বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তন্ত্র তৎকালীন বাংলার শিক্ষিত সমাজে রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল। অধিকাংশ শিক্ষিত ও সংস্কৃতিসম্পন্ন মানুষ একে কুসংস্কার এবং/অথবা কুরুচিপূর্ণ কিছু আচার বা জীবনশৈলী হিসেবেই দেখছিলেন। তারই পাশাপাশি অনেকে সত্যিই জানতে চাইছিলেন, তন্ত্র বলতে ঠিক কী বোঝায় এবং তার তাৎপর্য কী। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে তথা এই নিয়ে নানা সংশয়ের যথাসম্ভব নিরসনের উদ্দেশ্য নিয়ে পণ্ডিত, তার্কিক এবং সুলেখক হিসেবে পরিচিত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় "প্রবাহিণী" পত্রিকায় এই এগারোটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আলোচ্য বইয়ে বিমলেন্দু চক্রবর্তী'র মূল্যবান ভূমিকা-র পর সেই প্রবন্ধগুলো একে-একে পরিবেশিত হয়েছে। তারা হল~ ১. তন্ত্রের সৃষ্টিতত্ত্ব ২. তন্ত্রের দেহতত্ত্ব ৩. কাম ও মদন ৪. পঞ্চ ম'কার ৫. মানস পূজা ৬. তন্ত্রে মূর্তিপূজা ৭. শিব ও শক্তি ৮. শ্রীশ্রীদুর্গোৎসব ৯. শিবরাত্রি ১০. তন্ত্রের ঐতিহাসিক মূল্য ১১. বাঙলার তন্ত্র ঠিক কোন-কোন বৈশিষ্ট্য এই লেখাগুলোকে বাজারে প্রচলিত গাদা-গাদা বইয়ে পাওয়া লেখার থেকে আলাদা করে দেয়? প্রথমত, লেখাগুলোতে ভাবালুতার লেশমাত্র নেই। অসম্ভব আধুনিক, কঠোরভাবে যুক্তিবাদী কোনো মানুষও যাতে তন্ত্রের নানা গ্রন্থে ও ব্যাখ্যায় নিহিত দর্শনকে উপলব্ধি করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্য নিয়েই এই প্রবন্ধগুলো লিখিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, যেকোনো গুরুমুখী বিদ্যার মতো তন্ত্রের প্রতিটি পর্যায় বা স্তরও যে হাতে-কলমে সাধনার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়, সেই জিনিসটিই প্রাবন্ধিকের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এখানে বারবার বলা হয়েছে, মেড-ইজি মুখস্থ করে এর কিছুই বোঝা যায় না। আদিরসাত্মক চটি বইয়ে যেমন আদিরসের মহিমার একটি বিকৃত অপচ্ছায়াই শুধু দেখা যায়, না বুঝে তন্ত্রের মধ্যে সুপ্ত দেহতত্ত্বের অভ্যাস করলেও তেমন বিকৃতিই প্রাপ্তি হবে। তৃতীয়ত, শাক্ত পদাবলি থেকে শুরু করে দৈনিক সংবাদপত্র— সবকিছুর সঙ্গে প্রাসঙ্গিকতার তুলনা করে প্রাবন্ধিক বুঝিয়েছেন, কতখানি প্রবলভাবে আধুনিক ও সমাজ-সম্পৃক্ত ভাবনার বিস্তার ঘটেছে তন্ত্রে।
প্রায় আশি বছর পুরোনো এই বইটি এখন নতুন চেহারায় নতুনভাবে ছাপা হচ্ছে৷ সেটি এমনিতে সর্বাঙ্গসুন্দর, তবে চাঁদে কলঙ্কের মতো তার প্রচ্ছদে লেখকের নামের বানান ভুল থাকাটা বড়োই কষ্ট দিল। এর কিছু লেখা প্রাবন্ধিকের নির্বাচিত লেখার সংকলনে পাওয়া যায়। কয়েকটি লেখা 'তন্ত্র পরিচয়' নামক বইয়েও পাবেন। সেগুলো হাতের কাছে না থাকলে, অথচ তন্ত্রের প্রকৃত ধরন ও ধারণ সম্বন্ধে জানার আগ্রহ থাকলে এই বইটি আপনাকে পড়তেই হবে।