Politically correct-কথাটির অর্থ আসলে কি? ছেলেবেলায় আমরা আদর্শলিপিতে শিক্ষা পেয়েছি “কানাকে কানা, খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না”। মানসিক বা শারিরীকভাবে অক্ষম ব্যাক্তিকে তাঁর অক্ষমতার দিকটি মনে করিয়ে দেয়াটা মানবিক শিষ্টাচার বহির্ভুত এ কথা সর্বজনস্বীকৃত। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিকভাবে খোঁড়া এবং ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন কোন জাতিকে তার দীনতার দিকটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার বেলায় শিষ্টাচারের এ চেতনাটি কিভাবে কাজ করে? সুবিধাবাদী মানুষ মাত্রেই ঝামেলা এড়িয়ে চলতে ভালোবাসেন। সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ এড়িয়ে চলবার কারণেই জাতি-গোষ্ঠী-দেশ ইত্যাদিকে নিয়ে সমালোচনামূলক কথা বলতে গেলে এই সুবিধাবাদী ‘শান্তিপ্রিয়’ মানুষেরা আলোচনাটির গায়ে Politically incorrect তকমাটি লাগিয়ে দেন। বৈশ্বিক ভদ্রতার খাতিরে অধিকাংশ সময়েই সত্য কিন্তু politically incorrect কথাগুলো কবর চাপা পড়ে যায়। তবে সত্যের মতো বদমাশ আর হয় না, এবং ভাগ্যবশতঃ সত্য প্রকাশের মতো বদমাশও মানবজাতির কপালে কালেভদ্রে জুটে যায়। ‘দি ক্ল্যাশ অফ দি সিভিলাইজেশনস অ্যান্ড দি রিমেইকিং অফ দি ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ তেমনি সত্যের মতো বদমাশ একটি বই। ১৯৯৬ সালে প্রকাশের পর থেকে আজতক বইটি প্রচুর আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আলোচনা হয়েছে বইটির পেছনে ব্যায়কৃত গবেষণা ও জ্ঞানের প্রয়োগের জন্য। সমালোচনা হয়েছে politically incorrect বেআরামদায়ক বেফাঁস সত্য উচ্চ কণ্ঠে বলে দেবার জন্য। বইটির ব্যাপারে মূল আলোচনায় যাবার আগে বইটি রচনার প্রেক্ষাপট নিয়ে দুটো কথা খরচ করা প্রয়োজন।
আশির দশকের শেষে যখন সোভিয়েত রাশিয়ার পতন হয়, ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামা তখন তাঁর একটি নিবন্ধে ‘দি এন্ড অফ হিস্টরী’ শীর্ষক একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তাঁর এ তত্ত্বের সারাংশ হলো সোভিয়েত বনাম পশ্চিমা মুক্ত গনতন্ত্রের লড়াইয়ে পশ্চিম বিজয়ী হয়েছে, এবং এই পশ্চিমা চিন্তাধারাই মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের শেষ ধাপ। বৈশ্বিকভাবে মানুষ এখন পশ্চিমা সভ্যতার ছায়াতলে এসে একটি একীভূত মানবজাতির লক্ষ্যে কাজ করে যাবে (ইউনিভার্সাল সিভিলাইজেশন)। বিচ্ছিন্নভাবে এখানে ওখানে কমিউনিজমের ভুত থাকবে সত্যি, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, কিন্তু সার্বিকভাবে গোটা বিশ্বের মানুষ আসলে যুদ্ধ বিগ্রহ ভুলে ‘এক পৃথিবী-এক জাতি’ এমন একটি মহান লক্ষ্যের দিকে পা বাড়াবে। ফুকুইয়ামা কিছুটা যেন ক্ষেধের সাথেই বলেন যুদ্ধ-সংঘর্ষহীন সে পৃথিবীটা বরং বেশ একঘেয়ে হয়ে উঠবে। ফুকুইয়ামার এ তত্ত্বের জবাবে স্যামুয়েল পি হান্টিংটন রীতিমতো পিএইচডি গবেষণাপত্র-স্বরূপ এই বইটি লিখে ফেলেন।
