দীর্ঘ, দীর্ঘদিন পর প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই পড়ার সুযোগ পেলাম। মানুষটি ভয়ানক রকম কম লেখেন। তাই তাঁর বই বেরোচ্ছে জানার পর সেটি হস্তগত করা এবং যথাশীঘ্র সেটি পড়ে ফেলা আমার কাছে প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল।
কী নিয়ে লেখা হয়েছে এই বইটি? তৌর্যত্রিক (কী সাংঘাতিক নাম! এর মানে যে নৃত্য, গীত ও বাদ্যের একত্র রূপ— এটি বোঝার জন্য অভিধান খোলা দিয়েই পড়া শুরু হল) কুশারি নামের এক যুবকের বয়ানে কথিত হয়েছে এই অ্যাডভেঞ্চার। ডক্টর সরিৎপতি সর্বজ্ঞ নামক এক ডাক্তারের আপ্ত-সহায়ক হিসেবে কাজে যোগ দিল সে৷ ক্রমে জানা গেল, সর্বজ্ঞ এক দুর্ধর্ষ ইনভেন্টরও বটে। কিন্তু তাঁর মতো বহু ইনভেন্টর ইতিমধ্যে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন যাঁরা নিজেদের গবেষণা গোপন রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই সংগঠনের সম্মেলনে যোগ দিতে উত্তরাখণ্ডে চললেন সর্বজ্ঞ ও কুশারি। পথে যোগ দিলেন প্রোফেসর প্রাণকৃষ্ণ প্রামাণিক নামের আর এক ইনভেন্টর৷ ক্রমে প্রকাশ পেল, যাঁদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে চলেছেন এঁরা, সেই পরিবারে ঘটেছে নানা ট্র্যাজেডি। কিন্তু সেগুলো কি শুধুই ট্র্যাজেডি ছিল, নাকি তার পেছনে আছে অন্য কোনো রহস্য? সংগঠনের যে দুই বিজ্ঞানী গত কয়েকবছরে মারা গেছেন, তাঁদের মৃত্যুর পেছনে কি অন্য কারও হাত ছিল? কোমায় অচেতন পুলহ চামোলা কি সত্যিই অমৃত আবিষ্কার করেছিলেন?
এই বইয়ের ভালো দিক কী? ১) একেবারে প্রথম থেকেই আপনি বুঝে যাবেন হাড়-হিম-করা ভয় বা ফাম ফাতাল-লাঞ্ছিত ক্রাইম থ্রিলারের বদলে আপনি একটি মুচমুচে ফ্যান্টাসি পড়তে চলেছেন। এতে কল্পবিজ্ঞান নেই, কিন্তু কল্পনার উড়ান আছে দেদার। কালান্তক করোনাকালে এমন লেখা একেবারে আদর্শ। ২) বইয়ের মুখ্য রস হল কৌতুক। তা প্রকাশের জন্য কখনও কুইজমাস্টারের মতো করে আমাদের নানা জিনিস জানানো হয়েছে। কখনও নানা চরিত্র, বিশেষত প্রোপ্রাপ্রা'র মাধ্যমে কমিক রিলিফ আনা হয়েছে। আবার কখনও সাসপেন্স বা বীভৎসতার ভাব ঘন হয়ে উঠলেই শব্দ নিয়ে খেলার মাধ্যমে আমাদের বলা হয়েছে, "হোয়াই সো সিরিয়াস?" ৩) রে-শতবর্ষে বেশ একটা শঙ্কু ও অবিনাশবাবু জুটি বা প্রণাবচ ও দীননাথ জুটির আপডেটেড এবং তরুণতর রূপ পাওয়া গেছে এতে। ৪) পাল্প ফিকশনের শর্ত মেনে এই বই অলংকরণ দিয়ে একেবারে ঠাসা। প্রচ্ছদটাও ক্যাটকেটে, তবে ঘোর 'পাল্পি'। স্টলে রাখা থাকলে কনিষ্ঠ পাঠকেরা বইটি তুলে নিতে আগ্রহী হবেন এ-সব দেখে।
