উৎসমুখ: বাল্মীকির রামায়ণে নেই --- পাঠ ও পঠনচিন্তার এক নির্মোহ পুনর্ভাবনা
“सा रामं सत्यसन्धं च महात्मानं महायशाः।
श्रीनिवासं श्रियं कान्तं शीलवान्तं यशस्विनम्॥”
(বাল্মীকি রামায়ণ, ১.১.১৮)
অর্থ: “তিনি সেই রাম, যিনি সত্যনিষ্ঠ, মহাত্মা, মহাযশস্বী, লক্ষ্মীর আবাস, সৌন্দর্যের আকর্ষণ, নম্র ও শীলবান, যশস্বী।”
এই শ্লোকেই আদিকবি বাল্মীকির রামায়ণ, তার মূল কাঠামো ও নৈতিক দিকনির্দেশনা পায়। কিন্তু হাজার হাজার বছর পরে, যখন রাম চরিত্র চর্চিত হতে থাকে ছোটপর্দার সিরিয়াল থেকে রাজনৈতিক প্রচারে, তখন সেই "সত্যসন্ধ" রামের প্রকৃত রূপ কতটা ধরা থাকে আদিকবির পাঠে? এই প্রশ্ন কেন্দ্র করেই রচিত রাজা ভট্টাচার্যের অসাধারণ বিশ্লেষণী গ্রন্থ বাল্মীকির রামায়ণে নেই।
“रामो विग्रहवान् धर्मः”
(বাল্মীকি রামায়ণ, অযোধ্যাকাণ্ড, ১১৫.১১)
অর্থ: “রাম নিজেই ধর্মের সাকার রূপ।”
এই শ্লোকটি বহু পাঠকের অন্তরে স্থায়ী আসন গড়ে তুলেছে। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে ধর্ম যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন এই রাম ঠিক কোথায় দাঁড়ান? এ বই সেই প্রশ্নের সামনে এক নির্মোহ আলো ফেলে, যেখানে রামের জনপ্রিয় চিত্র নয়, বরং তার আদিকবির নির্মিত রূপ আলোচনার মুখ্য বিষয়।
রাজা ভট্টাচার্যের ভঙ্গি সহজ, অথচ তীক্ষ্ণ। তিনি একের পর এক এমন সব প্রচলিত ঘটনা ও বিশ্বাসের উৎস অনুসন্ধান করেছেন—যেমন ‘লক্ষ্মণের রেখা’, ‘সীতার অগ্নিপরীক্ষা’, কিংবা ‘রত্নাকর থেকে বাল্মীকি’ পরিণতি—যেগুলো জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হলেও আদতে বাল্মীকি রামায়ণে অনুপস্থিত।
“न हि सत्यात्परं किञ्चित्”
(বাল্মীকি রামায়ণ, অযোধ্যাকাণ্ড, ৮.১৫)
অর্থ: “সত্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কিছু নেই।”
এই সত্যই যেন গ্রন্থটির অন্তর্নিহিত দর্শন। লেখক মিথ ও কল্পনার চেয়ে প্রাচীন কাব্যের নির্যাসে আস্থা রাখেন। তবে এটা কেবল ব্যাখ্যার বই নয়, এটি একইসঙ্গে পাঠের সংস্কার, বুদ্ধির শুদ্ধি এবং একটি সুস্থ পাঠসংস্কৃতির রক্ষাকবচ।
১) শিরোনাম ও উদ্দেশ্য: এক পঠনদৃষ্টির পুনর্পরিচয়
বইটির নাম—বাল্মীকির রামায়ণে নেই—শুধু একটি বাক্য নয়, যেন পাঠ-সংস্কৃতির বুকে ছুঁড়ে দেওয়া এক গৌরবময় প্রশ্নবাণ। এটি সেই নাম, যা আদতে একটি প্রত্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করে — যে ‘রাম’কে আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর শাশ্বত সত্তাটি কতটা বাল্মীকির, আর কতটা উত্তরকালের, সংস্করণের, বা ভক্তিভাবনার অনুবর্তী কল্পনার সৃষ্টি? ভট্টাচার্য, একেবারে নির্মোহ, অথচ আন্তরিক সুরে, আমাদের ঠেলে দেন এই আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি।
“श्लोकबद्धं कथा रूपं काव्यं लोकविश्रुतम्।
रामायणं इति ख्यातं सर्गैः काण्डैश्च संयुतम्॥”
(বাল্মীকি রামায়ণ, ১.৪)
অর্থ: “শ্লোকবদ্ধ, কাহিনিরূপ, কাব্যত্মক এবং লোকবিশ্রুত এই গ্রন্থ—যা 'রামায়ণ' নামে পরিচিত—তা বিভিন্ন সর্গ ও কাণ্ডে বিভক্ত।”
