দেশভাগ শুধু একটা দেশকে ভাগ করে ভাগ করে মানুষকেও। ভাগ করে তাদের জীবন জীবিকা ও যাপনকে। অন্তরে বাইরে তারা খণ্ডিত হয়ে পড়ে বিশ্বাসে এবং আস্থায়। লোচনদাস শব্দকর তেমনই এক মানুষের গল্প যাকে কোনও দেশই আশ্রয় দিতে চায় না। দু'দিকেই সে অবাঞ্ছিত। দু'দিকেই সে বহিরাগত। অথচ তার বুকের ভেতর গভীর প্রেম অখণ্ড দেশের জন্য। সেই প্রেম সে নিজেই সমান দু'ভাগে ভাগ করে দিতে চায় দেশের দুই খণ্ডকে। কিন্তু কোনও খণ্ডই তা নিতে চায় না। উল্টে তাকেই তাড়িয়ে দিতে চায় সীমারে অপর পারে। কিন্তু তার প্রাণের ভেতর কোনও সীমানা নেই। তাই সে সমান সুখে থাকে দু'দিকেই। কিন্তু কোনও দিকই তা সহ্য করে না। তার পিছনে লেগে পড়ে পুলিশ প্রশাসন, দেশের আইন।
অবশেষে লোচন দাস আবার পার সম্প্রদায়ের ভেতর যেখানে প্রেম ছাড়া আর কিছু নেই। সে আর কিছু না ভেবেই ভেসে পড়ে সেই প্রেম সাগরে। সেখানেই সে খুঁে নিতে চায় সেই আরশি নগর যেখানে পৌঁছতে পারলে তার বিশ্বাস যাতনা সকল যে পুরো
ছিন্নমূল মানুষের আতাত্ত্বিক উত্তরনের এক দশী আখ্যান "লোচন দাস শব্দকর।
বিমল লামার জন্ম ৪ জুলাই ১৯৬৮ দার্জিলিং পাহাড়ের সিংতাম চা বাগানে এক চা-শ্রমিক পরিবারে। বাবা পুলিশের চাকরি নিয়ে সপরিবারে চলে আসেন হুগলি জেলায়। পড়াশোনা চুঁচুড়ার স্কুলে-কলেজে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। আইনের কলেজছুট। বর্তমানে রাজ্য সরকারি কর্মচারী, পুরুলিয়ায় কর্মরত। স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ছোটগল্পই জীবনের প্রথম প্রকাশিত লেখা। ‘দেশ’ পত্রিকা আয়োজিত ছোটগল্প প্রতিযোগিতায় পরপর দু’বার পুরস্কৃত। প্রথম উপন্যাস ‘নুন চা’। ‘রুশিকা’ লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাস। ২০১৩ সালে পেয়েছেন জ্যোতিপ্রকাশ চট্টোপাধ্যায় স্মারক সম্মান।
"সকলকেই ঘরে ফিরতে হয়। শূন্যের সন্ধান আসলে ঘরে ফেরার পথ খোঁজা। যেখান থেকে এসেছিলাম..." সেই শূন্যের পথ ধরেই লোচন দাস ঝান্ডিওয়ালা, লোচন দাস ইন্ট্যারন্যাশনাল, হয়ে ওঠে লোচন দাস শব্দকর। লোচন দাস ছিন্নমূল মানুষের প্রতীক; যাকে কোন দেশই জায়গা দিতে চায় না। অথচ, তার বুকের ভেতর লাবডুব করে চলে এক অখন্ড সত্তা। যে সত্তা সাকার হয়েও নির্বিকার, নিস্তব্ধ হয়েও অবলীলায় বয়ে বেড়ায় সেইসব কথা যা মানবমনের একান্ত গভীর। সীমানা থেকে আরেক সীমানা পার হয়ে যায় সে, পথে পড়ে থাকে ধূলোমাখা না - পাওয়া- রা। কখনো সে আসে রহিমার বেশে। সে বলে, "আমি তোমার পথ চেয়ে থাকব ঝান্ডিওয়ালা" তারপর আসে পরভীন, সে বলে, "ঔদাসীন্য জন্ম দেয় পাল্টা ঔদাসীন্যের। তুমি জগতের প্রতি উদাস হলে তোমার প্রতি জগত উদাস" লোচন চেষ্টা করে ঔদাসীন্যের। শূন্যতার হাত ধরে ঝাঁপিয়ে পড়ে জলে। "ভেসে থাকতে থাকতে লোচনের মনে হয় সে বিশ্বচরাচরেরই অঙ্গ। নীচে মাটি, মাটির ওপর জল, জলের ওপর বাতাস। আর তার ওপর মহাশূন্য। সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে রাতের মায়াবী আলো। তারই মাঝে সে-ও ভেসে আছে এক অদ্রাব্য দানার মতো। এমন করে থাকতে থাকতেই ধীরে ধীরে গলতে থাকবে তার এই মানবদেহ"। লোচনের খোঁজ শেষ পর্যন্ত এসে ঠাঁই পায় এমন এক সম্প্রদায়ের ভেতর যেখানে প্রেম ছাড়া আর কিছুই নেই। ফকির লোচন দাস হাত ধরে ফকিরানী সিতারার আর ভেসে পড়ে সেই প্রেমসাগরে। যে প্রেমের হাত ধরে সে খুঁজে নিতে চায় তার আরশিনগর - তার খোঁজ যতই গভীর হয় ততই তার হৃদয়ের অখন্ড সত্তা থেকে উঠে আসে এক অমোঘ স্বর - "আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময় পারে লয়ে যাও আমায়"
বিমল লামার এই উপন্যাস পড়ে এক কথায় আমি মুগ্ধ। অজস্র সূক্ষ কাজ ছড়িয়ে আছে এর বুনোনে, লেখাতে, শৈলীতে। আর বলতে হয় ভাষার কথাও - কারণ, এই ভাষার ব্যবহারই উপন্যাসটিকে স্বকীয়তা দিয়েছে। কতটা গবেষণা, গভীর পর্যবেক্ষণ এবং পড়াশোনার ফসল যে এই বইটি তা আলাদা করে বলতে হয় না।