Jump to ratings and reviews
Rate this book

মানিকের পাঁচালী

Rate this book
পাঁচের দশকে এক স্বপ্নসন্ধানী নবীন পরিচালকের হাতে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী'। জীবনের বহু ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করেও এগিয়ে চলার রাস্তা তৈরি করেছিল যে অপু, তাকে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন বাঙালির প্রাণের মানুষ সত্যজিৎ রায়, রচিত হয়েছিল অপুর পাঁচালী। সেই কালজয়ী সৃষ্টির জনককে আজও আমরা নতুন নতুন রূপে আবিষ্কার করে চলেছি তাঁরই অজস্র শিল্পকর্মের মধ্যে দিয়ে। সেই মহাজীবনকে এক উপন্যাসের মোড়কে উপস্থাপিত করা হলো এই বইতে।

এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মানিক। তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা, তাঁর চিন্তাভাবনা, দৈনন্দিন অভ্যাস, সাফল্য ও ব্যর্থতার আখ্যানের সঙ্গে এতে জুড়ে গেছে সমকালীন বাংলা ও ইউরোপের চিত্রপট। পাশাপাশি এক সমান্তরাল সময়রেখায় ফুটে উঠেছে তাঁর সৃষ্টিকে পুনরুদ্ধার করার এক অকল্পনীয় প্রয়াস। এই দুই সময়ের মেলবন্ধনে রচিত হলো 'মানিকের পাঁচালী'।

324 pages, Hardcover

First published April 1, 2021

62 people want to read

About the author

Arijit Ganguly

3 books31 followers

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
12 (60%)
4 stars
5 (25%)
3 stars
3 (15%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 9 of 9 reviews
Profile Image for Zaima Hamid Zoa .
64 reviews58 followers
May 23, 2021
সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে লেখা, তাও আবার তাঁর জীবনাশ্রয়ী উপন্যাস- শুনেই কেমন লোভ লেগে গেছিল। তাই তো প্রথম সুযোগেই বগলদাবা করে নিয়ে এসেছিলাম। সত্যজিৎ রায়ের বিভিন্ন বয়সের স্কেচ আঁকা প্রচ্ছদটা প্রথম দেখাতেই খুব টানলো। প্রথমে ভেবেছিলাম বোধকরি উনার পুরো জীবনটাকে কেন্দ্র করে লেখা উপন্যাস। ফ্ল্যাপ উল্টে সে ভুল ভাঙলো। ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত উনার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা অর্থাৎ পথের পাঁচালী নির্মাণের সময় থেকে শুরু করে অপরাজিত ছবির আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্তি'র ঘটনার সময়কাল পর্যন্ত এই বইটায় স্থান পেয়েছে।

সত্যি কথা বলতে সত্যজিতের জীবনাশ্রয়ী উপন্যাস নিয়ে বেশ খানিকটা আশা ছিল। বলা বাহুল্য সেই আশা পূর্ণ হয়নি। তবে এটা বলতেই হবে যে সত্যজিতের নিজের লেখা এবং সত্যজিৎকে নিয়ে লেখা অন্যান্যদের লেখা, বিশেষ করে বিজয়া রায়ের আমাদের কথা পড়ে ব্যক্তি সত্যজিৎ সম্পর্কে যে একটা ধারনা হয়েছে সেটা খুব সুন্দর করেই ফুটে উঠেছে এই বইটায়। আর তার সাথে বইয়ের মাঝে মাঝেই কাহিনীর সাথে সম্পর্কিত যেই হাতে আঁকা স্কেচগুলো স্থান করে নিয়েছে, সেগুলো ছিল উপরি পাওনা, পড়ার আনন্দটাকেই যেন দ্বিগুণ করে দিয়েছে। একদম যেন সত্যজিতের নিজের বইগুলোর মত।

বইটার শুরুর দিকে ন্যারেটিভ খানিক কাঁচা লাগলেও পরবর্তীতে বেশ কিছু জায়গা পড়বার সময় খুব ভালো লেগেছে। যেমন ছবি পরিচালনার অংশগুলো পড়তে যেয়ে একদম গায়ে কাঁটা দিয়েছে। সেই সাথে বেশ কিছু ডায়লগ এবং মনোলগ খুব ন্যাকা লেগেছে; বিশেষ করে পরিবারের মানুষদের সাথে সত্যজিতের কথোপকথনের অংশগুলো আর শেষদিকে ডেভিডের সাথে তার বাবার পুরো আলাপচারিতার অংশটুকু। তবে এও সম্ভব যে, এমন আমার একার-ই মনে হচ্ছে যেহেতু আমি ব্যক্তিজীবনে খুব একটা রোম্যান্টিক না।

বইয়ের যে জায়গাগুলো খুব চোখে লেগেছে, তার মাঝে একটা হল সন্দীপ রায়ের বয়স যখন তিনের মত, তখন কিন্ত তার মুখে "মাকে ম্যানেজ করে নেব" কথাটা বড্ড বেমানান। মৃণাল সেনের সাথেও ওই তিন বছর বয়সে যে কথোপকথনের দৃশ্য ছিল তাতেও কিন্ত এত পরিষ্কার কথা বলতে পারার কথা নয়। কারণ এই বয়সটাই আধো আধো বুলিতে কথা বলার। তাই এই বিষয়টা খুব অবাস্তব লেগেছে। বইটাতে এক জায়গায় রুমা ঘোষ (পরবর্তীতে রুমা গুহ ঠাকুরতা) কে পরিচয় করানো হয়েছে বিজয়া রায়ের বোন হিসেবে। কিন্ত বাস্তবে তিনি ছিলেন বিজয়া রায়ের বোনঝি, তাঁর সবচাইতে বড় বোনের মেয়ে। যদিও বইটিতে সত্যের সাথে কল্পনার মিশেল ঘটেছে, তারপরেও আমার মনে হয়েছে যে এই জিনিসটা লেখক অন্তত অপরিবর্তিত রাখতে পারতেন।