কিন্তু লোকপ্রিয়তা সর্বদা শুদ্ধতার প্রতীক নয়। আমরা ছোটবেলা থেকে যে সব রামায়ণ চর্চা জেনেছি—যাত্রা, টেলিভিশন, পাঁচালির রঙিন ফ্রেমে—তার অনেকটাই আদিকবির নির্মিত পরিসর নয়, বরং পরবর্তীকালের কাব্যিক সংযোজন ও কল্পনার ফল।
লক্ষ্মণের গণ্ডি, সীতার অগ্নিপরীক্ষা প্রসঙ্গে রামের অনুশাসন, রত্নাকর দস্যুর "মরা-মরা" জপে বাল্মীকি হয়ে ওঠা, কিংবা রামের নাম লিখলেই পাথর ভেসে ওঠা — এই সমস্ত ঘটনা, যেগুলো ভারতীয় সংস্কৃতির আবেগে ও আচার-অনুষ্ঠানে একরকম ছাপ ফেলে রেখেছে, তাদের সত্যতাই লেখক প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। এবং তাও কোনও তর্জন-গর্জন ছাড়াই। তাঁর হাতে রামায়ণ শুধু ধর্ম বা সংস্কার নয়—এ এক পাঠযোগ্য, পর্যালোচনাযোগ্য সাহিত্যকর্ম।
“न यथारुचिकल्पितं लोके धर्मः प्रवर्तते।”
(বাল্মীকি রামায়ণ, ২.১০৯.৩)
অর্থ: “ধর্ম লোকের খুশিমতো যেমন খুশি কল্পনা করা যায় না।”
এই শ্লোক যেন লেখকের পঠনদৃষ্টির অন্তরস্বর। তিনি পুনর্বিবেচনার পথ ধরেছেন, কিন্তু রামায়ণকে deconstruct করার কোনও কৃত্রিম চাতুর্যে যাননি। বরং একটা নিঃশব্দ অনুরোধ রেখেছেন — যা আমরা জানি বা বিশ্বাস করি, তা একটু যাচাই করি না কেন?
লেখার ভঙ্গি বৈঠকী, ঠিক যেন প্রিয় কোনও শিক্ষক শেষ ক্লাসের ঘন্টা পড়ে যাওয়ার পরেও আমাদের পাশে বসে রামায়ণ পড়াচ্ছেন। চায়ের কাপ, শ্রদ্ধা, আর কৌতূহলের মিশেলে তৈরি সেই আবহেই পাঠক ধীরে ধীরে খুঁজে পান — আসলে কী ছিল আদিকবির মূল বয়ানে, আর কী ছিল উত্তরকালের আবেগে।
২) গ্রন্থের কাঠামো ও কৌলীন্য: পাঠবিশ্লেষণের একটি পরিণত বিন্যাস
এই বইয়ের কাঠামোগত নকশা পাঠকের মনোযোগ প্রথম দৃষ্টিতেই কেড়ে নেয়। একুশটি স্বাধীন অথচ আন্তঃসম্পর্কিত প্রবন্ধ, যেন পাঠ ও প্রয়োগের মাঝখানে একটি সেতুবন্ধন রচনা করেছে — প্রত্যেকটি অধ্যায় এক একটি আলোচনার কক্ষপথ, যা মিলিতভাবে রামায়ণ-পাঠের ঐতিহ্য, প্রকরণ ও পরিবর্তনকে নতুন দৃষ্টিকোণে স্থাপন করে। এই বইতে রামায়ণের "যা ছিল না অথচ আমাদের জানা হয়ে গেছে", তার নিরীক্ষণই কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য।
প্রতিটি অধ্যায় এক একটি বহুল পরিচিত, সংস্কৃতির সঙ্গে গাঁথা ঘটনা — যেমন "অগ্নিপরীক্ষা", "লক্ষ্মণের রেখা", "সীতা হরণ", কিংবা "রত্নাকর বাল্মীকি" হওয়ার কাহিনি—যেগুলোর প্রকৃত উৎস ও বৈধতা বইটি প্রশ্নের মুখে তোলে। আলোচনার গঠনে লেখক সাহিত্যের গভীর বিশ্লেষণকে জনবোধ্য ভাষায় রূপান্তর করেছেন—শ্রদ্ধেয় গণিত শিক্ষকের মতো, যিনি জটিল অঙ্ককেও সহজ ভাষায় বর্ণনা করতে পারেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য “আগুন দেখেছি আমি” অধ্যায়। এখানে বিশ্লেষিত হয়েছে যে, বাল্মীকি রামায়ণ-এর যুদ্ধকাণ্ডে রাম সীতাকে অগ্নিতে প্রবেশ করতে বলেননি; বরং সীতা স্বয়ং তাঁর পবিত্রতার প্রতীকস্বরূপ অগ্নি-প্রবেশের প্রস্তাব দেন:
“प्रत्ययं चापि मे वीर यथार्थं वक्तुमर्हसि।
यदि तेऽहं प्रियं मन्ये देवगर्भं विवेश्यताम्॥”
(বাল্মীকি রামায়ণ, ৬.১১৫.২৩)
অর্থ: “হে বীর, যদি তুমি এখনও আমাকে প্রিয় মনে করো, তবে আমাকে অগ্নিতে প্রবেশ করতে দাও, যাতে আমি আমার শুদ্ধতার প্রমাণ রাখতে পারি।”