হান্টিংটনের 'ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশন' তত্ত্বটি মূলত বলে সোভিয়েত পরবর্তী পৃথিবীতে এখন অন্যান্য সভ্যতাগুলোর মাঝে সংঘর্ষ তৈরি হবে। সোভিয়েত যুগের পৃথিবীকে ব্যখ্যা করতে প্রয়োজন ছিলো 'সোভিয়েত বনাম আমেরিকা' মডেলের। হান্টিংটন বলছেন 'সোভিয়েত বনাম আমেরিকা' মডেলটি যেমন আজ অকেজো, তাঁর নিজের 'ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশন' মডেলটিও একসময়ে অকেজো হয়ে পড়বে। তবে তার আগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সভ্যতা একটি বৈশ্বিক কামড়াকামড়িতে জড়িয়ে পড়বে, সবার লক্ষ্য পশ্চিমকে ক্ষমতাচ্যুত করে সে জায়গায় নিজেকে স্থাপন করা। বৈশ্বিক এ ‘গেইম অফ থ্রোন্স’-এ মূল সংগ্রামটি হবে পশ্চিম বনাম মুসলমান বিশ্বে, যাকে কেন্দ্র করেই বাকী সভ্যতাগুলোর সংগ্রামের চালগুলো পরিচালিত হবে।
হান্টিংটনের মতে গোটা বিশ্বের সভ্যতাগুলোকে মেরেকেটে আট থেকে নয়টি ভাগে ভাগ করা যায়ঃ পশ্চিমা, হিন্দু, মুসলিম, ল্যাটিন আমেরিকান, আফ্রিকান, চৈনিক, জাপানী, বৌদ্ধিক এবং অর্থোডক্স (রাশান)। এর মাঝে অনেকগুলো সভ্যতাই পশ্চিমের শাসনাধীন ছিলো, বা কোন কোন ক্ষেত্রে আজও আছে। সময়ের সাথে সাথে পশ্চিমের অধীনে থাকা সভ্যতাগুলো নিজেদের স্বাধীনতা এবং অস্তিত্বের ব্যাপারে সচেতন হতে থাকবে এবং পশ্চিমের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিজেদের সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধের ওপর জোরারোপ করা শুরু করবে-এটি হান্টিংটনের তত্ত্বের অন্যতম একটি স্তম্ভ। মানুষ মাত্রেই নিজের দল ভারি করতে চায়। পৃথিবীর কোণায়-কানায় ছড়িয়ে থাকা সভ্যতাগুলোর মাঝেও একই প্রবণতা দেখা যায়। হান্টিংটন বলেছেন দুটি ভিন্ন সভ্যতা পরস্পরের বন্ধু হয়ে ওঠে একইরকম সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ইত্যাদির ভিত্তিতে, ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করেছেন সোমালিয়ার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ প্রতিবেশী দেশগুলোর শীরঃপীড়ার কারণ হয়নি। ইউগোস্লাভ সংকটের সময় রাশিয়া সাহায্য করেছে সার্বিয়াকে, ওদিকে মুসলমান-প্রধান দেশ বসনিয়ার সাহায্যে এগিয়ে এসেছে সৌদি আরব, ইরান, তুরস্ক ও লিবিয়া। যে জিনিষটির ভিত্তিতে এ দেশগুলো নিজেদের শত্রু-মিত্র সজ্ঞায়িত করেছে সেটি হলো সাংস্কৃতিক পরিচয়; অর্থোডক্স এবং ইসলাম-এ দুটি ধর্মের সংস্কৃতি এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। তাই বলে কি একই ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতির বাহক সকল দেশ এবং সে সব দেশগুলোর মানুষেরা হাজার হাজার মাইল দূরত্বের পার্থক্য ভুলে গিয়ে একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্ববোধের একটি অমোঘ টান অনুভব