আমি জানি না এটাই লেখকের প্রথম প্রকাশিত লেখা কি না, তবে লেখকের পরবর্তী লেখাগুলোতে আরও পরিপক্বতা দেখতে পারলে খুব ভালো লাগবে। বইটা কলেবরে আরও খানিক বড় হলে মন্দ লাগত না, তবে যেখানে শেষ হয়েছে তা নিয়েও কোন ক্ষোভ নেই। লেখকের পরবর্তী লেখাগুলোর জন্যে শুভকামনা।
Profile Image for Riju Ganguly.
Author 24 books1,868 followers
May 14, 2022
বাংলায় ফিকশনলাইজড বায়োগ্রাফি তথা জীবনাশ্রয়ী উপন্যাস খুব একটা বিরল নয়। এই ধারায় সাগরময় ঘোষের "একটি পেরেকের কাহিনি" কিংবদন্তি হয়ে আছে। সেভাবেই, আমাদের প্রজন্মের পাঠকমাত্রেই বিনোদ ঘোষালের "কে বাজায় বাঁশি"-র কথা জানবেন।
কিন্তু সত্যজিৎ রায় তথা তাঁর জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বছর তথা কাজ নিয়ে উপন্যাস?
এমন একটি প্রয়াস যে শুধু দুরূহ নয়, বিপজ্জনকও বটে— এটুকু আমরাও বুঝি। এতে একদিকে আছে 'ঠাকুরপুজো'-র ধাঁচে স্তুতিবাক্যের আধিক্যে লেখাকে একপেশে করে ফেলার সম্ভাবনা। অন্যদিকে আছে নির্মোহ লেখনীর দ্বারা উন্মত্ত ভক্ত ও স্তাবকদের বিদ্বেষের শিকার হওয়ার রাস্তা।
আরে বাবা, মানুষটা যে সত্যজিৎ রায়!
আর কাজগুলো যে "পথের পাঁচালী" আর "অপরাজিত"!
এ আমাদের তথা বাংলা সাহিত্যের সৌভাগ্য যে নবীন লেখক অরিজিৎ এই "মুশকিল হি নহিঁ, নামুমকিন" গোছের কাজটিকে অসামান্য দক্ষতায় সেরেছেন।
অসরলরৈখিক একটি কাঠামো অনুসরণ করে সাজানো হয়েছে সম্পূর্ণ লেখাটি। তাও যদি ভাঙি তাহলে জিনিসটা অনেকটা এ-রকম হয়~
১. ১৯৯৩: এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড এবং সর্বনাশের ইঙ্গিত;
২. গল্পের শুরু— স্বপ্নের উড়ান;
৩. লড়াই— ঘরে ও বাইরে;
৪. প্রথম জয়: পথের পাঁচালী;
৫. বন্ধুর পথ ও বব্ধুদের প্রত্যাশা;
৬. দ্বিতীয়, কঠিনতর কাজ: অপরাজিত;
৭. একজন পরশপাথর: পরশ পাথর;
৮. অন্যরকম ছবি: জলসাঘর;
৯. ২০১৫: ফিনিক্সের উত্থান!
১০. সত্যিই অপরাজিত!
এই উপন্যাস যেখানে থেমেছে, তার পরেও রে-তে আরও অনেকভাবে উদ্ভাসিত হবে গোটা দুনিয়া। আরও বহু সাফল্য, ব্যর্থতা, বিতর্ক আর প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবেন দীর্ঘদেহী মানুষটি— যাঁকে ঈর্ষায়, ক্ষোভে, আর শ্রদ্ধায় "ওরিয়েন্ট লংম্যান"-ও বলেছেন অনেকে।
তবে তাঁর পরিচালক-জীবনের ভোর এই ক'টা বছরই। আর এ-কথা কে না জানে যে "মর্নিং শোজ দ্য ডে!"
বইটির মধ্যে কোনো তথ্যগত ভ্রান্তি আছে কি না, সে বিষয়ে অন্তিম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বিশেষজ্ঞরা। আমার সীমিত জ্ঞানে তেমন কিছু চোখে পড়েনি।
ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অলংকরণ আর সামগ্রিক মুদ্রণ-পারিপাট্য বইটির সম্মান বৃদ্ধি করেছে।
তবে এই বইয়ের আসল নায়ক দু'জন: সত্যজিৎ রায় আর অরিজিতের লেখনী। অসম্ভব সাবলীল ও সপ্রাণ ভঙ্গিতে প্রসঙ্গের পর প্রসঙ্গ এসেছে এখানে। একের পর এক চরিত্র উঠে এসেছেন ইতিহাসের পাতা থেকে। আমরা তাঁদের দেখেছি, শুনেছি, ক্ষোভ বা মুগ্ধতা নিয়ে তাঁদের উদ্দেশে কথাও বলেছি। তারপর, ঠিক ফেড-ইন, ফেড-আউট চক্র মেনে তাঁদের জায়গায় দেখা দিয়েছে নতুন স্থান-কাল-পাত্র।
আমরা একমনে, দুলে-দুলে পড়ে ফেলেছি এই পাঁচালী।
বাঙালি ফুলের মালা আত ধূপের ধোঁয়ায় রক্তমাংসের মানুষকে ঢেকে ফেলতে বড্ড বেশি পছন্দ করে। সত্যজিতের ক্ষেত্রেও সেটাই হচ্ছে। বাংলার সাম্প্রতিকতম 'ঠাকুর' হিসেবেই তিনি ইদানীং তাঁর স্তাবকদের দ্বারা পূজিত হন। সেই পটভূমিতেই এই বই সহজ অথচ তথ্যনিষ্ঠ ভঙ্গিতে মানুষটির দুর্বলতা, স্বপ্ন, লড়াই, আর সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেছে। সত্যজিতের শতবর্ষ অতিক্রান্ত। নবীন পরিচালকেরা যদি এই বইটি পড়ে মানুষটির সেই শুরুর বছরগুলোর কথা জেনে কিছুটা উদ্বুদ্ধ হন আর নতুন করে স্বপ্ন দেখেন, তাহলে সেটাই হবে এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো সাফল্য।
ইতিমধ্যে, যদি সত্যজিতের জীবনের এই "সত্যি-হলেও-গল্পের মতো" বছরগুলোর নাগাল পেতে চান, তাহলে এই বইয়ের চেয়ে ভালো বিকল্প আর নেই।
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,294 reviews399 followers
July 7, 2025
"মানিকের পাঁচালী": ক্যামেরার পিছনে এক আত্মার স্বপ্নপথ

"The director is the only person who knows what the film is about." — Satyajit Ray

একটি বই কি কখনও সিনেমা হয়ে উঠতে পারে? অথবা উল্টোটা? বাংলা সাহিত্যের সাম্প্রতিকতম অনন্য সংযোজন "মানিকের পাঁচালী" পড়তে গিয়ে ঠিক এই প্রশ্নটাই বারবার মাথায় ঘুরেছে। অরিজিৎ গাঙ্গুলির এই উপন্যাস সিনেমার নির্মাণকে কেবল বিষয় করে না, সে হয়ে ওঠে এক নির্মিত আত্মজীবনীচিত্র, এক ছায়ার জার্নাল, এক পথের পাঁচালী অবলম্বনে লেখা উপন্যাসিক অপেরা।

কিন্তু শুধু তথ্যনিষ্ঠতা দিয়ে কি সত্যজিৎ রায়ের মতো এক মহাকাব্যিক সত্তাকে আঁকা যায়?

না।

এই বইয়ের অনন্যতা সেখানেই যে এটি তথ্যের পাটিগণিত থেকে বেরিয়ে এ��ে কল্পনার বীজতলায় সত্যজিতের শুরুর বছরগুলোকে এমনভাবে তুলে ধরে, যাতে পাঠক একইসঙ্গে হন দর্শক, শ্রোতা এবং চরিত্র। একটানা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মনে হয়—বই নয়, এক ‘স্ক্রিপ্টেড রিয়ালিটি শো’ দেখছি। আবার কোথাও মনে হয়—এ যেন নিজের ঘরের ভিতরেই একটা অডিশন চলছে। অডিশনে আমরা সবাই—পাঠক, লেখক, সমালোচক—অপুর ভূমিকায়!

প্রথম দৃশ্য: আগুন ও প্রতীক

১৯৯৩-এর সেই বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড, যা সত্যজিৎ রায়ের বহু প্রিন্ট-নেগেটিভকে ধ্বংস করেছিল, বইয়ের প্রথম পাতাতেই আমাদের মুখোমুখি করে দেয় "চিরদিনের মতো হারিয়ে যাওয়া এক মহারাজ্যের স্মৃতি"-র সঙ্গে। শুরুতেই লেখক যেন পাঠকের গালে আলতো করে একটা চড় মারেন—"এ তো শুধু বই নয়, এ তো ধ্বংসের বেদনা থেকে জন্ম নেওয়া পুনর্জন্ম!"

তাহলে কি এটা পুনর্জন্মকথা? হ্যাঁ, এক অর্থে। কিন্তু এটি সেই রকম পুনর্জন্ম নয় যা অলৌকিকতায় বিশ্বাস করে। বরং এটি একটি ইন্টেলেকচুয়াল রিবার্থ—ফেলুদার ভাষায়, একেবারে "cerebral"!

রূপকথা নয়, রূপচিত্র

"মানিকের পাঁচালী"র কাঠামো একটা শ্লোকের মতো। অলঙ্কার আছে, অনুষঙ্গ আছে, প্রতীক আছে, কিন্তু অভিনয় নেই।

লেখক যেখানে কল্পনা করেছেন, সেখানে নিজেই সাবধান করে দিয়েছেন—“এটি আমার অনুমান”, বা “গল্পের গতি বজায় রাখতেই এই বিন্যাস।” ফলে পুরো বইটা এক সতর্কতা আর প্রেমের আশ্চর্য সাম্যবানে গাঁথা।

রায়সাহেবের জানালায় প্যাঁচার বসে থাকা হোক, কিংবা বিলাপের মুহূর্তে তারসানাইয়ের সুর মিশিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত—সবই এসেছে বহু সন্ধানী প্রশ্ন, বহু পাতা ঘেঁটে খুঁজে পাওয়া তথ্য আর সেই তথ্যকে প্রাণবন্ত করে তোলার "মুক্তিমন্ত্র"-এর মতো লেখনীর ফসল হিসেবে।

একটা উদাহরণ দিই—

“তিন দিনের বেশি প্যাঁচাকে জানালায় বসার সুযোগ দিইনি, কারণ তারপরই আসে সেই সুখবর, বেলা দেবী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছেন।”

এই রকম সূক্ষ্ম পরিকল্পনা না থাকলে একটা বই কখনও সিনেমার মেজাজ নিতে পারে না।

সিনেমা মানে শুধু টেকনিক নয়, টেনশনও

আমাদের সমাজে সিনেমার প্রতি দুটো ধরণ স্পষ্ট—একদল মানুষ তাকে শিল্প বলেন, আরেকদল বিনোদন। কিন্তু সত্যজিৎ যে ভেতরে ভেতরে একজন “ফিলোসফার অফ দ্য FRAME”, সেটা এই বই না পড়লে বোঝা মুশকিল।

রাম হালদারের বইয়ের সূত্র ধরে শান্তিবাবুর সেই বিখ্যাত চুম্বন ও তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া—"আমরা তো এদেশে মানুষ হয়েছি তো, এরকমভাবে চুমু খেতে কোনোদিনই পারব না।”—এই একটা লাইনই বলে দেয়, Ray ছিলেন simultaneously আধুনিক এবং সঙ্কুচিত, সাহসী ও রক্ষণশীল। আর তাঁর এই জটিল layered মনস্তত্ত্বকে উপন্যাসটি যেভাবে ধরেছে—তা সত্যিই বিরল।

গদ্য যা নিজেই সিনেমার পর্দা হয়ে ওঠে

আমি একেবারে নির্লিপ্তভাবে বইটি খুলে পড়তে শুরু করেছিললাম। সিনেমা নিয়ে আমার আগ্রহ সীমিত, আর "পথের পাঁচালী" তেমন পছন্দ নয়। কিন্তু প্রথম পাতায় আগুনের বর্ণনা পড়েই আমি "হুকড" হয়ে যাই।

এই যে আমি, যার আগে সিনেমা ভালো লাগেনি, আমিও বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে সিনেমার দৃশ্য কল্পনা করতে করতে শেষে ইউটিউবে গিয়ে "পথের পাঁচালী" আবার চালিয়ে দিলাম। এটা কি কম কৃতিত্ব লেখকের?

এটা একপ্রকার reverse engineering of empathy—সাহিত্য এমন ভাবে ফিরে দেখে চলচ্চিত্রকে, যে পাঠকের নিজের চোখেই দৃশ্যগুলো নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

আলেখ্য শেষ, কিন্তু গল্প নয়

বইটির শেষ পাতায় এসে যেন পাঠকের মনে হয়—

"সাঙ্গ করি মনে হবে, ইটিসি ইটিসি…"
"শেষে এসে বুঝি সব সবে শুরু।"

এই যে দ্বিতীয় খণ্ডের জন্য অপেক্ষার বেদনা, এই যে "ওয়েব সিরিজীয় ঝুলিয়ে রাখার অভিমান", সেটাও তো আধুনিক পাঠ প্রতিক্রিয়ার এক প্রকার সার্থকতা।

অরিজিত গাঙ্গুলির লেখনী এখানেই তার আসল জাদু দেখায়। সে জানে কোথায় থামতে হয়, যেন পাঠকের মনে একটা ‘pause’ পড়ে—ঠিক যেমন Ray জানতেন এক ফ্রেমে কতখানি বলতে হয়, আর কতটা ফ্রেমের বাইরে রেখে যেতে হয়।

উপসংহার: সত্যজিতের গানে ছায়া পড়ে অরিজিতের ছন্দে

"Cinema’s characteristic forte is its ability to capture and communicate the intimacies of the human mind." — Ray again.

