‘মুশতাক হুসেনের দরবারি’ আসলে কবিতার মোড়কে আছড়ে পড়া এক জেহাদ, এ কথা বলাই যায়। এ গ্রন্থের কিছু লেখা প্রকাশ পাওয়ামাত্র পাঠকের কাছে এই কাব্যস্রোতের অন্তর্নিহিত জোর পৌঁছে গিয়েছিল। কেননা শ্রীজাত’র কলমে নতুন এই কবিতাগুচ্ছে দেখা যায় একেবারে আনকোরা প্রকাশভঙ্গি, যা শীতল ও নির্লিপ্ত হিংস্রতাকেই বেছে নেয় তার ভাষা হিসেবে। একের পর এক কবিতায় চলতে থাকে যন্ত্রণার রাংতা উন্মোচনের খেলা, যেখানে উপশম কখনও কবিতার কর্তব্য হয়ে ওঠে না। বরং আরও বেশি করে সভ্যতার ক্ষতচিহ্নগুলিকে নির্মেদভাবে উপস্থাপিত করাই হয়ে ওঠে এইসব কবিতার কাজ। ভাষার এমন অভূতপূর্ব সাহসিকতা ও বিষয়ের এই অনন্যতা এককথায় বাংলা কবিতার নতুন একটি দরজা খুলে দিল। নিজেকে আপাদমস্তক ভেঙেচুরে এক নতুন কবিসত্তাকেই সামনে নিয়ে এলেন শ্রীজাত, এই কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে।
Srijato Bandopadhyay (born 21 December 1975 in Kolkata), is an eminent poet of the Bengali younger generation. He won the Ananda Puroskar in 2004 for his book Udanta Sawb Joker: All Those Flying Jokers. He has also attended a writer's workshop at the University of Iowa.
His notable works include Chotoder Chiriyakhana: The menagerie for kids (2005), Katiushar golpo: Tales untold (2006), Borshamongol : The monsoon epic (2006), Okalboisakhi: Storms unprecedent (2007), Likhte hole bhodrobhabe lekho: Write politely, if you have to (2002), Ses Chithi: Last Letter (1999), Bombay to Goa (2007), Coffer namti Irish : Irish Coffee (2008), Onubhob korechi tai bolchi : Revealing the feeling (1998).
Having worked as journalist, he is now on the editorial board of the magazine "Prathama". He lived at Garia and spend his childhood at Kamdohari, Narkelbagan.
Srijato is the grandchild of classical vocalist Sangeetacharya Tarapada Chakraborty and nephew of musician and the Khalifa of Kotali Gharana Pandit Manas Chakraborty; his mother is also a classical vocalist Gaan Saraswati Srila Bandopadhyay.
Other than poetry he has also penned the lyrics of many popular playbacks in several movies like Autograph (2010 film,)Jaani Dyakha Hawbe, c/o Sir (2013 film),Mishawr Rawhoshyo,Iti Mrinalinee, charulata, Abosheshe etc.
বইটা হাতে নিয়ে ভয়ংকরভাবে চমকে উঠতে হোলো।আরে!শ্রীজাতের লেখাই তো??পড়তে পড়তে অন্তত পাঁচবার প্রচ্ছদে কবির নাম দেখেছি কবিতাগুলো আদতেই শ্রীজাতের লেখা কি না সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য।কবির স্বভাবসুলভ রোমান্টিক,আবেগী ও ছন্দোবদ্ধ কবিতার সাথে এই কবিতাগুচ্ছ কিছুতেই মেলানো যায় না।মুশতাক হুসেনের দরবারিতে ছন্দ নেই,ছিটেফোঁটাও রোমান্টিকতা নেই।আছে তীব্র শ্লেষ, ক্ষুরধার বক্রোক্তি, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্রোধ,বিবেকের দংশন আর অদৃশ্য চোরাস্রোতের মতো বয়ে যাওয়া ভালোবাসা,মানুষের জন্য।নিজের সমাজ ও মানুষের পচনে ব্যথিত কবির উচ্চারণে উঠে এসেছে জান্তব,রক্তাক্ত সমকালের ছবি।এই ছবি কেউ মুগ্ধতা নিয়ে পড়বে আর কেউ "ছাইপাঁশ " বলে নাক কুঁচকাবে। আমি প্রথম দলে।বারবার পড়ছি,
"অসাবধানে মদের গ্লাস উলটে পালিয়ে যাওয়া বেড়ালবাচ্চাকে কেউ খানকির ছেলে বলে না। তোমাকে বলে। কেননা তুমি কিছু ওলটাতে পারোনি। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ঝিম মারা সন্ধেবেলাগুলোয় দূরে ভেসে ওঠা পাহাড়চূড়া বেচে দিয়ে প্রফিট মেরে বাড়ি ফিরতে পারোনি তুমি। মিছিল দেখে দূরে সরে থেকেছ বরাবর, নয়তো মাথা গুঁজে দিয়েছ প্রথম সারিতে। মিছিলের পেছনে আগুন লাগিয়ে হা হা বলতে পারোনি তুমি। বাড়িভাড়া বাকি রেখে বাড়িওলার মেয়ের সঙ্গে কেটে পড়তে পারোনি নিদেনপক্ষে দিঘা। ঝড়ের রাতে রাস্তা আটকে দেওয়া গাছের ডালকে কেউ বাঞ্চোত্ বলে ডাকে না। তোমাকে ডাকে। কারণ তুমি কিস্যু আটকাতে পারোনি। প্রতিরক্ষাসীমা ভেঙে দিয়ে এগিয়ে আসা পোষা ট্যাঙ্কের ঝাঁক বা পেঁয়াজের বাড়তে থাকা দাম। তুমি শুধু দাঁতের কোনায় সুতো বেঁধে উড়িয়ে দিয়েছ নিজেকে সন্ধের ছাদ থেকে ছাদে, হাতে হাতে, মাজাকির লণ্ঠন বেয়ে। নামো। সুতো নাও হাতে। ওলটাও কিছু। কিছু আটকাও। পাহাড় বিক্রির জন্যে নয়। বোঝাও এবার।"
অথবা,
"যে-কোনও কবিতার একটু নীচ দিয়ে, বয়ে যাচ্ছে একটা চোরা স্রোত। চক্রান্তের। ঠিক যেমন রেড কার্পেটের ধারে ধারে চোখে-না-পড়া পেরেকগুচ্ছ। ঠিক যেমন বাসের ফুরফুরে জানলার কোণে লেগে থাকা টাটকা বমি। হয়তো লেখা হচ্ছে দিঘির কথা, কিন্তু তার অনেক গভীরে, নরম মাটিতে পুঁতে রাখা আছে বাপি মণ্ডলের লাশ, যা জাল ফেলেও পাওয়া যায়নি। হয়তো লেখা আছে ধানক্ষেতের কথা, কিন্তু তার মাঝখানটায় দলাপাকানো রক্তমাখা সায়া। এইরকম। পঙ্ক্তির ঠিক মাঝখানে না-দেখতে পাওয়া একটা মিহি ছুরির গুনগুন সুর লুকিয়ে আছে। কমা-র আগে দাঁড়িয়ে দম নিচ্ছে একটা মাছ কাটার লোলুপ বঁটি। স্তবকের ডানদিকের পরদার আড়ালে সায়ানাইড। কবিতা, যা ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, আসলে একটা অজুহাতমাত্র।"
দুপুরবেলা ঝমাঝম বৃষ্টির শেষে বিকেলবেলা বইয়ের দোকান থেকে কিনে এনে সন্ধেবেলা উল্টেপাল্টে খানিক নেড়েচেড়ে রাতে খাওয়ার পরে একপাতা দুপাতা করে চোখ বোলাতে বোলাতে রাত বারোটা-কুড়ির সময় চৌষট্টি নাম্বার অর্থাৎ অন্তিম পৃষ্ঠাটা উল্টে ফেলার পরে শেষমেশ ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার কথাটা মনে মনে স্বীকার করতেই হলো চিৎপটাং হয়ে শুয়ে শুয়ে সিলিংয়ে ঘুরতে থাকা ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।
