সোশ্যাল মিডিয়ায় অলৌকিক ও রহস্য গল্প লেখালেখির সুবাদে পবিত্র ঘোষ রীতিমতো জনপ্রিয়। তাঁর প্রথম একক গল্প-সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছে। নাতিদীর্ঘ 'ভূমিকা'-র পর তাতে আছে~ ১. টফি ২. লং ড্রাইভ ৩. ইচ্ছাপূরণ ৪. কাহামারী ৫. চানপুকুরের কাক ৬. রাত দশটার পর ৭. মংলু ৮. ব্ল্যাক ডেথ ৯. স্লিপ ওয়াকার ১০. আদমখোর এই গল্পগুলোর সবচেয়ে বড়ো বিশেষত্ব হল~ প্রথমত, এরা ভূতের নয়, বরং ভয়ের গল্প। দ্বিতীয়ত, সেই ভয়ের আবহটি নির্মাণের জন্য লেখক অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং নির্ভার একটি গদ্যভাষা ব্যবহার করেছেন। তৃতীয়ত, গল্পগুলোতে ভয়ের উপাদান হিসেবে তন্ত্র-মন্ত্রের বদলে আদিম সংস্কার থেকে কল্পবিজ্ঞান— সবই ব্যবহৃত হয়েছে। গল্পগুলো ভালো। আর বইটিও ছাপায়, হেডপিসে, লে-আউটে ভারি চমৎকার। তাই এই সংকলনটিকে স্বচ্ছন্দে উপভোগ করতে পারবেন বলেই আমি মনে করি। অলমিতি।
বইটিতে সর্বমোট ১০টি গল্প আছে। অলৌকিক ঘরানার। আমি প্রত্যেকটি গল্প ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। তবে তার আগে আসি প্রচ্ছদটির সম্বন্ধে। প্রচ্ছদের মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠেছে অলৌকিকতা। যদিও আমার মনে হয়েছে এই গল্পগুলোর বেশ কিছুতেই সাইকোলজি এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।
প্রথম গল্প – টফি – কোওলরোফোবিয়া কি জানেন? মানে হল ক্লাউনের ভয়। আনন্দ দেওয়ার ব্যক্তিটি যখন ভয়ে পরিণত হয় তা যে কী মারাত্মক হতে পারে তা আমরা ‘জোকার’ সিনেমাটা যারা দেখেছি তারা সবাই জানি। কিন্তু যারা কোওলরোফোবিয়ায় ভোগে তারাও কি ভয় সৃষ্টি করতে পারে?
দ্বিতীয় গল্প – লং ড্রাইভ – ছুটির দিনে লং ড্রাইভে যেতে কার না ভালো লাগে? শহর ছেড়ে গ্রামের অজানা রাস্তার পথে বাঁধনহীন ভাবে বেরিয়ে যাওয়ার এক আলাদাই মজা আছে, তাই না? কিন্তু সেই লং ড্রাইভই কি হয়ে উঠতে পারে বিভীষিকাময়? জানতে হলে পড়তে হবে এই গল্পটি।
তৃতীয় গল্প – ইচ্ছাপূরণ – কেমন হবে যদি আপানার হাতে হঠাৎ করেই এক আলাদীনের প্রদীপ এসে যায়? কিন্তু প্রদীপের জীন যদি আপনার ইচ্ছাপূরণের জন্যে শর্ত আরোপ করে দুটো কঠিন সিদ্ধান্তের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলে তাহলে কি সেই ইচ্ছাপূরণের মধ্যে কোনও আনন্দ থাকবে? নাকি গ্রাস করে নেবে আপনার আনন্দকে?
চতুর্থ গল্প – কাহামারী – জঙ্গলের নাম কাহামারী। জঙ্গল কি শুধু জন্তু-জানোয়ারদেরই বাসস্থান? নাকি সেখানে থাকতে পারে অশরীরীরাও?
পঞ্চম গল্প – চানপুকুরের কাক – গল্পটা পড়ে চানপুকুর বলে সত্যিই কোনো জায়গা আছে কিনা আমি খুঁজে দেখার চেষ্টা করছিলাম ইন্টারনেটে। কেন চানপুকুরে কাকদের চোখগুলো সব ফ্যাকাশে সাদা আর মাঝে কালো মণি? কেনই বা এখানে কাকদের দেবতা ‘বাহাবী’কে দেবতাজ্ঞানে পুজো করা হয়? জানতে গেলে পড়তে হবে এই গল্প।
ষষ্ঠ গল্প – রাত দশটার পর – কলেজে পড়াশোনার সাথে সাথে পার্ট টাইমে কাজ তো অনেকেই করে। কিন্তু সেই কাজ যদি বিজয় রানাওতের বাড়ির সংগ্রহশালার হিসেব রক্ষার কাজ হয় তাহলে বোধহয় কাজটা সুখের হয় না। বিশেষত সেই সংগ্রহশালা যার মধ্যে প্রাচীন অস্ত্রশস্ত্র, যুদ্ধের পোশাক, দেওয়াল ঘড়ি ইত্যাদি ছাড়াও রাখা থাকে মিশর থেকে সংগৃহীত একটি মমি। আর সেই মমি যদি কখনো জেগে ওঠে…???
সপ্তম গল্প – মংলু – অর্থাৎ মংলুবুড়ো যে নাকি পুতুলের খেলা দেখায় মহেশগঞ্জে। কিন্তু তার পুতুলগুলো অন্য পুতুলের থেকে আলাদা। ঠিক যেন জ্যান্ত পুতুল। এই মহেশগঞ্জেই সাগরের বাল্যবেলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সাগর আর তার তিন বন্ধুর মংলুবুড়োর এই পুতুলনাচের খেলা দেখার নেশা পেয়ে বসেছিল স্কুল ফেরতা পথে। তারপর একদিন হঠাৎ করেই সাগরকে নিয়ে তার বাবা-মা কলকাতায় চলে আসে। পনেরো বছর পর সাগরের আবার সেই মহেশগঞ্জে আসার সুযোগ ঘটে। বাকি তিন বন্ধুর সাথে দেখা করার প্রবল বাসনা জেগে ওঠে সাগরের। কিন্তু দেখা হবে কি?
অষ্টম গল্প – ব্ল্যাক ডেথ – প্রাচীন এক চিনা পুঁথি কথকের হাতে এসে পড়ে কোনভাবে। পুঁথি না বলে সেটাকে ডায়েরি বলাই ভালো। ডায়েরির লেখক তার মনিব সুয়াং-এর মতই চিকিৎসক হতে চান। সুয়াংও লেখককে পুত্রতুল্য স্নেহ করেন। কিন্তু একদিন সুয়াংকে দর্শন করতে এলেন মোঙ্গল উপজাতির এক সন্ন্যাসী। আর তারপর থেকেই সুয়াং এর মধ্যে এল দৈহিক ও মানসিক পরিবর্তন। কিন্তু কেন? এ কি আদৌ কোনো সন্ন্যাসী নাকি সাক্ষাৎ যম? এ সবেরই উত্তর আছে ব্ল্যাক ডেথে।
নবম গল্প – স্লিপ ওয়াকার – ‘শত্রুকে প্রাণে মারার চেয়ে তাকে মানসিকভাবে মেরে ফেলা ঢের বেশি ভয়ানক। সাইকোলজিক্যাল ড্যামেজ।’ কথাটা যে কত বড় সত্যি তাই লুকিয়ে আছে এই গল্পের পরতে পরতে। স্বপ্নের মধ্যে হাঁটাকে স্লিপ ওয়াকিং বলে। অনেকের মধ্যেই এটা থাকে। কিন্তু স্বপ্নের মধ্যে কিলিং! অবিশ্বাস্য প্লট। সব মিলিয়ে এই গল্পটাই বোধহয় আমার মনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে।
দশম গল্প – আদমখোর – জঙ্গলের প্রকৃত রাজা কে? বাঘ, সিংহ? না, তা নয়। রাজা সেই যার জোর আছে। জোর যার মুলুক তার। আর এই জঙ্গলের রাজা হল একটা কুমির। নাম কালো। কালো আদমখোর। মানুষ আর জানোয়ারের পার্থক্য হল তাদের বুদ্ধিতে। জানয়ারেরা কখনো মানুষের মত করে ভাবতে পারে না। কিন্তু পৃথিবীর সমস্ত হিংস্র দাঁতালো জানোয়ার যদি হঠাৎ করেই বুদ্ধিমান হয়ে যায় তাহলে তার পরিণাম কেমন হবে?