এই শ্লোকের আলোকে 'অগ্নিপরীক্ষা'র আজকের যে ন্যারেটিভ—‘রাম আদেশ দেন’, 'রাম নির্মম'—সেটিকে ভেঙে লেখক এক নির্মোহ পঠনসিদ্ধি উপস্থাপন করেন। একইসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন—
“रामो द्विर्नाभिभाषते।”
(বাল্মীকি রামায়ণ, ২.১৮.৩০)
অর্থ: “রাম কখনও দ্বিতীয়বার মিথ্যা বলেন না।”
এই নৈতিক কণ্ঠই রামকে ভগবান নয়, একজন আদর্শ পুরুষ—Maryada Purushottama—হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।
“ঠুমক চলত রামচন্দ্র” অধ্যায়ে লেখক শৈশব রামচরিত্রের মায়াবী নির্মাণকে বিশ্লেষণ করেন—কোনটা আদিকবির সৃষ্ট, কোনটা কৃত্তিবাসীয় আবেগ-সংযোজন। অন্যদিকে “তরণীসেন বধ” অধ্যায়ে রাবণের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক কৌশল, বিশেষ করে তার সৈনিক বিন্যাস ও ভ্রাতৃঘাতী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, এক আশ্চর্য পরিশীলিত দৃষ্টিতে ধরা পড়ে।
“ঘরশত্রু বিভীষণ” অধ্যায়ে লেখক দেখান, কেবল পৌরাণিক ন্যায়বোধ নয়, বিভীষণের পদক্ষেপে এক সামাজিক ও রাজনৈতিক নৈতিকতা অনুপস্থিত ছিল না। তিনি নিছক এক ‘দেশদ্রোহী’ নন; বরং নৈতিক সাহসের এক প্রতীক, যার নির্বাচন বাল্মীকি কাব্যে এক অনন্য বিশ্বাসযোগ্যতা বহন করে। সেই আলোকে লেখক তুলে ধরেন —
“न हि शत्रुः प्रियः स्यात्स्वपि स्नेहेन भाषितः।
अनृतं न कथं प्राह मया रामोऽपि रावणम्॥”
(বাল্মীকি রামায়ণ, ৬.১২.১৮)
অর্থ: “শত্রু কখনও প্রিয় হতে পারে না, যতই স্নেহের কথা বলা হোক না কেন। রাম এমন কিছুই বলেননি যা মিথ্যা।”
এখানে বিভীষণের ‘ঘরত্যাগ’ আদতে এক বৃহত্তর ন্যায়বোধের অনুষঙ্গ।
একইভাবে “মারীচের প্রকৃত সংবাদ” অধ্যায়ে রাবণের দূরদর্শিতা ও মারীচের বিভ্রান্ত চরিত্রটি সমকালীন রাজনীতির প্রতিমূর্তি হিসেবে উঠে আসে। লেখক দেখান—মারীচ কেবল এক দৈত্য ছিল না, সে ছিল কূটকৌশল, প্ররোচনার শিকার এক যান্ত্রিক সৈনিক, যার উপস্থিতি বাল্মীকি রামায়ণ-এ এক গভীরতর রাজনৈতিক পাঠের নির্দেশ দেয়।
“সীতা উবাচ” অধ্যায়ে লেখক এক অপ্রতুল আলোচিত দৃষ্টিকোণ—সীতার আত্মবীক্ষা—উপস্থাপন করেছেন। এখানে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ বা ‘লক্ষণরেখা’ নয়, বরং সীতার মুখে বলা সেই আত্মনির্ভর প্রতিবাদের সুরই মুখ্য। এই অধ্যায় এক নারীচরিত্রকে “পতিব্রতা”র ছাঁচ থেকে বের করে একজন মানবী হিসেবে দেখার সম্ভাবনা তৈরি করে।
সর্বোপরি, লেখকের আলোচনার ধরন কখনও ব্যাকরণিক চুলচেরা বিশ্লেষণ নয়—বরং এক ব্যক্তিগত পাঠ-দীপ্তি, পাঠকের সঙ্গেই সমান উচ্চতায় বসে কথোপকথনে নিমগ্ন থাকা। একারণেই প্রতিটি প্রবন্ধ যেন এক একটি গৃহসংলাপ, যেখানে পাঠকও নিমগ্ন হয়ে যান প্রশ্নে, উত্থানে ও উত্তরণে।
শেষে স্মরণ করাই যায় সেই শাস্ত্রীয় নির্দেশ:
“श्लोकार्थो नित्यमध्येतव्यः संशयश्च विनिर्णयः।”
(চরক সংহিতা)
অর্থ: “শ্লোকের অর্থ নিয়মিতভাবে অধ্যয়ন করো, আর সন্দেহ থাকলে তা নির্ণয় করে বোঝো।”
রাজা ভট্টাচার্য এই নির্দেশ মেনেই যেন আমাদের রামায়ণ পাঠের দরজাগুলিকে অর্চিত নয়, আলো-দেওয়া জানালার মতো করে খোলা রাখেন।
