আলিমদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে ফতোয়া দিতে হয়। তবে এই ফতোয়া দেওয়া কী চাট্টিখানি কথা! কুরআন হাদিসের জ্ঞান তো লাগবেই, সাথে লাগবে এগুলো ব্যাখ্যার নীতি, আরবি ব্যাকরণ জ্ঞান, শব্দের অর্থের সূক্ষ পার্থক্য বুঝতে পারা এবং অবশ্যই মানুষের মনস্তত্ত্বের বুঝ৷ আসলে বাইরে থেকে আমরা যেমনটা ভাবি, জিনিসটা একদমই সেরকম না। এই রহস্য উন্মোচনের জন্য পড়তে হবে ইলহাম প্রকাশিত বই 'সহজ ভাষায় উসুলুল ফিকহ' (আলিমদের মতভেদ রহস্য)
ফিকহ শব্দটি শুনলেই কেন যেন ঝগড়া ব্যাপারটা মনে আসে। আসলে সমস্যাটা শুধু আমার না, বরং শতশত বছর যাবত এই ফিকহ বিষয়টি নিয়ে উম্মাহতে প্রচুর ঝগড়া লেগেই আছে। এক মতের লক আরেক মতের লোকের পেছনে পড়েছে তাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য।
এমনকি ইতিহাসে এমন সময়ও গিয়েছে যখন এক ফিকহের নারী অপর আরেক ফিকহের পুরুষকে বিবাহ করতে পারবে না এ মর্মেও বড় বড় ফতোয়া এসেছিল! বাগদাদে একসময় হানাফী-শাফেয়ীর মধ্যে তুমুল মারামারি লেগেছিল মর্মেও ঘটনা পড়েছিলাম।
এগুলো যে শুধু ফিকহের আলোচিত বিষয়বস্তুর ঝগড়া তা কিন্তু নয়। এই যে বিষয় ফিকহ, এটাও প্রচুর ইমাম পছন্দ করতেন না। এই বিষয়কে দ্বীনের মধ্যে বিদআত বলেও অনেকেই আখ্যায়িত করেছেন। তাদের প্রধান কনসার্ন ছিল সম্ভবত এই ধারণা যে, ফিকহ সম্ভবত গ্রীক ফিলোসফি ও লজিক দ্বারা প্রভাবিত।
আমি বুঝতে পারলাম, বিষয়টি কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখছেন সে ব্যাপারটি ইম্পরট্যান্ট। আমি মনে করি দু’পক্ষই তাদের বুঝ অনুযায়ী দ্বীনের হেফাযতের জন্য খালেস নিয়তে এসব করেছেন। এক পক্ষ আরেক পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে না পারাতেই কাল হয়েছিল। এখনও এই সমস্যা যে পুরোপুরি মিটে গেছে তা বলা যায় না।
একই বিষয়ে হানাফি ফিকহ যদি একটি মত দেয়, আহলে হাদিসরা হয়তো আরেকটি মত দিবেন, লেগে গেল ক্যাচাল। হানাফিরা আহাকে দলিল দিয়ে পরাস্ত করতে চাইলো ওদিকে আহারাও হানাফিকে পরাস্ত করতে চাবে। সাধারণ ভাবে দেখা যায় আহলে হাদিস বলবে হানাফিরা হাদিস মানে না। আপনি যদি হানাফি ফিকহ বুঝে থাকেন আর আপনার মতপার্থক্যের বিষয়টিতে হানাফি ফিকহের দলিল ও মূলনীতি বুঝেন তবে আপনি হয়তো উল্টা দাবী করে বসবেন, আহলে হাদিসরা কুরআন মানে না!