‘আদমখোর এবং’ লেখক পবিত্র ঘোষের প্রথম একক গল্প সংকলন। প্রতিটি গল্পই স্বতন্ত্র। প্রথম বইতেই যথেষ্ট মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছেন লেখক পবিত্র ঘোষ। বইটিতে কিছু মুদ্রণপ্রমাদ পেয়েছি। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। লেখার ভাষা সহজ সরল। তবে একটা বিষয় চোখে পড়ার মত। সব গল্পগুলোতেই লেখকই কথক। দুটো গল্প আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। ১) রাত দশটার পরে, ২) স্লিপ ওয়াকার। ভবিষ্যতে লেখকের আরও লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
চারিদিকে আজকাল প্রচুর অলৌকিক, তন্ত্রমন্ত্রের বইয়ের ছড়াছড়ি | তারমধ্যেই এই বইটা পেলাম এবং পড়ে ফেললাম বেশ কয়েকটা গল্প | যদিও সব কটা পড়া হয়ে ওঠেনি এখনো | কিন্তু এর মধ্যেই গল্পের ধরণ বা লেখকের লেখার স্টাইল সর্ম্পকে ভালো ধারণা করাই যায় | পবিত্র ঘোষের লেখা আগে পড়িনি | এই প্রথম পড়লাম | নতুন লেখককের মধ্যে একজন | এটুকু বলতে পারি ইনি লম্বা রেসের ঘোড়া হবেন | ঠিক ভূতের বা অলৌকিক গল্প সব কটাকে বলা যাবেনা | নরখাদক তো পশুও হয়, তাইনা ? কয়েকটা গল্পের হালকা বিবরণী দিচ্ছি পাঠকদের আগ্রহের জন্য | "আদমখোর" - পশু কি মানুষের মতো ভাবতে পারে ? তারা কি পারে মানুষকে ফাঁদে ফেলতে ? অনেক সময় শিকারিদের মুখে এই রকমের কথা শোনা যায় | অনেক রহস্যই তো থাকে জঙ্গলে | জানতে হলে এই গল্পটা পড়তে হবে | "ব্ল্যাক ডেথ" - এক প্রাচীন চৈনিক পুঁথির বিবরণী | এক রসায়নবিদ তথা চিকিৎসক গোপন এক অস্ত্র তৈরিতে ব্যস্ত | কারণটা হলো মঙ্গোল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত আক্রোশ | এর পেছনে অবশ্য অদ্ভূত দর্শন এক মঙ্গোল সন্ন্যাসীর মদত আছে | সেই অস্ত্র কিন্তু কোন গোলা বারুদ বা ঢাল তরোয়াল নয় | সেটা তাহলে কি ? জানতে হলে ওই চিকিসকের শিষ্যের জবানবন্দিতে লেখা এই গল্প পড়তে হবে | "কাহামারী" - এ অদ্ভুত জঙ্গল | মানুষ এখানে হারিয়ে যায় - হ্যালুসিন��শনএর শিকার হয়ে পড়ে | লেখকের গ্রামের অনেকেই আর ফেরেনি সেখানে কাঠ কাটতে গিয়ে | লেখকও ঘটনাচক্রে গিয়ে পড়েন সেখানে | তিনি কি ফিরতে পারলেন ? জানতে হলে এটা পড়তে হবে | এমনি আরো কয়েকটা গল্পের সমাহার এই বইটা | বাকি তন্ত্রমন্ত্রের বইগুলোর যা নমুনা দেখেছি - বেশিরভাগ গুলোই অনেকটা ওই দাঁত মুখ খিঁচিয়ে ভয় দেখানোর মতো | সেই তুলনায় এনার লেখা বেশ প্রাঞ্জল | গল্পের জটটা বেশ তৈরী করেন এবং ধীরে ধীরে ঘড়ির স্প্রিঙের মতো খোলেন | আমার মনে হয় ইনি বড়ো থ্রিলার উপন্যাস লিখলে দারুন জমাটি ব্যাপার হবে এক একটা |
প্রতিটি গল্প একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও এমন সব সাধারণ দৈনন্দিন জীবনের ব্যাপার নিয়ে রচনা, যা গল্প গুলো পড়ার পর তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
