বিয়ে! আমাদের সমাজের বিয়েগুলো কতটা ইসলাম সম্মত আমাদের সবারই জানা। কেমন হবে একজন মুসলমানের বিয়ে? বিয়ের সময় মুসলিম পাত্র-পাত্রী বা তাদের অভিভাবকদের কি কি বিষয় মাথায় রাখা উচিত, বিয়ের সংকল্প থেকে শুরু করে পাত্র পাত্রী নির্বাচন,পাত্র-পাত্রীর গুণাবলী যাচাই, পাত্র পাত্রী দেখা, বিয়ের সমস্ত কার্যকলাপ সহ বাসর রাত পর্যন্ত সমস্ত বিষয়াদি এই বইয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এটা শুধু কোনো বই না, এটা বিয়ে বিষয়ক A to Z একটা বিস্তারিত গাইড লাইন।লেখক এত সহজ সাবলীল ও খোলামেলাভাবে বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন যে মনে হয়েছে তিনি যেন আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই বইয়ের প্রতিটি চ্যাপ্টার গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি এখন বিয়ে নিয়ে ভাবছেন, অথবা আপনার বাসায় বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে তাহলে এই বই আপনার অবশ্য পাঠ্য।
ইসলামে অন্যতম একটি চমৎকার বিধান হলো পরিবার ব্যবস্থা। নারী-পুরুষের বিয়ের মাধ্যমে যার সূচনা। ভালোবাসার পালাবদলে সময়ের চক্রঘুরে তাদের ঘরে আসে ‘চোখের প্রশান্তি’—সন্তান। সন্তানের বেড়ে ওঠা, তার তরবিয়ত নিয়ে বাবা-মায়ের জন্য ইসলাম সুস্পষ্ট নির্দেশনাবলী বয়ান করেছে। নেক সন্তান বাবা-মায়ের জন্য সদকায়ে জারিয়া-তুল্য! পরিবারগুলো যদি নিজেদের শুধরে নেয় ভুল পথ এবং ভুল মত থেকে, যদি নিজেদের সামলে নেয় অন্যায়-অনাচারের হলাহল থেকে, তাহলে সুস্থ-সঠিক সমাজ আপনাতেই নির্মাণ হয়ে যায়। আর সমাজের বিশুদ্ধতা মানেই দেশ-দশ-ধরণীর সাম্য-শান্তি বহাল থাকা।
মানব সভ্যতার এই আমূল পরিবর্তনের পেছনে পরিবারের অপরিসীম গুরুত্ব দিবাকরের ন্যায় দৃশ্যমান। ইসলাম নানাভাবে পারিবারিক শিক্ষা, সততার উপর গুরুত্বারূপ করেছে। পারিবারিক বন্ধনের সাথে জুড়ে থাকার প্রতি বিভিন্ন উপায়ে উৎসাহিত করেছে।
পরিবার ও পরিবারের লোকজনের সুস্থ বিকাশের অন্যতম সহায়ক—পরস্পরের প্রতি দায়বোধ। ঠিক এই জায়গাতে এসেই তথাকথিত আধুনিক বিশ্বের মিথ্যে খোলস খসে যাচ্ছে। পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ সম্পর্কই ভেঙে যাচ্ছে দায়বোধের অনুপস্থিতিতে! কারও কোনো কমিটমেন্ট না থাকায় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী কয়েকদিনের সস্তা আনন্দ-ফূর্তি শেষে থমকে যাচ্ছে।
২০১৬ সালে ইউরোপ-আমেরিকায় জন্ম নেওয়া ৫০% শিশুদের বাবা-মা এমন, যাদের বিয়ে হয়নি। ভাবা যায়, আজ থেকে কয়েক দশক পরে ইউরোপ-আমেরিকার অর্ধেক জনসংখ্যা হবে জারজ! পারিবারিক সমন্বয়হীনতায় এরাও কি একই কাজ করবে না? ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নামে সিদ্ধ হওয়া এসব কর্মের মন্দ প্রভাব কিন্তু সর্বজনীন। কয়েক বছরের লিভ টুগেদারের পরে আলাদা হয়ে যাওয়া, অবিবাহিত অবস্থায় সন্তানের অভিভাবক হওয়া, তারপরে আলাদা হওয়া, সিংগেল মাদার হওয়া—এককথায় এসকল ভঙ্গুর পরিবারে বেড়ে ওঠা বৈধ অথবা অবৈধ সন্তানরা দেশ-পরিবেশের জন্য স্বাভাবিক নয়, বরং আশঙ্কাজনক। পশ্চিমা গবেষকেরা তো এমনই বলছেন, এমনকি তারা এটাও বলছেন যে, যেসকল বিষয় ছেলে-মেয়েদের বিবাহহীন সম্পর্কের প্রতি উৎসাহ দেয়—সেসব নিয়ে যেন জ্ঞানীজনেরা নতুন করে ভাবেন। কারণ অবস্থা যদি এমনই থাকে, তাহলে তারা আগামী নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।
সুস্থ পরিবার ও সমাজ নির্মাণে বিয়ের ভূমিকা, বিয়ের প্রয়োজন—মোদ্দাকথা, মানবজীবনে বিয়ের বাস্তবতা নিয়ে ইসলামের রূপরেখা কী—বিবাহ-পাঠ বইয়ে সেসবের নানারূপ আলোচনা হয়েছে। উত্তর-আধুনিকতায় এসেও যখন রাষ্ট্র-মহারাষ্ট্র মিলে সভ্যতাজুড়ে অসভ্যতার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে, এবং এসবকেই অনিবার্য করতে চাইছে, এহেন পরিস্থিতিতে ইসলামিক ডিসকোর্সে এর কতো সহজ প্রতিকার রাখা হয়েছে—সেসবই যেন পরিচিত আলাপচারিতার ভঙ্গিতে বিবাহ-পাঠ বইয়ে ওঠে এসেছে।
ধর্মীয় আলোচনা বা বিধানের বাহিরে, মানবসভ্যতার স্বাভাবিক ক্রমবিকাশেও বিয়ের সম্পর্ক কতোটা ইতিবাচক—তা সহজেই অনুমেয় হয় আধুনিক বিশ্বের ইয়ং জেনারেশনের উপর পরিচালিত বৈশ্বিক গবেষণাগুলোর ফলাফলের দিকে তাকালে। সম্পর্কহীন সম্পর্কের অপরিণামদর্শীতা থেকে বিয়ের বরকতময় সম্পর্কে সভ্যতা অসভ্যতা মুক্ত হোক, বিবাহ-পাঠ বইয়ের আবেদন গৃহীত হোক—এই কামনা।
১. আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশের মুসলিম পরিবারগুলোর বিয়ে কতটা ইসলামসম্মত? উত্তর কমবেশি সবারই জানা।
'উপমহাদেশে ইসলাম আসার পর আমাদের পূর্বপুরুষরা ইসলামের ছায়াতলে এসেছিল। বিশাল হিন্দু জনগোষ্ঠীর মাঝে মুষ্টিমেয় মুসলিম ব্যক্তিজীবনে ইসলামকে ধারণ করেছি ঠিকই,কিন্তু পারিবারিক-জীবন, সমাজ জীবনে হিন্দুয়ানি স্বভাব ছাড়তে পারিনি। বরং বংশ-পরম্পরায় সেই মানসিকতা বয়ে চলেছি,শিখিয়েছি সন্তানদের।'(ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ২.০)
আমাদের সমাজে বিয়েগুলোতে হিন্দুয়ানি প্রভাব সুস্পষ্ট। পাত্রী দেখতে চলে পাত্রের মুরব্বিরা- এ থেকে শুরু করে -এনগেজমেন্ট,ওয়েডিং ফটোগ্রাফি,ডান্স ইভেন্ট,গায়ে হলুদ, কাবিন নিয়ে ধাক্কাধাক্কি, আগাম জানিয়ে দেওয়া এতজন বরযাত্রী আসছি, মেয়ের বাপকে খসিয়ে আবার সমালোচনা-গিবত, গেট ধরা, শালিকার হাত ধুয়ে দেওয়া, বৌভাত, অগ্রিম যৌতুক ইত্যাদি এসব সংস্কৃতি কি ইসলামসম্মত? কখনই না।
আমাদের ইসলামে 'বিয়ে' কতটা সহজ ভেবে দেখুন । মেয়ের বাপের একটা টাকাও খরচ নাই। উপরের কিছুই করা লাগে না।
"কনের বাবা মেয়ের অনুমতি নিয়ে মাসজিদে যাবেন। ছেলের কাছে প্রস্তাব পেশ করবেন ঈমাম সাহেব। ছেলে জোরে বলবেন, "আলহামদুলিল্লাহ, আমি কবুল করলাম "। ব্যস, এটুকুই। আল্লাহর খাতায় আপনারা বৈধ স্বামী-স্বামী।" (বিবাহ পাঠ)
