"আপনার গল্প যতই গাঁজাখুরি হোক না কেন, স্রেফ মশলা আর পরিপাকের জোরে শুধু যে উতরে যায় তা নয়, রীতিমতো উপাদেয় হয়।"
কথাটা আমি বলছি না। বলছে, ফেলুদা। জটায়ু রচিত 'অতলান্তিক আতঙ্ক' পড়ে লালমোহনবাবুর প্রতি ফেলুদার এই অমোঘ উক্তি। অবশ্য আপনি যদি চান তবে হেমেন রায়ের উদ্দেশ্যেও এই জিনিস নির্দ্বিধায় ব্যাবহার করতে পারেন। দিনের শেষে, উনিও তো কম-বেশি একই দোষে দুষ্ট। সরল, রোমাঞ্চকর, পাল্প ফিকশন যা প্রমোদক কিন্তু কুরুচিপূর্ন নয়। যার থেকে পেলেও পেতে পারেন চিন্তার খোরাক।
মানুষটি তাই এক অলীক দৃষ্টান্ত। বাংলা ও বাঙালির কিশোর সাহিত্যের নিরিখে তো বটেই, স্বাধীনতা পূর্ব-ভারতের সাথে পশ্চিমা সাহিত্যের এক যোগসূত্র হিসেবেও তার পরোক্ষ অবদান আলোচনা-যোগ্য। বলতে লজ্জা নেই, ওনাকে এক সময় বিস্তর দুষেছি। "ছ্যা! সেই তো বিদেশি গপ্পো টুকে লিখতেন" জাতীয় বাক্যালাপেও অংশগ্রহণ করেছি। বয়সের দোষেই হোক বা বিনা লাইসেন্সের পরিপক্কতা হেতু, শৈশব থাকতে শৈশব হারাতে বসেছিলাম বেশ কয়েকবার।
যুগের প্রকোপ, আর কি। আজকালকার ছেলেমেয়েদের কাছে 'যখের ধন' বলতে, যদি স্রেফ পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের সিনেমা বোঝায়, তাহলেও খুব একটা আশ্চর্য হবো না। যেই মন সর্বদা অন্তর্জালে ব্যাস্ত; সেই মনে, রেলিক-সম হেমেন্দ্রকুমার রায়ের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু, কে জানে। আমি অবশ্য ভালো লাগা এবং না-লাগার মাঝে দাড়িয়েই, সমগ্রখানি পড়ে ফেললাম। কেনা ছিল অনেকদিন। এবারে কদিনের ছুটিতে, একটা বড়োসড়ো কমিটমেন্টের খোঁজে 'বেড়িয়ে এলাম' দিন সাতেক।
প্রতিক্রিয়া যথারীতি মিশ্র। বইতে সব মিলিয়ে গল্প, দশটি। ন'খানা উপন্যাস, একটি ছোট গল্প। যথাক্রমে -
১) যকের ধন
২) অসম্ভবের দেশে
৩) নীল সায়রের অচিনপুরে
৪) জেরিণার কণ্ঠহার
৫) সুন্দরবনের রক্তপাগল
৬) কুমারের বাঘা গোয়েন্দা
৭) গুহাবাসী বিভীষণ
৮) মেঘদূতের মর্ত্তে আগমন
৯) ময়নামতীর মায়াকানন
১০) যক্ষপতির রত্নপুরী
বইটি শুরু হচ্ছে সেই আইকনিক 'যখের ধন' দিয়েই। অনেকবারের পড়া গল্প। মড়ার মাথায় গুপ্ত সংকেত, করালী ও তার দলবল, খাসিয়া পাহাড়, অভিশপ্ত গুপ্তধন! চিরন্তন কিশোর ক্লাসিক, যা কোনোকালেই পুরনো হওয়ার নয়। এই গল্পেই লেখক বিমল-কুমার সিরিজের প্রাথমিক ধাঁচটা ছকে ফেলেছিলেন। সঙ্গী হিসেবে বেয়াড়া রামহরি, ও তার স্বাদু হাতের ভেলকি এবং অসীম সাহসী দিশি কুকুর বাঘা!
