লক্ষ্মণ গণ্ডি কেটে সীতাকে বলে গেলেন, এর ভিতরে থাকলে রাবণের তাঁকে স্পর্শ করার সাধ্যি নেই ৷ সীতা সেই নিষেধ অমান্য করলেন ৷ ফলে...? রামের নাম লিখে যেই-না জলে ছুড়ে দেওয়া হল শিলা, অমনি তা ভাসতে লাগল !... লঙ্কার যুদ্ধের শেষে রাম তো সীতাকে অগ্ণিপরীক্ষা দিতে বললেন !... এমন হাজারো ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে রামায়ণের কাহিনি হিসাবেই সজ্জিত আছে ৷ আর রামায়ণ মানেই যে আদিকবির অর্থাৎ বাল্মীকির রচনা---তা কে না জানে! মজার কথা হল, উপরে ওই যা যা পড়লেন তার একটাও বাল্মীকি-বিরচিত রামায়ণে নেই ৷ এরা আমাদের কাছে এসেছে নানান সূত্র থেকে ! এই বই চেষ্টা করেছে সেই ‘নানান সূত্র’-গুলোকে আলাদা করার ৷ লেখক উত্তর ভারতে সর্বাধিক প্রচলিত তিনটি রামায়ণী ধারার মধ্যে খানাতল্লাশি চালিয়েছেন মূল সূত্রটির খোঁজে ৷ নিশ্চিতভাবেই, এই বইয়ের প্রত্যেকটা লেখা পড়ার পর আপনিও অবাক হয়ে বলবেন, সে কী ! এসব বাল্মীকির রামায়ণে নেই?
ভারতীয় মহাকাব্যের এপিক ফেস-অফে আমার পাঠক সত্ত্বা হয়তো মহাভারতের প্রতিই বেশি ঝুঁকবে। এই পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব নিয়ে, আজীবন সেই অমলিন অমৃত-সাগরে ডুব দিয়ে রয়েছি। যতই বড় হই, মন গিয়ে ঠাই গাড়ে ভারত-কথার জটিল রাজনীতি এবং মানব চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্বে। রামায়ণ বলতে পড়ে রয় ছোটবেলাটা। ছবির বই, পুরাণ কাহিনী, সপ্তাহান্তে কার্টুন সিরিয়াল। কতো গপ্পো, কতো মজা। মেলে রাম-রাবণের যুদ্ধ, সুকুমার রায়ের শক্তিশেল, রাবণের নাভিদেশ, সীতা দেবীর অভিমান এবং ঘরশত্রু বিভিষণেরা। সর্বোপরি, দেখা মেলে সেই মহাপরাক্রমশালী পবনপুত্রের অসাধারন সব কীর্তিকলাপ। একটা গোটা জেনারেশনের প্রথম সুপারহিরো।
মহাকাব্যিক রামায়ণ আধুনিক পৃথিবীতে, অনেকটা ব্রাত্য। আবার একই সাথে ভারতীয় সমাজের রাজনৈতিক প্রতিচ্ছবি প্রতি মুহূর্তে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে রাম নামের বজ্রনিনাদে। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। আজকের সময়ে দাড়িয়ে, তথাকথিত শিক্ষিত জ্ঞানী মানুষেরা যেন রামায়ণ নাম শুনলেই একটু তফাৎ বোঝেন। না বাবা, ওসবের মধ্যে আমরা নেই। রাম কাপুরুষ। পুরুষতান্ত্রিক বর্ম পরিধানে নিজ স্ত্রীর প্রতি কি অত্যাচারটাই না করলে। অমন মানুষ কি আবার আদর্শ হয় নাকি? ওদিকে আবার অপর প্রান্তের উগ্র ভক্তি ক্রিয়া, সঙ্গে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ - রামচন্দ্র সমানভাবে জর্জরিত। কোথাও গিয়ে যেন রাম নামে আস্থা হারিয়েছে মানুষে। আধুনিক সঙ্গায় রামচরিত্র আজ 'ওভাররেটেড'। একটা ভীষণ শক্তিধর পার্সোনালিটি কাল্টের মাঝে পিষে, হারিয়ে গেছেন আদিকবি বাল্মীকির মানব রাম। দড়ি ধরে মারো টান, রামচন্দ্র খানখান।
