ইট পাথর আর কংক্রিটের রুক্ষ শহরে প্রতিদিনই তো কত মানুষ হারিয়ে যায়। তারা কি সত্যিই হারিয়ে যায়? নাকি আমাদের চিরচেনা আলো ঝলমলে পৃথিবীর ভেতরেই রয়েছে আর একটা রহস্যময় পৃথিবী? যে পৃথিবীর অমোঘ আকর্ষণে চোরাবালির মতো ডুবে যায় নুহাশের মতো ছেলেরা। এই রুক্ষ শহরটাতে যারা স্বপ্ন বুনতে চেয়েছিল।
গল্পটার শুরু সুইডেনে। ষাটের দশকের উত্তর সুইডেনের ছোট্ট একটা শহরে। এক প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির রাতে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ভেঙে পড়া নরকের একটা টুকরো থেকে। গল্পটা স্বপ্নবিলাসী তিথির। কিংবা গল্পটা ম্যাথু শেপহার্ডের। রিপভ্যান উইংকেল ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে এক শান্ত সুন্দর বিকেলে যে দুহাত ভরে ভালোবাসতে চেয়েছিল জীবনকে। কিন্তু বিনিময়ে জীবন যাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল শুধু একরাশ নির্মম ঘৃণা।
গল্পটা উত্তাল একাত্তরের। দুর্গম গঙ্গাসাগর গ্রামে এক হৃৎপিণ্ড আগুন নিয়ে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার মামুন যেদিন মুখোমুখি হয়েছিল মিলিটারি ক্যাপ্টেন আনসারীর। ছাইচাপা পড়া আগুনের নিচে ফিনিক্স পাখির মতো যেদিন রচনা হয়েছিল নতুন এক ইতিহাসের। যে ইতিহাসকে লুকিয়ে রাখা হয় পৃথিবীর অন্ধকারতম ইতিহাসগুলোর সাথে।
It starts in the temple and ends in the temple. The temple reigned, the temple reigns, and the temple will reign.
“History is much more the product of chaos than of conspiracy”― Zbigniew Brzezinski - অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি - ষাটের দশকে সুইডেনের এক ছোট শহরে শুরু হয়েছিল এক ভয়াবহ সিরিয়াল ব্যাংক ডাকাতি। একের পরে এক ব্যাংক লুটের কারণে সেই এলাকার মানুষজন সারাক্ষণ তটস্থ হয়ে থাকতো। এক সময় পুলিশ ডাকাতদলকে ধরতে পারলেও কিছুদিন পরে জেল ভেঙে পালায় তারা। তাদের ভেতরে একজন লোকের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। - ১৯৭১ সালের মে মাস, বাংলাদেশের গঙ্গাসাগর নামের এক গ্রামে রচিত হয় যুদ্ধের এক বীরগাথা। কিন্তু সেই বীরগাথা ইতিহাসের কোথাও ঠাঁই পায় না। এর অনেক বছর পরে আমেরিকায় বসবাস করা ম্যাথু শেপার্ড নামের এক ব্যক্তি জানতে পারে নিজের সম্পর্কে বিস্ময়কর কিছু তথ্য। তাই সেই তথ্য যাচাই করতে সে চড়ে বসে বাংলাদেশে আসার এক প্লেনে। - বর্তমান সময়ে তিথি নামের এক মেয়ে ক্যাম্পাস পলিটিক্সের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দিয়ে ক্ষমতাবান এক ছাত্রনেতার রোষানলে পরে। এদিকে তিথির বন্ধু নুহাশ নিছক শখের গোয়েন্দা সাজতে গিয়ে জানতে পারে কয়েক দশক আগের গোপনীয় কিছু তথ্য। এর মাঝে রাফি নামের এক ছেলে হঠাৎই হারিয়ে যায়। - এখন ষাটের দশকের সুইডেন থেকে লোকটি কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো? ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সেই ঘটনার পরিণাম কী হয়েছিল? ম্যাথু শেপার্ড নামের লোকটি নিজের সম্পর্কে কী বিস্ময়কর তথ্য পেয়েছিলো? এসব ঘটনার সাথে তিথি, নুহাশ, রাফি, শিহান সহ আরো অনেক ব্যক্তি কীভাবে জড়িয়ে যায়? "অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি" আসলে কোন ধরণের সংগঠন? এ সকল প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে পড়তে হবে লেখক রিফাত হাসানের থ্রিলার ভিত্তিক "অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি" বইটি। - "অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি" বইটি লেখকের আগের বইয়ের মতোই আপাতদৃষ্টিতে সম্পৰ্কহীন কিছু ঘটনার মাধ্যমে শুরু হয়। তাছাড়া পুরো বইতেই লেখকের আগের বইয়ের সাথে নানা ধরণের ঘটনার প্যারালাল দেখানো হয়েছে। যারা লেখকের আগের উপন্যাস "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি" পড়েছেন তারা প্যারালালগুলো ভালোভাবে ধরতে পারবেন। অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি উপন্যাসটি পড়া শুরুর পর থেকে বেশ কয়েকটি সম্পর্কহীন ঘটনা একসাথে এসে পড়ায় তার সাথে তাল মিলাতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। এছাড়াও বইয়ের প্রথমদিকে রোমান্টিক অ্যাঙ্গেল একটু বেশিই ফোকাস পেয়েছে যা ব্যক্তিগতভাবে কাহিনির গতি বেশ স্লো করে ফেলেছে বলে মনে হয়েছে। - অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি বইটিতে কাহিনির প্রয়োজনে বহু চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে। এত চরিত্রের ভিড়ে কোন চরিত্রটিকে আলাদা করা বেশ কষ্টকর ছিলো। বইটির লেখনশৈলী এবং গল্পের বুনট মোটামুটি ভালোই ছিল। বইয়ের প্রথম অর্ধে কাহিনি বেশ ধীরে সুস্থে আগায়, কিন্তু বিশেষ এক চরিত্রের আগমনের পরে কাহিনি বেশ গতি পায় এবং আমারো বইটি ভালো লাগা শুরু হতে থাকে। তবে কাহিনির সবথেকে ভালো লেগেছে এর শেষ ভাগ, সারা বইয়ের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে সুন্দরভাবে জোড়া দেয়া হয়েছে এতে। বইয়ের সংলাপ এবং ভাষাশৈলীও উৎরে যাওয়ার মতোই, তবে কিছু জায়গায় অতিরিক্ত ডিটেলিং এবং কিছু ঘটনার একাধিকবার বর্ণনাকে কিছুটা বাহুল্য মনে হলো গল্পে। - অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি বইয়ের প্রোডাকশনের দিকে তাকালে বইয়ের ফ্রন্ট কভার বেশ ভালোই লাগলো। তবে সম্পাদনায় বেশ কিছু টাইপিং মিস্টেক এবং ছোট-বড় বানান ভুল দেখলাম। এক সংবাদপত্রের ব্যাপারে একটি কন্টিনিউটি এরর চোখে পড়লো। তাছাড়া পুরো বইতে প্রচুর যুক্তাক্ষর ভাঙ্গা ছিলো। সবমিলিয়ে বইতে সম্পাদনাজনিত বেশ কয়েকটি দৃষ্টিকটু ভুল রয়েছে। আশা করি পরবর্তী সংস্করণে এই ভুলগুলো শুধরে নেয়া হবে। - এক কথায়, প্রথমদিকে বেশ ঢিলেঢালা ভাবে