করে? না, মানব সমাজ এভাবে কাজ করেনা। এখানে রাজনৈতিক স্বার্থই আসল ভূমিকা রাখে। যে দেশগুলোকে নৈতিক সমর্থন দিলে জনগণের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিজেদের খুঁটি শক্ত হবে, শাসকেরা তারই জটিল হিসেব নিকেশ কষে শত্রু মিত্র নির্ধারণ করেন। বসনিয়ার সাথে সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলমান দেশগুলোর মাঝে দূরত্ব দু'হাজার মাইলের ওপর; রাজনৈতিক স্বার্থটি-যা ধরা ছোঁয়া এবং শোঁকা যায়-এখানে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 'ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ' বিষয়টি একান্তই বায়বীয় এবং কাল্পনিক।
হান্টিংটন তাঁর নিজের মডেলের কার্যকারীতার আলোচনায় তুলনা টেনেছেন জন মার্শেইমারের 'স্টেটিস্ট' (statist) মডেলের সাথে। মার্শেইমারের statist মডেল বলছে দুটো ক্ষমতাশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র যখন একই অরক্ষিত সীমানা নিজেদের মাঝে ভাগাভাগি করে, তখন প্রায়ই তারা নিজেদের মাঝে দ্বন্ধ-ফ্যাসাদ মিটিয়ে এক জোট হবার জন্য হাত মেলায়। এ মডেলের সূত্র ধরে মার্শেইমার ভবিষ্যৎবাণী করেছেন, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের অদূর ভবিষ্যতে বন্ধু রাষ্ট্রে পরিণত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। অপরদিকে, হান্টিংটনের 'ক্ল্যাশ অফ সিভিলাইজেশন' মডেলটি প্রথমেই আলোচনা করে সুদূর অতীত থেকে চলে আসা ইউক্রেনের অর্থোডক্সপন্থী পূর্বাঞ্চলের সাথে পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহাসিক সংঘাতের কথা, যার সূত্রপাত অঞ্চল দুটির সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় পার্থক্যের ভিত্তিতে। হান্টিংটন বলছেন সভ্যতার সংঘাতের এ তত্ত্বের পথে হাঁটলে রাশিয়া বনাম ইউক্রেন পরিস্থিতির চেয়ে বরং ইউক্রেন দেশটির আদৌ একসাথে থাকা হবে, নাকি, পূর্ব-পশ্চিম এ দুভাগে ভাগ হয়ে যেতে হবে-সে প্রশ্নটিই বেশী জরুরী হয়ে ওঠে। ইউক্রেনের দু’ভাগ হয়ে যাওয়া নিয়ে হান্টিংটনের ১৯৯৬ সালে তোলা এ প্রশ্নটি ২০১৯ সালে আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
সভ্যতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গেলে কি কি বিষয় আমলে নেয়া উচিৎ প্রথমেই সে প্রশ্নটি চলে আসে। হান্টিংটন উল্লেখ করেছেন ভাষা, ধর্ম, জীবনাচার এবং নৃতাত্ত্বিক পরিচয়-প্রাচীন গ্রীকরা এই বিষয়গুলোর ভিত্তিতে নিজেদের সাথে অন্য জাতিদের পার্থক্য ন���রূপণ করতো। অ্যাথেনিয়ানদের মতে সভ্যতার সংজ্ঞা নিরূপণকারী এই স্তম্ভগুলোর মাঝে ধর্মের ভূমিকাটাই সবচেয়ে বড়। এই পর্যবেক্ষণটির ওপর ভিত্তি করেই হান্টিংটনের নিজস্ব তত্ত্ব অনেকখানি দাঁড়িয়ে আছে। একই ভাষা, একই জীবনাচার এবং একই নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সদস্য হবার পরও ধর্মের পার্থক্যের কারণে খুনোখুনির ইতিহাস পৃথিবীর জন্য নতুন কিছু