সেই নিরিখে দাড়িয়ে বারংবার একটা কথাই উপলদ্ধি হয়। একটিমাত্র চিরন্তন সত্য। ব্যক্তি রাম কে এরা আর যাই হোক চিনে উঠতে পারলে না। চেনবার ইচ্ছে বা মানসিকতা কোনোটাই তাদের নেই। সেই তারা, যাদের 'জয় শ্রীরাম' নিনাদে মিশে থাকে বিদ্বেষের অভিপ্রায়। সেই তথাকথিত ভক্তেরা যারা রাস্তায় নামে মিছিল বিবাদে, হাতে শোভা পায় উদ্ধত তরবারি। আবার সেই তারাও, যারা রামায়ণ জুড়ে প্রতিনিয়ত খুজে বেড়ায় বিস্তর অশুচি। ফেসবুক, টুইটার জুড়ে যাদের পাল্লায় রাম-লক্ষ্মণ আজ 'ক্যানসেল' হন প্রতিদিন। এদের মাঝে, "বিশাল বপু বই। সংস্কৃত জানি না। ইচ্ছে থাকলেও বাল্মীকি রামায়ণ পড়া হচ্ছে না" জাতীয় একটা দলেরও দেখা মেলে। বলতে লজ্জা নেই, আমিও কম বেশি, এদিকেরই সদস্য। সেখানে দাঁড়িয়ে, অধ্যাপক রাজা ভট্টাচার্যের এই অসাধারন বইখানি আমাদের জন্য যাকে বলে, হস্ত মাঝে চন্দ্ররুপে অবতীর্ণ।
প্রবন্ধের বইও এতো সুপাঠ্য হয়? গল্পচ্ছলে তরতরিয়ে এগোনো একুশখানা প্রবন্ধে লেখক বলছেন রামায়ণের এমন কিছু প্রচলিত গল্প, যা হয়তো বা আমার সকলেই জানি। লোকেমুখে প্রচলিত গল্পগুলো ভারতবর্ষ, বিশেষ করে উত্তর ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছিন্ন অংশ। তবুও একটু বিশদে জানলে দেখা যাবে, গল্পগুলো আদতে বাল্মীকির রামায়ণে নেই। লেখক কিন্তু এখানেই থেমে থাকছেন না। প্রায় গোয়েন্দাসুলভ গবেষণায় তিনি আতস কাঁচ ধরছেন কৃত্তিবাস ও তুলসীদাস বিরচিত রামায়ণেও। ধরতে চাইছেন প্রচলিত বিশ্বাসের মূল উৎসগুলোকে। তুলনামূলক নিরীক্ষণ দ্বারা জানতে চাইছেন রচয়িতাদের ব্যক্তিগত চিন্তাধারা, সেকালের সামাজিক অবস্থান এবং তাতে ধর্ম ও লোকাচারের প্রকোপ। প্রক্ষেপণ নিয়ে তো সকলেই সরব হয়। তবে সেগুলোর পেছনের ইতিহাসটার খোজ কম মানুষেই রাখে। লেখকের এই বইটি একটি বিপুল শ্রমসাপেক্ষ রত্নভান্ডার, বই কিছু নয়।
বইটি পড়ে হয়তো বা লক্ষ্মণ চরিত্রকে একটু অন্য নজরে দেখবেন। পাবেন সীতা দেবীর চিরাচরিত ত্রস্ত নমনীয়তার এক ভিন্ন রূপ। কালের নিয়মে যা রূপ বদলায় পুরুষতন্ত্রের প্রকোপে। আর অবধারিত ভাবে পাবেন সেই মানুষ রামচন্দ্রকে। আরোপিত দেবত্বের সুবিশাল মহীরুহের মাঝে, কখনো দলপতি, কখনো স্বামী, কখনো আবার পুত্র কেবল। সাধারণ থেকে অসাধারণত্বের দিকে এগিয়ে চলা এক মানুষ। দোষ-গুণ-ত্রুটি সহযোগে আমাদের গল্পের মহাকাব্যিক নায়ক, যে দিনশেষে নিজেকে দশরথ নন্দন হিসেবেই পরিচয় দিয়ে স্বস্তিবোধ করে। অশেষ ভ্রুকুটি মাঝেও যেন নিজ অজান্তে পূর্ণতা পায় এক সার্থক পরম-পুরুষ।
এহেন প্রবন্ধগুলোর পরিবেশনেও যে চমক থাকবে না, সেটা হয় না। লেখকের শ্রম হেতু প্রতিটি অধ্যায়ই তথ্যবিজড়িত, তবুও সবটা জুড়েই নিখাদ গল্পকথনের আমেজ। দোসর হিসেবে পরিবেশিত তার লেখকের জীবন থেকে তুলে নেওয়া ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা। বলাই বাহুল্য এতে বইখানির অসাধারণত্ব কমে নি, উপরন্তু পাঠক অভিজ্ঞতা গদ্যরসে সমৃদ্ধ হয়েছে। নয়া মুদ্রণে বইটির নতুন প্রচ্ছদও ঝা-চকচকে এবং যথাযথ। বাহাদুর চিত্রকর অঙ্কিত পটচিত্রে রাম, লক্ষ্মণ এবং সীতা দেবীর অবয়ব, নব কলেবরে এমন একটি বইয়ের শোভা বৃদ্ধির পক্ষে দারুণ উপযুক্ত। তবে বইয়ের অভ্যন্তরীণ অলংকরণ ভীষণ শিশুসুলভ, এটা আক্ষেপ। কিন্তু এটুকু হলফ করে বলাই যায়, যে একবার বইটি নিয়ে বসলে আপনার আর ছবিটবি দেখবার অবকাশ থাকবে না।