শ্রীজাতর আগের কোনো কবিতার সঙ্গে মেলানো যায়না এই বইয়ের কবিতাগুলোকে যেমন গরমকালে রোদের মধ্যে অনেকক্ষণ মোটরবাইক দাঁড় করানো থাকলে তারপর হঠাৎ তাতে বসতে গেলে ছ্যাঁকা লাগে। প্যান্ট পরে থাকলেও লাগে (অবশ্য প্যান্ট না পরে মোটরবাইকে কেউ বসতে যাবেই বা ক্যানো)। কিংবা শীতকালে যদি একবালতি ঠান্ডা জল... অবশ্য শীতকালের ব্যাপারটা এই বৈশাখ মাসে একটুও আন্দাজ করা যাবে না। কত তাড়াতাড়ি আমরা ভুলে মেরে দিই সবকিছু। প্রায় সবকিছুই। এই বৈশাখ মাসটার কথাও ভুলে যাবো সামনের আশ্বিনে।
যে-কোনও কবিতার একটু নীচ দিয়ে, বয়ে যাচ্ছে একটা চোরা স্রোত। চক্রান্তের। ঠিক যেমন রেড কার্পেটের ধারে ধারে চোখে-না-পড়া পেরেকগুচ্ছ। ঠিক যেমন বাসের ফুরফুরে জানলার কোণে লেগে থাকা টাটকা বমি। হয়তো লেখা হচ্ছে দীঘির কথা, কিন্তু তার অনেক গভীরে, নরম মাটিতে পুঁতে রাখা আছে বাপি মণ্ডলের লাশ, যা জাল ফেলেও পাওয়া যায়নি। হয়তো লেখা আছে ধানক্ষেতের কথা, কিন্তু তার মাঝখানটায় দলাপাকানো রক্তমাখা সায়া। এইরকম। পংক্তির ঠিক মাঝখানে না-দেখতে পাওয়া একটা মিহি ছুরির গুনগুন সুর লুকিয়ে আছে। কমা-র আগে দাঁড়িয়ে দম নিচ্ছে একটা মাছ কাটার লোলুপ বঁটি। স্তবকের ডানদিকের পরদার আড়ালে সায়ানাইড। কবিতা, যা ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, আসলে একটা অজুহাতমাত্র।
শ্রীজাতর কবিতা যাদের ভালো লাগে, এই কবিতাগুলো তাদের ভালো না-ও লাগতে পারে। আবার লাগতেও পারে। আবার না-ও লাগতে পারে। যেমন এই কবিতাটার কথাই ধরা যাক!
হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে যখন পরমাণু বোমা আছড়ে পড়ছিল, আমি তখন কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে একটা গাড়ির তপ্ত বনেটের ওপর বসে এন্তার ড্রাম পেটাচ্ছিলাম। ঘিরে ছিল মাতাল বন্ধুদল, আর হে পিতা, আমি নিজেই কি কম মাতাল ছিলাম সেই রাত্রে? বোতলের পর বোতল বিয়র কিচ্ছুটি না জানিয়ে আমার গলা বেয়ে হুড়মুড় করে নেমে গেছিল পাকস্থলিতে। ঠিক যেমন প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মাবে যোনিপথ বেয়ে। দেদার গানবাজনা হচ্ছিল রাস্তার একটা সস্তা পাবের সামনে। গিটারের তুবড়ির সঙ্গে লয় মেলাতে পারছিল না আমার এলোমেলো মাতাল ড্রাম কিট। কিন্তু, হে পিতা, আমিই কি মেলাতে পারছিলাম? আমি কি জানছিলাম না, আমার ড্রামের এক একটা বিট-এর সঙ্গে কয়েকশো কিলোমিটার পর্যন্ত হিলহিলে সাপের মতোই নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ছে দাঁতক্যালানে তেজস্ক্রিয়তা? একটু একটু উন্মাদনার দুলুনি শরীরে বইয়ে দিতে দিতে আমি কি বুঝতেও পারছিলাম না যে ওরা, আমার এই ড্রামের স্টিকদুটোকে অগুনতি যুদ্ধবিমান বানিয়ে ঢুকিয়ে দেবে আমাদেরই পেছনে? আমি সবটাই বুঝেছিলাম, হে পিতা। কিন্তু আমি, হাড় বিচক্ষণ রিচার্ড ফেইনম্যান, নোবেল পুরস্কারটা আন্দাজ করে উঠতে পারিনি।
সব্বাই ওপেনহাইমারকে গালি দ্যায়। আর একজন ক্রুদ্ধ বাঙালি কবি ফেইনম্যানকে কেমন দিলো! আগে হলে বলতুম, উফ কি দিলো, চারআনা কিলো।
ভালো না-ও লাগতে পারে।
আবার লাগতেও পারে।
কিছুই বলা যায় না।
বইটা উৎসর্গ করা হয়েছে : "প্রিয় চাবুক, পিয়ের পাওলো পাসোলিনি, আপনাকে"। চেনেন নাকি তাঁকে?
