Many years after Baudelaire's aborted voyage to Calcutta, a child was born in a bylane of the city's suburb. He adopted a stray puppy and was himself adopted into a continent of words and images. One day, at a bend in the lane of his seedy, violence-torn neighbourhood, he discovered Garcia Marquez's Macondo. The magical journey has continued ever since: from cheap street fiction to Soviet-era literature, from the murky urban imagery of Jibananda Das's poetry to the cinema of Ingmar Bergman, it has taken him to a landscape that dreams up its own author, where a girl still waits amid the detritus of a lost civilization for the poet who had abandoned her. Genre-bending, and written in Parimal Bhattacharya's inimitable prose, Nahumer Gram O Onyanyo Museum celebrates artistic imagination in the teeth of dark times.
পরিমল ভট্টাচার্য বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। স্মৃতিকথা, ভ্রমণ আখ্যান, ইতিহাস ও অন্যান্য রচনাশৈলী থেকে উপাদান নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক নতুন বিশিষ্ট গদ্যধারা, নিয়মগিরির সংগ্রামী জনজাতি থেকে তারকোভস্কির স্বপ্ন পর্যন্ত যার বিষয়-বিস্তার। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। কলকাতায় থাকেন।
'স-ম-রে-শ ব-সু। এই লোকটা কে ছিল রে?' পাশের জনকে কনুইয়ের গাঁ মেরে জিজ্ঞেস করে যুবক।
ওপাশ থেকে মুরুব্বি গোছের ছেলেটি চোলাইয়ের পাত্র উপুড় করে শেষ চুমুক দিয়ে কবজি ঘুরিয়ে কষ মুছে নিয়ে বলল:
'আরে বাঁ। তুই সমরেশ বোসের নাম শুনিসনি? হেব্বি চেকনাইদার আদম ছিল। হেব্বি বোলবোলা ছিল এককালে।'
'কী করত?'
'আরে রাইটার ছিল, রাইটার।'
'দলিল লেখক?' পাশ থেকে একজন শুধোয়। 'আমডাঙার সুকেশ হালদারের মতো? 'ধুসস্।ওসব সুকেশ মুকেশ কিসসু না। এ ছিল আসলি রাইটার। বই লিখত, বই যা মাল খেত না। আর মেয়েছেলে পটাতেও ওস্তাদ ছিল। একপাশে মালের বোতল আরেক পাশে কচি মেয়েছেলে নিয়ে লিখতে বসত। উফফ্। কলম ফাটিয়ে লিখত মাইরি।
এক জনপদ, লেখক যেখানে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন, মৃত্যুর বহু বছর পরও যেখানে তাকে নিয়ে চালু থাকে বহু গালগল্প, হাঁটি হাঁটি পা করে যে জনপদ যেয়ে মেশে মাকোন্দোয়, - তাদের স্মৃতি আর অলৌকিক ভ্রমণের গল্প "নাহুমের গ্রাম ও অন্যান্য মিউজিয়াম। " জাদুঘরে যেমন সযত্নে থরে বিথরে সাজানো থাকে ঐতিহাসিক প্রত্নবস্তু, যার সামনে গেলে অতীত সময় তার রূপ-রস-গন্ধসহ জেগে ওঠে, পরিমল ভট্টাচার্য তেমন সৃষ্টির আদি থেকে স্মৃতির প্রত্নসন্ধান করেছেন লুপ্ত নাহুমের গ্রাম, অপমৃত লাইকার ব্যথিত চোখের বিস্ময় ও সাহিত্যিক-চলচ্চিত্রকারদের হাত ধরে। সমরেশ বসু, বোদলেয়ার,মার্কেজ, বার্গম্যান, তারকোভস্কি লেখকের কলমে হাজির হন একে একে। ইতিহাস আমাদের সামনে হাজির করে বৈষয়িক সত্য, অন্যদিকে পুরাণ উপস্থিত হয় মানবমনের গূঢ় জিজ্ঞাসা, অনুসন্ধিৎসা, অবদমিত ইচ্ছার প্রতীক হিসেবে। আর এসব প্রতীক লেখক-চলচ্চিত্রকাররাই ধরে রাখেন সবচেয়ে বেশি, সংরক্ষণ করে রাখেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। পরিমল ভট্টাচার্যের পৃথিবীতে তারকোভস্কি লিখে ফেলতে পারেন পথের পাঁচালী, ইতিহাস ও পুরাণ যেখানে একই মুদ্রার এপিঠ - ওপিঠ। পড়তে যেয়ে মনে হতে পারে, পরিমল আসলে দীর্ঘ এক কবিতা রচনা করে চলেছেন, বেরিয়েছেন এক রহস্যময় যাত্রায়, যেখানে অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ একইসাথে চলমান, যেখানে আমরা একক সত্তা নই, যেখানে আমরা-আমাদের অস্তিত্ব ছড়িয়ে আছে এ মহাবিশ্বের সবখানে।
সারমেয় আর মানবসম্পর্ক সূচনার আশ্চর্য আখ্যান দিয়ে শুরু হওয়া বইটির অধ্যায়গুলোতে মিলেমিশে রয়েছে লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতি আর ভাবনার সাথে তাঁর নিজস্ব স্টাইলে একেকজন কালজয়ীকে দেখার বর্ণনা। সেই ছোট্টবেলায় রুশ পরিকথার জগতে বিচরণ আরম্ভ হয়েছিল এক সার্কাসের মাধ্যমে যেখানে ভুক বলে একটি শিশু সারমেয়র স্মৃতি রয়েছে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে। পরবর্তীতে রুশ সার্কাসের সিংহের খানা হওয়া ভুক আর আকাশচারী লাইকার বিস্ফোরণে ঝলসানো দেহের নিষ্ঠুর গল্পে রুশদের প্রতি লেখকের শিশুমনে সৃষ্ট ঘৃণা আর ভয়কে ভাঙিয়ে দিল চুক আর গেক থেকে শুরু করে তাবৎ রাশিয়ান সাহিত্য আর চলচ্চিত্র। এরপর শুরু এক ভিন্ন জগতে পদচারণা, যে জগতে স্থায়ী আসন গেড়ে বসেন নৈহাটির সমরেশ বসু, যাঁকে নিয়ে শ্মশানের অতি সাধারণ ছোকরা থেকে আলোচনা করে দামী ক্যাফের ছেলেপেলেরাও। বামপন্থী থেকে স্বধর্ম হারানো বিতর্কিত অথচ অদ্ভুত প্রতিভাবান সমরেশ বসু জীবনের আসল লেখা 'দেখি নাই ফিরে' শেষ করে যেতে পারেন নি। মার্কেজের নিঃসঙ্গতার একশ বছরের জনপ্রিয়তা তাঁর গলায় ফাঁস হয়ে বসেছিল অ্যানসিয়েন্ট ম্যারিনারের সেই মৃত আলবাট্রস পাখির মতো! ৫০ এর ও বেশি ভাষায় অনূদিত নিঃসঙ্গতার একশ বছর কীভাবে লাতিন আমেরিকার কলম থেকে প্রায় সব কোণের মানুষের ব্যক্তিগত জীবন হয়ে উঠল তা লেখকের পাশাপাশি স্বস্তিময় বিস্ময় জাগায় পাঠক চেতনাতেও। স্বস্তি একারণে যে এমন তো হওয়ারই ছিল, হওয়াই উচিত। আসেন বার্গম্যান, তারকভস্কি। বার্গম্যান তাঁর সৃষ্টিতে জন্ম-মৃত্যু নিয়ে সব প্রশ্নোত্তর খেলেন, তো তারকভস্কির ঘরবাড়ি হয়ে ওঠে তাবৎ দর্শকদের শৈশব। আশ্চর্য, কোন গোপন মন্ত্রে এরা অনুরাগী কিংবা অনুরাগী নয় এমন বিদগ্ধজনের মনের কথা জানতে পেরে যেতেন? তারকভস্কি পথের পাঁচালী যদি করতেন কেমন হতো সেটা? অপুকে কীভাবে চিত্রায়িত করতেন তিনি? লীলাকে কি আনতেন না বাদ যেত সে আবারও? কে জানে৷ কল্পনা ছাড়া আর কী উপায়ই বা আছে এখানে। পরিমল ভট্টাচার্য এর আশ্চর্য স্বাদু ভাষার সাথে শাংগ্রিলার খোঁজে থেকে পরিচয় হওয়ার পর তাঁর বইগুলো সংগ্রহের অভিযানে নামাটা বিফলে যায় নি। স্বতন্ত্র স্টাইল আর বিস্ময়কর শব্দচয়নে তাঁর লেখা নন-ফিকশনগুলো একেকটা কবিতা হয়ে ওঠে। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য চমকে দেয়৷ 'এ রকম মিউজিয়াম তো আমাদের সকলের মধ্যেই একটি করে আছে-অন্তত থাকার তো কথা। সকলে টের পায় না, কেউ কেউ পায়।' নাহুমের গ্রাম ও অন্যান্য মিউজিয়াম সম্পর্কে বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে অজয় গুপ্তের এই উক্তিটি তাই ভীষণরকম খাঁটি।
এ বছর মনে হয়না ঠিক এরকম কোন বই আর পড়া হবে। মনে হয় না আবার কি? হবে না নিশ্চিত। আর কি আছে এই রকম কোন বই!
এ এক অন্যরকম মিউজিয়াম! আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলে আসা জীবনে! ছুঁয়ে আসা জীবনে! হারিয়ে ফেলা জীবনে, যে জীবন কখনো স্পর্শ করা হয়নি। হবে না কোনওদিন।
প্রথম চ্যাপ্টার মাতাল অ্যাম্ফোরা হলেও আমি শুরু করি "একজন লেখকের সন্ধানে একটি জনপদ" চ্যাপ্টারটা দিয়ে। কবিতার বই যেভাবে পড়ি আরকি।
দেখি এক স্মৃতির জনপদ কিভাবে রচনা করেন একজন লেখককে! সেই লেখক সমরেশ বসু। খেয়াল করে দেখলাম সমরেশ বসুর কোনও লেখাই পড়া হয়নি এখনও। মন ভারী করে আমি সন্ধান করতে থাকি সমরেশ বসুর লেখার। না পড়লে যেন জীবন বৃথা। এই যে আমার এই প্রবল অনুভূতি, সেটাকে জাগিয়ে তোলার অসীম শক্তিই তো আছে ওনার। কার আবার? পরিমল ভট্টাচার্যের।
