জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যার- এর 'বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন: দ্য হিউম্যান কাইমেরা' এর পরে আমরা নিয়ে আসছি তার লেখা গল্পসংকলন 'নিগৃঢ়' প্রথম খন্ড। বইটিতে থাকতে মোট ৬টি গল্প ও সেই সাথে বেশকিছু ইলাস্ট্রেশন। সূচিপত্রে যে ৬টি গল্প থাকছে তা এক নজরে: ১. বংশালের বনলতা ২. হাকিনী ৩. অসীম আচার্য্যের অন্তর্ধান ৪. বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন ৫. কালো পাথর ৬. ইব্রাহিম কাদরির মৃত্যু
বইতে ৬টা অতিপ্রাকৃত গল্প। গল্পগুলো আগেও প্রকাশিত ভিন্ন প্রকাশনী থেকে। কিন্তু আমি মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যার এর লেখা এর আগে পড়িনি। এটাই প্রথম।
ডাইনী, প্রেতসাধনা, পিশাচ, কয়েকশো/ কয়েক হাজার বছরের পুরনো কাল্ট সবই আছে। কিন্তু গল্পগুলো কিছুটা ভিন্নধর্মী। সরাসরী কোন ভূত প্রেত, অশরীরী কিছু এখন কী ধ্বংসযজ্ঞ বা ভয়ংকর নৃশংসতা চালাচ্ছে সেরকম না। বর্তমানের কোন একটা ঘটনা থেকে অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত কোন কিছুর আভাস থেকে চলে গেছে অনেক পুরনো ইতিহাসে। হয়তো কোন পুরনো আর্টিফ্যাক্ট, মন্দির বা কোন ঘটনার একদম শুরুর পর থেকে বিভিন্ন সময় হাত বদল, মালিকানা বদল এরকম অনেক তথ্য দেয়া হয়েছে। এরপর আবার সেখান থেকে যোগ করা হয়েছে বর্তমানের ব্যাখ্যাতীত ঘটনা।
গল্পগুলো অনেক হালকা মেজাজে পড়তে পেরেছি, সাধারণ হরর গল্পের মত সারাক্ষণ ভয় বা টুইস্টের চিন্তা নিয়ে পড়ার কিছু নেই। তথ্যগুলো মগজে গেঁথে, কিছুটা বিশ্লেষণ করে বর্তমান আর অতীতের ঘটনার সাথে মিল বের করতে হয়। সব মিলিয়ে লেখাগুলো খুব ভালো লেগেছে আমার। প্রচলিত হরর বা অতিপ্রাকৃত বা ডার্ক লেখা যেগুলোতে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয় সেগুলো আমার পছন্দ না। একারণে বোধহয় আরো বেশি ভালো লেগেছে।
প্রচ্ছদ, বিবলিওফাইল এর বাইন্ডিং, পেইজ কোয়ালিটি সবই ভালো লেগেছে। কয়েকটা বানান ভুল ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি।
দীর্ঘদিন পর একই মলাটে বেশ কয়েকটা ভালো হরর গল্প পড়লাম। বেশ উপভোগ করেছি মুহম্মদ আলমগীর তৈমুরের গল্পগুলো নিয়ে তৈরি সংকলন নিগৃঢ়। ছয়টা গল্প রয়েছে বইটাতে। বংশালের বনলতা, হাকিনি, অসীম আশ্চর্য্যের অন্তর্ধান, বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন, কালো পাথর আর ইব্রাহিম কাদরীর মৃত্যু। প্রত্যেকটা গল্পই হরর জনরার। তবে ভিন্ন ধাঁচের। শুধুই ভূত প্রেত, অশরীরি বা তন্ত্রমন্ত্র নিয়ে নয়। গল্পগুলো আবর্তিত হয়েছে ইতিহাস, আর্টিফ্যাক্ট, মিথলজি, কিংবদন্তি