'অন্ধকারের লেখাগুচ্ছ' পড়ে অবাক হয়েছিলাম। মনে হয়েছিল এ এক অন্য শ্রীজাতকে আবিস্কার করেছি। রোমান্টিকতা গোলাপ ভর্তি ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলে শ্রীজাত 'মুশতাক হুসেনের দরবারিতে' তীব্র, ক্ষুরধার গদ্য কবিতার আক্রমণে পাঠকের গায়ের চামড়া ঝলসে দেন। চোখা গনগনে উত্তপ্ত গজালের মত প্রশ্ন ছুড়ে দেন, আবার তার তেতো উত্তরও রেডি থাকে কবির খেরোর খাতায়। চোখের সামনে খুন-ধর্ষণের কোনো প্রতিবাদ করবেন না, বার বার মানা করেছেন কবি। কবি চান স্মৃতিরা ছ্যারছ্যার করে মুত্র বিসর্জনের সাথে হলুদ ছোপে ভরা কোনো অজানা দেওয়ালে হারিয়ে যাক, সেটাই বরং আমাদের গলিত মগজের জন্য সহজ। কর্পোরেট ভোগবাদী কোম্পানি, রাষ্ট্রযন��ত্র চুষে খাচ্ছে মেহনতি শ্রমিকের রক্ত। সামান্য এক ভবঘুরে বিড়াল টেবিলে পানি ফেললে তাকে খনিকের ছেলে বলতে দেন না শ্রীজাত। চারপেয়ে খনিকের ছেলেটাকে গাল দিয়ে কি হবে? বরং তার পায়ের ছোপ ছোপ দাগে আমাদের রক্ত পাড়ার সব ভাঙাচোরা রাস্তায় মিশে যাক।
কিছু প্রিয় লাইন:
চোখের সামনে খুন করতে দেখেছ যাকে, তাকে চিনতে পারবে না আর। মেয়েদের এপিঠ ওপিঠ ধর্ষণ করার পর পাঁউরুটিতে মাখা মাখো রক্ত লেপে চেটে নিতে দেখেছ যাকে, তাকে বলবে সৌন্দর্য। কতবার না বলেছি। বদহজমের পর গলগল বমি করে ফেলাকে বলবে পিকাসো আর দাঁত দিয়ে কামড়ে ঠোঁট ছিঁড়ে নেওয়াকে শামিয়ানা। বহুবার বলেছি তোমাকে। . সমস্ত স্মৃতি আর অপমান ছ্যারছ্যার করে বেরিয়ে যায়। পেচ্ছাপের সঙ্গে। হলুদ ছোপে ভরে যাওয়া দেওয়াল, অগুনতি মানুষের অতীতজীবনের ব্যর্থতায় ভরে যাওয়া দেওয়াল, আক্রোশের আঘাতে নরম হয়ে আসা দেওয়ালে আমিও সটান দেগে দিই আমার গতকালের কুড়িয়ে পাওয়া অপমানরাশি। খুব আলতো একটা আওয়াজ হয়। তলপেট, নিভে আসে দিনের মতোই। . এখান দিয়েই হিলহিলে সাপের মতো বয়ে চলে যাচ্ছে যুদ্ধকামান। এখানেই শেষবার হরিণদের দৌড় আর ঠান্ডা কনভয়। এখানেই কাদামাটি খুঁড়ে ক্যাতকেতে দলাপাকানো লাশেদের ছিল পুঁতে দেওয়া। আর ঠিক এইখানেই মরে যাবার পরেও মেয়েটার পথে ঢুকে গেছিল বেয়নেট। এইখানেই। . বন্ধ কারখানার গেটে জমে থাকা জং চাটি, চলো। বহুদিনের আটকে থাকা তালার শরীর জেগে উঠুক আজ। তার মরচে পড়া ফুটোয় একের পর এক আমাদের জিভ ঢুকিয়ে দিই, চলো। পুরনো দিনের ব্যথা নিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসুক তার ক্ষত- পুঁজ-দাবি-পোস্টার। দরজায় পরিয়ে দেওয়া শেকলে দরদ দিয়ে একবার শরীর ঘষি চলো আজ। লোহার মন বোঝার চেষ্টা করি অন্তত। টানটান অথচ শিথিল ছিটকিনির