শুরু হলেও পরবর্তীতে বেশ ভালোভাবেই শেষ হয়েছে অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি বইটি। যারা নন লিনিয়ার স্লো বার্ণ সাসপেন্স থ্রিলার পড়তে চান তারা বইটি পড়ে দেখতে পারেন, তবে বইটি পড়ার আগে লেখকের এর আগের উপন্যাস "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি" এর দুই খন্ড পড়ে নেয়ার সাজেশন থাকবে। লেখকের পরবর্তী বইয়ের জন্য থাকলো শুভকামনা।
সত্যি বলছি, বইটার প্রতিটা অধ্যায় শেষ করেছি আর ভেবেছি- রিফাত কোথায় গিয়ে হোচট খাবে যেন। নন লিনিয়ারে লেখা এই উপন্যাস খুব সহজ আর প্রাঞ্জল ছিল যে, হোচট খাবে খাবে ভেবেও আমি এক বসায় এগিয়ে গিয়েছি একেবারে শেষে। যে চমকটা লুকিয়ে ছিল তা একদমই অপ্রত্যাশিত। কলম থামাস না রিফাত, এগিয়ে যা আরো। পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম।
আপনি কি জীবন নিয়ে বীতশ্রদ্ধ, হতাশ? গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে একা একা কাঁদতে ইচ্ছা করে? মনে হয় কী লাভ বেঁচে থেকে, মরে গেলেই তো সব সুখ? তাহলে আমরা আছি আপনার জন্যই। কখনও যদি মনে হয় সামান্য হলেও আর একটু বাঁচার অনুপ্রেরণা চান আপনি, তাহলে নির্দ্বিধায় যোগাযোগ করতে পারেন আমাদের সঙ্গে। আপনার কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করে আছি আমরা। অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি। (একটি আত্মহত্যা বিরোধী সংগঠন)
কী মনে হচ্ছে? ভালো কাজের জন্য গড়ে ওঠা এ সংগঠন নিয়েই কাহিনী? তাহলে আপনি ভুল। এর মাঝে আছে অনেক কিছুই...আছে মস্ত বড়ো কিন্তু। যা আপনাকে নিয়ে যাবে এক অতল গহ্বরে। যেখানে আছে জানা, অজানার অনেক ফারাক। সত্য, মিথ্যার মধ্যে রয়েছে নানান বিভেদ। বিশ্বাস, অবিশ্বাসের এক খেলা! যে খেলায় জিতলে সাফল্য লাভের চাবি হাতে পাওয়া যাবে, আর হারলে? মৃত্যু অবধারিত।
শুরুটা করা যাক চায়ের দোকানদার সুরুজ মিয়া গল্পের মধ্য দিয়ে। 'আইজকালকার পোলাপান প্রেম ছাড়া থাকতেই পারে না। কথায় কথায় প্রেম। উঠতে প্রেম, বসতে প্রেম। একটা ছাড়ে আর আরেকটা ধরে। আইজকালকার আবার ফেসবুক না কী একটা হইছে, এইডা হইয়া পোলাপানগো মাথা এক্কেবারে গেছে। আসল প্রেম কারে কয় এইটা বুঝতেন, আমাদের ঐখানে একটা পোলা ছিল তারে যদি দ্যাখতেন...' এভাবে শুরু করা গল্পে অনেকেই বিরক্ত হতো। অনেকেই সুরুজ মিয়াকে মাঝপথে থামিয়ে দিত। আবার অতি ভদ্র কেউ কেউ সে গল্প পুরোটা শুনতো। নুহাশ আর সাবিত নামের দুইজন বুয়েটের ছাত্রও গল্পটা শুনেছিল। গল্পের শেষে সত্য, মিথ্যার এক দেয়াল উঠে গিয়েছিল দুই বন্ধুর মাঝখানে। আর তা প্রমাণের দায়িত্ব নেয় নুহাশ। যে করেই হোক, এর সত্যতা প্রমাণ করে ছাড়বেই।