এসবকে ঘিরেই। সেইসাথে তৈমুর সাহেবের হিউমারের প্রয়োগও দেখা গেছে প্রত্যেকটা গল্পে। সব গল্পই ভালো ছিল। কিন্তু আমার সবথেকে ভালো লেগেছে বংশালের বনলতা, হাকিনি, অসীম আশ্চর্য্যের অন্তর্ধান আর কালো পাথর। বিশেষ করে হাঁকিনি ও কালো পাথর পড়তে গিয়ে মাঝরাতে একটু ভয় ভয়ও লাগছিল। গল্পগুলো বিভিন্ন সময়ে রহস্যপত্রিকায় বেরিয়েছে। তবে একসাথে এবারই প্রথম সম্ভবত। যাইহোক গল্পগুলো হরর প্রেমীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য। সেইসাথে কালেকশনে রাখার মতও। মুহম্মদ আলমগীর তৈমুর সাহেবের পরবর্তী কাজগুলোর অপেক্ষায় রইলাম।
আমার রেটিং বায়াসড। হরর জনরা খুব একটা পছন্দ না, কিন্তু আলমগীর তৈমূর স্যারের লেখনী এত দারুন আর গল্পের বুনন এত চমৎকার যে গল্প টেস্টবাড না মেনে চললেও পড়া থামাতে পারিনি। যে কোনো হরর লাভার এর জন্য দারুন সুপাঠ্য এবং মাস্টরিড।
অতিপ্রাকৃতিক কিংবা হরর গল্প আমায় খুব একটা টানে না। তারমানে এই না যে একেবারেই পড়া হয় না। পড়ি, তবে খুবই বেছে বেছে। মুহম্মদ আলমগীর তৈমুর স্যারের অতিপ্রাকৃতিক গল্পগুলো যতোটা না ভয়ের কিংবা ভৌতিক, তারচেয়ে বেশ খানিকটা বরং মিথোলজিক্যাল এবং হিস্টোরিক্যাল। একটা গল্প সংকলনে এর আগে উনার লেখা "প্রাচীন মূদ্রা" পড়েই আমি উনার ফ্যান হয়ে গিয়েছিলাম। তাই বিবলিওফাইল থেকে উনার ছোট গল্পগুলোর প্রথম সংকলন "নিগৃঢ় ১" সংগ্রহ করেছিলাম অনেক আগেই। তবে পড়তে বেশ দেরী হয়ে গেলো। নিচে বইয়ের গল্পগুলো নিয়ে আমার সংক্ষিপ্ত পাঠ অনুভূতি জানাবো। তার আগে একটা কথা বলে নেই, তৈমুর স্যারের লেখনশৈলী অত্যন্ত চমৎকার। বিশেষ করে গল্পের পরিবেশ বা আবহ তৈরীতে উনার হাত অত্যন্ত শক্তিশালী মনে হয়েছে আমার কাছে। উনার মতো কারো লেখনশৈলী নিয়ে কথা বলা আমার মতো নাদানের সাজে না, তবুও এইটুকু বললাম যাতে স্যারের লেখা কেউ না পড়ে থাকলে একটা ধারণা পেয়ে যেতে পারেন। যাইই হোক এবার গল্পগুলোতে আসি।
বংশালের বনলতাঃ বইয়ের প্রথম গল্প, ভূমিকা পড়ে যদ্দুর মনে হলো স্যারেরও সম্ভবত প্রকাশিত প্রথম গল্প এটাই। পুরান ঢাকার এক বাড়িতে লুকানো ছোট্র একটা মূর্তি খুঁজে পাওয়া থেকে গল্পটা শুরু হয়। এরপর যথারীতি বেশ খানিকটা অতীত ইতিহাস আর মিথের বর্ণনা। গল্পটায় অবশ্য "শেষ হইয়াও হইলো না শেষ" টাইপ ফিনিশিং দেয়া হয়েছে। তবুও পড়তে ভালোই লেগেছে। পুরোনো ঢাকায় অপদেবী "লিলিথ" এর মূর্তি পাওয়া সংক্রান্ত ২য় গল্প পড়লাম এটা নিয়ে। "মাঝরাতে একটা গল্প শুনিয়েছিলেন" বইটা কি সামান্য করে এই গল্পটা থেকে ইন্সপায়ার্ড? নাকী আসলেই লিলিথ সংক্রান্ত কোনো সত্যিকারের ইতিহাস আছে পুরোনো ঢাকার 🤔!!
