“শহরটা সত্যিই ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে কাজী সাহেবকে, যেন ভূতেরই শহর। শহর ভূত বা কবি যার দখলেই যাক সবচেয়ে ভয়ংকর চেহারাটা নেয়; ভূতের দখলে গেলে শহরবাসীর জন্য ভয়ংকর, কবির দখলে গেলে নেতাদের জন্য।”
কবির কাছে যা প্রেমিকা, পুঁজিপতির কাছে তা পণ্য। কবির কাছে যা প্রত্নতত্ত্ব, পেটি-বুর্জোয়ার কাছে তা আবর্জনা। কবির কাছে যা বিপ্লব, ডানপন্থীর কাছে তা অশ্লীলতা। কবির কাছে যা ধর্ম, বামপন্থীর কাছে তা মেয়াদোত্তীর্ণ। কবির কাছে যা ইতিহাস, গোঁড়াপন্থীর কাছে তা অপচয়। প্রেমিকা-প্রত্নতত্ত্ব-বিপ্লব-ধর্ম-ইতিহাসকে কবিতায় ভরে কবি যখন নেতার মুখোমুখি, কবিতা তখন নেতার কাছে কী?
এই উপন্যাসের আখ্যানে এক রাজনৈতিক নেতা এবং এক কবির গল্প বলা হয়েছে যারা অপরাজনীতি এবং উগ্রসাংস্কৃতিক চর্চার মাঝে ‘একা’। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নেতাকে কবির খোঁজে বের হতে হয় এবং এই যাত্রাপথে সে শেকড়চ্যুত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দশার নানারকম স্তরের মুখোমুখি হয়। এই একেকটা স্তরে উঠে এসেছে একেকটা স্বতন্ত্র উপাখ্যান, স্বতন্ত্র কিছু চরিত্র। প্রাসঙ্গিক এসব উপাখ্যান, তার সাথে জড়িত বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে একজন কবির খোঁজে একজন রাজনৈতিক নেতার যাত্রাপথের ওপর বিস্তৃত হয়েছে এই উপন্যাসের অবয়ব।
শহরের দো-আঁশ কার্যালয়ে রোমান দেবী ভেনাসের একটি 'নগ্ন' ভাষ্কর্য করা হয়েছে। পহেলা বৈশাখের দিন স্থানীয় এমপি 'কাজী সাহেব'-এর সেটা উদ্বোধন করার কথা ছিল। কিন্তু আপত্তি উঠলো 'জামাতুল মুসলিম' নামের এক ধর্মভিত্তিক দল থেকে। তারা কিছুতেই এই নগ্ন নারীমূর্তি উন্মুক্ত হতে দিবেনা। কাজী সাহেব পড়লেন দোটানায়।
একদিকে শহরের প্রগতিশীল, সংস্কৃতিমনা লোকজনদের চাপ,তিরস্কার অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক দলটার জোরালো প্রতিবাদ! শহরে অস্বস্তি একটা বাতাস ক্রমেই ঝড়ের দিকে এগুতে লাগলো। সেই ঝড়ে তাঁ দিলো প্রগতিশীলদের কলম। আর এই কলমের বিরুদ্ধেই আরেকটা শক্তিশালী কলমের খোঁজে, খোঁজ শুরু হলো এক কবির। যে কিনা কাজী সাহেবের হয়ে কলম ধরবে। মুহুর্মুহু বাক্যবাণের বিরুদ্ধে একটা ঢাল তৈরি করবে কাজী সাহেবের জন্য।
'পুরোনো বিল্ডিংয়ের শহরে ভূত আর কবির অভাব হয় না', এই আত্মবিশ্বাস নিয়েই শুরু হলো কবির খোঁজ। কিন্তু সেটা আর নিছক কোনো খোঁজে সীমাবদ্ধ হয়ে রইলো না। কবির পাশাপাশি এলো কবিতা, দেশভাগ। এলো মুক্তিযুদ্ধ,এলো সাম্প্রতিক সময়ের 'উষ্ণায়ন'- এর কথা। এলো উপকূল,এলো এমন সব চরিত্র যারা আমাদেরই প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যার জন্য এতোকিছু, তাকে পাওয়া গেলো কী? নাকি খুঁজতে গিয়ে হারাতে হলো নিজেকেই?
সত্যি বলতে কী, লেখকের প্রথম বই হিসেবে একটু হেলাফেলা করেই শুরু করেছিলাম 'অরুণিমা'। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হলাম। অরুণিমা কল্পলোকের কোনো গল্প নয়,আমাদের যাপিত জীবনেরই গল্প এটা। যেসব প্রশ্ন,সমস্যা,প্রেক্ষাপটের কথা এসেছে সবই আমাদের সাথে অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত।
অরুণিমার পাতায় পাতায় তুমুল গতি না থাকলেও ছিল ভাবনার খোঁড়াক। প্রেম, রাজনীতি, ধর্মীয় কুসংস্কার, জলবায়ু সমস্যা সহ ২৭২ পৃষ্টার এই বইয়ে এতোকিছু এসেছে যে বলে শেষ করা যাবেনা। তবে শেষের দিকে ইতিহাসটা একটু বেশি আসায় কিঞ্চিৎ বিরক্ত ও হয়েছিলাম। সবশেষে বলাই যায়, অরুণিমা এই বছরে পড়া ভালো বইগুলোর একটি। না পড়া থাকলে নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন। শেষ করছি বইয়ে থাকা প্রিয় একটা উক্তি দিয়ে -
'বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বপ্ন এমন একটা ফসল যা শুধু আবাদ করতে হয়,ঘরে তোলা হয় না। যাপন করা যায় না। কিন্তু তারপরেও স্বপ্নের চাষ করতে হয়,কারণ স্বপ্নই আমাদের গতি দেয়।'
-বই আইনাই তো পড়া শুরু করছিলাম দোকানে বইসা। হিসাব ছিল না। কবির লগে যাত্রা শুরু করছিলাম পুরান শহরে। এর পর কত নদী গাং পার হইলো শেষে
ঠাই হইলো বুক হুহু করা এক ঘাটে। বুকটা যেন....
-হইসে,হইসে। বল তো এবার, কুমুবউরে মিস করোস?
-হ কুমুবউরে মিস করি, শেলীর মতো বিপ্লবিরেও মিস করি। তবে কবিকে মিস করিনা। তুই কি কবিরে মিস করোস নীল? কবির মতো কবিতাগুলারে খুজতে মনে চায় না?
-কাজীর মতো হইলে হয়তো খুজতাম। কিন্তু কবিরে খুজে লাভ কি? কবি তো ফেরারি। কবির মতোন বইটাও ফেরারি। ফেরারিদের খুজতে হয় না।
-ভাভাগো! কী কঠিন কঠিন কথা। তবে বইটা আমার ও ভাল্লাগছে। তোর মতো করে না হলেও নিজের মতো করে ঠিকই ভাল্লাগছে। কবিরে আমার কেরোসিনের পিদিম মনে হইছে। নিজের আলোয় আলোকিত করে গেছে কুমুবউকে, শেলীকে, মেহেরজানকে, মিত্রাকে আর আমাকে।
-তোরে কেমনে পাল্টাইলো!!