যাইহোক...অনেক বেশি কথা বললাম বটে, অনেক হলো। যান তো যান, ওই আদিপুরুষ না দেখে, বইটাই পড়ে ফেলুন। কিস্যু হারাবেন না মশাই। কিস্যু না। এ এক অসাধারন অভিজ্ঞতা। অ সা ধা র ন।
রাম! আসমুদ্রহিমাচল ভারতবর্ষকে যুগ-যুগ ধরে প্রভাবিত করে চলা এই ছোট্ট শব্দটা গত কয়েক দশকে হয়ে উঠেছে অস্ত্র। ওটির সাহায্যেই গড়ে তোলা হয়েছে এক নারায়ণী সেনা— যে বিবেকের তোয়াক্কা করে না, শুধু আদেশ মানতে জানে। সেই সঙ্গেই অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রামায়ণ নামের মহাকাব্যটি। সহস্রাব্দী ধরে মানুষকে মোহিত, ভাবিত, প্রাণিত করে চলা ওই রচনাটি ইদানীং বড়ো বেশি কাটাছেঁড়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠেছে তার নানা বর্ণনা, নানা চরিত্র নিয়ে। কিন্তু রামায়ণ নামে আমরা যা শুনি, পড়ি, দেখি, তার সবটাই কি বাল্মীকির রামায়ণে আছে? না। নেই। এই নিয়েই লেখা হয়েছে আলোচ্য বইটি। একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রাক্কথন এবং অন্তে 'গ্রন্থফল' ছাড়া এই বইয়ে যে-সব প্রসঙ্গ চর্চিত হয়েছে তারা হল~ ১. বাল্মীকি'র উৎস-সন্ধানে ২. রাম না-জন্মাতেই রমায়ণ ৩. ইন্দ্রজিতের মৃত্যুরহস্য ৪. মারীচের প্রকৃত সংবাদ ৫. ঠুমক চলত রামচন্দ্র ৬. আগুন দেখেছি আমি... ৭. সীতাহরণ পালা: লক্ষ্মণের গণ্ডি ৮. সীতাহরণ পালা: শূর্পণখা উবাচ ৯. সীতাহরণ পালা: সীতা উবাচ ১০. তরণীসেন বধ ১১. ঘরশত্রু বিভীষণ ১২. শবরীর প্রতীক্ষা ১৩. ভরদ্বাজের আমন্ত্রণে... ১৪. ছায়াসীতা ১৫. অহল্যা-উদ্ধার ১৬. অকাল-বোধনে আমি তোমাকে চাই... ১৭. সেতুবন্ধনম্ ১৮. হনুমানের সমুদ্রলঙ্ঘন ১৯. রাবণের হরধনু-ভঙ্গ ২০. নায়ক থেকে পরমপুরুষ এই বইয়ের ভালো দিক কী-কী? প্রথমত, এত সহজ ভাষায়, এত সরস ভঙ্গিতে, অথচ প্রতিটি প্রাসঙ্গিক তথ্য উল্লেখ করেও যে এমন একটি 'প্রবন্ধের বই' লেখা যায়, এ-জিনিস আলোচ্য বইটি না পড়লে বিশ্বাস হওয়া কঠিন। অথচ এও স্বীকার্য যে এই বইটি পড়লে রামায়ণ নিয়ে যেকোনো (আজ্ঞে হ্যাঁ, যেকোনো) পাঠকের রামায়ণ-ভাবনা বড়োসড়ো ধাক্কা খাবে। যেহেতু প্রতিটি তথ্যসূত্র দেওয়া আছে, তাই একে নির্দ্বিধায় রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতেও আমরা কেউই দ্বিধা বোধ করব না। দ্বিতীয়ত, বাল্মীকি'র রামায়ণ যে এক বীরগাথা— সরলতম ভাষায় সেটি প্রায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন লেখক। তার পাশাপাশি, এই অতি সংক্ষিপ্ত পরিসরেও তিনি বারংবার বুঝিয়ে দিয়েছেন, ঠিক কীভাবে সময় ও সমাজের নিগড়ে বাঁধা পড়ে একটি মহাকাব্য। বিভিন্ন প্রসঙ্গ ও ঘটনাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে কৃত্তিবাস ও তুলসীদাস ঠিক কীভাবে নিজেদের মতো করে গড়ে নিয়েছেন রামায়ণ তথা রাম-কে— তা এই বই প্রমাণ করেই ছেড়েছে। তৃতীয়ত, রহস্যভেদীর মতো করে লেখক বাল্মীকির মূল