"সেই সব প্রসূতিদের মনে আছে, যারা মেতেছিল সন্তান প্রসবকালীন গানে? ফিরে পেতে চেয়েছিল মেঘমল্লার। কিছুই পায়নি তারা। কেবল হরিৎ এই রাত। যার বুকে থেমে থেমে বাজে ধনুর্বিদ্যা। সেও কি তবে গান, বিপদ সংকেত? ফেরা হবে না জেনেও গলায় তুলেছিল সুর, হাতে নিয়েছিল পিস্তল। অসংখ্য চিৎকার ও শব্দে যারা ভেদ করে গিয়েছিল তোমাদের হেভিমেটাল।" - পৃষ্ঠা ১৮
'শেফালি কি জানে' পাঠের পর হাসনাত শোয়েবের প্রতি মনুষ্য আচরণজনিত হাই এক্সপেক্টেশন তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক বিষয়। তবে লেখালেখি মনে হয় ওভাবে কাজ করে না। লেখক / কবির শ্রেষ্ঠ কর্মের সাথে অন্যান্য কাজের তুলনা এসে যায় তবে প্রতিটি লেখা বা গ্রন্থের তো নিজস্ব সিগন্যাচার থাকে। 'সন্তান প্রসবকালীন গান' এরকম নিজস্বতা নিয়ে এগুনো এক কবিতার বই।
রিভিউর প্রথমটা পড়লেই দেখা যায় ছন্দ বা কবিতার প্রথাবদ্ধ ব্যাকরণের চেয়ে অনুভূতি প্রকাশের দিকে পুরো বই জুড়ে হাসনাত শোয়েবের নজর ছিলো বেশি। ভাষা যদিও চিন্তার অগ্রবর্তী, তারপরও শুধুমাত্র ভাষায় সব মনোযোগ দিয়ে দিলে অনেক সময় কবির মূল ভাষ্য হয়তো হারিয়ে যেতে পারে।
কবিতাগুলো আমার মনে হয়েছে একটি আরেকটির সাথে ধারাবাহিকভাবে কানেক্টেড। সব কবিতা মিলিয়ে একটি আখ্যান রচনা করতে চেয়েছেন মনে হয় হাসনাত শোয়েব। যেখানে 'সন্তান প্রসবকালীন গান' এর গল্পই শুনানো হয়েছে।
কবিতার সাথে মিথলজিক্যাল প্রাসঙ্গিকতা এবং সমসাময়িক পপ কালচারের উপমা হিসেবে প্রয়োগ ভালো লেগেছে। যদিও কবিতার উর্ধ্বে এসব ছাপিয়ে যায় নি। এই পরিমিতিবোধ প্রশংসনীয়। তবে আমার কাছে যেহেতু সবগুলো কবিতার বিষয়বস্তু বা থিম এক এবং ধারাবাহিকভাবে এক আখ্যানের দিকে অগ্রসরমান মনে হয়েছে, তাই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় একই থিমের কল্পনা পরিধি আরেকটু বৃহৎ হলে ভালো লাগতো। এক কবিতা হতে আরেকটির থিম একই হওয়ার পরও আরো বৈচিত্রময়তা সম্পন্ন হলে ভালো লাগতো। এই বিষয়ে কবির কথা-ই অবশ্য শেষ কথা। উক্ত বিষয়ে হাসনাত শোয়েব কি বলবেন সেটি শুনতে আমি আগ্রহী।
"সব সুরই একদিন হারিয়ে ফেলে তার বাদককে। হঠাৎ দুপুরের পর তার মনে পড়বে না কোনো সুর। মনে পড়বে না জেনেও সে গান বাঁধে। যেন এই আহির ভৈরবেই সে ডানা মেলে ছিল, ধরেছিল সন্তান প্রসবকালীন গান। সেই গান যার আছে শরীর। আছে মাংস ও জন্মদাগও। কোনো এক ভোরেই সে শিখেছিলো ধনুর্বিদ্যা। বাদককে লক্ষ্য করেই একদিন যে ছুঁড়ে দেবে সমস্ত বান।" - পৃষ্ঠা ২৬
একটা বড় ক্রেডিট কবি হাসনাত শোয়েবকে অবশ্য দিতে হয়। তিনি কবিতাপাঠকের মনোজগতে চেতনে বা অবচেতনে একধরণের বিপন্নতা এবং বিমর্ষতা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন মনে হয়েছে। এই কর্মটি তিনি ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন।
বই রিভিউ
সন্তান প্রসবকালীন গান
লেখক : হাসনাত শোয়েব
প্রথম প্রকাশ : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১
প্রকাশনা : চন্দ্রবিন্দু
প্রচ্ছদ ও স্কেচ : ইউসুফ বান্না
নামলিপি : রাজীব দত্ত
অলংকরণ, মুদ্রণ ও বাঁধাই :
চন্দ্রবিন্দু ডিজাইন এন্ড প্রিন্টার্স
রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