এদেশে, আমাদের আত্মপরিচয় অস্পষ্টতা বা অন্ধকারের কবলে পড়েছে নানাভাবে। সেই আবরণ ক্ষমতা সম্পর্কের পাটাতনে দাঁড়িয়ে রাজকীয় অবয়বে আমাদের পরিচয়ের ভাষ্য নির্ধারণ করে আমাদের ‘সহায়তা’ করতে চায়। ‘বাংলাদেশ ও ইসলাম : আত্মপরিচয়ের ডিসকোর্স’ আরোপিত কোনো রাজকীয় ভাষ্য দিয়ে নিজের পরিচয় নির্মাণের ‘সহায়তা’ নিতে রাজী নয়। বইটি বরং স্বচ্ছ আলোয় অবগাহনে সচেষ্ট। এজন্যে সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অধিপতি বুদ্ধিবৃত্তির ভাষা ও ভাষ্যকে হেলাচ্ছলে বইটি বলে, ‘সরো তা বাপু।’ আমার আলো দরকার।’ এ বই ইতিহাসের গভীর থেকে আমাদের আত্মপরিচয়ের সন্ধানের একটি প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশ ও ইসলাম আত্ম পরিচয়ের ডিসকোর্স "বইটি মূলত বাংলার প্রাচীন ইতিহাসকে ব্যবচ্ছরের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ের ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাপুঞ্জীর সমষ্টির সাথে মুসলিম শাসন পরবর্তী ইতিহাসের যোগসূত্র স্থাপনের দীর্ঘ ইতিহাস এর একটি সারসংক্ষেপ।
আমাদের প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং তাদের সাথে বহিরাগত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মিশ্রণের ফলে যে শংকর বাঙালি জাতির উদ্ভব এবং বিভিন্ন সময়ের সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ইতিহাসের যে বিবর্তন ঘটেছে এবং আর্য - অনার্য জাতির সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ভিন্নতার দিক ঐতিহাসিক ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। মৌর্য, গুপ্ত, পাল এবং সেন আমলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ইসলাম শাসন পূর্বের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতি বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন।
১২০৫ সাল পরবর্তী মুসলিম শাসন এবং বাংলাই ইসলাম বিস্তারের এবং প্রসারের বিভিন্ন কারণ এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।
যেহেতু আমাদের প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের নির্দিষ্ট কোন গ্রন্থ নেই তাই লেখক তৎকালীন সময়কার বিভিন্ন পরিব্রাজক,ব্রিটিশ বিভিন্ন ডকুমেন্ট এবং বাংলার বিভিন্ন ঐতিহাসিক যেমন ডক্টর নিহার চন্দ্র রায়, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, আবুল ফজল, স্যার যদুনাথ সরকার, গোলাম হোসেন সেলিম ও অন্যান্য লেখকদের বিভিন্ন গ্রন্থের সহায়তা নিয়েছেন।
অনেক আন্ডার রেটেড একটা বই, ইতিহাসের প্রিয় পাঠক হিসেবে বইটির মাধ্যমে বাংলার ইতিহাসকে একটি নতুন দৃষ্টিকোন থেকে জানার সুযোগ হয়েছে, সাথে রয়েছে অনেক বিস্ময়কর ঐতিহাসিক সত্য যা একজন বাঙ্গালি মুসলমানকে আন্দোলিত করতে সক্ষম হবে
মুসা আল হাফিজের “বাংলাদেশ ও ইসলাম : আত্মপরিচয়ের ডিসকোর্স” বইটি পাঠ করলাম। পড়া শেষ করার পর মনে হচ্ছে, আমি যেন এক দীর্ঘ ইতিহাসযাত্রা থেকে আবার বর্তমান সময়ে প্রত্যাবর্তন করলাম। অথচ বইয়ের ডিউরেশন কিন্তু অল্প। কিন্তু তারপরও মনে হচ্ছে কত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলাম। এই বইয়ে বাংলার প্রাচীন জনপদ থেকে শুরু করে আর্যদের আগ্রাসন, মৌর্য-গুপ্ত-পাল-সেন যুগ, তারপর মুসলিম বিজয় ও সুফি-দরবেশদের প্রভাব, সবকিছু এক সুসংগবদ্ধ ধারায় ফুটে উঠেছে।