৩) বাল্মীকির সংহতি বনাম বিনির্মাণের রমণীয়তা: পাঠ-প্রতিস্মৃতির এক বুনন
রামায়ণ কেবল একটি কাব্য নয়—এটি সংস্কৃতির এক চলমান ব্যুৎপত্তি। বাল্মীকি থেকে কৃত্তিবাস, তুলসীদাস থেকে কম্বন, থাইল্যান্ডের রামাকিয়েন থেকে ইন্দোনেশিয়ার সেরাত রামা—প্রত্যেকটি রামায়ণ এক একটি সময়, সমাজ ও সংস্কৃতির মুখপাত্র। এই বহুস্তরীয় অভিযাত্রায় একদিকে যেমন বাল্মীকি রচেছেন ইতিহাস-সমন্বিত পৌরুষের অন্বেষণ, অন্যদিকে সমাজ ও ভক্তির প্রবাহে রাম পরিণত হয়েছেন ঈশ্বরের প্রতিমূর্তিতে।
“रामो विग्रहवान् धर्मः”(বাল্মীকি রামায়ণ, ১.১.১৩)
অর্থ: “রাম ধর্মের মূর্ত প্রতীক।”
কিন্তু এই ধর্ম কোনও নিঃশ্বাসবিহীন দেবত্ব নয়। বরং সেই মানবিক ধর্ম, যা নিজেই বারবার পরীক্ষা দেয়। ভট্টাচার্য এখানেই আলাদা করে রামচরিতের পাঠধারাকে পাঠানুবীক্ষণের আলোয় স্থাপন করেন।
কৃত্তিবাস রামায়ণের এই অমোঘ পঙক্তি— “চৌদিকে হইল ধ্বনি রাম রাম বোল। / ভবসংসারজাল হতে হইল সে বিহ্বল॥”
— এক রাম-স্মৃতির অতিশয়োক্তিময় চিত্র আঁকে, যেখানে রাম শব্দেই মুক্তি, নামেই নিবারণ। এই ভক্তিভাব-সংযোজিত নির্মাণে রাম ঈশ্বরতুল্য, এক অনির্বচনীয় করুণার আধার। কিন্তু বাল্মীকি রামের মধ্যে ঈশ্বরত্ব জন্ম নেয় দীর্ঘ যন্ত্রণার, নৈতিক সংকটের, মানবিক সীমা ও শ্রেষ্ঠত্বের দ্বন্দ্ব থেকে।
ভট্টাচার্যের আলোচনায় এই পার্থক্য সুস্পষ্ট। “ঠুমক চলত রামচন্দ্র” নামের প্রবন্ধে লেখক বিশ্লেষণ করেছেন ছোট্ট শিশু রামের কাব্যিক রূপায়ণ—যে রূপ আমাদের যাত্রা, পালা ও গল্প-গানে ভাসমান। কিন্তু এই শিশুর ভিতর দিয়ে কিভাবে গড়ে ওঠে এক মহৎ পুরুষ, সেই অন্বেষণ বাল্মীকি কাব্যে যতটা সূক্ষ্ম, ততটাই গভীর।
“ঘরশত্রু বিভীষণ” অধ্যায়ে ভট্টাচার্য এমন এক চরিত্র নির্মাণের কথা বলেন, যে রাজনৈতিক চাতুরী এবং নৈতিকতা—দুইয়ের সীমানাতেই দাঁড়িয়ে। বিভীষণ বাল্মীকির বর্ণনায় শুধুই বিশ্বাসঘাতক নন, বরং এক অনুগৃহীত সত্যবাদী, যার বিচ্ছেদ রাবণের সঙ্গ থেকে নয়, অসত্য ও অন্যায় থেকে। রাম এই বিচ্ছেদকে আশ্রয় দেন কারণ:
“सत्येन लभ्यस्तपसा ह्येष आत्मा सम्यग्दर्शनैः।”(বাল্মীকি রামায়ণ, ৬.১১৭.৩১)
অর্থ: “এই আত্মা কেবলমাত্র সত্য, তপস্যা এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেই লাভ করা যায়।”
এই আত্মার অনুসন্���ানেই রাম বিভীষণকে স্বীকার করেন—অর্থাৎ রাম কেবল কৌশলী রাজনেতা নন, এক মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক।
“মারীচের প্রকৃত সংবাদ” অধ্যায়ে লেখক উঠে আসেন সেই ছায়ার জগতে, যেখানে রামের প্রজ্ঞা এবং সীমাবদ্ধতার টানাপোড়েন বিদ্যমান। এখানে মারীচ, যিনি মৃগরূপী প্রতিপক্ষ, আসলে এক ট্র্যাজিক চরিত্র। তাঁর ভিতর আছে আত্মজ্ঞান, পাপবোধ, কিন্তু নিষ্ক্রমণের পথ নেই। তিনি বলেন—
“न हि मे जीवितं रक्ष्यम्।”(বাল্মীকি রামায়ণ, ৩.৪১.৯)
অর্থ: “আমার জীবনের আর কোনো রক্ষা নেই।”