আরও আছে ১৯৭১ সালের গল্প। ছোটো এক গ্রাম পাক বাহিনীর বর্বরতার সাক্ষী হয়ে জ্বলে পুড়ে ছাইভস্ম হয়ে গিয়েছে। কত নাম না জানা মেয়ে ধর্ষিতা হয়ে জীবন হারিয়েছে আবার কেউবা সেখানেই নিজের অভ্যন্তরে আরেক অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে আছে। তারই মাঝে মামুন নামের এক মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার মুখোমুখি হয়েছিল মিলিটারি ক্যাপ্টেন আনসারীর। বুকে পাহাড় সমান সাহস আর জ্বলজ্বলে হৃদপিন্ড নিয়ে বোন, পরিবার বা নিজের জীবনের বিনিময়েও মুখ খুলেনি। অন্ধকারে হারিয়ে যেয়েও আলো হয়ে আছে এই বাংলার জ্বলজ্বলে সূর্যের মতো করে।
তিথি নামের মেয়েটার গল্প করা যাক! দু'চোখ ভরা স্বপ্ন তার। সেই স্বপ্ন নিয়ে ছুটে চলা নিজের জীবন। সেই জীবনে দুঃস্বপ্নের মতো আসা ক্ষমতাবান মুকী। যার অত্যাচারে ত্যক্ত বিরক্ত তিথিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে নুহাশ। সাথে নিজের স্বার্থও কিছুটা জড়িত। কিন্তু ভালোবাসায় তো স্বার্থ খাটে না। আর স্বার্থের জন্য যে ভালোবাসা হয় না। যে দু'চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা, সেই চোখ জোড়ায় ঘোর বিস্ময় নিয়ে মহাকালের অন্তরালে হারিয়ে গিয়েছিল তিথি।
গল্পটা সুইডেনের এক ছিমছাম সুন্দর এক শহরের। ষাটের দশকে যেখানে এক কারাগার ভেঙে তিন ব্যাংক ডাকাত পালিয়েছিল, যেন নরকের দুয়ার থেকে ফিরে আসা। তবে স্বর্গে নয়। এই মর্ত্যলোককে নরকে পরিণত করাই যেন লক্ষ্য তাদের। বিশ্বাস অবিশ্বাসের নির্মম সত্য, কিংবা মিথ্যা নিয়ে হাজির ওরা কী করতে চায়? জানা নেই।
আরিজোনা প্রদেশের হলব্রুক নামের ছোট্ট শহরের ম্যাথু শেপহার্ড এমন কী জানতে পেরেছিলেন ২০০২ সালের ২ মে, যার জন্য বদলে গেল তার জীবন? কীসের টানে মাইল পেরিয়ে ছুটে এসেছিল বাংলাদেশে। কিংবা আফতাব হোসেনের ঘটনাটাই বা কী? একটু একটু করে তিলে তিলে গড়ে তোলা বিশাল সম্রাজ্য হোসেন গ্রুপ। যেখানে পরিশ্রমই মুখ্য। সেখানে কোন জিনিসের গুরুত্ব তার কাছে বেশি? যা কেউ জানে না, যেন গোপন এক আখ্যান।
মারুফ নামের যুবকটাই বা কোন রহস্য উদ্ধারে সাভার উপস্থিত। সেই সাভারের গহীনে পরিত্যক্ত হাসপাতালে কীসের রহস্য লুকিয়ে আছে? আফতাব হোসেনের পিএস লীনাকেই বা কারা তুলে নিয়ে গেল সবার সামনে থেকে? মারুফ-লীনার মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যে এতটা বিস্ময় কেন?
পাঠ প্রতিক্রিয়া :
এত সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ২৪০ পৃষ্ঠার ছোট্ট এই বইয়ে। হ্যাঁ, আমার কাছে বইটা ছোটো-ই বেশ। কেননা শেষ ভাগে এসে এত দ্রুত গল্পের জট খুলছিল, যে মাথাটা চক্কর দেওয়া শুরু করেছিল। যেন মনে হলো, খুব দ্রুতই শেষ হয়ে গেল! রিফাত হাসানকে অনেক অনেক ধন্যবাদ এত সুন্দর একটা বই লেখার জন্য। এত এত গল্প, বিভিন্ন টাইমলাইনে ছুটে চলা সবকিছু শেষ সময়ে এসে এক বিন্দুতে মিলিত হলেও, কোনো রকমের ভজকট হয়ে যায়নি। মনের মধ্যে সেই আশংকা পেয়ে বসেছিল। যদি গল্পের শেষটা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়?