-সেটা তো আমি বুঝুম। তোরে তো পুরোপুরি ভাবে বোঝানো যাবে না। তাইলে তো আমিই কবি হইতাম। আর লেখক আমারে নিয়াই লেখতো।
-ওরে ওরে। অর্ধেক কবি হইয়াই গেছস। বাতাস লাগছেরে সাকিব।
-"অনুভবের যতটা গভীরে ডুব দিলে মৃত্যু নিশ্চিত হয়,
সেই গভীরতায় দাঁড়িয়ে বলছি অরুণিমা,
“ভালোবাসি।”
এই লাইন দুইটাই তো পুরা বইরে ধারণ করে নীল। এটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট ❤️ আরো কিছু লাইন ছিল। আমি মার্ক করে রাখছি জানিস। কলজে এফোর ওফোর করে দিছে।
-কোপের উপ্রে কোপ রে! লগে দিয়া কিন্তু ৪৩ এর প্রিপারেশনও হয়ে গেছে তাই না?
-এলাচির কামড়ের মতোনই।
-বাডি রিডিং ব্যাপারটা মজারই তাই নারে, হাইওয়ে।
-হ, পথে চলতে চলতে সহযাত্রীর মতোনই ❤️
-আচ্ছা, বই ছোট লাগে নাই? এমন লেখা অন্তত ৩৮০-৪২০ পেজের হইলে হয়তো শান্তি পাইতাম।
-নাহ, এই বছই ছোটই ভালো। বড় হইলে হয়তো ভালো লাগতো কিন্তু যা হয় নাই তা নিয়া আর মাথা ঘামায়ে লাভ কি তাইনা?
মিষ্টি-হৃদয় এই চমৎকার বইটা হাতে তুলে দিয়ে গ্যাছে গেল সেপ্টেম্বরে। নয়া সেমিস্টারের মাথা খেয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা অগ্রহায়ণের গোটা দিন ব্যয় করলাম কম্বলের তলে পা ডুবিয়ে এই 'অরুণিমা' শেষ করতে।
ঘটনার শুরু এক রমজান মাসে, সংযমের মাসে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনের নগ্ন ভেনাস-মূর্তি উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় এমপির রাজনৈতিক টানাপোড়েনের গল্প৷ গল্প ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়, এক অজ্ঞাতনামা ফেরারি কবি কবিতায় কবিতায় গোটা শহরজুড়ে তার চিন্তাভাবনার ছাপ রেখে যায়, ছাপ রেখে যায় মানুষের মনে। বাংলায় পড়াশোনা করা এমপি সাহেব, ফেরারি কবিকে হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে তার রাজনৈতিক, বিশেষত মানসিক টানাপোড়েন থেকে মুক্তির একটা পথ খুঁজে পান। আর এই যে সার্চলাইট ফেলে কবিকে খোঁজা, এই খোঁজার প্রসেসের মধ্য দিয়েই বিচক্ষণ লেখক আমাদের সমাজকে চমৎকারভাবে ব্যবচ্ছেদ করে গ্যাছেন।
ব্যবচ্ছেদে ব্যবচ্ছেদে বেলা গড়িয়েছে, আর ঘোর লেগে আছে এখনো।
“দখল হওয়া শহরে যাই, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভূমিহীন কৃষকের মতোন। তবুও কেন বুকের বীজতলায় একবুক কেমন যতন।”
ধর্ম ও সংস্কৃতি ... যেখানে একে অন্যের পরিপূরক হওয়ার কথা, সেখানে কোথাও যেন এক বাঁধা এসে দাঁড়িয়ে যায়! দুইয়ের মিলনে একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার কথা, অথচ প্রতিনিয়ত সংঘাত যেন একে অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বীর রূপ দেয়? কেন? ঠিক কি কারণে একসাথে একই পথে চলা যায় না? সংস্কৃতিমনস্ক মানুষেরা মনে করে ধর্মীয় কার্যক্রম তাদের অধিকার হরণ করে। ওদিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখা মানুষগুলোকে ঠিক যেন মানুষ মনে হয় না। ওরা ধর্মের খুঁত খুঁজতেই যেন তৎপর। আর সে কারণে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করাই যেন একমাত্র নেশা। কেন? সম্মান যেখানে সবকিছুকে একসূত্রে গাঁথতে পারে, সেখানে কেন প্রতিপক্ষ বনে যাওয়া?
▪️কাহিনি সংক্ষেপ :
রমজান মাস চলছে। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের প্রাণের মাস। সংযমের মাস। চৈত্রের দাবদাহ ���েষে বৈশাখ আসি আসি করছে। একদিকে রমজানের মাসের সৌন্দর্য আরেকদিকে বৈশাখের ঝংকার। ঠিক এই জায়গাতেই এসে বিভক্ত দুই দল। সাংস্কৃতিক সংগঠন "দো-আঁশ" ও ধর্মীয় "জামাতুল মুসলিম" মুখোমুখি অবস্থানে? কী হয়েছে তাদের মধ্যে?