এই শ্লোক রামের নয়—এটি মারীচের—কিন্তু এই ভয়, এই আত্মসমর্পণ, রামের সিদ্ধান্তের প্রতিবিম্ব বয়ে আনে। পাঠককে বাধ্য করে ভাবতে—রামের রাজনৈতিক নিষ্ঠা ও নৈতিক সিদ্ধান্ত কি সর্বদা একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এই ভাবনার বিস্তার ঘটেই যায় বাল্মীকির রামায়ণে নেই বইজুড়ে। বিনির্মাণ এখানে চমক নয়, তত্ত্ব নয়—বরং এক সমৃদ্ধ সংলাপ, যেখানে পাঠক ফিরে ফিরে যান মূল টেক্সটে, এবং নিজের ভিতরকার রামকে নতুন করে আবিষ্কার করেন।
পার্শ্বপ্রসঙ্গ: সীতাহরণ, ছায়াসীতা ও উত্তরকাণ্ডের অনুপস্থিতি: ‘সীতাহরণ পালা’ নিয়ে লেখকের পর্যবেক্ষণ তীক্ষ্ণ এবং পরিশীলিত। “লক্ষ্মণের গণ্ডি”, “শূর্পণখা উবাচ”, “সীতা উবাচ”—এই তিনটি পর্বে লেখক সীতাহরণের আশেপাশের গল্পগুলির প্রাথমিক ও বিকৃত রূপগুলি খুলে দেখান�� সীতার আত্মস্মৃতি, তাঁর অবচেতন উপস্থিতি ও তৎকালীন সমাজের নারী-অন্তর্হিত মনস্তত্ত্ব একত্রে ধরা দেয় এই অধ্যায়ে।
‘ছায়াসীতা ও বর্ণসংকট’ পর্বে আলোচিত হয়েছে সেই পৌরাণিক উপসংহার যেখানে রাবণের দ্বারা অপহৃত সীতা আসলে ছায়াসীতা। প্রশ্ন ওঠে, এই ছায়ার আড়ালে কি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নিজের অপরাধবোধ লুকিয়ে রাখছে? লেখক এখানে বাল্মীকির আসল বক্তব্য উদ্ধারে একটি দ্ব্যর্থহীন বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।
‘সেতুবন্ধনম্’ পর্বে “রামনাম লিখলেই পাথর ভাসে”—এই বহুলচর্চিত বক্তব্যের প্রকৃত উৎস কী, তা অনুসন্ধান করেছেন লেখক। বাল্মীকি ব্যতিক্রমী দক্ষতায় বর্ণনা করেছেন নল ও নীলের প্রযুক্তি-নির্ভর বুদ্ধিদীপ্ত সেতু নির্মাণ। সেখানে রামের নাম জপের জাদু নেই, আছে পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের রূঢ় বাস্তবতা।
সবশেষে আসে ‘উত্তরকাণ্ড: অনুপস্থিত অনুচ্ছেদ’। অনেক পণ্ডিত এই কাণ্ডটিকে বাল্মীকির মৌলিক রচনার অংশ মানেন না। ভট্টাচার্য এই বিতর্ককে অস্বীকার না করে বরং তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সামাজিক মানসিকতা ও তৎকালীন পুরুষতন্ত্রের প্রতিসরণকে ধরেছেন। অগ্নিপরীক্ষা-পরবর্তী সীতানির্বাসনের মূল পাঠটি এক নিঃশব্দ দ্রোহ—যা পাঠককে করে তোলে রামেরও ঊর্ধ্বে, সরাসরি সীতার পক্ষে।
অন্তে মনে পড়ে যায় সেই মর্মস্পর্শী শ্লোক—
“न कालो हि शुभाशुभं करोति लोकस्य किंचित्।स्वकृतं हि शुभाशुभं लोकः पश्यति कर्मणा॥”(বাল্মীকি রামায়ণ, ২.২৩.১৫)
অর্থ: “সময় নিজে কিছু শুভ বা অশুভ ঘটায় না। মানুষ নিজেই তার কর্মফল দেখে।”
রাম, বিভীষণ, মারীচ, সীতা—সবাই সেই কর্মেরই ফলভোগী। আর ভট্টাচার্যের বিশ্লেষণ সেই কর্মজালেই পাঠককে আমন্ত্রণ জানায়—নতুন চোখে, নতুন আলোয়, পুরনো এক কাব্যের ভিতর দিয়ে হাঁটতে।
৪) প্রক্ষিপ্ত কাণ্ড এবং একাধিক রামায়ণের ধোঁয়াশা
বাল্মীকির রামায়ণ বলতে আমরা যা বুঝি, তা আদতে একটি বহুতল পাঠিক বিন্যাস—যেখানে “বালকাণ্ড” ও “উত্তরকাণ্ড” নিয়ে চিরকাল দ্বিধা রয়ে গেছে। বহু গবেষকের মতে এই দুটি অংশ আদিরচনায় ছিল না, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংযোজিত হয়েছে ‘প্রক্ষিপ্ত’ অংশ হিসেবে। তবে ‘প্রক্ষিপ্ত’ মানেই ‘অপ্রাসঙ্গিক’—এমন ভাবাও ভুল। কারণ অনেক পাঠপ্রমাণ এবং সংস্করণে এই অংশগুলিই একে অপরের বিপরীত যুক্তির আশ্রয়ে মূল পাঠ-এর অনুষঙ্গ রচনা করেছে।
