'সূর্য তুমি সাথী' এই উপন্যাসটিতে সমাজের বাস্তব ছবি আশ্চর্য গতিশীলতায় বাধা পড়েছে। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিফলনে রতিচ হয়েছে উপন্যাসটি। সমজাের নিম্নশ্রেণির মানুষের উপর প্রভাবশালী মানুষের দৃষ্টি ভঙ্গি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে উপন্যাসটিতে। প্রাচীন কাল থেকে কীভাবে দরিদ্র মানুষেরা অত্যা*চার সহ্য করে আসছে তারও ধারণা পাওয়া যায় বইটিতে। গরিবদের শোষণ করে তাদের শরীরের সব র*ক্ত শোষে নেওয়াই যেন মানুষ রুপি অমানুষদের একমাত্র কাজ। অমানুষদের অবানবিক অত্যা*চারের যাতাকলে মানুষ পিষে মরছে জন্ম থেকে জন্মান্তর।
আহমেদ ছফা নিজের লেখা " সূর্য তুমি সাথি " বইকে সেরা উপন্যাস বলে মনে করতেন। কিন্তু বর্তমান পাঠক মহলে সবচেয়ে কম আলোচনা হয় এই বইকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির হৃদয়গ্রাহী এই উপন্যাস নিয়ে আরও বিস্তর আলেচনার প্রয়োজন আছে। নতুন প্রজন্মের কাছে বইটি পৌঁছে দেওয়া ভীষণ প্রয়োজন।
চট্টগ্রামের একটি গ্রামের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এ উপন্যাসে সাম্প্রদায়িকতা ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী চেতনা প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাসটিতে ধর্মীয় কুসংস্কারচ্ছন্ন একটি সমাজকে তুলে ধরা হয়েছে, তবে সেই সমাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও উচ্চারিত হয়েছে। গল্পের কেন্দ্রে ছিল হাসিম, যার পিতা হরিমোহন ধর্মান্তরিত মুসলমান। সব দিক দিয়েই তাই বঞ্চনার শিকার ছিল সে। মানুষের কটু কথা হাসিমের হৃদয়কে কেটে ফালাফালা করে দিতো। মানুষের চোখে নিজেকে নিম্নশ্রেণির কীট হতে দেখে তাঁর হৃদয়ে প্রচুর র*ক্ত ক্ষরণ হতো। কষ্টের এই জীবনে চারদিক থেকে আসা মন্দ কথা তাকে প্রচুর আঘাত করতো । হাসিম বার বার ভাবতো এরা আসলে মানুষ হয়েও কেন মানুষ না। এতো কষ্টের মাঝেও হাসিম জীবনের অর্থ খুঁজে পায় মনির, হিমাংশু বাবু,কেরামত ভাই এদের সংস্পর্শে এসে। হাসিম বুঝতে পারে টাকা পয়সা,ধন,সম্পদ,জায়গা,জমি এইসব আসলে মানুষের জীবনে মূল্যহীন, যদি মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ব না থাকে। হাসিমের স্ত্রী সুফিয়া মা*রা যায় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে। মা হারা শিশুকে কোলে তুলে নেয় হাসিমের হিন্দু দাদি। ধর্মের দোহাই দিয়ে এতো কাল বুড়িকে সবাই বন্দি করে রাখতে পারলেও আর পারা যায় নি। মানবিক সম্পর্কের জোরে হাসিমের স্ত্রী সুফিয়ার মৃ*ত্যুর পর এগিয়ে আসে পোদ্দার গিন্নী অর্থাৎ হাসিমের দাদী। হাসিমের শিশুকে গ্রহণ করতে পোদ্দার গিন্নীর জন্য ধর্ম কোন বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না, কারণ এই সন্তানের মধ্যে তিনি নিজের ত্যাগ করা সন্তানকে দেখতে পান।
'সূর্য তুমি সাথী' উপন্যাসে পোদ্দার গিন্নীর চরিত্রটির মতো আর্দশ নারী চরিত্র গোটা বাংলা সাহিত্যে অধিক নেই বলে আমার মনে হয়। এমন শক্তিশালী একটি চরিত্রকে আহমেদ ছফা কত সাধারণ ভাবে উপস্থাপন করে অসাধারণ করে তুলেছে। লেখক প্রতিটি চরিত্রকে নিজস্ব মতামতের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। কোথাও কোন অতিরিক্ত ভাব নেই কি চমৎকার এক একটা চরিত্র।
বইটি পড়ে পাঠক সেই সময়ের মানুষদের জন্য মায়া অনুভব করতে বাধ্য। মানুষের হাহাকার,কষ্ট,অত্যা*চার পাঠকদের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করবে। হাসিমের বুড়ি দাদির জন্য কষ্টে চোখের দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেও বাধ্য। কি চমৎকার তাদের ভালোবাসা, চাইলেও ধরা ছোঁয়া যায় না,তবুও কত মায়া তাদের মধ্যে এমন ভালোবাসার জন্যই মানুষ অপেক্ষা করে জন্ম থেকে মৃ*ত্যু পর্যন্ত।