দো-আঁশ কার্যালয়ের সামনে একটি মূর্তির দেখা মিলে। নগ্ন নারী মূর্তিটি দেবী ভেনাসের। সাংস্কৃতিক সংগঠনটির ইচ্ছে আসন্ন বৈশাখে এর উদ্বোধন করবে। রমজানের মাসের এই সময়ে ধর্মীয় কোনো সংগঠন একটি নগ্ন নারী মূর্তিকে আত্মপ্রকাশ করতে দিবে না। ধর্মের জন্য এ বড়ো আঘাত। সে আঘাত প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত ধর্মপ্রাণ মানুষেরা। একইভাবে ধর্মের দোহাই দিয়ে সংস্কৃতিমনা মানুষদের দমিয়ে রাখা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। এই মূর্তির উদ্বোধন হবেই। এমপি সাহেব যে কথা দিয়ে রেখেছেন।
ঠিক এখানেই যেন খাবি খাচ্ছেন অঞ্চলটির সংসদ সদস্য কাজী আমানুল্লাহ। একদিকে নিজে কথা দিয়েছেন অনেক আগেই, দেবী ভেনাসের মুর্তি উদ্বোধন করবেন নিজ হাতে। যদিও তার মাথাতে ছিল না এবারের বৈশাখ রমজানের সময়। অন্যদিকে সামনে নির্বাচন। এমন সময় ধর্মপ্রাণ মানুষদের চটিয়ে দেওয়া কাজের কথা নয়। তিনি রাজনীতি ভালো বোঝেন। নিজেও ধর্মকর্ম করেন। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন মনে মনে। কাউকে প্রকাশ না করলেও তার বিরুদ্ধে ঝড় উঠেছে। লেখক, কবি, সংস্কৃতিমনা মানুষজন তার বিরুদ্ধে লেগেছে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে।
লেখার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয় কলম দিয়ে। কিন্তু যেখানে পুরো শহরের লেখক শ্রেণী বিরুদ্ধে, সেখানে নিজ পক্ষের লেখনী খুঁজে বের করা মুশকিল। তবুও এক কবির খোঁজ মিলেছে। ঠিক কোন ধরনের কবি, বলা কঠিন। যার নিজস্ব কোনো ঠাঁই নেই। এ-কূল ও-কূল ঘুরে কোথায় স্থির হবে সে, নিজেও জানে না। যেন এক ফেরারী কোনো অবয়ব ছুটে চলেছে অজানার পথে। সেই অজানা অচেনা কবিকে এবার খুঁজে বের করতে হবে। কাজী সাহেবও ছুটছেন। সঙ্গে কেবল ব্যক্তিগত সহকারী। কীসের পেছনে ছুটছেন, তিনিও কি জানেন? আমরা সবাই ছুটে চলি। কোন পথে, গন্তব্য কোথায়; কেউ কি জানি? দিন শেষে যখন আলোর রেখা মিলিয়ে যায়, ঠিক সে সময় উন্মোচিত হয় নতুন দিগন্ত। হয়তো উত্তর মিলে যায়, কিংবা না। কাজী সাহেব কি তার উত্তরের খোঁজ পাবেন? বা কবির?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
একটি ছোট্ট সমালোচনা দিয়ে শুরু করি। ঠিক যে কারণ দেখিয়ে কাজী সাহেবের দৌড়ঝাঁপ আর কবিকে খুঁজে বেড়ানো, আমার কাছে ঠিকঠাক লাগেনি। খুবই ঠুনকো যুক্তি বলে মনে হয়েছে। যদিও এরপর লেখক যে অভিজ্ঞতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, তার প্রশংসা না করা অপরাধ। গভীর জীবনবোধের এ গল্প কেবল কবির না, আমাদেরও। আর এ গল্পের গভীরতায় প্রবেশ করতে ভাবনার গভীরতা আনতে হয়।
"অরুণিমা" উপন্যাসটি একজন রাজনীতিবিদের যতটা, তার চেয়েও বেশি একজন কবির। যেই কবির জীবনে ঘুরে বেরিয়েছে পুরো উপন্যাস। সেই সাথে জীবনের অলিগলি, রাজনীতি, সমাজতন্ত্র, ধর্মান্ধতা যেন উঠে এসেছে পুরো উপন্যাসে। কবির জীবন দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন আমাদের পরিবেশ কীভাবে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে। দেশপ্রেমের উপাখ্যানের পাশাপাশি, যৌনতা, ভালোবাসা সবকিছুই উঠে এসেছে অরুণিমার আড়ালে। আচ্ছা, নগ্নতা মানেই কি যৌনতা?
লেখক শুধু কবির জীবন দিয়ে আমাদের জীবনের মূল্য বুঝিয়েই ক্ষান্ত হননি, তিনি একই সাথে উঠিয়ে এনেছেন ইতিহাস। খুলনার ভৌগলিক অবস্থানের সাথে খুলনা শহরের গোড়াপত্তন লেখক দেখিয়েছেন দক্ষতার সাথে। অতীত ইতিহাসের রোমন্থন কিছু ক্ষেত্রে ভালো লাগলেও অনেক ক্ষেত্রে অবান্তর লেগেছে। গল্পের গতি কমেছে, যেন ইতিহাসের পাঠদান দিতে গিয়ে মূল গল্প হারিয়ে গিয়েছে। তবুও এ ইতিহাস হয়তো অনেকের ভালো লাগবে। অনেক কিছু জানতে সাহায্য করবে। মূল উপন্যাসের অংশ হিসেবে কমিয়ে নেওয়া যেত বলে মনে হয়েছে।
উপন্যাসটিকে লেখক চারটি খন্ডে ভাগ করেছেন। এই চার খন্ডের প্রতিটি খন্ড আলাদা আলাদাভাবে কবির জীবন বয়ান করেছে। যেখানে লেখক যথাযথ উপমার সাথে সমাজের সংকীর্ণতার দিকে আলোকপাত করেছেন। একইসাথে দেখিয়েছেন উদারতাও। সমাজের নানান সমস্যা যেখানে উঠে এসেছে, সমাধানও বাতলে দিয়েছেন। কোনটা সমস্যা আর কোনটা সমাধান, তা ভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভাবনা থেকে বুঝে নিতে হবে।
লেখকের লেখনী ভালো। তবে অতিরিক্ত ধীর গতির লেগেছে গল্পটি। বিশেষ করে লেখক যেভাবে প্রতিটি বাক্যে দর্শন প্রবেশের চেষ্টা করিয়েছেন, ফলে আরও ধীর হয়ে গিয়েছিল উপন্যাসের যাত্রা। লেখক কবির জীবনের ফ্ল্যাশব্যাক যেভাবে দেখিয়েছেন, আমার পছন্দ হয়েছে। যদিও এখানে কথা থাকে। যার বয়ানে কবির জীবন উঠে এসেছে, তার হয়তো কবির সম্পর্কে অনেক কিছুই জানার কথা না। কবির ভাবনা, কবির দর্শন; অথচ লেখক তা দেখিয়েছেন। সেটা অনেকের ক্ষেত্রে দৃষ্টিকটু মনে হতে পারে। তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে ভালো লেগেছে, সিনেমায় অনেক দৃশ্য এভাবে ফ্ল্যাশব্যাকের মাধ্যমে দেখানো হয়। লেখক যেন সেই চেষ্টাই করেছেন।