লেখকের সবচেয়ে বেশি যা ভালো লেগেছে, তা বানান। বর্তমান অনেক লেখককে প্রমিত বানান ব্যবহারে মনোযোগী হতে দেখা যায় না। কিন্তু এক্ষেত্রে লেখককে কৃতিত্ব দিতেই হবে। বানানের যথাযথ ব্যবহার ছিল খুব ভালো। যদিও বই আগানোর সাথে, পৃষ্ঠা বাড়ার সাথে বানানের ভুলের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। যার বেশিরভাগ টাইপিং মিসটেক। শুরুর দিকে যা ছিল শূন্যের কোঠায়। বইয়ের বাইন্ডিং, প্রচ্ছদ নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। ভালো ছিল সবকিছু। আর বইয়ের নামটা রোমান্টিক মনে হলেও, শুরু থেকে এগিয়ে যাওয়াতেও রোমান্টিক ছাপ থাকলেও শেষের টুইস্ট মাথা নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
লেখকের 'এখনো ঘোড়ার চাল বাকি' উপন্যাসের পর থেকেই বইটার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। তার বিশেষ এক কারণ ছিল। কিন্তু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা এগিয়ে যাওয়ার পরও যখন সেই কারণের ছিটেফোঁটাও পাচ্ছিলাম না, বেশ হতাশ লাগছিল। এরপর যখন সেই জায়গায় এসে পৌঁছলাম, কাহিনির টুইস্ট এর পর টুইস্ট গল্পের গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ।
আমার বইটাকে বেশ আন্ডাররেটেড মনে হয়। এই বইটা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিৎ। সমালোচনা হলেও ক্ষতি নেই। তরুণ লেখকদের জন্য সেই সমালোচনাগুলো অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। বর্তমান সময়ে যেই কয়জন তরুণ লেখকের লেখা পড়েছি, রিফাত হাসান আমার পছন্দের একজন। এভাবেই এগিয়ে যাক তরুণ লেখকেরা, এগিয়ে যাক এদেশের সাহিত্য।
পরিশেষে, একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি। রিফাত হাসান তার চরিত্রগুলো দিয়ে আধ খাওয়া বা পূর্ন খাওয়া সিগারেটগুলো ছুড়ে ফেলে। এভাবে ছুড়ে ফেলতে গিয়ে যদি কোথাও আগুন লাগে, দায়টা লেখক নিবে?
বইটা ভালো। অনেক চরিত্র, অনেকগুলো টুকরো ঘটনা দেখে মনে হয়েছিল শেষমেশ সব না আবার গুবলেট হয়ে যায়!
কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি। লেখক খুব সফলভাবেই যা বলতে চেয়েছেন, তা বলতে পেরেছেন। প্লট অবশ্যই ইন্টারেস্টিং, তবে লেখকের গল্প বলার ভঙ্গিটা অাকৃষ্ট করেছে বেশি।
মানুষ এই বইকে এত হাইলি রেট কেন করছে অনেক চিন্তা করেও বুঝলাম না। আমার কাছে কোনো দিক দিয়েই ভালো লাগেনি। যেহেতু অনেকের কাছেই ভালো লেগেছে এবং আমারো বুঝে আসেনি যে কেন লেগেছে; সেহেতু আমার তেমন কিছু না লেখাই শ্রেয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি"- ১ এবং ২ যারা এখনো পড়েন নাই, এই বইটি তাদের জন্য নয়।
শুরুর দিকে একটু মেজাজ খারাপ হচ্ছিলো। ভাবলাম, কি অবস্থা ! প্রতি অধ্যায়ই একটা করে রহস্য রেখে যাচ্ছে। আমি নিজেই ভয়ে ছিলাম, লেখক কি পারবেন ২৪০ পেইজের ভেতরে সব রহস্য সমাধান করতে? কিন্তু লেখক রিফাত হাসান অনেক সুন্দর করেই সেটা করতে পেরেছেন। সব ঠিক ছিলো, সুন্দর করে আগাচ্ছে, কিন্তু হুট করে ইফতেখারের আগমনে হোঁচট খেলাম, ব্যাপার কি, ভুল বই পড়া শুরু করলাম নাকি!! যাই হোক, এর পরে বইটা যেভাবে আগালো তাতে মনে হয়েছে বইটা "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি"-৩ হলেই বরং ভালো হতো। নেগেটিভ কোনো দিক নেই বইটাতে, সব কিছু সুন্দর ছিলো। শুধু কিছু বানান একেক জায়গায় একেক রকম ছিলো।