এই উপন্যাস আসলে এক ‘human mind’-এর অন্তর্জাত্রা। এক তরুণ লেখকের মনের ভিতরে এক প্রবীণ পরিচালক বসে রয়েছেন, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি ভঙ্গিমায়, প্রতিটি কুয়াশা-ঢাকা শটে। "মানিকের পাঁচালী" সেই অন্তর্মনস্কতার প্রতিফলন।

অবশেষে বলতেই হয়—

এই বই পাঠ মানে এক ধরণের সিনেমা দেখা।
এই সিনেমা মানে এক ধরণের আত্মজীবনী পড়া।
এই আত্মজীবনী মানে এক ধরণের রক্তমাংসের মহাকাব্য।

তাই বলব— "যদি কখনও সত্যজিতের জীবন দেখে একটুখানি সিনেমার স্বপ্ন তোমার চোখে খেলে যায়, তবে জেনো—এই বই ঠিক তোমার জন্যই লেখা হয়েছে।"
Profile Image for Chinmoy Biswas.
175 reviews64 followers
May 30, 2022
একজন নতুন লোক সিনেমা বানাতে চান। যার সিনেমা বানানো সম্পর্কে পূর্ব কোন অভিজ্ঞতা নেই। তার উপর সিনেমা বানানোর জন্য যে গল্পটি ঠিক করেছেন,সেটিও বেশ অদ্ভুত। গল্পের মধ্যে কোন নাচা গানা কিস্যু নেই। তাই এই সিনেমার পিছনে লগ্নি করতে কেউ আগ্রহী না। যার কারণে নতুন পরিচালক কোন প্রয়োজক পাচ্ছেন না। কিন্তু এতে দমে যাওয়ার পাত্র সে নয়। নিজের দামী কয়েকটা স্কেচবুক আর স্ত্রী'র গয়না বিক্রি করে সামান্য কিছু টাকার ব্যবস্থা করলেন। সেই টাকা দিয়ে শুরু হলো ছবি বানানোর কাজ।

এই পরিচালকের চাহিদা আবার ভিন্ন, তিনি প্রফেশনাল কোন অভিনেতা দিয়ে তার ছবিতে অভিনয় করাতে চান না। তিনি চান নতুন লোক দিয়ে কাজ করাতে। তাই ছবির অভিনয় শিল্পীদের খুঁজে পেতে বেশ কষ্ট হয়েছে। তা যাই হোক,অভিনয় শিল্পীদের খুঁজে পেয়ে নতুন উদ্যোমে শুরু হলো ছবি বানানোর কাজ। কিন্তু টাকার কারণে বেশি দূর এগোনো গেল না। তবে যতটুকু বানানো হয়েছে সেটুকু দেখিয়ে অনেক জনের থেকে টাকার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হয়েছে,অনেকেই ফিরিয়ে দিলে ও অবশেষে সরকার থেকে একটা ফান্ড পেল। সেই টাকা থেকে নির্মিত হলো চলচ্চিত্র "পথের পাঁচালি "। প্রথম বারেই সে কান জয় করে ফেলল। এরপর দেশে মুক্তি পেল, সেখানেও দেশের মানুষ অগুনতি প্রশংসা কুড়ালো। সেই বিখ্যাত ছবির পরিচালক ছিলেন সত্যজিৎ রায় ওরফে মানিক। সেই থেকে শুরু মানিকের জয়যাত্রা। সেই জয়যাত্রার শুরুদিকের গল্প লেখা হয়েছে " মানিকের পাঁচালি " বইটিতে।

