⚈ স্পয়লার-ফ্রি রিভিউ—
❝এই উপন্যাসটি ‘প্রিন্স অব পার্সিয়া’ গেমের ডাইহার্ড ফ্যান তথা অন্ধ ভক্তদের জন্য একেবারেই নয়।❞
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট—মরুভূমি—হাসানসিন—পার্সিয়ান—ষড়যন্ত্র সবকিছু মিলিয়ে ❛প্রিন্স অফ পার্সিয়া❜ উপন্যাসটি দারুণ প্যাকেজ বলা যায়। অ্যাডভেঞ্চার, সাসপেন্স, থ্রিল সবকিছু এই উপন্যাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস প্লট, প্রেক্ষাপট যখন মরুভূমি তখন এমনিতে আগ্রহ জেগে উঠে পড়ার জন্য। পারস্য রূপকথা কিংবা তৎকালীন শাহাজাদা-শাহাজাদী, বাদশা চরিত্রগুলো যখন নিজেদের যোগ্য প্রমাণ করতে ব্যস্ত তখন কিছু চরিত্র গড়ে উঠে সত্য ও সংগ্রামের প্রতিক হিসেবে।
❛প্রিন্স অফ পার্সিয়া❜ উপন্যাসে পাঠক সেসব উপকরণ পাবে যেগুলো কোনো আরব্যোপন্যাসে থাকে। আসন্ন বিপদের আভাস, শত্রুদের পদধ্বনি, আপনজনের বিশ্বাসঘাতকতা এইসব যেন ঘোর লাগিয়ে দেয়। কিছুটা নস্টালজিয়া অনুভব হয়। সবমিলিয়ে দারুণ।
➲ আখ্যান—
শত্রুপক্ষকে অস্ত্র সরবারহের অভিযোগে পবিত্র নগরী আলামুত আক্রমণ করে বসলো পরাক্রমশালী পার্সিয়ান বাহিনী। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়িয়ে বিজয়ী হলো পার্সিয়ানরা; মেতে উঠলো বিজয় উদযাপনে। বাদশাহ’র সম্মানে আলামুতেই আয়োজন করা হলো এক আড়ম্বরপূর্ণ ভোজসভা। আর সেখানেই ঘটে রক্ত হিম করা ঘটনা—শাহজাদা দাস্তানের হাতে খুন হলো তারই পিতা বাদশাহ শারামান।
কিন্তু দাস্তানের দাবী সে নির্দোষ। সুপরিকল্পিতভাবে বিছিয়ে রাখা ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়েছে সে, হাজার বছর ধরে গুপ্ত অবস্থায় থাকা এক অলৌকিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করাই যে ষড়যন্ত্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
সেই ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে কে? এর মাধ্যমে নিজের কোন স্বার্থই বা হাসিল করতে চাচ্ছে সেই ষড়যন্ত্রকরী?
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
উপন্যাসটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনার মনোযোগ আকর্ষণ ধরে রাখবে। মাঝপথে থেমেও গেলেও সামনে কী হবে সেটা জানার জন্য উদগ্রীব হবেন। উপন্যাসে এমন টুইস্ট রয়েছে যেটা ক্ষণিকের হতবিহ্বল করবে আপনাকে। তখন মাথায় আসবে, আহা! এইভাবেও সবকিছু ঠিক করা যায়? কিন্তু সেটা কীভাবে?
● প্রারম্ভ—
গল্পটা শুরু এক পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য নাম—পার্সিয়া থেকে। সে-ই সাম্রাজ্যের এক রাজকুমার ছিল শারামান, অন্যজন নিজাম। শারমান কোনোভাবে বাদশা বনে যায় নিজামের সহযোগিতায়। তার দুই সন্তানের পাশাপাশি আরেকজন সন্তানের ভার তিনি স্বেচ্ছায় বহন করেন! টাস ও গার্সিভ দুই পুত্রসন্তান থাকার পরেও বাদশার পরিবারটি ছিল অসম্পূর্ণ! কিন্ত কেন? আর দাস্তান নামের ছেলেটিকে বাদশা কীভাবে নিজের সন্তান বলে আখ্যায়িত করলেন? রহস্য কী?
গল্পের শুরুতে হুকড হওয়ার মতো কারণ ছিল। শুরুটা মূলত এইভাবে...
● গল্প বুনন—
লেখকের গল্প বুনন প্রক্রিয়া বেশ সাবলীল। পর্যবেক্ষণ করার জন্য বেশি প্রেশারের কোনো দরকার নেই। স্মুথ পাবে সিকুয়েন্স চেঞ্জ হচ্ছে, আর গল্প মোড়ে মোড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। টানা পড়ে গেলেও বিন্দুমাত্র ক্লান্তি আসবে না। বরঞ্চ আপনি নিজে গল্পের মায়াজালে আটকে যাবেন।
● লেখনশৈলী—
প্রাঞ্চল আর সুনিপুণ। শব্দচয়নে দক্ষতা আর বাক্যগঠনে কারিশমা পুরো উপন্যাসকে পারস্যের রূপে রূপান্তরিত করে ছেড়েছে। প্রেক্ষাপটের সাথে তাল মিলিয়ে লেখনশৈলী বেশ উত্তম।
তবে অনুবাদকের অনুবাদে সেটা হয়ে উঠেছে আরও জীবন্ত।
● বর্ণনাভঙ্গি—
প্রত্যকটা সিকুয়েন্সের যথাযথ বর্ণনা সুস্পষ্ট ভাবে দিয়েছেন লেখক। অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিনিসের বিবরণ বেশ সাবলীলভাবে পাঠকদের মস্তিষ্কে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস করেছেন। অনুভূতি জাগ্রত করার জন্য নাটকীয়তার দরকার হয়নি, ঘটনা ঘটার সাথে সাথে সেটা মনের সিলভার স্ক্রিনে এমনিতে জায়গা করে নিয়েছে। তৃপ্ত হওয়ার মতো ছিল সবকিছু।
● চরিত্রায়ন—
চরিত্রগুলো ছিল এই উপন্যাসের প্রাণ। প্রত্যকটি চরিত্র যেন জীবন্ত। কে স্পেশাল আর কে হ্যাটেড সেটা না হয় উপন্যাস পড়ে বুঝে নিবেন। অনিন্দ্যসুন্দর এক শাহাজাদীর দেখাও পেয়ে যাবেন। দেখা পাবেন ভয়ংকর এক গুপ্ত গোষ্ঠীর!
● সমাপ্তি—
পরিমার্জিত। হওয়ার দরকার এমন ছিল। তবে নাটকীয়তা আরেকটু আশা করছিলাম। যে সভা ঘিরে সবকিছু সে-ই সভায় সবকিছুর অন্ত হলে আরও খুশি হতাম। তারপরও ভালোই।
➢ লেখক ও অনুবাদক নিয়ে কিছু কথা—
লেখক জেমস পন্টির পড়া প্রথম কোনো বই, অনুবাদক রুদ্র দা বেশ ভালো বই চুজ করেছেন। অন্তত কিছু ঘণ্টার পার্সিয়া সাম্রাজ্যে ডুব দিয়ে ঘোরে থাকার মতো যথেষ্ট। অনুবাদ যথেষ্ট প্রাঞ্জল বাংলায় বললে মাখন। বইটি উপভোগ করতে পেরেছি সাবলীল অনুবাদের জন্য।
● সম্পাদনা ও বানান—
কয়েক জায়গায় টাইপো ছিল, বানান ভুল সামান্য।
● প্রচ্ছদ, অলংকরণ—
দারুণ ও দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ করেছেন জুলিয়ান ভাই। উপন্যাসের প্রত্যকটি এলিমেন্ট দারুণ ভাবে ফ্রন্ট ও ব্যাক কাভারে ফুটিয়ে তুলেছেন। লেটারিং ভালো লেগেছে।
বইয়ে অনেক ইলাস্ট্রেশন রয়েছে যেটা পড়ার সাথে সাথে ভিজুয়ালাইজ করতে দারুণ সাপোর্ট দিবে।
● মলাট, বাঁধাই, পৃষ্ঠা—
হার্ড পেপারব্যাক—শক্তপোক্ত বাঁধাই—ক্রিম কালারের পেজ আর কী দরকার? প্রিমিয়াম ফিল নেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সতীর্থের সিগনেচার হিসেবে এই প্রিমিয়াম কোয়ালিটির পেপারব্যাক বেশ আকর্ষণীয়।
➠ বই : প্রিন্স অফ পার্সিয়া | জেমস পন্টি
➠ জনরা : অ্যাডভেঞ্চার থ্রিলার
➠ প্রথম প্রকাশ : এপ্রিল ২০২১
➠ অনুবাদক : রুদ্র কায়সার
➠ প্রচ্ছদ : লর্ড জুলিয়ান
➠ প্রকাশনা : সতীর্থ প্রকাশনা
➠ মুদ্রিত মূল্য : ২৮০ টাকা মাত্র
➠ পৃষ্ঠা : ১৮৪