এক স্নিগ্ধ, মায়াময়, স্মৃতিময়, মোহময়, আর কাব্যিক লেখনি নিবিষ্ট করে রাখে আমাকে। সার্বক্ষণিক বইটি ব্যাগে নিয়ে ঘোরা ছাড়া উপায় নেই যেন! এরপর ভুক নামের সেই কুকুরছানার গল্প! আহা ভূক। আহা লাইকা! তারপর এল রাশিয়ার চিঠি। আমাদের চিরচেনা রাদুগা প্রগতি। কি নেই সেই লেখায়! নাহুমের গ্রাম, আন্দ্রেই তারাকোভস্কির অপু, আমার তারা, বার্গম্যান আর সবশেষে পড়া হারিয়ে যাওয়া সেই দেশ। কোন দেশ? বহুদূরের কোনও দেশ বুঝি? নাহ! সেই দেশ থাকে নিজের অন্তস্তলে। থাকে বুঝি? ছিল কোনও এক সময়। কেবল স্মৃতির হাতছানি দেয়। সেই দেশ, যে দেশকে আমরা রেখে দেই বইয়ের তাকে। আর সেই দেশের মানুষ বিভিন্ন চরিত্র হয়ে ভর করে থাকে আমাদের মননে, মস্তিষ্কে। রাসকোলনিকভ, সামসা কিংবা রেমেদিউসের মত ।
তবে, সবচেয়ে বেশী মোহবিষ্ট করেছে একশো মলাটের নি:সঙ্গতা! গাবো যাদের প্রিয় তারা আমারও প্রিয়। গাবোকে নিয়ে, আমার প্রিয় উপন্যাসকে নিয়ে এমন লেখনি এই জন্মে আর দ্বিতীয়টি পড়া হবে কিনা সন্দিহান আমি। পড়ার সময় মনে হচ্ছিল ধরার সকল মার্কেসপ্রেমীদের ফটোকপি করে পাঠাই এই চ্যাপ্টারটি। প্রিয় কবিতার মত ঠোটস্থ করি। চলতে ফিরতে আওড়াতে থাকি। আওড়াতেই থাকি। বহু বছর পর কত কত কতকিছুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মনে পড়ে যাবে কোন একটা সময় এসেছিল যখন প্রবল ঘোর লাগা মার্কেসের নি:সঙ্গতার একশো বছর নিয়ে একটি লেখা দিয়ে আবারও ঘোরের মধ্যে নিয়ে গিয়েছিলেন পরিমল ভট্টাচার্য নামের এক জাদুকর। যে বই পড়ে মার্কেসের মাই পারসোনাল হেমিংওয়ের মত আমার কেবলই বলতে ইচ্ছে করছিল- ওহ! দিস ইজ মাই পারসোনাল পরিমল।
বইটা যখন আমার হাতে এলো তার মাত্র কয়েকদিন আগেই নেটফ্লিক্সের One Hundred Years of Solitude সিরিজটা দেখে শেষ করলাম, বইটা পড়া হয়েছে আরো আগে। মার্কেজ তার নিঃসঙ্গতার গল্পে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে দিয়ে 'মাকোন্দো' নামের নতুন এক বসতি স্থাপন করিয়েছিলেন। বিশ্বব্যাপী অগণিত মানুষের 'ব্যক্তিগত আত্মজীবনী' হয়ে ওঠা মার্কেজের জাদুবাস্তবতার আখড়া এই মাকোন্দো।
মাকোন্দোর ২০ টা পরিবার, ২০ টা ঘর এমনভাবে সাজানো যাতে সবাই সমান দূরত্ব পেরিয়ে নদীতে যেতে পারে, সমান সূর্যের আলো পড়ে সব ঘরে সবসময়, সব ঋতুতে। পরিমল ভট্টাচার্য মাকোন্দো'র মতো একটা মিউজিয়াম সাজিয়েছেন, সেখানে স্থান পেয়েছেন সমরেশ বসু, বার্গম্যান, তারকোভস্কি, মার্কেজ এবং আরো অনেকে। হোসে আর্কাদিও অদ্ভুত উপায়ে মাকান্দো'র সব পরিবারের ওপর সমান সূর্যের আলো ফেলার যে ব্যবস্থা করেছিলেন, তেমনটা করেছেন পরিমল ভট্টাচার্যও।
নাহুমের গ্রামকে কেন্দ্র করে বাকিরা এ মিউজিয়ামে ঘুরপাক খাচ্ছে না, বরং তারা সবাই আছে নিজস্ব মহিমায়, সমান গুরুত্ব নিয়ে। সমরেশ বসু তার অনুসন্ধানী নজরের জন্য যতটা মনোযোগ পেয়েছেন বার্গম্যানকে লেখা লেখকের অলীক চিঠিটাও ততটা যত্নের, যদিও সে চিঠি কখনো পৌছাবে না গন্তব্যে। জুবফস্কি বুলভার থেকে অজ্ঞাত প্রেরকের প্রয়াত কমরেডকে ফি-বছর পাঠানো বইয়ের পার্সেলটাও গুরুত্বপূর্ণ। এ মিউজিয়ামের সবগুলো গল্প এক করে বকুল ফুলের মালা গাঁথা যায়। যার সুতো ধরে রেলগাড়ীর মতো টেনে নেওয়া যায়, আবার একটা একটা করে ফুল খুলে ডিঙি নৌকার মতো ভেসে বেড়ানোও যায়।
"একশো মলাটের নিঃসঙ্গতা" শিরোনামে লেখা প্রবন্ধের মাঝে উঠে এসেছে মার্কেজের গ্যাবো হয়ে ওঠার গল্প, ল্যাতিন দেশের অখ্যাত এক সাংবাদিকের কলম থেকে সৃষ্ট ভূমিকম্পের গল্প। One Hundred Years of Solitude এর ৩২ টা ভিন্ন প্রচ্ছদ বইয়ে ঝুলিয়েছেন পরিমল ভট্টাচার্য। সবকটা প্রচ্ছদ যেন ভিন্ন ভিন্ন সময়ের নিঃসঙ্গতার গল্প বলে যায়। আলাদা কোনো প্রদর্শনী হতে পারে এগুলো, যেমনটা হতে পারে সমরেশ বসুর জীবন নিয়েও। শ্মশানঘাটের মড়া পোড়ার ছাই আর ধোয়া সাদা দেয়ালের যে অংশটা বারবার ঢেকে দেয়, সেখান থেকে সমরেশ বসুকে তুলে এনে এ মিউজিয়ামে রাখা জরুরি বৈকি।