বইটা আমার দারুণ লেগেছে। লেখক বইটির পিছনে অনেক পরিশ্রম করেছেন,তার সাক্ষী বইয়ের পাতা। দারুণ কাজ হয়েছে এটা। পড়ে খুবই বিস্মিত হয়েছি। মনে হয়েছে প্রত্যকটি ঘটনা চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করছি। সত্যজিৎ রায় কে নিয়ে এরকম উপন্যাস কেউ বোধ করি লেখেনি আগে। যারা সত্যজিৎ ভক্ত আছেন আমার মতো,তারা একবারট্টি হাতে নিয়ে দেখতে পারেন। আমি নিশ্চিত মন্দ লাগবে না।
Profile Image for Saima  Taher  Shovon.
529 reviews195 followers
July 4, 2022
যারা সাদাকালোর যুগে কাজ করতেন তাদের শ্রদ্ধা করি। রঙ অনেক কিছু প্রকাশ করে ফেলে।আমার মতে রঙের আলাদা ভাষা আছে। সাদাকালোর জগত আমার অচেনা। বেশি কিছু দেখা হয়নি। তবে যা হয়েছে, তাতে সত্যজিতের পরিচালিত পথের পাঁচালী আছে, পুরো অপুত্রয়ী-ই আছে। তবে এক সিনেমা বারবার দেখাকে যদি গোণায় ধরা হয়, তবে আমি অনেক দেখেছি। সাদাকালোর জগত অচেনা বলছি কারণ এর মর্ম আমি বুঝিনা,এতে নতুন পুরাতনের কাজ কী,কেনোই বা বংশী এতো কষ্ট করে সেটের কাজ করতেন,সর্বজয়ার ঘরের দোয়ার পুরাতন করতে চেয়েছিলেন এসব বুঝিনা। তবে এসব যার মাথায় এসেছিলো,ওই মানুষটি যে একজন অসাধারণ প্রতিভার মানুষ, শ্রদ্ধার মানুষ সেটা জানি। এই গল্প মানিকের গল্প। এই বই সবার কাছে মায়ের মানিকের সত্যজিৎ হয়ে উঠার গল্প।

সত্যিকে গল্প বানানো সহজ কি জানি। তবে নন-ফিকশনের গল্পকে যে লেখক পুরোদস্তুর ফিকশন বানিয়ে ফেলেছেন,এইজন্য তার বাহবা পাওয়া উচিত। কিন্তু তাকে বাহবা দেয়া যায় তার শব্দ সাজানোর জন্য।

পথের পাঁচালী এমন একটি উপন্যাস যেটা আমি বছরে ৬-৭ বার পড়ি। গ্রামের বাড়িতে এককপি,শহরের বাড়িতে এক কপি রেখেছি, যাতে করে পড়ার ইচ্ছে হলেই পড়তে পারি। সত্যজিৎকে নিয়েও এক রকম অন্ধ মুগ্ধতা কাজ করে,ফলে আমার পড়া এই বইগুলোর প্রতিটি শব্দ তিনিও পড়েছেন এ ভেবেই অনেক খুশি লাগে। যা-হোক পথের পাঁচালী পর্দার গল্প হলো কীভাবে,মানিকের স্বপ্ন,শুরু - এসব দিয়ে মানিকের পাঁচালী শুরু। আর থেমেছে ঠিক অপু ট্রিলজির ৩য় সিনেমা যে হবে,তার ঘোষণার সাথে। পুরোটাই সুখপাঠ্য। তবে ৫তারা হলো না কেনো আমার জন্য? বড় বেলার সন্দীপকে ঠিক ভাবে টেনে নিতে পারেননি মনে হলো।
Profile Image for Shotabdi.
824 reviews202 followers
October 10, 2025
সত্যজিৎ এর মতো বিশাল কর্মময় জীবনে দুখণ্ডে যে ধরা যাবে না এটা আগেই বুঝেছিলাম। সত্যজিৎ এর জীবনভিত্তিক হলেও এটার ব্যাপ্তি কেবল অপরাজিত এর গোল্ডেন লায়ন জেতা পর্যন্ত৷ আর বর্তমানের কিছু কিছু অংশ আছে।
সত্যজিৎকে নিয়ে পড়তে সবসময়ই ভালো লাগে। লেখার হাত ভালো হওয়ায়, পড়ার সময় মনে হচ্ছিল আমিও অদৃশ্য হয়ে প্রতিটা দৃশ্য অবলোকন করছি।
সুন্দর একটা জার্নি।
1 review
June 9, 2021
সত্যজিতের শতবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত বেশ কিছু পত্রিকা/বই হাতে পেলেও, অরিজিতের 'মানিকের পাঁচালী' পড়ার ইচ্ছে একটু বেশিই ছিল - কারণ অবশ্যই বই এর প্রেক্ষাপট। পথের পাঁচালী বা অপরাজিত-র শুটিং এর কিছু ঘটনা জানা থাকলেও তা খুবই সীমিত। তাই ঠিক করেছিলাম যে ২-রা মে ই হোক শুভসূচনা। অগত্যা বইটি কেনা এবং পড়তে শুরু করা। বইটা শেষ করেই অরিজিৎ-কে বই-সম্পর্কিত উপলব্ধি জানাবার ইচ্ছে হল আর সেই জন্যই এই লেখা। তাই এই লেখাটি typical Book-review বা বই এর detail technical analysis নয় (আমি এ-কাজে অক্ষম) ।

