বড়লোক বাবার সুনিশ্চিত জীবন থেকে পালিয়ে নিজের মত কিছু করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে রিশাদ নামের এক তরুণ। অন্ধকার রাতে একা একা বাড়ি থেকে পালাবার সময় হঠাৎ অদ্ভুত এক আলো জ্বলে ওঠে পথে! তারপরে আর কিছু মনে নেই। জেগে উঠে হতভম্ব রিশাদ আবিষ্কার করে সে কোন অচেনা জায়গায় চলে এসেছে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে আক্রমণ করে বসে অদ্ভুত কিছু, আতঙ্কে ছুটতে ছুটতে রিশাদ ভাবতে থাকে আবার কখনো বেঁচে ফিরতে পারবে তার চেনা জগতে?
ঢাকা কমিক্সের সাই-ফাই কমিক্স সিরিজ রিশাদের প্রথম তিনটি বই এক মলাটে নিয়ে রিশাদ ট্রিলজি।
আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগা মাত্র ২১ এ পা রাখা রিশাদ বাসা থেকে পালিয়ে যায়। বড়লোক বাবার ব্যবসায় তাঁর আগ্রহ নেই মোটেও। সে কিছু করতে চায়, সে হয়তো কিছু হতে চায়। এমন সব প্রশ্ন তাঁর মাথায় ঘুরপাক খায় যেসব হয়তো এখনো আমাদের অনেকের মনে গেঁথে আছে। এই অজানা পথে রিশাদ চলে যায় ভিন্ন এক ডাইমেনশনে।
রহস্যময় প্রাচীন একটি গ্রন্থে পুরো মহাবিশ্বের নিয়তি লেখা আছে। সেই ভিন্ন ডাইমেনসনে রিশাদের সাথে দেখা হয় নুশিতের সাথে। প্রাচীন সেই গ্রন্থের পাহারাদার একজন। মহাবিশ্বের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পথে। রিশাদের উপর দ্বায়িত্ব পড়েছে সেই কালো এবং সাদা শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে। প্রাচীন চীনের সেই সিম্বল "ইন" "ইয়ান" এর কথা মনে পড়ে যায় এই গল্প পড়তে পড়তে। একই সাথে অনেক ছোটখাট ঘটনা একটির সাথে আরেকটি অদ্ভুতভাবে সম্পর্কিত থাকার কারণে যে বিশাল পরিবর্তন ঘটে সেটা দেখে মনে পড়ে যায় ক্যাওস থিওরির কথা। একধরণের "বাটারফ্লাই ইফেক্ট" এর কারণে রিশাদ জড়িয়ে পড়ে দানবদের সাথে এক যুদ্ধে। এমন এক যুদ্ধ যেখানে শত্রু মিত্র চিনা কঠিন। নিজের নতুন প্রাপ্ত ক্ষমতার ব্যবহার করে রিশাদ কি পারবে পৃথিবীকে এবং হয়তো মহাবিশ্বকে রক্ষা করতে?
অদ্ভুত সুন্দর কমিক্স আর্ট করেছেন মেহেদী হক এবং আসিফুর রহমান। আমার কাছে মাঙ্গা আর্টের একটা ছাপ লেগেছে এই গ্রাফিক নভেলে। এই কমিক্সের ওভারঅল আর্ট নিয়ে আন্তর্জাতিক কমিক্সের বাজারে গর্ব করা যায় যদি বলি তাহলে একটুও বাড়িয়ে বলা হবেনা। আরো ভালো লেগেছে এই গ্রাফিক নভেলে খসড়া আঁকাআঁকি দেওয়া হয়েছে সেই ব্যাপারটা। কমিক্স আর্টের বেসিক কিছু ধারণা যে দেয়া হয়েছে সেটা প্রশংসনীয়। এসব কারণেই রিশাদ আমার ফেভারিট।
গল্প সম্পর্কে বলতে গেলে খুব জটিল কিছু বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন নাভিদ হোসাইন। সত্য কথা বলতে খুব ইউনিক গল্প নয় এটি কিন্তু কমিক্সের অনন্ত জগতে বা স্টোরিটেলিং এর ভুবনে পাঠকদের ধরে রাখার যে স্কীল এই গল্পে পেয়েছি সেটাই আসল। মেহেদী হক সংলাপের কাজ করেছেন বেশ ভালোই। তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো গল্পটা আরেকটু বড় হলে হয়তো ভালো হতো। অথবা আমি রিশাদের গল্পের ফ্যান বলে হয়তো আশা একটু বেশি করছি। রিশাদকে সম্ভব হলে ঢাকা কমিক্সের অন্যান্য গল্পে ক্যামিও রোল দিলে ভালো হয়। ঢাকা কমিক্সের সব প্রধান চরিত্রগুলোর একটি ক্রশওভার হলে খুব দারুন হবে। সবকিছু মিলিয়ে একটা কথা বলতে চাই এবং সেটা হলো বাংলাদেশে কমিক্সের সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্যে ঢাকা কমিক্সের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
আমার কেন জানি মনে হয় এই সুদিন ফিরে আসার পিছনে রিশাদের হাত আছে। সেই রহস্যময় বইয়ের কাছাকাছি তো সে গিয়েছিলো, যেখানে আছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। প্রাচীন ক্রেইনেগেন সেই গ্রন্থের "নিয়তি এড়াতে তুমি কতদূর যাবে?" কথাটি মনে দাগ কেটে দেয়। ডিসির ফ্ল্যাশ অক্লান্ত ছুটে যেতে থাকে এবং মার্ভেলের ডক্টর স্ট্রেন্জ ক্রমাগত সাধনা করতে থাকেন মিস্টিক আর্টের ঠিক এই প্রশ্নের জবাব দেয়ার জন্যে। রিশাদও হয়তো ফিরে আসবেন এই প্রশ্নের জবাব দিতে। যে প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমাদের কারো কাছেই নেই।