হাকিনীঃ এক জোড়া বালা বন্ধক রাখা থেকে গল্পের শুরু। যা গিয়ে ঠেকে একেবারে প্রাচীন সেন বংশের ইতিহাসের সাথে। তবে গল্পের মূল উপজিব্য হলো আদি ও অকৃত্রিম রিভেঞ্জ। যার জন্য গল্পের চরিত্র সঞ্জয়কে হাকিনী নামক এক পিশাচকে বশীকরণ করতে চায়। এই গল্পটায় কিছুটা হরর ভাইব আছে। ইতিহাস এবং মিথোলজির অংশগুলো যথারীতি বেশ উপভোগ করেছি। শেষটা পছন্দ না হলেও, বইয়ের অন্যতম ভালো গল্প এটা।
অসীম আচার্য্যের অন্তর্ধানঃ গল্পটা আগেরকার লেখকদের প্রাচীন গল্পের ধাঁচে শুরু হয়। এরপর শুধুই ইতিহাস। সে ইতিহাসে রহস্যময় মুসলমান ফকির, হিন্দু তান্ত্রিক, পুন্ড্ররাজ্য, সেন বংশের অত্যাচার অনেক কিছুই উঠে এসেছে। আমার মনে হয়েছে এই গল্পটায় ইতিহাসের পরিমাণ একটু বেশীই হয়ে গিয়েছে। শেষটা অতিপ্রাকৃতর ছোঁয়া থাকলেও, আমার কাছে গল্পটা মোটামুটি ধরণের লেগেছে।
বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তনঃ প্রাচীন সময়ে তান্ত্রিকদের ক্ষমতা সম্পর্কে বেশ ভালো একটা ধারণা পাওয়া যায় এই গল্প থেকে। শয়তান বা অপদেবতার উপাসনা ভিত্তিক এই গল্পটাও আগাগোড়া ঐতিহাসিক রেফারেন্স সমৃদ্ধ ফিকশন। এবং এই গল্পটাও আমার কাছে মোটামুটি ধরণের ভালো লেগেছে। সম্ভবত লেখকের একই প্রকাশনী থেকে বের হওয়া হিউম্যান কাইমেরা বইটাতে এই গল্পের আরো কিছুটা অংশ পাওয়া যাবে।
কালো পাথরঃ এই বইয়ের সেরা গল্প নিঃসন্দেহে। দূর্দান্ত বললেও কম বলা হবে। পরিচিত এক বন্ধুর রহস্যময় মৃত্যুর পর তার লেখা এক ডায়েরী পড়তে গিয়ে রহস্যময় এক কালো পাথরের খোঁজ পান ফারাবি। আসামের এক দূর্গম পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই বিশালাকার কালো পাথর কোথা থেকে, কখন আর কিভাবে এখানে এলো সেই রহস্য সমাধাণে বেড়িয়ে পড়েন ফারাবি। যথারীতি বেশ কিছু ইতিহাস, মিথ আর প্রাচীন আমলের অপদেবতার পূজো ছিলো গল্পটায়। গল্পে বাড়তি হিসাবে ছিলো হালকা সাসপেন্স আর ভ্রমণের বর্ণনা। তবে গল্পটার আউটস্ট্যান্ডিং পার্ট ছিলো, একটা রিচুয়ালের বর্ণনা। ভয়াবহ, নৃশংস আর কুৎসিত সেই রিচুয়ালটাই গল্পটাকে অনন্য করে তুলেছে। এছাড়া বইয়ের অন্য গল্পগুলোর তুলনায় এই গল্পের শেষটা বেশ চমৎকার।
ইব্রাহিম কাদরির মৃত্যুঃ বইয়ের আরো একটা পছন্দের গল্প। গল্পে ছিলো এক প্রত্নতত্ত্ববিদের প���রোনো মন্দির খোঁজা, অল্প করে ছিলো প্রাচীন মিশরের অপদেবতা অ্যাপোফিস আর তার এক কাল্টের কথা, ছিলো ফেরাউন, ছিলো পর্তুগীজদের প্রথম এই দেশে আসা, আর ছিলো বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চলের রহস্যময় এক মন্দির। বাইবেলের সূত্র সমাধান করে প্রাচীন মন্দির খুঁজে নেয়া আর আর্টিফ্যাক্ট উদ্ধার করার ব্যাপারটা বেশ ভালো লেগেছে। শেষটা মোটামুটি। তবে এই গল্পটায় লেখকের সেন্স অফ হিউমারের প্রয়োগ আমার বেশ ভালো লেগেছে। অন্যান্য গল্পের তুলনায় বাড়তি একটা মাত্রা যোগ করেছে হালক ধাচের রসিকতাগুলো। কালো পাথরের পর বইয়ের ২য় প্রিয় গল্প আমার এটা।