প্রথমেই যে ভালোলাগা পড়তে গিয়ে অনুভব করি, তা হল - দুটো আলাদা সময়কালকে গল্পের (গল্প নয়, সত্য ঘটনা) স্রোতের সাথে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এতে গল্পের flow নষ্ট হয়নি। তবে আমার কাছে বইটির মূল আকর্ষণ - সত্যজিতের মতো towering genius- এর career-এর শুরুর দিকের struggle, কাজের প্রতি passion, compromise না করে শিল্পকলার honest execution এবং সাফল্য - এ সবই melodramatic বা অতিরঞ্জিত না করে পাশের বাড়ির একটি মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের সাধারণ জীবনযাপনের আঙ্গিকে দেখা। তাই সারা বই জুড়েই পাঠকের কাছে সত্যজিৎ, মানিক হয়েই উপস্থিত থাকে, কখনোই 'The great Ray' হিসেবে নয়। আর এই সারল্যই রায় পরিবারের signature। তাই সত্যজিৎ এর শতবর্ষে রায় পরিবারের প্রতি এই বই একটি যথোপযুক্ত নিবেদন ও বটে।

বইটির আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল সত্যজিৎ এর শুটিং unit এর বংশী বাবু, সুব্রত বাবু, অলোকনাথ দে-র বিস্ময়কর প্রতিভার টুকরো টুকরো নিদর্শন। এনাদের শিল্পকলার প্রশংসা মানিকের মুখে শুনতে বেশ লাগে।
এছাড়াও সত্যজিৎ এর মা, স্ত্রী ও সন্তান এর সাথে কিছু মুহুর্ত, একই studio তে ঋত্বিক ঘটকের কাজ, অপরাজিত নিয়ে মৃণাল সেন এর সাথে সন্দীপ রায়ের discussion সত্যজিৎ-প্রেমী দের আবেগতাড়িত করবেই।

ফুল দিয়ে যে ভাবে মালা গাঁথা হয়, সেভাবেই ছোট ছোট মুহুর্ত দিয়ে বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়কে বই এর ছোট্ট পরিসরে গেঁথে রাখার প্রয়াস কে স্বগত।

Cover page খুব সুন্দর আর painting গুলোও। তবে আঁকার খুটিনাটি কিছুই বুঝিনা, তাই better not to comment 😌.

Well done Arijit 👍.
Profile Image for Titas Karak.
1 review1 follower
June 7, 2021
মানিকের পাঁচালী , মানিকের মতই স্নিগ্ধ এবং উজ্জ্বল। সত্যজিতের জীবনাশ্রয়ী এই উপন্যাসের ফিকশনাল আর ননফিকশনাল মিশ্রণটাই ইউএসপি। ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে পরশপাথরের শুটিং কাহিনী,সন্তোষ দত্তের সাথে পরিচয়,জলসাঘরের লোকেশন-সমাপতন প্রসঙ্গ,এবং টিনটোরেটোর যীশুর গল্প। শুষ্ক গবেষণা ধর্মী লেখার চেয়ে সাধারণ মানুষের মনের অনেক কাছে পৌঁছে যায় এই উপন্যাস। যদিও সময় পরিসর ১৯৫০-১৯৫৭, চাইব সত্যজিৎ রায়ের পুরো জীবনটাই এইভাবে প্রকাশিত হোক।বহুমাত্রিক সত্যজিতের বিভিন্ন সত্তার উদ্ভাস দেখতে চাই পরবর্তী খন্ডে।
Displaying 1 - 9 of 9 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.