বর্তমানের দ্বীনি ছেলেমেয়েদের মধ্যে এসব অপসংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। হয়তো আমাদের ও পরের প্রজন্ম এসব হতে বের হয়ে আসবে আল্লাহ চাহেন তো।
২. একজন মুসলিম পরিবারের বিয়ে কেমন হবে? করণীয়+বর্জনীয়সহ বিস্তারিত জানতে পারবেন বইটা পড়ার মাধ্যমে।
বইটা একজন বিবাহ ইচ্ছুক মানুষের জন্য একটা সুস্পষ্ট ও সবিস্তার গাইডলাইন বলতে গেলে। হয়তোবা আপনি প্রাক্টিসিং মুসলিম নন তবুও কৌতূহলে হাতে নিন। পাল্টে যেতে পারে আপনার জীবনপথ।
বিয়ের সময় মুসলিম পাত্র-পাত্রী বা পরিবারগুলোর কী কী বিষয় মাথায় রাখা উচিত? বিয়ের সংকল্প থেকে শুরু করে পাত্র-পাত্রী নির্বাচন, পাত্র-পাত্রীর গুণাবলি যাছাই, পরস্পরকে দেখা, বিয়ের সামগ্রিক কার্যকলাপসহ বাসররাত পর্যন্ত সমস্ত বিষয়াদির ইসলাম-সম্মত গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন এই বই!
বিয়ে ইচ্ছুক ভাই-বোনদের জন্য বইটা পড়া ফরজ!
৩. 'বিয়ে তো অনুষ্ঠান না রে! বিয়ে হলো একটা আমল। অনেক বড়ো সুন্নাত আমল। বিয়ে হলো দ্বীনের অর্ধেক।এই এক জিনিসের কারণে দুনিয়া জান্নাত হতে পারে,আবার এই কারণেই দোযখ হতে পারে পৃথিবী।'
''এতগুলো ফরজ-সুন্নাহ নষ্ট করে নতুন জীবন শুরু? বলি, আকল বুদ্ধি কি সব ইউরোপে-বলিউডে মশাই? আল্লাহকে নারাজ করে কার কাছে সুখী দাম্পত্য জীবন চাচ্ছেন? লোক দেখানোটাই ���ড়ো, নাকি বিয়ে করে সংসারে সুখ বড়ো?''
চিন্তা করুন কেমন?
বই ~ বিবাহ পাঠ লেখক ~ শাইখ মাহমুদ আল-মিসরী ও Shamsul Arefin Shakti প্রকাশনী ~ মাকতাবাতুল আসলাফ মূল্য ~ ২৪০/- পৃষ্ঠা ~ ১৬৫
এই বইয়ের একেবারেই প্রথম অংশে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, পশ্চিমা সভ্যতার পুঁজিবাদীরা বিবাহ ও ধর্মের মধ্যকার দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়ে লিভ টুগেদারের মতো জঘন্য পাপাচারে লিপ্ত হওয়া। সেই সাথে আরো কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আলোচনায় উঠে এসেছে সেটা না জানলে অনেক কিছুই মিস হয়ে যাবে আপনার। আর বইয়ের এই প্রথম অংশটা পড়া শেষ হলেই আপনি 'থ' মেরে বসে থাকবেন। যেমনটা আমিও বসে ছিলাম সব কিছু পড়ার পর।🙂
◾এই বইটা বিবাহ সম্পর্কিত অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ টপিক'স নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তার মধ্যে কিছু ব্যপার আপনাদের সাথে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরলাম।
প্রথমত, আলোচনা করা হয়েছে বিয়ের জন্য অবশ্যই দ্বীনদার ছেলে এবং মেয়ে প্রাধান্য দিতে হবে উভয়কে।
দ্বিতীয়ত,আলোচনা করা হয়েছে দ্বীনদার ছেলে মেয়ে বিয়ে করার উপকারীতা। সেই সাথে দ্রুত ও দেরিতে বিয়ে করার উপকারিতা ও অপকারিতার চমৎকার বর্ননা।
তৃতীয়ত, আলোচনা করা হয়েছে দ্বীনদার মেয়েকে বিয়ে না করলে সংসারে কী কী সমস্যা হতে পারে সেগুলোর বর্ননা।
চতুর্থত, আলোচনা করা হয়েছে দ্বীনদারী নারী সাহাবীদের গুনাবলি,ঈমানী জজবা,সাহসিকতা,এবং ইসলামে তাদের অবদান।
পঞ্চমত, আলোচনা করা হয়েছে একজন দ্বীনি মেয়ে কিভাবাে পুরো পরিবারকে দ্বীনের আলোয় আলোকিত করতে পারে,এবং চারিত্রিক দ্বীনি গুনাবলি তুলে ধরা হয়েছে
ষষ্ঠমত, আলোচনা করা হয়েছে মেয়েরা বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলেদের কোন গুনগুলো দেখে বিয়ে করবে,বিয়ের পূর্বে ছেলে সক্ষম না অক্ষম সেটাও যাচাই করার অধিকার এবং কোন পারিবারিকভাবে ছেলের দুরারোগ্য আছে কিনা সেটা সেগুলো যাচাই করার চমৎকার ডিটেইলসে বলা হয়েছে।
সপ্তমত, আলোচনা করা হয়েছে যৌতুক, গায়ে গলুদ, শরীয় বিধান অনুযায়ী বিয়ে না করার মতো জঘন্য ইসলামিক সাংঘর্ষিক ব্যপারগুলো নিয়ে।
অষ্টমত,আলোচনা করা হয়েছে বিয়ের রজনীতে স্বামী স্ত্রীর ভূমিকা কী, তারা কী করবে না করবে সুন্দরভাবে সেটিও আলোচনা করা হয়েছে।
নবমত, আলোচনা করা হয়েছে ডিভোর্সের ব্যাপারে। এটাও সুন্দর করে গুছিয়ে বলা হয়েছে। কারো বুঝতে কোন সমস্যা হবেনা।
◾▪️সারকথা, একজন প্র্যক্টিসিং মুসলিম হিসেবে আপনি এই বই না পড়ে বিয়ে করলে আপনার জীবনে অনেক বড় ভুল হবে। আমি চাই এই বইটি আমার প্রত্যেক অনাগত বিবাহিত ভাইয়ারা এবং যারা বিবাহ করেননি তারাও অবশ্যই অবশ্যই এই বইটি পড়বেন। এটা অসাধারণ একটি বই। না পড়লে বুঝবেনা এই বইটা আসলে কতটা প্রয়োজন আপনাদের।
বিয়ে করার চিন্তা ভাবনা থেকে বইটা কেনা, শক্তি ভাইয়ের লেখার সাথে আগেই পরিচিতি ছিল। জেনারেল লাইনের ছেলেমেয়েদের জন্য যে কয়জন মানুষ জন ইসলামী লেখা লেখে , শক্ত ভাই তাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় আগে থেকেই।
বিয়ে নিয়ে একজন সাধারন মানুষের যা কিছু জানা দরকার সবকিছু এক মলাটে এই বইতে এসে পড়েছে। যারা বিয়ে করেছেন এরকম অনেক ভাইয়ের থেকেও এই বইয়ের সাজেশন পেয়েছিলাম। বিয়ে অবশ্যই একটি কমপ্লেক্স জার্নি, বর্তমান ফিতনার যুগে বিয়ে তো আরো কঠিন। এই বইটা এই জার্নির অলিগলি সম্পর্কে আপনাকে বেশ ভালো একটা আইডিয়া দিবে, অলিগলিতে ইসলাম মেনে নেভিগেইট করবেন কিভাবে তার একটা ধারনা দিবে। এবং আপনি বিয়ের বাজারে ইসলাম ইমপ্লিমেন্ট করবেন কিভাবে তার একটা আইডিয়াও বইতে পাওয়া যাবে। পুরা বই একদম সহজ ভাষায় লেখা হয়েছে, শক্তি ভাইয়ের লেখা অবশ্য এই জন্যই জনপ্রিয়।
আল্লাহ লেখকদের এইরকম বই আরো লেখার তৌফিক দিক। ছেলেমেয়েদের অবিভাবকরা তাদের দ্রুত বিয়ে দিক, এই আশা রাখি।
এই বইটাতে বাংলাদেশের সমাজের দৃষ্টিকোণ থেকে খুব সুন্দর করে অনেক অনেক বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। বইটা পড়েছি আর অবাক হয়েছি কত বেসিক জিনিসই জানা নেই! বিয়ে একটা সহজ-স্বাভাবিক ব্যাপার। এত আড়ম্বরতা আর অপচয় শুধু বিয়েকে কঠিনই করছে না, তার পাশাপাশি সমাজে আরও অনেক কমপ্লেক্স ইস্যু তৈরি করছে। বিয়ের পূর্বে প্রতিটা মুসলিমের জন্য এই বই অবশ্যপাঠ্য।