ছোট গল্পের সংকলন হিসাবে ওভারঅল বেশ ভালো লেগেছে বইটা আমার। অবশ্য সবই আমার কমফোর্ট জোনের গল্প হওয়ায় ভালো লাগাটাই স্বাভাবিক। লেখকের ভাষার প্রয়োগ এবং গল্পের গাঁথুনি উনার লেখা সব গল্প পড়তে উদ্ভুদ্ধ করেছে আমাকে।
#ব্যক্তিগত_রেটিংঃ ০৮/১০ (আগে কেউ এই গল্পগুলো পড়ে না থাকলে আমার দিক থেকে রেকমেন্ডেড রইলো)
#প্রোডাকশনঃ এই বইটার প্রোডাকশন নিয়ে বেশ কিছু সমালোচনা চোখে পড়েছিলো। মূলত বড় ফন্ট, লাইন স্পেসিং এবং বইয়ের উপরে নিচের মার্জিন নিয়ে সমালোচনাগুলো ছিলো। বলা হয়েছিলো এগুলা করে বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়িয়ে এর দাম বেশী রাখা হয়েছে। প্রকাশনীর পেইজ থেকে যা জেনেছি, লেখক নিজেই চেয়েছেন উনার গল্পগুলা এভাবে ছাপানো হোক, এবং প্রিমিয়াম কোয়ালিটির বই হোক। তাই আসলে আমার মনে হয় না এটা নিয়ে সমালোচনা করা উচিত। লেখকের চাহিদা রক্ষা করা প্রকাশনীর দায়িত্বের মাঝে পড়ে। তাই আমার এগুলা নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। তবে পেইজগুলো আরেকটু হালকা পাতলা দিলে ভালো হতো! বইটা আসলেই বেশ প্রিমিয়াম কোয়ালিটির। এছাড়া বিবলিওফাইলের ফন্টটা আমার বেশ ভালো লাগে।
কয়েক বছর আগে মুহম্মদ আলমগীর তৈমূরের কিছু গল্প পড়েছিলাম। ভালো লেগেছিল। তাই বিবলিওফাইল থেকে যখন লেখকের লেখাগুলো বের হতে শুরু করলো আমিও সংগ্রহ করতে শুরু করলাম। পড়েও ফেললাম একটা বই কয়েক মাস আগে। বেতাল, উপন্যাসিকা। খুব একটা ভালো লাগেনি। সত্যি বলতে পড়ার সময় বিরক্তিও চলে আসছিল খানিকটা। তবে এই বইয়ের ক্ষেত্রে অনুভূতি সম্পূর্ণ বিপরীত। বইয়ের ৬টি গল্পই কম বেশি উপভোগ করেছি। বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক মনে হয়েছে গল্পগুলোর প্লট। সেগুলোকে যোগ্য সমর্থন দিয়েছে লেখকের অসাধারণ ভাষাশৈলী। নিগৃঢ়-২ সংগ্রহে আছে, পড়ে ফেলতে হবে। সামনে নিগৃঢ়-৩ বের হবার কথা। অপেক্ষায় রইলাম।
তৈমূর স্যারের লেখার সাথে আমার পরিচয় বাচ্চাদের রূপকথা দিয়ে। কী ভীষণ দারুণ লেখেন মানুষটা! গল্পগুলো একই ধাঁচের। গল্প তো নয়, যেন মিথ আর হিস্ট্রির পাঠ। কিন্তু স্বাদু লেখনশৈলীর জোরে বিরক্তি আসে না মোটেও। পড়ার সাথে সাথে সুন্দর সুন্দর নতুন নতুন শব্দ শেখা তো আছেই। গল্পের দুয়েক জায়গায় অবশ্য খটকা লাগে, অমনটা আদৌ সম্ভব হলো কী করে। সব মিলিয়ে—ইতিহাস আর পুরাণ পছন্দ হলে রেকমেন্ডেড।
ছোটকাল থেকেই হররের প্রতি ভিন্ন এক ওবসেশন ছিল। পাশের বাসার রিফাত মামার বুকশেলফ থেকে প্রায়ই বিশ্বসেরা ভূতের গল্প সমগ্র বইটা চুরি করে নিয়ে আসতাম। এরপর রাত জেগে বসে বসে পড়তাম। বেশি ভয় লাগলে, গরমের মধ্যে কাঁথা জড়িয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকতম।
বয়স বাড়লেও এখন হরর বই কিংবা মুভি দুইটাই খুব আগ্রহ নিয়ে ইনজয় করি।
বেশ কিছুদিন আগে, মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর স্যারের লেখ হাকিনী গল্পের মিরচী বাংলার অডিওবুক একটা ফ্রেন্ড ইনবক্সে দিয়ে বলছিল শুনতে। আমি কিছুদূর শুনে ভালই মজা পাচ্ছিলাম, তখন ঠিক করি এখন শুনব না। হার্ডকভার সংগ্রহ করে মিরচী বাংলার অডিওবুক আর হাতে হার্ডকভার, দুইটার খিচুড়ি করে লেবু চিপড়ে খাবো। যে ভাবা সেই কাজ, কিনে ফেললাম আর সময় নষ্ট না করে শুরু করে দিলাম দুই নৌকায় পা দিয়ে ভ্রমণ।
নিগৃঢ় ১ বইয়ের দুই মলাটের মাঝে রয়েছে মোট ৬ টি গল্প।
৬ টি গল্পের নামই খুব সুন্দর। প্রথম দর্শনে নাম গুলা পড়ে পাঠকের মনে ভালই আগ্রহ জন্মাবে। কিন্তু সবগুলো গল্পই কি সুন্দর? আমি নিজের ভাল লাগাটা '★' দিয়ে ইন্ডিকেট করে দিচ্ছি।
১. বংশালের বনলতা ★★★
২. হাকিনী ★★★★★
৩. অসীম আচার্য্যের অন্তর্ধান ★★
৪. বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন ★
৫. কালো পাথর ★★
৬. ইব্রাহিম কাদরির মৃত্যু ★★
বইটা হাতে পাওয়ার পর যতটা আগ্রহ নিয়ে শুরু করেছিলাম কিন্তু দুইটা গল্প শেষ করার পর সব আগ্রহই নিমেষে গায়েব হয়ে গেল। আমি পড়ে গেলাম এক রিডিং ব্লকে। বই খুলে বসি কিন্তু পড়ার প্রতি আগ্রহ পাই না৷ বেশ কয়েকবার ভাবছি, থাক এই অব্দি। অন্য বই পড়া শুরু করি। ভবিষ্যতে একদিন পড়ব না হয় এটা। কিন্তু না, আগ্রহ নিয়ে মাখাইছি যখন, শেষ না করে উঠব না। বহুত কষ্টে বইটা শেষ করছি। বইটা শেষ নামানোর পর কি যে এক ঐশ্বরিক শান্তি লাগছিল।
কেন এমন অনুভূতি হল আমার? লেখকের লেখার স্টাইল কী গুরুগম্ভীর?! জ্বী না, লেখকের লেখনশৈলী অসাধারণ। এই লেখনশৈলীর জন্যই মূলত বইটা শেষ নামাইতে পারছি নাহলে আমার দ্বারা সম্ভব হইত না। মূল সমস্যা হচ্ছে, বইটা হরর নামধারী হলেও এটা হরর ঠিক না। বরং গল্পের আকারে ইতিহাসের বিস্তর বিবরণ। এত এত ইনফরমেশন, আর এত এত প্রাচীন সময়, স্থানের বিবরণে মাথা হ্যাং হয়ে যাওয়ার যোগাড় হয়েছিল। একাডেমিকের চাপে যখন আধপাগলা হয়ে যাই তখন রিলিফের জন্য গল্পের বই পড়ি, কিন্তু সেই গল্পের বইয়েও যদি সমহারে জ্ঞান বিতরণ চলতে থাকে তবে তো...
