"ভাবো সেই সন্ধ্যাজল অস্ফুট বাতাস আমি আভাময় পায়ে হেঁটে গেছি পাথরবিছানো পথে পথে তোমার দুঃখের পাশে দীক্ষা নেব ইচ্ছা ছিল কত প্রেমের পল্লব সর্বঘটে ভেবেছি এত যে দল, দল দল, আমারও কি জায়গা নেই কোনো?" না, এই কবিতাটি এ-বইয়ে পাবেন না আপনি। আমাদের কবিতার মুহূর্তগুলো বড়ো ফাঁকা আর নির্জন করে দিয়ে, মাত্র ক'দিন আগেই চলে গেছেন সেই মানুষটি। কিন্তু আলোচ্য বইয়ের কবিতাগুলো পড়তে-পড়তে বারবার দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম এক অস্বস্তিকর আয়নার সামনে, আর তখনই এই কথাগুলো মনে হচ্ছিল। কেন? ঠিক কী আছে আলোচ্য বইটিতে? আগে বরং সেটাই লিখি। দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এবং ঝকঝকে মুদ্রণে শোভিত বইটিতে আছে~ ১. বালি ও তরমুজ ২. উন্মেষগোধূলি ৩. বঙ্গীয় চতুর্দশপদী ৪. উত্তর কলকাতার কবিতা ৫. আনন্দ ভিখিরি ৬. রামলীলা ময়দান ৭. গুপ্তদাম্পত্য কথা ৮. উপাদানকারণ ৯. রাধাতপা চতুর্দশী ১০. মধুরতুমুল ১১. টুরিস্ট কাহিনি এছাড়া আছে মোট পাঁচটি পর্যায়ে 'অগ্রন্থিত কবিতা' এবং ২০০৯-এ প্রকাশিত 'কবিতা সংগ্রহ'-র অন্তর্গত 'কবির কথা।' কবিতাগুলো কেমন লেগেছে— এ-প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টাই বাতুলতা। বরং আসুন, আপনাদের সঙ্গে আমাকে মুগ্ধ-করা ক'টি কবিতার আংশিক পরিচয় করিয়ে দিই~ "জেলেদের কথা আমি কী করি বর্ণন আঁশগন্ধে ভরে আছে আমার জীবন এখানে গেড়েছি ঘাঁটি বিদগ্ধ মেকুর মারাঠা ডিচের রাস্তা... স্মৃতির ঢেঁকুর...
কতেক জন্ম ধরে লেখা যে কুলুজি ইতিহাসে নাই... তারে অভ্যন্তরে খুঁজি মানুষের অভ্যন্তরে... লতায়-পাতায় জটিল বুনোট ঠাস্ কথা-অকথায়" (ধীবরপুরাণ) বা "একই পথ ক্লান্ত দৃশ্য রুটিরুজিময় সিনেমা পোস্টার ছাড়া অন্যকিছু পালটায় না তেমন পাল্লা দিয়ে দড় হয় হিরো... হিরোইন নগ্ন থেকে নগ্নতর হয়
একই পথ একই কথা একই সুর... তবু অন্ধ গায়কের কণ্ঠে গানে কেন নূতনকে পাই" (প্রতিদিনের নূতন) আর "একের উপরে শূন্যের বসতি শূন্যেরে জানয়ে কেউ একের মাঝারে দুই-এর বসতি দুই-এর মাঝারে ঢেউ ঢেইয়ের তলায় অথৈ জলধি চারির ভিতরে তিন তুহ্মার আহ্মার মাঝারে যে ঢেউ উথলিছে প্রতিদিন তাতেই প্লাবন... বাকি যে ডাঙাটি সেথায় বাঁধলু ঘর...
দেখি সে ঘরেও প্রেমের আকুতি বসতে নিরন্তর" (প্রেমের বসতি) এবং "বাহিরে কোথাও নেই দৃশ্যাবলি চোখেরই রচনা মনেরই রটনা সব... যে খবরে আঁতকে ওঠে মন সমাধান দুরূহ যে সমস্যাগুলির... বুদ্ধিপ্যাঁচ একটা-একটা করে সব সযত্নে নির্মাণ করেছে
যে সমস্যা নেই তার কী কৌশলে সমাধান করি চিন্তার তরবারি শূন্যে ঘোরে সানিক্ সানিক্
একটা সমস্যার মাথা কাটা পড়লে বিন্দু রক্ত থেকে আরও লক্ষ জন্ম হয়... রক্তবীজ আন্তর্ভূমিক" (রাধাতপা চতুর্দশী: তৃতীয় কবিতা) এ-ভাবে কবিতা তুলতে থাকলে এটা রিভিউ বা প্রতিক্রিয়া না হয়ে এই মস্ত বইটার একটা সংক্ষিপ্ত সংস্করণ হয়ে উঠবে। তাই আপাতত থেমে যাচ্ছি।
উপরোক্ত ক'টি উদাহরণ থেকে কেউ ভাবতে পারেন, এই কবি হয়তো আপন একাকিত্ব আর সংশয় ও ব্যথার ভুবন নির্মাণ ছাড়া আর কিছু ব্যক্ত করেননি। সেক্ষেত্রে আমি আর এক প্রাতঃস্মরণীয়ের উক্তির দিকে তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি~ "কোনো প্রাক্নির্দিষ্ট চিন্তা বা মতবাদের জমাট দানা থাকে না কবির মনে— কিংবা থাকলেও সেগুলোকে সম্পূর্ণ নিরস্ত করে থাকে কল্পনার আলো ও আবেগ; কাজেই চিন্তা ও সিদ্ধান্ত, প্রশ্ন ও মতবাদ প্রকৃত কবিতার ভিতর সুন্দরীর কটাক্ষের পিছনে শিরা, উপশিরা ও রক্তের কণিকার মতো লুকিয়ে থাকে যেন।" (কবিতার কথা, জীবনানন্দ দাশ) প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই কবিতাগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে আমাদের সময়, দিনগত পাপক্ষয়, অন্ধকারের মধ্যে লণ্ঠন বা জোনাকি হয়ে জলে ওঠার ইচ্ছে, আর কালো স্রোতে ডুবে যাওয়ার প্রাণপণ আকাঙ্ক্ষা। যদি কবিতা ভালোবাসেন, যদি শব্দহীন হয়ে লেখায় ডুবে থাকা আয়ুর সন্ধান চান, তাহলে এই বইটি পড়লে আপনার ভালো লাগবে বলেই আমার ধারণা। অলমিতি।