এই বই শুরু হয়েছে যে 'শুরু' দিয়ে, তাতে লেখক বলেছেন, "এই বইয়ের নাম অনায়াসে রাখা যেত 'ঘনশ্যাম দাশের জীবনী ও কৃতিত্ব।'... সুধীরের লেখা অনুযায়ী ঘনাদাকে যা বলতে শোনা গিয়েছে, তার প্রতিটি বক্তব্য অক্ষরে-অক্ষরে বিশ্বাস করে ঘনাদার জীবন ও কর্মকাণ্ডের সন্ধান করা হয়েছে এই বইতে।" অর্থাৎ বলা চলে, এই বই আসলে ঘনাদার লাইফ অ্যান্ড টাইমস্। কিন্তু আমরা যারা ঘনাদাকে এক কাল্পনিক, মূলত গুলগল্পের কথক হিসেবে জানি, তাদের চমকে দিয়েছেন লেখক এই অংশেই। তিনি ঘনাদাকে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে ধরেছেন। তাই বারিং-গুল্ড এবং লেসলি ক্লিংগার শার্লক হোমস, এমনকি ড্রাকুলাকে নিয়ে যে 'গেম'-টিতে আমাদের টেনে নিয়েছেন নিজস্ব গবেষণার মাধ্যমে, এই বই সেই ধারাতেই লেখা হয়েছে। এটি দেখিয়েছে, কীভাবে ঘনাদা'র নানা অ্যাডভেঞ্চারের মধ্য দিয়ে এই পৃথিবীর নানা স্থান, মানুষ, সংস্কৃতি এবং কালের সঙ্গে আমরা পরিচিত হয়েছি। যেহেতু লেখকের মতে ঘনাদা রক্তমাংসের চরিত্র, তাই গল্প বা উপন্যাস ধরে-ধরে এখানে আলোচনা হয়নি। বরং ঘনাদা'র নানা বৈশিষ্ট্য তথা তাঁর মুখোমুখি হওয়া চরিত্রদের তুলে ধরা হয়েছে এখানে। যে-সব অধ্যায়ের মাধ্যমে বইটি সাজানো হয়েছে, তারা হল~ ১) তিনি ২) গুণ ৩) বিদ্যা ৪) ভাষা ৫) জাতি ৬) নীতি ৭) দেশ ৮) কাজ ৯) বন্ধু ১০) শত্রু ১১) জিরো ১২) গ্রহ ১৩) ভেক ১৪) মার ১৫) বাড়ি ১৬) মেস ১৭) গুল ১৮) তস্য ১৯) কাব্য ২০) খানা ২১) ওরা ২২) শেষ এই বইয়ের সেরা আকর্ষণ কী? প্রথমত, ঘনাদা সমগ্র-তে কোনো অলংকরণই ছিল না। সেই তুলনায় এই বই অজস্র লুপ্তপ্রায় অলংকরণকে ফিরিয়ে এনেছে। সেই চিত্রসূত্র-র মাধ্যমে লেখাগুলোর প্রথম প্রকাশ বিষয়ে তথ্যও দেওয়া হয়েছে অত্যন্ত সংক্ষেপে। দ্বিতীয়ত, ফেলুদাকে নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে, যাতে তার বন্ধু, শত্রু, দেখা-শোনা, উল্লিখিত তথ্য— এইসব জিনিস উল্লিখিত হয়েছে। পরে প্রফেসর শঙ্কু এবং জটায়ুও কিছুটা হলেও তাঁদের প্রাপ্য মনোযোগ ও চর্চা আদায় করেছেন। কিন্তু বাঙালির প্রথম আন্তর্জাতিক সুপারহিরো ঘনশ্যাম দাশকে নিয়ে এর আগে কোনো নিবিড় আলোচনা হয়নি। সৌরভ দত্ত তাঁর 'ঘনাদা গ্যালারি'-র মাধ্যমে এই কাহিনিগুলোর ডকুমেন্টেশন নিয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। প্রেমেন্দ্র শতবার্ষিকীতে কোনো-কোনো প্রবন্ধে, বা বাঙালির 'দাদা'গিরি নিয়ে কোনো বই হলে তার একটি অধ্যায়ে ঘনাদা এসেছেন। কিন্তু একটা গোটা বইয়ে ঘনাদার কার্যকলাপ তুলে ধরা? নাহ্! সে-জিনিস এই প্রথম এল বাংলায়। তৃতীয়ত, সিগারেটের হিসেব রেখে, খাদ্য ও আড্ডার সমন্বয়ে বাঙালির টল-টেলস্ বা গুল্প-প্রীতির পরাকাষ্ঠা হিসেবেই ঘনাদাকে দেখে এসেছি আমরা। কিন্তু পথের দেবতা'র আহ্বানে সাড়া