বাংলার আত্মপরিচয়ের সংকটকে লেখক যে দৃষ্টিকোণ থেকে ধরেছেন, সেটি অনেকটাই ভিন্নধর্মী। বইটি যেন আমাদের শেখায়, পরিচয় গড়ে ওঠে ক্ষমতার আরোপিত ভাষ্য দিয়ে নয়, বরং ইতিহাসের ভেতরকার আলো-অন্ধকার ছুঁয়ে দেখা দিয়ে।
লেখক ইতিহাসের আয়নায় দেখিয়েছেন কিভাবে উত্তর ভারতের দখলদারি সংস্কৃতির প্রভাব বাংলায় প্রবেশ করতে দেরি হয়েছিল, এবং এই অঞ্চলের মানুষ বহু শতক ধরে সেই আগ্রাসনের প্রতিরোধ করেছিলো। এ সময় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের উত্থানকে তিনি প্রতিরোধের সাংস্কৃতিক আশ্রয় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক রেফারেন্সের মাধ্যমে দেখতে পাই, সেন রাজত্বের অধঃপতনকালীন সমাজের দুর্দশা, বৌদ্ধদের নিপীড়ন এবং মুসলিম আগমনকে মুক্তির দোরগোড়া হিসেবে দেখেছিলো এই বাংলা জনপদের দীন মানুষেরা। দীনেশচন্দ্র সেন থেকে রিচার্ড ইটন পর্যন্ত নানা ঐতিহাসিকের ব্যাখ্যার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত যে, বখতিয়ারের বিজয় আসলে নিপীড়িত গণমানুষের জয় ছিল।
মুসলিম শাসনের পূর্বে যে বাংলা ভাষাকে “ইতরের ভাষা” বলা হতো, এবং যে ভাষা ব্যবহার করলে রৌরব নামক নড়কের ভয় দেখানো হত, সেই ভাষাটি মুসলিমদের পৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্যভাষা হিসেবে মর্যাদা পেল। প্রাচীন চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে শুরু করে পরবর্তী কাব্যধারার বিষয়বস্তু সমন্ধে বইয়ে একটানা বর্ণনা আছে।
লেখক সুফি-দরবেশ ও আরব-পারসিক ব্যবসায়ীদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, বাংলায় ইসলাম বিস্তার ছিল কোনো জবরদস্তির ফল নয়; বরং সাম্যের, মানবতার ও ন্যায়ের বার্তায় আকৃষ্ট হয়ে বাঙালি সমাজ ইসলাম গ্রহণ করেছিলো।
বইটি অন্ধ আবেগে লেখা নয়। লেখক নালন্দা ধ্বংসের মতো বিতর্কিত বিষয়ে নানা ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করে পাঠককে চিন্তা করার সুযোগ দিয়েছে। বর্তমান সময়ে ইসলাম বিদ্ধেষী এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিকরা নালন্দা ধ্বংসের দায় বখতিয়ারের উপর চাপায় কিন্তু বাস্তবে বখতিয়ারের হাতে যে এই মহাবিহার ধ্বংস হয়নি তা লেখক বিভিন্ন ঐতিহাসিক রেফারেন্স উল্লেখ করে প্রমাণ করেছেন। এই দেশের বৌদ্ধ আর কথিত নিম্ন বর্ণের মানুষেরা মূলত ব্রাক্ষণ্যবাদী জাতিগোষ্ঠীর হাতে নিপিরীত হয়ে আসছিলো যুগের পর যুগ, ইসলামের আগমন তাদের সেই নিপীরন থেকে মুক্তি দিয়েছিলো এবং তাদের মধ্য থেকেই অনেকে ইসলামের সাম্য ও ন্যায়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলো।
সব মিলিয়ে, বইটি শুধু ইতিহাসের পুনরুল্লেখ নয়, বরং এক ধরনের দার্শনিক প্রয়াস। বাংলাদেশের আত্মপরিচয় আসলে কীভাবে গড়ে উঠলো এবং ইসলাম সেখানে কীভাবে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেলো, তার অনুসন্ধান।
