চতুরঙ্গের অশ্বারোহী মূলত বিষ-নিঃশ্বাসে আচ্ছন্ন এক পাতালপুরীর গল্প। এখানে ঝাঁ চকচকে বর্তমানের আড়ালে, যাপিত হয় পরাক্রম আর নিয়ন্ত্রণের জীবন। নিকষ অন্ধকারেই রচিত হয় শঠতা, ধূর্ততা আর অমানবিকতার নতুন নতুন অধ্যায়। স্বার্থের দানে আর পাল্টা দানে চলতে থাকে চতুরঙ্গের খেলা। শতরঁচের সাদা - কালো ঘরে আটকে পড়ে জীবন ও মনন, প্রত্যাবর্তনের পথ হারিয়ে যায়। নিয়ম ভাঙার এ খেলায় গন্তব্য শুধুই জিত, বাকি সবই মরীচিকার মতো মিথ্যা।
Politics is war without bloodshed while war is politics with bloodshed. - Mao Zedong - চতুরঙ্গের অশ্বারোহী - চতুরঙ্গের অশ্বারোহী বইয়ের মূল প্রেক্ষাপট হচ্ছে খুলনা শহর। এই শহরে খুলনা রাইডার্স ও সিলেট সুপারস্টারস্ এর মধ্যকার চলা একটি ম্যাচ শেষ হবার প্রাক্কালে শহরে আগমন হয় এক রহস্যময় ব্যক্তির। "দাদা" নামে সবাইকে নিজের পরিচয় দেয়া সেই ব্যক্তির আগমনের পরে শহরের রূপরেখা পাল্টে যেতে থাকে। শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই প্রান্তে থাকা দুই ডন মোজাফফর এবং জামশেদ মোল্লা ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়ে এক ভয়াবহ গ্যাং ওয়ারে। - খুলনা শহরের ভেতরে এই গ্যাং ওয়ার শুরু হলে এই ঘটনার সুলুক সন্ধানে নামেন ইন্সপেক্টর হাদী এবং তার সহকারী বাবুল। তাদের সাথে যোগ দেন "দৈনিক পূবের আলো" পত্রিকার সাংবাদিক সামিয়া। এখন কে এই "দাদা' যার আগমনের পরেই শহরে শুরু হয়েছে এরকম ধ্বংসযজ্ঞ? তার আসল উদ্দেশ্যই বা কী? বিশাল ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আগেই হাদী, বাবুল আর সামিয়া কী পারবে এই গ্যাং ওয়ার থামাতে? তা জানার জন্য পড়তে হবে লেখক সিদ্দিক আহমেদের ক্রাইম এবং পলিটিক্যাল থ্রিলার ঘরানার উপন্যাস "চতুরঙ্গের অশ্বারোহী"। - "চতুরঙ্গের অশ্বারোহী" বইটি মূলত ক্রাইম থ্রিলার এবং পলিটিক্যাল থ্রিলারের মিশ্রণ বলা যায়। বইয়ের পুরো পটভূমি জুড়েই ছিল খুলনা শহর। তাই চরিত্রগুলোর সংলাপও অনেক সময় সে ধরণের টোনেরই ছিলো, যা পটভূমি এবং ঘটনাবলীর সাথে ভালোভাবে খাপ খেয়ে গেছে। খুবই ইন্টারেস্টিং ভাবে শুরু হবার পরে মাঝে বইয়ের কাহিনি কিছুটা হালকা চালে চললেও শেষের গিয়ে আবারো গতি পায় বইটির কাহিনি। বইয়ের বেশ কিছু ঘটনার বর্ণনাভঙ্গি বেশ সিনেম্যাটিক লাগলেও গল্পের খাতিরে সেগুলো মেনে নেওয়ার মতো। - "চতুরঙ্গের অশ্বারোহী" বইয়ের চরিত্রগুলোর ভেতরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত "দাদা" চরিত্রটি ছিল বেশ রহস্যময় এবং আগ্রহোদ্দীপক। এছাড়া ইন্সপেক্টর হাদী এবং বাবুলের যুগলবন্দী দারুণ লাগলো। গ্যাংস্টার থ্রিলার হওয়ায় সেধরনের চরিত্রের প্রচুর আনাগোণা দেখলাম পুরো বইজুড়ে, যার ভেতরে কিছু চরিত্র আমাকে মারিও পুজো এর গডফাদার উপন্যাসের কয়েকটি চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দিলো। এছাড়াও কাহিনির ভেতর হিউমার থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবস্থার উপর সূক্ষ্ম ধারাভাষ্যের ব্যাপারটা ভালোই লাগলো। - "চতুরঙ্গের অশ্বারোহী" বইটি অবসর প্রকাশনা সংস্থার ব্যানারে প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের বাঁধাই, কাগজ ইত্যাদির দিক থেকে অসন্তোষজনক কোন কিছু পাইনি। বইয়ের প্রচ্ছদ এবং নামলিপি উভয়ই আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। বইয়ের কাহিনি মিনিমালিস্টিকভাবে প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বইয়ের শেষদিকে সামান্য কিছু টাইপিং এরর দেখলাম, এগুলো অবশ্য খুব বেশি সমস্যার সৃষ্টি করেনি। - এক কথায়, খুলনার পটভূমিতে বেশ ভালোমানের গ্যাংস্টার এবং পলিটিক্যাল থ্রিলার ঘরানার একটি বই হচ্ছে "চতুরঙ্গের অশ্বারোহী"। তাই যারা এ ধরনের থ্রিলার বই পড়তে পছন্দ করেন তাদের বইটির ব্যপারে রিকমেন্ডেশন দেয়া থাকলো।
গ্যাংস্টার বা আন্ডারওয়ার্ল্ড জনরার থ্রিলার বাংলাদেশে এখনো সেভাবে শুরু হয় নি। বেগ-বাস্টার্ড সিরিজে সেটা কিছুটা দেখা দিলেও - সেটা অনেকটা নির্দিস্ট কিছু ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কিন্তু মাফিয়াওয়ার্ল্ড নিয়ে বৃহৎ পরিসরে কাজ তেমন একটা হয় নি। মাফিয়া ফ্যামিলি, আন্ডারওয়ার্ল্ড পলিটিক্স নিয়ে আরো বাংলা থ্রিলার প্রয়োজন।। Gangs of Wasseypur, Mirzapur - এর মত কন্টেন্ট আমি এখনো বাংলাদেশি সিনেমা বা ওয়েবসিরিজ থেকে আশা করতে পারি না। কিন্তু সাহিত্যের দিক থেকে বাংলাদেশের থ্রিলার লেখকগণ বেশ এগিয়ে। আমি আশা করতেই পারি - দারুণ কিছু কন্টেন্ট সামনে আসবে।
এবার বইয়ের কথায় আসি। "চতুরঙ্গের অশ্বারোহী" - বইটি শুরু থেকেই এটেনশন Grab করে নেয়। শুরুতে অনেকগুলো সুতো ছড়িয়ে, খুব দ্রুতই সেটা গুটিয়ে আনা এবং শেষ পর্যন্ত দারুণভাবে সেটা মেইনটেইন করা। লেখক অতিরিক্ত কথায় বই বড় করার পথে হাটেন নি। আবার তাড়াহুড়োয় বই শেষ করেছেন - এমন কিছুও মনে হয় নি। মেদহীন লেখা বলতে যা বুঝায় - এই বইটি এক্সাক্টলি তাই। গল্পের অপ্রয়োজনীয় শাখা প্রশাখা নেই। অদরকারি জিনিসের বিশদ বিবরণ নেই। Sticking to the Point - এই বইয়ের সবচেয়ে ইমপ্রেসিভ ব্যাপার। আর সিদ্দিক আহমেদের দারুণ লেখনী - সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ্য।
লেখক ভূমিকাতেই বলেছেন - লেখাটি মূলত সিনেমার স্ক্রিপ্ট হিসেবে লেখা হয়েছিল শুরুতে। এজন্য দুইটা বিষয় হয়েছে। ১। যে স্টাইলে লেখা - গল্প ভিজুয়ালাইজ অনেক সহজেই করা যায়। ২। কিছুক্ষেত্রে অতি নাটকীয়তা চলে আসে। যা সিনেমার পর্দায় আমরা হয়ত মেনে নিতে পারি - কিন্তু বইয়ের পাতায় সেটা মানানসই হয় না।
*** Skip the next Bracket to prevent little spoiler. *** ( পুলিশের সাথে মাস্টারমাইন্ডের ক্যাফেতে দাবা খেলার বিষয়টা অনেকটা সেরকম। অতি নাটকীয়তা। আবার, ক্ল্যাইম্যাক্সে গ্যাংস্টারদের ফলো করা পুলিশের পক্ষে পসিবল না - কারণ তবে গ্যাংস্টাররা টের পেয়ে যাবে - এই অযুহাতে রিপোর্টারকে সেখানে পাঠানো হলো। কিন্তু পুলিশ নিজেও সেখানে রিপোর্টারের সাথে একই সময়ে উপস্থিত হলো।)
???
Climax আরেকটু ডিটেইলড হতে পারত - এখানেই যা একটু বইয়ের ল্যাকিংস চোখে পড়েছে। কিন্ত সবমিলিয়ে বিচার করলে বেশ উপভোগ্য।
বইয়ের প্রোডাকশন নিয়ে বলতে হলে - সম্পাদনা, পেজ কোয়ালিটি, বাইন্ডিং ভালোই বলা যায়। অভিযোগের সুযোগ তেমন নাই। প্রচ্ছদ তেমন এট্রাক্টিভ না। আমাকে টানে নি সেরকম। ২৩০ পেজের বই হিসেবে মূদ্রিত মূল্য অনেক বেশি - ৪২৫ টাকা।
একই বইটি বাতিঘর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হলে - মূদ্রিত মূল্য হতো ৩০০টাকার মধ্যে। বইটি আপনি বাংলাবাজারে প্রকাশনী থেকে সংগ্রহ করলে ৫০% ছাড়ে পাঠক সংগ্রহ করতে পারতো ১৫০টাকায়। বাস্তবে - বাংলাবাজারে অবসর প্রকাশনী থেকে বইটি সংগ্রহ করতে হয়েছে ২৫℅ ছাড়ে - ৩২০টাকায়।
কিছুটা প্রোডাকশন কোয়ালিটি (সম্পাদনা সংক্রান্ত মূলত) স্যাক্রিফাইস করে বইটি বাতিঘর ডেলিভার করতো অর্ধেকেরও কম মূল্যে।
ঘরোয়া ক্রিকেট লীগের মাঠে আবির্ভূত হলেন এক অচেনা আগন্তুক, ম্যাচ ফিক্সিং এর দান উলটে দিয়ে শহরে পা রাখলেন দশ বছর পর। রহস্যঘেরা এই চরিত্রকে চেনে শুধু শহরের পুরান লোকেরাই, দশ বছর আগের ঘটনা ভেবে তাদের আত্না কেঁপে যায় আশঙ্কায়- আবার কি ধ্বসে পড়বে খুলনা শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ড? চার পক্ষের স্নায়ুযুদ্ধে উপক্রমণ হয়েছে চতুরঙ্গের খেলার; জিততে হবে কৌশলে, বাহুবল এখানে অকেজো। কে এই চরিত্র, উদ্দেশ্য কি তার?
