"মানিকের পাঁচালী": ক্যামেরার পিছনে এক আত্মার স্বপ্নপথ
"The director is the only person who knows what the film is about." — Satyajit Ray
একটি বই কি কখনও সিনেমা হয়ে উঠতে পারে? অথবা উল্টোটা? বাংলা সাহিত্যের সাম্প্রতিকতম অনন্য সংযোজন "মানিকের পাঁচালী" পড়তে গিয়ে ঠিক এই প্রশ্নটাই বারবার মাথায় ঘুরেছে। অরিজিৎ গাঙ্গুলির এই উপন্যাস সিনেমার নির্মাণকে কেবল বিষয় করে না, সে হয়ে ওঠে এক নির্মিত আত্মজীবনীচিত্র, এক ছায়ার জার্নাল, এক পথের পাঁচালী অবলম্বনে লেখা উপন্যাসিক অপেরা।
কিন্তু শুধু তথ্যনিষ্ঠতা দিয়ে কি সত্যজিৎ রায়ের মতো এক মহাকাব্যিক সত্তাকে আঁকা যায়?
না।
এই বইয়ের অনন্যতা সেখানেই যে এটি তথ্যের পাটিগণিত থেকে বেরিয়ে এ��ে কল্পনার বীজতলায় সত্যজিতের শুরুর বছরগুলোকে এমনভাবে তুলে ধরে, যাতে পাঠক একইসঙ্গে হন দর্শক, শ্রোতা এবং চরিত্র। একটানা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মনে হয়—বই নয়, এক ‘স্ক্রিপ্টেড রিয়ালিটি শো’ দেখছি। আবার কোথাও মনে হয়—এ যেন নিজের ঘরের ভিতরেই একটা অডিশন চলছে। অডিশনে আমরা সবাই—পাঠক, লেখক, সমালোচক—অপুর ভূমিকায়!
প্রথম দৃশ্য: আগুন ও প্রতীক
১৯৯৩-এর সেই বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড, যা সত্যজিৎ রায়ের বহু প্রিন্ট-নেগেটিভকে ধ্বংস করেছিল, বইয়ের প্রথম পাতাতেই আমাদের মুখোমুখি করে দেয় "চিরদিনের মতো হারিয়ে যাওয়া এক মহারাজ্যের স্মৃতি"-র সঙ্গে। শুরুতেই লেখক যেন পাঠকের গালে আলতো করে একটা চড় মারেন—"এ তো শুধু বই নয়, এ তো ধ্বংসের বেদনা থেকে জন্ম নেওয়া পুনর্জন্ম!"
তাহলে কি এটা পুনর্জন্মকথা? হ্যাঁ, এক অর্থে। কিন্তু এটি সেই রকম পুনর্জন্ম নয় যা অলৌকিকতায় বিশ্বাস করে। বরং এটি একটি ইন্টেলেকচুয়াল রিবার্থ—ফেলুদার ভাষায়, একেবারে "cerebral"!
রূপকথা নয়, রূপচিত্র
"মানিকের পাঁচালী"র কাঠামো একটা শ্লোকের মতো। অলঙ্কার আছে, অনুষঙ্গ আছে, প্রতীক আছে, কিন্তু অভিনয় নেই।
লেখক যেখানে কল্পনা করেছেন, সেখানে নিজেই সাবধান করে দিয়েছেন—“এটি আমার অনুমান”, বা “গল্পের গতি বজায় রাখতেই এই বিন্যাস।” ফলে পুরো বইটা এক সতর্কতা আর প্রেমের আশ্চর্য সাম্যবানে গাঁথা।
রায়সাহেবের জানালায় প্যাঁচার বসে থাকা হোক, কিংবা বিলাপের মুহূর্তে তারসানাইয়ের সুর মিশিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত—সবই এসেছে বহু সন্ধানী প্রশ্ন, বহু পাতা ঘেঁটে খুঁজে পাওয়া তথ্য আর সেই তথ্যকে প্রাণবন্ত করে তোলার "মুক্তিমন্ত্র"-এর মতো লেখনীর ফসল হিসেবে।
একটা উদাহরণ দিই—
“তিন দিনের বেশি প্যাঁচাকে জানালায় বসার সুযোগ দিইনি, কারণ তারপরই আসে সেই সুখবর, বেলা দেবী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছেন।”
এই রকম সূক্ষ্ম পরিকল্পনা না থাকলে একটা বই কখনও সিনেমার মেজাজ নিতে পারে না।
