২০২০-র অগাস্টে প্রত্নগবেষক চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত'র প্রয়াণে ইতিহাস ও সংস্কৃতির জগতে শোকের ছায়া বড়ো ঘন হয়ে এসেছিল। সেই সময় সুধীজন তাঁর যে বইটির কথা বারবার উল্লেখ করেছিলেন, তা হল 'বিষ্ণুপুরের মন্দির টেরাকোটা।' পরবর্তীকালে শ্রীদাশগুপ্ত'র অন্য বহু গবেষণাগ্রন্থ এবং প্রবন্ধ-নিবন্ধ নিয়ে চর্চা হলেও রাঢ়চর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ ওই বইটি দীর্ঘদিন ছাপা ছিল না। অবশেষে, গ্রাম বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাস নিয়ে অনলস কাজ করে চলা টেরাকোটা সেই বইটিকে এনেছে, তাও পরিবর্ধিত আকারে। প্রায় চল্লিশ বছর আগে প্রকাশিত প্রথম সংস্করণের 'ভূমিকা', পরবর্তী টেরাকোটা সংস্করণের 'ভূমিকা' এবং প্রকাশকের বক্তব্যের পর শুরু হয়েছে মূল বইটি।
বিষ্ণুপুরের মন্দির নিয়ে কাজের কথা বলতে গেলে প্রথমেই ডেভিড ম্যাক্কাচ্যনের কথা আসে। তাঁর লেখা The Temples of Bankura District-এর সঙ্গে যদি তুলনা করি, তাহলে এই বইয়ের প্রকৃতিগত স্বাতন্ত্র্য এইভাবে বোঝানো যায়~ ১. ম্যাক্কাচ্যনের বইয়ে মন্দিরের অবস্থান, নির্মাণ এবং আকৃতির পুঙখানুপুঙখ বিবরণ পাওয়া যায়। আলোচ্য বইয়ে মুখ্য কয়েকটি মন্দিরের নানা খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা থাকলেও ঠিক ওইরকম বিবরণ নেই। তবে বিষ্ণুপুরের পঞ্চাশটি মন্দিরের স্থান, নির্মাণকাল এবং পূজিত দেবতার তালিকা এতেও আছে। ২. ম্যাক্কাচ্যনের সম্পূর্ণ ফোকাস মন্দিরের গঠন ও শৈলীতে নিবিষ্ট। আলোচ্য বই কিন্তু সমকালীন ইতিহাস এবং ধর্মীয় ভাবধারা কীভাবে এই বিশেষ গঠন ও শৈলীকে গড়ে তুলল— তাকেই খুঁজতে চেয়েছে।
মূলত এই দ্বিতীয় কারণেই বইটি টেরাকোটা মন্দিরের ক্ষেত্রে তো বটেই, বিষ্ণুপুর তথা রাঢ়ের ইতিহাস-চর্চাতেও একেবারে ভিত হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে শ্রীদাশগুপ্ত দেখিয়েছেন: (ক) কীভাবে ও কেন এযাবৎ কাঠ ও পাটাতে দেখানো অলংকরণই এই মন্দিরের দেওয়ালে, চূড়ায় এবং অন্দরে ফুটে উঠল; (খ) আপাতভাবে বৈষ্ণব বা শৈব মন্দির হলেও এই মন্দিরের অলংকরণে সুফি-দরবেশ ও নানা লোকায়ত সাধকের ছবির মাধ্যমে সহজিয়া সাধনাও স্থা পেয়েছিল; (গ) পারস্যের গঠনশৈলীকে আঞ্চলিক আবহাওয়া ও উপাদান অনুযায়ী আত্তীকরণের এই ধারা প্রতিবেশী অঞ্চলেও কেমন প্রভাব ফেলেছিল।
ম্যাক্কাচ্যনের মতো শ্রীদাশগুপ্তও লিখেছেন, সময়ের সঙ্গে, মূলত পশ্চিমী স্থাপত্যরীতির অনুকরণ করতে গিয়ে এই ঘরানা প্রথমে নিষ্প্রাণ ও পরে পরিত্যক্ত হয়। তবে সেই স্তরে পৌঁছোনোর আগে বিষ্ণুপুরের বুকে যে অতুল সম্পদ নির্মিত হয়েছিল, তার একটি মনোজ্ঞ ও সুখপাঠ্য বিশ্লেষণ পরিবেশিত হয়েছে এই বইয়ে।
বইটিতে লেখার মাঝে-মাঝে আছে সাদা-কালো অলংকরণ, মন্দিরের প্ল্যান, রঙিন ছবির মাধ্যমে নানা শৈলীর প্রভাব-নির্দেশ, সর্বোপরি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ক'টি মন্দিরের সাদা-কালো ছবি। এদের উপস্থিতির কারণে বইটিকে বিষ্ণুপুরের মন্দির তথা টেরাকোটা শিল্পের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক ফোলিও হিসেবেও পড়া চলে। 'টেরাকোটা' সংস্করণ প্রকাশ উপলক্ষ্যে এতে সংযোজিত হয়েছে লেখকের একটি প্রবন্ধ এবং প্রথম প্রকাশের পর বইটি নিয়ে বিশিষ্টজনের অভিমত।
আপনি কি বাংলার এই অসামান্য শিল্প ও স্থাপত্য বিষয়ে আগ্রহী? যদি হন, তাহলে প্রয়াত গবেষকের এই অসামান্য কাজটি আপনার অবশ্যপাঠ্য। অলমিতি।