❝বুদ্ধিমান লোক বন্দুক ধরে না। আর যে বুদ্ধি খরচ করে সে কখনোই বুলেট খরচ করে না।❞
আনুমানিক ৩২০ থেকে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে ‘গুপ্ত সাম্রাজ্য’-এর প্রসার ঘটে। উত্তরবাংলায় গুপ্তবংশীয় ভূপতিদের শাসনকাল শুরু ঠিক তখন থেকে। মহারাজ শ্রীগুপ্ত, ধ্রুপদি সভ্যতার অনুকরণে এই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এই গুপ্তযুগকে ভারতের ‘স্বর্ণযুগ’ বলেও অভিহিত করা হয়। নানান আবিষ্কার, ধর্ম ও দর্শনের পাশাপাশি এই যুগে ষষ্ঠ শতকের কাছাকাছি সময়ে ‘চতুরঙ্গ’ নামক একটি খেলার প্রাদুর্ভাব হয়।
পারস্যে ‘সসনিয়ন’ বা ’সাসনীয়’ শাসনামলের সপ্তম শতকে গিয়ে এটি ‘শতরঞ্জ’ খেলা হিসেবে পরিচিত লাভ করে। বলা হয়ে থাকে, ওদের ‘চ’ এবং ‘গ’ নেই বলে—‘চতুরঙ্গ’ পারস্যে গিয়ে ‘শতরঞ্জ’ আকার ধারণ করে। পরবর্তীতে সেটা মধ্যযুগে ইউরোপে গিয়ে ‘দাবা’ খেলায় রূপান্তর ঘটে। বর্তমানে আমরা ৬৪টি কালো-সাদা ছকবিশিষ্ট চৌকৌ বোর্ডের ওপর ১৬টি করে দুই রঙের ঘুঁটির সাহায্যে যে অন্তরঙ্গন খেলা খেলি; অনেকটা সে-রকমই।
এখন হয়তো আপনাদের মনে একটি প্রশ্নের উদয় হতে পারে; যে চতুরঙ্গ অথবা দাবা খেলা কি একই নিয়মে খেলা হতো?
আমি খুব করে চাইব—এই প্রশ্নের উত্তর অন্য কোথাও না খুঁজে, ঘাঁটাঘাঁটি না করে আপনি বইটি পড়ে তবেই জানুন। সে-সব নিয়ে বলতে গেলে গল্পের মূল মজা নষ্ট হবে। তা-ছাড়া প্রচ্ছদের পেছনে দাবা খেলার ঘর কিংবা ফ্রন্টে আড়াই ঘর বাজিমাত করা অশ্বারোহীর অবয়ব দেখে এটিকে ‘দাবা’ খেলার কোনো প্রতিযোগিতা ভেবে একেবারেই ভুল করবেন না। চতুরঙ্গের যে ইতিহাস আমি শুরুতে লিখেছি, তেমন কোনো ইতিহাস বা ঐতিহাসিক কোনো ঘটনার লেশমাত্র উক্ত বইয়ে নেই। ❛চতুরঙ্গের অশ্বারোহী❜ বইটি রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্রিকেট খেলার অন্ধকার দিক এবং একজন দুরধিগম্য মানবের আগমনে শহরের ত্রাস সৃষ্টি হওয়ার দিকগুলো নিয়ে লেখা।
দেশিয় পর্যায়ের রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ ছাড়া শুধুমাত্র একটি জেলা অথবা শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দুই বা ততোধিক দলের আন্ডারওয়ার্ল্ড আয়ত্তে রাখা কোন্দলের বিষয়বর্ণনা নিয়ে ❛চতুরঙ্গের অশ্বারোহী❜ উপন্যাসের কাহিনি সাজানো। পটভূমি হিসেবে খুলনা শহরকে মর্মস্থল বানিয়ে লেখক পুরো কাহিনি লিখেছেন দুর্বার গতিতে।
◆ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
হাতি, ঘোড়া, রথ ও পদাতিক এই চারটি শাখাবিশিষ্ট সৈন্যদলকে আমরা চতুরঙ্গ হিসেবে জানি। দাবা খেলার নিয়ম অনুযায়ী এই চতুরঙ্গের ব্যবহার আমরা সব সময় করে থাকি। একটু চিন্তা করলে দেখবেন, এই চতুরঙ্গের ব্যবহার ছিল প্রাচীন সময়ে কোনো যুদ্ধ সংগঠিত হওয়ার প্রধান রণকৌশলের একটি অংশ হিসেবে। ব্যুহ রচনা থেকে শুরু করে, চাতুর্যের সাথে চতুরঙ্গের প্রয়োগ যুদ্ধ বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়া করিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ভূমিকা পালন করত। বর্তমানে এই চতুরঙ্গের ব্যবহার শুধুমাত্র দাবা বোর্ডের ওই চৌষট্টি কালো-সাদা ঘরে দাপিয়ে বেড়াতে দেখা যায়; যা এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের ইঙ্গিত দেয় বটে।
যাহোক, ❛চতুরঙ্গের অশ্বারোহী❜ গ্যাং ওয়ার প্রিয় পাঠকদের জন্য দারুণ একখানা গল্প বটে। গত বছর একই জনরায় বা প্রেক্ষাপট নির্ভর করে লেখক ‘মুসফিক উস সালেহীন’ ভাইয়ের ‘কাকতাড়ুয়া’ বইটি পড়ে দারুণ মজা পেয়েছি। এই বছরেও সেই একই জনরা বা প্লট নিয়ে লেখা ❛চতুরঙ্গের অশ্বারোহী❜ পড়ে আনন্দিত হয়েছি।
জনরা বা প্লটের সামঞ্জস্য শুধুমাত্র গ্যাং ওয়ারে থাকলেও লেখকের লিখনপদ্ধতির স্বকীয়তায় দুটো বই হয়ে উঠেছে অনন্য। যারা ইতোমধ্যে কাকতাড়ুয়া পড়েছেন তাদের জন্য এই বইটি অবশ্যই রেকমেন্ড থাকবে। দুটো বইয়ের মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। বিশেষ করে চরিত্র গঠন ও তাদের ক্রিয়া সাধনের উপায়ে। ❛চতুরঙ্গের অশ্বারোহী❜ উপন্যাসে ‘ডিপ অ্যান্ড ডার্ক’ কিছু চরিত্রের দেখা মিলেছে। বিশেষ একজনের কথা না বললেই নয়; সে হচ্ছে—‘দাদা’। বুদ্ধি দিয়ে কিস্তিমাত করা যার একমাত্র কাজ।
লেখকের বর্ণনা শৈলী নিয়ে আলাদা করে কিছুই বলার নেই। চিরাচরিত ঐতিহাসিক উপন্যাস হোক কিংবা বর্তমান সময়ের থ্রিলার প্লট; যে-কোনো জনরায় লেখা যেন ওনার বা হাতের খেল। শব্দচয়নে নতুনত্ব এবং বর্ণনায় আভিজাত্য; এই দুইয়ের মিশ্রণে ❛চতুরঙ্গের অশ্বারোহী❜ উপন্যাস হয়ে উঠেছে পরিপূর্ণ। যতটা বুঝেছি, লেখক উক্ত বই নিয়ে সিক্যুয়েল অবশ্যই টানবেন। বইয়ের শেষটা হয়েছে অন্তত সেই ইঙ্গিত দিয়ে।
● গল্পের শুরু এবং কিছু প্রশ্ন—
উপন্যাসের সূত্রপাত বিষ-নিঃশ্বাসে আচ্ছন্ন এক পাতালপুরীর গল্প দিয়ে। কোনো রূপকথার জগতে নয়, আমাদের এই পৃথিবীতে। এখানে ঝাঁ চকচকে বর্তমানের আড়ালে, যাপিত হয় পরাক্রম আর নিয়ন্ত্রণের জীবন। বিপিএল হওয়া ক্রিকেট মাঠ থেকে দেখানো অঙ্গভঙ্গিতে লুকিয়ে থাকে, ম্যাচ পাতানোর যত গোপনীয় কৌশল। ক্রিকেটার সরফরাজ এবং বাজি নিয়ে ঘটকালি করা এখলাসের এই নিয়ে দহরম-মহরম। কিন্তু কোনো এক কারণে সেই সম্পর্কের অবসান ঘটে! কেন?
খুন হয়ে যায় কালো টাকা সাদা করা এবং মোজাফফর ও জামশেদের আস্থাভাজন হাসান গাজী। কে করল তাকে খুন?
খুলনা শহরের অন্ধকারে রচিত হয় শঠতা, ধূর্ততা আর অমানবিকতার নতুন নতুন অধ্যায়। যে অধ্যায়ের সূচনা ঘটায় অস্ত্র ব্যবসায়ী মোজাফফর এবং ড্রাগ চোরাকারবারির অধিপতি জামশেদ মোল্লা নামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই শাসক। স্বার্থের দানে আর পালটা দানে চলতে থাকে এক নির্মম খেলা। সেই খেলায় ভাগ বসাতে আগমন ঘটে ‘দাদা’ নামক এক রহস্যময় চরিত্রের। কে সে?