কিন্তু দুটো দল যে দুটো ডিফারেন্ট মূলনীতির আলোকে তাদের রেজাল্টে পৌঁছেছেন এটা দেখা হচ্ছে না। বিভিন্ন ফিকহের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের ব্যাপারটি এভাবে দেখা যেতে পারে: আপনি উত্তরা থেকে মিরপুর দেশে যাবেন, আরেক লোক মিরপুর যাবে যাত্রাবাড়ি থেকে। দেখেন, দুজনেই মিরপুরই যাবেন কিন্তু তাদের যাবার পথ ভিন্ন। একজন যেই যেই ক্রসিং, মোড় ও এলাকা দিয়ে মিরপুর যাবেন অন্যজন হয়তো সেভাবে যাবেন না। আবার যিনি যাত্রাবাড়ী হতে যাবেন তিনি মিরপুর ১ পৌঁছে বলবেন, এই যে মিরপুর এসেছি। উত্তরার জন হয়তো মিরপুর ১০ এসে বলবেন, আরে! এটাই তো মিরপুর। লেগে গেলো দুজনের মধ্যে ক্যাচাল।
ধরুন একজন উত্তরা থেকে মিরপুর দেশে যাবেন, আরেক লোক মিরপুর যাবে যাত্রাবাড়ি থেকে। দুজনেই একই দেশে যাবেন কিন্তু পথ ভিন্ন। আবার যাত্রাবাড়ীর জন মিরপুর ১ পৌঁছেই মিরপুর এসেছেন বলে দাবী করবেন।
আপনারা যারা মিরপুর দেশ চেনেন, তাদের কাছে ব্যাপারটা হাস্যকর লাগতে পারে যে দুটোই তো মিরপুর। ঝগড়া করার কি আছে! পুরো মিরপুরকে United States of Mirpur ধরলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়, একেক্টা স্থান হলো একেক্টা স্টেইট আর প্রত্যেকটাই মিরপুর।
ফিকহের বিভিন্ন মাযহাবের বিষয়টিও অনেকটা তেমন। যিনি দ্বন্দ্বে অন্তর্গত দুটো মতেরই মূলনীতি ও দলিল বুঝেন তার কাছে ঝগড়া অর্থহীন মনে হবে। তিনি বলবেন দুটোই তো ঠিক আছে। কখনও তিনি একটির উপর অন্যটি প্রায়োরিটি দিতেই পারেন। কিন্তু তিনি কখনোই অন্য মতটি ছুঁড়ে ফেলে দেবেন না।
মতের অমিল হলে জ্ঞানী সালাফদের মত ছিল অনেকটা এমন যে, ‘আমি সঠিক কিন্তু ভুল হতেও পারি, আর তুমি ভুল কিন্তু ঠিক হতেও পারো’।
একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝাই ব্যাপারটা। যেমন ধরুন নামাযে সুরা ফাতেহা পড়ার বিষয়টা। এটা নিয়ে দেশের হানাফি-আহলে হাদিসদের তুমুল ঝগড়া। হানাফিরা বলেন মুক্তাদির পড়া দরকার নেই, আহলে হাদিসরা বলেন অবশ্যই পড়তে হবে, নইলে নামাযই হবে না। আসুন ভেতরের কার্যকরনটা সহজ ভাষায় দেখি।
সুরা ফাতেহা পড়তেই হবে এর পক্ষে দলিল দেয়া হয় হাদিস থেকে, “যে সুরা ফাতিহা পড়ে না তার সালাতই হলো না।” (বুখারি ৭৫৬) এদিকে হানাফীগন দলিল দেন কুরআন থেকে, আল্লাহ বলেন, “কুরআন থেকে যা সহজ আবৃত্তি করো।” (কুরআন ৭৩:২০) অর্থাৎ, কথা হচ্ছে কুরআন থেকে পড়তে হবে, যা সহজ তা পড়লেই হবে। সুরা ফাতিহাই যে পড়তে হবে তা না। এখানে যদি কুরআনের এই সাধারণ পারমিশনকে যদি হাদিস দিয়ে নাকচ করতে যাই তাহলে হাদিসকে কি কুরআনের উপরে স্থান দেয়া হচ্ছে না? তাহলে যখন আহলে হাদিসদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন হানাফীরা হাদিস মানে না তখন হানাফিরা যদি তাদের বলেন, তোমরা কুরআন মানো না, তাহলে কি অবস্থা হবে?
