প্রাচীন মিশরে তাদের বলা হত সূর্যপুত্র। দীর্ঘ পাঁচ হাজার বছর ধরে প্রাচীন মিশরকে শাসন করেছিল তারা। তাদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অগণিত মিথ। আর সেই মিথ-সমন্বিত ইতিহাস ভবিষ্যতের সামনে তুলে ধরেছে তাদের সূর্যের মতন তেজ আর পরাক্রম, যার কাছে গেলেও সাধারণ মানুষ যেন ঝলসে যেত। মাঝে এমন একটা সময় এল যখন সেই সূর্যের শরীরেও গ্রহন লাগল। প্রায় একশোটা বছর প্রাচীন মিশর সেই গ্রহণে হয়ে রইল অন্ধকারাচ্ছন্ন। তবে ইতিহাস সেই অন্ধকার সময়ের কোনও দলিল রাখেনি। আসলেও কি তা অন্ধকার ছিল? নাকি সোনার মতন উজ্জ্বল রঙের ছটায় ইতিহাসের চোখ ঝলসে গিয়েছিল! প্রাচীন মিশরের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া সেই একশো বছরকে পুনরুদ্ধার করতেই আমাদের এই অভিযান “সূর্যের রং কালো”।
মিশরের ইতিহাস নিয়ে আমরা কতটুকু জানি? সাম্প্রতিককালে অনির্বাণ ঘোষ এবং বিশ্বজিৎ সাহা— এই দুই তরুণ লেখক আমাদের কাছে বালি আর রহস্যে ঢাকা ওই সভ্যতার গল্পগুলো একে-একে তুলে ধরছেন। তাঁদের সেই প্রয়াস সাহারা-র বুকে কয়েক বিন্দু জলের মতোই হারিয়ে যায় আমাদের অজ্ঞতার সামনে। তবু, হাল না ছেড়ে দেওয়াই বোধহয় এঁদের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য। তাই চমৎকার ছাপায়, শুদ্ধ বানানে, আলোকচিত্র ও তথ্যসূত্রে সমৃদ্ধ হয়ে আমাদের কাছে এল বিশ্বজিতের নতুন বই। এর বিষয় কী? মিশরের ইতিহাস সাজাতে গিয়ে ঐতিহাসিক ও গবেষকেরা দেখেছিলেন, একশোটা বছরের হিসেব পাওয়া যাচ্ছে না৷ সেই সময়ে কী হয়েছিল? কারা শাসন করেছিল তখন নীলনদের দান ওই সভ্যতাকে? সেই প্রশ্নেরই যৌক্তিক উত্তর খোঁজার চেষ্টা নিয়ে লেখা হয়েছে এই বইটি। নাতিদীর্ঘ ভূমিকা-র পর ছোট্ট-ছোট্ট পঁয়ত্রিশটি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে বইটিকে। তাতে একদিকে যেমন এসেছে ইতিহাসে উল্লিখিত নানা ঘটনার বিবরণ, তেমনই এসেছে যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে তথ্যের বিশ্লেষণ। তার মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেছে সেই একশো বছরের ইতিহাস। পাশাপাশি এও দেখানো হয়েছে যে কীভাবে ভ্রান্ত ধারণা ও দ্বেষের বালির নীচে তলিয়ে গেছে সেই গাথা। অনুচ্চ স্বরে হলেও লেখক সাবধান করে দিতে চেয়েছেন আধুনিক পাঠকদের— যাতে ভ্রান্তি ও বিস্মৃতির স্থূল হস্তাবলেপ আমাদের ইতিহাসকেও মুছে না দেয়। নন-ফিকশন লেখালেখিও যে গবেষণা, লেখনী এবং সংবেদনশীলতার সমন্বয়ে কতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে— তার উৎকৃষ্ট নিদর্শন হল এই বইটি। তাই যদি ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী হন, তাহলে এই বইটিকে উপেক্ষা করবেন না। অলমিতি।
মিশর বা আধুনিক ইজিপ্টের কথা শুনলেই প্রথম যা আমাদের মনে আসে তা হলো পিরামিড, মমি, ফিনিক্স আর মিশরের রাজা রানী যাদের ফারাও বলা হত। ছোটবেলা থেকেই মিশরের প্রতি আমার একটা আলাদাই কৌতূহল আছে যার ফলে মিশরের ওপর যখনই কোন ডকুমেন্টারি, বই অথবা মুভি পেয়েছি সে গুলি বলতে গেলে গোগ্রাসে গিলেছি। যতই জেনেছি মিশর সম্বন্ধে তার ইতিহাস সম্বন্ধে, কৌতুহল আরো বেড়ে গেছে কিন্তু মিশরের বাইরেও যে আলাদা একটা মিশর আছে তারও একটা আলাদা ইতিহাস আছে সেটা এই বইটা পড়ার আগে পর্যন্ত জানা ছিল না। জানা ছিল না পুরো একটা শতাব্দীর ইতিহাসকে কিভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল মিশরের ইতিহাস থেকে। একটা গোটা রাজবংশের ইতিহাসকে কিভাবে ষড়যন্ত্র করে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল, মিশরের ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান সুদান ও ইথিওপিয়ার যে গভীর সংযোগ রয়েছে তা এই বইটা পড়ে জানতে পারলাম সেই সঙ্গে মিশরের ইতিহাস কে নতুন করে জানার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। বইটিতে যে সব জায়গার কথা বলা হয়েছে তার সঙ্গে যদি সেখানকার কিছু ছবি দেয়া যেত তাহলে পড়ার মজাটা আরো বেড়ে যেত, কিছু অংশে একই কথার পুনরাবৃত্তি হয়েছে যাতে পড়তে গিয়ে অনেক সময় থমকে যেতে হয়েছে। তবে “হায়রোগ্লিফের দেশে” র পরে আরেকটা বই পেলাম যাতে সহজ-সরলভাবে খুব সুন্দর করে মিশরের ইতিহাস (হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস) কে বর্ণনা করা হয়েছে। “মিশরের রহস্যময়ী রানীরা” র পরে আরেকটা সুন্দর বই উপহার দেয়ার জন্য লেখককে ধন্যবাদ।
মিশর বলতে আমরা সাধারণত বুঝি পিরামিড, মমি, ফ্যারাও নিয়ে পাঁচ হাজার বছরের পুরনো এক ইতিহাস। কিন্তু এসবের বাইরেও অনেক কিছু আছে যা আমাদের অজানা। সেই অজানার সন্ধানই দিয়েছেন লেখক বিশ্বজিৎ সাহা।
মিশরের রাজধানী কায়রোতে রয়েছে ইজিপ্সিয়ান মিউজিয়াম। যেখানে রাখা রয়েছে এযাবৎ খুঁজে পাওয়া হায়রোগ্লিফিক ভাষায় লেখা প্যাপিরাস, বিভিন্ন ধাতুর তৈরি মুদ্রা, সারকোফেগাস, মমি, ওবেলিক্স, টুম্ব ইত্যাদি। কিন্তু মিউজিয়ামের তালিকা সংগ্রহ, নথি দেখে বোঝা যায় কিছু একটা মিসিং আছে। আর সেই মিসিং বিষয়টি হলো মিশরের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া একশো বছর। হ্যাঁ, মিশরের পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় একশো বছর। সেই একশো বছরে মিশরে কী ঘটেছিল তার কোনো হদিশ পাওয়া যায় না কায়রো মিউজিয়ামে। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন মিশরের ইতিহাস থেকে এই একশো বছরের ইতিহাস হারিয়ে গেল? কারা রাজত্ব করতো সেই সময়ে? কারা ছিল সেই সময়ের ফ্যারাও? কী অবদান ছিল তাদের মিশরীয় সভ্যতায়? প্রাচীন মিশরে ফ্যারাওদের বলা হতো সূর্যপুত্র। কিন্তু মাঝের এই একশো বছরে সূর্যের শরীরে গ্রহণ লেগে প্রাচীন মিশর হয়ে রইল অন্ধকারাচ্ছন্ন। আসলেই কি তা অন্ধকার ছিল? নাকি সোনার মতন উজ্জ্বল রঙের ছটায় ইতিহাসের চোখ ঝলসে গিয়েছিল?
মিশরের নীলনদ থেকে সাড়ে চারশো মাইল এগিয়ে বর্তমান সেদানের অন্তর্গত সাঙ্গরা গ্রামের সেলেবে এক প্রাচীন স্থাপত্যের মন্দির দেখা যায়। মিশরের সঙ্গে এই মন্দিরের কি কোনো সম্পর্ক আছে? কে বানিয়েছিল এই মন্দির? তিনি কি কোনো ফ্যারাও ছিলেন? যেখানে মিশরের মন্দিরগুলিতে পর্যটকদের ভীড় উপচে পড়ে, সেখানে এই মন্দির চিরকাল জনমানবহীন নির্জন দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু কেন, কী ইতিহাস লুকিয়ে আছে এর পেছনে?