এই বইয়ের খারাপ দিক কী? (১) বইটাকে সিরিয়াসলি নিতে চাইলে হেভি মাথা-গরম হবে। আমার প্রথম দিকে হচ্ছিল৷ তারপর কেসটা বুঝলাম এবং হাসি ও ঘটনার ঘনঘটা ভরপুর উপভোগ করলাম। পোস্ট-মডার্ন পাঠক এই বইকে ততটা সময় নাও দিতে পারেন (২) বইয়ের শুরুতে কুশারি ও সর্বজ্ঞ'র আলাপের জায়গাটা বড়োই ইনফোডাম্পিং-ক্লিষ্ট। ওটাকে আরও সহজ ও সরস করে দেখালে ব্যাপারটা আরও ভালো হত বলে আমার মনে হয়।
বইটির বানান নির্ভুল বলেই মনে হল। ছাপাও পরিষ্কার তথা নয়নসুখকর। গুমোট ধরা এই পরিবেশে ফুরফুরে মনে কিছুক্ষণের জন্য উত্তরাখণ্ড থেকে বেড়িয়ে আসতে চাইলে এই বইটা পড়তে পারেন। বেশ লাগবে।
প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'রুদ্ধশ্বাস সপ্তক' ছোট গল্প সংকলনটি পড়ে ভালো লেগেছিল। সেটা যত না গল্পের প্লটের জন্য তার থেকে অনেক বেশি ভদ্রলোকের লেখার জন্য। বাক্য ও শব্দ নিয়ে ভদ্রলোক রীতিমত জাগলিং করেন। ছোট গল্পগুলি ক্ষেত্রে একটা ইউ এস পি যেটা বুঝেছিলাম লেখক একদম শেষে একটা মারাত্মক মোচড় বা টুইস্ট রেখেছেন। সেগুলো কখনও হয়তো ছিল বেশ রোমাঞ্চকর আবার কখনও বেশ হাস্যরসাত্মক। এই উপন্যাসের শেষেও একটা দারুণ টুইস্ট আছে এবং শেষের ত্রিশ পাতা বেশ টান-টান উত্তেজনাপূর্ণ। তন্ত্র-মন্ত্র খুন জখম এসবের বাইরেও একখানা উপভোগ্য উপন্যাস হয়ে উঠেছে এবং 'পানকেষ্ট'বাবুর উপস্থিতিতে পরিস্থিতি কখনও সিরিয়াস হয়নি। একটা হাস্যরসাত্মক ব্যাপার বরাবর চলতে থাকে। উপন্যাসখানায় 'থ্রিল' হয়ত সেই অর্থে নেই কিন্তু 'ফিল' আছে অনেকখানি। বইখানা পড়তে পড়তে বারবার শঙ্কু আর অবিনাশবাবুর কথা মনে আসছিল। এবারে লেখকের প্রতি পূর্ণ সম্মান (ও শ্রদ্ধা) রেখেই দুটো অপ্রয়োজনীয় কথা বলি। সম্ভবত অরুন্ধতি রায়ের (অথবা ঝুম্পা লাহিড়ী) কোনও একটা ঘটনা পড়েছিলাম। যেখানে উনি একটি উপন্যাস লেখার সময় যখন যেরকম মনে হয়েছে অধ্যায়গুলো লিখেছিলেন। মানে নির্দিষ্টক্রমে লেখেননি। পরে সম্পাদনার সময়ে পাঠকের চোখ দিয়ে উপন্যাসটি দেখে ঠিক করেছিলেন কোন অধ্যায় ক্রম আগে হবে কোনটা পরে। বেশ কিছু টেড-এক্স ক্রিয়েটিভ রাইটিং বক্তব্যেও এই ব্যাপারে বেশ কিছু জনের মন্তব্য হল- একটি বড় উপন্যাসের মূল ক্রাইসিস যেন প্রথম তিনটে অধ্যায়ে চলে আসে। যাতে পাঠক বুঝতে পারেন তাঁর এই বইটা কেন পড়া উচিত। Dan Brown মশাই এব্যাপারে আরও কড়া। তিনি বলছেন, ওপেনিং সিন, প্রাক-কথন বা প্রথম অধ্যায়েই যদি পাঠক বুঝতে না পারেন গল্পের মূল অভীষ্ট কী তাহলে পরের দিকে যত ভালো ভালো দৃশ্য রচনা করা