দারুণ ছন্দে বইটি শুরু করলাম বটে, তবে বিপত্তি ঘটল পরক্ষনেই। বইতে দ্বিতীয় উপন্যাস হিসেবে রাখা হয়েছে, 'অসম্ভবের দেশে'-কে। এখানে, বিমল ও কুমার পার্শ্বচরিত্র হিসেবে পাশে পায়, বিজ্ঞানী বিনয় বাবু এবং তার সহকারী কমলকে। রীতিমত হকচকিয়ে গেলাম। এরা আবার কারা? উত্তর মিলল ভাসা-ভাসা। পড়তে গিয়ে বুঝলাম, এ জিনিস অনেক পরের গল্প। বিমলের মুখে, "মঙ্গলগ্রহে, ময়নামতীর মায়াকাননে, আসাম আর আফ্রিকার বনেজঙ্গলে, সুন্দরবনে অমাবস্যার রাতে আর হিমালয়ের দানবপুরীতে অনেক অসম্ভব রহস্যই আমরা দেখলুম!" শুনে আর বুঝতে বাকি রয় না, ক্রনোলোজির কাঁচা গলদ।
ওয়েলসের 'ফুড অব দ্যা গডস...'(নাকি 'ডক্টর মরৌ'?) ঘেঁষা এই বঙ্গিকৃত গল্পটি এমনিতেও বেজায় দুর্বল। সব মিলিয়ে, কতকটা ছন্দপতনই বটে। ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে না-পসন্দ গল্প এইটি।
তবুও, এগিয়ে যেতে হয়। কিন্তু কাঁটাতার স্বরূপ বারংবার মাথাচাড়া দেয় সেই খারাপ সম্পাদনা। সমুদ্র বসু, রেপুটেড গবেষক। পেছনের ফ্ল্যাপে, তার সম্পাদক-পরিচিতির সাইজ, সামনের ফ্ল্যাপের হেমেন রায়ের পরিচিতি থেকেও বড়। তার কাছ থেকে এমন অগোছালো কাজের নিদর্শন, অকল্পনীয়। প্রকাশকের দাবি মানতেই কি 'আবার যখের ধন'-কে দ্বিতীয় খন্ডের জন্য সরিয়ে রাখা? যাতে পরবর্তী খন্ডের গ্রহণযোগ্যতা কমে না যায়?
এদিকে বিমল-কুমার দুটোতে মিলে, এক গল্পে আরেক গল্পের উল্লেখ করে যায় ক্রমাগত। আর সম্পাদনার ত্রুটিতে পাঠক হিসেবে আমরা সমস্ত রেফারেন্স ধরতে পারি না। এতে উপন্যাসগুলোর উপভোগ্যতা মার খায়। নিদেনপক্ষে, তারকা চিন্হ সদ্ব্যবহারে একটা দুটো টীকা সংযোজন করা কি খুব মুশকিল ছিল? দেব সাহিত্য কুটিরের বই পড়তে বসে, পাঁচ-ছয়টি টাইপো পাওয়া প্রত্যাশিত, তবে এরূপ অভিজ্ঞতা সত্যিই বিস্ময়কর।
মানছি, হেমেন্দ্রকুমার রায়ের উপন্যাসগুলোর, বই হিসেবে প্রথম প্রকাশের সঠিক তথ্য পাওয়া কার্যত অসম্ভব। তবে উপন্যাসগুলোকে বিষয়গত বিভাজনে ভাগ করলেই ব্যাপারটা অনেকটা মসৃণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, গুপ্তধন-মূলক অভিযান (যখের ধন, যক্ষপতির রত্নপুরি), কল্পবিজ্ঞান/ফ্যান্টাসি অভিযান (মেঘদূতের মর্ত্তে আগমন, ময়নামতীর মায়াকানন, অসম্ভবের দেশে, নীল সায়রের অচিনপুরে), অবলাকান্ত ট্রিলজি (জেরিণার কণ্ঠহার, সুন্দরবনের রক্তপাগল, কুমারের বাঘা গোয়েন্দা), হরর ছোট-গল্প (গুহাবাসী বিভীষণ)। এরই সাথে, যদি সময় করে, কিছু টীকা এবং বেশ কিছু তথ্যমূলক আলোচনার দ্বারা গল্পগুলোর কালানুক্রমিক বিবর্তন তুলে ধরার একটা প্রাথমিক প্রচেষ্টা করা হয়তো, তাহলে বইটি মাস্ট-বাই হয়ে দাড়াতো।