নয়। প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে হালের সময়ের লেবানন, ইউগোস্লাভিয়া আর আমাদের উপমহাদেশের ধর্মভিত্তিক হানাহানি অ্যাথেনিয়ান এই দাবীটিকেই সত্য প্রমাণ করে চলেছে। তত্ত্বীয় আলোচনা বাদ দিয়ে সভ্যতা বলতে আমরা আসলে যা বুঝি তা হলো ‘সভ্য আমরা’ ও ‘বর্বর ওরা’। প্রতিটি সভ্যতাই বস্তুতঃ এই ‘সভ্য-বর্বর’ মোটা দাগটির ভিত্তিতে নিজেদের পরিচিত করে, দাগের এ-পারের নিজেরা সবাই সভ্য এবং শিক্ষিত, আর ও-পারের সবাই বুনো, অসভ্য এবং বর্বর। ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর ভেতর সভ্য-বুনো’র ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করে দেখার প্রবণতাটি সবচেয়ে বেশী; নিজের ধর্মের অনুসারী ছাড়া আর কেউ স্বর্গে যেতে পারবেনা, নিজের ধর্মীয় কি���াবের অনুশাসন ছাড়া মনুষ্যনির্মিত দ্বিতীয় কোন শাসন-ব্যবস্থাই খাঁটি নয়, ধর্মত্যাগকারীকে প্রাণদণ্ড দিতে হবে... ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিটি ধর্মই নিজ অনুসারীদের অপর ধর্মের অনুসারীদের পতিত এবং নিচু চোখে দেখবার শিক্ষা দেয়। ইহুদী ঘরে জন্ম না নিলে আপনি যেমন ইহুদী হতে পারবেন না, হিন্দু ঘরে জন্ম না নিলে তেমনি আপনার হিন্দু ভগবানটির দেখা পাবারও কোন আশা নেই। ইদানিং ইস্কন অবশ্য অহিন্দুদের হিন্দুতে পরিণত করবার একটি রাস্তা খুলেছে তবে সেটি ভিন্ন আলোচনা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইস্কনের অন্যতম শ্লোগান পৃথিবীকে মুসলমান-মুক্ত করতে হবে, অর্থ্যাৎ, ধর্মভিত্তিক সেই বর্ণবিদ্বেষটাই মূল কথা, তাতেই ভগবানের যতো সুখ।
হান্টিংটন তাঁর তত্ত্বে ইসলামকে যে কারণে পশ্চিমের সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে দেখিয়েছেন সেটি হলো পশ্চিমা সমাজ এবং ইসলামী বিধানের মৌলিক বিষয়গুলোর আদর্শগত দ্বন্দ্ব। পশ্চিমা সমাজের মূল বিষয়গুলো যা পশ্চিমকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে সেগুলো হলো গণতান্ত্রিক রাজনীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার পৃথকীকরণ, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের অধিকার। একটি রাষ্ট্রকে আধুনিক হতে হলে এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করতেই হবে, তবে তার মানে এই নয় যে আধুনিকীকরণ মানেই পশ্চিমাকরণ। হান্টিংটন বলছেন এই বিষয়গুলো ৮ম-৯ম শতক থেকেই পশ্চিমা সমাজের মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রচলিত হয়ে আসছে, যেখানে পশ্চিমের নিজের আধুনিকীকরণ হলো ১৫-১৬ শতকের দিকে এসে। ইসলামী বিধির সাথে পশ্চিমা এই ধারণাগুলো অত্যন্ত সাংঘর্ষিক; পশ্চিমা চিন্তা যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে, ইসলাম সেখানে-নিজের রুচিমত-কাপড় পরবার, মানুষের সাথে মেশার, খাবার খাওয়ার কিংবা শিল্প-সাহিত্য চর্চার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার পৃথকীকরণ, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কিংবা নারী স্বাধীনতা-এর সবই ইসলামী বিধিতে অকল্পনীয়। মুসলমানরা বিশ্বাস করেন আল্লাহ্র আইন-ই সব সমস্যার একমাত্র সমাধান এবং পশ্চিম মাত্রেই ইসলামের নামে কালিমা লেপনের ষড়যন্ত্রে রত। পশ্চিমের সাথে ইসলামী সমাজের এ পার্থক্য দিনকে দিন আরো বাড়বে কারণ ইসলাম পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম। এর মানে এই নয় যে প্রচুর মানুষ আগের ধর্মের ভুল বুঝতে পেরে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলামকে গ্রহণ করছে। ইসলাম সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম কারণ মুসলিম-প্রধান দেশগুলোর প্রজনন হার সবচেয়ে বেশী। অন্যভাবে বলা যায়, মুসলিম দেশগুলোতে শিক্ষার অভাব প্রকট হওয়ায় এবং মানবিক যৌন-অনুভূতিগুলোকে কৃত্রিমভাবে জোর করে অবদমিত করে রাখায় বিনোদনের সবচেয়ে ওঁচা রাস্তাটিতেই দেশগুলোর অধিবাসীদের আগ্রহটা বেশী। পরকালে এঁদের হুর-প্রাপ্তির প্রণোদনা দেখিয়ে ধর্মটির অনুসারী করে রাখতে হয়, সেটি খুব বিচিত্র কিছু নয় বৈকি!
বস্তুগত দিক থেকে ভীষণ পিছিয়ে থাকা মুসলিম দেশগুলোর ভেতর শিক্ষায়, বিজ্ঞানে, প্রাচুর্যে পশ্চিমের সমকক্ষ হতে চাইবার প্রচণ্ড একটি ক্ষিধে আছে, কিন্তু একই সাথে আদর্শগত পার্থক্যের কারণে পশ্চিমের প্রতি প্রবল ঘৃণাও তারা লালন করে। পশ্চিমের আধুনিকতাবাদ ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির টানাপোড়েনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু মুসলিম দেশ। হান্টিংটন উল্লেখ করেছেন আদর্শের এই দড়ি টানাটানি খেলায় মিশর, তিউনিশিয়া, আলজেরিয়া, ইরান এবং লেবাননের মতো শিক্ষিত এবং অসাম্প্রদায়িক মুসলিম দেশগুলোতেও ইসলামী জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিলো আগের দশকগুলোতে। ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানো গোষ্ঠীগুলোর লক্ষণীয় দিক হলো এরা আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং প্রযুক্তির পরিপূর্ণ ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ; প্রযুক্তিবিদ্যার সর্বাধুনিক সংযোজনগুলো এরা সবার আগে গ্রহণ করে মানুষের কাছে তাদের প্রাগৈতিহাসিক বর্বর মতবাদ পৌঁছাবার কাজে।
হান্টিংটনের পর্যবেক্ষণ বলছে উগ্র ধর্মবাদে প্রধানত দুই ধরণের মানুষ বেশী যোগদান করেঃ প্রথম দলে আছে উন্নত জীবনের লক্ষ্যে যারা বিভিন্ন নতুন জায়গায় বা শহরে অভিবাসী হয়। সম্পূর্ণ অপরিচিত, ব্যস্ত সে জায়গার সাথে খাপ খাওয়াতে তাদের মানসিক, সামাজিক এবং বস্তুগত সহায়তার প্রয়োজন পড়ে যা ধর্মীয় গোষ্ঠীর চেয়ে ভালোভাবে কেউ দিতে পারেনা। ধর্ম সাধারণ মানুষের জন্য আফিম হতে পারে, কিন্তু দুর্বলের জন্য তা ভিটামিন-স্বরূপ। ধর্মীয় সংস্থাগুলোর কৃতজ্ঞতায় বাঁধা পড়া এই অভিবাসীরা সংস্থাগুলোর হাতের পুতুল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় যে