা মুক্ত করতে পারে,
সেটি হলো ভালোবাসা।’ —সফোক্লিস
Profile Image for Bibi Rasheda Afrin Rumi.
19 reviews16 followers
March 5, 2026
কী অসাধারণ সুন্দর একটি বই! দর্শনের মতন এতো খটোমটো বিষয় কী নিদারুণ সুন্দর প্রাঞ্জল করে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক তার লেখনীর মাধ্যমে! কী অদ্ভুত ঘোরলাগা কাজ করেছে পুরোটা পড়ার সময়ে। মনে হয়েছিলো যেন এথেন্সের সেই সময়টাতে ফিরে গিয়েছিলাম যখন কিনা সক্রেটিস, ক্রিতো, প্লেটো জ্ঞান চর্চা করতেন। আবার পড়বো বইটি। আবার হারিয়ে যাবো সেই সময়টাতে। এখন সংক্ষেপে লিখলাম, আবার লিখবো এই বই নিয়ে, লিখতেই হবে।
Profile Image for Sharmin Sultana  Shamoly.
90 reviews26 followers
April 15, 2022
চমৎকার!
সক্রেটিসের সাথে আড্ডার পরিভ্রমণ।
Profile Image for Samia Rahman.
41 reviews2 followers
September 23, 2024
ভাষাগত দিক দিয়ে ভালো লাগেনি। অনেকটা মুখের ভাষায় লেখা হয়েছে। বইয়ের ভাষায় হলে পড়ে মন ভরতো। তবুও বলবো, মাস্টরীড, বইয়ের বিষয়ের জন্য।
This entire review has been hidden because of spoilers.
Profile Image for প্রিয়াক্ষী ঘোষ.
378 reviews40 followers
August 17, 2024
প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা। বাংলা থেকে বহুদূরের এক সভ্য জনগোষ্ঠী যারা ছিল সময়ের থেকে কয়েকশ ধাপ এগিয়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে সৃষ্টিশীল সময় এবং সেই সময়ে কিছু সৃষ্টিশীল মানুষের জন্ম হয় গ্রিকে। গ্রিকের এথেন্স ছিল সুন্দর মনোরম এক শহর। এই শহরে জন্ম নেওয়া কিছু প্রতিভাবান মানুষের পাগলামি থেকে জন্ম হয়েছিল গনতন্ত্র, চিকিৎসা, দর্শন, সহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস সহ জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রায় সবকিছু।
সেই সব প্রতিভাবান মানুষদের মধ্যে একজন ছিলেন সক্রেটিস। তিনি নিজে কিছু না লিখলেও শিষ্যদের মাধ্যমে তিনি নিজের প্রতিভা রেখে গেছেন।
সারাজীবন খালি পায়ে হেঁটে হেঁটে তিনি "সুন্দর জীবন" এর গল্প বলেছেন। যার ফলে প্লেটো শিখেছেন জীবনের অর্থ। জন্ম হলো দর্শন ও নৈতিকতার। প্লেটো ছিলেন মূলত একজন কবি, কিন্তু সক্রেটিসের ছোঁয়ায় হয়ে গেলেন কঠিন দার্শনিক।

সেই সময়টা ছিল মূলত সৃষ্টিশীল সময়।
ইতিহাসের জনক হেরোডটাস লিখতে শুরু করলেন পৃথিবীর প্রথম ইতিহাসের বই।
থেলিস নামের এক লোকের ভাবনা থেকে জন্ম নিলো এক নতুন জিনিস, যার নাম বিজ্ঞান।

পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম শুরু হয় সভ্য উপায়ে ( মারামারি কাটাকাটি না করে) বীর হওয়ার লড়াই, নাম তার অলিম্পিক গেমস।
এথেন্সের মানুষই প্রথম আবিষ্কার করলো গনতন্ত্র, পাহাড়ের উপরে বসে শুরু হলো পৃথিবীর প্রথম সংসদ।
পিথাগোরাস বের করলেন জ্যামিতিক সূত্র, গোল্ডেন রেশিও। সেই রেশিও দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভবন পার্থেনন ডিজাইন করেছেন শিল্পী ফিডিয়াস।
চিকিৎসাবিদ্যার জনক হিপোক্রাটিস ডাক্তারদের জন্য লিখলেন ' হিপোক্রেটিস শপথ'।
ম্যারাথন মাঠ থেকে এক দৌড়ে যুদ্ধের খবর আনতে গিয়ে মারা গেলেন ফিডিপিডিস। সেই থেকে শুরু হলো ম্যারাথন।
এথেন্সের থিয়েটারে প্রথম অভিনয় শিল্পী থেসপিস।
প্রথম ট্রাজেডি নাটকের জনক ইস্কিলাস। অভিনয় করেছেন ' প্রমিথিউস বাউন্ড'।
সফোক্লিস লিখলেন সর্বকালের সেরা ট্রাজেডি 'রাজা ইদিপাস'।
হোমারের কবিতা আবৃত্তি করে পাহাড়ের গুহায় বসে ইউরিপিডিস লিখলেন ' ট্রয়ের মেয়েরা'।
কমেডি নাটকের জনক এরিস্টোফানিস সক্রেটিস কে না জেনে না চিনে অন্যের কথায় ভয়ঙ্কর রকমের মিথ্যা দিয়ে সক্রেটিসকে নিয়ে লিখলেন প্রহসন নাটক 'মেঘ'।
সেই রাগে ক্ষোভে প্লেটো নিজের লেখা সব কবিতা পুড়িয়ে ফেলে হয়ে গেলেন দার্শনিক এবং তার আদর্শ রাষ্ট্র থেকে নির্বাসন দিলেন কবি -সাহিত্যিকদের।
কিছু মানুষের ব্যক্তিগত আক্রোশ আর গোঁড়ামির জন্য আসামি হতে হলো সক্রেটিসকে।
পৃথিবীর ইতিহাসে জ্ঞান বিজ্ঞানের জন্ম ও রোমাঞ্চকর দারুণ সব তথ্য নিয়ে এই উপন্যাস সুজন দেবনাথের " হেমলকের নিমন্ত্রণ "।
Profile Image for Md.Asif Iqbal.
8 reviews1 follower
October 12, 2024
জীবনের সামান্য বই পড়ার মাঝে। আমি যেকোন বই ধরার সময় মনে হতো বইটা শেষ হবে আমার বই পড়ার তালিকায় আরেকটা বই জমা হবে। কোনো সময় আমার মনে হয় নি এই বইটি শেষ না হোক, চলতে থাকুক আজীবন। মনে হয় নি ইস যদি বই এর পৃষ্ঠা সংযোজন হতে থাকতো সময়ের সাথে সাথে, বইটি আর কখনো যদি শেষ না হতো।

আমি হেমলকের নিমন্ত্রন এ এমন একটা রস পেয়েছি। আমি দর্শন ভালোবাসি। আমি এই বইতে দর্শন এর ইতিহাস জেনেছি, সাথে সাথে বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, বিচার, চিকিৎসা, গণতন্ত্র, নাটক, স্থাপনাশিল্প, গণিত, মিথলোজি, প্রেম, কৌতুক সব কিছুর রসই পেয়েছি।

আমি এই বইটা অবশ্য পাঠ্য একটা বই হিসেবে পরামর্শ দিতে চায়। যেখানে পাঠক হারিয়ে যাবে সক্রেটিস এর সাথে এক সুন্দর জ্ঞানের দেশ এনথেনায়, করবে প্রশ্ন প্ৰশ্ন খেলা।
Profile Image for Shreyashi Bhattacharjee Dutta.
90 reviews6 followers
October 12, 2025
গ্রীসের এথেন্সে একদিন সন্ধ্যায় এক পিতা খুব শাসন করছেন তাঁর ছেলেকে। বাড়ির পাশে লোক জমেছে সেই মজা দেখতে। ছেলেটি আর কেউ নন মহান দার্শনিক সক্রেটিস। তাঁর পিতা তাঁকে কবিতার লাইন বলে বলে মারছেন। কারণ তিনি মানুষকে উদ্ভট প্রশ্ন করছেন এবং সব কাজের ব্যাখ্যা খুঁজে সবাইকে নাজেহাল করে দিচ্ছেন। এই নিয়ে রোজ লোকে নালিশ করছে সক্রেটিসের বাড়িতে।