মিরচী বাংলার অসাধারণ উপস্থাপনে হাকিনী গল্পটা দারুণ লাগছিল। i wish মিরচি তে ওনার সবগুলো গল্পই থাকত, তবে হয়ত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, আর অসাধারণ ভয়েসওভারে এতটা বিরক্ত না হয়ে বরং ইনজয় করতাম।
দুর্দান্ত, কমই বললাম মনে হয়। অনেক আগে কালো পাথর পড়েছিলাম রহস্য পত্রিকায়। রোমাঞ্চের সাথে আদিম অতিপ্রাকৃত ভয়, এদুটো মসলাকে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের হাড় মাংসের সাথে কষিয়ে গল্পের মাধ্যমে এত উপাদেয় হিসেবে লেখক উপস্থাপন করেছেন যে, ডাল ভাত খাওয়া বুভুক্ষু পাঠকের কাছে এই নিগৃঢ় সিরিজটি রীতিমতো বেনকুইট। এ পাড়েও স্যার মুহম্মদ আলমগীর তৈমুর এর মত অশেষ স্বকিয়তা সম্পন্ন সাহিত্যিক রয়েছেন তা ভাবতেই গর্বে বুকটা ভরে উঠে। নিগৃঢ়-১ এর ভূমিকায় শ্রদ্ধেয় লেখক লিখেছেন, 'প্রাকৃত অতিপ্রাকৃত কাহিনী লিখিয়ে রথী-মহারথীরা...'।লাইনগুলো খুব ভালো লেগেছে পড়তে কিন্তুু স্যার তাদের সারিতে আপনিও এক দূর্লভ নক্ষত্র...
বিবলিওফাইল প্রকাশনীকে বিশেষ ধন্যবাদ। একদিকে যেমন ক্রিম কালারের বেশ পুরু পেজ থেকে শুরু করে বইয়ের প্রচ্ছদ, বাঁধাই সবকিছুর মধ্যে পেশাদারিত্�� ও যত্নশীলতার ভাব ফুটে উঠেছে, ঠিক একইভাবে লেখার হরফ ছিল বড়সড় আর একদম ঝকঝকে তকতকে। বানানের ভুল বা অসংগতিও খুব একটা চোখে পড়েনি।
গল্পগুলো সম্পর্কে আলাদা করে বলতে গেলে রাত-ভোর পার হয়ে যাবে। প্রতিটি গল্প এক একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর। শেষে এতটুকুই বলব হরর-টেরর, থ্রিলার-চিলার, হিস্ট্রি-মিস্ট্রি আপনি যে ধরনেরই পাঠক হয়ে থাকুন না কেন নিগৃঢ়-১,২ পড়ুন। না হলে বলবো না যে আপনি মিস করবেন, কারণ সবার কপালে তো আর সব কিছু জুটে না।
বইয়ের নাম "নিগৃঢ়"। এই শব্দের অর্থ হলো অকাল্ট, অতিলৌকিক। আলমগীরের স্যারের গল্প নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এই সংকলনের প্রায় প্রত্যেকটা গল্প গতমাসে অন্য একটি সংকলন " কুহক কথনে" পড়েছি। ব্যাতিক্রম ছিলো শুধু হাকিনী গল্পটি। তারও প্লট লাইন বাকি গল্পগুলোর মতনই। সেন আমল থেকে ব্রিটিশ যুগ তারপর স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ পর্যন্ত গল্পের বিস্তৃতি। প্রাচীন ব্যবিলন থেকে প্রাচীন ভারতীয় তন্ত্র মন্ত্রের একটা ছাড়া ছাড়া ইতিহাসও এই গল্পে পাওয়া যায়। সর্বোপরি স্যারের গল্প মানেই অন্ধকারে মোড়া এক অলৌকিক যাত্রার সঙ্গী হওয়া।
সবগুলি গল্পই বেশ ভালো এমনিতে। ইতিহাস, মিথলজি আর অশুভ অতিপ্রাকৃত শক্তির কাহিনী মিশ্রণে রচিত। বেশ অনেক জায়গায় সংলাপে বড় বড় ইতিহাস ঢুকে পড়লেও, বাংলা ভাষায় সম্ভবত এরকম জটিল কাহিনী মিশ্রিত অতিপ্রাকৃতিক গল্প বেশি নেই।
তবে, বিশেষ কিছু সমস্যা চোখে পড়ার মত লেগেছে। শেষ গল্পে অনেকবার "উপজাতি" শব্দটি ব্যবহার হয়েছে যেটা আপত্তিকর। এখানে "আদিবাসী" শব্দটি ব্যবহার করতে হতো। জানিনা কেনো প্রুফরিড করতে গিয়েও কারো এটা চোখে পড়েনি।
যে গল্পগুলির চরিত্ররা হিন্দু, সেখানে তাঁদেরকে সম্বোধনে একঘেয়েভাবে "বাবু" শব্দটি বেশ অনেকবার ব্যবহৃত হয়েছে, যেটা পড়তে গিয়ে বারবার সমস্যা মনে হচ্ছিলো। হিন্দু পুরুষরা নিজেদের বা অন্তত সমবয়সী / সমসামাজিক অবস্থানের পুরুষদের এত ঘনঘন "বাবু" সম্বোধন করেনা। বা লেখকের বর্ণনায়ও এতবার এভাবে এই সম্বোধনটা মানায় না।
আরেকটা ব্যাপার হলো যত্রতত্র প্রবাদ/বিখ্যাত কবিতার পংক্তি ইত্যাদির ব্যবহার। এখানে লেখকের দক্ষতা প্রকাশ পেলেও, সবগুলি গল্পে সব চরিত্রের সাথে এ বিষয়টা ঠিক মানানসই মনে হয়নি। এছাড়া মাঝে মধ্যে হঠাৎ কোথাও সামান্য কিছু অসামঞ্জস্যতা আর ছোটখাটো কিছু ভুল চোখে পড়েছে মনে হয়েছে। পরবর্তী সংস্করণে এসব সংশোধিত হবে আশা করি।
অসীম আচার্য্যের অন্তর্ধান আর বংশালের বনলতা, এ দুই গল্পের জন্য পাঁচ তারা। দুর্দান্ত ওরা। সেই কবে পড়েছি, আজও ভুলিনি। এ ছাড়া ভালো লেগেছে কালো পাথর, কিন্তু যেই লেভেলের স্টেক এই গল্পে শুরুতে দেখানো হয়েছে, বাকি গল্পে কেন যেন অতোটা আর জমেনি। আর বলবো হাকিনীর কথা। জমাট জিনিস। অথচ, গল্পের শেষ দুই তিন লাইন মনে হয় পুরো গল্পের পরিবেশকে হালকা করে দিয়েছে। সব মিলিয়ে খুবই ভালো সময় কেটেছিল এ বইয়ের সাথে। মনে হয়েছিল ঐতিহাসিক মারপ্যাঁচে না পড়ে লেখক শুধু যদি অতিপ্রাকৃতে মন দেন, আরও আরও অসাধারণ সব গল্প পাবো তার থেকে আমরা। এ মুহূর্তে হাতের কাছে আছে বিবলিওফাইল থেকে বেরনো তার সাম্প্রতিক নভেলা বেতাল। প্রিমাইজ যথারীতি দুর্দান্ত। কোন এক বৃষ্টির রাতে শুরু করে দেব জানি। মুহম্মদ আলমগীর তৈমূরের দুর্বল গল্পও আমি পড়তে চাই, পরিবেশ নির্মাণের এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে তার লেখায়। নিতান্ত ব্যস্ত অস্থির সময়েও তার যে কোন গল্পের হাত ধরে এক ঘোর লাগা সময় কাটে।
মোঃ আলমগীর তৈমুর স্যারের লেখা অতিপ্রাকৃত গল্পগুলো পড়ার ইচ্ছা থাকলেও শুরু করতে হয়েছে "দ্যা হিউম্যান কাইমেরা - বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন" বই থেকে। এর পরেই বিব্লিওফাইল থেকে স্যারের অন্যান্য গল্পসমূহ একত্রে বের হবার ঘোষণায় আলাদা ভাবে বইগুলো না কিনে "নিগৃঢ়-১" সংগ্রহ করলাম।
৬ টি গল্পের প্রতিটিতেই গা ছমছম করা বর্ননার সাথে ছোটখাটো কৌতুক দেয়ায় বর্ননা ছিল আকর্ষণীয়। ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন ঘটনাকে নিয়ে গল্পগুলোর সময়কাল আবর্তিত হয়েছে। একই সাথে ঘটনার স্থানগুলো গল্প অনুযায়ী দেশের রাজধানী থেকে নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে।