টেক্সট থেকে বিচ্যুতির অংশগুলোই শুধু নয়, তাদের পেছনে থাকা পৌরাণিক সূত্রদেরও দেখিয়ে দিয়েছেন একে-একে। ফলে থ্রিলারাসক্ত পোস্ট-মডার্ন পাঠকের কাছেও এই বইটি অনায়াসে পাঠযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। চতুর্থত, লেখাটি নিছক প্রবন্ধের স্তর ছাপিয়ে ব্যক্তিগত গদ্য হয়ে উঠেছে নানা স্থানে। সেই কথাগুলো থাকার ফলে লেখা ফোকাস হারায়নি, বরং বহু স্মৃতির মেঘ এসে নরম করে দিয়েছে বর্তমানের রোদজ্বলা আকাশকে। এতে বইটি সুখপাঠ্য তো হয়েইছে, পাশাপাশি পাঠকের অখণ্ড মনোযোগ নিজের দিকে আকর্ষণ করে নিতেও সক্ষম হয়েছে সে। এই বইয়ের খারাপ দিক কী-কী? ১) এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ, প্রায় বৈপ্লবিক বইয়ের সঙ্গে এই চাঁদমামা-লাইট প্রচ্ছদ আর ভেতরে বসে-আঁকো প্রতিযোগিতায় সান্ত্বনা পুরস্কার-বিজেতা লেভেলের অলংকরণ করানোর আইডিয়া কার মাথা থেকে বেরিয়েছিল, জানতে মন চায়। বিশ্বাস করুন, আমা-হেন চন্দ্রদ্বীপবাসীর স্টকেও অপশব্দ নেহাত কম নেই। সেগুলো দিয়ে শিল্পী ও তার নিয়োগকর্তাটিকে বিভূষিত না করা অবধি ঠিক শান্তি হচ্ছে না। পরবর্তী সংস্করণে এমন বালখিল্য কীর্তির বদলে যথাযথ প্রচ্ছদ ও অলংকরণ দেখতে চাই— ব্যস! ২) বইটিতে বেশ কিছু বানান ভুল আছে। এখানে পৃষ্ঠা বা অনুচ্ছেদ ধরে বলার ইচ্ছে হচ্ছে না, কারণ এখনও বইটার লেখায় মজে আছি। কিন্তু পরবর্তী সংস্করণ প্রকাশের আগে একেবারে কড়া করে প্রুফ দেখিয়ে নিলে ভালো হয়। ৩) বইটির কয়েকটি লেখা লকডাউনের মধ্যে ওয়েব-পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী পর্বটি লিখতে বসে লেখক পাঠকদের স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য "আমরা আগেই দেখেছি", "আগেই জানি" ইত্যাদি বাক্যাংশ ঘন-ঘন ব্যবহার করেছেন। কিন্তু গ্রন্থাকারে সন্নিবিষ্ট হওয়ার সময় সেই কথাগুলো বাদ দিলেই ভালো হত। পরবর্তী সংস্করণে এই পরিমার্জনাটিও কাঙ্ক্ষিত। কিন্তু সবার উপরে, বা সবার শেষে আসল কথা একটিই— বইটা অসাধারণ! রাজনীতির জয়শ্রীর আম ভুলে যান। এই বই আমাদের নিয়ে যায় গল্পময় ভারতবর্ষের হৃৎপিণ্ড হয়ে দীপ্যমান এক মহাকাব্যের আঙিনায়। সেখানে থেবড়ে বসে চেনা হয়েও অচেনা গল্পটা শোনার সুযোগ করে দেন লেখক। তাতে আপনার পাশে চুপটি করে এসে বসে এই সময়, সমাজ, দেশ...কাল!
আচ্ছা, গল্প, উপন্যাস, কবিতা, রম্যরচনা তো নাহয় একরকম বুঝলুম। সময় কাটে, মন ভালো হয়, আনন্দ পাই, এক অন্য জগৎ খুলে যায় চোখের সামনে যার রঙ-রস-রূপ এই ধোঁয়া-ধুলোর দিনযাপনের পৃথিবীর চেয়ে ঢের সুন্দর। কিন্তু প্রবন্ধ?
এইখানে হালকা চালে গড়গড়িয়ে ভেসে যাওয়া ভাবনা হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। বলি, তত্ত্ব আর তথ্য কি স্কুল-কলেজে নেহাৎ কম পড়া হয়েছিল গা? ঐ দ্যাখো, লুকোচ্ছ কই? সেসব যে তখন পড়তে বেজায় অপছন্দ করতে, সে কি আর আমি জানি না? সেই অপছন্দের ফিরিস্তিতে যে সবচেয়ে উপরদিকে থাকত মূলত থিওরিশোভিত পেপারগুলো, সেটাও ভুলিনি বাপু, হুঁ হুঁ!