সিনেমা মানে শুধু টেকনিক নয়, টেনশনও
আমাদের সমাজে সিনেমার প্রতি দুটো ধরণ স্পষ্ট—একদল মানুষ তাকে শিল্প বলেন, আরেকদল বিনোদন। কিন্তু সত্যজিৎ যে ভেতরে ভেতরে একজন “ফিলোসফার অফ দ্য FRAME”, সেটা এই বই না পড়লে বোঝা মুশকিল।
রাম হালদারের বইয়ের সূত্র ধরে শান্তিবাবুর সেই বিখ্যাত চুম্বন ও তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া—"আমরা তো এদেশে মানুষ হয়েছি তো, এরকমভাবে চুমু খেতে কোনোদিনই পারব না।”—এই একটা লাইনই বলে দেয়, Ray ছিলেন simultaneously আধুনিক এবং সঙ্কুচিত, সাহসী ও রক্ষণশীল। আর তাঁর এই জটিল layered মনস্তত্ত্বকে উপন্যাসটি যেভাবে ধরেছে—তা সত্যিই বিরল।
গদ্য যা নিজেই সিনেমার পর্দা হয়ে ওঠে
আমি একেবারে নির্লিপ্তভাবে বইটি খুলে পড়তে শুরু করেছিললাম। সিনেমা নিয়ে আমার আগ্রহ সীমিত, আর "পথের পাঁচালী" তেমন পছন্দ নয়। কিন্তু প্রথম পাতায় আগুনের বর্ণনা পড়েই আমি "হুকড" হয়ে যাই।
এই যে আমি, যার আগে সিনেমা ভালো লাগেনি, আমিও বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে সিনেমার দৃশ্য কল্পনা করতে করতে শেষে ইউটিউবে গিয়ে "পথের পাঁচালী" আবার চালিয়ে দিলাম। এটা কি কম কৃতিত্ব লেখকের?
এটা একপ্রকার reverse engineering of empathy—সাহিত্য এমন ভাবে ফিরে দেখে চলচ্চিত্রকে, যে পাঠকের নিজের চোখেই দৃশ্যগুলো নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
আলেখ্য শেষ, কিন্তু গল্প নয়
বইটির শেষ পাতায় এসে যেন পাঠকের মনে হয়—
"সাঙ্গ করি মনে হবে, ইটিসি ইটিসি…"
"শেষে এসে বুঝি সব সবে শুরু।"
এই যে দ্বিতীয় খণ্ডের জন্য অপেক্ষার বেদনা, এই যে "ওয়েব সিরিজীয় ঝুলিয়ে রাখার অভিমান", সেটাও তো আধুনিক পাঠ প্রতিক্রিয়ার এক প্রকার সার্থকতা।
অরিজিত গাঙ্গুলির লেখনী এখানেই তার আসল জাদু দেখায়। সে জানে কোথায় থামতে হয়, যেন পাঠকের মনে একটা ‘pause’ পড়ে—ঠিক যেমন Ray জানতেন এক ফ্রেমে কতখানি বলতে হয়, আর কতটা ফ্রেমের বাইরে রেখে যেতে হয়।
উপসংহার: সত্যজিতের গানে ছায়া পড়ে অরিজিতের ছন্দে
"Cinema’s characteristic forte is its ability to capture and communicate the intimacies of the human mind." — Ray again.
এই উপন্যাস আসলে এক ‘human mind’-এর অন্তর্জাত্রা। এক তরুণ লেখকের মনের ভিতরে এক প্রবীণ পরিচালক বসে রয়েছেন, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি ভঙ্গিমায়, প্রতিটি কুয়াশা-ঢাকা শটে। "মানিকের পাঁচালী" সেই অন্তর্মনস্কতার প্রতিফলন।
অবশেষে বলতেই হয়—
এই বই পাঠ মানে এক ধরণের সিনেমা দেখা।
এই সিনেমা মানে এক ধরণের আত্মজীবনী পড়া।
এই আত্মজীবনী মানে এক ধরণের রক্তমাংসের মহাকাব্য।
তাই বলব— "যদি কখনও সত্যজিতের জীবন দেখে একটুখানি সিনেমার স্বপ্ন তোমার চোখে খেলে যায়, তবে জেনো—এই বই ঠিক তোমার জন্যই লেখা হয়েছে।"