খুব সাধারণ অথচ সাধারণ নয় এমন সব গল্পের সমষ্টি এই বই। লেখক পবিত্র ঘোষের লেখার আদল আমার বরাবরই ভালো লাগে ও আকর্ষণ করে। তার চিন্তা ভাবনা, লেখার মোচর, প্লট সাজানো, বাক্যগঠন, অসাধারণ। যখন পড়ি, ছবির মতো চোখের সামনে দৃশ্যপট ভেসে ওঠে, সাথে গল্প গুলো পাঠককে বেঁধে রাখতে অত্যন্ত পটু। সব মিলিয়ে লেখকের সমস্ত গল্পের সহজ সরল ভাষা ও সাধারণ দৃশ্যপটে অদ্ভুত পারদর্শিতার সাথে ভয়ের প্রলেপ লাগানো আমাকে মুগ্ধ করে বার বার, প্রতিবার।
Pabitra Ghosh আগামী দিনের জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা রইল, আর এভাবেই যেন আমাদের মতো পাঠকরা এই লেখার দ্বারা সমৃদ্ধ হতে পারি তার আর্জি রইলো। 🍁
#পাঠপ্রতিক্রিয়া পুস্তক পরিচয় : আদমখোর এবং লেখিক : পবিত্র ঘোষ প্রকাশনা : কল্পবিশ্ব পাবলিকেশন
সম্প্রতি লেখক পবিত্র ঘোষের লেখা আদমখোর এবং বইটি পড়া শেষ করলাম। সংক্ষেপে পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি।
আদমখোর এবং এবং কোনও ভূতের গল্পের বই নয়। ভূত ছাড়াও যে অতিপ্রাকৃত ঘটনা থেকে ভয় পাওয়া যায় সেটাই বোঝানো হয়েছে এই বইতে। বরং বলা যায় গল্পগুলি ভূতের গল্প না হলেও ভয়ের গল্প।
গল্প পড়তে আমরা প্রত্যেকেই ভালোবাসি। সাধারণ কিছু চরিত্র এবং তাদের জীবনের কিছু ঘটনা যখন শব্দবন্ধে বাঁধা হয়, তখন তাকে গল্প বলা হয়। কিন্তু ঘটনাগুলি যখন পৃথিবী এবং প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যায় তখন তাকে অলৌকিক অথবা অতিপ্রাকৃত বলা হয়।
যা কিছু অলৌকিক, অপার্থিব তার প্রতি আমাদের প্রবল আকর্ষণ। এই অপার্থিব বিষয়কে কেন্দ্র করে ১০ টি ভিন্ন স্বাদের গল্প লেখা হয়েছে। গল্পগুলি নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করছি।
টফি : মনের ভয় যে মানুষকে কতটা মারাত্মক দিকে নিয়ে যেতে পারে তাই নিয়েই টফি গল্পটি লেখা হয়েছে। রণদেববাবুর ক্লাউনের উপরে ফোবিয়া। এই ফোবিয়া রণদেব বাবুর মতো একজন ভদ্রলোককে কতটা ভয়ঙ্কর করে তুললো তাই নিয়েই গল্পটি লেখা হয়েছে।
লং ড্রাইভ : নতুন গাড়ি কেনার পর ঋষিকেশ শখ করে লং ড্রাইভে বেরোলো। রাস্তায় বেরিয়ে কিছুক্ষণ পরে সে রাস্তার একধারে তার নতুন গাড়িটা দাঁড় করিয়ে সে একটা দোকানে বসে খাবার দাবার খেল। হটাৎ সে দেখলো ওই দোকানে একজন আধাপাগল ভবঘুরে মানুষ এসেছে। ঋষিকেশ তখন সেই ভবঘুরেকেও খুব যত্ন করে খাবার খাওয়ালো। খাবার খাওয়ার পরে হটাৎ করে সেই আগন্তুকটি ঋষিকেশের গায়ে কাদা ছুঁড়ে মারলো। ঋষিকেশ খুবই বিরক্ত হল এবং তারপর খাবারের দাম দিয়ে দোকান থেকে চলে এলো। এরপর আবার সে গাড়ি চালাতে শুরু করলো নতুন গন্তব্যের দিকে। এরপর সে ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে পড়লো? কি ছিল সেই সমস্যা? আদৌ কি ঋষিকেশ রক্ষা পেয়েছিল বিপদ থেকে?
