বনের মায়াবন্ধনে একবার যারা জড়িয়ে পড়েন তাদের বুঝি আর বের হয়ে আসার পথ থাকে না। সেই স্মৃতি তারা বহন করেন আজীবন। বন যেন নিসর্গের স্বর্গীয় এক রূপ। এর আছে কতোই না বিচিত্রতা।। সেই প্রকৃতির সাথে মিশে আছে বনের প্রাণীকুল, শিকারের অমোঘ আকর্ষণে চলে তাদের সাথে মানুষের দ্বৈরথ। এমনি পটভূমিকায় পূর্বতন বম কর্মকর্তা বনপ্রেমিক আলী আকবর কোরেশীর গ্রন্থ কেবল বনস্মৃতির ঝাঁপি খুলে দেয়নি, পাঠকদের যা নিয়ে যাবে এমন এক বনপরিক্রমায় যেটা হয়ে থাকবে স্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা।
খুব বেশি আশা নিয়ে বইটা শুরু করিনি। পড়া শুরু করা মাত্র শকড! একদম ঝরঝরে লেখনী। প্রত্যাশারও বাইরে।
লেখক মহোদয় ছিলেন বনবিভাগের কর্মকর্তা। সেই সঙ্গে প্রচন্ড দু:সাহসী। বনবিভাগে চাকরি করতে গেলে যা ম্যান্ডাটরি। ও হ্যা! ভদ্রলোকের আরেকটা গুণও আছে। খুবই ভালো শিকারী। তখন প্রায় ১৯৬০ সালের কথা। এখন তো আধুনিকতা, ডেভেলাপমেন্ট ইত্যাদি ইত্যাদি কঠিন কঠিন সব শব্দের ভিড়ে হারিয়ে গেছে সহজ সরল গহীন জঙ্গলগুলো। এরচেয়ে বেশি ঘন আর বড় জঙ্গল, দুর্গম এলাকা ছিল। বইয়ে উল্লেখিত এতো প্রাণী ছিল এই দেশে ভাবতেও অবাক লাগে। আহারে! আমাদের সুন্দরবনটা এখন কী এতিমের মতোই না হয়ে আছে! ভাবলেই মায়া লাগে। কতো বিরল প্রজাতির প্রাণী, পাখি মানুষের কয়েক মুহূর্তের আনন্দ আর গর্ব করবার খোরাক হিসেবে বলি হয়েছে! আচ্ছা থাক। দু:খের কথা বাদ দেই। লেখকের কথায় আসি, বনবিভাগের কর্মকর্তা হয়ে কর্মের খাতিরে ঘুরেছেন সুন্দরবন, কক্সবাজার, বান্দরবনের দুর্গম সব এলাকা, গারো পাহাড়, সিলেটের জঙ্গল ইত্যাদি সব জায়গা। মানুষ ও পশু-পাখির মিশেলে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতাই জমা করেছেন দুই মলাটের মাঝে। উনি প্রফেশনাল লেখক নন, বনের মায়ায় পড়ে, বনের স্মৃতি ভুলতে না পেরে নিজের বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলো সকলের সাথে শেয়ার করার জন্য কলম ধরেছেন। বইয়ের পুরোটাই অসম্ভব ভালো লেগেছে কিন্তু কিন্তু কিন্তু! 😶 কোন কারণে বন্য প্রাণী মারা এক কথা, আর অকারণে শিকার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। এই বইয়ের পাতায় পাতায় আছে অকারণ শিকারেরও অনেক আখ্যান। বড্ড খারাপ লেগেছে :(
বইটার সাথে আমার ব্যক্তিগত অনেক অপ্রত্যাশিত চমক জড়িয়ে আছে। বই দেখিয়ে লোভ লাগানোর জন্য আর বিচিত্র উপায়ে পড়ার বন্দোবস্ত করে দেয়ার জন্যা দাদাআআআ.. তোমাকে থ্যাংক্স আবারও!