মুখ চুষে তাকে জাগাই, খুলে দিই। ওপর নীচ করি তাকে হাতে নিয়ে। বেরিয়ে আসুক। গল্প। মিথ। দাবি। ইউনিয়ন। মালিকপক্ষ। আর নোটিস। বন্ধ কারখানার পা দুটো আজও ফাঁক করা। জমে যাওয়া শ্যাওলা আর মজে যাওয়া মরচে সরিয়ে, আজ আমরা একবার, চলো, মেশিন চালাই। . বহুবার কুপিয়ে একটা খুনের পর আমি মুশতাক হুসেনের দরবারি চালিয়ে দিলাম। লং প্লেয়িং। অনেকক্ষণ ধরে রক্ত বেরোবে। মেঝেতে জমে থাকবে কিছু, বাকিটা পোষা বেড়ালের পায়ে পায়ে পাড়া বেড়াবে। পৃথিবীর সমস্ত সংগীত আজ অপরাধের সেরা স্যাঙাৎ। প্রিয় সেতার আমার, কত খুনের সাক্ষী হয়ে থাকল। . স্যানিটারি প্যাড ছাড়াই ম্যারাথন দৌড়চ্ছে মেয়েটা। হেভি পিরিয়ডস চলছে তখন তার। সেই নিয়েই দৌড়চ্ছে। মাইলের পর মাইল। দৌড়চ্ছে হাঁপাতে হাঁপাতে হাসিমুখে। আর তার দু’পায়ের ফাঁক দেখতে দেখতে ভিজে উঠছে রক্তে। বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে সেটা। হলুদ শর্টস-এর সামনে থেকে পেছন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে গাঢ় লাল। যেন অবন ঠাকুরের ছোঁয়া। ট্র্যাকের পিচকালোর ওপর ছড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। যেন দৌড়নোও এক অপরাধ। কিন্তু সে হাসিমুখে পেটের ক্র্যাম্প অগ্রাহ্য করে দৌড়চ্ছে সেই অবস্থাতেই। তার বয়েস সতেরো। সে দৌড়চ্ছে ম্যারাথন। গ্যালারি থেকে তার নাম ধরে চিৎকার করতে করতে আনন্দে লাফিয়ে উঠছেন তার বাবা আর মা। ম্যারাথন কে জিতছে কেউ জানে না। কিন্তু অসংখ্য দর্শকের করতালি তার মাসিক রক্তে এসে মিশে যাচ্ছে। আর সে বলছে, দৌড়তে দৌড়তে বলছে, এটা কোনও প্রতিবাদ নয়। কোনও জেহাদ নয়। নারীবাদ নয়। এটা কেবল স্বাভাবিক। এত এত অস্বাভাবিক রক্তপাতের পর, এটুকু তোমরা মেনে নেবে না? . যে-কোনও কবিতার একটু নীচ দিয়ে, বয়ে যাচ্ছে একটা চোরা স্রোত। চক্রান্তের। ঠিক যেমন রেড কার্পেটের ধারে ধারে চোখে-না-পড়া পেরেকগুচ্ছ। ঠিক যেমন বাসের ফুরফুরে জানলার কোণে লেগে থাকা টাটকা বমি। হয়তো লেখা হচ্ছে দিঘির কথা, কিন্তু তার অনেক গভীরে, নরম মাটিতে পুঁতে রাখা আছে বাপি মণ্ডলের লাশ, যা জাল ফেলেও পাওয়া যায়নি। হয়তো লেখা আছে ধানক্ষেতের কথা, কিন্তু তার মাঝখানটায় দলাপাকানো রক্তমাখা সায়া। এইরকম। পঙ্ক্তির ঠিক মাঝখানে না-দেখতে পাওয়া একটা মিহি ছুরির গুনগুন সুর লুকিয়ে আছে। কমা-র আগে দাঁড়িয়ে দম নিচ্ছে একটা মাছ কাটার লোলুপ বঁটি। স্তবকের ডানদিকের পরদার আড়ালে সায়ানাইড। কবিতা, যা ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, আসলে একটা অজুহাতমাত্র।