গোষ্ঠীটি ধর্মীয় জঙ্গিবাদের প্রতি বেশী ঝোঁকে, এরা আসে শহরের মধ্যবিত্ত অংশটি থেকে যারা মূলত তাদের পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্ম। ধর্মীয় জাগরণ আলোড়ন তৈরী করে মূলত শিক্ষিত, আধুনিকতামনস্ক ছাত্রছাত্রী এবং কর্মজীবিদের মাঝে যারা ব্যবসা, রাজনীতি, সরকারী চাকরী বা অন্যান্য সম্মানজনক পেশায় নিয়োজিত। হান্টিংটন দেখিয়েছেন মুসলমান সমাজে তরুণদের ভেতর ধর্মীয় উৎসাহটা প্রবল এবং ধর্মের দিকে তাদের ঝোঁকার প্রবণতাটাই বেশী, যেখানে তাদের বাবা-মা’রা নিজেরা বেশীরভাগক্ষেত্রেই ধর্ম-নিরপেক্ষ। এই তরুণদের লক্ষ্য আধুনিকতাকে বাদ দেয়া নয়, পশ্চিমকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা। হান্টিংটন মন্তব্য করেছেন, বিশ্বজুড়ে তরুণদের মাঝে যে উগ্রবাদী একটি ইসলামী বিপ্লব জেগে উঠছে, তা অস্বীকার করা হবে ষোড়শ শতকে ইওরোপে প্রটেস্ট্যান্ট রিফর্মেশনকে অস্বীকার করবার মতো, অথচ প্রটেস্ট্যান্টিনিজিম আজ একটি বড় বাস্তবতা, খ্রিষ্টবাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম শাখা। তাঁর এ পর্যবেক্ষণ জানিয়ে দেয়, বাঙলাদেশের হলি আর্টিজান আসলে বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি মাত্র। মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ তাদের ধর্মবাদী তরুণ সমাজের হাতে একইভাবে নিগৃহীত হয়ে এসেছে পেছনের দশকগুলোতে।
এ বইতে মিশরের ইসলামী জঙ্গিবাদী একটি গোষ্ঠীর সদস্যদের ওপর চালানো একটি গবেষণার কথা এসেছে যেখানে ইসলামী জঙ্গিদের সার্বজনীন ৫টি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত হয়েছে। এই জঙ্গিদের প্রায় সবার বয়েস বিশ থেকে ত্রিশের মাঝে, এদের ৮০ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, এদের অর্ধেক জনবল এসেছে দেশের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এবং তারা সচরাচর প্রযুক্তিবিদ্যা সংক্রান্ত অনুষদগুলোর ছাত্র-ছাত্রী। এদের ৭০ শতাংশ এসেছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে এবং তারা নিজেদের পরিবারের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া প্রজন্ম। এরা প্রায় সবাই-ই এদের ছেলেবেলা কাটিয়েছে গ্রামে বা মফস্বলে এবং বড় হবার পর শহরে অভিবাসী হয়েছে।
১৯৯৬ সালে লেখা এই বইটির সাথে পরিচিত হবার যথেষ্ট সময়-সুযোগ বাঙলাদেশের নীতি-নির্ধারকদের ছিলো, তবে দেশটির রাষ্ট্রনীতি শিক্ষিত লোকদের কলমে নির্ধারিত হয়না। এ ভূমিকাগুলো পালন করতে যারা আসেন তারা চুরি এবং লুটেপুটে খাওয়াতে এত ব্যস্ত থাকেন, অন্যদিকে চোখ ফেরাবার অবসর তাঁদের হয় না। ফলস্বরূপ, কয়েক দশক আগে মূর্খ দেশগুলো যে ভুল করে আসে, বাঙলাদেশ সেই একই রাস্তায় একই জুতোর ছাপে পা ফেলে পৃথিবীর মানচিত্রে আরেকটি মূর্খ দেশ হিসেবে নাম লেখায়। একটি (মুসলিম) দেশের তরুণদের ভেতর এ ধরণের জঙ্গিবাদ তখনই ছড়ায় যখন দেশটির