উপনিবেশ স্থাপনকারী দেশগুলোর জনগোষ্ঠী সভ্য, সংস্কৃতবান ও উন্নত আর উপনিবেশিতরা অসভ্য, বর্বর ও সংস্কৃতিহীন; উপনিবেশিতদের সভ্য আর সংস্কৃতবান করার জন্যই উপনিবেশ স্থাপন করা হয়েছে। পশ্চিমা দার্শনিক-চিন্তাকদের মতে ইতিহাসের মূল স্রোতে ঢোকার জন্য অন্যদের উপনিবেশিত থাকার দরকার ছিল। এভাবে পশ্চিম চিন্তক-দার্শনিকরা সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী হয়ে এমন একটি চেতনা দাঁড় করিয়েছে যা উপনিবেশিতদের খাটো করে, তাদের মনোজগতে হীনম্মন্যতার বোধ সৃষ্টি করে। উপনিবেশবাদে প্ররোচিত হয়েই তারা এরূপ বুদ্ধিবৃত্তিক সন্ত্রাস চালিয়েছে। উপরন্তু এই আধিপত্য বিস্তার ও স্থায়ী করার লক্ষ্যে পশ্চিমারা অধিগত দেশসমূহে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত একটি শ্রেণী তৈরি করেছে, যারা ঔপনিবেশিক শিক্ষা এবং আধিপত্যের মহত্ত্ব প্রচার করে। উত্তর-ঔপনিবেশিত রাষ্ট্রের অনেক মেধাবী চিন্তক দাঁড়িয়েছেন এ ডিসকোর্সের বিরুদ্ধে। যারা এই এককেন্দ্রিক প্রতারণাপূর্ণ উপস্থাপনার বিরোধিতা করে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে প্রাক্তন উপনিবেশসমূহে উপনিবেশবাদ-সৃষ্ট মন্দ প্রভাব ও বিকৃতি শোধনেও তৎপর তাঁরা। এ সংকলনে এইসব উত্তর-ঔপনিবেশক চিন্তকদের লেখাই সংকলিত হয়েছে। যারা পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, বলেছেন নিজেদের সমাজ ও সংস্কৃতির কথা, অস্তিত্বসংলগ্ন বাস্তবতার কথা; আর উম্মোচন করেছেন উপনিবেশবাদের কৌশল ও উদ্দেশ্য। সর্বগ্রাসী এই অশুভ শক্তি উপনিবেশিত মানুষদের দেহ-মনকে এমনভাবে অধিগত করে রেখেছে যে, তাদের পক্ষে পুনরায় স্বরূপে প্রত্যাবর্তন করা রীতিমতো দুরূহ ব্যাপার। এ থেকে উত্তরণ সোজা নয়, তার জন্য দরকার বৈপ্লবিক মানসিক দৃঢ়তা। একইসঙ্গে উপনিবেশবাদী ডিসকোর্সের বিরুদ্ধে জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে গড়ে তুলতে হয় প্রতিরোধ। দীর্ঘ-জটিল সেই সংগ্রামের অংশ হিশাবে এই গ্রন্থটির আত্মপ্রকাশ। তাই বলা যায় বাংলাদেশ তথা বাংলা ভাষায় এটি এক অনন্য উদ্যোগ।