হোক না কেন পাঠক আগ্রহ হারাতে থাকবে। উক্ত বইয়ের যদি কোনও একটি দুর্বলতা থাকে তা হল ওই একটিই। লেখক তাঁর ইউ এস পি বজায় রেখে শেষ পাতে দুর্দান্ত টুইস্টখানা রেখেছেন কিন্তু সেটা লম্বা দৈর্ঘ্যের উপন্যাসের ক্ষেত্রে ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে বাধ্য। প্রথম অধ্যায় থেকে সরিৎপতি 'সর্বজ্ঞ', তৌর্যত্রিক করিৎকর্মা ছেলে। তারা অভিযানে চলেছে। দিল্লির এয়ারপোর্ট দেখছি, ভীমতাল, নৈনিতাল দেখছি। প্রাণকৃষ্ণবাবুর 'PUN' শুনছি, সব ভালো লাগছে। কিন্তু ২০০ পাতার বইয়ের প্রায় ১৩০পাতা অবধি মূল উদ্দেশ পরিষ্কার হয় না। মনে হয় একটা খুব ভালোমানের ট্রাভেল লগ পড়ছি। প্রায় ১৫০পাতার কাছে গিয়ে উপন্যাসের গ্রাফ কিছুটা উপরের দিকে উঠতে থাকে। শেষ অবধি যেটা দাঁড়িয়েছে সেটা বেশ ভালো লেগেছে কিন্তু কাহিনির বিন্যাস বা অধ্যায় সজ্জা নিয়ে হয়ত আরও একটু ভাবনা চিন্তার প্রয়োজন ছিল। বইয়ে সুমন্ত গুহের অলঙ্করণগুলো বেশ ভালো লেগেছে। গল্পের মূল প্লট বেশ তারিফযোগ্য। তাই কল্পনার এই উড়ানে চেপে এক অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে একবার পড়ে ফেলতে পারেন বোধিবীক্ষণ!
'আমরা কি সবাই পাগল? পাগলামি মাপার মানদন্ডটাই বা কী? প্রশ্ন-উত্তর-পরীক্ষার তুলায় মাপা হচ্ছে মেধা! বিজ্ঞানও আটকে সূত্র-ফর্মূলা-প্যাটার্নের গণ্ডিতে...বিজ্ঞান-মেধার তথাকথিত ধ্যান-ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করতে উদ্যত এক বিজ্ঞানী। বৈজ্ঞানিকদের এক গুপ্ত সংগঠন...ডেথট্র্যাপ...আর এক গভীর ষড়যন্ত্র...'
বহুদিন পর এক সিটিংয়ে ২০৮ পাতার ফিকশন পড়ে শেষ করলাম। তন্ত্রমন্ত্র, হাড় হিম করা ভয় ছাড়াও শুধুমাত্র কল্পনা এবং কল্পবিজ্ঞানের ডানা মেলে টানটান এক অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি, বেশ ভাল লাগল। কাহিনির অন্যতম গুণ হয়তো গতি, রহস্য এবং কৌতুকের সঙ্গে সঙ্গে তথ্যের এবং চরিত্রের পারফেক্ট ব্লেন্ডিং। চরিত্রগুলির নাম সেইরকম মারকাটারি হলেও তৌর্যত্রিক কুশারি, ডক্টর সরিৎপতি সর্বজ্ঞ, প্রোফেসর প্রাণকৃষ্ণ প্রামাণিক এই কঠিন সময়েও বেশ রিলিফ দিলেন।
নামকরণ অনুয���য়ী 'বোধিবীক্ষণ'-এর এই অভিযানের ক্ষেত্রে ভূমিকাটুকুই বড় অল্প মনে হল ব্যক্তিগতভাবে, নয়তো এই কঠিন সময়ে কাহিনি হিসাবে 'বোধিবীক্ষণ'কে 'সাড়ে চার'তারা দেওয়াই যায়। প্রকাশনীর প্রুফরিডিং উন্নত হয়েছে অনেক। বহুদিন পর বিভার কোন বই পড়ে একটি শব্দ ছাড়া আর কোন ভুল চোখে পড়েনি। বইয়ের ভিতরের অলংকরণগুলিও বেশ সুন্দর।