⚊
গল্পের শুরুটা টানটান উত্তেজনায় পূর্ণ। একই দিনে শহরে আগন্তুক এক চরিত্রের আগমন, অন্য দিকে ম্যাচ পাতানো নিয়ে দর কষাকষির তুমুল আলোচনা। বসে নেই হাসান গাজীকে হত্যা করা খুনের কার্যক্রম। শহরের শাসকের ওপর অতর্কিত হামলা; দুই পুলিশ ও এক মেয়ে সাংবাদিকের সংগ্রামে মুখরিত হয়ে উঠে উপন্যাসের এক একটি অধ্যায়।
থেমে থাকার জো নেই। শুরু থেকে গল্পের পথ সহজবোধ্য। কাহিনির মধ্যপথে গল্পের প্রয়োজনীয়তায় অনেক কথোপকথন ও চরিত্রের আনাগোনা দেখা দিলেও, মূল গল্পে ভাটা পড়তে দেখা যায়নি।
● গল্প বুনট » লিখনপদ্ধতি » বর্ণনা শৈলী—
লেখকের গল্প বুননের আলাদা এক নিয়ম রয়েছে। কোথায়, কখন কোন স্পেল ব্যবহার করে গল্পকে বাস্তবে রূপান্তরিত করতে হয়; তা ভালোই জানা আছে। অপ্রয়োজনীয় কোনো উদ্বৃত্ত না দিয়ে, পাঠক সত্তাকে সরাসরি গল্পে প্রবেশ করিয়ে—চরিত্রদের মাধ্যমে মূল অবস্থান এবং করণীয় সব কার্য পরিচিত করিয়ে দেওয়া যে লেখকের একমাত্র কর্ম—তিনি সেটা ভালোভাবে পালন করেছেন।
সাবলীল লিখনপদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে, উপযুক্ত বর্ণনার পাশাপাশি—পারিপার্শ্বিক আলোচনা নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে দক্ষতার সাথে। জনরা ব্যতিক্রম হওয়ার কারণে লেখকের পূর্বের বইয়ের মতো শৈল্পিক ছাপ খুঁজে না পেলেও, বর্ণনা শৈলীর নৈপুণ্য সেই আক্ষেপ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। তবে ফাইটিং সিকোয়েন্সের অভাব বোধ করেছি; বিশেষ করে শেষ দিকে। দুয়েকটা যে ছিল না তাও না; তবে আরও বেশি আশা করেছি।
মোদ্দা কথা, ভালো একটি গল্প তৈরি করতে যে-সব আনুষাঙ্গিক বিষয়ের প্রয়োজন তার সবকিছু যাচাই-বাছাই করা এবং সেগুলো নিয়ে উপযুক্ত দৃষ্টান্ত স্থাপনের ক্ষেত্রেও লেখক সতর্ক দৃষ্টি নিবেদন করেছেন।
��� যেমন ছিল গল্পের চরিত্ররা—
উপন্যাসে চরিত্রের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সব চরিত্রকে একসাথে পরিচিত করানো হয়নি। ধাপে ধাপে অনেক চরিত্রের আগমন ঘটেছে। সেই হিসেবে কোনো চরিত্রকে অবহেলার পাত্র বানাতে দেখা যায়নি। গুরুত্ব যতটুকু দেওয়ার, লেখক সেটা দিয়েছেন। প্রয়োজন নেই, এমন কোনো চরিত্র ঠাঁই পায়নি উপন্যাসে।
তবে ‘দাদা’ নামক চরিত্রটি সবচেয়ে বেশি রহস্যের সৃষ্টি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই আবহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সাব-ইন্সপেক্টর হাদী এবং কনস্টেবল বাবুলের কেমিস্ট্রি সমাদৃত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। আপনি বইটি পড়লে, এই দুই চরিত্রকে পছন্দ না করে থাকতে পারবেন না।
যদিও সংলাপে প্রচুর স্ল্যাং ব্যবহার করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে আধিক্য দেখা গিয়েছে। তবে চরিত্রদের স্বার্থচিন্তা করলে এসবের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই ছিল। চরিত্রগুলো মূলত কাহিনির মূল স্তম্ভ অথবা শক্তিশালী দিক। যদি এই দিকটি ঠিকঠাক ভাবে নির্মাণ না হতো, তাহলে এই গল্পের অস্তিত্ব সংকটে ভুগতে হতো। তবে লেখকের মুনশিয়ানায় সেটা মাটির নিচে চাপা পড়তে বাধ্য হয়েছে।
আমার উক্ত উপন্যাসের সবগুলো চরিত্র নিয়ে খুঁটিনাটি লিখতে ইচ্ছা করছে কিন্তু সেটা সম্ভব না। স্পয়লার হয়ে যাবে। তার চেয়ে পাঠকরা বরং তাদের পরিচয় খুঁজে বের করে অনুভূতি ভাগাভাগি করুক। চরিত্রায়নের দিক থেকে এই বইটি যথাযথ অবতরণিকার প্রমাণ দিয়েছে।
● শেষের গল্প বলা প্রয়োজন—
সিক্যুয়েল, ত্রয়ী অথবা সিরিজের প্রথম বই হিসেবে বিবেচনা করলেও, ❛চতুরঙ্গের অশ্বারোহী❜ পরিতৃপ্ত করার মতো একটি উপন্যাস। অতি নাটকীয়তা বা অতিরঞ্জিত, ভাগ্যের সহায়তা পেয়ে বারবার বেঁচে যাওয়ার মতো কাহিনি অন্তত ঘটেনি। সম্পূর্ণ ঘটনাপ্রবাহে লেখক লাগাম টেনে রেখেছিলেন বলে হয়তো; সুন্দর এই সমাপ্তির দেখা পাঠক হিসেবে উপভোগ করতে পেরেছি।
গ্যাং ওয়ার বা এই ধরনের লেখায় অনেক সময় তামিল-তেলেগু সিনেমার ফ্লেভার থেকে যায়। বর্তমানে এমন লেখা অনেকেই লিখে। উদাহরণ বা নাম বলতে অনিচ্ছুক।
তবে ❛চতুরঙ্গের অশ্বারোহী❜ উপন্যাসের লেখক যদিও এই গল্পটি চিত্রনাট্য নির্মাণের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন; সেই দিক থেকে ভাবলেও সুন্দর একটি সিনেমা আমরা অবশ্যই পেতাম। তবে বিজ্ঞানকে ভুল প্রমাণ দেখিয়ে একাই একশ সাজার মতো অতিমানবীয় ক্ষমতা দেখানো বাদ দিয়ে এবং নির্মাণ কোয়ালিটির নেতিবাচক ও দুর্বল দিকগুলো পাশ কাটিয়ে রাখলে—অবশ্যই সম্ভব।
উপন্যাসে ‘দাদা’ চরিত্রটি নিয়ে যে আগামীতে আরও লেখালিখি হবে এই নিয়ে আশাবাদী। যেহেতু খেলাটা মাত্র শুরু। এই বইয়ের সিক্যুয়েল ও প্রিক্যুয়েল নিয়ে লেখক আরও কয়েকটি বই লিখবেন; এই প্রত্যাশা নিয়ে আপাতত দিনযাপন করি।
● খুচরা আলাপ—
দুর্বলতা ও বিশ্বাসঘাতকতার মেলবন্ধন ❛চতুরঙ্গের অশ্বারোহী❜ উপন্যাসে প্রস্ফুটিত হয়েছে বেশ ভালো রকমে। ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে নামা সেই ‘দাদা’ চরিত্রটি যেন অ্যান্টি হিরোর রোল প্লে করে যাচ্ছে অনায়াসে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, যে কাজগুলো করা হচ্ছে তা সঠিক না; কিন্তু ভবিষ্যতের শান্তির কথা চিন্তা করলে সেটাকে বৈধ বলে মেনে নিতে বাধ্য।
দেশের প্রায় জেলা শহরগুলোতে আন্ডারওয়ার্ল্ড-এর বৈরূপ্য—দেশ ধ্বংস করার নতুন নতুন ঘটনার দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। অস্ত্র আর মাদক ব্যাবসাকে লাগাম টেনে ধরার লোকবল, সেই ব্যাবসাকে নিজের অস্তিত্ব থেকে দামি করে নিচ্ছে। এর ফলাফল যে খুব সুখকর হয় না; তা জানার জন্য জ্যোতিষী হওয়া লাগে না। দেখা যাক ভবিষ্যতে এই দেশের চিত্র কেমন দাঁড়ায়। পরিবর্তন তো হবে না জানি, খারাপের আর কী কী বাকি আছে সেটাও দেখতে চাই।
◆ লেখক নিয়ে কিছু কথা—
লেখক সিদ্দিক আহমেদের তিনটে উপন্যাস ইতোমধ্যে পড়া শেষ। রুচির দিক থেকেও তিনটি আলাদা আলাদা স্বাদ দিতে বাধ্য করছে। ওনার সদ্য প্রকাশিত ‘স্বর্ণবাজ’ দ্রুত পড়ার চেষ্টা থাকবে।
● বানান ও সম্পাদনা—
ব্যবসা, পনের, ষোল, লক্ষ্য (খেয়াল করা হলে ‘লক্ষ’ হবে), আঁতাত-সহ বেশকিছু প্রচলিত বানানে ‘ও-কার’ জনিত ভুলের দেখা পেয়েছি। উঠে এবং ওঠে; সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার গড়মিল স্পষ্ট।
কিছু টাইপোর পাশাপাশি দুয়েকটা বাক্য গঠনে সম্পাদনার অভাবও লক্ষণীয় ছিল।
● প্রচ্ছদ » নামলিপি—
লেখকের প্রকাশিত বইগুলোর প্রচ্ছদ এবং নামলিপি সব সময় ইউনিক হয়। নতুনত্ব থাকে সেখানে। এই বইয়েও সেটার ব্যত্যয় ঘটেনি। রাজীব ভাইয়ের দুর্দান্ত ‘বল পয়েন্ট কানেকশন’ টাইপ প্রচ্ছদ দারুণ লেগেছে। নামলিপিও চমৎকার। দাবা বোর্ডের সাদা-কালো রঙের আধিক্য পুরো প্রচ্ছদ জুড়ে রয়েছে। পিছিয়ে নেই ব্যাক কাভারও। অসাধারণ। তবে স্পাইন অংশে কালো অক্ষরগুলোর সাদা আউটলাইন কালার কিছুটা কম মনে হয়েছে, শেলফে রাখলে বইয়ের নাম সহজে পড়া যায় না।
● মলাট » বাঁধাই » পৃষ্ঠা—
বইয়ের বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ প্রোডাকশন বেশ ভালো। তবে দাম আরেকটু কমিয়ে রাখলে বোধহয় ভালো হতো।
≣∣≣ বই : চতুরঙ্গের অশ্বারোহী • সিদ্দিক আহমেদ ≣∣≣ জনরা : ক্রাইম, পলিটিক্যাল থ্রিলার ≣∣≣ প্রথম প্রকাশ : জুন ২০২১ ≣∣≣ প্রচ্ছদ : ফরিদুর রহমান রাজীব ≣∣≣ প্রকাশনা : অবসর প্রকাশনা সংস্থা ≣∣≣ মুদ্রিত মূল্য : ৪২৫ টাকা মাত্র ≣∣≣ পৃষ্ঠা : ২৩১
খুলনা শহরে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নেতৃত্বে আছে দুটো দল। অস্ত্র চোরাচালানকারী মোজাফফর এবং মাদক ব্যাবসায়ী জামশেদ মোল্লা। দুজন দুই বিরোধী দলের হলেও তাদের মধ্যে আছে অলিখিত চুক্তি - কেউ কারোর এলাকায় বা ব্যবসায়ীক ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে না, কারোর পরিবারের উপর আক্রমণ করে না। এই সব হিসাবই ভন্ডুল হয়ে যায় শহরে রহস্যময় এক চরিত্রের আগমনে। অপরাধীরা সবাই তাকে চেনে দাদা নামে, শহরের সব রহস্য যেন দাদার নখদর্পনে। তাদের মুখে মুখে প্রচলিত আছে ১০ বছর আগে দাদা যখন খুলনা শহর ছেড়ে যান তখন এমন কিছু ঘটনা ঘটে যার কারণে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কোনো সদস্য আর বেঁচে ছিলো না। হঠাৎ দাদার আগমনের উদ্দেশ্য কী বা ১০ বছরের আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে কি না তাই নিয়েই এই বইয়ের কাহিনী।
আধুনিককালের দাবা দুপক্ষের মধ্যে খেলা হলেও অনেক আগে চতুরঙ্গ নামে এই খেলা চলতো চার পক্ষের মধ্যে। সেই চতুরঙ্গের মতোই দুই আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন, তাঁদেরকে ধরতে উদ্যত পুলিশ এবং রহস্যময় দাদা এই ৪ পক্ষের একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার অভিযানই চতুরঙ্গের অশ্বারোহী।
বইয়ের শুরুটা এতোই চমকপ্রদ ছিলো প্রথম পাতা থেকেই কাহিনীর প্রতি আকর্ষণ তৈরী হয়। পাতায় পাতায় টুইস্ট না থাকলেও পুরো বই জুড়েই রহস্য, কী হবে কী হবে ভাব বজায় ছিলো। সিদ্দিক আহমেদের লেখনী নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই, বরাবরের মতোই উপভোগ্য। ফিকশনের আড়ালে সোস্যাল কমেন্টারি উঠে এসেছে বারবার, স্বাধীনতার পর পাটকল বন্ধ হওয়া, যেকোনো নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলের সুপরিকল্পিত কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি অথবা সেলেব্রিটি টিকটকারের গ্রেফতার কোনো কিছুই বাদ যায়নি। বেশ গম্ভীর মেজাজের বইয়ের মধ্যে দুই পুলিশের কথোপকথন কিছুটা কমিক রিলিফ যোগান দিয়ে সুন্দর একটা ভারসাম্য বজায় রেখেছিলো। বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে চমৎকার কিছু সংলাপ পড়তেও বেশ ভালো লেগেছে।
লেখকের বাকি বইগুলো পড়ে প্রত্যাশা আকাশচুম্বী হওয়ার কারণেই হয়তো শেষটা পড়ে কিছুটা হতাশ হয়েছি। এছাড়া আর যা ভালো লাগেনি তা হলো অত্যধিক চরিত্রের সমাগম। ��য়েক পাতা পরপর যুক্ত হওয়া নতুন চরিত্রের হিসাব রাখতে গিয়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। চলমান কাহিনীর সমাপ্তি থাকলেও বিশাল এক ক্লিফহ্যাঙ্গারও থেকে গেছে। আশা করি লেখক দ্রুতই সিক্যুয়াল উপহার দিবেন আমাদের।
সবশেষে বলবো ক্রাইম ফিকশন জনরার ভক্ত না হওয়ায় আমার ভালোলাগার পরিমাণ হয়তো একটু কম। তবে যারা আন্ডারওয়ার্ল্ড, মাফিয়া, গ্যাংওয়ার সম্বলিত ক্রাইম থ্রিলার পছন্দ করেন তারা বেশ উপভোগ করবেন বইটি।
ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলারের বাইরে গিয়ে সিদ্দিক আহমেদ লিখেছেন অপরাধের কালো জগৎ নিয়ে। এর আগে পড়েছিলাম তার নটরাজ ও ধনুর্ধর। স্বর্ণবাজ পড়ার ইচ্ছে আচ্ছে।
আন্ডারওয়ার্ল্ড কিভাবে চলে এবং তাদের থামাতে পুলিশ কিভাবে কাজ করে সে বিষয়টি বেশ সূক্ষ্ম ভাবে বলেছেন লেখক। তবে তা করতে গিয়ে মাঝে লেখা হয়ে গিয়েছে স্লো।
বলা হয় যেকোনো লেখার শত্রু হলো অডিও-ভিজুয়াল। শো, নট টেল। এই ক্ষেত্রে সিদ্দিক আহমেদ পাস মার্ক পাবেন না। বলেছিলাম সূক্ষ্মভাবে লিখেছেন, আদতে বলেছেন, দেখাতে পারেননি।
দুটো গ্যাংয়ের মাঝে মারামারি লাগায় তৃতীয় কোনো পক্ষ। এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাপদ থেকে নিজের কাজ ঠিকভাবে করে যায় সেই তৃতীয়পক্ষ। এখানে একটু খটকা লাগে। সেই তৃতীয় পক্ষের চরত্রায়ন আমার কাছে পরিপূর্ণ লাগেনি। গ্যাংওয়ার লাগাতে গেলে যেই ধরনের শক্তিশালী চরিত্র হতে হয় সেটি হয়নি। তাছাড়া গল্পে বারবার উঠে এসেছে দশ বছর আগের কোনো এক কাহিনী। সে বিষয়ে ডিটেইলস বলা নেয়। আরেকটু বিস্তারিত লিখতে পারলে ভালোই হতো।
গল্পের শেষে বেশ কয়েকটি টুইস্ট ছিল। যার একটি আন্দাজ করে ফেলেছিলাম। অপর টুইস্টটি না দিলেও চলতো।
এতক্ষণ সমালোচনা করলেও আন্ডারওয়ার্ল্ড বিল্ডিংয়ে লেখক মুন্সিয়ানা দেখিয়েন সেটা স্বীকার করতেই হবে। গল্পের চরিত্র নিয়ে আমি খুঁতখুঁতে বলে বিষয়গুলো নজরে এসেছে। তা বাদে উপভোগ্য একটি গল্পই বলেছেন সিদ্দিক আহমেদ। এছাড়াও বইয়ের নামের সাথে গল্পের চমৎকার মিল রয়েছে।
চতুরঙ্গ, শতরঞ্জ বা দাবা — নামে যত ভিন্নতা থাকুক না কেন, খেলা কিন্তু এক। আর এই খেলা বুদ্ধির। মস্তিষ্কের নিউরনে যে আন্দোলন হয়, তার মধ্য দিয়ে প্রতিপক্ষকে চেকমাত দেওয়ার চেষ্টা মধ্য দিয়েই বিজয়ের গল্প লেখা হয়।
“চতুরঙ্গের অশ্বারোহী” বইটা যেন এমনই এক খেল, যেখানে প্রতিপক্ষ একজন, দুইজন কিংবা তিনজন। প্রত্যেককে হারিয়ে বাজিমাত করার চেষ্টা যিনি করছেন, তিনি সবার কাছে দাদা নামে পরিচিত। ঠিক দশ বছর আগে খুলনা অঞ্চলের শহরে যারা দাদাগিরি করত, ভারিক্কি ভাষায় মাফিয়া কিংবা ডন! তাদেরকে কুপোকাত করে হারিয়ে গিয়েছিল। হারিয়ে যাওয়া থেকে আবার ফিরে এসেছে নতুন লক্ষ্য নিয়ে। যে লক্ষ্য হয়তো আবারও অতীতকে স্মরণ করিয়ে দিবে, আবারও শুরু হবে রক্তের হোলি খেলা।
“চতুরঙ্গের অশ্বারোহী” মূলত খুলনা শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডের গল্প। যেখানে একদিকে মোজাফ্ফর, অন্যদিকে জামশেদ মোল্লা। ভিন্ন তাদের ব্যবসা, দুইজন দুই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে। কেউ কারো পথে বাঁধা হয় না। নিজেদের ব্যবসা, নিজেদের ক্ষমতা তাদের এলাকাতেই সীমাবদ্ধ রাখে। কিন্তু একদিন ঝড় ওঠে। সুপ্ত অবস্থায় থাকা শত্রুতা জেগে ওঠে দুইজনের মধ্যে। প্রকাশ্যে দুই মাফিয়ে এক অপরের চোখে তাকিয়ে, অস্ত্র তাক করে যে ভয়ংকর খেলায় মেতেছে তাতে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। খুলনা শহর তাই আতঙ্কে দিনযাপন করছে। আর এই দুই মাফিয়াকে প্রতিপক্ষ বানানোর এক মোক্ষম চল দিয়েছে ভিন্ন কেউ।
গল্পের শুরুটা হয়েছে দুইভাবে। একদিকে বাঙালিদের প্রাণের খেলা ক্রিকেট। বিপিএলের ফাইনাল। যেখানে খুলনা রাইডার্স ও সিলেট সুপারস্টারস মুখোমুখি। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট এলেই সবার আগে যে অভিযোগ আসে, তা ফিক্সিং। এখানে ফিক্সিংয়ের কিছু খুঁটিনাটি লেখক আলোচনা করেছে। কীভাবে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে জুয়ার বাজার জমে ওঠে, কীভাবে একজন ফুলেফেঁপে উঠলে বাকিরা সর্বশান্ত হয়, তার একটা চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। যদিও পুরোপুরি না, কিন্তু তার কিছুটা আভাস লেখক ঠিকই দিতে পেরেছেন।
অন্যদিকে শহরের নামকরা উকিল হাসান গাজী। যে আসলে এই শহরের খুবই জাঁদরেল মানুষ। যে দুই মাফিয়ার কথা উপরে বলা হয়েছে, তারাও বেশ সমীহ করে চলে উকিল সাহেবকে। বৃষ্টি মানুষকে উদাস করে দেয়। হাসান সাহেবও উদাস হয়ে বৃষ্টির সময় হুড খোলা রিকশায় ভ্রমণ করতে বেশ পছন্দ করে। এমনই এক বৃষ্টির সময় হাসান গাজী হারিয়ে গেল। কেউ জানল না তার কী হয়েছে। পুরোপুরি লাপাত্তা হয়ে সবার মাথায় চেপে বসল। কালো টাকা সাদা করার উপায় বন্ধ। পুলিশও এক নিখোঁজ উকিলকে খুঁজছে। কী হলো তার? কেউ জানে না।
লেখকের লেখা যারা পড়েছেন, তারা জানেন লেখক বর্ণনার বিষয়ে কতটা দক্ষ। ভূমিকা থেকে জানতে পারি, কোনো এক মুভির স্ক্রিপ্ট হিসেবে লেখা গল্পটি উপন্যাস আকারে তৈরি হয়েছে। লেখকের এই বর্ণনায় মুগ্ধ হতে হয়। চোখের সামনে যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে ঘটনা প্রবাহ। মাফিয়াদের জীবন, চালচলন, গ্যাং ওয়ারের ভয়াবহতা, এক অপরের জীবন নেওয়ার যে চিত্র — সবকিছুর দৃশ্যায়ন ছিল জীবন্ত। চোখের সামনে দেখতে পারছিলাম। আর অনুভব করতে পারছিলাম সবকিছু। লেখকের বর্ণনা সাবলীল ও গতিশীল। তিনি তার লেখা দিয়েই মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিতে পারেন।
তিনি অ্যাকশন দৃশ্যের বর্ণনায় যতটা সাবলীল, খেলার বর্ণনায় কিঞ্চিৎ দুর্বল মনে হয়েছে। টানটান উত্তেজনার মুহূর্তে সেই ইমোশন ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। এর থেকে প্রমাণ হয় সবাই সবকিছুতে পারদর্শী হতে পারে না। তাছাড়া কিছু ভলভ্রান্তিও ছিল খেলার বর্ণনায়। প্রথমে ব্যাট করে দল ১৭১ রান তুলে। সেই লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৪০ রানে আট উইকেট হারানো ঠিক আছে। কিন্তু বৃষ্টিভেজা পিচ, স্পিনারদের সাফল্য, যেখানে আট উইকেট চলে গেছে সেখানে ১৪ ওভারে ১৪০ রান বাংলাদেশের পিচ অনুসারে একটু কঠিন। লেখক হয়তো একটি সংখ্যা দিতে হবে, তিনি তা-ই দিয়েছেন। তাছাড়া ক্রিজে থাকা যে ব্যাটসম্যান ১২ বলে ৩০ রান করে অপরাজিত আছে, ধারাভাষ্যের মতে সে টেস্ট খেলছে না টি-টোয়েন্টি এটা এক রহস্য। সেই ব্যাটসম্যান না-কি ডিফেন্স করছে। ১২ বলে আর কত রান করলে আক্রমণাত্মক হতো?