তাহলে অমনধারা কাজকম্মো ফেলে, লেপের নিচে থেবড়ে বসে চোখ গোল, মুখ হাঁ আর স্বল্পকেশ মস্তক ঘর্মাক্ত করে, ‘তিব্বতী গুহার ভয়ঙ্কর’ মার্কা বইপত্র না পড়ে এইটে পড়ছ কেন হে? জানো না এটি একটি প্রবন্ধের বই (ঢোঁক গেলা), তার বিষয় আবার মূল সংস্কৃতের বাল্মীকি-রামায়ণ (আবার ঢোঁক গেলা), আর যিনি লিখেছেন তিনি এক পণ্ডিত, সংস্কৃতজ্ঞ, বাংলাভাষার শিক্ষক? (ঢোঁক গিলতে গিয়ে বিষম লাগা, থাবড়া, জল ও ষাট-ষাট পর্ব)
মুশকিল হচ্ছে, এগুলো জেনে-টেনেও, বইটাকে যথোপযুক্ত সমীহ করে তাকে তুলে রাখা গেল না। পড়তে হল, পাতার পর পাতা উলটে পরিচ্ছেদ শেষ করতে হল, শেষ করে মুগ্ধ হয়ে বসে থাকতে হল, তারপর সময় নেহাৎ নেই জেনেও পরের পরিচ্ছেদ ধরে ফেলতে হল, তারপর শেষ করতে না পেরে আবার ফ্রি না হওয়া অবধি মনে মনে আকুলিবিকুলি হতে হল, তারপর সেই পরিচ্ছেদ শেষ করে আরও বেশিক্ষণ চুপ করে বসে থাকতে হল – এই করতে করতে পুরোটাই পড়ে ফেলতে হল।
তারপর? যাকে পাচ্ছি তাকেই ধরে, ‘পড়ো শিগগির, নইলে তোমার আজি প্রাতে সূর্য ওঠা (মেঘে ঢাকা দিন হয়ে থাকলে ওটা ‘আজি প্লেটে পাটিসাপটা’) সফল হবে না!’ করে আক্রমণ করছি।
বইটা কী নিয়ে তা এদ্দিনে হয়তো সবাই জানেন। খুব সংক্ষেপে বলি, রামায়ণের ঘটনা বলে বহু কথা বাঙালীর চিন্তায়/জ্ঞানে/লব্জে চালু আছে, যেগুলো বাল্মীকির মূল লেখায় আদৌ ছিল না। বা সম্পূর্ণ অন্য কোনও রূপে ছিল। যেমন ধরুন - আহা এই একটা বললে স্পয়লার হয় না, তাছাড়া এটা বইয়ের পিছনের ব্লার্বেই আছে - লক্ষ্মণের গণ্ডি কাটা। বাল্মীকির লেখায় ওটি... নেই! এরকম কত কিছু নেই, কত কিছু চমকপ্রদ রকমের অন্যরকম – তা এই বইয়ের একুশটি অধ্যায়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন রাজা ভট্টাচার্য। অধ্যায়গুলি, বা কী আছে আর কী নেই এসব আলোচনায় যাচ্ছি না, কারণ আগেই বলেছি আমি তত্ত্ব-টত্ত্বকে বেজায় ডরাই! বরং কেন এ বই আমার এত ভালো লেগেছে সেই সদামাটা কথাগুলো বলি।
প্রথমত, বিষয়। এমন নিবিড় আলোচনার জন্য মূল সংস্কৃত ও অন্যান্য ভাষার রামায়ণগুলির যে কী গভীর পাঠ করতে হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। এই প্রবল পরিশ্রমের ফলটি আমরা সহজ সুললিত বাংলায় দুই মলাটে পেয়ে যাচ্ছি, এ কি এক বিশাল প্রাপ্তি নয়? এই জ্ঞানার্জনের লোভেই না জ্ঞানসাগরের তীরে উঁকিঝুঁকি মারতে আসা। সেখানে এ যে সমুদ্রে ডুব না দিয়েও মুক্তো পেয়ে যাচ্ছি হাতের মুঠোয়, ছাড়ে নাকি কেউ!