খুব কম বই আছে যেগুলো পড়তে গিয়ে মাঝপথেই মনে হয় ''আবার পড়তে হবে এ বই''। এ বই আবার পড়তে হবে, নাহুমের গ্রামে আবার ঢুঁ মারতে হবে, দেখতে হবে সারি সারি ঝোলানো শতবর্ষের নিঃসঙ্গতার ছবি, অপুর দেশের ছবি, হাজার বছর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা অ্যাম্ফোরার ছবি।
বইয়ের শেষে অজয় গুপ্তের একটা কথা আছে, "এরকম মিউজিয়াম তো আমাদের সকলের মধ্যেই একটি করে আছে, অন্তত থাকার তো কথা। সকলে টের পায় না, কেই কেউ পায়।"
পরিমল ভট্টাচার্যের আরও রচনার মতোই এই বইয়ের ভরকেন্দ্র হলো স্মৃতিচারণ। কিন্তু পাঠক জানেন, ঠিক প্রচলিত আঙ্গিকে নয়, গবেষক-সুলভ একটা গন্ধ সর্বদাই ঘিরে থাকে লেখকের স্মৃতিচারণগুলো।
এই সংকলনে কখনো কোনো অবকাশ-যাপন কেন্দ্র, কখনো পোষা কুকুর, কখনো কোনো এলাকা, কখনো একটা বই, কখনো কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে স্মৃতি এবং কল্পনার জাবর কাটতে থাকেন লেখক—তারপর চলে যান আরও নানা প্রসঙ্গে। এক প্রবন্ধের সূত্র/চরিত্র ঢুকে পড়ে আরেক প্রবন্ধে, একই কল্পনাকে গাইতে গাইতে গোটা বইতে পুনরাবৃত্তি হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট ছন্দের।
নির্দিষ্ট এই বইটা ততটা যে ভালো লাগলো না, তার কারণ ওই পুনরাবৃত্তি নয়। মনে হলো, স্মৃতিচারণের ফাঁক গলে রচনার গবেষণা ভাবটা কিছুটা ক্ষয়ে গেছে, প্রবন্ধ-গুণও গেছে ছলকে। তার চমৎকার গদ্যও সেই খামতিটা পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। বার্গম্যান আর অপুকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ দুটোও পরিমলের পাঠকেরা আগেই পড়েছেন অনেকাংশে।
“…এ যদি হয় প্লাস্টিকের যুগ,তাহলে সে ছিল পোড়ামাটির যুগ।ভাগ্যিস তখন সেইকালে এত মানুষ ছিল না পৃথিবীতে, এত বিপনন ছিল না। না হলে আজ ভাসমান প্লাস্টিকের মহাদেশের মতো খোলামকুচির স্তুপের উপর দাঁড়িয়ে থাকতো আমাদের এই মহাদেশটা।’’
মাটির তৈরি অ্যাম্ফোরার শ্যামল ইতিহাস ছুঁয়ে লেখক প্রথমেই নামেন এক তরুণীর বয়ানে, যিনি খুঁজে ফেরেন জলমগ্ন সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ। সেখান থেকেই ফিরে তিনি তুলে আনেন মানুষের সঙ্গে সারমেয়ের প্রথম সখ্যের নরম আলো, আর তারই বিপরীতে দেখান আমাদের নিষ্ঠুর ব্যবহার—লাইকার নিঃসঙ্গ মৃত্যুর গল্পে, ভূকে’র শীতে কাঁপতে-কাঁপতে শেষ হয়ে যাওয়া ভাগ্যে।
সমরেশের গল্প অন্বেষার প্রসঙ্গে উঁকি দেয় এক অচেনা গ্রামের নিঃশব্দ পরিবেশ ও তার স্নিগ্ধ প্রতিবেশ। আবার কথার ভাঁজে ভাঁজে জেগে ওঠে নিঃসঙ্গতার মহারথী মার্কেজ ও তার সৃষ্টির ঝরনা, তার ভাষার ঘ্রাণ, একাকিত্বের মহাকাব্য। আর ফিল্মের ক্যানভাসে নীরবে উঠে আসে বার্গম্যানের আলো-অন্ধকারের গভীর নৃত্য।
এ সব মিলিয়ে লেখনী কখনো গল্প হয়ে ওঠে, কখনো ইতিহাসের দোলা; কখনো প্রবন্ধের স্নিগ্ধ বিশ্লেষণ, আবার কখনো স্মৃতিচারণের কুয়াশামাখা সকাল কিংবা কাব্যের ছন্দ । তাই আলাপ দীর্ঘ হলেও পাঠকের মন লেগে থাকে চমৎকার-বিস্ময়ঘোর বইয়ের পাতায়।
কিছু বই শেষ করার পর স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয়। মুখ থেকে কোনো কথা সরে না। নির্দিষ্ট কোনো ইমেজ ধরা দেয় না — কেবল বিমূর্ত, ঝাপসা, ক্ষয়াটে সব স্মৃতির আরকের কোলাজ মস্তিষ্কের বিস্মৃত ফসিল থেকে গুমরে উঠে আসতে চায় মহাপ্রলয় হয়ে; সমস্ত চেতনা উদ্ভাসিত করে দিতে চায় পরিযায়ী স্মৃতিগন্ধা মৌতাতে।
না-চাইতেও কালচক্রে আমরা সবাই হয়ে উঠি একেকটা জীবন্ত মিউজিয়াম — স্মৃতির গোরস্তান। হঠাৎ-আলোর ঝলকানিতে প্রত্মতাত্ত্বিকের ভূমিকায় হাতড়ে খুঁজে-ফিরি বিশেষ বিশেষ স্মৃতির জরাজীর্ণ করোটি, এককালের আইভরি-শোভিত-কমনীয় আশ্চর্য হাতের জিরজিরে তর্জনী কিংবা পাঁজরের মিশ্র ভগ্নাংশের স্টেনসিল। মাতাল অ্যাম্ফোরার দুলুনিতে জারিত স্মৃতির মদিরা আমাদের শোণিতে প্রবাহিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মতর; জড়ো হতে থাকে এলোমেলো, অবিন্যস্ত, অবান্তর জিনিসের স্তূপ — ক্ফারনাউম।
একটা পেইন্টিং, একটা কম্পোজিশন, একটা চলচ্চিত্র, একটা ভাস্কর্যের আড়ালে গোটা একটা জীবন থাকতে পারে। একটা জাতির ইতিহাস কোনও জায়গায় গিয়ে মিশে যায় ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে, স্মৃতির সাবকনশিয়াসে সংরক্ষিত শব্দ, গন্ধ, রঙ ও সুর লিখিয়ে নেয় এক একটা বই, রচিত করে সুরমালা, বাধ্য করে শিল��পীকে শিল্পের সামনে আত্মসমর্পণ করতে। শিল্পের আঙ্গিক, উৎপত্তি, বিবর্তনের সমান্তরালে শিল্পীর চেতনা ও অবচেতন নিয়ে আলোচনা ও লেখালিখি কম হয়নি, কিন্তু নন ফিকশনে গূঢ় মনস্ত্বাত্তিক তদন্ত করতে গিয়ে পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে দিতে খুব বেশি বই পারে না। নাহুমের গ্রামে লেখকের ভাষার মায়া ও চিন্তার গভীরতা চুপ করিয়ে রাখে পাঠককে, ভাবতে বাধ্য করে। এই বইয়ের সম্পর্কে আর বিশেষ কিছু বলা যায় না, কারণ পাঠের এই অনুভব প্রত্যেকের ক্ষেত্রে নিজস্ব। শিল্পের সার্থকতা ও আবহমান প্রাসঙ্গিকতার এই দীর্ঘ অণুবীক্ষণে বার্গমান, তারকোভস্কি যেমন আছেন সেরকম সমরেশ বসু ও মার্কেসও আছেন। সমসাময়িক শিল্পের কথা যেমন আছে, হারিয়ে যাওয়া শহর ও ইতিহাসের মহামারীর অন্তরালে বদলে যাওয়া মনোজগতের কথাও আছ। আর কিছু না বলে বরং বইয়ের খানিকটা অংশ পাঠকদের জন্য তুলে দিলাম। যদি পড়ে ভালো লাগে, অনুরোধ করব বইটা পড়তে। একাধিক বার পড়তে। আমার ধারণা, আমাদের মধ্যে অনেককেই এই বইটা ফিরে ফিরে পড়তে হবে সারাজীবন।
#পুস্তকাংশ
ক্ফারনাউম : গ্রিক শব্দ, হিব্রু ভাষায় উৎপত্তি। আদতে দুটি শব্দ, কেফার ও নাহুম, অর্থাৎ নাহুমের গ্রাম।গ্যালিলি সাগরের উত্তর উপকূলে এক সুপ্রাচীন মাছ-ধরাদের গ্রাম। কোনো এককালে জনসংখ্যা ছিল দেড় হাজারের মতো। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু হয়ে এগার শতক পর্যন্ত একটানা মানুষের বসবাস ছিল এখানে। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা খনন করে উদ্ধার করেছেন দুটি সুপ্রাচীন সিনাগগের ধ্বংসাবশেষ, একটির ঠিক ওপরে আরেকটি। ক্রুসেডের আগে গ্রামটি পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়। ৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে একটি বিরাট ভুমিকম্প হয়েছিল। ক্ফারনাউম, নাহুমের গ্রাম। শব্দবন্ধটি কীভাবে যে হয়ে উঠল এলোমেলো জড়ো হওয়া অবিন্যস্ত অবান্তর জিনিসের স্তূপ, সেসব ভাষাতাত্ত্বিকদের গবেষণার বিষয়।
সিলিকন আর ইন্ডিয়া রাবার দিয়ে ওকে বানানো হয়েছিল চীনের গুয়াংঝাউ শহরে। এরপর হংকং ঘুরে চলে যায় লিসবনের বাজারে। চীনে তৈরি হলেও চেহারাটা কিন্তু মঙ্গোলয়েড ধাঁচের নয়, বরং অনেকটা যেন ভূমধ্যসাগরীয়দের মতো। ঘন কালো চুল, সবুজ আঙুরের মতো চোখ, পুষ্ট স্তন, চওড়া জঘন ও শ্রোণি; পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের একটি পুতুল। খুব জীবনানুগভাবেই বানানো, এমনকি মুখের গড়নেও নিখুঁত ফুটে আছে লাস্য আর বিষাদ। পোল্যান্ডের দুই নাবিক ভাগাভাগি করে কিনেছিল ওকে। ওরা ছিল অভিন্নহৃদয় বন্ধু, বিভিন্ন বন্দরে