ঘুম থেকে উঠে স্বপ্নকে মনে করার চেষ্টা করেছেন কখনও? নিশ্চয় করেছেন। কিন্তু পেরেছেন কি? উঁহু। ওদের ধরা যায় না। যত বেশি করে ওদের মনে করার চেষ্টা করবেন, একেবারে খাঁটি হাইজেনবার্গীয় নীতি অনুযায়ী ওরা ততই অধরা রয়ে যাবে। অথচ স্বপ্নগুলো যে আমরা দেখেছিলাম, এ-বিষয়ে কোনো সংশয় থাকে না আমাদের মনে। জীবনেও কি এমন হয়? হয়। স্মৃতি, অনুভূতি, কল্পনা... অনেক ক্ষেত্রে এদের আর ধরা যায় না। মনে হয় যেন এগুলো অন্য কারও সঙ্গে হয়েছিল— "হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে।" সত্যিই যদি এগুলো আমাদেরই সঙ্গে, কিন্তু অন্য কোথাও হয়? সে এমন জায়গা, যাকে আমরা অনুভব করলেও দেখতে পাই না, দেখতে পেলেও ছুঁতে পারি না, ছুঁতে পারলেও ঢুকতে পারি না, আর ঢুকতে পারলে... ফিরতে পারি না! তেমন এক জগতের টুকরো-টুকরো ছবি, শব্দ, টুপ্-টাপ্ আর কুয়াশা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই বইটি। এতে যে ষোলোটি ছোটোগল্প আছে, আগে তাদেরই বরং নাম লিখি~ ১. জ্যোৎস্নার পাখি ২. অভিন্ন ৩. অন্য কারো জীবন ৪. অন্য কোথাও ৫. সমান্তরাল ৬. সিঁড়ি ৭. মামাবাড়ির সেই তেনারা ৮. সময়ের বাঁকে ৯. বনের আরো গভীরে ১০. রুদ্রাণী ১১. টুনিদিদিমার বাড়ি ১২. দেয়ালের ও-ধারে ১৩. গোলকধাঁধা ১৪. খেলাবাড়ি ১৫. গাছটা ১৬. কল্পনা গল্পগুলো একেবারে নিটোল এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু নিজস্ব রহস্যময়তা আর ব্যক্ত-অব্যক্ত ভাব নিয়ে তারা সম্মিলিতভাবে একটা অন্য পৃথিবীর সন্ধান দেয়। সে যেন থেকেও নেই! তার কিছু চেনা, আর কিছুটা অচেনা। সবচেয়ে বড়ো কথা, তার নাগাল পেতে গেলে আলোকবর্ষ পাড়ি দিতে হয় না। গল্পগুলো পরপর, একবারে পড়তে গেলে তাতে কিছু কমন ট্রোপের সন্ধান পাওয়া যাবে। যেমন ধরুন, এখানে বারবার নানা গল্পে এসেছে একটা বিশেষ আকারের মূর্তি, এসেছে সিঁড়ি, এসেছে দুঃখিনী মায়ের সঙ্গে অন্য এক কুয়াশাচ্ছন্ন জগত থেকে ধরার ধূলিতলে এসে পড়া কোনো শিশুকন্যা। এগুলো বাংলা মৌলিক লেখায় সেভাবে ব্যবহৃত নয়। বরং লাভক্র্যাফটের মিথোজে তথা কিং প্রমুখের লেখায় তার রূপান্তরে, জেমসের গথিক হররে, এমনকি 'তুল্প' বিষয়ক কাহিনিতে আমরা এদের দেখেছি। বিমল কর তাঁর কিছু লেখায় এই "অন্য জগতের" সন্ধান দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই "কিশোর ফিরে এসেছিল" বা "হারানো জিপের রহস্য" আমি আজও ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারিনি। এই বইয়ের লেখারা কিন্তু সহজবোধ্য নয়, স্বাদে ও গন্ধে একেবারে মৌলিকও বটে। এদের পড়তে গিয়ে দুটো জিনিস উল্লেখযোগ্য বলে মনে হল~ (ক) একান্ত বাঙালি সুখের নীল পটভূমিতে ঘরোয়া দুঃখের কালো আর ক্রোধের লাল— এই রঙেই চালিত তথা তাড়িত হয়েছে গল্পের আখ্যানেরা। তারই মাঝে আছে প্রেম, আছে স্বপ্ন, আছে অনেক আশা আর নতুন শুরুর