ইচ্ছাপূরণ : এই গল্পের বিষয়বস্তু একটু অন্যরকম। পৃথিবীতে কোন মানুষকে বেশি প্রয়োজন আর কোন মানুষকে অপেক্ষাকৃত কম প্রয়োজন সেটা কে স্থির করবে? টুকাই নামে একটি ছেলের কাছে একটি দৈত্য মাঝে মাঝে আসে তার কোনও কাছের মানুষের প্রাণের বিনিময়ে যাতে অন্য কারোর প্রাণ বাঁচানো যায়। এরপরে কি হবে? টুকাই কি আদৌ তার কাছের মানুষদের জীবনের বিনিময়ে অন্য কাউকে বাঁচাতে পারবে?
কাহামারী : একটি অলৌকিক জঙ্গলকে নিয়ে এই গল্পটি লেখা হয়েছে। এই গল্পে কাহামারী হল একটি ভয়ঙ্কর জঙ্গল যেখানে গেলে মানুষ হারিয়ে যায়। একজন রাত কাটিয়েছিল সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গলে। কি অভিজ্ঞতা হয়েছিল মানুষটির? আদৌ কি সেই মানুষটি সুস্থভাবে বাড়ি বাড়ি ফিরতে পেরেছিল? আমার মতে এই গল্পটি হল বইটির মধ্যে সবথেকে ভয়ের গল্প।
চানপুকুরের কাক : কাক একটি আপাত নিরীহ পাখি। এই কাক আঘাত পেলে যে কতটা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠতে পারে তাই নিয়েই গল্পটি লেখা হয়েছে। গল্পটি পড়ার পরে মারাত্মক রোমহর্ষক অনুভূতি হয়।
রাত দশটার পরে : কলেজ পড়ুয়া একটি ছেলে পড়াশোনার সাথে সাথে একটি পার্টটাইম কাজ করার সুযোগ পেল। এই কাজটি হল একটি ধনী বৃদ্ধ মানুষের কিছু দরকারী হিসাবপত্রের কাজ করা। কিন্তু এই হিসাবপত্রের কাজ পুরোটাই করতে হবে ওই বৃদ্ধ লোকটির ব্যক্তিগত মিউজিয়ামে বসে। কিছুদিন কাজ পড়ার পরে ছেলেটির জীবনে কি অভিজ্ঞতা হল? আদৌ কি সুস্থভাবে তার নিজের জীবনে ফিরে আসতে পেরেছিল?
মঙলু : মঙলু হল একজন বুড়ো যে গ্রামে গ্রামে ঘুরে পুতুল নাচ দেখাত। একদিন মঙলুর সাথে পাঁচটি কিশোরের দেখা হল। ওই পাঁচজন কিশোর মঙলুর দেখানো পুতুল নাচের রীতিমতো ভক্ত হয়ে গেল। এরপরে কি হল? মঙলুর দেখানো খেলাগুলি কি নিছকই পুতুলনাচ নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও কোনও ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত?