সরকার তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ এবং চরম উদাসী হয়; জাগতিক চাহিদাগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়ে হতাশ তরুণরা আশ্রয় খোঁজে ধর্মের মাঝে। অতীতে এবং বর্তমানে যে দেশগুলোতে ইসলামী জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তার প্রতিটিতেই সরকারের ক্ষমতার বৈধতা এবং দেশ শাসনের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। ইসলামী খিলাফতে বিশ্বাসীরা মুসলমান বিশ্বে প্রচলিত 'দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ' হাদীসটিকে জাল বলে অভিহিত করেন, কারণ, খিলাফতের সাথে দেশপ্রেমের ধারণাটি সাংঘর্ষিক। এভাবেই একইসাথে মানব-রচিত আইন বা 'তাগূতী মতবাদের প্রতি ঘৃণা, অসৎ সরকারের প্রতি ক্ষোভ, জীবনের হতাশা এবং পরকালের প্রতিশ্রুতি-এই সবগুলো উপাদান এক একটি সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিয়ে তৈরী করে এক একটি অনুভূতিহীন জঙ্গি যন্ত্র।
স্যামুয়েল পি হান্টিংটন তাঁর এ বইয়ে ঘৃণা ছড়াননি, বাস্তবতার একটি ছবি শুধু এঁকেছেন। পৃথিবীর কোন সভ্যতাই এক�� অপরকে সহ্য করতে পারেনা। টিভিতে হিন্দী অনুষ্ঠানের জোয়ারে আপনি যেমন বিরক্ত হন, আমেরিকায় জাপানী গাড়ীর আধিক্যে আমেরিকানরাও শঙ্কিত হয়। নিজের ভাষা, পরিচয়, সংস্কৃতি ইত্যাদিকে কেউই ছোট হতে দেখতে চায় না। পশ্চিম বহু বছর ধরে একক শক্তি হিসেবে পৃথিবীর ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে যাচ্ছে এটি বহু সভ্যতার জন্যই শীরঃপীড়ার বিষয়। পশ্চিমকে টেনে ফেলে দেবার ইঁদুর দৌড়ে চীন অন্য আর বাকী সবার চেয়ে এগিয়ে আছে প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে। পশ্চিমের প্রতি ঘৃণাটা চীন আর মুসলিম বিশ্বের প্রায় একই পর্যায়ের, যদিও কারণগুলো ভিন্ন। শত্রুর শত্রু বন্ধু, এই নীতিতে চলে চীনের সাথে মুসলিম বিশ্ব একাট্টা হয়ে পশ্চিমের বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগবে এই ভবিষৎবাণী হান্টিংটন করে গেছেন যার বাস্তব প্রয়োগ আজ আমাদের চারপাশেই দেখি। গেলো বছরের অক্টোবরে সৌদী আরব চীনের সাথে ২৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন করে। পাকিস্তানে চীনের সমালোচনা কার্যত ট্যাবু, মালয়েশিয়ার সাথে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য... এমনকী চীন যে তার নিজের দেশের উইঘুর মুসলমানদের নিপীড়ন করে চলেছে, জাতিসংঘে সে ব্যাপারটি উত্থাপিত হলে যে ৩৭টি দেশ চীনের সমর্থনে এগিয়ে আসে, তাদের অর্ধেকই মুসলিম দেশ। এ দেশগুলোর কয়েকটিই মুসলমানদের কাছে ইসলামী বিশ্বের নেতা-স্বরূপ (ইরান, সৌদী-আরব, তুরস্ক, মিশর, পাকিস্তান, কাতার, সিরিয়া, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান)। চীনকে সমর্থনকারী ইসলামী দেশগুলোর প্রতিটিরই অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য জাগতিক প্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে চীনের কাছে। আখিরাত বা পরকালের প্রাপ্তির যে বিষয়টি মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে বড় পুরষ্কার, যা পৃথিবীর সমস্ত মুসলমানকে এক চাদরের নিচে নিয়ে আসার কথা বলে, পার্থিব লোভেই মুসলমান দেশগুলোর গনেশ উল্টে যাচ্ছে দেখা যায়।