▪️চরিত্রায়ন :
"অরুণিমা" উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দুইটি। কবি ও কাজী সাহেব। এর সাথে কিছু নারী চরিত্রের আনাগোনা। নারীদের মাধ্যমে লেখক এই সমাজের চিত্র যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা অসাধারণ। নারীরা বোধহয় এমনই। আমাদের সমাজের ভিন্নরূপ।
কাজী সাহেবের ক্ষেত্রে একটি বিষয় ভালো লাগেনি। তিনি সংসদ সদস্য হয়েও বারবার ছুটে গিয়েছেন, যেখানে তার একটি ইশারায় সবকিছু হয়ে যাওয়া সম্ভব। আরেকদিক দিয়ে চিন্তা করলে, যেই যাত্রায় তিনি নিজেকে শামিল করেছেন; সেখানে তিনি ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারতেন না।
কবি চরিত্রের জীবন বর্ণনা করার হয়তো কিছু নেই। আবার অনেক কিছুই আছে। শান্ত, ঠাণ্ডা প্রকৃতির কবি যেন এই সমাজের অংশ। সমস্ত কিছু নখদর্পনে। যার দর্শন, চিন্তাভাবনা সমাজকে বদলে দিতে পারে। সিস্টেমের অংশ হয়ে নয়, পুরো সিস্টেমকে নিজের করে নিতে হলে কবিদের মতো কিছু মানুষের প্রয়োজন।
বেশ কিছু নারী চরিত্রের দেখা পাওয়া যায় উপন্যাসে। নারীরা যেন সমাজের মূর্ত প্রতীক। কোথাও ফসলের মাঠঘাট যেন গ্রাম্য বধূর মতো সারল্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আবার কোথাও সমাজতন্ত্রের ন্যায় কাঠিন্য ভর করে। কখনো কখনো কাল বৈশাখীর মতো তীব্র রাগে সব এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। চরিত্রগুলো কখনো এসেছে সবার কখনো হারিয়ে গেছে নিজেদের নিয়মে। কিন্তু শুরুর দিকের কিছু চরিত্র শেষে থাকবে আশা করেছিলাম। কিন্তু কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
এই উপন্যাসে আরেকটি চরিত্র আছে। খুলনা শহর। যে শহরের এক যাত্রা এ "অরুণিমা" সূচনা থেকে শেষ, সব যেন গল্পে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছে। যেই শহর পরম মমতায় আগলে রাখছে তার মানুষদের। কিংবা ভাসিয়ে রাখছে জীবনযাত্রায়।
▪️পরিশেষে, শেষে একটা কবিতা দিয়ে শেষ করি। এই উপন্যাসে অসংখ্য কবিতা আছে। মনে জায়গা করে নেওয়া সে কবিতাগুলো নাহয় পাঠক বই পড়ে জেনে নিবে। আমি আমার সবচেয়ে ভালো লাগা কবিতা জানিয়ে যাই,
আমার কেবল পাঞ্জাবি পরার উপলক্ষ্য বাড়ে! বৈশাখের প্রথম সকাল থেকে শুরু, প্রভাতফেরি এসে মাঝে ডেকে নিয়ে যায়। দুই ইদে আমি নিজেই কাতারে দাঁড়াই, হঠাৎ হঠাৎ দাঁড়াতে হয় পরিচিত কারো জানাজায়। সব মিলে আমার কেবল পাঞ্জাবি পরার উপলক্ষ্য বেড়ে যায়। অরুণিমা, সাধ্যের ভেতর একটাই পাঞ্জাবি আমার, সে কখনো প্রশ্ন তোলেনি, “তবে আমি কার?” শুধু যাদের উপলক্ষ্যে দাঁড়াই, তারাই প্রশ্ন তোলে— “পাঞ্জাবিটা কার? বৈশাখ, ইদ, একুশ নাকি জানাজার?”
বইয়ের নাম :- অরুণিমা লেখক :- আহ্সান কবীর ধরন :- সামাজিক উপন্যাস প্রকাশনী :- ভূমিপ্রকাশ প্রচ্ছদ :- পরাগ ওয়াহিদ পৃষ্ঠা সংখ্যা :- ২৭২ মুদ্রিত মূল্য :- ৩৮০টাকা
❝সৌজন্যতার যুগে আমরা অনুভূতি চাপা দিতে আমাদের চারপাশে যেসব দেওয়াল তৈরি করে রাখি, তা ভাঙার ক্ষমতা রাখে শুধু হাসি আর কান্না। হয় বাঁধ ভেঙে কাঁদুন, নাহয় বাঁধ ভেঙে হাসুন।❞
কাহিনী সংক্ষেপ :- চারবারের সংসদ সদস্য 'কাজী আমানুল্লাহ' তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে সংকটকালীন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন। সমস্যার শুরু সাংস্কৃতিক সংগঠন 'দোঁ-আশ' কার্যালয়ের সামনে তৈরি করা দেবী ভেনাসের নগ্ন নারী মূর্তির উদ্ধোধন নিয়ে। কাজী সাহেব কথা দিয়েছ��লেন আসন্ন পহেলা বৈশাখে তিনি নিজ হাতে এই মূর্তি উদ্বোধন করবেন। কিন্তু পহেলা বৈশাখ রমজান মাসে পরে যাওয়ায় এবং শহরের মধ্যে একটি নগ্ন নারী মূর্তি রাখাটা কোনো ভাবেই মেনে নিতে রাজি হচ্ছে না শহরের ধর্মীয় সংগঠন 'জামাতুল মুসলিম'। মূর্তি উদ্বোধন করলে খেপে যাবে ধর্মীয় সংগঠন গুলো, দেশের ধর্মভীরু মুসলমানদের খেপিয়ে আসন্ন নির্বাচনে জিততে পারবেন না কাজী সাহেব। আবার উদ্বোধন করতে মানা করে দিলে এলাকার লেখক কবি সহ সব সাংস্কৃতিক মানুষেরা তার বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু করবেন। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র কাজী সাহেব খুব ভালো করেই জানেন কলমের শক্তি কতটুকু। এই সংকট নিরসনের একমাত্র পথ নিজের পক্ষে লেখালেখি করবে এমন একজন কবি খুঁজে বের করা।
❝পুরোনো বিল্ডিংয়ের শহরে ভূত আর কবির অভাব হয় না।❞ শহরের পুরোনো বিল্ডিংয়ের ভিড়েই পাওয়া গেল এমন এক রহস্যময় কবিকে যার প্রকৃত নাম ঠিকানা কেউ জানে না। শুরু হলো কাজী সাহেবের কবিকে খুঁজে বের করার অভিযান। নন্দগ্রামের প্রাইমারি স্কুল থেকে বাজিপাড়ার ব্যেশ্যাপল্লী, সব জায়গায় কবির যাতায়াত। হোটেলের আড়ালে পতিতা ব্যাবসা চালানো হোটেল বসুন্ধরাতে বাজার কিনে দেওয়ার কাজ করে, আবার বিভিন্ন স্কুলে বেতনের একাংশের বিনিময়ে মাস্টারির কাজও করে। কে এই কবি? কী তার পরিচয়? কেন কেউ তার নাম জানে না? যেই তার সংস্পর্শে আসে সেই কেন তার প্রতি মুগ্ধ হয়ে যায়?