ব্ল্যাক ডেথ : ইঁদুর একটি সাধারণ নিরীহ প্রাণী। কিন্তু এই ইঁদুর যে ক্ষেত্রবিশেষে কতটা বিষাক্ত হতে পারে তাই নিয়েই এই গল্পটি লেখা হয়েছে।
স্লীপ ওয়াকার : মার্কিনমুলুকের পটভূমিকায় লেখা এই গল্পটি সেখানকার জঙ্গল এবং জঙ্গলের মধ্যে ঘটে চলা বিভিন্ন ভয়ঙ্কর ঘটনা নিয়ে এই গল্পটি লেখা হয়েছে। তথাগত নামের একজন ব্যক্তি ফরেস্ট রেঞ্জার হিসাবে কাজ করতে গিয়ে কি কি ভয়ানক বিপদের সম্মুখীন হলেন তাই নিয়েই এই গল্পটি লেখা হয়েছে। এই গল্পে জঙ্গলের বর্ণনা এতটাই জীবন্তভাবে করা হয়েছে যে গল্পটি পড়তে পড়তে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একপ্রকার মানুষভ্রমণ হয়ে যায়।
আদমখোর : আদমখোর মান��� মানুষখেকো। আদমখোর বলতে সাধারণত বাঘের কথাই মনে হয়। কিন্তু এই গল্পে আদমখোর হল একজন কুমির। এই কুমির আঘাত পেলে যে কতটা ভয়ঙ্কর নৃশংস হয়ে উঠতে পারে তাই নিয়েই এই গল্পটি লেখা হয়েছে।
দশটি গল্প নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করলাম। গল্পগুলির মধ্যে আমার ব্যক্তিগতভাবে টফি, কাহামারী, চানপুকুরের কাক, রাত দশটার পরে এবং মঙলু এই পাঁচটি গল্প খুবই ভালোলেগেছে। তবে আমার মনে হয় স্লীপ ওয়াকার গল্পটি একটু ছোট হলে খুব ভালো হত। এছাড়া বইয়ের বাঁধাই, মুদ্রণ এবং পৃষ্ঠার গুণমাণ খুবই ভালো। বইটি পড়ার জন্য সকল পাঠককে অনুরোধ জানালাম। আশা করি গল্পগুলি আপনাদেরও ভালোলাগবে।
কাহিনী: আদমখোর এবং (গল্প সংকলন) লেখক: পবিত্র ঘোষ প্রকাশনা: মন্তাজ (একটি কল্পবিশ্ব পাবলিকেশন ইম্প্রিন্ট) মুদ্রিত মূল্য: ২৫০/- ভারতীয় মুদ্রা
প্রতিক্রিয়া: "বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা চলে না, যুক্তিকে যা গ্রাহ্য করে না এবং সবার ওপরে যার বিবরণ আমাদের মনে সঞ্চার করে রুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চ, তারই নাম অতিপ্রাকৃত।" এটা আমার কথা নয়, প্রকাশকের কথা। কিন্তু সত্যিই কি পবিত্র ঘোষের এই কাহিনী সংকলন সেই অতিপ্রাকৃত বিষয়কে যথার্থতা প্রদান করতে পেরেছে? সেটা বলার আগে বইটি সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। এই বইতে আদমখোর নামক কাহিনী সহ আরো ৯টি কাহিনী রয়েছে এবং প্রতিটি কাহিনীর প্রেক্ষাপট সাধারণ ঘটনার বাইরে। আমার যেটা ভালো লাগলো, ১০টি কাহিনীর মধ্যে অতিপ্রাকৃত বিষয় টি ছাড়া বাকি বিষয়বস্তু একদম আলাদা। লেখক কখনো বুনেছেন গ্রাম বাংলার ভূতের গল্প, আবার কখনো শুনিয়েছেন কল্পবিজ্ঞানের গল্প, আবার কখনো কখনো পাওয়া গেছে সাইকো কিলিং এর প্রেক্ষাপট কেও। তবে বিষয় বস্তু ভালো হলেও লেখনীর জোর যদি না থাকে, তাহলে এখন কার যুগে চমকে দেওয়া টা একটু কঠিনই বটে। আর এখানেই পবিত্র বাবু বাজিমাত করেছেন। এত সুন্দর আর সাবলীল ভঙ্গীতে উনি প্রতিটা কাহিনী লিখেছেন যে প্রতিটা গল্পকেই ফ্রেশ বলে মনে হয়েছে আমার (২-১ টা কাহিনীর টুইস্ট যদিও আমি বুঝে ফেলেছিলাম, তবে এতে লেখকের কোনো দোষ নেই, আমার খুব বেশি বই পড়ার নেশা এর জন্য দায়ী)। তবে যে কাহিনী টা আমার মনে দাগ কেটেছে বেশি, সেটার নাম আমি উল্লেখ করতে চাই - "ইচ্ছাপূরণ"। কাহিনী টা পড়ে আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। অনেক ধন্যবাদ জানাই লেখক কে এই কারণে। তার সাথে আরেকটা কথাও উল্লেখযোগ্য, সেটা হলো, ছোট গল্পের যেটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে আমার মনে হয়, "শেষ হয়েও হয় না শেষ" এই বিষয়টা আমি প্রায় প্রতিটা গল্পেই পেয়েছি। আমার পার্সোনালি এটা খুব ভালো লেগেছে। তার মানে এই নয় যে লেখক গল্প গুলো নিয়ে একটি মহাজগত তৈরি করতে চেয়েছেন বলেই এটা করেছে, উহু। ছোট গল্পের নিয়ম মেনে শেষে এসে পাঠকের কল্পনার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, যেটা আমি এখনকার খুব কম লেখকের লেখার মধ্যেই পাই। সেইদিক থেকে পবিত্র বাবুকে জানাই অনেক অভিনন্দন।
এবার চলে আসি, বইটির বাহ্যিক ব্যাপারে। কল্পবিশ্বের পেজের কোয়ালিটি খুব ভালো লেগেছে এবং তার সাথে প্রুফ রিডিং আমার যথাযথ বলেই মনে হয়েছে। পড়তে গিয়ে আমি খুব বেশি বানান ভুল পাইনি (২-১ টা জায়গা ছাড়া)। বাইন্ডিং কোয়ালিটিও খুব ভালো আর প্রিন্টিং একদম ঝা চকচকে। তার সাথে প্রচ্ছদ পরিকল্পনাও খুব ভালো লেগেছে, কারণ এই প্রচ্ছদের কারণেই বইটির প্রতি প্রথম আকর্ষণ অনুভূতি করেছিলাম।
খারাপ লাগা: সত্যি বলতে কাহিনী গুলো নিয়ে কোনো খারাপ লাগা আমার তৈরি হয়নি। বাট ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর।
উপসংহার: যে কোনো রকম হরর প্রিয় পাঠকের কাছে এই কাহিনী সংকলন আমার তরফ থেকে ১০০% রেকমেন্ড রইলো। যারা যারা নেটফ্লিক্সের লাভ, ডেথ অ্যান্ড রোবট সিরিজটি দেখেছো এবং ভালো লেগেছে, তাদের জন্য এই কাহিনী সংকলন ট্রিট হতে চলেছে। পবিত্র বাবুর এরকম লেখা পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকলাম।
"আদমখোর এবং" লেখক পবিত্র ঘোষের লেখা প্রথম একক বই। এটি একটি গল্পসংকলন, যা অতিপ্রাকৃত, কল্পবিজ্ঞান এবং সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারসহ বিভিন্ন ধারার দশটি গল্প নিয়ে গঠিত। প্রতিটি গল্পের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, লেখকের সাবলীল ভাষাশৈলী এবং চমকপ্রদ উপস্থাপনা পাঠককে মুগ্ধ করে।
বইটির প্রধান বৈশিষ্ট্য:
বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য: গ্রামবাংলার ভূতের গল্প থেকে শুরু করে কল্পবিজ্ঞান এবং সাইকো কিলিং—প্রতিটি গল্পই ভিন্ন স্বাদের। এই বৈচিত্র্য পাঠককে একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দেয় এবং নতুন অভিজ্ঞতার স্বাদ প্রদান করে।
লেখনীর সাবলীলতা: লেখকের সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা প্রতিটি গল্পকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। গল্পের টুইস্টগুলি পাঠককে চমকে দেয় এবং কাহিনীর গভীরে নিয়ে যায়। গল্পের শেষ এমনভাবে করা হয়েছে, যা পাঠকের কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করে এবং গল্প শেষ হলেও ভাবনার জগতে রেশ রেখে যায়।