ছোটোবেলায় দেখা হলিউডের সেই 'মমি' সিনেমা থেকে মিশরের প্রতি আকর্ষণ ও কৌতূহল জন্মায়। তারপর বড়ো হওয়ার সাথে সাথে কিছু ডকুমেন্টারি ভিডিও দেখে কৌতূহলের খোরাক মিটিয়েছি। বছর তিনেক আগে অনির্বাণ ঘোষের লেখা 'হায়রোগ্লিফের দেশে' পড়েও সেই কৌতূহলের খোরাক অনেকটাই মেটে। কিন্তু তবুও এই হারিয়ে যাওয়া একশো বছরের ইতিহাস সম্পর্কে অজানাই ছিলাম। আসলে ক্লিওপেট্রা, তুতানখামেন, নেফারতিতি, আমেনহোতেপ, হাতশেপসুত, রামেসিস এদের বাইরেও যে এক মিশর আছে তা কখনও মাথাতেই আসেনি।
ইতিহাসকে কখনও পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। কালের নিয়মে তা একদিন সকলের সামনে আসবেই। হাজারো কূটনীতি, ষড়যন্ত্রের দ্বারা যেভাবে মিশরের ইতিহাস থেকে একদিন বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল তার একশো বছর, সেই একশো বছরের ইতিহাসকেই আর্কিওলজিস্টরা তাদের আপ্রাণ প্রচেষ্টার দ্বারা প্রকাশ্যে আনেন। আর সেই তথ্যকেই সহজ সরল ভাষায় লেখক আমাদের পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করেছেন।
মোট ৩৫ টি অধ্যায়ের সাথে স্বল্প পরিসরে লেখক সমস্ত বিষয় তুলে ধরেছেন। আর এরজন্য তাঁকে একাধিকবার চলে যেতে হয়েছে টাইম মেশিনে করে প্রাচীন সময়তে, আবার ফিরে আসতে হয়েছে বাস্তবের দুনিয়ায় তার সাক্ষ্যপ্রমাণ খুঁজতে। ইতিহাস প্রিয় মানুষ আমি, তাই খুবই ভালো লাগলো বইটি। এমন এক ইতিহাস জানলাম, যা এই বই পড়ার আগে অবধি সম্পূর্ণ অজানাই ছিল। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই এরকম একটি বিষয় তুলে ধরার জন্য।
যারা মিশর সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, অবশ্যই একবার পড়ে দেখুন এই বই। আশা করি ভালো লাগবে। পাঠে থাকুন।
মুখে অস্বীকার করলেও আজও আমরা অর্থাৎ বাদামি চামড়ার মানুষরাও 'ফর্সা' বলে শব্দটাকে প্রাধান্য দিই। বর্ণবিদ্বেষ পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে রয়েছে। তা আমাদের ম��নসিকতার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। জ্ঞানত অথবা অজ্ঞানত পৃথিবীর প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ মানুষ বর্ণবিদ্বেষ বুকে নিয়েই বাঁচে। সৃষ্টির আদি থেকেই তার অস্তিত্ব বড়ো বেশি করে প্রকট। অথচ খুব সুচারু ভাবে নানান ষড়যন্ত্র করে তাকে ঢেকে রাখার প্রয়াস দেখা গেছে সেই আদিম কাল থেকেই। 'রেসিজম', অর্থাৎ শরীরের রং বিচার করে মানুষের মধ্যেকার সেই চিরন্তন বৈষম্যই আমাদের 'ব্ল্যাক ফারাও'- দের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবার প্রধানতম কারণ। কোনো দিন তারা তাদের যোগ্য সম্মান ফিরে পাবে- এই আশা রাখাও হয়তো বৃথা। কারণটা আমার আপনার সকলেরই প্রায় জানা... ~ সূর্যের রং কালো
মিশরের এক অজানা ইতিহাস। যা কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছিলো, লোকমুখেও শোনা যায় না... কিন্তু সময় কোনো কিছুকেই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে দেয় না। মিশরের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস নিয়ে রচিত এই ননফিকশনটি অসাধারণ ! <3