“बुद्धिर्बलं यशो धैर्यं निश्चयः श्रुतिमान् दमः।
एतं मे सप्तमं मित्रं प्राहुर्लोकविशारदाः॥”
(বাল্মীকি রামায়ণ, কিষ্কিন্ধা কাণ্ড, 2.36)
অর্থ: “বুদ্ধি, বল, খ্যাতি, ধৈর্য, সংকল্প, শ্রুতি ও সংযম—এই সাতটি গুণ যার মধ্যে আছে, তিনিই প্রকৃত বন্ধু।”
এই শ্লোকটি রামের চরিত্রের পরিপূর্ণতা নির্দেশ করে, যা অনেক গবেষক উত্তরকাণ্ডে খুঁজে পান।
নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীসহ অনেক বিদগ্ধজন উত্তরকাণ্ড-কে পুরোপুরি বর্জন না করেই, তার কিছু অংশকে “আখ্যানাত্মক পরিপূরক” বলে মনে করেন। যেমন, সীতার বনবাস, লব-কুশের আগমন বা অশ্বমেধ যজ্ঞ—এ সব ঘটনার একটি বৃহত্তর সাহিত্যিক উদ্দেশ্য ছিল, যদিও আদিকবির আদি কাহিনিতে তার উপস্থিতি প্রশ্নবিদ্ধ।
ভট্টাচার্য এই দ্বৈততার মধ্যেই ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। তিনি কোনও কাণ্ডকে একরৈখিক ভাবে বাতিল করেন না, আবার কোনও বিতর্ককে অবান্তর আবেগে ঢেকে রাখেন না। বরং তাঁর আলোচনায় উঠে আসে এক গভীরতর পাঠপ্রশ্ন: "আদিরামায়ণ মানে কি শুধুই বাল্মীকির রামায়ণ? নাকি রামায়ণ মানেই হাজার বছরের পাঠ-সংস্কার, বৈচিত্র্য ও বহুত্বের মিথোগুলির সমবায়?"
এই প্রশ্নের উত্তর তিনি পাঠকের মগজে ছেড়ে দিয়ে নিজে নীরব থাকেন। এবং এটাই একটি শক্তিশালী, দায়িত্ববান পাঠকোচিত মননের পরিচয়। কারণ এই আলোচনার লক্ষ্য কোনও নির্দিষ্ট 'সত্য' প্রতিষ্ঠা নয়, বরং 'সত্যের সম্ভাব্যতা' নিয়ে মননে আলো ফেলা।
৫) রামায়ণের রাজনৈতিক ব্যবহার ও তার প্রতিরোধ:
সমকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে রাম অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। এক দল রামকে তুলে ধরছে ধর্মরক্ষার প্রতীক হিসেবে, তো অন্য দল তাঁকে পিতৃতন্ত্রের রূপক হিসাবে খণ্ডন করছে। এই অবস্থায়, কে রাম? কোন রাম? রামের আসল কথাই বা কোথায়? এই প্রশ্নগুলির নিরপেক্ষ, প্রাজ্ঞ ও সহজ পাঠ অত্যাবশ্যক, যা ভট্টাচার্যের বইটি সফলভাবে সরবরাহ করে।
শূর্পণখার প্রসঙ্গে লেখকের আলোচনা বিশেষভাবে মনোযোগপ্রাপ্ত হওয়ার যোগ্য। অনেক সমসাময়িক পাঠে তাঁকে ধর্ষিতা হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা আছে, অথচ বাল্মীকি, কৃত্তিবাস কিংবা তুলসীদাস—কোনও মূল পাঠেই এরকম কোনও নির্দেশ নেই। এটি একটি মারাত্মক উদাহরণ যেখানে পাঠবিকৃতি পাঠকের মানস ও সমাজের নৈতিকতা দুটোকেই প্রভাবিত করে।
গত দুই দশকে ভারতীয় জনজীবনে রাম ও রামায়ণ শুধু সাহিত্য বা ধর্মীয় কাব্যরসের বিষয় নয়, এক চূড়ান্ত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে উঠেছে। একদিকে রামের নাম ধরে ধর্মীয় একতা ও নৈতিক শৃঙ্খলার ডাক, অন্যদিকে তাঁর নামেই বিভাজন, বিদ্বেষ ও জাতিগত-বর্ণগত মেরুকরণ।
“रामो विग्रहवान् धर्मः।”
(বাল্মীকির রামায়ণ, অরণ্যকাণ্ড 9.11)
অর্থ: রামই হলেন ধর্মের মূর্ত প্রতীক।
কিন্তু প্রশ্ন হল, কোন ধর্ম? মানবধর্ম, নাকি কোনও বিশেষ মতাদর্শের একচোখা ব্যাখ্যা?