উদ্ভাস। (খ) গল্পগুলোর ভাষা পুরোপুরি লীলা মজুমদারের টপ ফর্মকে মনে করিয়ে দিল। ভাবলে অবাক লাগে, এমন প্রাপ্তমনস্ক গল্পগুলোতেও ওই হালকা মজাকিয়া, ছলাৎছল ভাষা কী অসামান্যভাবে মানিয়ে গেছে! এর বেশি কিছু লিখব না। এমনকি এও লিখব না যে এগুলো অলৌকিক কাহিনি, না পরাবাস্তব আখ্যান। শুধু বলব, এই বইয়ের ষোলোটি গল্প এক কুহেলি মায়ায় ভরা— পড়তে শুরু করলে যাদের হাতছানি উপেক্ষা করা অসম্ভব। জয়ঢাক-এর বইয়ের ছাপা, বানান, লে-আউট সবই ভীষণ ভালো। গোটা বইয়ে আর প্রচ্ছদে একটিই ছবির মোটিফ হিসেবে ব্যবহারে একটি পরিমিতির ভাব স্পষ্ট— যা সদাই স্বাগত। যদি ভূত, ভয়, অপরাধ— এইসব বাদ দিয়েও রহস্যের গল্প পড়তে চান— যারা আপনাকে নিয়ে যাবে অন্য কোথাও, তাহলে এ একেবারে অবশ্যপাঠ্য বই!
আমাদের রোজকার দুনিয়ার সাথে পরাবাস্তবের যোগাযোগ নিয়ে একসারি লেখা। অনেকটা লীলা মজুমদার যদি লাভক্র্যাফটিয়ান হরর নিয়ে লিখতেন তাহলে হয়ত এরকম হত। চরিত্রগুলি খুবই চেনা, অনেকসময় মনে হবে আমাদেরকে নিয়েই হয়ত লেখা। সব গল্পের নিচ দিয়েই একটা চাপা আতঙ্কের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। মেঘলা দিনের পড়ার জন্য আদর্শ। তবে একটি যেন একঘেয়ে হয়ে যায় একই মোটিফের রিপিটেশনের জন্য। তবে সেইটাই হয়ত ছিল লেখকের উদ্দেশ্য, একই মোতিফকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ফেলে দেখা কীরকমভাবে সেটা প্লট ও চরিত্রের ওপর প্রভাব ফেলে।
অলৌকিক, প্রতিদিনকার দুনিয়ার সাথে পরাবাস্তবের যোগাযোগ ও পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, স্বপ্ন, সবগুলোর মিশ্রণে ভয় না পেলেও গা ছমছম করাবে। গল্পের ধরণে "লীলা মজুমদার" এর ছাপ পাওয়া যায়। রোজকার চেনা জীবনের মধ্যে অলৌকিকের গভীর যাতায়াতের শরদিন্দুসুলভ ঘরাণাকে লেখিকা-আত্মীকরণ করে নিয়ে নিজস্ব নারীত্বের আলোয় তাকে নতুন করে রঞ্জিত করেছেন। একঘেয়েমি আসার মতো প্রতিটা গল্পে আলাদা ভিন্ন কিছু না রেখে একই বিষয়বস্তু শুধু বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে বুঝিয়েছে। কিন্তু ষোল'টার মধ্যে কয়েকটা গল্প বেশ ভালো। ছিটেফোঁটা ফ্যান্টাসির ভাবও আছে, তবে মুখ্য নয়।
বইয়ের নাম ও প্রচ্ছদ গল্প অনুযায়ী হারে-হারে মিলেছে। 'দেখি পড়ে কেমন হয়েছে' মনোভাবে পদ্মজার মতো বই ছয়শ/সাতশ টাকা দিয়ে কিনতে পারেন, তারা অন্তত সাহিত্যকে নিজের আসল রুপ দেখানোর সুযোগ দিন 'সমান্তরাল' বইটা কিনার পর পড়ে। আসল সাহিত্যের বইগুলো পড়তে গিয়ে লেখা গুলোর গুরুত্ব নিজ-সীমা অনুযায়ী সুবোধ্য নাও হতে পারে, এতো গভীরতা! তাই সাধারণ থেকে শুরু করুন।
অলৌকিক গল্পের প্রতি অল্প বিস্তর আকর্ষণ বেশীরভাগ পাঠকেরই থাকে , স্বাভাবিকভাবে আমারো রয়েছে । সম্প্রতি এই বিষয়ের উপর লেখা গল্প সংকলন 'সমান্তরাল' পড়লাম।