এই গেল ছোট্ট এক ভুলের কথা। ঘটনাপ্রবাহে খুব একটা গুরুত্ব না এলেও এমন ভুলভ্রান্তি চোখে লাগে। এছাড়া খুব একটা অসঙ্গতি চোখে পড়েনি। বরং টুকটাক যে প্রশ্ন ছিল, লেখক তার গল্পের মধ্য দিয়ে সেগুলো দূর করেছেন। আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষেত্রে এক দুর্দান্ত থ্রিলার এই “চতুরঙ্গের অশ্বারোহী”। এখানে প্রতিশোধ আছে, ক্ষমতা দখলের লড়াই আছে, আছে নিজেকে জহির করার প্রবণতা। তবে সবচেয়ে বড় খেলাটা বোধহয় ষড়যন্ত্র। আর এই ষড়যন্ত্রের মূল ধরতে না পারলে নিজের নিজেরা লড়াই করে পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে।
যখন এমন মাফিয়াদের উত্থান বা বিস্তারের ঘটনা ঘটে, তখন পুলিশের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপুর্ণ। হাদী ও বাবুলের জোড় এই জায়গায় খুব গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে একটা ইন্টারেস্টিং বিষয়, শুরুতে যেমন চারিত্রিক বিশ্লেষণ দিয়ে তাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, ঠিক তেমনটা পুরো গল্পে ছিল না। হাদীকে বুদ্ধিমান, সৎ ও যোগ্য বলেই মনে হয়েছে। তার সাথে বাবুলের যে সম্পর্ক, সেটাও মনে ধরেছে ভীষণ। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে এমন ভাইয়ের মতন সম্পর্ক, আগলে রাখার মানসিকতা, মায়া ও ভালোবাসার বন্ধন আজকালকার বইগুলোতে খুব একটা দেখা যায় না। সেক্ষেত্রে এই মানিকজোড় জুটির কেস সমাধানের জন্য যেভাবে ছুটে যাওয়া, বইটির মূল আকর্ষণ ছিল। একবারের জন্যও তাদের গুরুত্বহীন হতে হয়নি।
এমন এক আন্ডারওয়ার্ল্ড জাতীয় গল্পে সাংবাদিকের ভূমিকা অপরিসীম। এই গল্পেও একজন সাংবাদিক ছিল, তাও সে যদি হয় নারী তাহলে সোনায় সোহাগা। নারী চরিত্র না থাকলে গল্প ঠিকঠাক জমে না। একটু রহস্য, একটি প্রেম, কিছুটা খুনসুঁটি গল্পকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। সাংবাদিক সামিয়ার সাথে পুলিশ অফিসার হাদীর একটু আধটু মন দেওয়া-নেওয়ার বিষয় ভালো লেগেছে। হাদীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো লেগেছে কথা বলার ধরন, দৃঢ়তা। পুরোপুরি রসকষহীন কোনো চরিত্র না।
উপন্যাসের সবচেয়ে দুর্দান্ত বিষয় ছিল সংলাপ। খুলনার আঞ্চলিক ভাষায় সংলাপ বেশ উপভোগ করেছি। তাছাড়া বেশ কিছু ক্যাচি সংলাপ ছিল। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ বেশ ইন্টারেস্টিং ছিল। হাদী আর বাবুলের কথা বলা, এক অপরের সাথে খুনসুঁটি বেশ আমোদ দিয়েছে। দারুণ বলতে হয় অবশ্যই। যেহেতু চিত্রনাট্য হিসেবে শুরুতে গল্পটা লেখা হয়েছিল, তাই সংলাপে লেখক বাজিমাত করেছেন। ���ছাড়া কিছু ঘটনা বেশ সিনেমাটিক ছিল। একটু বাস্তবসম্মত করতে পারলে বোধহয় ভালো হতো।
উপন্যাসের সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র দাদা। কে এই দাদা? এই প্রশ্নের উত্তর পুরো উপন্যাস জুড়ে খুঁজে বেড়াবে। যার উত্তর শেষেও মেলে না। দাদার চারিত্রিক যে দৃঢ়তা আর বুদ্ধি বইটিতে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে এই চরিত্রকে ভালো লাগে আবার কর্মকাণ্ডে খারাপ লাগাও অস্বাভাবিক না। মিশ্র একটা চরিত্র। কেন সে আক্রমণের মতো ঘটনা সাজিয়ে এক অপরের শত্রু বানাচ্ছে এই রহস্য লেখক শেষ পর্যন্ত বয়ে নিয়ে গিয়েছেন। দাদা চরিত্রকে একটি বেশি অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয়েছে। নায়ক সবকিছুতেই জিতে যাবে, সকল পরিকল্পনা সফল হবে; এমন উপাদান বইয়ে ছিল। তবে পুলিশ অফিসার হাদীকে আবার অতিরঞ্জিত হিসেবে দেখানো হয়নি। সে-ও লড়াইয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে।
ক্রিকেটের ফিক্সিংয়ের সাথে মাফিয়া জগতের একটা সম্পর্ক থাকে, এখানে তা দেখানো হয়েছে। তাছাড়া অস্ত্র কিংবা মাদক চোরাচালান, রাজনীতির ময়দানে উপস্থিতি, নিজেদের শক্তি প্রদর্শন বইয়ের পাতায় পাতায় ছিল। তবে মাফিয়া জগতকে ঠিকঠাক উপস্থাপন করা হয়নি। আরেকটু ভালোভাবে তাদের কর্মকাণ্ড বা অনৈতিক ব্যবসার প্রসার দেখানোর সুযোগ ছিল।
সমাপ্তিটা লেখক পুরোপুরি খোলামেলাভাবে উপস্থাপন করেছেন। কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। সম্ভবত লেখক সিরিজ লেখার ভাবনা রেখেছেন। আমি মনে করি এই বইটির সিরিজ হওয়া দরকার। কারণ শেষ বাক্য দিয়ে যে ব্যক্তিগত শত্রুতার আভাস দেওয়া হয়েছে তার সমাপ্তি টানা প্রয়োজন। সেই সাথে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। একই সাথে অতীতের যে সংযোগ লেখক তুলে এনেছেন, তা দিয়ে প্রিকুয়াল লেখা সম্ভব। এতে এই গল্পের প্রকৃতি আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
অবসর প্রকাশনীর এই বইয়ের বাঁধাই, কাগজের মান ছিল সেরা। বানান ভুল বা ছাপার ভুল চোখে পড়েনি খুব একটা। প্রচ্ছদ দুর্দান্ত। গল্পের ভেতরের আবেদনকে ফুটিয়ে তুলেছে।
খুলনা শহরের আণ্ডারওয়াল্ডের দুই ত্রাস–মোজাফফর এবং জামশেদ। মোজাফফর অন্ধকার জগতের বাসিন্দাদের নিয়ে দেদারসে চালান অস্ত্র-ব্যবসা, এদিকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জামশেদ নেতাদের ছত্রছায়ায় চালাচ্ছেন নিষিদ্ধ ড্রাগের সাপ্লাইয়ের কার্যক্রম। দু'দল ঝঞ্জাটহীন নিজেদের কুকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিল, তবে বিপত্তি ঘটল তৃতীয় পক্ষের আগমনে। কে এই তৃতীয়পক্ষ, যে দুই দলের মাঝে কুটচাল প্রয়োগ করে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে, যেমনটা ১০ বছর আগে খুলনা শহরে হয়েছিল। মোজাফফর আর জামশেদের কালো টাকা সাদা করার চাবিকাঠি হাসানকেই বা কারা হত্যা করল। অন্ধকার জগতের টালমাটাল অবস্থায় কী হতে চলেছে খুলনা শহরে? শেষ করলাম সিদ্দিক আহমেদের ‘চতুরঙ্গের অশ্বারোহী’। হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার থেকে বের হয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন জগৎ নিয়ে লেখক যেভাবে উপস্থাপনা করেছে তা নিসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। প্রথমে বিক্ষিপ্তভাবে ছোট ছোট গল্প দিয়ে শুরু হয়, ফলে প্রথম থেকেই বেশ আগ্রহোদ্দীপক ঠেকেছে। গল্প শুরু হয় প্রিমিয়ার লীগে জুয়ার আসর দিয়ে, ক্রিকেটার সাফোরাজ এবং রহস্যময় চরিত্র 'দাদা'-কে দেখানো হয়। অপরদিকে আণ্ডারওয়াল্ডে চলতে থাকে একের পর এক বিশৃঙ্খলা। ধীরে ধীরে সব সুতো একসাথে মিলতে থাকে। মোজাফফর আর জামশেদের মাঝে তৃতীয় পক্ষ কীভাবে ঝামেলা বাঁধাবে, তা দেখতে বেশ উন্মুখ থাকতাম, পাশাপাশি পুলিশের চাপ আর তৃতীয় পক্ষের রহস্যময় কার্যকালাপ বেশ সাসপেন্স তৈরি করছিল। দ্রুত একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে বিধায় বিরক্ত লাগেনি, গল্পের গতিবিধি পার্ফেক্ট ছিল। তেমন মাথা নষ্ট করা টুইস্ট না থাকলেও শেষদিকে অপ্রত্যাশিত একটা টুইস্ট ছিল যা গল্পকে শেষ অবধি জীবন্ত রেখেছে। আণ্ডারওয়াল্ডের গ্যাংস্টারদের মাঝে চলা খণ্ডযুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধগুলো ছিল বেশ রোমাঞ্চকর, বর্ণনায় কোনো খাদ ছিল না। শেষদিকে শেষ হয়েও হইল না শেষ ধরণের সমাপ্তি আছে, তবে প্রোটাগনিস্ট কেন এমন জট পাকানো কার্যকালাপ করল, তথা তার উদ্দেশ্য এখনো কেন জানি খোলাসা হয়নি। লেখক খোলাসা করে দিলে ভালো হতো।
★চরিত্রায়ন: চতুরঙ্গের অশ্বারোহীর সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার ঠেকেছে তার ‘চরিত্রায়ন’। একগাদা চরিত্রের ভীড়ে কোনো চরিত্রই স্বকীয়তা হারায়নি। বরং প্রত্যেকের মনস্তত্ত্ব এবংং কার্যকালাপ বেশ জীবন্ত ঠেকেছে। মোজাফফর এবং জামশেদের কথাবার্তা আর চিন্তাচেতনায় ভিন্নতা মানিয়েছে পুরো, যেন আসলেই কোনো গডফাদারের সাক্ষাৎ পেয়েছি। আর তৃতীয় পক্ষ তথা দু'দলের চক্ষুশূল 'দাদা' নামক ব্যক্তিকে তো রীতিমত সম্ভ্রম করে চলেছি। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ইন্সপেক্টর হাদীর চরিত্রটা। বেশিরভাগ গল্পের মুখ্য চরিত্রকে সৎ, নীতিবান দেখানো হলেও আমাদের হাদীকে প্রথমেই জব্দ করা টাকা নিজের পকেটে ঢুকাতে দেখা যায়, বাস্তবেও আসলে ১০০% সৎ চরিত্র জগতে নেই। এছাড়া কাছের মানুষদের সাথে আঞ্চলিক ভাষায় প্রয়োগ এবং প্রফেশনাল লাইফে শুদ্ধ ভাষায় ব্যবহার–এই দিকটা আরেকটা মাত্রা দিয়েছে চরিত্রকে। ★ইস্টার এগস- ১) বইয়ে ‘কফিতা’ নামক এক কফি শপকে দেখানো হয়, যার মালিকের নাম শুভ্র, এবং সেখানে হূমায়ুন স্যারের ছবি টাঙানো। কফিতা নামটি আসলে নেয়া হয়েছে হিমু সিরিজের একটা বই থেকে, যেখানে হিমুর খালাতো ভাই ‘কফিতা’ নামক কফি শপ খুলতে চেয়েছিলেন। যেহেতু হূমায়ুন স্যারের ছবি টাঙানো, তাই বলা যায় মালিক স্যারের ভক্ত, তাই হিমু পড়ে নাম রেখেছে ‘কফিতা’ ২) বইয়ে ‘পিপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে’ লাইনটা দেখে লেখকের আরেক বই ‘পিপিলিকার ডানা’ মনে পড়ে গেল।
পরিশেষে, বেশ দ্রুতগতির এবং উপভোগ্য থ্রিলার ‘চতুরঙ্গের অশ্বারোহী’। আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ, রাজনৈতিক কুটচাল এবং অন্ধকার জগতের আখ্যান–সব মিলিয়ে এ যেন শহরের আড়ালে আচ্ছাদিত আরেক শহর।
ব্যারিস্টার হাসান গাজী নিখোঁজ হয়েছেন। খুলনা শহরের প্রধান দুই মাফিয়া ডনের কালো টাকা সাদা করার কর্ম করতেন তিনি। তাঁরা হলেন জামসেদ মোল্লা এবং মোজাফফর। ভয়ংকর এই দুই ব্যক্তির কাছে শহর দুইভাগে বন্টিত। জামসেদের কাজ ড্রাগ নিয়ে আর মোজাফফরের অস্ত্র-চোরাচালানের ব্যবসা।
খুলনা শহর। সুন্দর এই শহরে আলোর নিচেই আছে অন্ধকার। পুলিশ, সাংবাদিক অনেককিছু দেখেও দেখে না। সিস্টেম বলে কথা। এই সিস্টেম ভাঙতে শহরে পা রেখেছেন একজন রহস্যময় ব্যক্তি। তাঁর অপরাধের সঙ্গি বা অনুগতরা তাঁকে 'দাদা' বলে ডাকে। সকল নিয়ম-কানুনের বাইরে হেঁটে বেড়ান তিনি। কি উদ্দেশ্য তাঁর?
