"সঞ্চয়িতা" - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিশ্বভারতী গ্ৰন্থন বিভাগ
মুদ্রিত মূল্য ₹১৬২ (১৯৯৩)
আমি ঠাকুর বলতে একজনকে চিনি, তিনি রবি ঠাকুর।
এই বইটি নিয়ে পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। কবিগুরুর সাথে পরিচয় আমার এই বইটি দিয়ে। প্রতিটি কবিতা এক একটি উপন্যাসের মতো। বিশ্বকবির কবিতাগুলি যেন বাঙালি সমাজের প্রতিটি মানুষের চলার পথে পাথেয়। তিনি আমাদের সব অনুভূতি লিপিবদ্ধ করে গেছেন তার কবিতাগুলিতে। কবিগুরুর কবিতা ও গান আমার দুঃসময়ের আশ্রয়।
✓হঠাৎ-দেখা
রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা,
ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন।
আগে ওকে বারবার দেখেছি
লাল রঙের শাড়িতে
দালিম-ফুলের মতো রাঙা;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,
আঁচল তুলেছে মাথায়
দোলন-চাঁপার মতো চিকন-গৌর মুখখানি ঘিরে।
মনে হল কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে,
যে দূরত্ব শর্ষেখেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে।
থম্কে গেল আমার সমস্ত মনটা,
চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে।
হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে
আমাকে করলে নমস্কার।
সমাজবিধির পথ গেল খুলে;
আলাপ করলেম শুরু—
‘কেমন আছি, কেমন চলছে সংসার’
ইত্যাদি
সে রইল জানলার বাইরের দিকে চেয়ে
যেন কাছের-দিনের-ছোঁয়াচ-পার-হওয়া চাহনিতে।
দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো-একটা জবাব,
কোনোটা বা দিলেই না।
বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায়—
কেন এ-সব কথা,
এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ ক’রে থাকা।
আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে
ওর সাথিদের সঙ্গে।
এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে।
মনে হল, কম সাহস নয়;
বসলুম ওর এক-বেঞ্চিতে।
গাড়ির আওয়াজের আড়ালে
বললে মৃদুস্বরে,
‘কিছু মনে কোরো না,
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার?
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই;
দূরে যাবে তুমি,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই।
তাই, যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে,
শুনব তোমার মুখে।
সত্য করে বলবে তো?’
আমি বললেম, ‘বলব।’
বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল,
‘আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে,
কিছুই কি নেই বাকি?’
একটুকু রইলেম চুপ করে;
তার পর বললেম,
‘রাতের সব তারাই আছে
দিনের আলোর গভীরে।’
খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম নাকি।
ও বললে, ‘থাক্, এখন যাও ও দিকে।’
সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে।
আমি চললেম একা।
✓পরশমণি
আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে,
এ জীবন পুণ্য করো দহন-দানে।
আমার এই দেহখানি তুলে ধরো,
তোমার ওই দেবালয়ের প্রদীপ করো—
নিশিদিন আলোক-শিখা জ্বলুক গানে।
আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।
আঁধারের গায়ে গায়ে পরশ তব
সারা রাত ফোটাক তারা নব নব।
নয়নের দৃষ্টি হতে ঘুচবে কালো,
যেখানে পড়বে সেথায় দেখবে আলো—
ব্যথা মোর উঠবে জ্বলে ঊর্ধ্ব-পানে।
আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে।