বাংলা সাহিত্যে নীহাররঞ্জন রায়ের স্থান অক্ষয় হয়ে আছে তাঁর মহাগ্রন্থ "বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদিপর্ব" রচনার সুবাদেই। কিন্তু পাঠক্রমের বিকৃত শাসনের বশ্যতা করতে গিয়ে আমরা ইতিহাস নিয়ে তাঁর একান্তভাবে দেশজ ও মৌলিক চিন্তাভাবনাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছি। স্বদেশের ঠাকুর ফেলিয়া বিদেশের কুকুর পূজা এবং ভাইস-ভার্সার চক্করে মাঝখান থেকে আমাদের ইতিহাসচেতনা মাঠে মারা গেছে। আলোচ্য বইটি নীহাররঞ্জনের 'শতবর্ষ-পূর্তি গ্রন্থমালা' সিরিজের প্রথম খণ্ড, তথা তাঁর কিছু প্রবন্ধের সংকলন। এতে যুক্তি, তথ্য, তত্ত্ব এবং তর্কের সাহায্যে কয়েকটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক বিষয় আলোচিত হয়েছে। বইয়ের শুরুতে আছে তরুণ পাইন রচিত 'প্রসঙ্গত', যা এই বই প্রকাশের সঙ্গে জড়িত ভাবনাটি প্রকট করেছে। "বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদিপর্ব"-কে সর্বজনবোধ্য করে তোলার জন্য পুনর্লিখনের কাজটি করেছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। সেই সুবাদে নীহাররঞ্জন-চর্চায় তাঁকে অধিকারী বলে মানতে কারও দ্বিধা হওয়ার কথা নয়। তাঁর লেখা 'কয়েকটি কথা' দিয়ে শুরু হয়েছে মূল বই। এরপর একে-একে এসেছে~ ১. সংস্কৃতির সংকট: অতি সংক্ষিপ্ত এই লেখা একটি সমাবর্তন-অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণের লিখিত রূপ। ২. ভারতেতিহাস জিজ্ঞাসা: 'বারোমাস' পত্রিকায় ধারাবাহিক আকারে প্রকাশিত হয়েছিল এই অতুলনীয় প্রবন্ধটি। ইতিহাস-চর্চার পদ্ধতি বা হিস্টরিওগ্রাফি নিয়ে বাংলায় সম্ভবত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ এটিই। এতে এযাবৎ ভারতীয় ইতিহাস রচনার মূল পদ্ধতিগুলোর গুণাগুণ বিশ্লেষিত হয়েছে। কোনো বিশেষ তত্ত্ব বা মতের অনুগামী না হয়েও কীভাবে যুক্তি ও সমাজচেতনার আলোয় ইতিহাসকে যথাযথ আকারে পরিবেশন করা যায়, তাও বলা হয়েছে এতে। সর্বোপরি এতে রয়েছে ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য একটি সামগ্রিক কাঠামো। এ আমাদের চরম খেদের ও পরিতাপের বিষয় যে এমন একটি প্রবন্ধ অনুসরণ না করে আমাদের পাঠ্য বইগুলোতে এখনও বিশেষ-বিশেষ গোষ্ঠীর চাহিদামাফিক জিনিসই পড়ানো হচ্ছে। ৩. গ্রিক ও ভারতীয় কালচেতনা: ইতিহাসের মূল তত্ত্বই হল 'কাল' এবং তার বিভাজনকে চিহ্নিত করা। ভারতের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে এই 'কাল' নিয়েই কেন গোড়ায় গলদ হয়, সেটাই তুলে ধরা হয়েছে এ-লেখায়। ৪. কৃষ্টি কালচার সংস্কৃতি: 'কালচার' শব্দের পরিভাষা নির্মাণ করার সময় রবীন্দ্রনাথ শুধু যে 'সংস্কৃতি'-কে অনুমোদন করেছিলেন, তাই নয়। 'কৃষ্টি' শব্দটি যাতে ব্যবহৃত না হয়— তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি যে পরিমাণ শ্রম ও কাল ব্যয় করেছিলেন, তা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কিন্তু কেন? কালচার-এর অর্থ যাতে 'ঠিকমতো' ফোটে, তা নিশ্চিত করা নিয়ে শুধু রবীন্দ্রনাথ নন, সেইসময় বিশ্বজুড়ে নানা চিন্তাবিদ কেন তিনি এত উদ্বিগ্ন ছিলেন? ৫. ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দী: অতি সংক্ষিপ্ত এই লেখাটিও এক ভাষণের লিখিত রূপ মাত্র। ৬. উনিশশতকী বাঙালির পুনরুজ্জীবন— বাঙালির 'রেনেসাঁ' এক অত্যন্ত বিতর্কিত ও চর্চিত বিষয়। একটা সময় বুদ্ধিজীবীরা ওই আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে উদ্বাহু হয়েছেন। আবার একসময় ওটিকে অত্যন্ত সীমিত ও কার্যত অসার বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবণতাও প্রবল হয়েছিল। দুইয়ের মাঝে সত্যের সন্ধান করেছেন নীহাররঞ্জন এই লেখায়। ৭. গান্ধীজী: সবরকম ভাবালুতা সরিয়ে ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে গত শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের অন্যতমকে দেখার চেষ্টা হয়েছে এখানে। ৮. এ-কালে আমাদের কাল: এও এক ভাষণ; কিন্তু এর মধ্যে খণ্ডতার বদলে এক সামগ্রিকতার ভাবই ফুটে ওঠে। বইয়ের শেষে এসেছে রচনা-প্রসঙ্গ এবং সূত্রনির্দেশ। ইতিহাসে কিছুমাত্র আগ্রহ থাকলে এই বইটি পড়া অত্যাবশ্যক। এতে সহজ গদ্যে, কোনোরকম তত্ত্ব বা কৃত্রিম কাঠামোর সাহায্য না নিয়ে স্রেফ যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের মতো ফার্স্ট প্রিন্সিপলের সাহায্য নিয়ে ইতিহাসকে পড়া, লেখা ও শেখার প্রকৌশল আলোচিত হয়েছে একের পর এক লেখায়। সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন!