লাবিবাকে পড়াতে গিয়ে আবীর পড়ে গেল অদ্ভুত এক সমস্যায়। লাবিবা তাকে পরিচয় করিয়ে দিল রহস্যময় চরিত্র মিস ব্রুটালের সাথে। মিস ব্রুটাল। রহস্যের সমাধান করতে না করতেই আত্মহত্যা করে বসলো আবীরের প্রেমিকা রাইসা। রাইসার সুইসাইড নোটে চিঠি হয়ে পৌছালো আবীরের কাছে। চিঠি পড়ে জানা গেল রাইসার আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী কে। আবীর কি প্রতিশোধ নিতে পেরেছিল রাইসা হত্যার? আবীর কি পেরেছিল মিস ব্রুটাল রহস্যের উদঘাটন করতে?
পড়লাম লেখক কয়েস সামীর লেখা নতুন উপন্যাস ‘টিউশনি’। যদিও লেখকের মতে বইটি অতিপ্রাকৃত ও ভৌতিক জনরার বই, আমার কাছে মনে হয়েছে এসবের সাথে বইটি সামাজিক প্রেক্ষাপটেরও বটে। কারণ সব ছাপিয়ে আমরা দেখতে পাই বইটি আমাদের সমাজের একটা প্রতিবিম্বের মতো কাজ করছে।
শুরুতে আসি বইটির চরিত্রগুলোর দিকে। গল্পের মূল চরিত্র কে? শুরুতে মনে হতে পারে যার জবানীতে পুরো গল্পটি এগিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে, যাকে আমরা আবীর নামে চিনতে পারি, সেই গল্পের মূল চরিত্র; কিন্তু আদতে গল্পের মূল চরিত্র হলো আবীরের ছাত্রী লাবিবা—যাকে কেন্দ্র করেই মূলত গড়ে উঠেছে গল্পটি।
গল্পের অন্যান্য চরিত্রে আমরা যাদের পাই তাদের মধ্যে অন্যতম হলো—আবীরের প্রেমিকা রাইসা এবং আবীরের বন্ধু রাশেদ। এছাড়া অপ্রধান চরিত্রে লাবিবার মা, রাইসার প্রথম প্রেমিক (যার নামও আবীর) উল্লেখযোগ্য।
মূলত গল্পটি গড়ে উঠেছে আমাদের সমাজের তিন শ্রেনীর মানুষের উপর নির্ভর করে। এক. যারা অপরাধী, দুই. যারা অপরাধীর শিকারে পরিণত হয় এবং তিন. যারা অপরাধী নয় বা সরাসরি ভিক্টিম নয় এবং নিজে ভিক্টিম নয় বলে অপরাধের বিরুদ্ধে আওয়াজ না তোলা—এই তিন শ্রেনীর মানুষকে নিয়ে এগিয়ে গেছে উপন্যাসটি।
লেখক যে সামসাজিক সমস্যাটি নিয়ে কথা বলেছেন তাতে তার একটি ধন্যবাদ প্রাপ্য। কারন আমাদের সমাজে নারীরা যখন কোন সমস্যার সম্মুখীন হয় তখন অবধারিতভাবে সব দোষ গিয়ে পরে ঐ মেয়েটির উপরেই, ফলে অধিকাংশ সময় মেয়েরা প্রকাশ করে না তাদের সাথে ঘটে যাওয়া কোন দুঃসহ ঘটনাও, যার ফলে তারা সমগ্রজীবন বয়ে বেড়ায় একটি মানসিক বিস্বাদগ্রস্থ জীবন, যার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে তা আমরা দেখতে পারি লাবিবা বা রাইসার ক্ষেত্রে।
উপন্যাসের শুরুর দিকে মনে হবে হয়ত ভৌতিক কোন ঘটনাকে ঘিরে গল্পটি আবর্তিত হবে এবং শেষে গিয়ে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। কিন্তু বইয়ের মাঝ বরাবর গেলে মনে হবে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার টাইপের কিছু হবে। শেষমেশ তাও হয় না। শেষে গিয়ে দেখা যায় আমাদের সমাজের একটি পরিচিত রূপ, যে কথাগুলো আমরা জেনেও না জানার ভাণ করে থাকি।
উপন্যাসের যে অংশগুলো বেশী ভালো লেগেছে—যেখানে একটা মেয়েকে একটা ছেলে চাপাতি হাতে মারতে আসে, মেয়েটি গল্পের নায়কের কাছে এগিয়ে এলে নায়ক নিজেও ভয় পেয়ে দৌড়ে পালায়, বাংলা সিনেমার নায়কের মতো সে প্রতিরোধ গড়ে তোলে না, পরে যখন ভাইরাল হওয়া কোন এক ভিডিওতে মেয়েটির উপর অত্যাচারের চিত্র দেখে তখন তার অনুতপ্ত হয় কেন সে মেয়েটিকে সাহায্য করল না। এই ঘটনাটি আমাদের সমাজের প্রায় প্রতিটি মানুষের কথাই তুলে ধরছে, যারা সিনেমার নায়কের মতো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। আরেকটা দৃশ্যে আবীর যখন সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে গিয়ে ওয়েটিং লঞ্জে বসে থাকে, তখন তার পাশের সেই ব্যাংক কিনে নেওয়া ভদ্রলোকটির সাথে আবীরের কথোপকথন লেখকের রসবোধের পরিচয় বহন করে।
লেখকের লেখার যে দিক গুলো খারাপ লেগেছে—শুরুর দিকে বইটি একটু বেশীই সাধারণ ভাবে এগুচ্ছিল, এমন কিছু ছিল না যেটা পরে আরও পড়ার ইচ্ছা জাগবে। আর এও মনে হচ্ছিল ঘটনা হয়ত কেবল আবীরের টিউশনিতে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রথম চার অধ্যায় জুড়ে একই ঘটনা চলছিল।
তারপর রাইসার সাথে দেখা করতে যাওয়ার পর প্রতিটি ঘটনা খুব বেশী নাটকীয় মনে হয়েছে, বাড়িতে একটা মানুষকে ওভাবে সবার চোখ বাঁচিয়ে লুকিয়ে রাখা কতটা সম্ভব বা এমন পরিস্থিতেও জামা বদলিয়ে দেখানো কুতটা যৌক্তিক কিংবা এক রূমে থেকেও একেবারেই স্পর্শ না করা, এটা যেন নায়ককে অতিমানবের মতো দেখানো হয়ে গেছে। আরেকটা বিষয় ঝগড়া করে নায়ক সিম কার্ড ভেঙে ফেললেও যোগাযোগের জন্য ফেসবুক মেসেঞ্জারের অপশনটি বহাল তবিয়তে থাকার পরেও মেসেঞ্জারে কেন যোগাযোগ হলো না সেটা খটকা লাগায়। এছাড়া লেখকের লেখনী আরও একটু উন্নত হলে, পারিপার্শ্বিকের বর্ণনা একটু বাড়ালে বইটা আরও একটু ভালো হতো বলেই আমার ধারণা।
বই টা অনেক অংশে আমাদের বাস্তবত এর সাথে মিল আছে। আমাদের অনেকে সাদু সেজে যে গোপনে অনেক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেটা আপনার এই বই এর মধ্যে লক্ষ্য করতে পারবেন। একটা মেয়ে এই রকম পরিস্থিতি তে পরে, যে তার জীবনে শেষ পরিণতি কি হয় টা দেখা যায় ।