বইটিতে আহলে হাদিসদের কথা নেই, উদাহরণটা আছে হানাফী বনাম শাফেয়ীদের ব্যাপারে। আমাদের দেশের আহলে হাদিসগন আসলে না জেনে শাফেয়ী উসুল ফলো করেন বলে আমি আহলে হাদিসদের নাম উল্লেখ করলাম। এতে ব্যাপারটা প্রাসঙ্গিক হয় আরও।
এরকম উসুল মেনেই মাযহাব ভেদে ওয়াজিব-সুন্নতে মুয়াক্কাদার পার্থক্য হয়ে থাকে। এক মাযহাবে যেটা ওয়াজিব অন্য মাযহাবে সেটা ফরজ কিংবা সুন্নতে মুয়াক্কাদাও হয়ে যেতে পারে। এই যে সুরা ফাতেহার ব্যাপারটি। শাফেয়ী মাযহাবে পড়া ফরয কিন্তু হানাফী মাযহাবে এটা হয়ে গেলো ওয়াজিব, কারণ কুরআনে না থাকলে হাদিস দিয়ে তো এর বাধ্যতা প্রমাণিত, তাই এটাকে ফরজের চাইতে একটু নিম্নস্তরে ওয়াজিব বলা হোক।
যাই হোক, প্রত্যেক ফিকহি মাযহাবেই নির্দিষ্ট উসুল তথা মূলনীতি আছে, এটা অনেকটা বীজগনিত বা সরল অংকের ফর্মুলার মতো বলতে পারেন। এই ফর্মুলার ছকে কুরআন, হাদিস, ইজমা, কিয়াস, সাহাবী-তাবে-তাবেয়ী-ইমামদের মত, ইজতিহাদ, কন্টেক্সট ইত্যাদি ফেলে একটা মত বের করে আনা হয়। মাযহাব ভেদে ফরমুলার মধ্যে খানিক পার্থক্য থাকে যার কারণে শেষমেশ যে রেজাল্ট বের হয় তার মধ্যেও একটু একটু উনিশবিশ দেখা যায়। তাই এই পার্থক্য গুলো নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটাবার কোনো প্রয়োজন নেই।
আরেকটা বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, ফিকহের মতো ফিকহের উসুলও কিন্তু ইজতিহাদি বিষয়। এ কারণেই মাযহাব ভেদে উসুলে খানি পার্থক্য হয়ে থাকে। এই উসুল মেনে যে কোন কিছুকে ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নতে মুয়াক্কাদা ইত্যাদি বলা হচ্ছে, এটাও ইজতিহাদ। তাই এটি সঠিক হবার ৯৯% চান্স আছে, ভুল হবারও চান্স আছে। তাই নিজের মাযহাবের উসুল আর ফিকহের এই ফরজ-ওয়াজিব হুকুমকেও সবসময় ওহীজ্ঞান করা উচিত নয়। যদি না তা ইজমার মাধ্যমে অকাট্যভাবে প্রমাণিত না হয়।
এখানে ইমাম যাহাবী (রাহিঃ)-এর একটি বক্তব্য আমার পছন্দ হয়েছে, “তুমি মনে করো না তোমার মাযহাব সর্বশ্রেষ্ঠ এবং আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মাযহাব। এর পক্ষে তোমার কোনো প্রমাণ নেই। তোমার বিপরীত পক্ষেরও কোনো প্রমাণ নেই। বরং সকল ইমামই প্রভূত কল্যাণের উপর ছিলেন। তাদের প্রত্যেকে প্রত্যেক মাসআলায় ঠিক করলে দুই নেকী করে পাবে, আর ভুল করলে এক নেকী করে পাবে।” (বায়ানু যাগালিল ইলম: ১৬)