পাঠ প্রতিক্রিয়া :- ❝নারীর যোনীপথ বেয়ে আসা রক্তে যার গা গুলায়, সে দেখেনি ক্ষেতের আল বেয়ে পানি কীভাবে যায়। সে জানে না উর্বরতা কীভাবে আসে।❞
কিছু উপন্যাস আছে যেগুলো পড়ে আমরা মজা পাই, আবার কিছু উপন্যাস আছে যেগুলো আমাদের চিন্তাকে ঝাঁকি দিয়ে যায়, আমাদের ভাবতে বাধ্য করায়। 'আহ্সান কবীর' রচিত "অরুণিমা" ঠিক এরকমই একটি উপন্যাস। এই বইটা পড়ার সময় বারবার আমার চিন্তাকে ঝাঁকি দিছে, লেখকের কথা গুলো নিয়ে ভাবতে বাধ্য করছে। ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্মান্ধতা, পরিবেশ বিপর্যয়, দেশপ্রেম, ভালোবাসা, যৌনতা সবকিছু নিয়েই লেখক পাঠকের মনে চিন্তার বীজ বপন করে দিতে সক্ষম হয়েছে। লেখক কবি চরিত্রের মাধ্যমে সমাজের এমন সব চিত্র তুলে ধরেছে যেগুলো আমরা দেখি সব সময় কিন্তু এগুলো নিয়ে ভাবি না। আমরা নিজেদের চিন্তার সংকীর্ণতায় আটকা পড়ে থেকে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরো সময়টা কাটিয়ে দেই। আমরা দেখি না আমাদের সামনের মানুষটার মনের অবস্থা কেমন, আমরা ভাবি না সুখে থাকতে খুব বেশি কিছু লাগে না আসলে। চার খন্ডে ভাগ করা এই উপন্যাসের প্রতিটি খন্ডে উঠে এসেছে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন চিত্র। লেখকের কলমে উঠে এসেছে প্রাচীন খুলনা শহরের পত্তন থেকে বর্তমান খুলনা শহরের জন্য প্রাকৃতিক হুমকির কথা। উঠে এসেছে গ্রাম্যবধূর ভালোবাসা থেকে শহুরে আধুনিক নারীর প্রেম। এই উপন্যাসে মূল চরিত্র কবি মনে হলেও পুরো উপন্যাসটা আসলে অনেকগুলো চরিত্রের আলাদা গল্পের সমন্বয়। আর কবি হচ্ছে সেই সুতো যে সবগুলো চরিত্রকে এক সুতোয় গেঁথে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। কবি, যে সবার সাথে খুব সহজেই মিশে যায়, সবার অস্তিত্বে নিজের ছাপ ফেলে যায়। লেখকের লেখার হাত দারুন এটা বলতেই হচ্ছে। উপন্যাসে লেখক যেভাবে উপমার ব্যাবহার করছেন সেটা অবশ্যই প্রসংসনীয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা, ফসলের মাঠ, নদী এবং তার রূপের বর্ণনা লেখক দারুন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবির মাধ্যমে যেভাবে একেরপর এক ভাবনার খোরাক দিয়ে গেছেন সেটা সামাজিক উপন্যাসে খুব কমই পাওয়া যায়। সেই সাথে অনেকগুলো কবিতাও আছে বইতে, যেগুলোর কোনো কোনোটা কবিতা না বোঝা এই আমার কাছেও দারুন লাগছে। তবে আমি কবিতা খুব একটা পড়ি না, তাই কিছু কবিতা আমার মাথার উপর দিয়েও গেছে।
এখন আসি বইয়ের যেসব বিষয় আমার কাছে অসঙ্গতি মনে হইছে সেসবে। প্রথমেই বলবো লেখকের গল্প বলার ভিউ পয়েন্ট নিয়ে। কাজী সাহেব যখন কবিকে খুঁজতে কোনো এক জায়গায় যাচ্ছে তখন সেই চরিত্রের জবানিতে আমরা কবির এবং সেখানকার চরিত্রগুলোর গল্পটা জানতে পারছি। যেমন কবি যখন নন্দগ্রামের প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করতে যায় সেই সময়ের ঘটনা আমরা শুনতে পাই "কুমুবউ" এর জবানিতে। আবার কবি যখন বাজিপাড়ায় প্রেগন্যান্ট মেহেরজানকে রাখতে যায় সে সময়ের গল্প শুনতে পাই সরলা মাসি এবং মেহেরজানের জবানিতে। আবার মাঝখানে আমরা শেলি নামের এক চরিত্রের মাধ্যমে কবির গল্প শুনতে পাই। কিন্তু এই সময় আমরা এমন কিছু বিষয়ও জানতে পারি যেটা বক্তার জানার কোনো উপায় ছিল না। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায়, কবির একান্ত নিজস্ব চিন্তাভাবনা বা এমন সময়ের গল্প যখন বক্তা ঐ জায়গায় উপস্থিত নাই। আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যায়, কাজী সাহেব যখন বাজিপাড়ায় কবিকে খুঁজতে গেল তখন সেখানকার সর্দারনী সরলা মাসির কাছে কবির গল্প শুনতে শুরু করার এক পর্যায়ে কবির দেওয়া একটা কবিতাও আবৃত্তি করা হলো। কিন্তু পরে আবার দেখা গেল কাজি সাহেব সেই কবিতাটা চাচ্ছে পড়ে দেখার জন্য, অর্থাৎ আমরা পাঠকেরা কবিতাটা পড়ে ফেললেও কাজি সাহেব তখনও পড়েননি এবং সরলা মাসিও সেই কবিতা বলেননি কারণ তিনি পড়তে পারেন না। এরকম অসঙ্গতি পুরো বইতে দুই তিনবার লক্ষ্য করছি আমি। এরপর আসি দ্বিতীয় খটকা নিয়ে। কাজী সাহেব, যিনি চারবারের এবং রানিং সরকার দলীয় সংসদ সদস্য, তার চরিত্রটা আরো গম্ভীর হলে ভালো হতো। সামান্য এক কবিকে খুঁজতে শুরু থেকেই কাজী সাহেব সব জায়গায় নিজেই হাজির হয়ে যাচ্ছেন, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সহকারীকে সাথে নিয়ে একাই হাজির হয়ে যাচ্ছেন কখনো নন্দগ্রামে তো কখনো বাজিপাড়ায়। একজন চারবারের রানিং সংসদ সদস্যের সাথে এই কাজ ঠিক মানায় না। বরং উনার পক্ষথেকে কিন্তু তৃতীয় কাউকে শুরুতে পাঠানোটা বেশি যুক্তিসংগত হতো। তৃতীয় এবং শেষ যেটা অপছন্দ লাগছে সেটা হচ্ছে নন্দগ্রামে কুমুবউ এবং তার বাড়ির দুই কাজের মেয়ের কারণে অকারণে হা হা, হি হি, হো হো করে হেঁসে উঠা। গ্রামের টিনএজ মেয়েরা একটু বেশি হাসাহাসি করে, কিন্তু এখানে মাঝে মাঝে সেই হাসাহাসির পরিমাণ একটু বেশিই হয়ে গেছে মনে হইছে আমার কাছে। যদিও এই খটকা লাগার বিষয়গুলো খুব বড় বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে হয়নি আমার কাছে বা পড়ার সময় খুব একটা সমস্যাও করেনি। সত্যি বলতে গেলে অনেক পাঠক পড়ার ফ্লোতে এগুলো ধরতেও পারবে না হয়তো, তারপরও ভবিষ্যতে এগুলো ঠিক করে নিতে পারলে আরো দারুন কিছু লেখা পেতেই পারি আমরা লেখকের কাছে। যারা সামাজিক উপন্যাস পছন্দ করেন এবং বই পড়ার পাশাপাশি লেখা নিয়ে ভাবতে পছন্দ করেন তাদের কাছে এই বই ভালো লাগবে আশাকরি। সেই সাথে যারা কবিতা পছন্দ করেন তারা দারুন কিছু কবিতার সাথে সাথে দারুন কাব্যিক লেখাও উপভোগ করতে পারবেন।
❝দখল হওয়া শহরে যাই, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভূমিহীন কৃষকের মতোন। তবুও কেন বুকের বীজতলায় একবুক কেমন যতন।❞ বই হোক সব সময়ের সঙ্গী ❤️ Happy Reading ❤️
নারীর যোনীপথ বেয়ে আসা রক্তে যার গা গুলায়, সে দেখেনি ক্ষেতের আল বেয়ে পানি কীভাবে যায়। সে জানে না উর্বরতা কীভাবে আসে।
বই পরিচিতি
বই- অরুণিমা (সামাজিক রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস) লেখক- আহসান কবীর প্রচ্ছদ- পরাগ ওয়াহিদ প্রকাশনা- ভূমি প্রকাশ মলাট মূল্য- ৩৮০ পেইজ সংখ্যা - ২৭২ প্রকাশকাল - বইমেলা ২০২১ প্রাপ্তিস্থান : অনলাইন বুকশপ, নীলক্ষেত এবং তাদের শোরুম : ৩৮ বাংলাবাজা���, ২য় তলা। (সিঁড়ি দিয়ে ওঠে বামদিকে ফেইথ বুকস এর সাথে লাগোয়া।)
পুরোনো বিল্ডিংয়ের শহরে নাকি ভূত আর কবির অভাব হয় না। এমনটাই বলেছিলো রাজনৈতিক নেতা কাজী সাহেবের তরুণ সহকারী। তা, একজন রাজনৈতিক নেতার হঠাৎ কবি খোঁজার দরকার পড়লো কেন?