সম্পাদক স্রেফ গল্পগুলোকে একত্রিত করে, একটা যেনতেন প্রকারেণ সম্পাদকীয় লিখেই রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। 'জেরিনার কণ্ঠহার' উপন্যাসের শেষে, 'অবশিষ্ট' হিসেবে 'এক রাত্রের বিভীষিকা' নামক একটি ভয়োৎপদাক গল্প জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যার সাথে বিমল, কুমার, বিনয়বাবু, কারোরই কোনো সম্পর্ক নেই। জানতে ইচ্ছে হয়, এই গল্পের তাৎপর্য কি? এমন ছোটখাটো 'অবশিষ্ট' কি হেমেন রায়ের বইতে আকছার পাওয়া যেত? উত্তর মেলে না যথারীতি।
যাই হোক, এসবের বাইরে, আমার কাছে সেরা পাওনা অবশ্যই বইয়ের গল্পগুলি। বিশেষ করে, 'মেঘদূতের মর্ত্তে আগমন' এবং 'ময়নামতীর মায়াকানন' - কল্পফ্যান্টাসি ঘরাণার উজ্জ্বল দুই নক্ষত্র। পোড় খাওয়া পাঠক মাত্রেই বোঝে গল্পদুটির মূলে, 'ওয়ার অব্ দা ওয়ার্ল্ডস্' এবং 'দা লস্ট ওয়ার্ল্ড'-এর ছায়া সুদৃশ্য। তবুও ভুলে গেলে চলবে না, উপন্যাস-দ্বয়ের বয়স প্রায় একশ বছর হতে চললো। সেই কোন ১৯২৬, ১৯২৭-এ বসে, হেমেন্দ্রকুমার রায় দেশ-বিদেশের ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের চর্চায় মত্ত হয়ে, একের পর এক সুপাঠ্য অভিযান কাহিনী উপহার দিয়েছিলেন বাংলা পাঠক দরবারে। আজ সেই জিনিস কেবল আধুনিকতার দাড়িপাল্লায় মাপলে, যথার্থ মূল্যায়ন হয় কি?
এছাড়াও রয়েছে, অবলাকান্ত। সেই নারীকণ্ঠী বিশালদেহী নরপিশাচ, যাকে বাগে আনতে বিমল, কুমারের সাথে মাঠে নামে জয়ন্ত, মানিক এবং সুন্দরবাবুরাও! তিনটে গল্প জুড়ে এই দ্বন্দ্ব, হয়তো বা অসাধারন নয়। তবে মনোরঞ্জক নিশ্চই। খুনোখুনি, মারামারি, পশ্চাদ্ধাবন, কিডন্যাপিং, কি নেই? সাথে অবলাকান্তের সব অতিনাটকীয় সংলাপ। মশলাদার বলে মশলাদার? তবে, যথার্থ অর্থে বইয়ের ডার্ক-হর্স, 'নীল সায়রের অচিনপুরে।' এতে মেলে অভিযানের আবেশে অনেকটা ভাবনার খোরাক। বিশেষত, নতুন প্রজাতির সংস্পর্শে এসে বিমলের অতীব হিংস্র ঔপনিবেশিক মনোভাব। যা একটি কিশোর-পাঠ্য উপন্যাসে দ্রষ্টব্যই বটে।
রঞ্জন দত্ত অঙ্কিত প্রচ্ছদটি দুর্দান্ত। তবে বইতে একটিও বাড়তি অলংকরণ নেই। নেই কোনো হেডপিস্ও। এসব অবশ্য বাহুল্য। যে বইতে সুসম্পাদনার রেশমাত্র নেই, সেই বইতে এর চেয়ে বেশি... যাক গে। আশা করি, হেমেন্দ্রকুমার রায়ের এই পাল্পি তবে সুপাঠ্য লেখাগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আরো নিবেদিত, গবেষণাসমৃদ্ধ এবং যত্নশীল কোনো সংকলন পাবো।
(৩/৫)