বাঙালি মুসলমানের বয়ান এবং প্রতিবয়ান বলতে আমরা কি বুঝব? প্রথমত এটা হল এমন একটা বয়ান ও প্রতিবয়ান যেখানে রবীন্দ্রকেন্দ্রিকতা নেই; কিংবা কাজী নজরুল ইসলামকে বাহান্নো থেকে একাত্তর হয়ে আজ অবধি যেভাবে “জাতীয় কবি” বানিয়ে জাতিবাদী ও বেইনসাফবাদী বাংলাদেশের জন্য সাংস্কৃতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক জনসম্মতি আদায় করা হয়—এখানে তাও নেই; কিংবা বাহান্নো থেকে একাত্তর হয়ে আজ অবধি এমন একটি চেতনাকাঠামো তৈরি করা হয় যেখানে আমাদের সাংস্কৃতিক-চিন্তাকল্পিক অস্তিত্ব মানেই হল কলকাতার জানালা দিয়ে পাশ্চাত্য বীক্ষার অনুগামীতা—সেটিও এখানে নেই। আমাদের মনীষা ও কল্পনার ব্যক্তিত্বরা এর ফলে হয়ে যান দ্বিতীয় স্তরের বা সারির। যেমন শামসুর রাহমান, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বা হুমায়ুন আজাদরা হয়ে যান কোন না কোন কলকেতীয় পূর্বসূরীর ঢাকুভি সংস্করণ বা অবতার।
আমার এই গ্রন্থে আমি এই সমকালীন বাঙালি মুসলমানের প্রতিষ্ঠিত রবীন্দ্র-নজরুলীয়-একুশে ফেব্রুয়ারী-উত্তর মহাআখ্যানের কৃষ্ণগহ্বর এবং চোরাবালিগুলোকে উন্মোচিত করতে চেয়েছি। এমন কিছু বয়ান, প্রতিবয়ান, বয়ানকার এবং প্রতিবয়ানকারদের এখানে হাজির করেছি যারা আমাদের বিগত সত্তুর বছরের সংস্কৃতি-বুদ্ধিবৃত্তির বলয়ে উপেক্ষিত, প্রান্তিক এবং— কারো কারো ক্ষেত্রে বলা যায়—একেবারেই অনুপস্থিত।
যেমন উস্তাদ ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান প্রসঙ্গে বলা যায় যে, তার মত একজন বহুমুখী ও মৌলিক জ্ঞানতাপসকে বাংলাদেশের সমকালীন যে সংস্কৃতি-বুদ্ধিবৃত্তির প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক বলয়ের কথা বললাম তা একেবারেই চিনতে পারেনি, গুরুত্ব দেয়নি; বরঞ্চ প্রান্তিক ও অপাংক্তেয় করে রেখেছে। একই কথা অনেকটা প্রযোজ্য ড. এবনে গোলাম সামাদ সম্পর্কেও। কিংবা ডা. ফাহমিদ-উর-রহমানের বেলাতেও একই প্রান্তিকীকরণ এবং উপেক্ষার ধারাবাহিকতা।
এছাড়া এই গ্রন্থে উপমহাদেশের এমন কয়েকজন মনীষীকে ধারণ করতে চেয়েছি যারা মুসলিম বিশ্বে বা আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত ও প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ শিক্ষিত বাঙালি মুসলমানের বিদ্যজাগতিক এবং সৌখিন বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির আঙিনায় প্রান্তিক এবং অবদমিত। যেমন মহাকবি দার্শনিক আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল, মওলানা আবুল আ'লা মওদূদী, মওলানা আবুল হাসান আলী নদভী। প্রথমজন বাঙালি জাতিবাদী বিবেচনায় অচ্ছুৎ ও অস্পৃশ্য; দ্বিতীয়জন দলীয় রাজনীতির নৃশংস প্রতিহিংসার শিকার আর তৃতীয়জনকে ধারণ করার মত পরিণতমনস্ক এখনো হয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশীয় বাঙালি মুসলমানের মূলধারা।
এই গ্রন্থে বাঙালি মুসলমানের চেতনাভূমিতে শাসন করছেন এমন কয়েকজন চিন্তক ও লেখককে পর্যালোচনা করতে চেয়েছি বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতির চলমান পরিবেশ ও বাতাবরণকে আরো উন্মুক্ত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার উদ্দেশ্য থেকে। এই বিবেচনা থেকেই এই বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আহমদ ছফা, ফরহাদ মজহার এবং সলিমুল্লাহ খানের উপরে নাতিদীর্ঘ পর্যালোচনা। লক্ষ্য হল তাদের ক্রমবর্ধিষ্ণু বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে একটা মোলাকাত ও মোকাবেলার মধ্যে নিয়ে আসা।
এভাবেই এই গ্রন্থে পাঠকদের জন্য হাজির করেছি বাঙালি মুসলমানের চাপা পড়া, অজানা ও অল্প চেনা বয়ান ও প্রতিবয়ান।