নির্বাচনী প্রচারণার খাতিরে কত কিছুই না করতে হয়! কিন্তু সমস্যাটা বড় উভয় সংকট হয়ে গেঁথে আছে! কবি ছাড়া মুক্তির উপায় কই?
শহরের দুটো দলকে কিছুতেই এক ছাতার নিচে আনা যাচ্ছে না। জামাতুল মুসলিম নামের রাজনৈতিক দল আর দো আঁশ নামের সাংস্কৃতিক দলটিকে। দো আঁশ কার্যালয়ে রোমান দেবী ভেনাসের ভাস্কর্য উন্মোচিত করার দায়িত্ব এসে পড়ে কাজী সাহেবের ঘাড়ে। কিন্তু যেদিন সেটি উন্মোচিত হবে, সেদিন পহেলা বৈশাখ তো বটেই, সেই সাথে পবিত্র রমজান মাসও। পবিত্র এই মাসে এসব বেলেল্লাপনা মানবেন কেন মৌলবাদীরা?
এই উভয় সংকটে পড়ে কাজী সাহেব মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ভাস্কর্য তিনি উন্মোচন করবেন না। এতে ক্ষেপে গেছে শহরের কবি পরিষদ। অস্ত্র হিসেবে তারা তুলে নিয়েছে কলম। গল্প কবিতার মাধ্যমে কলমযুদ্ধে নেতার সাথে লড়াই করবে কবি পরিষদ। ওদের কলমের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য, উত্তাল শহরকে শীতল করার জন্য কাজী সাহেবের একজন কবি দরকার।
কবি খোঁজ খোঁজ রবের দশম দিন একজন কবির সন্ধান মিললো। তবে তাকে দিয়ে শহর ঠান্ডা করবেন কী, আগে তাকেই খুঁজে বের করা দরকার যে! কবি যে পলাতক!
কবিকে খুঁজতে গিয়ে কাজী সাহেব দৌড়ে বেরিয়েছেন কবির ফেলে রাখা রাস্তায়। আর উপলব্ধি করেছেন কিছু সত্যকে। যে সত্য তাঁর মনের গভীরতম অংশে সুপ্ত অবস্থায় ছিল। জেনে শুনেও তিনি তাকে জাগিয়ে তুলতেন না। কবির খোঁজ বের করতে গিয়ে সেই সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন কাজী সাহেব।
চারটি খন্ডে বইটি লেখা। উপমা খণ্ড, বেহুলা খণ্ড, শরীর খণ্ড আর মনসা খণ্ড। চার খণ্ডে কবির চার গল্প।
বাংলা কবিতার মধ্যযুগের মোড়ে কেমন রূপ ছিল তা কবি দেখিয়েছেন সরলা মাসির মাধ্যমে, সাতচল্লিশের দেশ ভাগের আখ্যান দেখিয়েছেন কুমু বৌ এর মাটিপ্রেমের সহায়তায়, একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের গল্পটা যেন তুলতে চেয়েছেন মেহেরজানের কাব্যে, আটের দশকের বিপ্লবের কাহিনিটা বলেছে শেলী, আর বর্তমানের উপমাসর্বস্ব প্রেম হলো মিত্রা।
সর্বোপরি কাজী সাহেবের যাত্রাপথে উন্মোচিত হয়েছে দেশের অপরাজনীতি ও উগ্র সাংস্কৃতিক চর্চার বাহুল্য। এবং আরও অনেক কিছু।
উপন্যাসের গল্পটাকে বোঝাতে আরও কিছু যদি লিখতে যাই, তাহলে সেটা নিজেই একটা ছোটো গল্প হয়ে যাবে। কাহিনি পর্যালোচনা তাই বেশি বড় করছি না।
পাঠ প্রতিক্রিয়া
কবির প্রথম কবিতাটাই ভীষণ নাড়া দিয়েছে।
অরুণিমা জানো! তোমার শহরে একদল কনফিউজড লোকের আসা-যাওয়া। রাত দশটায় কাজ শেষ করে, শহরের মাথায় বাস ট্রাক ধরার মোড়ে আসতে আসতে এদের এগারোটা বেজে যায়। ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করার পর ওরা যখন ট্রাক বা বাসের ছাদে ওঠে, তখন তোমার ঘড়িতে বারোটার এলার্ম বাজে।
ওরা হিসেব করে দেখে, "দেড়টার আগে বাড়ি পৌঁছুতে পারব তো!" বাস বা ট্রাক ছাড়লে ওদের মনে পড়ে, "কাল কাজ ধরতে গেলে তো সেই আবার ভোর ছয়টার বাস ধরতে হবে।" এমনই কনফিউজিং দূরত্বে তোমার শহর থেকে ওদের গ্রাম।
তারপর একদিন পদ্মার ওপর একটা সেতু বসবে। তোমার শহর থেকে পাওয়া যাবে রাজধানীর পারফিউমের গন্ধ। তোমার শহরে কনফিউজড লোকের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। রাতে বাড়ি ফেরার ট্রাকে বসে ভাববে, "দূরত্ব তো খুব বেশিও না। শহরটা গ্রামে না এলো, গ্রামটা শহরে নিলে কেমন হয়!" তখন তুমি কী ভাববে অরুণিমা আমি জানি না। আমি ভাবব, "অরুণিমা নামটা বড্ড সেকেলে!"