একই বেশ্যালয়ে যেত। কখনো কখনো এমনকি একই নারীর কাছে। মাসের পর মাস দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় পুতুলটি হাতবদল হয়ে চলত ক্যাবিন থেকে ক্যাবিনে। ওর একটি নামও দেওয়া হয়, হেলেন। ডান পায়ের গোড়ালির নীচে মার্কার পেন দিয়ে লেখা থেকে জানা যায়। এই নামটি কেন দিয়েছিল, সেটা অবশ্য জানা যায়নি। হয়তো ওদের চেনা কোনো নারীর নাম, যে ওদের একজনকে, এমনকি হয়তো দুজনকেই, প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রেমিকার নাম কখনোই নয়। ‘হেলেন’ নামের নীচে পোলিশ ভাষায় লেখা ছিল দুটি শব্দ -- বেদনার কুয়ো।
বছর দুয়েক পরে ওদের মালবাহী জাহাজটি কিনে নেয় ক্যারিবিয়ানের এক শিপিং কোম্পানি। কর্মী বদল হয়, কিন্তু পুতুলটি কোনোভাবে থেকে যায়। হয়তো ফেলে রেখে গিয়েছিল দুই যুবক। ওরা নাবিকবৃত্তি ছেড়ে অন্য পেশায় ফেরে। একজন ওয়ারশ-য় রুটির দোকান দেয়, অপরজন গ্রামে খামারবাড়িতে ফিরে গিয়ে চাষবাস শুরু করে, বিয়ে করে সংসার পাতে। হেলেনের শুরু হয় আরেকরকম জীবন।
জাহাজে নতুন কোম্পানির নাবিকদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিল ল্যাটিনো ও মেস্টিজো। এছাড়া রসুইখানার কাজে চট্টগ্রামের তিন বাঙালিও ছিল। ওদেরই মধ্যে একজনের প্রথম চোখে পড়ে হেলেনকে। অবশ্য ওর নাম বদলে দেওয়া হয়েছিল কী না সেটা আর জানা যায়নি। ওর দেহে আর কিছু লেখা হয়নি কখনো। তবে এই সময়ে সে বিভিন্ন হাতে ঘুরতে থাকে। জাহাজটি একবার উত্তর মেরু অঞ্চলে হিমজমাট সমুদ্রে আটকা পড়েছিল আড়াই মাস (নরওয়ে থেকে হাঙরের তেল আর পাম্পের যন্ত্রাংশ বহন করছিল)। অত্যধিক ব্যবহারে হেলেনের দেহে রাবারের অংশগুলি ক্লান্ত আর শিথিল হয়ে পড়তে থাকে এইসময়, মাথায় ও দেহের অন্যত্র কেশও ঝরতে থাকে। যদিও সিলিকন অটুটই ছিল। এবং এক কুয়াশাঢাকা ভোরে অস্বচ্ছ তেলের মতো প্রশান্ত মহাসাগর পার হবার সময় -- জাহাজটি পানামা থেকে লাওস যাচ্ছিল -- তাকে পোর্টহোল দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় এক বাঙালি রন্ধনকর্মী। মাসাধিককাল এলোমেলো ভেসে বেড়ানোর পর হেলেন আন্তর্মহাদেশীয় বাণিজ্যস্রোত পেয়ে যায়, এবং গোলার্ধ পরিক্রমা করে বিষুবরেখা পেরিয়ে চলে আসে বঙ্গোপসাগরে। এক পূর্ণিমার জোয়ারে আন্দামানের একটি অগম্য দ্বীপে এসে ওঠে।
দ্বীপে বাস করত অস্ট্রিক জনজাতির একদল মানুষ। ওরা সভ্যতার কোন ভোরে মূল ভূখন্ড থেকে এসেছিল ভেলায় চেপে। মাছ ধরে, ফলমূল কুড়িয়ে, ছোটোখাটো প্রাণী শিকার করে জীবন নির্বাহ করত। চাষবাস তেমন জানত না। নারকোলপাতা দিয়ে তাদের ঘর বানিয়ে নিত আর পশুর চামড়া ও গাছের বাকল পরত কটিদেশে। এছাড়া উল্কি আঁকার এবং নাক ও কান ছেদন করার প্রথা ছিল। বিশ-পঁচিশ জনের ছোটো ছোটো দলে ওরা থাকত প্রায় আশি বর্গমাইল সিমের বিচির আকারের দ্বীপটায়। একশো কুড়ি থেকে দেড়শোর মধ্যে ওঠানামা করত ওদের জনসংখ্যা। জন্মহার কম এবং শিশুমৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় এই ভারসাম্যটা বজায় থাকত। সমুদ্রে খাঁড়িতে অঢেল মাছ, অঢেল নারকোল গাছ, বনে ভোজ্য পাতা ও কন্দ অঢেল থাকায়, এবং চাষের প্রয়োজনে জমির ব্যবহার না থাকার কারণে, বিবাদ বিসম্বাদ প্রায় ঘটতই না। সেভাবে কোনো সংগঠিত ধর্মও ছিল না ওদের। কিছু কিছু আদিম ভীতি এবং লোকবিশ্বাস ছিল। যেমন, ওরা মনে করত পিতৃপুরুষেরা মৃত্যুর পর উইপোকা হয়ে যায়। সেজন্য পিঁপড়ের ডিম ও কিছু কিছু পোকার লার্ভা ওদের খাদ্যতালিকায় থাকলেও উইপোকাদের রক্ষণাবেক্ষণ করত। এমনকি মাটি আর নারকোল পাতা দিয়ে বানানো ওদের শঙ্কুর আকারের ঘরগুলোয় ছেয়ে থাকত উইয়ের বাসা। এভাবেই পূর্বপুরুষদের নিবিড় সান্নিধ্যে সহাবস্থান করত ওরা।
এবং এভাবেই রয়ে গিয়েছিল শত শত বছর। ইতিমধ্যে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে, স্বাধীন রাষ্ট্র আন্দামানের আদিবাসী নাগরিকদের জন্য কিছু কিছু জনহিতকর পদক্ষেপ নিয়েছে। তাতে কমবেশি সাড়াও দিয়েছে কয়েকটি জনজাতি। কোনো কোনো গোষ্ঠী এমনকি পোর্ট ব্লেয়ার ও অন্যান্য শহরে মূলস্রোতে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বিলুপ্তও হয়ে গিয়েছে কেউ কেউ। এই দ্বীপের জনগোষ্ঠীকে অবশ্য বশে আনা যায়নি। বিভিন্ন সময়ে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা হয়, কিন্তু সাড়া মেলেনি। চিনি, সুতির কাপড়, পলিথিনের শিট ইত্যাদি উপঢৌকন হিসেবে রেখে আসা হয়, কিন্তু সেসব পুড়িয়ে নষ্ট করে দেয় ওরা। এরই মধ্যে একবার এক বেপরোয়া মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ গোপনে একটি নৌকা নিয়ে দ্বীপে চলে আসেন গবেষণার উদ্দেশ্যে। তিনি আর ফিরতে পারেননি। খবরটা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হলে এবং এব্যাপারে কূটনৈতিক স্তরে চাপ তৈরি হলে ভারতের উপকূল রক্ষীবাহিনির বিশাল একটি দল প্রায় দশদিন পরে দ্বীপে গিয়ে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে। দেহটি বেলাভূমিতে নারকোল গাছের গায়ে বাঁধা ছিল। কড়া রোদে এবং নোনা হাওয়ায় শুকিয়ে গিয়েছিল, এবং সম্ভবত এক বিশেষ ধরণের গুল্মের রস মাখানো থাকার জন্য পশুপাখিতে কোনো ক্ষতি করেনি। প্রায় অবিকৃতই ছিল।
রবার ও সিলিকনে তৈরি চীনা পুতুল, একদা যার নাম ছিল হেলেন, যখন অর্ধেক পৃথিবী ভেসে দ্বীপের খাঁড়িতে গিয়ে ঢুকল, ওরা তাকে তুলে নিয়ে এসেছিল। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে জাহাজডুবির সামগ্রী ও অন্যান্য আবর্জনা ভেসে এসেছে দ্বীপে। ওরা কখনো সেগুলো অনুসন্ধিৎসার বশে কুড়িয়ে নিয়েছে, কখনো নেয়নি। ছেঁড়া জাল, প্লাস্টিকের বোতল ও জেরিক্যান ছাড়া আর প্রায় কোনো কিছুই ওরা কাজে লাগায়নি। কিন্তু এবার এক দুর্জ্ঞেয় কারণে হেলেনকে নিয়ে এসে ওরা তুলল বসতিতে। শুধু তাই নয়, নারকোলপাতা মাটি আর কাঠ দিয়ে ওর জন্য একটি ছোট্ট ঘর বানিয়ে দিলে কৌম উঠোনের এক কোণে। দিনের পর দিন সাগরের নোনা জলে ভেসে ভেসে হেলেনের সব চুল খসে গিয়েছিল, দেহের বিভিন্ন অংশে, বিশেষত স্তন এবং যোনিদেশে, ইন্ডিয়া রাবারের অংশগুলো কোনও বিশেষ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিকট স্ফীত ও বিকৃত হয়ে এসেছিল, এছাড়া জলপাই তেলের মতো চামড়ার রঙ সম্প��র্ণ উঠে বেরিয়ে পড়েছিল সিলিকনের দগদগে সবুজ। ওরা লতাপাতার রস দিয়ে ওদের বিশিষ্ট উল্কি আঁকল, নাক ও কান বিঁধিয়ে দিল, সাজিয়ে দিল মাছের কাঁটার গয়নায়।
এভাবেই শুরু হল। যেভাবে শুরু হয়।
পর পর ঠিক কী কী ঘটেছিল সেসব অবশ্য জানা যায়নি। হয়তো যাবেও না কোনোদিন, কারণ এই জনজাতির কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। তবে হেলেনকে কেন্দ্র করে কোনো বিবাদ, হিংসা কিংবা হানাহানির সূত্রপাত ঘটেছিল বলে কোনো প্রমাণ নেই। কিংবা, সাধারণত যেমন ঘটে থাকে, নতুন কোনো ক্ষমতার বিন্যাস গড়ে ওঠেনি। পরিবেশের ওপরেও কোনো প্রভাব পড়েনি। তবে পুতুলটি উদ্ধার হবার পর ওদের মধ্যে, বিশেষ করে পুরুষ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, এক অদ্ভুত ধরণের বিষণ্ণতার অসুখ দেখা দেয়। সবচেয়ে উদ্যমী আর কর্মঠরাও যেন জীবনীশক্তি হারায়। খাঁড়িতে মাছ ধরা, জঙ্গলে ঢুকে ফল কন্দ সংগ্রহের কাজে উৎসাহ হারায়। বনে এক ধরণের মাদক ছত্রাক খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে সারাদিন। এমনকি নারকোলপাতা জড়ো করে কুঁড়ের