হান্টিংটন তাঁর বইয়ে পশ্চিমকে সতর্ক হতে বলেছেন চীন ও মুসলিম বিশ্বের ঐক্য বাহিনীর বিরুদ্ধে। হান্টিংটন নিজে পশ্চিমা, আমেরিকান। তিনি তাঁর দেশের, তাঁর সভ্যতার রক্ষায় তাঁর দেশকে অস্ত্র এবং সামরিক শক্তি বাড়াতে বলবেন সেটাই স্বাভাবিক। হান্টিংটন তাঁর জীবদ্দশায়ই তাঁর ভবিষ্যৎবানী ফলতে দেখেছেন, ২০০১ সালের টুইন টাওয়ার হামলা এবং পরবর্তী ইরাক-যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। হান্টিংটনকে বর্ণবিদ্ধেষী, যুদ্ধবাদী ইত্যাদি বলে গালমন্দ করে মুসলমানরা সাময়িকভাবে নিজেদের স্বান্তনা দিতে পারেন, কিন্তু তাতে নিজেদের পিছিয়ে পড়ার ধস ঠেকানো যাবেনা। মুসলমানরা যদ্দিন পর্যন্ত নিজেদের ধর্মের উগ্রবাদী বিষয়গুলো আমলে না আনছেন, এবং সংস্কারের প্রয়োজন অনুভব না করছেন, তদ্দিন পর্যন্ত তাঁরা বিশ্বের কাছে খলনায়ক হয়েই থাকবেন। হান্টিংটন নিজেই বলেছেন, বিশ্বের মোড়ল হয়ে ওঠার পেছনে পশ্চিম যত না উন্নত বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির সহায়তা পেয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশী ভূমিকা রেখেছে পশ্চিমের সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ বা জুলুম করবার ক্ষমতা। এতদস্বত্ত্বেও, মানবিকতার মূল্যটা এ মূহুর্তে আর সব অঞ্চলের চেয়ে পশ্চিম-ই সবচেয়ে বেশী দেয়। মুসলমান দেশগুলোর নিজেদের ভেতরই ঐক্যের ভীষণ অভাব আছে, দ্বিমত আছে কে বেশী মুসলমান তা নিয়ে। যে ৫০টির মতো মুসলমান দেশ রয়েছে পৃথিবীতে, সেগুলোতে ৭০-এর ওপর 'ফেরকা' বা ইসলামী আদর্শের ব্যখ্যা রয়েছে, যার কোনটির সাথেই কোনটির মিল নেই, এবং প্রতিটি মতবাদের অনুসারীরা অপরদের ভ্রান্ত বলে রায় দিয়ে চলেছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায়ও তাঁদেরই আজ সবচেয়ে করুণ দশা। এখন পর্যন্ত যে একমাত্র মুসলমান বিজ্ঞানী পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন, সেই আব্দুস সালাম আহমাদী মুসলমান বলে পাকিস্তানের মুসলমান সমাজ তাঁর মুসলিম পরিচয়টিকে অস্বীকার করেছে। তাঁর কবরের ফলকে লেখা ছিলো 'In 1979 became the first Muslim Nobel Laureate', সেখানে 'Muslim' কথাটি মুছে দেয়া হয়েছে, ফলকটি আজও 'In 1979 became first Nobel Laureate'-এই অর্থহীন বাক্যটি বহন করে চলেছে। সম্মিলিত উদ্দেশ্যে একজোট হয়ে পৃথিবী শাসন মুসলমানদের কম্মো নয়। তাঁরা যাদের কাঁধে চেপে পশ্চিমকে হঠাতে চাইছেন, সেই চীন কিংবা উত্তর কোরিয়া আমেরিকার জায়গায় এলে পৃথিবী আদৌ কতটা বাসযোগ্য থাকবে সেটি ভেবে দেখতে পারেন।