জীবন মূলত সুটকেসের মতোই। আমাদের জানা নেই, কী আছে এর ভেতরে। কতটা বিস্ময় আছে কিংবা কতটা অভাব বা প্রাচুর্য। একটা সুটকেস আর কিছু মানুষের জীবন মিলেমিশে একাকার এ উপন্যাসে। জাহিদ, নীরা, মহিউদ্দিন তালুকদার, আনিস, রিপন, তানজিম, জয়নাল কিংবা আরো যারা, সবারই একটা করে সুটকেস আছে। জীবন নামের সুটকেস। এই উপন্যাসের ভেতরে প্রবেশ করলে পাওয়া যাবে তাদের জীবনের গল্প। যে গল্পগুলো নতুন নয়। আপনার, আমার অথবা আমাদের জানাশোনা কোনো পুরাতন গল্পই...
“কোথায় যেন শুনেছিলাম, প্রচণ্ড ভালোবাসা নিয়ে মুখোমুখি বসে, সমানতালে কথা বলা যায় না। এই সময়টায় একজন কথা বলে, আরেকজন মুগ্ধ হয়ে তার কথা শোনে। কথার কিছুটা বোঝে, কিছুটা হারিয়ে ফেলে। বোঝা অংশটা দায়িত্ব। হারিয়ে ফেলা অংশটা প্রেম।” . বই: সুটকেস লেখক: ইশতিয়াক আহমেদ প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ প্রকাশনী: অনিন্দ্য প্রকাশ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১১২ মলাট মূল্য: ২০০ টাকা .
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, কংক্রীটের অট্টালিকায় থাকা সুট-টাই পরা তথাকথিত উচ্চবিত্তদের জীবন কতটা বৈচিত্রময়? তারা কী কখনো মোটা কাঁচের দেয়াল বা জানালা ঘেঁষে দাঁড়ান? যে উঁচু ইমারতে থাকেন, সেখান থেকে নিচে তাকালে রাস্তায় থাকা মানুষদের ঠিক কীরকম দেখা যায়, পিঁপড়ার মতো? মানুষের জীবন পিঁপড়াদের মতো হয় কিনা জানা নেই। কিন্তু সমাজে থাকা মধ্যবিত্তদের জীবনে পিঁপড়াদের একটি বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। সেটা হলো, তাদের অবিরত ছুটতে হয়। বিন্দুমাত্র দাঁড়ানোর সময় নেই। বিশ্রামের সময় নেই। এক একজন মধ্যবিত্তের জীবন লক্ষাধিক ঘটনার সমষ্টি। যেগুলোর কিছু আমরা জানি। কিছু আবার জানি না। এমনই কতক মধ্যবিত্ত মানুষ, তাদের জীবন এবং ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাস।
সুটকেস কী, সেটা আমরা কমবেশি সকলেই জানি। উচ্চবিত্তদের নিজস্ব সুটকেস থাকে। সেটাতে স্থান পায় দুর্বোধ্য ভাষার জরুরি কাগজপত্র। স্থান পায় নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের রক্ত পানি করা বান্ডিল বান্ডিল টাকা। আচ্ছা, মধ্যবিত্তদের কি সুটকেস থাকে? কী থাকে সেই সুটকেসে? কাগজ, টাকাপয়সা অথবা জরুরি জিনিসপত্র? আপনি যখন এই উপন্যাস পড়বেন, খুব সহজ স্বাভাবিক উত্তর পাবেন। কিন্তু সেই উত্তর আপনাকে বইয়ের শেষ পর্যন্ত তাড়িয়ে বেড়াবে।
খুব সাধারণ কয়েকটি চরিত্র, সাধারণ তাদের জীবনযাপন। ঘটনা প্রবাহে তারা একে-অন্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জাহিদ আর নীরার প্রেম কোন কবিতা থেকে কম নয়। তাদের প্রেম ভালোবাসাময় জীবনের ছন্দ কবিতার ছন্দকেও হার মানায়। জাহিদের মনে হয়, নীরার হৃদয় সমুদ্রসমান। তার কাছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতও তুচ্ছ। পিতামাতাহীন ছন্নছড়া জীবনে তার বেঁচে থাকার একমাত্র উৎস এই মেয়েটি। জাহিদ চাইলেও নিজেকে একা ভাবতে পারে না। সময় ও ঘটনাক্রমে কিছু মানুষ তার জীবনে জায়গা করে নেয়। কখনো বটবৃক্ষের ছায়া হয়ে আসেন মহিউদ্দিন তালুকদার, কখনো সহদর হয়ে আসে আনিস ও রিপন, আবার কখনো ঝড় হয়ে আসে জহির! এরপর টানা নিস্তব্ধতা। অসহায়ত্বের দোলাচল, টিকে থাকার দুর্নিবার প্রয়াস। জাহিদের জীবন মুহূর্তের মধ্যেই পাল্টে যায়। মুখোমুখি হয় নিজের অতীতের, অনিশ্চয়তাময় পরিণামের দিকে।
