ছোট থাকতে, বিভিন্ন ভৌতিক সংকলনের সূচিপত্তর ঘেঁটে হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের নামটি খুঁজে পেয়ে রোমাঞ্চিত হতাম বেশ। মানুষটা আমার শিশুমনের কাছে একটা আস্ত 'হরর ব্র্যান্ড' ছিলেন যেন। সেই সমস্ত বারোয়ারী, নামী বেনামী হলদে হয়ে যাওয়া বইয়ের পাতায় বা হালফিলের অডিও স্টোরির কল্যাণে ওনার পরিচিতি কিছুটা হলেও সুদুরপ্রসারীত। 'র্যাবিড' কোনো ফ্যানবেস না হলেও, 'বিনোদ ডাক্তার', 'অমর-ধাম', 'ফাঁসির আসামী' বা 'রাত গভীর', নামক গল্পগুলোর সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত।
তবে, এই বইটিতে লেখকের সমস্ত ভৌতিক, অলৌকিক ও পারলৌকিক লেখনী একত্রে পড়তে গিয়ে একটা কথাই অনুধাবন করলাম কেবল। 'নস্টালজিয়া সেলস্'। বাস, ওটুকুই! 'পুরোনো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায়...' ব্র্যান্ডের গোলাপি চশমাটি খুলে দেখলে এই বই আপনাকে হতাশই করবে হয়তো। কারণ, আর যাই হোক, পঁয়ত্রিশখানি ভূতের গল্প লেখার ম্যাটেরিয়াল হরি চাটুজ্জের মধ্যে ছিল না। এই বই যতই তা গলা ফাঁটিয়ে দাবি করুক না কেন।
ওনার গল্পের ফাঁকফোকরে তাই পুনরাবৃত্তির সুনামি। সাথে গতে-বাধা প্লটের একঘেয়ে পরিণতি ও শিশুতোষ টুইস্ট। পড়তে অবশ্য মন্দ লাগে না। কারণ প্রায় সব গল্পই সাইজে ছোট। বেশিরভাগই স্বদন্তহীন। ছোট ছোট বাক্য। সহজ সরল লেখনী। গতিময় সবটাই। এক কি দুইদিনে গোটা পয়ত্রিশেক লেখা সাঁটিয়ে দেওয়াই যায়। এবং এখানেই সংকলনটি ভ্যালু ফর মানি। এছাড়াও, পরিবেশনায় বুক ফার্ম দুর্দান্ত। যেমন ছাপার কাজ। তেমনই পৃষ্ঠা কোয়ালিটি। সব মিলিয়ে, সহজলভ্য দৃষ্টিনন্দন হার্ডকভার!
কিন্তু, প্রতারণা ঘটে অন্য খাতে। যার নেপথ্যে, বইটি তথা সিরিজের প্রাথমিক নামকরণ। 'ভয়' সমগ্র নাম দিয়ে কারচুপি করার সূক্ষ্ম লাইসেন্স। প্রকাশক ব্যাক কভারে দাবি জানিয়েছেন যে এই বই '৩৫টি ভয়ের গল্পের বৃহত্তম সংকলন'। 'ভয়'। স্রেফ ভৌতিক নয়! 'যেখানে তাঁর ভৌতিক গল্পের পাশাপাশি স্থান পাবে সবকটি অলৌকিক, অতীন্দ্রিয়, অতিপ্রাকৃত তথা পারলৌকিক ব্যাখ্যাতীত গল্প।' - এমন এক কৈফিয়ত যার দ্বারা বইটির কলেবর বৃদ্ধির ছাড়পত্র নিয়ে দৌড়ে বেড়ান প্রকাশকের দল।
ফলস্বরুপ বইতে স্থান পেয়ে যায় 'গোয়েন্দা ও প্রেতাত্মা' নামক এক 'ভয়'-এর গল্প। যা আখেরে, লেখকের গোয়েন্দা পারিজাত বক্সী (ব্যোমকেশের ভাইপো)-র এক বিশ্রী রহস্য কাহিনী। এছাড়াও আছে 'অমানুষিক'। যার নায়িকা হৈমন্তী ঘোষাল, লেখক সৃষ্ট এক বিস্মৃত নারী গোয়েন্দা! হৈমন্তীকে হঠাৎ আবিষ্কার করে সামান্য খুশি হয়েছিলাম বটে। তবে বাধ সাধে, গল্পটির অখাদ্য পরিণতি। আর লেডি ডিটেক্টিভ হয়েও, ক্যারেকটারাইজেশনে ভিন্নতার অভাব। ওদিকে, 'সামন্ত বাড়ি' নামক আরেকটি গল্পে হাস্যরস ও স্ল্যাপস্টিক গোছের কমেডির অবতারণা ঘটিয়ে দিব্যি আসর জমান লেখক। যা পড়তে ভালো লাগলেও, ভয় সমগ্রে একেবারেই বেমানান।
তাহলে? '...গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে? কিছুই কি নেই বাকি?'
আছে। ভালো লাগার খোরাক এই বইতে আছে। তবে সেটুকুর জন্য আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে। আর মনের মধ্যে একটা ছাঁকনি বসিয়ে নেবেন পারলে। আবার দয়ার সাগরে ভেসে একটু ক্ষমাঘেন্না করে ফেললেও, দেখবেন বইটা পড়ে খুব একটা বিরক্ত হচ্ছেন না আর। লেখক, আর যাই করুন, আবহ সৃষ্টি করতে জানতেন। ওনার কলমের সাবলীল চালে, কোনো বৃষ্টির দিনে লেপমুড়ি দিয়ে বসলে, 'রাত্রি নিশীথ'-এর মতো একটা গল্প পড়ে আপনার গা ছমছম করে উঠলে খুব একটা আশ্চর্য হবো না আমি।
এছাড়াও উল্লেখ্য, 'টান', 'আরণ্যক', 'অবাস্তব', 'বনকুঠির রহস্য', 'পাঁচ মুন্ডির আসর', 'প্রতিহিংসা', ইত্যাদি, নামক কিছু পরিচিত, স্বল্প-পরিচিত গল্প। যা দিনশেষে প্রেডিকটেবল হলেও, ক্ল্যাসিকালি সুপাঠ্য।
তবে যেই লেখাটিকে নিয়ে আলাদা করে কিছু না বললেই নয়, তার নাম 'লাল নিশানা'। আজ থেকে অনেক বছর আগে, এই কাহিনীটি দিয়েই আমার ছেলেবেলায় হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ে হাতেখড়ি। এই অ্যাদ্দিন বাদে ঝালিয়ে নিয়ে ভালোই লাগলো বেশ। নতুন করে কষ্টও পেলাম আবার। মেলোড্রামার দোষটুকু না ধরলে, লেখকের এই নারী-কেন্দ্রিক 'সোশ্যাল ট্যাবু'-র প্রতি সোচ্চার কমেন্টারি বরাবরই আশ্চর্য করে। গল্পের যত্নশীল গদ্যেও যেন অতীতের বালখিল্যতার অভাব। এ যেন এক অন্য হরিনারায়ণ!
এমন এক লেখক যাকে বইয়ের বাকি লেখাগুলোতে চাইলেও খুঁজে পাওয়া যায় না। এক বুঝি ওই শেষ গল্প, 'রূপে সে কুরূপা' বাদে। যেখানে, অলৌকিকের মাধম্যে, কালারিজম বা নারী-রূপের সামাজিক স্ক্রুটিনির প্রতি স্বক্লেষে ধিক্কার জানান লেখক। দুটি লেখাই বিষন্ন প্রকৃতির। তবুও লেখাগুলোতে মানব মন ও ভয়ের যেই চমৎকার কোরিলেশন এঁকেছেন লেখক, সেই ক্ষমতার বইজুড়ে এত স্বল্প প্রদর্শন হতাশাজনক। বরং সিংহভাগ গপ্পের শেষলগ্নে এক দঙ্গল কঙ্কাল নাচিয়ে কি যে আনন্দ পেতেন উনি নিজেই জানেন।
লেখকের এই কঙ্কাল ফ্যাসীনেশন নিয়ে একটা চমৎকার 'সুরাপান ক্রিয়া' ওরফে ড্রিংকিং গেম তৈরি করা যায়। Take a shot every time Harinarayan Chattopadhyay mentions a skeleton in his ghost stories! আমি হিসেব রেখে দেখেছি। সব মিলিয়ে দশটি গল্পে কঙ্কালদের ক্যামিও পাবেন। সাথে ভাটার মত রক্তিম চোখ, হাড় ও গোড়ের মিউজিকাল খটখটানি এবং এক সমুন্দর ন্যাতানো ভয়।
বাকিটা এবার আপনাদের ওপর। আমি আসি।
(২.৭৫/৫ || সেপ্টেম্বর, ২০২৪)