চাল ছাইবার উদ্যমও হারায়। একটি গোটা ঋতুতে দ্বীপে কোনো নতুন শিশুর জন্ম হয় না। এবং আরও কিছু কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে। মরা মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী ভেসে এসে উপকূল ছেয়ে যায়, সমুদ্রে ভাসে কালো তেল, নারকোল গাছে অদৃশ্য কীটাণুর প্রকোপে অপুষ্ট ফলগুলো শুকিয়ে ঝরে যেতে থাকে। এই দ্বীপের ত্রিসীমানায় কোনো পণ্যবাহী জাহাজের পথ নেই, কিন্তু রাত্রিবেলা দিকচক্রবালে বিচিত্র আলোর আনাগোনা দেখা যায়। এইসব লক্ষণ গণনা করার পর গোষ্ঠী প্রবীণেরা বলেন, জ্বরে কাঁপছে মেদিনী। এবং কিছুদিনের মধ্যেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
প্রথমে টের পায় উইপোকারা। উপকূলের লাগোয়া ভিটে ছেড়ে তারা সারি দিয়ে উঠে যেতে থাকে উঁচু জমিতে। তারপর একদিন, কার্ত্তিক পূর্ণিমার তিনদিন পর, দুপুরের পর থেকে সমুদ্র সরতে শুরু হয়। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য : মনে হয় যেন মেদিনীর সরা থেকে সব জল এক চুমুকে পান করছে এক দৈত্য। বিস্তীর্ণ তটভূমি উন্মোচিত হয়ে বেরিয়ে পড়ে আগ্নেয় শিলার ভাস্কর্য, চাটান, গুহা, ধাপকাটা সিঁড়ি, পাথর কুঁদে তোলা দৈত্যাকার পাখি ও বিচিত্র সব প্রাণীর রিলিফ।
দ্বীপবাসীরা অবশ্য সেসব খুঁটিয়ে দেখার জন্য বেলাভূমিতে অপেক্ষা করেনি। তারা উইপোকাদের পথ ধরেছিল। এবং যথারীতি সূর্যটা ডুবে যাবার আগেই ধেয়ে এল বিপুল জলরাশি, নারকোল বীথির মাথায় মাথায়, ওদের বসতিগুলি ভাসিয়ে নিল।
শেষবার এমন ঘটনা ঘটেছিল তিন প্রজন্ম আগে। সেবারও তটভূমি উন্মোচিত হয়ে দেখা দিয়েছিল এই আশ্চর্য পাথরের দেশ, বহুবর্ণ প্রবালে ছাওয়া। আগুনের ধারে বসে সেই স্মৃতিকথা শুনে বড়ো হয়েছে এরা। তারও অনেক কাল আগে ওই আগ্নেয় শিলার দেশে, ওইসব গুহা আর চাটানে বাস করত ওদের পূর্বপুরুষ। সেই কাহিনি এতবার বলা ও শোনার ভেতর দিয়ে কল্পনায় এমন সুস্পষ্ট খোদাই হয়েছিল যে মেদিনীর জ্বর সেরে যাবার পর সমুদ্র যখন ফিরে গেল নীচু এলাকা থেকে, জলের নীচে ঠিক কোথায় ওই শিলাপ্রবালের দেশ রয়েছে সেটা নিখুঁত নিরূপণ করতে কোনো অসুবিধা হয়নি। ওই ডুবে-যাওয়া অঞ্চলটা উপকূল থেকে বাইশ দমের পথ, আট দম গভীর।
এমনিতে নারীপুরুষ নির্বিশেষে দ্বীপের সকলেই হাঁটতে শুরু করার পরেপরেই সমুদ্রে সাঁতার দিতে শিখে যেত। তিন, চার এমনকি পাঁচ দম গভীরে সাঁতার দিতে পারার ক্ষমতা অনেকেরই ছিল। সাত, আট কিংবা তার বেশি দম নীচে যেতে পারত যারা, তাদের মধ্যে থেকেই কুলপতি নির্বাচন হতো। স্বাভাবিকভাবেই কুলপতির ওপরে ভার পড়ল হেলেনকে জলের নীচে শিলাপ্রবালের দেশে রেখে আসার। তার আগে ওর নাক ও কান থেকে খুলে নেওয়া হলো মাকড়ি, গা থেকে খোলা হলো মাছের কাঁটার অলংকার। এরপর সবজে সিলিকনের গা থেকে ঘসে ঘসে সব উল্কি তুলে ফেলল ওরা। দেহের প্রতিটি ছিদ্রপথে ভরে দিল ডুমুরের বীজ। তারপর সারাদেহ ছাই আর পাতায় মুড়ে ভেলায় চাপিয়ে নিয়ে গেল বাইশ দম, ঠিক যেখানে ঢেউয়ের মাঝে একটি সুস্থির ঘোল চিহ্নিত করেছে শিলাপ্রবালের দেশ। এরপর কুলপতি পাতায় মোড়া পুতুলটিকে পিঠে বেঁধে নিয়ে ডুব দিল।
আর উঠে আসেনি।
জলের নীচে প্রবালগুহায় ছিল অসংখ্য গোলকধাঁধার ফাঁদ, স্বতঃপ্রভ মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক জীবের দেশ। সেখানেই ভোররাতের স্বপ্ন, শিশুর দেয়ালা আর না-পাওয়া পুরুষ কিংবা নারীর জন্য গলার কাছে চিনচিনে ব্যথাগুলো সব থরে থরে জমা হয়ে থাকে। বর্ষার রাতে নারকোল ছাউনির ভেতর আগুনের ধারে বসে সেই গোলকধাঁধার গল্প বোনে গোষ্ঠীপ্রবীণারা। হয়তো সেই কাহিনির বুননের ভেতর কোনো একটি বাঁকে রয়ে গিয়েছিল কুলপতি। আর ফিরে আসেনি।