বইটির ভাষা ঝরঝরে ও প্রাঞ্জল। অনেক তথ্য আমি আগে খণ্ডিতভাবে জানতাম, কিন্তু এখানে একত্রে সংহতভাবে পাওয়া গেল। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, কলেবরটা আরেকটু বড় হলে আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যেত। তবে এই সীমিত আয়তনেও বইটি আমাকে ভাবিয়েছে, আলোড়িত করেছে। পাঠক হিসেবে, আমি মনে করি, এই বইটি একটি প্রয়োজনীয় গ্রন্থ যা বাংলাদেশের মুসলিম ইতিহাস এবং সমাজের মূলবিন্দু গুলোর সঠিক ধারণা দেয়। এটি শুধু ইতিহাসেরই নয়, একটি সাংস্কৃতিক দর্শন হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। লেখক অত্যন্ত সুন্দর ভাষায় এবং গভীর বিশ্লেষণ দিয়ে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস থেকে ইসলামের প্রভাবের গতিপথে আমাদের নিয়ে গেছেন। এর মাধ্যমে, বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ এবং তাদের ইতিহাসকে এক নতুন দৃষ্টিতে দেখা সম্ভব হয়েছে।
ইতিহাসপ্রেমী পাঠকদের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য বই। বিশেষ করে যারা বাংলার মুসলিম পরিচয়ের শেকড় অন্বেষণ করতে চান, তাদের জন্য বইটি এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
প্রাচীনকালে আমাদের আজকের বাংলাদেশ ঐক্যবদ্ধ কোন দেশ ছিল না।বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গ,বর্তমান পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করে গৌড়,দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গে সমতট,উত্তর বঙ্গে পুণ্ড্র(বগুড়া) ও বরেন্দ্র(রাজশাহী), ভাগীরথী নদীর তীরে উত্তর ও পশ্চিম রাট, পূর্ব বঙ্গের পার্বত্য অঞ্চলে হরিকেল প্রভৃতি জনপদে বিভক্ত তৎকালীন বাংলার জনপদসমূহ শাসিত হতো ভিন্ন ভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর হাতে।পর্যটকদের বিবরণীতেও উঠে আসে এসব জনপদের ভিন্ন ভিন্ন জীবনাচরণ ও পেশাবৃত্তির।
অধ্যাপক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, "মুসলিম বিজয়ের প্রক্কালে বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির অধঃপতনের পেছনে ছিলো তৎকালিন মানুষের সমাজ,জাত-বর্ণ প্রথা, শ্রেণীভেদ। জনজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রে,ধর্মে,শিল্প-সাহিত্যে, দৈনন্দিন জীবনে ছিল যৌন অনাচার,নির্লজ্জ কামপরায়ণতা, মেরুদন্ডহীন ব্যক্তিত্ব, ব���শ্বাসঘাতকতা এবং রুচির অভাব।.....একটা বৃহৎ গভীর ব্যাপক সামাজিক বিপ্লবের ভূমি পড়িয়াই ছিল কিন্তু কেহ তার সুযোগ গ্রহণ করে নাই।মুসলমানেরা না আসিলে কিভাবে কি উপায়ে কি হইতো বলিবার উপায় নাই"
এমন পরিস্থিতিতে বখতিয়ারের বাংলা বিজয় কোন আধিপত্যবাদীর জয় ছিল না।এটা ছিল মুক্তিকামী ভূমিপুত্রদের জয়,লাঞ্ছিত গণমানুষের নবজন্ম। যার প্রত্যক্ষ প্রমাণ "নিরঞ্জনের রুম্মার " প্রতিটি শ্লোকে।
শশাঙ্ক থেকে সেন রাজত্বে কেউ বাংলার জনপদসমূহকে একত্র করতে পারেনি,কেউ কেউ আংশিক একত্রিত করে উপাধি নিতো "গৌড়েশ্বর "। পক্ষান্তরে প্রখ্যাত মুসলিম সুলতান শামস-উদ-দীন ইলিয়াস শাহ সমস্ত বাংলা জনপদসমূহ একত্রিত করে উপাধি নেন" শাহ-ই-বাঙ্গালাহ", "সুলতান-ই-বাঙ্গালা"। তার সেনাবাহিনী হয় "জইশ-ই-বাঙ্গালী"।একত্রিত জনপদের জনগণ অভিহিত হতে শুরু করে " বাঙ্গালী " নামে।বহিরাগত মুসলিমরা মিলে মিশে একাকার হয়ে যায় এদেশের ভূমিপুত্রদের সাথে।বাঙ্গালী ও মুসলিম পরিচয় হয়ে যায় একে অপরের সমার্থক।অথচ সেন আমলেও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের চোখে এরা ছিল নিচ,হীন,পক্ষী সমতুল্য, অন্তজ।