অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে রাহুল-এর কুড়িটি লেখা। একদিকে অভিনেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার কাহিনি। অন্যদিকে নানা সাম্প্রতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে এক অনুভূতিশীল শিল্পীর বিশ্লেষণ।
সহজ সাবলীল ভাষায় লেখা টুকরো টুকরো কথাচিত্রের সমাহার এই বই। এই বইয়ের ' কথামুখ ' বড় সুন্দর। ছোট ছোট পর্বে নিজের পারিপার্শ্বিককে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন অরুণোদয়। যা পড়তে শুরু করলে থামা যায়না। নিজের স্মৃতির ভাণ্ডার হাতড়ে রচনা করেছেন এক মায়াময় গদ্যকাব্য। হাসি কান্না, দুঃখ বেদনা, পাওয়া না - পাওয়ার অজস্র কথা আমাদের জানিয়েছেন অকপটে। সবার ভালোলাগার মত বই।
যেদিন বইটা পড়তে শুরু করেছিলাম সেদিন ভাবতেও পারিনি যে, বই শেষ হওয়ার আগেই লেখক তারাদের দেশে পাড়ি দেবেন। অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয় বিদারক ঘটনা, যা তাঁর অনুরাগীদের শোকস্তব্ধ করে রাখবে বহুদিন। নিজ মাধুর্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকুন অরুণোদয় তারাদের মাঝেও।
📘 রম্য রচনা পড়তে আমার বড়ো ভালো লাগে। অভিনেতা রাহুলকে দেখেছিলাম প্রথম "চিরদিনই..." তে। ওনার শেষ ছবি দেখেছি "রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত", তার আগে দেখেছি "পিউপা" তে। আস্তে আস্তে অভিনেতা হিসেবে দিনে দিনে ওনাকে আরও পরিণত হতে দেখেছি। তাই যখন জানলাম উনি রম্য রচনা, নিবন্ধ ইত্যাদি নিয়ে ছোট একটা বই লিখেছেন আর সেটা Swiftboox এ আছে, তখন সময় নষ্ট না করে কিনে ফেললাম। 📗 পড়া শেষ করে বুঝলাম যে ভাগ্যিস কিনেছিলাম! বিষয়বস্তু - নানান রকম... বাবা-মা, পরিবার, স্ত্রী, শাশুড়ি, ছোটবেলার প্রেম, বন্ধু, হাইস্কুল, পরীক্ষা, হঠাৎ 'হিরো' হয়ে ওঠার হ্যাপা ইত্যাদি ইত্যাদি। বহুদিন পর কোনো লেখা পড়ে এরকম প্রাণ খুলে হাসলাম। হাসতে হাসতে অনেক জীবনবোধের শিক্ষা পেলাম/revisit করলাম। অনেক গুলো লেখা পড়ে nostalgic হয়ে গেলাম - স্কুলজীবন চোখের সামনে ভাসতে লাগলো। 🙂🙂 আর বেশি কিছু না লিখে বইয়ের দুটো ছোট জায়গা তুলে দিই - ✅ "প্রিয়াঙ্কা এবং আমার মা একই বাড়িতে একসঙ্গে সংসার চালাচ্ছে। আমি মাঝখানে হাইফেন-এর মতো জুড়ে আছি। খুব কালেভদদ্রে বাড়িতে আবহাওয়া ঈষদুষ্ণ হয় ঠিকই, কিন্তু আমরা বেশ ভালোই আছি (টাচ উড)। সেই ঈষদুষ্ণ আবহাওয়া আদতে টের পাইয়ে দেয় বাড়িতে উষ্ণতার অভাব নেই। আর কিছু কিছু ব্যাপারে এই দু'জনের ঐক্যমত দেখলে আমার বিস্ময়ের অবধি থাকে না। যেমন : শাড়িওয়ালি দেখলে এদের দুজনের চোখে যে জিঘাংসা দেখতে পাওয়া যায়, তা একমাত্র বুনিপের চোখেই দেখতে পাওয়া যেত সম্ভবত! শ্বাপদসংকুল সেই বাড়িতে আমি ত্রস্ত হরিণের মতো এমন কাঁপতে থাকি যে দুষ্মন্ত দেখলে আমায় নির্ঘাত কোলে তুলে নিতেন! ঘন্টা দেড়েকের ধস্তাধস্তির পর হাসিমুখে শাড়িওয়ালি যখন চলে যান, আমি হঠাৎ টের পাই আমার ওজন যেন বেশ খানিকটা কমে গিয়েছে! আসলে মানিব্যাগ আমার পেছনের পকেটেই থাকে কিনা! ফলে সেটা যখন সোনাক্ষি সিনহা থেকে 'সাইজ জিরো' রূপ ধারণ করে, তখন আশঙ্কার কারণ হয় বইকি!" ✅ "আমি শচীনের বিশাল ভক্ত ছিলাম। ওর জালিদার হেলমেট দেখে মনে হল এর'মটা আমারও চাই। একটা দুপুরবেলা মশারি থেকে কেটে টুপির তলায় ফিট করে খেলতে চলে গেলাম। বলা বাহুল্য, মা-বাবা মশারির গায়ে দক্ষিণ-খোলা-জানলা মেনে নিতে পারেননি। ফলস্বরূপ ক্রিকেট থেকে আমার রিটায়ারমেন্ট অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। বাংলা হারায় সৌরভের যোগ্য উত্তরসূরিকে!!!"
রাহুলের অভিনয় দেখেই তাঁর প্রতি মুগ্ধতা শুরু। হঠাৎ করেই পেয়ে গেলাম রাহুলের লেখা এই বই। যাক, বইয়ের প্রসঙ্গে আসি।
বইটা লেখকের জীবনকেন্দ্রিক নানা ঘটনাবলি, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ। বইটা পড়ে মিশ্র একটা অনুভূতি হয়েছে। কোন কোন জায়গায় ভালো লেগেছে, আবার কোন কোন জায়গায় মনে হয়েছে বেশি তাড়াহুড়ো করে লেখা হয়েছে। বই পড়ে লেখকের খুব ভালো সেন্স অব হিউমারের পরিচয় পাওয়া যায়। তবে কোথাও মনে হয়েছে আরেকটু যত্ন নিয়ে লিখলে হয়ত আরও ভালো হতো। তবে বইটা পড়ে মানুষ রাহুল তথা অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেনা যায়, আরও ভালো করে, আরও কাছ থেকে।