কাহিনি সংক্ষেপঃ ঢাকার অদূরের এক মফস্বল এলাকার জংলা খালপাড়ে পাওয়া যায় এক নবজাতককে৷ কারা যেন নিষ্পাপ এই সদ্যজাতকে ফেলে রেখে গেছে এখানে। আশেপাশে অনেকে ভিড় জমালেও বাচ্চাটাকে কেউ তুলে নেয় না। ধুঁকতে ধুঁকতে মারা যায় সে। আর ঠিক এই দুঃখজনক ঘটনার কিছুদিন পরেই এক গর্ভবতী মহিলা এক ভীতিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। কি দেখে এতোটা ভয় পেয়েছিলেন তিনি?
ধানমন্ডির শংকরের ডায়না ভবন। এই ভবনের এক ফ্ল্যাটে দুই ব্যাচেলর বন্ধু ভাড়াটিয়া হিসেবে উঠলো। ধ্রুব আর রিয়ন। দুজনের চরিত্র একে অপরের একদম বিপরীত। ধ্রুব বেশ শান্ত স্বভাবের, আর ওদিকে রিয়ন অনেকটা প্লেবয় টাইপের ছটফটে ছেলে। এই ফ্ল্যাটে ওঠার কিছুদিন পর থেকেই রিয়নের আচরণ পাল্টে যেতে থাকে। সময়ে-অসময়ে ভয় পেতে শুরু করে সে। একদিন এক মেয়ের প্রেতাত্মার মুখোমুখী হয় রিয়ন, যে সম্পূর্ণ নগ্ন আর যার মুখের একপাশ দিয়ে ফেনা গড়াচ্ছে। এই প্রেতাত্মা আসলে কি চায়?
রিয়নের সাথে ভৌতিক ঘটনাগুলো ঘটে যাওয়ার পর এসবের আঁচ টের পাওয়া শুরু করলো ধ্রুবও। ডায়না ভবনের স্পেসিফিক এই ফ্ল্যাটের 'সমস্যা' বের করার জন্য এর পেছনের ইতিহাস খুঁজতে নেমে পড়লো সে। নানা মাধ্যম থেকে ধ্রুব এমন অনেক কিছুই জানতে পারলো, যা এই ফ্ল্যাটের রহস্যকে আরো ঘনীভূত করে তুললো। শেষ পর্যন্ত এমন এক সত্য ওর সামনে উন্মোচিত হলো, যেটা আরো একবার প্রমাণ করলো মানবচরিত্র কতোটা অন্ধকার আর প্রতিশোধ কতোটা ভয়াবহ হতে পারে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ চমৎকারভাবে শুরু হয়ে প্রায় হতাশাজনকভাবে শেষ হওয়া বই 'কৃষ্ণজাল'। লেখক হিসেবে প্রান্তিক সৌরভের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস এটা। কিছুটা লো এক্সপেকটেশন নিয়ে বইটা পড়া শুরু করেছিলাম। শুরুর দিকে বেশ ভালোই লাগছিলো। তবে যতোই সামনে এগিয়েছি মাঝেমাঝেই বিরক্তি বোধ করেছি। সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স সম্পর্কিত জায়গাগুলোর বর্ণনা একটু বেশিই রগরগে মনে হয়েছে আমার কাছে। একটা সময় পর ভৌতিক আবহটাও যেন ঠিক জমছিলো না। তবে বেশ কিছু জায়গায় আবার লেখক আবহটা ঠিকঠাক আনতেও পেরেছিলেন।
'কৃষ্ণজাল' টেক অফ করেছে বেশ সাবলীলভাবে, কিন্তু ল্যান্ড করার বেলায় গোলমাল পাকিয়ে ফেলেছে। এটা বললাম এই কারণে যে, বইটার শেষদিকে পজেশনের যে বর্ণনা দেয়া হয়েছে সেটাকে আমার কোন অ্যাঙ্গেলেই পজেশন বলে মনে হয়নি। হরর পডকাস্ট শোগুলোতে ইদানীংকালে শোনানো অনেক হরর স্টোরিই এর চেয়ে স্ট্রং মনে হবে বইয়ের ওই অংশটুকু পড়লে। 'কৃষ্ণজাল'-এর ফাইনাল টুইস্ট বেশ ভালো ছিলো। কিন্তু সেটার এক্সিকিউশন আমার কাছে পারফেক্ট মনে হয়নি। তবে এই উপন্যাসে লেখক ভ্রুণহত্যার মতো বিষয়ে যে মেসেজটা দিতে চেয়েছেন, সেটা ভালো লেগেছে। এটা প্রান্তিক সৌরভের প্রথম উপন্যাস। ভবিষ্যতে আরো ভালো করার সুযোগ আছে তাঁর। সময়ের সাথে সাথে তাঁর লেখায় আরো পরিপক্বতা আসবে আশা করি।
বইয়ের প্রচ্ছদটা আমার কাছে মোটামুটি টাইপ লেগেছে। তবে সজল চৌধুরীর করা নামলিপিটা বেশ ভালো লেগেছে। আমার পাঠ প্রতিক্রিয়া অংশটা পড়ে যারা ভাবছেন বইটা পড়া ঠিক হবে কি-না, তাদের প্রতি আমার সাজেশন একটাই। নিজে পড়ে যাচাই করুন। কারণ, পাঠ প্রতিক্রিয়া সবসময়ই পাঠকের ব্যক্তিগত অভিমত।
সবাইকে ইংরেজি নতুন বছরের শুভেচ্ছা। বই পড়া শুভ হোক, আনন্দময় হোক।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ২.৫/৫ গুডরিডস রেটিংঃ ২.৭৩/৫
#Review_of_2023_01
~ শুভাগত দীপ ~
(১ জানুয়ারি, ২০২৩, রবিবার, বিকাল ৩ টা ৩০ মিনিট; ইউসুফ মামার দোকান, নাটোর)
বই : কৃষ্ণজাল লেখক : প্রান্তিক সৌরভ মুদ্রিত মূল্য : ২৬০ টাকা প্রকাশকাল : মার্চ ২০২১
ফ্ল্যাপ থেকে ভার্সিটি পড়ুয়া বিজ্ঞানমনস্ক ছেলে ধ্রুব ভুত-প্রেতে মোটেও বিশ্বাস করে না। কিন্তু ধানমন্ডি শংকরের ডায়না ভবনে ওঠার কিছুদিন পর থেকেই তার রুমমেট ও বন্ধু রিয়নের সাথে ঘটতে শুরু করে অস্বাভাবিক নানান ঘটনা, যেসবের পুরোটাই প্রথম দিকে অবিশ্বাস করলেও একটা সময় যখন সে নিজেও কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনার সম্মুখীন হতে থাকে, তখন আস্তে আস্তে বিশ্বাস আর কৌতূহল তার মধ্যে দানা বাঁধতে শুরু করে। আর সেই কৌতূহলের জের ধরেই সে বেরিয়ে পড়ে ডায়না ভবনের ফ্ল্যাট বি-এর অতিপ্রাকৃত ঘটনার উৎস খুঁজতে। উৎস খুঁজতে খুঁজতে যতই চেষ্টা করে রহস্য সমাধানের কাছাকাছি যায়, ততই উপলব্ধি করতে থাকে রহস্যের এই কৃষ্ণজাল যেন ক্রমশ অভেদ্য থেকে আরো তীব্র অভেদ্য হয়ে যাচ্ছে। তারা কি পারবে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া ভৌতিক ও রহস্যময় ঘটনার জাল ভেদ করতে?
