সত্যজিৎ - দ্য বেস্টসেলার (হার্ড কভার)
লেখক - বাদল বসু
প্রকাশক - সপ্তর্ষি প্রকাশন
দাম - ৩০০ টাকা
পাতা সংখ্যা - ১০৪
সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকী পূর্তি উপলক্ষে মে মাসের চার তারিখে সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হল 'সত্যজিৎ - দ্য বেস্টসেলার'। বইটি মূলত আনন্দ পাবলিশার্সের প্রবাদপ্রতিম প্রকাশক প্রয়াত বাদল বসুর কলমে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে লেখা চারটি প্রবন্ধ ও প্রকাশক ও লেখকের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া মোট ২১টি চিঠির সংকলন। বইটিতে বাড়তি পাওনা হিসাবে রয়েছে আর্ট পেপারে ছাপা কিছু দুষ্প্রাপ্য ফটোগ্রাফ, পেপারকাটিং, সত্যজিৎ রায় কৃত খসড়া লেখা (প্রুফ সংশোধন নির্দেশ সহ), সিনেমার জন্য ব্যবহৃত বইয়ের প্রচ্ছদের মূল আর্টওয়ার্ক এবং তার ফাইনাল আউটপুট, বিভিন্ন কাহিনীতে ব্যবহৃত ইলাস্ট্রেসনের মূল ছবি, পেন্সিল স্কেচ (ছাপার নির্দেশাবলি সহ) এবং 'সোনার কেল্লা' বইয়ের জন্য আঁকা প্রথম প্রচ্ছদ এর ছবি। রয়েছে সত্যজিৎ ভক্তের এক আশ্চর্য বুদ্ধিদীপ্ত চিঠিও।
বাদল বসুর কলমে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ চারটি হল -
১) সত্যজিৎ - দ্য বেস্টসেলার
২) গ্রন্থ-চিত্রক সত্যজিৎ রায়
৩) ফেলুদার পাণ্ডুলিপি
৪) ফেলুদার স্রষ্টা
এই চারটি লেখার সময়কালের কোন উল্লেখ এই বইতে নেই। এমনকি লেখাগুলি পূর্বে কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল কিনা সে তথ্যও জানানো হয়নি। বইতে এই তথ্যগুলির উল্লেখ থাকলে ভাল হত। লেখাগুলির মূলত স্মৃতিচারণধর্মী, তার মধ্যে প্রথম দুটি লেখা অত্যন্ত সুখপাঠ্য, কিন্তু বাকি দুটি লেখায় বহু ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। যদিও বইয়ের শুরুতে প্রকাশকের বয়ানে উল্লেখ আছে - বইতে প্রকাশিত চারটি লেখাতেই তাঁর সত্যজিৎ সংসর্গের কথকতা। তিনটি লেখারই যেহেতু প্রকাশকাল ভিন্ন তাই কিছু ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আমরা মনে করিনি সেই সম্পাদনাটুকু জরুরি। বরং আরও জরুরি অবিকৃত লেখার উপস্থাপন।এই বইয়ের একমাত্র নেগেটিভ দিকটি হল বইয়ের অস্বাভিক দাম। মাত্র ১০৪ পাতার বইয়ের দামটি যদি কিছুটা কম করা যেত তাহলে ভাল হত (আর্ট পেপারে ছাপা, দুষ্প্রাপ্য ফটোগ্রাফ এর উপস্থিতি, খসড়া লেখা, অপ্রকাশিত চিঠি সবকিছুর উপস্থিতি মাথায় রেখেই একথা বলছি).