প্রথমে ভেবেছিলাম চার নম্বর তারাটা দেব না তিথিকে মেরে ফেলার জন্য, কিন্তু কী আসে যায়?🙂
এত সুন্দর একটা নাম নিয়ে গল্প লেখার সুযোগ পেয়ে কেউ সেটাকে নর্দমার পঁচা গলা লাশ বানাতে পারে, জানা ছিল না। তবে সান্ত্বনা পুরষ্কার হিসেবে থাকলো নুহাশের অকৃত্রিম ভালোবাসা। কল্পনার চরিত্ররা এক জীবনে এর চেয়ে বেশি দাবি করতে পারে না।
সুন্দর প্রচ্ছদ, চমৎকার বাঁধাই, আকর্ষণীয় নাম সেই সাথে ঝরঝরে লেখা। কাহিনি অনেক দূর পড়ার পরেও মনে হচ্ছিল টুকরো টুকরো ঘটনাগুলোর মাঝে যেন আকাশ পাতাল দূরত্ব । এত এত মানুষ, তাদের নিজেদের একেকটা গল্প। তেমন কোনো রহস্য শুরু থেকেই ছিল না। তাই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম লেখক সবগুলোকে শেষে কীভাবে মেলান সেটা দেখার জন্য। ভালো ছিলো বইটা। যদিও সম্পাদনায় গাফিলতি চোখে পড়ার মতো।
"অতন্দ্রিলা, ঘুমোওনি জানি" -একটি আত্মহত্যা বিরোধী সংগঠন। রিফাত হাসানের লেখার বরাবরই ভক্ত আমি। এই বইতেও তার ব্যাঘাত ঘটেনি। লেখক সুদূর সুইডেন থেকে শুরু করে ১৯৭১ এর বাংলাদেশ ঘুরে বর্তমান সময়ে এসে গল্পে থিতু হয়েছেন। ম্যাথু শেপহার্ড থেকে শুরু করে নুহাশ অবধি ধরে রেখেছেন টান টান উত্তেজনা! সাথে অলৌকিকতার একটা আবছা ছাপ রেখে গেলেন গল্পে। যেটা বিশ্বাস হতে না চাইলেও, এক মুহুর্ত অন্তত থামিয়ে দিবে আপনাকে। এবছরের চমৎকার আরেকটি কন্সপিরেসি থ্রিলার পড়লাম।
একটাই খুঁত ছিল বইতে। গল্পের একফাঁকে গাজীপুরের সেই পূর্ণিমা রাতটার কথা, আর স্পেশালি হ্যান এর মাধ্যে পাঠানো চিঠির বর্ণনাটুকু পুরোপুরি এখানে প্রাসঙ্গিক লাগেনি। এটুকু বাদে, আগাগোড়া উপভোগ্য একখানা বই! লেখকের জন্য শুভকামনা।
সুপার! মাইন্ডব্লোয়িং! যত বলব তত কম। wholesome একটা বই। যেটা ভালো জিনিস সেটা হচ্ছে লেখকের গল্প বলার ধরন। এতটাই ইউনিক যে না পড়লে আপনি বিশ্বাস করবেন না। বেশিরভাগ বই আমরা দেখি কোন একটা জিনিসের ইনভেস্টিগেশন হতে হতে প্রতি চ্যাপ্টারের শেষে লেখক কোন টুইস্ট বা হুক দেন যাতে করে পরের চ্যাপ্টারে কি হয় সেটা জানার আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু এখানে পুরো বিষয়টা উল্টা। এখানে চ্যাপ্টারের শেষে কোন টুইস্ট দেওয়া হয় না তার বদলে আখ্যানটাকে পুরোপুরি ভাবে সম্পূর্ণই করেন না। অসম্পূর্ণ অবস্থায় রেখে দেন। চ্যাপ্টারটা শেষ হয়েও হইল না শেষ এরকম টাইপ আর কি। দ্বিতীয় আরেকটা জিনিস সেটা হচ্ছে দেখা যায় যে পুরা গল্পটাই একজন বা খুব বেশি হলে দুজন মানুষের পার্সপেক্টিভ দিয়ে গল্পটা ঘুরতে থাকে। কিন্তু এখানে না হলেও দশ বারোটা চরিত্রের পার্সপেক্টিভ দিয়ে প্রতি চ্যাপটারে গল্পটা ঘুরতে থাকে। এতগুলো চরিত্র এতগুলা পার্সপেক্টিভ। গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে কোথাও খেই হারিয়ে ফেলে না লেখক। একটা পর্যায়ে মনে হয় কিছুই হচ্ছে না কিছুই হচ্ছে না খালি মিস্ট্রি বিল্ড হচ্ছে চাপটার গুলো পুরোপুরিভাবে শেষ হচ্ছে না। কিন্তু শেষে গিয়ে যেভাবে জিনিসগুলা মিলিয়ে দেওয়া হয় হ্যাটস অফ টু দা রাইটার। একটা কোথাই বলব শুধু - A new master story teller has born.