এই দ্বন্দ্বে ভট্টাচার্যের বইটি যেন টর্চলাইটের মতো কাজ করে। তিনি ধর্মীয় আবেগকে অস্বীকার না করেও, রামের রাজনৈতিক appropriation-এর বিরুদ্ধে এক ধরনের বৌদ্ধিক প্রতিরোধ রচনা করেছেন।
ভট্টাচার্য স্পষ্ট করে দেখান, বাল্মীকির রাম সেই রকম কোনও ‘আদর্শ পুরুষ’ নন, যাঁর কোনও প্রশ্ন করা যাবে না। বরং তিনি এক flesh-and-blood রাজপুত্র—যিনি সিদ্ধান্ত নেন, ভুল করেন, সংশোধন করেন এবং সেই প্রক্রিয়াতেই পূর্ণতা লাভ করেন। এই রাম ‘ভক্তিযোগ্য’ না-হলেও, পাঠযোগ্য ও বোধ্য এক মানবিক চরিত্র।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে শূর্পণখার আলোচনা। সাম্প্রতিক কালে একাধিক সাহিত্যকর্ম, নাট্যরূপ এবং সোশ্যাল মিডিয়া-ভিত্তিক নারীবাদী চর্চায় শূর্পণখাকে “ধর্ষিতা” রূপে দেখা হয়েছে—যা পাঠবিকৃতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। অথচ বাল্মীকির রামায়ণ, কৃত্তিবাসের পাঁচালী, কিংবা তুলসীদাসের রামচরিতমানস—কোনও মূলপাঠেই এর ভিত্তি নেই।
“यस्य धर्मार्थयोरर्थं यशः कामं च नानयन्।
धृतिं न विप्रमुच्येत स वै पुरुष उच्यते॥”
(অযোধ্যাকাণ্ড, 2.1.23)
অর্থ: যে ধর্ম, অর্থ, কাম ও যশ—এই চতুর্বিধ পুরুষার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, তিনিই প্রকৃত পুরুষ। এই ভারসাম্যের ধারণাই যেন আজ হারিয়ে যাচ্ছে জনচেতনায়, এবং সেটিকে ফিরিয়ে আনার প্রয়াসই লেখকের।
এমনকি ‘অগ্নিপরীক্ষা’ অধ্যায়েও লেখক প্রশ্ন তোলেন, রামের ‘নির্মমতা’ আদৌ তাঁর চরিত্রের সঙ্গে মানানসই কি না। যে রাম সর্বদা সত্য ও সংযমের পক্ষে, তিনি কি সত্যিই সীতাকে আদেশ দিয়েছিলেন অগ্নিতে প্রবেশ করতে?