এথেন্স এমন একটি দেশ যেখানে গণতন্ত্র চলে। তখন এমন একটি সমাজ যখন হোমারের ইলিয়াড ও ওডিসি সকলের মুখস্থ, সেখানে সবেতে দেবদেবীর প্রাধান্য দেওয়া হয়, এমনকি চিকিৎসা শাস্ত্রের জন্ম হয়নি। মানুষের অসুখ করলে দেবদেবীর কাছে পুজো দিয়ে সুস্থ করার চেষ্টা করা হয়, সেখানে যোদ্ধা ও বীরেরা তরুণদের আদর্শ। 

তেমন একটি সমাজে হিপক্রাটিস কয়েকজন ছাত্রকে নিয়ে লিখতে শুরু করলেন চিকিৎসা শাস্ত্রের গ্রন্থ, অন্যদিকে সক্রেটিস প্রথম শোনালেন যে বীরের জীবন নয়, আমাদের দরকার সৎ পথে, শান্তিপূর্ণ হয়ে জীবন কাটানো, যাকে তিনি বলেন ' সুন্দর জীবন '। শুধু দর্শন বা চিকিৎসা শাস্ত্র নয়, সেই সময়ে এথেন্স নিয়েছিল নাটক, রাজনীতি, শিল্প, জ্যামিতি ইত্যাদি বিষয়ে এক অগ্রণী ভূমিকা। গণতন্ত্রের বেছে নেওয়া এথেন্সের নেতা পেরিক্লিস ঢেলে সাজিয়ে তুলছেন শহর, তাঁকে সেই কাজে সাহায্য করছেন শিল্পী ফিডিয়াস। 


মোটের ওপর, 550 পাতার এই বিশাল উপন্যাস পাঠককে নিয়ে যাবে প্রাচীন গ্রীসের সমাজে, মুগ্ধ করবে মানুষের যুক্তিবাদী মানসিকতা, নতুন উদ্ভাবনের ঐকান্তিক চেষ্টা, অপরদিকে কিছু গোঁড়া ও কট্টরপন্থী মানুষের কুকীর্তি হৃদয় ভেঙে দিতে বাধ্য। সক্রেটিসের সম্বন্ধে জানতে আমি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াকালীন শেষবার পড়েছি। তারপর আর কোনোদিন তাঁর সম্পর্কে কৌতূহল জাগেনি। কিন্তু এই বইটি পড়ার পর সেই যুগ সম্পর্কে জানার আগ্রহ বেড়ে গেছে। মাঝখানে গুগল সার্চ করে করে অনেককিছু জেনে নিয়েছি। 

খুব ভালো লেগেছে। একদম দারুন।
Profile Image for Anup Kumar Saha.
13 reviews
January 7, 2025
প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের একদল সৃষ্টিপাগল মানুষ মেতে উঠেছিলেন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে সেই মানুষগুলো তৈরি করেছিলেন সভ্যতার বেদিমূল। তাঁদের সেই পাগলামোতেই সৃষ্টি হয়েছিল সাহিত্য, বিজ্ঞান, গণতন্ত্র, থিয়েটার, চিকিৎসা, অর্থনীতি, দর্শনসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখা। আর এ-সকল পাগলামোর কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল নগররাষ্ট্র এথেন্স। হেমলকের নিমন্ত্রণ এথেন্সের সেইসব জ্ঞানপাগল মানুষগুলোকে নিয়েই। গল্পের সব চরিত্র ঐতিহাসিক, তাই বলাই যায়, গল্পের আড়ালে এ-এক ইতিহাসগ্রন্থ। সক্রেটিস, প্লেটো, হেরাডটাস, পেরিক্লিস, সফোক্লিসসহ নানা ঐতিহাসিক চরিত্র রয়েছে এখানে। তবে মূল চরিত্র সক্রেটিস— তাঁকে ঘিরেই কাহিনীর ডালপালা। সক্রেটিসের পাগলামো, সুন্দর জীবনের স্বপ্ন, প্রথা ভেঙে তরুণদের প্রশ্ন করতে শেখানো, আর এসবের ফলে জ্ঞানের দিগন্তে নতুন যাত্রা— এসবই গল্পের মূল উপজীব্য।

বইটি সুখপাঠ্য, কাহিনী বর্ণনা মসৃণ, আগ্রহ-জাগানিয়া; তবে, অতি সমসাময়িক শব্দের ব্যবহার প্রচুর, কিছু জায়গায় তা বিষয়বস্তুর গম্ভীরতাকে হালকা করেছে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, প্রয়োজনীয় ফুটনোট— যেগুলো কাহিনীর মিনিং ও ব্যাকগ্রাউন্ডকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। বইয়ের পেছনে লম্বা রেফারেন্স দেখে বোঝা যায়, কত পরিশ্রমের ফল এই বই। বলাই যায়, লেখকের পরিশ্রম সার্থক।
Profile Image for Jahid Hasan.
135 reviews158 followers
February 15, 2025
একটা গল্পকে আমি বিবেচনা করি তার অনুভূতিকে ছুঁতে পারার ক্ষমতা দিয়ে। সেদিক থেকে হেমলকের নিমন্ত্রণ ভালোই ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। মানে সক্রেটিসের সঙ্গে আগোরার পথে হাঁটতে চেয়েছিলাম, সেই সাধ পূর্ণ হয়েছে। গল্পে তথ্য এসেছে আলগোছে। তাতে কোন জোরজবরদস্তি নেই, তথ্য জানিয়ে বাহাদুরির প্রকাশ নেই। এমনকি যে এথেন্সের ইতিহাস, মিথলজি আর মানুষগুলোকে আমি মানসচক্ষে এঁকেছি এতোদিন, তারই প্রকাশ ঘটেছে এ-বইতে। তাই পছন্দের তালিকায় হেমলকের উঠে আসতে সময়ে লাগেনি।
তারকা কেবল এক ঘর নিচে নেমে যায় যখন প্রসঙ্গ ওঠে চরিত্র চিত্রণের। যেখানে সক্রেটিক মেথড বোঝা গেলেও সক্রেটিসের জীবনবোধের আরেকটু গভীরে যেতে উশখুশ করে মন। আর চরিত্রদের কথোপকথনে ভাষার প্রয়োগ লাগে বেখাপ্পা।
সে যাই হোক, হেমলকের নিমন্ত্রণ পেয়ে আমি সত্যি আনন্দিত। এখন কেবলই ইচ্ছে জাগে এই মরণ সুধা হরিৎ মদের মতো
গেলাসে-গেলাসে পান করি।
Profile Image for Parvez Alam.
332 reviews15 followers
February 4, 2022
এককথায় অসাধারণ পাঠ অভিজ্ঞতা। এ বই দিয়ে পৌঁছে গিয়েছি আড়াই হাজার বছর আগের অন্য এক পৃথিবীতে। সক্রেটিস, প্লেটো, হেরাডটাস, সফোক্লিস, হিপোক্রেটস -এর সময়ে গণতন্ত্র, থিয়েটার, সাহিত্য, কমেডি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাশাস্ত্রে জন্ম নিয়ে ৫৫০ পেজে বিশাল এক উপন্যাস। কয়েকজন মহাপ্রতিভাবান মানুষ অদ্ভুত এক পাগলামি শুরু করেছিলেন। তাদের মধুর এই পাগলামিতে জন্ম হয়েছিল গণতন্ত্র, থিয়েটার, সাহিত্য, কবেডি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাসহ মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় সবকিছু। এই উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রতি পর্বের শুরু তে মনীষীদের উক্তি আর যে কোনো তথ্যে বিস্তারিত ১৪০টি ফুটনোট , এই দুইটি বই টির সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দেয়।
Profile Image for ASHIK.
270 reviews69 followers
March 17, 2023
খুব কম বইয়ে ৫ তারকা দিতে পেরেছি। এই বইটিতে ৫ তারকা না দিলে অন্যায় হবে।
Displaying 1 - 30 of 81 reviews