এই বইয়ের আমার সব থেকে প্রিয় গল্প:
"ইচ্ছাপূরণ" গল্পটি পাঠকের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। এই গল্পের আবেগময় উপস্থাপনা এবং চরিত্রচিত্রণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
"আদমখোর এবং" হরর, কল্পবিজ্ঞান এবং থ্রিলারপ্রেমী পাঠকদের জন্য একটি অবশ্যপাঠ্য সংকলন। লেখকের গল্প বলার দক্ষতা এবং বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য বইটিকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য করে তুলেছে।
The Anthology - Adamkhor Ebong by Pabitra Ghosh, is a captivating collection of short stories that skillfully blend horror, suspense, and human psychology. Among the standout tales are Toffee and Adamkhor, both of which offer gripping narratives that leave a lasting impact. Toffee is a poignant yet chilling exploration of innocence lost, while Adamkhor delves into the macabre with a dark, atmospheric setting. Both stories are rich with potential to be adapted into compelling films, with their intriguing plots and strong emotional undercurrents. The author's mastery in creating tension and capturing human emotions makes this a must-read for horror fans.
এই বইয়ের প্রতিটা গল্পই এককথায় অনবদ্য। লেখকের বিশেষত হল তিনি খুব সাধারণ ভাবে গল্প শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে রহস্য এবং ভয়ের আবহ তৈরি করেন, এক সময় দমবন্ধ একটা পরিবেশ তৈরি হয়। এই বইতে আমার প্রিয় গল্প টফি, ব্ল্যাক ডেথ, রাত দশটার পর এবং স্লিপওয়াকার। আদমখোর গল্পটাও দারুণ লেগেছে, এর আগে অনেক শিকার কাহিনী পড়েছি, কিন্তু এই গল্পটা তাদের চেয়ে আলদা, hunter becomes hunted এই কথাটা বার বার মনে পড়ছিল গল্পটা পড়তে পড়তে। লেখকের আরও বই পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
সাইকোলজিক্যাল, সুপারন্যাচারাল, ক্রিপ্টিড সব রকম মিলিয়ে মোট দশটা গল্প আছে বইটিতে। তথাকথিত ভূতের গল্প এগুলো নয়। বরং ভয়াল রসের গল্প বললেই সব থেকে ভালো হয়। এবং সেদিক থেকে গল্পগুলো সার্থক। সহজ, সরল ভাষা আর চমৎকার লেখনির মাধ্য��ে লেখক পবিত্র ঘোষ ভয়ের যে বাতাবরণ সৃষ্টি করেছেন, তা যে কোনও হরর গল্পের ভক্তের ভালো না লেগে যাবে না। সব মিলিয়ে, বেশ উপভোগ্য গল্প সঙ্কলন।
বাংলায় যে কয়টা হাতে গোনা ভালো horror সংকলন বিগত কয়েক বছরে প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম সেরা বই আমার মতে এটা। যদি আপনি MR James, Lovecraft, Junji, সত্যজিৎ রায়, শরদিন্দু বাবুর ভৌতিক/ভয়ের গল্পের ফ্যান হয়ে থাকেন তবে এই বইটি অবশ্যপাঠ্য।