লেখকের জীবনবোধ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি মুগ্ধ করার মতো। এমনকি এটা উপন্যাসেও এক ভিন্নমাত্রা এনেছে। তিনি পারিপার্শ্বিক অস্থিরতা ও ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। অত্যন্ত নৈপুণ্যতার সাথে তুলে ধরেছেন সমাজ-রাষ্ট্রের মধ্যকার বৈষম্য। তার সরল স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে মধ্যবিত্তদের জীবনচিত্র। কাউকে কিছু বলতে না পারা অসহায়ত্ব। যার প্রকাশ ঘটেছে জাহিদ চরিত্রের মাধ্যমে। যে কিনা ভালোবাসার অভাবে ভুল পথে এগিয়েছিল। সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে মৃত্যুর খুব কাছাকাছি গিয়ে আবার ভালোবাসার টানেই ফিরে এসেছে। বাঁচতে চেয়েছে। অনিশ্চিত জীবন আর নির্মম সত্যকে অগ্রাহ্য করে খুব আপনভাবে পেতে চেয়েছে কাউকে। আপনি যখন জাহিদকে জানবেন, তখন খেয়াল করে দেখবেন- সে কোনোকিছু আড়াল করেনি। যতটুকু চেষ্টা করেছে, সেটাতেও কোন জোর ছিল না। আর জোর ছিল না বলেই নীরার হাতটি কখনো শক্ত করে ধরতে পারেনি। মানুষের সহানুভূতি তাকে স্পর্শ করেনি। কঠোর হতে কঠোরতম পরিণতি সে হাসিমুখে মেনে নিয়েছে। কোনপ্রকার অভিযোগ ছাড়াই। এই যে সবকিছু সয়ে যাবার ক্ষমতা, এটা কেবল মধ্যবিত্তদের মাঝেই দেখতে পাওয়া যায়।
বাস্তবতার বুকে অঙ্কিত এই উপন্যাস খুব সহজেই আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। মোটা দাগে মধ্যবিত্তদের জীবন তুলে ধরলেও এখানে আপনি সবকিছুর দেখা পাবেন। হরেক রকমের মানুষ, তাদের ক্ষমতা-অক্ষমতা, হাসি-কান্না, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম। জীবন কত বৈচিত্রময়, তার কিছু অসাধারণ চিত্র দেখার সুযোগ মিলবে।
উপন্যাসের সাথে যদি মিল রেখে বলি, জীবন মূলত সুটকেসের মতোই। আমাদের জানা নেই, কী আছে এর ভেতরে। কতটা বিস্ময় আছে কিংবা কতটা অভাব বা প্রাচুর্য। একটা সুটকেস আর কিছু মানুষের জীবন মিলেমিশে একাকার এই উপন্যাস। জাহিদ, নীরা, মহিউদ্দিন তালুকদার, আনিস, রিপন, তানজিম, জয়নাল, জহির কিংবা আরও যারা- সবারই একটা করে সুটকেস আছে। জীবন নামের সুটকেস। এই উপন্যাসের ভেতরে প্রবেশ করলে পাওয়া যাবে তাদের জীবনের গল্প। যে গল্পগুলো নতুন নয়। আপনার, আমার অথবা আমাদের জানাশোনা কোনও পুরাতন গল্পই।
যারা জীবন কেন্দ্রিক উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য ‘সুটকেস’ বইটি সাজেস্ট রইলো। এক বসায় পড়ে ফেলার মতো দারুণ একটি উপন্যাস। .
গতকাল বইয়ের মাধ্যমে ইশতিয়াক আহমেদের লেখার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিলো আমার। সুটকেস বইটি তার অন্যান্য বইয়ের মত ভালো লাগে নি। লেখক গল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা নাটকীয় মুহূর্তের শেষে জীবন সম্পর্কে কিছু উপলব্ধি বা লাইন জুড়ে দেন। এই বইয়ের ক্ষেত্রেও সেই ব্যাপারটি রয়েছে। জীবন কেন্দ্রিক উপন্যাস।
'সাদা প্রাইভেট' বইয়ের মাধ্যমে ইশতিয়াক আহমেদের লেখার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিলো আমার। অসাধারণ লেগেছিলো বইটি। এরপর পড়ি তার লেখা 'গতকাল' বইটি। 'সাদা প্রাইভেট' এর মতো এতো অসাধারণ মনে না হলেও মোটামুটি ভালোই লেগেছিলো। কিন্তু এই বছর প্রকাশ হওয়া তার নতুন বই 'সুটকেস' পড়ে বেশ হতাশই হয়েছি বলা যায়। গল্প ও গল্পের চরিত্রগুলো খুব একটা আগ্রহ তৈরি করতে পারেনি। এর আগে আমার পড়া ইশতিয়াক আহমেদের বই দুটোতে খেয়াল করেছিলাম যে, লেখক গল্পের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা নাটকীয় মুহূর্তের শেষে জীবন সম্পর্কে কিছু উপলব্ধি বা লাইন জুড়ে দেন। এই বইয়ের ক্ষেত্রেও সেই ব্যাপারটি রয়েছে। তবে কিছু জায়গায় ওই লাইনগুলো কিছুটা জোর করেই ঢুকে গেছে বলে মনে হয়েছে। বইয়ে বেশ কিছু জায়গায় বানান, একজায়গায় চরিত্রের নামও ভুল পেয়েছি। কিছু জায়গায় বাক্যের গঠন আমার কাছে ব্যাক্তিগতভাবে বিদঘুটে বলে মনে হয়েছে। এই বিষয়গুলো বেশ পীড়া দিয়েছে। আশাকরি পূর্বে তার লেখা পড়ে যেই মুগ্ধতা জন্ম নিয়েছিল, তার পরবর্তী কাজগুলোতে তা আবার ফিরে পাবো।