*** সত্যজিৎ - দ্য বেস্টসেলার ***
১৯৬০ সাল, বাদলবাবু তখন একুশ-বাইশ বছরের তরুণ যুবক। নিজের গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় এসে কর্মজীবনের সূচনা করেছেন গৌরাঙ্গ প্রেসের হাত ধরে। সত্যজিৎ রায়ের নাম গ্রামে থাকতেই শুনেছেন, তাঁকে চেনেন সিনেমার পরিচালক হিসাবে। সেই সময় সত্যজিৎ রায়ের কোন নতুন সিনেমা এলেই তা দেখতেন অত্যন্ত আগ্রহের সাথে। কিন্তু কলকাতায় কাজের সূত্রে তার সামনে খুলে গেল সত্যজিত রায়ের আরেক পরিচয়।
১৯৬১ সাল, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনের শতবর্ষপূর্তি। আর সেই বছরের মে মাসেই সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে ফিরে এল ঐতিহ্যবাহী 'সন্দেশ' পত্রিকা। ক্রাউন অক্টেভো সাইজ। চোখ জুড়ানো মলাট, ঝকঝকে ছাপা। বইয়ের ভিতরে অজস্র ছবি, হরেক ধরনের লেখা। লে-আউটের পিছনে কাজ করেছে ভাবনা ও উদ্যম। কোথাও এতটুকু হেলাফেলার চিহ্ন নেই। গল্পের মেজাজ অনুযায়ী অলঙ্করণ এবং বিচিত্র ক্যালিগ্রাফিতে বিভিন্ন ধরনের মাস্টহেড। একবার নয়, বারবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকলেন সবকিছু। আর ঠিক তখনই, একেবারে অন্য পরিচয়ে হাজির হলেন লেখক সত্যজিৎ রায়। সেই সংখ্যা থেকেই ওনার প্রিয় লেখকদের তালিকায় জায়গা করে নিলেন লেখক সত্যজিৎ রায়।
সেই শুরু, এরপর সন্দেশের পুজোসংখ্যায় আবির্ভাব ঘটল প্রোফেসর শঙ্কুর। কাহিনীর নাম 'ব্যোমযাত্রীর ডাইরি'। প্রত্যেক মাসে নতুন সন্দেশ, আর সেই সন্দেশ এ সত্যজিৎ রায়ের নিত্যনতুন গল্প - 'বঙ্কুবাবুর বন্ধু','টেরোড্যাকিলের ডিম', 'সেপ্টোপাসের খিদে', 'সদানন্দের খুদে জগৎ'। অভিনব বিষয় আর অনন্য স্বাদ।১৯৬৫ সালে সত্যজিৎ রায় 'ফেলুদা' নামের এক গোয়েন্দা চরিত্রকে নিয়ে এলেন সন্দেশের পাতায়। তিন কিস্তিতে প্রকাশিত সেই রহস্য, এডভেঞ্চার কাহিনী প্রকাশের সাথে সাথেই কিস্তিমাত করল। এ কাহিনী বারবার পড়েও যেন আশ মেটে না। তখনও তিনি জানতেন না, এই ফেলুদার হাত ধরেই সত্যজিৎ রায়ের সাথে সম্পর্কের এক নতুন রসায়ন সৃষ্টি হবে। হয়ে উঠবেন সত্যজিৎ রায়ের অত্যন্ত কাছের মানুষ।
বাকি লেখা পড়ে আমরা জানতে পারি সত্যজিৎ রায়ের সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের অভিজ্ঞতার কথা। রয়্যালটির চেক প্রথমবার হাতে পেয়ে লেখক সত্যজিৎ রায় কি বলেছিলেন তাঁকে। এই ফেলুদার কাহিনী পরবর্তী কালে শারদীয় 'দেশ' পত্রিকাতে ছাপার ফলে সেই পত্রিকার বিক্রিও যে বহুগুন বেড়েছিল সেকথাও স্বীকার করেছেন অকপটে। রয়েছে সত্যজিৎ রায়ের হাত থেকে এক অপ্রকাশিত উপন্যাসের আস্ত পাণ্ডুলিপি হাতে পাবার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার বিবরণ। বইমেলায় আনন্দ পাবলিশার্সের স্টলে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে তাঁর ভক্তদের উন্মাদনার কথা। ফেলুদার জনপ্রিয়তা যখন মধ্যগগনে তখন বাজারে আবির্ভাব ঘটেছিল 'নকল ফেলুদার', সেই প্রসঙ্গে সত্যজিৎবাবু কি বলেছিলেন রয়েছে সেই কাহিনীও। লেখক সত্যজিৎকে নিয়ে আরো বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতার কাহিনী ছড়িয়ে রেয়ে সারা লেখা জুড়ে।