আমি কবিতা কম বুঝি। কিন্তু কবিতা যখন হয় এমন হৃদয় ছুঁয়ে দেওয়া, সেই কবিতার খানিকটা তো বোধগম্য হয়ই। বাকি যেটুকু বুঝিনি, তা লেখক কাজী সাহেবকে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। প্রতিটা কবিতাই এত বেশি প্রাসঙ্গিক! প্রতিটা কবিতার বিষয়বস্তুই গল্পের পালে চমৎকার হাওয়া দিয়েছে। ব্যাখ্যাটুকুনও মুগ্ধ হয়ে পড়ার মতোন।
বই- অরুণিমা (সামাজিক রাজনৈতিক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস) লেখক- আহসান কবীর প্রচ্ছদ- পরাগ ওয়াহিদ প্রকাশনা- ভূমি প্রকাশ মলাট মূল্য- ৩৮০ পেইজ সংখ্যা - ২৭২ প্রকাশকাল - বইমেলা ২০২১ প্রাপ্তিস্থান : অনলাইন বুকশপ, নীলক্ষেত এবং তাদের শোরুম : ৩৮ বাংলাবাজার, ২য় তলা। (সিঁড়ি দিয়ে ওঠে বামদিকে ফেইথ বুকস এর সাথে লাগোয়া।)
বইটা পড়ার সময়ে আমি ভেবেছি, এই বইয়ের প্রোপার রিভিউ করতে পারব কি না। বরাবরই ভালোমানের সাহিত্য পড়লে আমার এমন অসহায় অনুভূতি হয়। মনে হয় বইটার মাহাত্ম্য আমি সকলকে ডেকে জানাই, কিন্তু ঠিকঠাক শব্দ গুছিয়ে উঠতে পারি না যেন! এরচেয়ে যেকোনো থ্রিলারের রিভিউ করা সহজ মনে হয় আমার কাছে।
পড়ার সময় অরুণিমা যেন ফুরিয়ে না হয়ে যায়, তাই আস্তে ধীরে পড়েছি। বই শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও বইয়ের প্রতি মুগ্ধতা যেন কমছেই না। এটার প্রতিটা চ্যাপ্টার মুগ্ধ করবে পাঠককে। তবে অরুণিমা পড়তে হবে হাতে সময় নিয়ে। বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে এই বই পড়লে বোরিং লাগতে পারে।
লেখকের চিন্তার ডেপথ্সগুলো উল্লেখ করার মতো।
"ওই ইটের ভাঙনটাই দেখলা, ভেতরে এতদিন যা যা অপকর্ম চলল, ভাঙন হিসেবে তা কী কম!"
"যা মূর্ত হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে, তাই মূর্তি।"
পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গির উপরে এই উপন্যাসের অর্থ ভ্যারি করবে। কেউ চাইলে এই উপন্যাসটিকে সাধারণ একটা সামাজিক রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবেই দেখতে পারে। আর কেউ কেউ এর প্রতিটি খন্ডে পাবে গভীর কিছু গল্প। গভীর দেশপ্রেম। একাত্তর। মুক্তিযুদ্ধ। ইতিহাস। ঐতিহ্য। বিপ্লবের বৈচিত্র্য। ধর্মের মধ্যে উগ্র মৌলবাদ। এবং এই ঘুণে ধরা এই সংস্কৃতি বদলে নির্মল দেশ গড়ার ইচ্ছে।
এই লেখকের মধ্যে একজন কবি বাস করেন। লেখকবেশী এই কবি বেঁচে থাকুন। মাইন বোমা তৈরি করার ইচ্ছে বহাল থাকুক। বিশ্বায়নের এই সময়ে বইপড়ুয়ারা বড্ড বেশি ট্রেন্ডি। তাই তাৎক্ষণিক ফলাফলের আশা করাটা ভীষণ বোকামি। তবে আমরা এটুকু আশা করতে পারি, আগামী ১০ বছর পর 'এপারে কেউ নেই', 'অরুণিমা'র মতো বই সত্যিকারের পাঠকদের নিত্যকার চায়ের সাথেই আলোচিত হবে।
প্রচ্ছদটা বইয়ের গল্পকে দারুণভালো উপস্থাপন করছে। সেজন্য পরাগ ওয়াহিদকে সাধুবাদ জানানোই যায়। ভূমিপ্রকাশ বইয়ের বাইন্ডিংয়ে ভালো উন্নতি করছে দিন দিন। সবমিলিয়েই প্রোডাকশন বেশ ভালো। বানান ভুল পাইনি বললেই চলে। বইয়ের অলংকরণও চমৎকার হয়েছে। আমি বইয়ে রেটিং করি না। তবে এইটুকু বলতে পারি, আমার তরফ থেকে মাস্ট রিড বই অরুণিমা।
ঘটনা শুরু হয় রোমান দেবী ভেনাসের একটি মূর্তিকে ঘিরে। দোঁ-আশ নামের সাংস্কৃতিক সংগঠন, পহেলা বৈশাখে ভেনাসের মূর্তি উদ্বোধন করবে। ছয় মাস আগে শহরের এমপি কাজী সাহেব কথাও দিয়ে রেখেছেন উদ্বোধনে যাওয়ার জন্য। কিন্তু, তার খেয়াল ছিল না, এবারের বৈশাখ রমজানের মধ্যে। রমজান মাসে নগ্ন মূর্তি উদ্বোধনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেল রাজনৈতিক সংগঠন জামতুল মুসলিম। কাজী সাহেব পড়লেন ফ্যাসাদে।
এরই মাঝে কবি নামের একজন শহরের এক ব্যবসায়ীর মেয়েকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে তুলে দিয়েছে বেশ্যাপাড়ার দালালের হাতে!
ঘটনার প্রেক্ষিতে কাজী সাহেবের উপস্থিতি থাকলেও এর পরের গল্প শুধুই কবির। কবির জীবন নিয়ে।
বইটি আপনাকে জীবনের গল্প বলবে, বলবে বেশ্যাপাড়ার রাতের কথা, সাম্যবাদের গপ্পো, রাজনীতি, ধর্মের বেড়া, পরিবেশের গল্প, প্রেম, যৌনতা, চাষাভুষার গল্প, নদীর গল্প, মাটির গল্প, মায়ের গল্প।
বইটি পড়তে আরাম লাগলেও কখনও কখনও কাহিনি থেকে দর্শন এবং ইতিহাসের বিশাল আখ্যানের কারণে, পড়তে একটু বিরক্ত লেগেছে। পথে পথে দর্শনের কারণে বইটি পড়তেও সময় লাগে।
সমালোচনার জায়গায় যে জিনিস না বললেই নয়, কাজী সাহেবের কবিকে চাওয়া/পাওয়ার ব্যাপারটা। দিনশেষে এই যুক্তি বড়োই ঠুনকো লাগল। তাছাড়া, একজন এমপি এভাবে প্রয়োজনে যার-তার কাছে যেতেই পারে। কিন্তু, বঙ্গদেশে এইটা কতটুকু খাটে! তা প্রশ্নবিদ্ধ।
এইটুকুই। বাদবাকি কেবলই মুগ্ধতা। এই বছরে পড়া অন্যতম সেরা মৌলিক বই এটি।
এর আগে কবি শিরোনামে বই পড়েছি দু'টো। একটা হুমায়ূন আহমেদের, আরেকটা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এই বইটির নামও কবি রাখা যেত। তবে অরুণিমা কেন? সেটাও এক ইতিহাস!