রিফাত ভাইয়ের "এখনো ঘোড়ার চাল বাকি" ১ ও ২ শেষ করার পরপরই এইটা পড়ার ভুত চাপে মাথায়। কিন্তু কাজের চাপে পড়ছিলাম না। অতঃপর টাইফয়েড হল, হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে শেষ করে ফেললাম। প্রাচীন একটা কাল্ট বিশ্বাস এই গল্পের বেইজ। কিন্তু সেটা খুবই insignificant একটা অংশ। আসল মজা হল কাহিনী বুনন আর শেষে সব একসাথে জোড়া দেয়ার মুন্সিয়ানা। শেষের টুইস্ট দেয়ার বেলায় ভাই ওস্তাদ। আশা করি এই বইমেলায় ভাইয়ের নতুন বইটা কিনে ফেলব আর পড়ে ফেলব শীঘ্রই।
বিজয়স্মরনি সিগন্যাল, ধুঁকে ধুঁকে এগুচ্ছে বাইক, পাশে রাজধানী সুপার সার্ভিস।এক যাত্রী খানিক পরপর জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সকালে কি নাশতা করছে তা সশব্দে জানান দিয়ে যাচ্ছে।আয়হায়!জ্যামের মধ্যে আমার বাইক যদি ঠিক সেই যাত্রীর জানালা বরাবর গিয়ে আটকে যায়?!-এতটুক বলে গল্পটা থামিয়ে দিলাম।নিশ্চয়ই কী ঘটে জানার জন্য উৎসুক ছিলেন। এই উৎসাহটা কি একই থাকবে যদি গল্পের শেষটা পঞ্চাশ পাতা পরে গিয়ে বলি? “এটা হয়েছিল সেসময় তাহলে...আচ্ছা।”- এমন একটা নিস্পৃহ অভিব্যক্তি হবে না? আমার হয়েছে। ঠিক এজন্যই বইটা পড়ে শান্তি পাইনি। এমনিতে ননলিনিয়ার গল্পশৈলী আমার পছন্দ। কিন্তু আমার নিজস্ব অভিমত হচ্ছে ননলিনিয়ার গল্পশৈলী একটা একক গল্প বলার জন্য বেশি মানানসই। এই বইয়ে লেখক টুকরো টুকরো অনেক কাহিনী এনেছেন যেগুলো এমনিতে হয়তো সুন্দর, হৃদয়স্পর্শী। কিন্তু বারবার মোমেন্টাম নষ্ট হওয়ায় আমাকে তেমন একটা নাড়া দেয়নি। লেখক নিজেও এক পর্বের শেষে নাটকীয় ভাবে উল্লেখ করা একখানা তারিখের মাজেজা পরে খুলে লিখতে ভুলে গিয়েছেন (অথবা হয়তো আমিই খুঁজে পাইনি পরে!)। ননলিনিয়ার বলে একই কথার পুনরাবৃত্তি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ে, অবতারণা করতে হয়েছে এমন অধ্যায়ের যেগুলোর সারাংশ গল্পে পরে অন্য কোন অধ্যায়ে এক-দুই লাইনেই বলা হয়ে গিয়েছে। আমার অভিযোগ মূলত লেখকের রচনাশৈলী নিয়ে। প্লট বিচারে বইটা ভালো লাগার মতই। কথায় আছে না, পৃথিবী খুব ছোট? পৃথিবীর এক মাথায় থাকা মানুষ অন্য মাথার আরেক মানুষের সাথে জড়িয়ে যায় প্রকৃতি-নিয়তির বিচিত্র খেয়ালে। কেউ কেউ এমন অদ্ভুত বাঁধন নিয়ে ভাবে না। আর কেউ সব ছেড়েছুঁড়ে অতীত তাড়া