দ্বিতীয়ত, ওই যে বললুম, সহজ সুললিত ভাষা! প্রবন্ধ বলতে আমরা সাধারণত যে তৎসমশব্দসঙ্কুল তর্কভারাক্রান্ত বাক্যালংকারগর্বিত থান-ইটতুল্য শুষ্ক দুরূহ বস্তু বুঝি, এটি তার ধারেকাছেও যায় না। এ বইয়ের আলোচনা, বিশ্লেষণ, যুক্তি, তর্ক, উদাহরণ- সব চলে বেজায় চেনা ঘরোয়া বোলে, যে ভাষা সবাই বোঝে, যে ভাষা সবার প্রাণে দোলা দেয়। সংস্কৃত শ্লোকটি বুঝিয়ে দেবার গুণে সবার হৃদয়গ্রাহ্য হয়ে ওঠে, যুক্তি আপন স্বচ্ছন্দ বিস্তারে বিজ্ঞান বুঝিয়ে দেয়, ‘ঠুমক চলত রামচন্দ্র’কে দিব্যি চেনাপরিচিতির গণ্ডির মধ্যে বসিয়ে ফেলা যায়। পড়তে, বুঝতে এমনকী ভাবতেও হয়তো অনেকেই পারেন, কিন্তু সেই ভাবনার ফসলকে সর্বজনের আয়ত্তে আসার মতো সহজ করে বুঝিয়ে বলতে খুব কম লোক পারেন। রাজা ভট্টাচার্য এক্ষেত্রে পেরেছেন।
তৃতীয়ত, এবং আমার কাছে এইটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ – এ বই সরলরৈখিকভাবে ‘বাল্মীকির লেখায় অমুকটা ছিল না, তার বদলে সেখানে এই তমুক ছিল, এবং পশ্য পশ্য, তৎবিপরীতে কৃত্তিবাস বা তুলসিদাস এই তৃতীয় রূপে বর্ণনা করেছেন সেই কথা’ – শুধু এইটুকুই বলে না। লেখক সযত্ন এবং সযুক্তি আলোচনায় এই দ্বিতীয় বা তৃতীয় রূপ কেন এসেছিল, কীভাবে এসেছিল সেটাও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ফলে বাল্মীকির কাল, তুলসিদাসের কাল এবং বাঙালির সবচেয়ে পরিচিত কৃত্তিবাসের কাল – এই তিন সময়ের ইতিহাস, সমাজ, যুগধর্ম, লোকাচার, অভ্যাস, ধর্মাচরণের ভেদাভেদ, পরিবেশ-পরিস্থিতি সমস্ত কিছুর তুলনামূলক বিচার তাঁর লেখায় পদে পদে উঠে এসেছে। তিনি দেখিয়েছেন কালে কালে কীভাবে পালটে গেছে রামনামের উপস্থাপনা, কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে নারীর জায়গা পরিবর্তিত হয়েছে, কীভাবে স্থানীয় লোকাচারের প্রভাবে বদলে গেছে সৎ বা অসৎ আচরণের ধারণা।
এগুলি তেমন প্রবন্ধ নয় যা শেষ অবধি শুধুই তথ্যের সমাহার, এগুলি পাঠককে জানার সঙ্গে সঙ্গে ভাবতেও বাধ্য করে। ভাবায় নিজের দেশের আসল রূপটি নিয়ে,স্বজাতির এক অতুল ইতিহাস নিয়ে, যে অনন্যসাধারণ একজন মানুষকে বাল্মীকি তাঁর নির্মম ও সৎ কলমে রচনা করেছিলেন সেই রামচন্দ্রকে নিয়ে। পাঠকের হাত ধরে, ‘জানিস, সেদিন কী হয়েছিল!’র সহজতায়, গল্পে গল্পে এই ভাবার রাস্তাটিতে এনে পৌঁছে দেওয়াই এই বইয়ের সেরা কৃতিত্ব।
ফিরে যাব শুরুর কথায়? এ বই পড়লে সময় কাটবে, মন ভালো হবে, আনন্দ পাবেন, এক অন্য জগৎ খুলে যাবে চোখের সামনে যার রঙ-রস-রূপ এই ধোঁয়া-ধুলোর দিনযাপনের পৃথিবীর চেয়ে ঢের সুন্দর।
শেষ করার আগে আর একটা কথা বলে যাই, সুমুদ্রিত বইটির দ্বিতীয় সংস্করণের প্রচ্ছদ অপূর্ব হয়েছে। বাহাদুর চিত্রকরের পটচিত্রে মহাকাব্যের গাম্ভীর্য এবং লেখকের লেখার সাবলীলতা দুই-ই অদ্ভুত সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে।
রামের নামে কত কথকতা কত কাহিনি। উত্তর কোশলরাজের রাজপুত্রের কাহিনি সূত্রপাত আদিকবি বাল্মীকি রচিত রামায়ণ থেকে। তারপর রামায়ণ গান হিসেবে তা বিস্তৃত হতে থাকে ভারতবর্ষের সর্বদিকে। ভারতবর্ষকে অতিক্রম করে তা চলে যায় পারস্য থেকে জাপানে। যত সীমা অতিক্রম করে ততই নিত্য নতুন ঘটনা তাতে যুক্ত হয়। সেই আদিকবির রচনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে ৩০০+ রামচরিত্র আখ্যান। এতো বিশাল সাহিত্যরাজিকে তুলনা করা অসম্ভব বটে। ফলশ্রুতিতে লেখক বেছে নেন উত্তর ভারতে ও বঙ্গে প্রচলিত তুলসীদাসকৃত