দীর্ঘ চৌদ্দ বছর পর জেল থেকে ফিরে এসে ফয়সাল দেখলো তার চেনা পৃথিবীটা কেমন যেন বদলে গেছে। পৃথিবী নামক রঙ্গমঞ্চে তার নিজেকে মনে হতে লাগলো অনাহূত এক দর্শক। তার গ্রামকে এখন চেনা যায় না, চিঠির জায়গা নিয়ে ফেলেছে ম্যাসেঞ্জার, প্রেম হয়ে গেছে সময় কাটানোর ও লোক দেখানোর অনুষঙ্গ, সামাজিক ঐক্য হয়ে গিয়েছে বিনষ্ট, মানুষ হারিয়ে ফেলেছে তার সরলতা, জীবন হয়ে গিয়েছে ভীষণ ভোগবাদী। কিন্তু চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ এক 'ঘুমের' পর ফয়সাল কিভাবে নেবে এই পরিবর্তনকে? সে কি পারবে নিজেকে মানিয়ে নিতে?
লেখকের প্রথম বই পড়লাম। এবং বেশ মুগ্ধই হলাম বলা চলে। ' চোখ দুটো বন্ধ করে, মনটাকে স্থবির করে, মুহূর্তেই তিনি দীর্ঘ এক ঘুম থেকে জেগে উঠে চেনা পৃথিবীকে অচেনারূপে' যেভাবে তিনি তুলে ধরেছেন তা সত্যিই অনবদ্য। আমি তো নব্বইয়ের দশকের একদম শেষ সময়ের মানুষ, যাঁরা আরেকটু আগে পৃথিবীতে এসেছেন তাঁরা বইটার সাথে আরও ভালোভাবে নিজেদেরকে একীভূত করতে পারবেন। তারপরেও আমি গ্রামের নগর হয়ে ওঠা, সম্পর্ক নিয়ে মানুষের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন, প্রকৃতির প্রযুক্তির কাছে নতজানু হওয়া, নতুন নতুন ধর্মীয় চিন্তার আগমনে সামাজিক ঐক্য নষ্ট হওয়া ইত্যাদিকে বেশ ভালোভাবেই ধরতে পেরেছি। লেখক নিপুণভাবে এক যুগের ব্যবধানে সমাজের পরিবর্তন দেখিয়েছেন। এবং যেটা না বললেই নয়, তা হলো এই পরিবর্তনটা বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামীণ সমাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ফলে ছুটিপুরের গল্প আর কেবল ছুটিপুরের থাকেনি, আকস্মিক পরিবর্তন দেখে হোঁচট খাওয়া মানুষও কেবল ফয়সালই নয়।
লেখকের লেখনীও বেশ ভালো লেগেছে। কিছু কিছু উপমা ও রূপক তো খুবই ভালো লেগেছে এবং মনে হয়েছে আগে কখনও পড়িনি। যেমন এক জায়গায় লেখক মৃদুস্বরে কথা বলাকে দিনের নামাজে ( যোহর/আসর) ইমামের কেরাত পড়ার সাথে মিলিয়েছেন। আর আরেকটা বিষয় না বললেই নয়, সেটা হলো আহলে হাদিস গোষ্ঠীর আবির্ভাব ও দীর্ঘদিন ধরে চলা আসা হানাফি মাজহাবের মধ্যে দ্বন্দ্বের যে বিষয়টা লেখক তুলে এনেছেন তাও অনন্য। এই বিষয়টা আগে কোনো বইয়ে পেয়েছি বলে মনে হয় না। বইয়ের নামটাও বিষয়বস্তুর সাথে একদম মানানসই হয়েছে। ' ভাঙনের দিন ' ঠিকই তো, ফয়সালের চেনা দুনিয়াটা কিভাবে একটু একটু করে ভেঙ্গে পড়েছে তারই তো আখ্যান এই বইটা।
ভাঙনের দিন বইটাকে মোটাদাগে অনেক কিছুই বলা যায়। স্মৃতিকাতরতা, প্রযুক্তির কাছে নীরব সামাজিক অবক্ষয় কিংবা ক্রমবর্ধমান সময়ের স্রোতে মানুষের পরিবর্তন।
গল্পটা ফয়সালকে নিয়ে। চৌদ্দ বছর জেল খাটার পর সদ্য ছাড়া পেয়েছে ফয়সাল। বের হয়েই ছুটে এসেছে নাড়ির টানে ছুটিপুরে। তবে এসেই পড়েছে বিপাকে। কাউকে সে চিনতে পারছে না। গত চৌদ্দ বছরে সবকিছুর এতোটাই পরিবর্তন যে তার কোন কিছুই ঠাওর করতে হিমশিম খেয়ে যায় বেচারা। তার জমানায় লোকে নিজেদের সাথে গল্প করতো, এখন ঘাড় বাঁকিয়ে নিজের ফোন গুঁতো তেই ব্যস্ত সবাই। ভালোবাসার পবিত্রতাটুকুও যেন মিইয়ে গেছে কেমন করে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় সমাজ কেমন যেন বদলে গেছে। মানুষে মানুষে তৈরি হয়েছে দুর্ভেদ্য দেয়াল। এত সব কিছুর মাঝে ফয়সালের দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। তার মস্তিষ্কটা যে পড়ে আছে সেই চৌদ্দ বছর আগের কোন এক সময়ে। সেখান থেকে বেরুতে পারেনি বেচারা।