মোট ১৬ টি গল্প নিয়ে এই বই। সাধারণত অলৌকিক বিষয় বলতে যা বুঝি ভূত, অতৃপ্ত আত্মা, ভূতুড়ে বাড়ি এই সব কিছুই নেই ,প্রতিটি গল্পগুলোর মধ্যে এক অজানা দুনিয়া বা সমান্তরাল বিশ্বের কথা ঘুরেফিরে আসে।গল্পের চরিত্ররা পাঠককে সেই সব জগতে নিয়ে যায়, প্রাথমিকভাবে ফ্যান্টাসি মনে হলেও একটা গা ছমছম অনুভূতি ও রহস্যময় পরিবেশ তৈরী হয়েছে প্রতিটি লেখায়। মনে হয়না বাংলায় এই ধরনের মৌলিক লেখা আছে কিনা,তবে প্রতিটি গল্পে এক ধরনের কমন প্যাটার্ন রয়েছে ,বেশ কিছু গল্প ওপেন এন্ড মনে হয়েছে।একটা অদ্ভুত রকম টান অনুভব হয় গল্পগুলি পড়বার সময়ে। তাই ধীরে ধীরে গল্পগুলি পড়তে ভালো লাগে।সেই সব অচেনা জগতে গল্পের চরিত্রগুলির আসা যাওয়া , দুটি জগতের দোলাচলে নিজেদের নতুন করে চেনা, বাস্তব ও পরাবাস্তবের পারস্পরিক দ্বন্দ এই সব মিলিয়ে ভালোই লাগলো এই বই। এক নতুন ধরনের পাঠ অভিজ্ঞতা হলো বলা যায়।লেখনী মনোগ্ৰাহী , একঘেয়ে নয় বরং একটা কি হয় কি হতে পারে মূহুর্ত তৈরী হয়েছে বারবার। গল্পের মধ্যে লেখিকা অন্য রহস্যময় জগতকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন সেইসব পড়তে বেশ উপভো��্য লেগেছে। ব্যক্তিগতভাবে 'জ্যোৎস্নার পাখি','অভিন্ন','অন্য কারোর জীবন', 'সমান্তরাল', 'সিঁড়ি', 'সময়ের বাঁকে','বনের আরো গভীরে' , 'দেওয়ালের ও-ধারে', 'গোলকধাঁধা','খেলাবাড়ি',ও 'গাছটা' এই গল্পগুলি বেশ ভালো লাগলো।
বই এর নামকরণ ও প্রচ্ছদ বিষয় অনুসারে একদম পারফেক্ট মনে হয়েছে, প্রোডাকশন ফন্ট সাইজ বেশ ভালো। অন্যরকম অলৌকিক ঘরানার লেখা পড়তে চাইলে পড়তে পারেন এই বই
The best collection of paranormal stories I have read recently. The storytelling is flawless, reminds me of Leela Majumder and Ashapurna Debi..the plots and characters are strong and love the touch of strong feminism in the writing style... Will definitely keep an eye out for more of her work..Kudos to the publishers for getting such a gem of a writer to the forefront! Superb!
সুন্দর গদ্য। ভয় না লাগলেও গা ছমছম করে। ঘুমোতে ভয় হয় হয়তো স্বপ্নে অন্যরকম কিছু দেখে ফেলতে পারি এই ভাবনায়। তবে গল্পগুলো প্রায় একই। বৈচিত্র্য খুব কম। হয়তো লেখিকা একটিই সমান্তরাল দুনিয়া দেখাতে চেয়েছেন যা বিভিন্ন গল্পে বিভিন্ন চরিত্রের কাছে ধরা দেয় কিন্তু যেহেতু গল্পগুলো স্বতন্ত্র ও চরিত্রের মধ্যেও যোগাযোগ নেই তাই সব গল্পে একই দুনিয়ার ছবি ঘুরেফিরে এলে একঘেয়ে লাগে। কয়েকটি গল্প খুবই ভালো।
মায়ায় ভর করে অলৌকিক জগতে পারি দিতে চান তো এ লেখা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। ঘর, গৃহস্থ, চারিপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসের ভিতর দিয়ে প্রবেশ করবেন অলৌকিক পরাবাস্তবের জগতে। ভাষা সাবলীল এবং সুখপাঠ্য।