ধানের আবাদ কেবল অর্থনীতির হৃদপিন্ডতুল্য বিষয় নয়— এটা কর্মসংস্থানেরও মূল স্তম্ভ এখনও। কিন্তু রাজনীতি-মিডিয়া-একটিভিজম কোথাও চাষীরা নেই। সেখানেও তাদের পরাজয় বহু আগেই সম্পন্ন হয়েছে। ফলে তাদের বিপন্নতা জাতীয় মনযোগের বাইরে পড়ে থাকবে এটা অস্বাভাবিক নয় আর। অথচ কোটি কোটি মানুষ অন্তত দু’বেলা ঐ বিপন্নতার সুবিধাভোগী। কী গভীর আর ব্যাপক এক সুবিধা-ভোগের আখ্যান এই ধান-চাষ!
এই লেখায় ধান-চালের দাম নিয়ে কোন সমাধান খোঁজা হয়নি। এ বিষয়ে কোনো প্রস্তাবও নেই। বরং চাষিরা ধান আবাদ করতে যেয়ে– আবাদ পর্যায়ে এবং বিক্রি পর্যায়ে কী অবস্থায় পড়ছে সেটা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক একটা ঘটনা এই উদ্যোগের প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে।
২০১৯-এ বোরো মওসুমে ধানের দাম নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকরা নানাভাবে অভিযোগ তুলছিল। খুব বেশি সংঘটিত ছিল না ধানচাষিদের ঐ আন্দোলন। কিন্তু তখন সারা দেশের চাষিদের মাঝে একই অভিযোগের প্রতিধ্বনি দেখা যায়। খোলা দৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল, ধান আবাদে দেশজুড়ে চাষিসমাজ একই ধাঁচের কিছু সমস্যায় পড়ছে। সঙ্গতকারণেই বিষয়টা বাড়তি অনুসন্ধান দাবি করে। তারই ফসল এই প্রতিবেদন।
ধান-চালের-অর্থনীতি নিয়ে এতদিনকার প্রভাবশালী অভিমত হলো কৃষকরা ‘ন্যায্যমূল্য’ পেলেই ‘সমস্যা’ মিটে যায়। দশকের পর দশক এই গৎবাঁধা ধারণা রাজত্ব করছে। কিন্তু ধানচাষীদের সমস্যা এত সোজা-সাপ্টা নেই আর। বীজ-পানি-কীটনাশক-সার ও কৃষি যন্ত্রাংশের বাণিজ্য শেষেই কেবল মাঠে ‘সোনালী ধান’ আসে। ঐ সোনালী রঙে যে চাষীদের হাহাকার মিশে থাকে সেটা বর্ণিল আলোকচিত্র সামান্যই ছুঁতে পারে। বীজ-পানি-কীটনাশক-সার ও কৃষি যন্ত্রাংশের প্রতিটি খাতে চাষীদের এক দফা করে বিপন্নতা আছে। আছে লিজের খরচ। তারপরই কেবল শুরু হয় ধান-চালের সিন্ডিকেটের অধ্যায়। বীজ থেকে অটো-মিল পর্যন্ত দীর্ঘ এই প্রক্রিয়াতে চাষীসমাজের বিপন্নতার যে পরম্পরা সেটা এক ধরনের কাঠামোগত সহিংসতার মতো। এটা শুধুই ‘ন্যায্যদামে’র মামলা নয়।
আলতাফ পারভেজের জন্ম ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬। দর্শনশাস্ত্রে প্রথম স্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন শেষ করেন। ছাত্রত্ব ও ছাত্র রাজনীতির পর সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু। পরে গবেষণা ও শিক্ষকতায় সংশ্লিষ্টতা। প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি। যার মধ্যে আছে—‘কারাজীবন, কারাব্যবস্থা, কারা বিদ্রোহ : অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা’, ‘অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্নের তাহের ও জাসদ রাজনীতি’, ‘বাংলাদেশের নারীর ভূ-সম্পদের লড়াই’, 'মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ'।
বাংলাদেশে ১০৭ থেকে ১১১ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়। ৩৪ থেকে ৩৬ শত কোটি কেজির মত ধান উৎপাদিত হয় প্রতিবছর। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পায় না এটা আমরা জানি। মধ্যসত্ত্বভোগীরা মুনাফা লুটে নিচ্ছে তা-ও জানি। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় এবং এর প্রভাবে কী হচ্ছে তা নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা করেছেন আলতাফ পারভেজ। কৃষকদের সাথে যা করা হয় তাকে বলা যায় " কাঠামোগত সহিংসতা।" এ ধরনের সহিংসতা এমনভাবে করা হয় যাতে ভুক্তভোগীরা সেটা মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং পুরো পদ্ধতিকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয় সবাই।
পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায় - ফসল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য জমিতে সার দেওয়া হয়, সেই সার জমির জৈব উপাদান ৫০-৬০% কমিয়ে দেয়, মাটি হয়ে যায় বালুময় ও পুষ্টিগুণহীন। তখন আবার দরকার পড়ে অতিরিক্ত সেচ আর অতিরিক্ত সার! এ এক জটিল নাটক। সরকার কৃষকের সহায়তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ধান কেনে তবে তা মোট চালের তিন ভাগের এক ভাগও নয়। সহায়তা দেবার কথা থাকলেও এর দায়িত্বে থাকে ঘুষখোর ও মুনাফালোভী মহাজন, নেতা ও ফড়িয়ারা। ভুয়া অ-কৃষকদের নাম রেজিস্ট্রি করিয়ে তাদের সুবিধা দিয়ে প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করা হয়। এ বঞ্চনার শেষ নেই।
(ছোট্ট একটা পাদটীকা চমকে দিলো।১৯৬৬ সালে উদ্ভাবিত উফশী ধানকে মিরাকল রাইস বলা হলেও এটি খাটো হওয়ায় খড় কম হয়,ফলে গরু খড় খেতে পারে না প্রয়োজন অনুসারে। ধানচাষে গরুও যে একটা হিস্যা তা অস্বীকার করা হোলো এর মাধ্যমে। আমরা ধীরে ধীরে আধুনিক হওয়ার নামে অন্য প্রাণীদের প্রাপ্য কীভাবে কেড়ে নিচ্ছি তার একটা নমুনা এটা।)
আলতাফ পারভেজ একজন সুলেখক। ওনার লেখা বলেই আগ্রহ নিয়ে বইটা পড়া। ছোটবেলায় পাটচাষের আশপাশে বড় হওয়া, ধানচাষের সাথে পরিচয় দূর থেকেই৷ তাই সম্পূর্ণ অজানা বিষয় নিয়ে আগ্রহ ও ছিল বেশ। লেখক সেই আগ্রহ তৃপ্ত করতে পেরেছেন।
ধানচাষ মানব ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাক। এগ্রিকালচার এর হাত ধরেই ক্লাস/হায়েরার্কির সৃষ্টি, উদ্বৃত্ত ধান থেকেই ক্যাপিটাল এর সৃষ্টি, ধানচাষে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরেই টেকনোলজি আর বুদ্ধিবৃত্তিক স্কিলের সৃষ্টি। সেই দিক দিয়ে ভাবলে খেতের কাজ হচ্ছে মানবসভ্যতার ভিত্তি। লেখকের থিসিস হচ্ছে, এই ভিত্তির মানুষদের কিভাবে শোষণ করা হয়, তার সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কাঠামোভিত্তিক আলাপ।
দেশে ধানের উদ্বৃত্ত ফলন হচ্ছে। ধানের দাম বাড়ছে। কিন্তু কৃষক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, ধান কেটে ফেলে, পুড়িয়ে দিয়ে এই অদ্ভুত প্যারাডক্সের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। আলতাফ পারভেজ এর মতে, নয়া-উদারনৈতিক ব্যাবস্থায় ধানের ফলন বাড়ার ন্যায্য মূল্য কৃষক পাচ্ছেন না মধ্যেস্বত্ত্বভোগীদের কারণে, যারা বীজ বোনা থেকে শুরু করে মাড়াই ও সাপ্লাই এর বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন অপ্রোয়জনীয় অংশ হিসেবে, যার ফলে কৃষক ফসলের ওপর দাবী হারাচ্ছেন। সেচ ব্যাবস্থা, কীটনাশক, উন্নত বীজ, বিক্রির কাজ গুলোর থেকে কৃষকের অধিকার হারাচ্ছে। Means of production যার হাতে, সে ন্যায্য মুনাফা পাচ্ছে না, পাচ্ছে supply chain এর বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা।
আলাপটা কাঠামোগত, অর্থাৎ বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলের ভিতরে চিন্তা করার ব্যাপার। কৃষকের উপরে ও আঘাত টা শুধু অর্থনৈতিক না, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, মানসিক৷ এই ব্যাপারটা নিয়ে আরো আলাপ জমলে ভালো লাগত।
খুব কম মূল্যের বই, বোঝাই যায় মুনাফার জন্য লেখা না৷ যাদের চাল আমাদের পেটে, তাদের জন্য যেন আরেকটু ভাবি, সেই প্রত্যাশা থাকলো সবার কাছে। লেখকের ভবিষ্যৎ বইগুলোও পড়ার ইচ্ছা থাকলো।
বাংলাদেশের কৃষকসমাজ যে ভয়ংকর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সারাবছর থাকে সেটার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সমস্যা শুধু ধান কৃষকদের কাছ থেকে অল্প টাকায় কেনা না। ধান উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধির নিত্য নতুন পদ্ধতি নিয়ে হাজির হয় আমাদের কৃষিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। একদিকে ধান উৎপাদন বাড়ে, আরেকদিকে সব লাভের টাকা চলে যায় ব্যবসায়ীদের পকেটে। ”হাইব্রিড হলো দুটি জাতের মাঝে ক্রস করে নতুন তৈরি জাত। এর বীজ সংরক্ষণ করা যায় না। এগুলোকে সেই অর্থে বলা যায় বন্ধ্যা জাত। অর্থাৎ হাইব্রিড ধানের বীজ সংরক্ষণ করা যায় না। এর ফলে কৃষক বীজের উপর তার শতশত বছরের সার্বভৌমত্ব হারায়। আর বীজ কোম্পানিগুলো চিরস্থায়ী এক বাজার পায়।“ ”উফশী (উচ্চ ফলনশীল) ধান উচ্চতায় খাটো। তার মানে এই ধানে খড় হবে কম। এই আবাদে কেবল মানুষ খাদ্য পাবে, গরু নয়। এভাবে কার্যত কৃষকের গবাদিপশু পালন নিরুৎসাহিত করা হলো।”