কৃষ্ণকথা বলতে ঠিক কী বোঝায়? বিষ্ণু কীভাবে বৈদিক সৌরদেবতা থেকে পৌরাণিক মহাশক্তিধর ত্রিদেবের অন্যতম হয়ে উঠলেন— তা নিয়ে চর্চার ধারাটি সুপ্রতিষ্ঠিত। জনমানসে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করা কৃষ্ণকে কীভাবে বিষ্ণুর মধ্যে আত্তীকরণ করার চেষ্টায় অবতারের ধারণাটি এল, এক পর্যায়ে কীভাবে বিষ্ণুই কৃষ্ণের এক প্রকাশ হয়ে উঠলেন— এমন নানা বিষয় নিয়েও ইতিহাসে ও পুরাকথার ক্ষেত্রে বহু গবেষণা হয়েছে। তবে এদের থেকে স্বতন্ত্র, বিষ্ণু এবং অন্যান্য বৈদিক প্রসঙ্গকে দূরে সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র মহাভারত, হরিবংশ এবং লোকমুখে কৃষ্ণকে নিয়ে প্রচলিত কাহিনিরাই যদি আমাদের বিচার্য হয়? হ্যাঁ, তেমন সাহিত্যকেই আমরা কৃষ্ণকথা বলতে পারি। বৈষ্ণব পদাবলি তথা মধ্যযুগীয় সাহিত্য নিয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতার জগতে সত্যবতী গিরি'র অবস্থান প্রশ্নাতীতভাবে স্বীকৃত। তবে প্রথাগত গবেষণার বাইরে গিয়ে যখন বৃহত্তর, সাধারণ পাঠকদের কাছে পৌঁছোতে হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে লেখার সুখপাঠ্যতা নিয়ে। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই বইয়ের ভূমিকা-র প্রথম লাইনেই তাই লিখেছেন, "পিষ্টকের আস্বাদ যেমন রসায়ন, গ্রন্থের আস্বাদ তেমনি পাঠে।" আজ থেকে তিন দশকেরও বেশি আগে প্রথমবার প্রকাশিত হওয়া এই বই কি আজও পাঠযোগ্যতার কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ হয়? আগে লিখে এই বইয়ে কী-কী আছে। মূল্যবান একটি 'ভূমিকা' ও 'পূর্বভাষ'-এর পর এতে এই অধ্যায়গুলো স্থান পেয়েছে~ প্রথম অধ্যায়: কৃষ্ণকথার প্রাচীন প্রসঙ্গ— বৈদিক ও বেদোত্তর কালে এই সাহিত্যের উদ্ভব নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা হয়েছে এই অংশে। দ্বিতীয় অধ্যায়: বাংলা কৃষ্ণকথার প্রাক্ রূপ— লিপিলেখন, প্রাকৃত ও সংস্কৃত শ্লোক হয়ে গীতগোবিন্দম্ অবধি সময়কাল দেখানো হয়েছে এই পর্যায়ে। তৃতীয় অধ্যায়: বাংলা কৃষ্ণকথার আদিপর্ব— এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তু হল শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, শ্রীকৃষ্ণবিজয়, বিদ্যপতি ও চণ্ডীদাসের রচনা। চতুর্থ অধ্যায়: কৃষ্ণকথায় মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য ও গোস্বামীগণ— বাংলা কৃষ্ণকথার জগতে আসা বৃহত্তম পরিবর্তনটির ধরন ও ধারা চর্চিত হয়েছে এই পর্যায়ে। পঞ্চম অধ্যায়: ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলিতে কৃষ্ণকথা— চৈতন্য-সহচর ও চৈতন্য-পরবর্তী কবিবৃন্দের রচনা এবং ভাগবত-অনুসারী কৃষ্ণলীলার বিশেষত্ব নিয়ে আলোচনা আছে এই অধ্যায়ে। ষষ্ঠ অধ্যায়: সপ্তদশ শতাব্দীর পদাবলির কৃষ্ণকথা— গোবিন্দদাস প্রমুখের রচনা এবং কৃষ্ণমঙ্গল কাব্যসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই অংশে। সপ্তম অধ্যায়: অষ্টাদশ শতাব্দীর পদাবলিতে কৃষ্ণকথা ইতিহাসের কালানুক্রমে যাকে যে সময়টিকে আমরা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যুগ বলে চিহ্নিত করি, তার ঠিক আগে এসে থেমে গেছে এই বইয়ের মূল, বিদ্যালয়ের পাঠক্রম-অনুসারী টেক্সট। তবে তারপর এসেছে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দু'টি অংশ। সেগুলো হল~ পরিশিষ্ট-ক: তন্ত্র-প্রভাবিত কৃষ্ণকথা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ পরিশিষ্ট-খ: কৃষ্ণকথার আধুনিক যুগ শেষে এসেছে নির্দেশিকা। সামগ্রিক বিচারে এই বইটিকে আমি বাংলা সারস্বত সাধনার ধারায় একটি অমূল্য সম্পদ হিসেবেই চিহ্নিত করব। সাহিত্যের নিরিখে কৃষ্ণকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কবি, কথক ও গীতিকার কোন চোখে দেখেছেন ও দেখিয়েছেন— তার এক অনন্য পরিচয় ফুটে উঠেছে এই বইয়ে। ছাত্র ও গবেষকেরা তো বটেই, আমার মতো পল্লবগ্রাহী পাঠকও এই বই থেকে পদাবলি সাহিত্যের নানা শাখার বিপুল বিস্তারের এক সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যনিষ্ঠ পরিচয় পাবেন। 'রাধা'-নামক ভাবনাটির উদ্ভব ও প্রতিষ্টার একটি চিত্র ফুটে উঠবে তারই মধ্যে। সেই সঙ্গে, বিশেষ করে 'পরিশিষ্ট-ক' অংশের আলোচনা থেকে পাওয়া যাবে প্রচুর ভাবনার খোরাক। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বা কৃষ্ণের বিবর্তনে আগ্রহী হলে, পদাবলির রসাস্বাদনে উৎসাহী হলে এই বইটি আপনার কাছে অবশ্যপাঠ্য বলেই আমি মনে করি। অলমিতি।