রামচরিতমানস ও কৃত্তিবাস ওঝা রচিত রামপাঁচালিকে। আদিকবির রচনার সাথে এদুটোর সর্বাংশে তুলনা করলেও তা ঢাউস সাইজের গ্রন্থে রূপ নেবে। আর তা সর্বসাধারণের জন্যও সুখপাঠ্য হবে না। ফলে লেখক কেবল এই গ্রন্থে তুলে এনেছেন সেসকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই যা স্থানীয় রামায়ণে চলিত থাকলেও, লোকমুখে অধিক প্রচলিত থাকলেও তা নেই আদিকবির রচনায়। সাথে এসেছে কিছু মৌখিক কথা ও সেদিনকার মাইকেল রচিত "মেঘনাদবধ" মহাকাব্যে গায়ের জোরে লক্ষ্মণকে কলঙ্কিত করার বিষয়ও।
রামায়ণ নিয়ে আগে পড়া থাকায় এর অধিকাংশই জানা ছিল বটে। তবে লেখকের অনবদ্য উপস্থাপনায় মনে হচ্ছিল তা যেন নতুন করে জানছি। সেই সাথে বর্ণনার ঢং এবং লেখকের পূর্ববঙ্গের শিকড়ে লুকিয়ে থাকা "বাঙাল" কথ্য ভাষার যোজনা তাতে যেন সাহিত্য গুণেরই বৃদ্ধি করেছে। যদিও কিছু কিছু বিষয়ে লেখকের সাথে একমত নই তথাপি সর্বাংশে এ গ্রন্থ দারুণ, সেজন্যই পাঁচতারকা দিয়ে দিচ্ছি।
রামায়ণ নিয়ে কারো আগ্রহ থাকলে বা আদিকবির রাম ও আঞ্চলিক কবির রামকে চেনার জন্য আগ্রহ থাকলে অবশ্যই তাকে অনুরোধ করবো এ গ্রন্থটি একবার চেখে দেখার জন্য। আশাকরি কেউ হতাশ হবেন না।
এই মুহূর্তে ভারতের রাজনীতিতে রাম ও রামায়ণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। একদল রামের নামে পারলে মানুষ কেটে ফেলেন। অন্যদল আবার পারলে তার গুষ্টি উদ্ধার করে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন। রাম ও রামায়ণ এখন চরিত্র আর মহাকাব্যের গন্ডী ছাড়িয়ে গেছেন। সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই বইটি অনেক প্রচলিত ধোঁয়াশা কাটাতে সাহায্য করবে।
ইদানীং বেশ কিছু গ্রুপে যেমন রাবণকে নিয়ে বেশ ধনাত্মক সব প্রবন্ধ (চলতি ভাষায় হ্যাজ বলাই ভাল) তেমনই শুনতে হয় লক্ষ্মণ তো অন্যায় যুদ্ধে মেরেছে ইন্দ্রজিৎকে। প্রতিবাদ করতে গেলে শুনতে হয় 'রামায়ণের অনেক ভার্সন, মধুসূদন কি না পড়ে লিখেছেন?' এখন মধুকবি যে ফ্যানফিকশনই লিখেছেন মেঘনাদবধ কাব্যে, তা বললেই কিছু লোকের চূড়ান্ত রাগ হয় তখন আবার বিশেষ রাজনৈতিক দলের পোষ্য হবার খেতাব জুটে যায়। এমনকি এও শুনতে হয় শূর্পণখা ধর্ষিতা হয়েছিলেন। যদিও শূর্পণখা উবাচ শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়লে তাকেই অন্য কারোর ধর্ষণের কারণ বলে মনে হয়; যেভাবে বর্ণনা দিয়ে রাবণকে বারবার উত্তেজিত করার চেষ্টা করেছেন তা সুবিবৃত। মহাকাব্যটি নিয়ে আলোচনা বা প্রবন্ধের আড়ালে লেখক, বাল্মীকির রত্নাকরত্ব ঘুচিয়েছেন যেমন সুন্দর যুক্তিতে, তেমনই সাবলীল ভঙ্গিতে মধুকবির চাপিয়ে দেওয়া কলঙ্কের দায়ভার থেকে মুক্ত করেছেন রামানুজকে। এরপরে আসি অগ্নিপরীক্ষা। উফ, সে আরেক 'হট টপিক'; শুধু তাই নয়, রামকে গালাগাল দেবার আর সেই সঙ্গে 'আমার রাম তোমার রাম' করে নিজেকে বিজ্ঞ প্রমাণ করার এক সুবর্ণ সুযোগও। একদম নিরপেক্ষ ভঙ্গিতে অগ্নিপরীক্ষা প্রসঙ্গে রামের কলঙ্কমোচনের দায় নিয়েছেন লেখক এবং তাতে তিনি সম্পূর্ণ সফল। সীতা, অহল্যা প্রসঙ্গে সমাজ কীভাবে নারীকে পিছিয়ে দিয়েছে সে বর্ণনা ও যুক্তিজাল আমাকে মুগ্ধ করেছে। প্রতিটি প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা করলাম না। অদ্ভুত আবেশ ঘিরে রেখেছে আমাকে। তবে কী কী প্রবন্ধ আছে তার একটি তালিকা দিলাম, উৎসাহীরা দেখে নিন।