ক্ষুদ্র প্রতিক্রিয়া "কৃষ্ণজাল" লেখক প্রান্তিক সৌরভ'র প্রথম উপন্যাস/উপন্যাসিকা। প্রথম বই হিসেবে দারুণ বলতেই হবে। গল্পের প্লটটা ভালো ছিল। আংশিক সমসাময়িক বিষয়কে প্লট হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। বেশ সাবলীল ভাবে লেখা বইটি। গল্পের সুনিপুণ বর্ণনা, রহস্য, ভৌতিক আবহ তৈরি করা সবই ভালো ছিল। আর শেষ টুইস্টটাতো একদম ফাটাফাটি। বইতে বানান ভুল ত্রুটি ছিল না তেমন। তবে এক জায়গায় চরিত্রের নাম গুলিয়েছে। গল্পে বেশ কিছু ১৮+ বর্ণনা আছে। আর কিছু স্ল্যাং। সেজন্য গল্পের শুরুতে একটা ১৮+ এলার্ট দিলে ভালো হতো। বইয়ের ভূমিকায় লেখক বলেছেন বইয়ের বেশিরভাগ অংশই সত্য ঘটনা থেকে নেওয়া। সেসব সত্যি-মিথ্যা যাচাই বা এবিষয়ে যুক্তি তর্কে যাবো না, শুধু বলবো গল্পটা উপভোগ করেছি। সবমিলিয়ে মোটামুটি লেগেছে প্রান্তিক সৌরভ'র প্রথম বই "কৃষ্ণজাল"। হরর লাভাররা পড়তে পারেন।
বিবাহ বহির্ভূত শারীরিক সম্পর্ক, ভ্রুণ হত্যার মতো বিতর্কিত বিষয়কে নিজের প্রথম একক বইয়ের মূল উপজীব্য করা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। লেখক বেশ দক্ষতার সাথে সেই ঝুঁকি সামলেছেন। প্রথমদিকে পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিল লেখক বুঝি মেয়েদেরকেই একতরফা দোষ দিয়ে যাচ্ছেন! কিন্তু পুরো বই পড়ে বোঝা যায় লেখক নিজের কোন মতবাদ প্রতিষ্ঠা বা এক পক্ষের ওপর দোষ চাপানোর কাজটা এড়িয়ে গেছেন। লেখক বরং সাময়িক বিনোদন পেতে কামনার কাছে হার মানা দু'জন মানুষের একক সিদ্ধান্ত কীভাবে আরো দশজনের জীবনকে প্রভাবিত করে সেই ছবিটাই এঁকেছেন। অতিপ্রাকৃত ঘরানার হলেও বইটা পড়তে গিয়ে যে পিলে চমকে যাবে এমন নয়। গল্পের খাতিরে যতটুক দরকার ততটুকু ভীতি উদ্রেককারী উপকরণই ঢালা হয়েছে বইটিতে। উপন্যাস হলেও বইটা তেমন মোটাসোটা নয়। ১৪২ পৃষ্ঠার বইটা লেখকের গতিময় লেখনশৈলীর গুণে এক বসায় পড়ে ওঠার মতো। আসলে বইয়ের শুরু থেকেই নায়ক ধ্রুব ডায়না ভবনের চারতলার ফ্ল্যাট বি-এর রহস্য সমাধানের যে চেষ্টা চালায় তাতে রহস্যের জট না খোলা পর্যন্ত পাঠকেরও ঠিক আরাম হয় না। বই খুললে তাই হাত থেকে রাখা কঠিন। তবে বইয়ের সবচেয়ে অস্থির দিক নিঃসন্দেহে গল্পের টুইস্ট; একেবারে "তাক খেয়ে গেলাম" বলে ফেলার মতোন। শুধু তাকটা খাওয়ার জন্য হলেও বইটা পড়ে শান্তি পাও���়া যাবে। বইটা পড়ে ভালো না লাগার বিষয় হতে পারে কিছু কিছু জায়গায় কামার্ত কপোত-কপোতীর ঘনিষ্ঠ হওয়ার "রগরগে" বিবরণ কিংবা মেয়ে নিয়ে চরিত্রদের ছোঁড়া বিচ্ছিরি সংলাপ। কিন্তু গল্পের খাতিরে ওইটুকু সয়ে যায়। সেক্ষেত্রে বইয়ের শুরুতেই সতর্কবার্তা দেয়া থাকলে ভালো। আরেকটা ব্যাপার, গল্পের মধ্যমণি যেই ফ্ল্যাট লেখক সেটা গুলিয়ে ফেলেছেন এক জায়গায়। সারকথা, ভয়ে আঁতকে উঠতে চাইলে এই বই নয়; টুইস্টে তাক খেয়ে মাননীয় স্পিকার হতে চাইলে খুলে বসুন "কৃষ্ণজাল"।
একচুয়ালি ৩.৫। খুব ফাটাফাটি না হলেও বেশ ভালই লেগেছে বইটি। দারুন হরর আবহের সাথে আমাদের বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। সবচেয়ে যেটা ভাল লেগেছে যেটা সেটা হল এই গল্পের মধ্যে একটা মেসেজ দিয়েছেন। "পাপ" জিনিসটা হাইলাইট হয়েছে। পাপ বাপকেও ছাড়ে না, এই কথাটা বইটি পড়া শেষে অনুধাবন করেছি। অসাধারণ লিখনশৈলীর মাধ্যমে আমাদের এখনকার যুব সমাজের একটা নেতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। প্রেমের নামে শরীর নিয়ে খেলা, ভ্রূণ হত্যার মত স্পর্শকাতর জিনিস গুলো যেভাবে তুলে ধরেছেন তার জন্য প্রশংসা প্রাপ্য আপনার