আরেকটা কথা। কবির কবিতাগুলোও ভালো। আমার পছন্দের একটা কবিতা বলি—
আমার কেবল পাঞ্জাবি পরার উপলক্ষ্য বাড়ে! বৈশাখের প্রথম সকাল থেকে শুরু, প্রভাতফেরি এসে মাঝে ডেকে নিয়ে যায়। দুই ইদে আমি নিজেই কাতারে দাঁড়াই, হঠাৎ হঠাৎ দাঁড়াতে হয় পরিচিত কারো জানাজায়। সব মিলে আমার কেবল পাঞ্জাবি পরার উপলক্ষ্য বেড়ে যায়।
অরুণিমা, সাধ্যের ভেতর একটা পাঞ্জাবিই আমার, সে কখনো প্রশ্ন তোলেনি, ‘‘তবে আমি কার?” শুধু যাদের উপলক্ষ্য দাঁড়াই, তারাই প্রশ্ন তোলে— “পাঞ্জাবিটা কার? বৈশাখ, ইদ, একুশ নাকি জানাজার?”
অরুণিনা উপন্যাসকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করলে বলা যায় — দুইজন মানুষের জার্নি দেখানো হয়েছে। একজন কবি, আরেকজন জাঁদরেল নেতা কাজী সাহেব। কবির জার্নিটা আমার কাছে যথেষ্ট ভালো লেগেছে। শুধু ভালো নয়, বলতে গেলে চমৎকার লেগেছে। শিক্ষকতা করে, তবে স্থায়ী পেশা নয়। কারো প্রক্সি হিসেবে কিছু সময়ের জন্য। পাশাপাশি কবিতা লেখে। কবির জার্নি ঘিরে অন্যান্য চরিত্রগুলো — কুমুবউ, কান্তাবউ, শেলী, মেহের — যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। চরিত্রগুলো স্বমহিমায় আভরণ তৈরি করেছে কাহিনীর। তবে নেতা কাজী সাহেবের জার্নিটা অতটা ইম্প্রেসিভ লাগেনি। অন্তত যে কারণে সে কবির পিছে ছুটে বেড়িয়েছে সেটা অতটা প্রমিজিং লাগেনি আমার কাছে। তবে তার বিচক্ষণতা, বুদ্ধিমত্তা চোখে পড়ার মতোই। লেখকের লেখার ধরন বেশ ভালো লেগেছে। সাবলীল ভাবেই বলে গিয়েছেন গল্প। কাহিনীকে ভাগ করেছেন কয়েক খন্ডে। আমি খুলনা শহরেই মানুষ। লেখক উপন্যাসে 'খুলনা' নামটা ব্যবহার না করলেও, বড়বাজার ঘিরে শহরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস মুগ্ধ করেছে। তবে একইসাথে বিরক্তিরও উদ্রেক করেছে। কারণ শহরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস সংলাপ আর বর্ণনায় বেশ কয়েকবার তুলে ধরেছেন লেখক। একই কথাবার্তা বারবার পড়তে ইচ্ছে কি আর করে! তবে... তবে এই উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য শক্তিশালী দিক হলো কবিতা আর দর্শন। এই উপন্যাসে অনেকগুলো কবিতাই ব্যবহৃত হয়েছে এবং প্রতিটি কবিতাই ভাবনার যথেষ্ট খোরাক জোগায়। কোথাও গিয়ে ধাক্কা দেয়। আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি। পাশাপাশি শহুরে মানুষ ঘিরে এবং চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব, চিন্তাধারা, দর্শনও দারুণভাবে পোট্রে করেছেন লেখক। অন্তত এই উপন্যাসের কবিতা আর দর্শনের জন্য তাকে সাধুবাদ জানাতে বাধ্য আমি। সবকিছু মিলিয়ে ৩ তারকাই দিতাম। কিন্তু ৪ তারকা দিচ্ছি শুধুমাত্র উপন্যাসের কবিতাগুলো আর দর্শনের জন্য।
বইটা আমি উপহার পেয়েছিলাম আমার ভাই জুয়েলের কাছ থেকে। তো আমি প্রথমে বুঝিনি বইটাকে কেন এত গুরুত্ব দিচ্ছে জুয়েলদা। পরে বইটা পড়ার পর মুগ্ধতার রেশ নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলাম। বইটা পড়েছি আমি মার্চের দিকে। বইয়ের গল্পটুকু দুটো সমান্তরালে এগিয়ে গেছে। রহস্যময় এক কবি আর এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের আখ্যানে।
একজন ছুটে বেড়ায় অন্যজন ধেঁয়ে যায়। খুব আহামরি যে গল্প তা কিন্তু না। গল্পটা আপাতদৃষ্টিতে সামান্য। কিন্তু এর বিষয়বস্তু, লেখার ধরণ সুন্দর। আরো সুন্দর এর সংলাপগুলো। একটি উপন্যাস যদি আপনাকে কিছু চিন্তা অথবা ভাবনার রসদ জুগিয়ে থাকে তবে তাকে স্বার্থক বলা চলে।
আমি জানিনা আমি খুব বিস্তারিত বলতে পারবো কিনা৷ তবে বইটির ব্যখ্যা পাঠকের উপরেই ছেড়ে দেয়া ভালো। কারণ নিটোল গল্পের মাঝে যখন ভাবাদর্শ ছাড়াই যুক্তির অবতারণা ঘটে তখন একে সামান্য না বলে ভাবনার খোরাক জোগানোর মতো কিছুই বলা যায়।
কিন্তু আমরা কি ভাবনার জন্য প্রস্তুত? বাংলা রাজনৈতিক উপন্যাসের একটি আদর্শ উপন্যাস বলেই একে ধরা যাবে? সময় হলেই বোঝা যাবে।
রিসেন্ট লেখকদের বই তেমন পড়া হয়ে উঠে না। আহসান কবিরের "অরুণিমা " একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে পড়েছি। রাজনীতি, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্ম,জলবায়ু, ইতিহাস সবকিছুর সাথে " অরুণিমা " সম্বোধনে অদ্ভুত সুন্দর কবিতা নিয়ে একটা সুখপাঠ্য বই।