করে। আমাদের এই গল্পের মূল নায়ক কিংবা খলনায়কেরা দ্বিতীয় দলের। অতীত নিয়ে নিজেদের অদ্ভুত কাব্যিক কৌতূহল মেটাতে তারা আপন-পর সবকিছু বাজি রাখতে রাজি। কিন্তু বাজিতে জেতা কি এতই সহজ? গল্পের টুইস্টটা ভালো হলেও আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। কারণ, যুক্তিতে মিলেনি। কাহিনীর আরো কিছু টুকটাক জায়গাও অযৌক্তিক লেগেছে। আপনি যদি ভীষণ রকম খুঁতখুঁতে হোন তাহলেই হয়তো আমার মতো এইসব যুক্তি কি অকাট্য না বখাট্য তা নিয়ে মাথা ঘামাবেন, নয়তো নয়। এই বইয়ের কাহিনী, চরিত্র শতকরা নিরানব্বই দশমিক নয় নয় ভাগ অন্ধকার। বইতে খুন-ধর্ষন-অপহরণ সব আছে। বইটা পড়ার পর তাই একটা তিতকুটে অনুভূতি হবে। কিন্তু লেখক বইয়ের মুড়িতে গল্পের ভূমিকার শেষে তো বলেছেনই–“পাঠককে স্বাগতম এক অন্ধকার পৃথিবীর চোরাবালিতে।” এই বিচারে বলাই যায় যে লেখক এই গল্প লিখে স্বার্থক।
অনেকদিন পর কোন থ্রিলার পড়ে এতটা ভালো লেগেছে। এত বেশি থ্রিলার পড়া হয় যে খুব আনকমন কিছু না থাকলে সব থ্রিলারই এখন অ্যাভারেজ লাগে। ছাত্র রাজনীতি, হ্যারাজমেন্ট, মানুষ হারিয়ে যাওয়া, একগাদা খুন, গুপ্তসংঘ কোনটাই নতুন কিছু না। কিন্তু তারপরও কেন যেন সব মিলে এটাকে পারফেক্ট প্যাকেজ লাগছিলো। তবে হুট করে ইফতেখার আর প্রেরনাকে নিয়ে আসার ব্যাপারটা ঠিক পছন্দ হয় নাই। ঘোড়ার চাল পড়া না থাকলে এদের উপস্থিতি টা উইয়ার্ড লাগবে। এটুকু ছাড়া বাকিটা সত্যিই বেশ ভালো লেগেছে৷ ১০ এ ৯ দেওয়ার মত।
This entire review has been hidden because of spoilers.
আপনি কি জীবন নিয়ে বীতশ্রদ্ধ, হতাশ?গভীর রাতে ঘুম থেকে উঠে একা একা কাঁদতে ইচ্ছা করে? মনে হয় কী লাভ আর বেঁচে থেকে মরে গেলেই তো সব সুখ? তাহলে আমরা আছি আপনার জন্যই।কখনও যদি মনে হয় সামান্য হলেও আর একটু বাঁচার প্রেরণা চান আপনি,তহলে নির্দ্বিধায় যোগাযোগ করতে পারেন আমাদের সঙ্গে। আপনার কথা শোনার জন্যই অপেক্ষা করে আছি আমারা
অতন্দ্রিলা,ঘুমোওনি জানি (একটি আত্মহত্যা বিরোধী সংগঠন)
বইটি যখন পড়া শুরু করি তখন ভাবছিলাম লেখক বইটি শেষ করবেন কিভাবে? শুরুতে মনে হচ্ছিল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ে বইটি লেখা, যার একটার সাথে অন্যটার কোন মিল নেই।কিন্তু লেখক আমাকে হতাশ করেননি। বইটির শেষের টুইস্ট সত্যিই অসাধারণ।