তবে শুধুমাত্র লেখক সত্যজিৎ রায়ই নন, শিল্পী সত্যজিৎ রায়ের কথাও রয়েছে এই বইতে। কী টাইপে বই ছাপা হবে, পাতায় কি মাপে বসবে হরফ, ইলাস্ট্রেশন কোথায় কোথায় যাবে, টাইটেল পেজ কেমন হবে, প্রচ্ছদ কি হবে - সমস্ত টেকনিক্যাল বিষয়ে ছিল তাঁর নজর যে কতটা এবং প্রোডাকশন নিখুঁত করার দিকে লক্ষ্য যে কতখানি তা জানতে পারা যায় বদলবাবুর এই লেখা পাঠ করলে। বাদলবাবুর ভাষায় - "আমার কর্মজীবনের শুরুতেই সত্যজিৎ রায়কে পেয়েছিলাম এই শিল্পের পথপ্রদর্শক হিসেবে। ওনার করা যে কোন একটা বই হাতে নিলেই বুঝতে পারা যায় একটা বই ডিজাইনের ব্যাপারে উনি কতটা ভাবনা-চিন্তা করেন।কত বিভিন্ন রকম প্রচ্ছদ, ছবি এবং হরফ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গেছেন তা না দেখলে অবিশ্বাস্য মনে হয়। উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ আছে 'এক্ষণ' পত্রিকার কথাও। মাত্র তিনটে হরফ নিয়ে যে কতরকমভাবে 'এক্ষণ' পত্রিকার প্রচ্ছদপট এঁকেছেন, তা দেখলে অবাক হতে হয়। আমার প্রকাশক জীবনে এমন বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষের সান্নিধ্য আর পাইনি।"
বাদল বসুর কলমে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ গুলিতে কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ নেই দেখে বেশ অবাক হলাম -
১) ফেলুদার কাহিনী পরবর্তী কালে শারদীয় 'দেশ' পত্রিকাতে ছাপার কথা উল্লেখ থাকলেও, আনন্দমেলাতে প্রোফেসর শঙ্কুর কাহিনীও যে সেইসময় ছাপা হচ্ছে তার কোন উল্লেখ নেই।
২) সত্যজিৎ রায় সোনার কেল্লা ছবি করার পর 'সোনার কেল্লা' বইয়ের প্রচ্ছদে ইলাস্ট্রেশন এর পরিবর্তে ছবির স্থির চিত্ৰকে ব্যবহার করেছেন একথার উল্লেখ করলেও, এই ছবি হবার পর থেকে জটায়ু চরিত্রের ইলাস্ট্রেশন যে সম্পূর্ণভাবে পাল্টে অভিনেতা সন্তোষ দত্তের আদলে ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন সেকথার কোন উল্লেখ নেই।
বইয়ের যে দুটি মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়েছে তা হল -
১) (পৃষ্ঠা ৩৩) সত্যজিৎ ভক্তের চিঠির প্রথম বাক্য - 'এবারো বারো' গল্প শোনার বলে মনে করছি।লেখাটি হবে 'এবারো বারো' গল্প শোনাব বলে মনে করছি। (শোনাব > শোনার হয়েছে)
২) (পৃষ্ঠা ৫৩) তিনি নিজেও যেমন কথার নড়চড় করতেন না তেমনি অন্যের কাছেও সেটা প্রতাশা করতেন।(প্রত্যাশা > প্রতাশা হয়েছে)
সত্যজিতের কিছু ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বইতে থাকলেও ছবিগুলি আকারে খুব ছোট এবং ছবির বিন্যাসসজ্জাও ঠিক নয়। তুলনায় বইয়ের বাকি অলঙ্করণ, রঙিন ছবিগুলি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। এই বইয়ের অন্যতম আকর্ষণ প্রকাশক ও লেখকের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া মোট ২১টি চিঠির সংকলন। যা এই বইয়ের একেবারে শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে হলুদ রংয়ের মোটা পৃষ্ঠায় (অনেকটা পোস্টকার্ডের কালারের)। নিঃসন্দেহে এই চিঠিগুলি সত্যজিৎ প্রেমী পাঠকদের কাছে বইয়ের সেরা প্রাপ্তি !
'বস্তুত, লেখক হিসাবে সত্যজিৎ রায় জনপ্রিয়তার যে শিখরে পা রেখেছেন, সমকালে তা যে সর্বোচ্চ, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। বেস্টসেলার ও সত্যজিৎ রায়ের বই আজ সমার্থক।