গল্পের শুরুটা ফয়সালের জেল মুক্তি থেকেই। এরপর ছুটিপুর আসতে আসতেই স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে কাহিনি এগুতে থাকে। প্রথমদিকে একটু বিরক্তই লাগছিল বারবার স্মৃতিচারণায়। বুঝতে পারলাম কাহিনি এভাবেই এগিয়ে যাবে। তাই পড়ে যেতে থাকি। একটার পর একটা দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসে সেই সাথে চৌদ্দ বছর আগের আর পরের সমান্তরাল আর অসমান চিহ্ন চোখে ভেসে ওঠে আমাদের। এ যাত্রায় আমাদের দেখা মিলে ইমাম সাহেবের মত ভালো মানুষ, তেমনি ইবরাহীম খাঁ এর মতো ধূর্ত অথচ নাতীর প্রতি প্রবল ভালবাসাবোধের এক মানুষের। আবার কাদেয়ানি থেকে শুরু করে আহলে হাদিসদের সাথে হানাফিদের তথা মুসলমানদের নিজেদের ভেতরকার দ্বন্দ্ব বেশ ভালোরকমের ফোকাস পেয়েছে। এসব কিছুকে ছাপিয়ে ফুটে উঠেছে ফয়সালের চৌদ্দ বছর পিছিয়ে থেকে বর্তমানের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার নীরব যুদ্ধ। যাতে শেষমেশ হেরেই যায় বেচারা।
সাব্বির জাদিদের লেখা সুন্দর। বেশ আবেগঘন তার লেখায় যত্নের চিহ্ন স্পষ্ট। কিছুটা প্লটহোল মনে হলেও অনায়াসে পড়ে যাওয়া যায়।
সভ্যতার প্রয়োজনেই সমাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়। তবে কিছু মানুষ যারা এই প্রতিযোগিতায় সামান্য পিছিয়ে পড়ে তাদের পদদলিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। ফয়সাল সেই পদদলিতের একজন। সহায় সম্বলহীন এক মানুষ যার আপন বলতে যেই স্মৃতিগুলো ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
অনলাইনের কল্যাণে লেখক 'সাব্বির জাদিদ' বহুদিনের পরিচিত হলেও তার বই পড়ছি এই প্রথম। 'ভাঙনের দিন' উপন্যাসটি পড়ার মাধ্যমেই কালো হরফের আঁকিবুকিতে তার একান্ত সৃজনশীল সৃষ্টির জগতে প্রবেশ করলাম। সত্যি বলতে 'ভাঙনের দিন' আমাকে আশাহত করেনি। যদিও আমার প্রত্যাশার গণ্ডি যথেষ্ট সীমাবদ্ধতার আকরে আবদ্ধ ছিলো।
লেখক ১১১ পৃষ্ঠার কলেবরে ফয়সাল নামক একজন যুবকের বিচিত্র জীবন অঙ্কন করেছেন; পরকীয়ায় আসক্ত জননীকে হত্যার দায়ে যাকে দীর্ঘ চোদ্দ বছর কারাবাস করতে হয়। ফয়সালের শৈশব-কৈশর ও দীর্ঘ চোদ্দ বছরে পরিবর্তিত হওয়া জন্মভূমি ছুটিপুরের হাল-হাক্বিকতের বর্ণনাই 'ভাঙনের দিন' উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তু। প্রেম-ভালোবাসা, নিষিদ্ধ আকর্ষণ, বিচ্ছেদ, গ্রামের সাদামাটা দিন-রাত, সামাজিক রীতির ব্যত্যয় ও তার পরিণতি, ধর্মের গোঁড়ামি নিয়ে পারস্পরিক রেষারেষি সহ আরো নানান দিক সম্পর্কিত বহুবিধ সুখকর ও দুখকর ঘটনাবলির সাবলীল সমন্বয় গোটা বইয়ে স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে উপন্যাসটির পরিসমাপ্তি ঘটেছে অনিশ্চিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত যাত্রায়; অনেকটা ছোটগল্পের মতন।
'ভাঙনের দিন' উপন্যাসটির প্রতিটি ঘটনাই আমাদের জীবনের সাথে কোনো না কোনো ভাবে সংশ্লিষ্ট। সেজন্য উপন্যাসটি পড়ে হয়তো বিস্ময়ে বিস্মিত হবেন না তবে জীবনঘনিষ্ঠ চিরায়ত ঘটনাগুলির সহজ বর্ণনা পড়ে সহজেই অভিভূত হবেন। বলতে হয়—উপন্যাসটির বেশ কয়েক স্থানে লেখকের শব্দ প্রয়োগে আরেকটু সচেতন হওয়া উচিৎ ছিলো। তেমনটা হলে হয়তো ভাবপ্রকাশের পুরোটা বিব্রতবোধ ব্যতিরেকেই শেষ করা সম্ভব হতো। সর্বোপরি, ছোট-খাটো এইসব ভুলচুক বাদে 'ভাঙনের দিন' যথেষ্ট উপভোগ্য। নির্দ্বিধায় পড়তে পারেন।