বইটির সবথেকে বড় গুণ এটি রামায়ণ সংক্রান্ত আলোচনার বই, সেই অর্থে প্রবন্ধের বই অথচ ভাষাটি পড়লে মনে হবে পাশের বাড়ির জেঠু অফিস সেরে এক কাপ চা হাতে নিয়ে ছোটছোট ভাইপো ভাইঝিদের রামায়ণের সারসত্য শেখাতে বসেছেন। সেখানেই জিতে গেছে লেখনী।
তবে কয়েকটি মুদ্রণপ্রমাদ কষ্ট দিল। প্রচ্ছদ এবং অলঙ্করণ এই বইয়ের উপযুক্ত বলে মনে হয়নি। দুঃখিত। লেখক পরিচিতিতে দেখলাম রামায়ণের মহাসমুদ্র থেকে তুলে আনা এটিই প্রথম ঝিনুক। তাই আশা রাখি এমন আরও অনেক ঝিনুক আমাদের করায়ত্ত হবে ভবিষ্যতে। এই অবশ্যপাঠ্য বইটি মহাকাব্যপ্রেমীরা যদি এখনও সংগ্রহ না করে থাকেন তবে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিন। পাঠ শুভ হোক।
রাজা ভট্টাচার্যের এই গ্রন্থটি রামায়ণ বিষয়ক প্রচলিত বয়ানগুলিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা। শুধু ধর্মীয় বা পৌরাণিক আবহ নয়, রামায়ণের বহুল প্রচলিত উপস্থাপনগুলির মধ্যেকার অমিল, রূপান্তর এবং উপেক্ষিত স্তরগুলিকেই এখানে বিশ্লেষণের কেন্দ্রে আনা হয়েছে।
গ্রন্থটি গঠিত হয়েছে একগুচ্ছ প্রবন্ধের মাধ্যমে, যেখানে বাল্মীকি রচিত মূল সংস্করণের নিরীক্ষার পাশাপাশি পরবর্তী কা���ের নানা ব্যাখ্যা ও ব্যতিক্রমকে আলোচনায় আনা হয়েছে। আলোচ্য বিষয়গুলো হলো: ১. বাল্মীকি'র উৎস-সন্ধানে ২. রাম না-জন্মাতেই রমায়ণ ৩. ইন্দ্রজিতের মৃত্যুরহস্য ৪. মারীচের প্রকৃত সংবাদ ৫. ঠুমক চলত রামচন্দ্র ৬. আগুন দেখেছি আমি... ৭. সীতাহরণ পালা: লক্ষ্মণের গণ্ডি ৮. সীতাহরণ পালা: শূর্পণখা উবাচ ৯. সীতাহরণ পালা: সীতা উবাচ ১০. তরণীসেন বধ ১১. ঘরশত্রু বিভীষণ ১২. শবরীর প্রতীক্ষা ১৩. ভরদ্বাজের আমন্ত্রণে... ১৪. ছায়াসীতা ১৫. অহল্যা-উদ্ধার ১৬. অকাল-বোধনে আমি তোমাকে চাই... ১৭. সেতুবন্ধনম্ ১৮. হনুমানের সমুদ্রলঙ্ঘন ১৯. রাবণের হরধনু-ভঙ্গ ২০. নায়ক থেকে পরমপুরুষ
গ্রন্থটিতে রামায়ণের বহু সংস্করণ—বাল্মীকি, কৃত্তিবাস, তুলসীদাস প্রমুখ—এসবের তুলনামূলক পাঠ ও পাঠান্তর বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। কীভাবে সময়, সমাজ, এবং রাজনৈতিক চাহিদা একটি মহাকাব্যের আখ্যান ও চরিত্রদের রূপান্তরিত করে দেয়, তা এই বইয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বইটির ভাষা সরল, রচনাশৈলী সাবলীল এবং আকর্ষণীয়। প্রবন্ধ হলেও তাত্ত্বিক ভারাক্রান্ত নয়, বরং বোধগম্য ভাষায় লেখক তাঁর বক্তব্য পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে কেবল পুরাণ-মনস্ক পাঠক নয়, ইতিহাস বা সাহিত্য-রসিক সাধারণ পাঠকের কাছেও বইটি সমানভাবে উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
বইটির প্রচ্ছদ ঠিকঠাক হলেও অলংকরণ বইটির বিষয়বস্তুর গভীরতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়; এদিক থেকে আরও যত্নবান হওয়া উচিত ছিল।
কিছু বানান ও প্রুফ রিডিং জনিত ত্রুটি পাঠে বিঘ্ন ঘটায়—যদিও তা সামগ্রিক মূল্যায়নে বড়ো সমস্যা নয়।
অতএব, আজকের সময়ে যখন রামায়ণকে রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা ক্রমবর্ধমান, তখন এই বই আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় রামায়ণের আদি-আখ্যান ও বিবর্তনের জটিল, বহুস্তর বিশ্লেষণে। এটি শুধুমাত্র রামায়ণ বিষয়ক আলোচনাকে সমৃদ্ধ করে না, বরং পাঠককে উদ্বুদ্ধ করে—পুনরায় ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং পুরাণের ভেতরে থাকা মানবিক গল্পগুলিকে নতুন করে অনুধাবন করতে। এখনো না পড়ে থাকলে শ্রীঘ্রই ভুল সংশোধন করুন। নমস্কার!