এই বইতে প্রথম দুটি গল্প "বংশালের বনলতা" এবং "হাকিনী" আমার ব্যক্তিগতভাবে বেশ পছন্দের। এই দুটি গল্পেই লেখক একটু কম প্যাঁচাল পেড়েছেন৷ বাকি গল্পগুলিও ভালো। কিন্তু লেখক ইতিহাস বা পেছনের কথা বলতে বলতে এতো দূরে চলে যান যে মূল গল্পের থেকে আলাদা হয়ে যায় সেটা। আর স্টাইলটাও একটু একঘেয়ে। ব্যাকস্টোরি বলার সময় যদি কাহিনীটাকে আরেকটু কনভারসেশনাল রাখতেন তাহলে পড়তে ভালো লাগতো। একসাথে পুরো ইতিহাস একজনের মুখ দিয়ে না বলিয়ে সেটাকে ভাগ করে দেওয়া যায় তাহলে পড়তে বেশ লাগে। এই জায়গাতেই লেখককে আসলে উন্নতি করতে হবে৷ এছাড়া গল্পের প্লট, ক্লাইমেক্স এবং এণ্ডিং সবই আমার বেশ সলিড লেগেছে৷ গল্প বলার একঘেয়ে ধরনের জন্য একটা স্টার কম দিয়েছি।
দ্য হিউমেন কাইমেরা- বজ্রযোগীর প্রত্যাবর্তন পড়েই আমি তৈমুর সাহেবের ফ্যান হয়ে গেছি। লেখার মধ্যে তার হুটহাট হিউমার বেশ লাগে। তবে এখানে একটা সমস্যাও আছে। যখন মেজাজ খারাপ নিয়ে উনার বই পড়তে বসি তখন এসব হিউমার প্রদর্শন কেন জানি না ওভার স্মার্টনেস দেখানোর মত লাগে! যাই হোক...
তৈমুর সাহেবের এসব গল্প আগেই নাকি প্রকাশিত হয়েছিলো। এবার ছয়টি গল্প একই বইয়ের ভিতরে। যদিও আগে আমার তৈমুর সাহেবের লেখার সাথে পরিচয় ছিল না। দ্য হিউমেন কাইমেরা দিয়েই শুরু।
প্রথমত, উনার বইয়ে অনেক তথ্য থাকে। প্রাচীন কোন কাল্ট, আর্টিফ্যাক্ট, স্থাপনা, মিথ ঘিরেই তথ্যের পাশাপাশি এসব গল্প চলতে থাকে। গল্পগুলো ভিন্ন ধরণের। অতিপ্রাকৃত গল্প বলতে শরীর হিম করা ভয়ানক গল্প না যেখানে শুধু ভূতপ্রেতই থাকবে। প্রত্যেকটি গল্পই সুন্দর। মনোযোগ সহকারে পড়লে বেশ লাগবে। আমি উপভোগ করেছি প্রতিটি গল্প।
বইয়ের প্রোডাকশন আমার পছন্দ হয়েছে। প্রচ্ছদ এবং নামলিপি দুইটাই আকর্ষণীয়। বইটি কালেকশনে রাখা যায়।
সমস্যাটা হয়েছে গল্পগুলো একই ধাঁচের হওয়াতে। ইতিহাস আর মিথের আশ্রয়ে রচিত চমৎকার সব ভৌতিক গল্প। আলাদা আলাদা গল্প সংকলনে থাকায়, গল্পগুলোর এই সদৃশতা চোখে পড়ে নি। একসাথে নিয়ে আসায়, আর আমি টানা পড়ায় শেষের দিকে কিছুটা একঘেয়ে লেগেছে। বংশালের বনলতা সবচাইতে জনপ্রিয় হলেও, ইব্রাহীম কাদরির মৃত্যু আমার মতে এই বইয়ের সেরা গল্প। মাস্ট রিড ফর এভরি বুক লাভার। এই একঘেয়েমি পেয়ে না বসলে অনায়াসে ৪ তারকা বই।
প্রাচীন মিথ, কাল্ট, ইতিহাসের সমন্বয়ে ভিন্ন রকমের অতিপ্রাকৃত দুর্দান্ত ৬টি গল্পের বই 'নিগৃঢ়', যেখানে লেখকের গল্প বর্ণনা ভঙ্গি যুক্ত করেছে এক অন্য মাত্রা, যা পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে বাধ্য। ৬টি গল্পের মধ্যে বইটির সবথেকে ভালো লেগেছে 'কালো পাথর' গল্পটি।
বইটিতে বিবলিওফাইলের প্রোডাকশন কোয়ালিটি, লর্ড জুলিয়ানের প্রচ্ছদ দারুণ হয়েছে।