হাসান গাজীর ঘটনাটি গুম না খুন নাকি পলায়ন তা কারো জানা নেই। পুলিশ কর্মকর্তা হাদী, তাঁর বিশ্বস্ত জুনিয়র বাবুল এবং সৎ সাংবাদিক সামিয়া জড়িয়ে পড়েন এমন এক ঘটনায় যা তাদের তিনজন অথবা পুরো মাফিয়া চক্র এবং পুলিশ বাহিনীর চেয়েও বড়। জুয়ারি এনামুল, ক্রিকেটার সরফরাজের কীর্তি বা উদ্দেশ্য কি এই ঘোলাটে পরিস্থিতিতে?
একদম গ্যাংস্টার ঘরাণার থ্রিলার পড়লাম অনেকদিন পর মনে হয়। সিদ্দিক আহমেদের লেখনীর ফ্যান আমি সেই 'ধনুর্ধর' থেকেই। তবে এই প্রথম সম্ভবত তাঁর কো�� বই পাঠ হল যা ঐতিহাসিক থ্রিলার বা ইতিহাসকে উপজীব্য করে লিখা থ্রিলার নয়। এই গ্রন্থে লেখকের লেখালেখির মধ্য দিয়ে সুন্দর এক যাত্রা হয়েছে। খুলনা সিদ্দিক আহমেদের প্রিয় শহর। এই শহরের একধরণের মিনিমালিস্ট এপ্রোচে সুন্দর বর্ননা করেছেন লেখক। সেই হিসেবে তাঁর লিখা অন্যকরমের একটি উপন্যাস পাঠ হল। লেখকের জলতরঙ্গের মত গল্পকথনের সাথে সাথে প্রতিটি চরিত্রের সংক্ষিপ্ত তবে কার্যকর চরিত্রায়ন সার্থক হয়েছে।
'দাদা' চরিত্রটি মূলত শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের 'কালো বেড়াল, সাদা বেড়াল' উপন্যাসের 'দাতা' চরিত্রটির প্রতি একটি ট্রিবিউট। আন্ডারগ্রাউন্ডের মধ্যকার চরিত্রগুলোর বিভিন্ন চাল-চলন, বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব কিছু অলঙ্ঘনীয় নীতিমালা এবং রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যোগসূত্র ফুটিয়ে তুলতে লেখকের খুব বেশি শব্দ খরচ করতে হয়নি। উপন্যাসটি সম্ভবত লিখা হয়েছিলো কোন সিনেমা বানানোর উদ্দেশ্যে। চিত্রনাট্যও নাকি তৈরি করা হয়ে গিয়েছিল।
শহরে ঠিক দশ বছর পূর্বের মত ঝড় আসছে। আসন্ন এই ঝড়ে বয়ে যাবে রক্তগঙ্গা। মাস্টারমাইন্ড দাদার কিছুটা কাছাকাছি ব্রেইন আছে সৈয়দ হাদীর। বাবুল এবং সামিয়াকে সাথে নিয়ে পারবেন কি তিনি অনেক নিরপরাধের জীবন রক্ষা করতে?
ব্যক্তিগত জীবনে দাবা আমার সবচেয়ে প্রিয় একটি গেইম। দাবা একসময় চারজনের খেলা ছিল। এইকারণে এর অপর নাম 'চতুরঙ্গ'। চারজনের এই খেলায় একজন মিত্র এবং দু'জন অমিত্র থাকতো। সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দাবারু তিনি হতেন যিনি শুধুমাত্র দুই অমিত্রকে জয় করতেন না, একইসাথে মিত্রকেও জয় করতেন।
জামসেদ, মোজাফফর, পুলিশ এবং দাদার এই চতুরঙ্গের বাইরেও কি কেউ আছে? যে শহরের এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সামাল দেয়া বা আরো খারাপ করতে পারেন? ধুরন্ধর জামসেদ, ঠান্ডা মাথার মোজাফফর, চৌকশ হাদী এবং বাটারফ্লাই ইফেক্ট সৃষ্টি করার পেছনের কারিগর সেই রহস্যময় দাদা, কে শেষ পর্যন্ত এই চতুরঙ্গে চেকমেইট করতে পারবেন? সম্ভবত ঘোড়ার চাল যে ভালো দিতে পারবে সে। তিনিই চতুরঙ্গের অশ্বারোহী।
2.5 অবশেষে পারলাম শেষ করতে। গত দুমাস ধরে 'সেই সময়' পড়ছি প্রতিদিন অল্প অল্প করে। একটু বোরিং লাগছিল বলে ভাবলাম একটা থ্রিলার পড়ে নেই! বাট এটা শুরু করার পড় দেখি এটার অবস্থা আরো খারাপ! শুরুর দিকে একদমই ভাল্লাগেনি। সিদ্দিক ভাইয়ের 'ধনুর্ধর', 'দশগ্রীব' আর 'পিপিলিকার ডানা' আগেই পড়া ছিল। তিনটাই ভাল লেগেছে। তবে, এবার মনে হলো লেখা একদম আনাড়ি। বইয়ের সবথেকে বিরক্তিকর এবং দূর্বল চরিত্রই হচ্ছে 'দাদা' চরিত্রটি। অথচ লেখক এই চরিত্রটিই একদম মরিয়ার্টি টাইপ করতে চেয়েছিলেন। মাঝের দিকে ভালই লাগছিল, তবে শেষে এসে আবার গোলমাল! স্টোরি ভাল ছিল, বিল্ড আপ ভাল তবে ভাল চরিত্রের অভাব আর এক্সিকিউশন একদম ভাল হয়নি।
এটা নিয়ে ভাল একটা থ্রিলার ওয়েব সিরিজ হতে পারে (নাকি হয়ে গেছে এর মাঝেই?)। কাহিনীর প্লটটায় খুববেশি নতুনত্ব নেই; কোন এক রহস্যময় লোক কিভাবে খুলনা শহরের দুই গ্যাংয়ের মাঝে গোলমাল লাগিয়ে দুই গ্যাংকেই খতম করছে তা নিয়ে, কিন্তু এগজিক্যুশনটা বেশ ভাল। কোথাও ঝুলে পড়ে না, যদিও এই অতিবুদ্ধিমান লোকটির ইনফরমেশন সোর্সটা সবসময় পরিস্কার না। শেষের ট্যুইস্টটাও খুবই আরোপিত মনে হয়েছে। যা বলছিলাম, বইয়ের চেয়ে টিভি বা ওয়েব সিরিজ হলেই ভাল হবে।
❝শুধু তাই না, চারটা পক্ষও থাকতো সেখানে। মডার্ন দাবায় তো দুটো পক্ষ মাত্র। তখন ছিল চারটা পক্ষ। বাকি তিনজনের একজনকে ধরা হত মিত্র হিসেবে বাকরা ছিল অমিত্র। মিত্র, অমিত্র যাকেই জয় করেন না কেন, প্রতিটা বিজয়ের আলাদা নাম ছিল।অমিত্র দুজনের কাউকে জয় করলে তাকে বলা হয় সিংহাসন জয়। আমার সবচেয়ে প্রিয় জেতার নাম হচ্ছে চতুরাজি। এ জয়টা খুব দুঃসাধ্য ছিল। কারণ এতে দুই অমিত্র শুধু না মিত্রকেও জয় করতে হত। এখান থেকেই চাতুর্য কথাটা এসেছে কিন্তু।❞
|| কাহিনী সংক্ষেপ ||
খুলনা শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডের উপাখ্যান চতুরঙ্গের অশ্বারোহী। শহরের দুই প্রান্তের দুই ডন, তৃতীয় পক্ষ আর ধূসর চরিত্রের পুলিশের ইঁদুড়-বেড়াল দৌঁড় কাহিনী এ বই। তবে তৃতীয় পক্ষের পরিচয়টা সবার অজানা। একে একে শহরে দোজখ কায়েম করছে চতুরঙ্গে পারদর্শী তৃতীয় পক্ষ। সাব ইন্সপেক্টর হাদী আর তার এসিস্ট্যান্ট কাম কাছের বন্ধু বাবুল কিনারা করতে পারছে কোন কিছুর। থামাতে হবে অবশ্যম্ভাবী গ্যাং ওয়ার। তবে তৃতীয় পক্ষ তার চতুরঙ্গে 'শাহমাত' করতে ব্যস্ত। ফলাফল কী দাঁড়াবে শেষমেশ?