এই সব আলোচনায় লেখক কোনও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েননি, বরং নির্মোহ এবং নির্ভুল পাঠ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাঠকের হাতেই প্রশ্ন ফেলে দেন। এটাই এই বইয়ের সর্বাপেক্ষা বড় গুণ: সে রাজনৈতিক নয়, প্রতিক্রিয়াশীল নয়, প্রজ্ঞাস্নাত।
৬) পরিশিষ্ট: ইতিহাসের পাঠ, রূপকের প্রকৃতি
এই বই পাঠককে এক দার্শনিক ও ঐতিহাসিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমরা কি ইতিহাস পড়ি, না কি রূপকের ছায়ায় ইতিহাস নির্মাণ করি? রাম যে কেবল পুরাণের চরিত্র নন, তা বহুদিন ধরেই ভারতীয় জনমানস বিশ্বাস করে এসেছে; কিন্তু আজকের দিনে, গবেষণাও সেই বিশ্বাসকে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চার মাপকাঠিতে অনেকাংশে সমর্থন দিয়েছে।
ভট্টাচার্যের আলোচনার মূলস্রোত এই দ্বৈততার মধ্যেই ভেসে চলে—রাম, যিনি একাধারে মানুষ ও পুরুষোত্তম; আর রামায়ণ, যা একাধারে মহাকাব্য ও নৈতিক গ্রন্থ।
তাঁর কথোপকথন পাঠককে এই রূপান্তরযাত্রার ভিতর টেনে নিয়ে যায়—যেখানে রাম কেবল ঈশ্বর নন, বরং ‘নরোত্তম’ এক পুরুষ, যিনি দ্বিধা করেন, সিদ্ধান্ত নেন, আত্মত্যাগ করেন। এই রাম কেবল পূজার বা মঞ্চস্থ করার নয়—এই রাম আমাদেরই প্রতিবিম্ব, একটি সমাজের, একটি রাষ্ট্রচেতনার এবং আত্মসন্ধানরত নৈতিক মনের প্রতিনিধি।
রাম ছিলেন কি? এই প্রশ্ন অনেকেরই মনে আসতেই পারে। এবং এ নিয়ে ভারতের বেশ কয়েকটি গবেষণা সংস্থা ইতিমধ্যেই কাজ করেছে। ISRO-র প্রাক্তন বিজ্ঞানী Dr. Pushkar Bhatnagar তাঁর Dating the Era of Lord Ram গ্রন্থে বাল্মীকির রামায়ণ-এ বর্ণিত নক্ষত্র ও গ্রহের অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন—রামের জন্ম হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫১১৪ অব্দে, ১০ই জানুয়ারি, দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে। ঐ দিন ও সময়ে— “চৈত্র মাসে, শুক্ল পক্ষের নবমী তিথিতে, পুনর্বসু নক্ষত্রে, কর্কট রাশিতে চন্দ্র অবস্থান করছিল, এবং পাঁচটি গ্রহ—সুর্য, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনি—আপন আপন উচ্চস্থানে অবস্থান করছিল।”
এমন জ্যোতিষসংগত ঘটনা একমাত্র ওই সময়কালেই ঘটে, যা বাল্মীকি বর্ণিত রামের জন্মকে বাস্তবের নিরিখে একটি স্পষ্ট কালরেখা দেয়।
অর্থাৎ রাম ছিলেন, এবং তাঁর জীবন ছিল এক গভীর মানবিক ইতিবৃত্ত, যা অলৌকিকতা ও ধর্মের মোড়কে ঢেকে রাখা হয়েছে কাব্যের অনন্ত উপচারে।
এই বই তার পাঠককে—ভক্ত, ঐতিহাসিক, সন্দেহবাদী এবং কৌতূহলী—সবার জন্য একটি আলোচনার টেবিলে এনে বসায়। রাম এখানে দেবতা নন, একজন রাজপুত্র; রামায়ণ এখানে মিথ নয়, সমাজ-মনস্তত্ত্বের ধারাবাহিক পাঠ।
ভট্টাচার্যের নির্মোহ কণ্ঠে, পাঠক অনুভব করে—রাম কেবল ভক্তির বস্তু নন, প্রশ্নেরও ক্ষেত্র। এবং এই প্রশ্ন করাটাই, একবিংশ শতকের ভারতীয় পাঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।
৭) উপসংহার: পাঠের অন্বেষণ, পঠনচিন্তার নবজন্ম
বাল্মীকির রামায়ণে নেই শুধুই একটি বই নয়—এ এক পাঠের প্রকল্প, এক বুদ্ধিদীপ্ত যাত্রাপথ, যেখানে পুরাণ, ইতিহাস, সাহিত্য আর রাজনীতি ছায়াপথের মত মিশে যায়। যে কোনও রামায়ণ-রসিক, পাঠপ্রেমী, গবেষক, বা এমনকি একজন সাধারণ পাঠক যিনি ছোটবেলায় একবার ‘লক্ষ্মণের রেখা’-র গল্প শুনে চোখ গোল করেছিলেন—তাঁর জন্য এই বই এক অনিবার্য পুনর্পাঠের আহ্বান।
যে সময়ে 'রাম' হয়ে উঠেছেন ভোটের প্রতীক, পোস্টারের নায়ক, আর সোশ্যাল মিডিয়ার মিম-মন্দির, সে সময়ে রাজা ভট্টাচার্যের এই বইটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যসন্ধ রামের ঠিকানা এখনও শুধু বাল্মীকির পঙক্তিতে লুকিয়ে আছে, অন্য কোথাও নয়।
এই বই আমাদের শেখায়—পাঠ মানেই প্রশ্ন তোলা, খুঁটিয়ে দেখা, আর অন্ধ অনুসরণের বদলে আত্মজিজ্ঞাসায় জেগে ওঠা।
“न हि ज्ञानेन सदृशं पवित्रमिह विद्यते।”
(Bhagavad Gita, 4.38)
অর্থ: “এই জগতে জ্ঞানসম পবিত্র কিছু নেই।”
অলমতি বিস্তরেণ।