আসলে সাহাবীগনদের (রাঃ আঃ) আমলে ব্যাপারটি অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। কারণ তারা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নাহ-নফল পার্থক্য করতেন না। যার বিধান আছে কুরআনে, রাসুল (সঃ) যা প্রেস্ক্রাইব করেছেন বা নিষেধ করেছেন সবকিছুই তারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলতেন। এটা তো শুধু সুন্নাহ, ওটা তো ওয়াজিব- এরকম মেন্টালিটি তো গুনাহগার আমাদের। আমলে ফাঁকি দেবার জন্য আমরা যা “সুন্নত মাত্র” বলে এড়িয়ে যাই, তাঁরা তা শুধুমাত্র সুন্নত বলেই করার জন্য রীতিমত কম্পিটিশন করতেন। যেমন দাঁড়ি, এটা রাখার জন্য মানুষকে অনেক কষ্টে বোঝাতে হচ্ছে যে এটা ওয়াজিব, সুন্নত না। সুন্নত হলে যেন কাটতে ক্ষতি নেই।
বইতে কি কি আছে? অনেক কথা বলে ফেললাম বুক রিভিউ করতে এসে। আসলে বইতে কি কি আছে, কি কি নেই সেটা মোটামুটি বই���়ের সূচিপত্র দেখেই বোঝা যায় অনেকটা। এখানে আমি বলতে চেয়েছি বই পড়ে আমার মনে কি কি খেয়াল এসেছে, কি কি বুঝ এসেছে তা।
‘সহজ ভাষায় উসুলুল ফিকহ’ বইটি পড়তে যেয়ে দফায় দফায় অনেক চিন্তাই মাথায় এসেছিল। পরের কয়েক পাতা যেয়েই দেখি সেটাই এখানে উল্লেখ করা, কি মুশকিল! বইয়ের শেষের দিকে এসে একটা ওভারভিউ দিতে যেয়ে দেখি পরিশিষ্টে-মতের অমিল হলে কি করা যায়-নিয়ে যা লেখা হয়েছে তাই আমার মনের কথা। মেজাজটাই বিগড়ে গেলো। এখন আর কি লিখবো আমি?
কি আর করা, বিসমিল্লাহ বলে লেখা শুরু করতে এতোগুলো কথা বেরইয়ে গেলো। যাই হোক, বই সম্পর্কে কিছু কথা আছে।
বইয়ে অনেক গুলো আলাদা অধ্যায় থাকলে আমার কাছে মূলত প্রধান অংশ লেগেছে দুটোঃ ফিকহি আইনের উৎস ও এই উৎসগুলো ব্যাখ্যার নিয়ম। পড়ে মনে হয়েছে বইটি হানাফি উসুলুল ফিকহকে সামনে রেখেই লেখা হয়েছে। আর অন্য মাযহাবের কম্প্যেয়ার কন্ট্রাস্ট করার জন্য শাফেয়ী ফিকহ কে বেঁছে নেয়া হয়েছে, ঠিক যেমনটি আমাদের উপমহাদেশে করা হয়।
বইটি কার জন্য উপকারী? ওভারটেকনিক্যালিটি বইতে নেই। তাই জেনারেল লাইনে শিক্ষিত যে কেউ খুব সহজেই বুঝতে পারবে। মাসুদ শরীফ ভাই অনুবাদে এই মুন্সিয়ানা বেশ দেখাতে পারেন, তার প্রমাণ এই বইতে আমি আরেকবার পেয়েছি। যারা ইসলামিক লাইনে একাডেমিকভাবে আগে থেকেই পড়ে আসছেন তারা তেমন নতুন কিছু শিখবেন বলে মনে হয়নি। কিন্তু শেখা ব্যাপারগুলো বেশ সুন্দর করে ঝালাই হয়ে যাবে তা বলতে পারি। বিশেষ করে আহলে হাদিস ভাইদের বইটা সবচাইতে বেশী কাজে আসবে বলে মনে করি। ফিকহের ইন্ট্রিকেসি বোঝাটা তাদের জন্য খুব বেশী জরুরি। ফিকহ সেটা হানাফী বলেন কি হানবালি, তা যে হাওয়া থেকে ভেসে আসেনি তা জানলে মাযহাবিরা হাদিস মানে না এই অপবাদ অন্তত হয়তো দিবে না তারা।