|| চরিত্র ||
প্রথমেই বলি হাদী আর বাবুলের কেমিস্ট্রি ছিল বইয়ের প্রাণ। প্রতিটা ক্যারেক্টারই ছিল ওয়েল ডেভেলপড। দাদা চরিত্র বই শেষেও অন্ধকারে রয়ে গেছে। লেখক বই যেই নোটে শেষ করেছেন তাতে বোঝাই যাচ্ছে দ্বিতীয় কিস্তি আসছে।
এছাড়া ক্রিকেটার সরফরাজ, সাংবাদিক সামিয়ার চরিত্রগুলোও বেশ ছিল। তবে পিরো বইয়ে দাদা চরিত্রের উপস্তিতি সবচেয়ে বেশি থাকলেও তিনি আপাতত অন্ধকারেই রয়ে গেলেন।
|| আলোচনা ||
প্রথমেই বলি বইটা একটা স্লো বার্নার। চ্যাপ্টার টু চ্যাপ্টার টুইস্ট দিয়ে ডোপামিন রিলিযে সাহায্য করবে না বইটা। ধীর সুস্থ সাসপেন্স থ্রিলার পাঠকদের জন্য মোক্ষম একটা বই।
বইটা লিখতে লেখক বেশ রিসার্চ করেছেন। এমনিতেও খুলনা শহরে ডনদের উৎপাত নিয়ে জানেন অনেকেই যারা পত্রিকা পড়েন। লেখক বিলকুল অতিরঞ্জন করেননি। সত্যটাকে তথ্যের সমাহারে কাল্পনিক কাহিনীতে উপস্থাপন করেছেন মাত্র। এছাড়াও বইয়ের ওপেনিং সিনটাও দারুন ছিল। ক্রিকেট জুয়াড়িদের ব্যাপারে বেশ কিছু চলে এসেছে বইয়ে।
ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট খুবই জোশ। ভাল-খারাপ ট্যাগ কারও গায়ে লাগানো সম্ভব না। ক্যারেক্টার সবাই কমবেশি ডার্ক বা গ্রে।
হাদী আর বাবুলের কেমিস্ট্রির কারণে হিউমারের উপস্থিতি ছিল। বাবুলের 'সব অসল্য কাম খালি আমারে দিয়ে করান লাগবি আপনার' ডায়লগটা বেশ কয়েকবার হাসিয়েছে।
পাঞ্চিং ডায়লগের উপস্থিতি ছিল বইয়ে বেশ। 'বুদ্ধি খরচ করলে বুলেট খরচ করা লাগে না' এর মাঝে বেশ লেগেছে আমার।
দাবার সাথে পুরো গল্পের মিশেলটা একটা দারুন তড়কা হিসেবে কাজে দিয়েছে। বইয়ের শেষ দিকের অ্যানালজিটা তুখোড় ছিল।
প্রচ্ছদটা খুবই ভাল লেগেছে। ইউনিক ধাচের পুরো।
|| সমালোচনা ||
এই বইয়ের কাহিনীর বুনন বেশ শক্ত থাকলেও কিছু বিষয় বলতে চাই।
প্রথমত হাদী যখন হাইপোথিসিস দেয় যে শহরে তৃতীয় পক্ষ থাকলেও থাকতে পারে তখন সেটা একটা ধারনা হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। কিন্তু অওরের পাতাতেই দেখা যায় হাদী আর বাবুল এমনভাবে আলাপ করছে যেন তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতির ব্যাপারে তারা এক পৃষ্ঠার ব্যবশানেই নিশ্চিত হয়ে গেছে। অথচ তখনও ঐটা কেবল হাইপোথিসিস ছিল।
বইটার শেষ কয়েকটা অধ্যায় বাদে পুরোটাই বেশ স্লো। এটা নেগেটিভ না অবশ্য। তবে অনেক পাঠকের জন্য এটা টার্ন অফ হতে পারে তাই জানিয়ে রাখা। স্লো বার্নার এমনিতে ভাল লাগলেও অনেকের এটা পছন্দ না-ও হতে পারে।
মোটাদাগে খুবই এঞ্জয়েবল একটা বই। লেখক নিরাশ করেন নি বরং আরও পরিপক্কতার প্রমাণ দিয়েছেন।
দাদা আগ্রহ নিয়ে চিন্তাযুক্ত কণ্ঠে বললেন, "জানেন তো দাবার প্রাচীন নাম চতুরঙ্গ ।" "হ্যাঁ, জানি । চারবাহিনী বোঝাতেই এই নাম । চাল দেন ।" দাদা চাল ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন," শুধু তাই না , চারটা পক্ষও থাকতো সেখানে । মডার্ন দাবায় তো দুটো পক্ষ মাত্র । তখন ছিল চারটা পক্ষ । বাকি তিনজনের একজনকে ধরা হত মিত্র হিসেবে, বাকিরা ছিল অমিত্র । মিত্র অমিত্র যাকেই জয় করেন না কেন, প্রতিটা বিজয়ের আলাদা নাম ছিল । অমিত্র দুজনের কাউকে জয় করলে তাকে বলা হয় সিংহাসন জয় । সবথেকে দুঃসাধ্য জেতার নাম ছিল চাতুরাজি ।" "কেন?" "কারণ এতে দুই অমিত্র শুধু না, নিজের মিত্রকেও জয় করতে হত । আর এখান থেকেই চাতুর্য শব্দটা এসেছে ।"
চতুরঙ্গের অশ্বারোহী || সিদ্দিক আহমেদ
ফ্ল্যাপ থেকে : চতুরঙ্গের অশ্বারোহী মূলত বিষ-নিঃশ্বাসে আচ্ছন্ন এক পাতালপুরীর গল্প। এখানে ঝাঁ চকচকে বর্তমানের আড়ালে, যাপিত হয় পরাক্রম আর নিয়ন্ত্রণের জীবন। নিকষ অন্ধকারেই রচিত হয় শঠতা, ধূর্ততা আর অমানবিকতার নতুন নতুন অধ্যায়। স্বার্থের দানে আর পাল্টা দানে চলতে থাকে চতুরঙ্গের খেলা। শতরঁচের সাদা - কালো ঘরে আটকে পড়ে জীবন ও মনন, প্রত্যাবর্তনের পথ হারিয়ে যায়। নিয়ম ভাঙার এ খেলায় গন্তব্য শুধুই জিত, বাকি সবই মরীচিকা।
পাঠ প্রতিক্রিয়া -------------------------- ফ্ল্যাপের ভারী শব্দের আড়ালে মূল গল্পটা পুরোপুরি বোঝা হয়ে ওঠেনি সম্ভবত । আমার বেলায়ও একই ব্যাপার ঘটেছিল । ফ্ল্যাপ পড়ে প্লট সম্পর্কে সামান্য ই ধারণা পাওয়া যায় । বইটা মূলত পলিটিক্যাল থ্রিলার বলা চলে । রাজনীতির রোষানল, আন্ডারগ্রাউন্ড ক্রাইম ও সাদামাটা শহরের আড়ালে প্রত্যহ ঘটে চলা কঠোর সিদ্ধান্তগুলোর জট নিয়েই বইয়ের গল্পটা ।
৹ যেভাবে প্লটের সূত্রপাত
শুরুটা হয় খুলনা রাইডার্স ও সিলেট সুপারস্টারস্ এর মধ্যকার টু টুয়েন্টি ক্রিকেট ম্যাচ দিয়ে ; যেখানে দেখা যায় তুমুল উত্তেজনাকর ম্যাচে ব্যাট করছে সরফরাজ মাহমুদ । ম্যাচ জিততে দরকার ৩২ রান, ওভার আছে এখনো ছয়টি । কিন্তু হাতে উইকেট মাত্র দুইটি । এমন টানটান উত্তেজনার ম্যাচের আড়ালে চলছে ভিন্ন খেলা - জুয়া । এভাবে যতই সময় বাড়ে, ধীরে ধীরে গল্প নানা বাঁক লাভ করে । কখনো খুন জখম, কখনোবা ড্রাগস কিংবা অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা । এভাবে গল্প সামনে এগোতে থাকে এবং এক টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে গিয়ে গল্পের ইতি টানেন লেখক ।
৹ চরিত্রায়ন
চরিত্রায়নে লেখক বরাবরের মত মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন । লেখক তার অন্যান্য বইগুলোর মত 'চতুরঙ্গের অশ্বারোহী' বইটিতেও ধীরে ধীরে চরিত্রগুলো রিভিল করেছেন এবং যথেষ্ট সময় ব্যয় করেই চরিত্রগুলো ডেভেলপ করেছেন । প্রতিটি চরিত্রের চিন্তাভাবনা, দর্শন, সাইকোলজি - সবকিছু লেখক সুনিপুনভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন । পলিটিক্যাল থ্রিলার হওয়ার দরুন অসখ্য চরিত্রের আনাগোনা ঘটেছে গল্পে । লেখক দক্ষতার সাথে প্রতিটি চরিত্রের বিল্ডাপ করেছেন । বিশেষত দাদা চরিত্রটি ছিল অতুলনীয় । এছাড়া অন্যান্য মূখ্য চরিত্রগুলোর মধ্যে ইন্সপেক্টর হাদী ও বাবুল ছিল যথেষ্ট সক্রিয় । এছাড়া মোজাফফর রহমান, জামশেদ মোল্লা, এখলাস, সরফরাজ আহমেদ, রিপোর্টার সামিয়া - সবগুলো চরিত্রই বেশ ভালোভাবে ডেভেলপ করতে পেরেছেন লেখক ।
৹ ভাষাশৈলী, সংলাপ ও স্টোরিটেলিং
গল্পের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হল এর ভাষা । খুলনা শহরের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে বইটি । তাই চরিত্রগুলোর সংলাপে খুলনার একসেন্ট খুব সুন্দরভাবে নিয়ে এসেছেন লেখক । ফলে সংলাপগুলো যথেষ্ট প্রাণবন্ত ও বাস্তবিক লেগেছে আমার কাছে । এছাড়া কখনো সূক্ষ্ম স্যাটায়ার, কখনোবা হালকা দার্শনিক কথাবার্তা প্লটে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে । চরিত্রগুলোর ভেতরকার দৃঢ়তা তুলে ধরতে বেশ শক্তপোক্ত সংলাপ ই ব্যবহার করেছেন তিনি । এতে চরিত্রায়নের দিকটা আরেক ধাপ পাকাপোক্ত হয়েছে ।
যারা সিদ্দিক আহমেদের লেখা 'ধনুর্ধর' বা 'দশগ্রীব' পড়েছেন তারা জানেন লেখকের গল্প বলার ভঙ্গি কতটা সুন্দর । এখানেও তার ব্যতিক্রম পাইনি । পুরো গল্পজুড়ে লেখক বইতে আমাকে আটকে রাখতে পেরেছেন । তবে থ্রিল বা সাসপেন্সের প্রসঙ্গে বলতে গেলে বলবো গল্পটা একটু ঢিমেতালের । চরিত্রায়ন ও প্লট বাস্তবায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়াতে গল্পটা শুরুর দিকে কিছুটা স্লো মনে হয়েছে আমার । তবে যতই পৃষ্ঠা বেড়েছে, গল্প ততই ডেভেলপড্ মনে হয়েছে আমার কাছে এবং শেষটা ছিল টানটান উত্তেজনাকর ।
৹ বর্ণনাভঙ্গি ও পরিবেশ বর্ণনা
লেখকের বর্ণনাভঙ্গি বরাবরের মত বেশ ভালো । প্রতিটি অবস্থা, দৃশ্য তিনি সময় নিয়ে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন । ফলে গল্পটা আরো বাস্তবিক হয়ে উঠেছে এবং ভিজুয়ালাইজ করতে সুবিধে হচ্ছিল । বিশেষত একশন সিনের বর্ণনা ছিল চমৎকার । মনে হচ্ছিল যেন চোখের সামনে ঘটছে সবকিছু । মানুষ ক্ষমতার মোহে কতটা নিচে নামতে পারে সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লেখক দেখিয়েছেন । জর্জ অরওয়েলের একটা বাক্য এখানে কোট করতে ইচ্ছে হচ্ছে : Political language is designed to make lies sound truthful and murder respectable, and to give an appearance of solidity to pure wind.
৹ প্রোডাকশন
বইটা প্রকাশ করেছে অবসর প্রকাশনা সংস্থা । প্রচ্ছদ করেছেন ফরিদুর রহমান রাজীব । প্রচ্ছদটা খুবই সুন্দর এসেছে । অহেতুক এলিমেন্টের ছড়াছড়ি বিহীন ক্ল্যাসিক একটা প্রচ্ছদ । বইয়ের বাঁধাই ও পৃষ্ঠার মান বেশ ভালো । পুরো বইতে দু-চারটার বেশি বানান ভুল তেমন চোখে পড়েনি । তবে বুকমার্ক হিসেবে একটা ফিতার অভাববোধ করেছি । সব মিলিয়ে ভালো প্রোডাকশনের সাথে সিদ্দিক ভাইয়ের ভালো লেখনশৈলীর মিশেলে চমৎকার একটা পলিটিক্যাল থ্রিলার 'চতুরঙ্গের অশ্বারোহী ।' যাদের এই জনরাটা পছন্দ তারা পড়ে দেখতে পারেন বইটি । আশা করি ভালো সময় কাটবে । লেখকের পরবর্তী বইয়ের জন্য শুভকামনা রইলো ।
এক নজরে, বই: চতুরঙ্গের অশ্বারোহী লেখক: সিদ্দিক আহমেদ প্রকাশনী: অবসর প্রকাশনা সংস্থা মুদ্রিত মূল্য : ৪২৫ টাকা পৃষ্ঠা : ২৩০
"The supreme art of war is to subdue the enemy without fighting.
"He will win who knows when to fight and when not to fight."
বিখ্যাত war strategist, philosopher এবং writer, Sun tzu এর এই দুটো quote; এই বইটির ক্ষেত্রে সম্পূর্ন ভাবে প্রযোজ্য। বইটির শুরুতেই লেখক সিদ্দিক আহমেদ বলেই দিয়েছিলেন যে, চিত্রনাট্যটি তিনি লিখেছিলেন এটিকে নিয়ে সিনেমা হবে বলে এবং তা গল্প বলার ধরনেই বোঝা যায়। একটা সিন থেকে আরেকটা সিনে জাম্প করা, চরিত্র গুলোর এন্ট্রি যেভাবে হচ্ছে, তাদের বর্ণনা দেওয়ার ধরন দেখেও তা স্পষ্ট।
গল্পের ঘটনাপ্রবাহ প্রায় পুরোটাই খুলনা শহরের মধ্যে এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকা নিয়ে সাজানো। একটি বৃষ্টির দিনে, খুলনা রাইডার্স ও সিলেট সুপারস্টারস্ এর মধ্যকার চলা ম্যাচ শেষ হবার মুহূর্তে, এক রহস্যময় ব্যক্তির আগমন হয়, চোখে সানগ্লাস, ঠোঁটে সিগারেট। সে স্টেডিয়ামে এসেই ক্রিকেটের জুয়া যে পরিচালনা করছে এনামুল তার কাছে যায় এবং টাকা লাগায় এবং অদ্ভুত ভাবে সে যেনো আগে থেকেই ম্যাচের রেজাল্ট সম্পর্কে অবগত। তার আসল নাম কেউ জানে না, কথা থেকে এসেছেন কেউ জানে না, শুধু সবাই তাকে ' দাদা ' নামে ডাকে। খুলনা শহরের দুই প্রান্ত দুজন ডন দেখাশোনা করে, মোজাফফর এবং জামশেদ মোল্লা। এই ' দাদা ' আসার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এই দুই আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাথা পরস্পরের সাথে গ্যাং ওয়ার শুরু করে। ব্যারিস্টার হাসান গাজী, যে কিনা এই দুই ডনের কালো টাকা সাদা করার কাজ করতো এবং তার একটা অদ্ভুত নেশা ছিল বৃষ্টির দিনে ভিজে ভিজে রিক্সায় করে শহর ঘোরার, এরকম এক বৃষ্টির দিনে বেরিয়ে সে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। দুই পুলিশ চরিত্র হাদী এবং বাবুল এইসব জট ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে এবং তাদের সাথে পরিচয় হয় 'দৈনিক পূবের আলো" পত্রিকার সাংবাদিক সামিয়া। ' দাদা ' নামক রহস্যময় ব্যক্তি ১০ বছর আগেও যখন ছিলেন খুলনা শহরের সব মাফিয়াদের শেষ করে তবে শহর ছেড়েছিল। আসলে কে এই ' দাদা '? কেনই বা সে দশ বছর পর আবার ফিরে এলো? ক্রিকেটের জুয়া খেলার কারণ কি ? আসল মাফিয়া কে বা কারা ?
অনেকদিন পর এরকম একটা pacey বা intense লেখা পড়ে বেশ ভালো লাগলো। প্রত্যেক চরিত্রের ডায়লগ, যাওয়া আসা, অ্যাপ্রোচ দুর্দান্ত ছিলো। পুলিশ চরিত্র হাদী সাহেব এবং বাবুলের রসায়ন ও বেশ জমজমাট ছিলো।
কিছু জিনিস হলে ভালো হতো, যে আসল মাথা যে এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের পেছনের প্রধান মাথা সে এত সহজে ধরা পড়বে ভাবিনি, সে এত বুদ্ধিমান শহরের দুজন মাফিয়া তার আন্ডারে, এত সহজ সরল ভাবে ধরা পড়লো এইখানে ব্যাপারটা ঠিক জমেনি। ব্যারিস্টার হাসান গাজী এবং জব্বার এই দুটো চরিত্রকে যদি আরো একটু স্পেস দেওয়া যেত তাহলে বেশ আরো জমজমাট হতো পুরো চিত্রনাট্যটি।
অবশ্যই শেষে এর পরবর্তী পার্টের আভাস পাওয়া যায়, এবং অপক্ষায় থাকবো। এখনো দাবার চল বাকি আছে যে....
খুলনা শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডকে ঘিরে বইটি। মোজাফফর রহমান এবং জামশেদ মোল্লা শহরের দুই দিকের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রক। একজন অস্ত্র ব্যবসার মূল পরিচালক আরেকজন ড্রাগ ডিলার। ডন হলেও এই দুই ব্যাক্তি একজন অপরজনের ব্যবসা নিয়ে কোনোদিন ঘাটায়নি। কিন্তু এক ব্যাক্তি হঠাৎ করে উদয় হলো যাকে "দাদা" নামে সবাই সম্বোধন করে। লোকটির মূল উদ্দেশ্য ছিল খুলনা শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডের পতন ঠিক যেমনটা দশ বছর আগে হয়েছিল। এরই মাঝে দুই দলের কালো টাকা সাদা করার মূল সাহায্যকারী ব্যারিস্টার হাসান গাজী হঠাৎ খুন হয়ে যায়। তারপর থেকেই দুই দল পড়ে যায় বিপাকে। দাদা তার লোকদের সাহায্য শুরু করে দেন তার মিশন। দুই দলকেই লেলিয়ে দেওয়া হয় একে অপরের বিপক্ষে। এরপর শুরু হয় খুনের পর খুন।
দুই দলের রেষারেষি হয়ে যায় দৈনিক পুবের আলো ক্রাইম রিপোর্টার সামিয়া ফারজানার মোক্ষম সুযোগ শহরের কাছে এদের ক্রাইম হাতেনাতে তুলে ধরার। রিপোর্ট করার সুবাদে এসআই হাদীর সাথে তার পরিচয় হয় এবং সেই থেকে তারা এই রেষারেষির মূল কারণ খুঁজতে তৎপর। তদন্ত করতে গিয়ে তাদের সামনে আসে গোপন কিছু তথ্য , উন্মোচিত হয় আরো কিছু মুখোশ।
সিদ্দিক আহমেদ ভাইয়ার গল্প ব্যাখা করার ক্ষমতা দারুন যার কারণে মনে হয় গল্পের প্রত্যেক অংশ আমি নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছি। প্রথম দিকে গল্প যেভাবে শুরু হয়েছিল তাতে মনে হয়েছিল অসাধারণ কিছু একটা পড়তে যাচ্ছি কিন্তু মাঝে এসে আমার মনে হয় গল্পটির খেয় হারিয়ে যায়। গল্পে দাদা চরিত্রটি বেশ রহস্যময়ী হলেও চরিত্র টিকে আমার অনেক ড্রামাটিক লেগেছে। শেষে তার আসল চরিত্র কিংবা তার দুই দলকে লেলিয়ে দেওয়ার কারণ কিছুই জানা যায়নি। যে গল্পের মূল নিয়ন্ত্রক তার উদ্দেশ্যই জানা গেল না। শেষটাও মন মতো হয়নি।
সিদ্দিক আহমেদ ভাইয়ার দশগ্ৰীব এবং ধনুর্ধর আমার পড়া বইগুলো মধ্যে সেরার কোঠায় থাকবে সবসময়। এজন্য ওনার থেকে আমার এক্সপেক্টেশন অনেক বেশি যার কারণে বইটি পড়ে আমি বেশ আশাহত হয়েছি।
খুলনা।এই শহরের দুই প্রান্তের অলিখিত ডন বা আন্ডারওয়ার্ল্ড এর অধিপতি হল মজাফফর আর জামশেদ। একজন অস্ত্র বেবশায়ি , অন্যজন ড্রাগ লর্ড। আর হাসান গাজী এদের পার্টনার যে এদের কালো টাকা সাদা করে। পেশায় সে আবার উকিল। একদিন হটাৎ করেই হাসান সাহেব নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। নাকি তাকে খুন করে গুম করে ফেলা হয়েছে?
এদিকে মজাফফরের উপর হামলা হল। আর জামশেদের গোডাউনে পাওয়া গেলো অস্ত্র। কে আছে এর পিছনে? কি তার উদ্দেশ্য??
দশ বছর পর ফেরত আশা দাদাকে দেখে কেন চমকে উঠল ছিনতাইকারি দের নেতা এখলাস? কেন দাদাকে এত সম্মান করে সে?
কি উদ্দেশ্য দাদার? কেন দশ বছর ফিরে এসে সে এদের পিছনে লেগেছে?
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ এক কথায় মাইন্ডব্লইং!! দেশীয় পটভূমিতে, দেশীয় চরিত্রআয়নে এরকম গ্যাংস্টার থ্রিলার খুব ভাল লেগেছে। যারা গডফাদার বা মাফিয়া টাইপ বই পছন্দ করেন, তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য!! আর প্রেক্ষাপট অনুযায়ী চরিত্রগুল নিখুঁতভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। সাথে এস আই হাদি আর এ এস আই বাবুলের হিউমার কথোপকথন গুলা মজা লেগেছে।
আমাদের চেনাজানা সমাজের আড়ালে আরো একটা সমাজ বাস করে। অন্ধকার সেই সমাজের মানুষগুলোই আমাদের দৈনন্দিন জীবনটা এলোমেলো করে দিতে পারে এক লহমায়। এমনই এক অন্ধকার জগৎ নিয়ে ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার এই বইটি লিখেছেন সিদ্দিক আহমেদ ভাই। বইয়ের গল্প এগিয়েছে খুলনা শহরের অন্ধকার জগৎকে ঘিরে। যথারীতি দূর্দান্ত লিখনশৈলীর কারনে টানা পড়ে গিয়েছি গল্পটা। গল্পের প্লট, এক্সিকিউশান সব ভালো লেগেছে। সমস্যা হয়েছে থ্রিলার উপন্যাসের শেষে এসে কে, কেনো, কিভাবে এই ৩টা প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরী বলে মনে করি। কিন্তু এই বইতে শুধু "কিভাবে" প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি। "কে" এবং "কেনো" এই দুই প্রশ্নের কোনো ধরণের ব্যাখ্যা ছাড়াই লেখক গল্পের ইতি টেনেছেন। আমি জানি না, এই বইটার কোনো সিক্যুয়েল আসবে কি না! ভালো একটা গল্পের এমন পরিণতিতে তাই আমি বেশ খানিকটা হতাশ।
বেশ ভালো মানের থ্রিলার। যথারীতি নায়ক একজন নেগেটিভ ক্যারেক্টার। আর তার পরিচয় শেষ পর্যন্ত অপ্রকাশিতই থেকে গেল। যদিও গোটা গল্পে তিনি দারুন ভাবে প্রকাশিত।
This entire review has been hidden because of spoilers.
✔️ “দাদা একা একা দাবার চাল দিতে শুরু করলেন, দুপক্ষের হয়েই। তিনিই সাদা আবার তিনিই হয়ে উঠছেন কালো।” - লাইনটা সম্ভবত দাদা চরিত্র কে এক কথায় ডিফাইন করে।
✔️ অফিসার হাদী আর বাবুলের জুটি টা শুরু থেকেই এন্টারটেইনিং।
✔️ সরফরাজ এর ক্যারেক্টার টা অল্প সময়ের জন্য হলেও ভালো ছিলো।
✔️ রবিউল কফিল শাহীন মামুন, এখলাস এর গ্রুপ এর চরিত্র গুলো ইন্টারেস্টিং।
✔️ জামশেদ আর মোজাফফর এর হাড্ডা হাড্ডি লড়াই ভালো ছিলো।
✔️ এন্ডিং ঠিকঠাক, তবে কিছু ব্যাপার এখনও আড়ালেই রয়ে গেছে ।
শেষ হইয়াও হইলো না শেষ - ব্যাপারটা লিটারেরি ফিকশনের বেলায় ঠিক আছে। কিন্তু থ্রিলার-মিস্ট্রিতে আমি আশা করি, সকল ঘটনার ব্যাখ্যা থাকবে; সকল কার্যের কারণ দর্শানো হবে; এবং গল্পের যৌক্তিক পরিণতি টানা হবে। এসবের ঘাটতি থাকলে, ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় প্লট বা লেখনী যতই ভালো হোক, সেটা একটা ভালো থ্রিলার নয়। আমার কাছে ভালো থ্রিলারের সংজ্ঞা হচ্ছে - ভালো ব্যাখ্যা। অবশ্য এমনও হতে পারে যে, লেখক হয়তো এই বইটার সিকুয়েল আনতে চান। সেক্ষেত্রে আলোচনা ভিন্ন। তবে স্ট্যান্ড এলোন হিসেবে, বইটা সুখপাঠ্য হলেও, ঢেঁকুরটা ঠিকঠাক তোলা যায়নি।