দিয়ে এক বঙ্গসন্তান কীভাবে "জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য, চিত্ত ভাবনাহীন" হয়ে এগিয়ে গিয়েছিল, তার একটা সার্বিক ছবি ধরা পড়েছে এই বইয়ে। এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো অপ্রাপ্তি কী? ১) ঘনাদা-কে বাস্তব চরিত্র হিসেবে ধরে নেওয়ার ফলে এই বইয়ে একটা বিশাল সমস্যা হয়েছে। সেটা হল, প্রেমেন্দ্র মিত্র এই কাহিনিগুলোতে কীভাবে কল্পনা, অ্যাডভেঞ্চার আর রসবোধের সঙ্গে বিজ্ঞানভাবনার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, সেটা এখানে আলোচনার অবকাশই আসেনি। আসবে কী করে? এই বইয়ে তো প্রেমেন্দ্র মিত্র নেই! ২) এমন বিষয়-ভিত্তিক বিভাজনের ফলে ব্যাপারটা বড়োই নীরস হয়ে গেছে। এতে ঘনাদার নানা বিষয়ে জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া গেছে। ঘনাদাকে নিয়ে জিকে বাড়াতে চাইলে এই বই বেশ ভালো কাজ দেবে। কিন্তু প্রায় চার দশক ধরে তাঁর কীর্তিকাহিনি নথিভুক্ত হওয়ার মাঝে ঘনাদার আচরণ ও মানসিকতার কীরকম পরিবর্তন ঘটেছিল— সেটা এতে ধরা পড়েনি। ৩) ঘনাদা যে একজন স্বাধীনচেতা এবং ভীষণরকম মানবদরদী ব্যক্তি, তা লেখক নানা ঘটনা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন। কিন্তু ডসিয়ারের বদলে তাঁর একটি ক্রনোলজি নির্মাণ করে সেই ছকে গল্পগুলো ফেললে ব্যাপারটা বেশি উপভোগ্য হত। ৪) ঘনাদা'র গল্পে ক্রিপ্টোজুলজি থেকে পুরাণ, হাইপারস্পেস থেকে মোলাস্কের বুদ্ধিমত্তা— এমন নানা প্রসঙ্গ এসেছে। সেগুলো সমকালীন বিজ্ঞানচর্চা, দর্শন এবং বিশ্লেষণী ভাবনার যে অদ্ভুত সমন্বয় ঘটিয়েছে, তার সাহিত্যিক সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হয়নি এই বইয়ে। উদাহরণ হিসেবে বলি, এতে একান্তই সোজা বাংলায় লিখে দেওয়া হয়েছে, "যতদূর জানা যায়, ঘনাদা দু'বার মঙ্গলগ্রহে গিয়েছিলেন।" কিশোর পাঠকদের মনোজগতে এইরকম লেখার প্রভাব কতটা ছিল বা আদৌ ছিল কি না— তা এই বইয়ে আলোচিত হয়নি ওই একই কারণে। ব্যক্তিগতভাবে আমার মতামত, ঘনাদা-চর্চায় এই বই প্রাইমার। হের ডস্-এর ডসিয়ার— এভাবে সাজানো এই বইকে স্ট্র্যাটেজিক বা ট্যাক্টিকাল পাঠের জন্যই অনুসরণ করতে হবে। তবে প্রেমেন্দ্র মিত্র'র ঘনাদা-ভুবন-কে জানতে ও বুঝতে গেলে একেবারে অন্যরকম আলোচনা প্রয়োজন। ভরসা রাখি, মহাজন হিসেবে লেখক যে পথ দেখালেন, আগামী দিনে অন্য গবেষকেরা সেই পথে আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন আরও অনেক দূরে। বইটির ছাপা, বাঁধাই, অঙ্গসজ্জা ও অলংকরণের কোনো জবাব নেই। সঙ্গে বুকমার্ক এবং অন্য যে দু'টি কার্ড দেওয়া হয়েছে তারা এটিকে আরও বেশি করে সংগ্রহযোগ্য করে তুলেছে। সব মিলিয়ে বলি, ঘনাদা-কে ভোট দিন বা নাই দিন, এই বইটি কিন্তু আপনাকে কিনতে ও পড়তেই হচ্ছে!