আলী আকবর কোরেশী ১৯৬০ সালে বন বিভাগে ফরেস্ট রেঞ্জার হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পেশাগত কারণে চট্টগ্রাম,কক্সবাজার, সুন্দরবন, রাঙ্গামাটি,কাপ্তাই সহ নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। তখনকার কিছু টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণই আলী আকবর কোরেশীর -'বনের স্মৃতি'।
কিছু স্মৃতি যেমন চমকে দেওয়ার মতো,ঠিক তেমনি কিছু স্মৃতি আবার বেদনাদায়ক। এই যেমন তিনি লিখেছেন -“সেই সময় আমাদের গ্রামের গাছে গাছে,বাঁশঝাড় ও খালে-বিলে হরেকরকম পাখপাখালি দেখেছি আর নির্বিচারে শিকার ও করেছি। শিকার করা এসব পাখির মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য ছিল হরিয়াল,বক,ঘুঘু,ওয়াক,কাচিচোরা,শামুকভাঙ্গা, শরাইল,পানকৌড়ি, ডাহুক,কোড়া,কায়িম,স্নাইফ,কবুতর, গাং কবুতর, হাট টিমা টিম ইত্যাদি। কোথায় গেল সেসব পাখি? আজকাল এসব পাখি ছেলেমেয়েদের দেখাতে হলে চিড়িয়াখানায় যেতে হয়। তাও সবরকমের পাখি সেখানে এখন দেখা যায়না’’।
আবার সাঙ্গু মাতামুহুরীর বনের অভিজ্ঞতায় লিখেছেন নানা রকমের বানর,বড় ধনেশ পাখি,ধুমকল,হরিয়াল,বনমোরগ, মথুরা,কাটময়ূর,মায়া হরিণ, কালো হুল্লুক,বন্য শুকর,খরগোশ,গুইসাপ,বেজি,মোষ আর গয়ালের কথা। বর্তমানে উপরোক্ত প্রায় সবকটি প্রাণীই বিলুপ্তপ্রায় জেনে, দীর্ঘশ্বাস লুকাতে পারিনি।
এছাড়াও সুন্দরবনের কিংবদন্তি শিকারি পশ্চাব্দী গাজী ছিলেন লেখকের অধিনস্ত কর্মচারী। উনার সাথে একটা শিকারের ঘটনাও উল্লেখ আছে। শিকারের পাশাপাশি 'বনের স্মৃতি’-তে রক্ষীবাহিনী এবং সর্বহারা বাহিনীর একটা দুর্ধর্ষ ঘটনার বিবরণ ও শিহরিত করার মতো।
আলী আকবর কোরেশী একজন শখের লেখক। সুতরাং তার কাছে সাহিত্যের রুপরস আশা করাও উচিৎ নয়। তবুও ভদ্রলোক যথেষ্ট সাজিয়ে,গুছিয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা বলে গেছেন। ঠিক সাহিত্যরস না পেলেও,কোথাও আটকানোর মতোও নয়।
শিকার,বন সংক্রান্ত ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতি এবং রোমাঞ্চকর কিছু ঘটনার একটা জমজমাট প্যাকেজ এই বই। যারা বন এবং বনের ঘটনা ভালোবাসেন,তারা নির্দ্বিধায় হাতে তুলে নিতে পারেন -“বনের স্মৃতি’’। আলী আকবর কোরেশী তার নামান রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিয়ে আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছেন।
ষাটের দশকের গোড়ায় পাকিস্তান ফরেস্ট সার্ভিসে যোগ দেন আলী আকবর কোরেশী। তিন দশকের বেশি সময় কাজ করেছেন বনে-বাদাড়ে। নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। সেইসব ঘটনা নিয়েই সাহিত্য প্রকাশের বই 'বনের স্মৃতি'।
প্রায় ছয় দশক আগে চট্টগ্রামের রাউজানের গহীন বনে পোস্টিং হয় লেখকের। তিনি তখন নবীন কর্মকর্তা। সবকিছু নিয়ে আগ্রহ অত্যন্ত প্রবল। আর, সবচেয়ে বেশি কৌতূহল শিকার নিয়ে। সুযোগ পেলেই শিকার করেন। তখনো শিকার বেআইনি হয়নি। তাই অফুরন্ত সুযোগ। বিশাল এক অজগর মারার কাহিনি দিয়ে বইয়ের সূচনা। এরপর পার্বত্য চট্টগ্রামের হাতি শিকার, বান্দরবানের একেবারে গভীরে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নিজস্ব মন্দিরের ঘটনা ভালো লাগবে।
ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ের স্মৃতি বেশ চমৎকার। মুক্তিযুদ্ধের পর সুন্দরবনে রক্ষীবাহিনী বনাম সর্বহারাদের খণ্ড যুদ্ধের বর্ণনা বেশ রোমাঞ্চকর।
লেখকের পোষা ঘোড়া ও হরিণের ঘটনা স্মরণে রাখার মতো।
সীমিত পরিসরের বই হিসেবে পড়তে ভালো লাগবে। অতুলনীয় কোনো বই নয়। তা-ও মোটামুটি চলে। শিকার নিয়ে আগ্রহ থাকলে পড়তে পারেন।
লেখক আলী আকবর কোরেশীর প্রতি যতটা শ্রদ্ধা ছিলো তা অর্ধেক হয়ে গেছে দুটো কারণে।
১) লেখক শর্ষীনা পীরের ভক্ত ছিলেন (পৃষ্ঠা ৭৪- এ দোয়া নেয়ার উল্লেখ)। এই শর্ষীনার পীর আবু সালেহ মো জাফর ছিল একাত্তরের বড় রাজাকার। গণিমতের মাল আখ্যা দিয়ে হিন্দু সম্পত্তি বেদখল ও নারী ধর্ষণের হোতা এই জাফর। সাথে স্বরূপকাঠি মাসাকারের খলনায়কও এই রাজাকার।
২) লেখক ভালোমত যাচাই না করেই এক মা হরিণকে মেরে ফেলেন - আহত মা টি যখন করুন চোখে প্রাণভিক্ষা করছিলো লেখকের কাছে, তখনও মায়ের বুক থেকে বাচ্চা দুধ খাচ্ছিলো। এই মহাপাপের ফলে দীর্ঘদিন বাকশক্তি রহিত হয়ে যায় লেখকের। পরে শিকার করাই ছেড়ে দেন।
বইটিতে বহু অপ্রয়োজনীয় হত্যার বর্ণনা আছে। স্রেফ আনন্দ বা শিকারের উত্তেজনা পেতেই শ শ প্রাণী শিকার করেছেন লেখক। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য দুই গুলিতে একুশটি হরিয়াল শিকার, উড়ন্ত সরালির ঝাঁকে গুলি ছোঁড়া, অজস্র হরিণ শিকার, ময়মনসিংহে ভাল্লুক ও সাঙ্গুতে অজগর হত্যা ইত্যাদি।
তবে লেখকের প্রাণীর প্রতি ভালোবাসারও অনেক উদাহরণ আছে। মা হরিণকে হত্যার পর এতটাই কষ্ট পান যে শিকার করাই ছেড়ে দেন। এক মুরং শিশুকে ওষুধ দিয়ে প্রাণে বাঁচান। তাঁর এই শিকারী বনাম জীবপ্রেমী - এ দুই বিপরীতমুখী সত্ত্বার প্রমাণ পাবেন বইজুড়ে।
অজগরে মাংস রান্না, মুরংদের সংস্কৃতি ও নগ্নতা, পোষা হাতি সরস্বতী, পোষা ঘোড়া রাকস ও শমসের ডাকাত, পাগলা মায়া হরিণ কুমার বাহাদুর, ভন্ড পীরের কাহিনী, কালান্তর সাপের (সম্ভবত কালাচ) প্রতিশোধ, লঞ্চে বাঘের মুখোমুখি, কুমে পড়ে বেঁচে ফিরে আসা ইত্যাদি অনেক আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতার বিবরণ আছে বইজুড়��। আছে সনাতনীদের পবিত্র ধর্মস্থান আদিনাথের ইতিহাস বর্ণনা (যদিও লেখক অজ্ঞতাবশত হনুমানকে রাবণের অনুচর বানিয়ে দিয়েছেন!!)
স্বাধীনতা পরবর্তী সত্তর দশকের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গ্লিম্পস পাওয়া যায় সুন্দরবনে অদক্ষ রক্ষীবাহিনী বনাম সর্বহারাদের সংঘর্ষের বিবরণে।
'বনের স্মৃতি' - আলী আকবর কোরেশী (উপ বন সংরক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত)। রেটিং ৩.৫/৫। অহেতুক প্রাণীহত্যা ও রাজাকার প্রীতির উল্লেখ না থাকলে বইটি আরো সুখপাঠ্য হতো বলে আমার বিশ্বাস।