পৌরাণিক গল্প লেখা সহজ, আবার কঠিনও। সহজ এজন্য যে, গল্পের সূত্রসমূহ পুরাণবৃত্তান্তে পাওয়া যায়; কঠিন এজন্য যে, পুরাণকাহিনির সঙ্গে বর্তমানের মানবজীবনকে মিলাতে হয়। শেষেরটা দুরূহ। হরিশংকর জলদাস তাঁর পৌরাণিক গল্পে ওই দুরূহ কাজটিই করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে পৌরাণিক গল্প খুব যে লিখা হয়, এমন নয়। বলা যায়, হরিশংকর এককভাবে পৌরাণিক গল্প-উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন, এই দেশে। তাঁর ছোটগল্প সংখ্যা খুব বেশি নয়, টেনেটুনে আশি-পঁচাশি। তাদের মধ্যে তেরোটি পৌরাণিক গল্প। ওই তেরোটি গল্পেরই সন্নিবেশ ঘটেছে এই গ্রন্থে। লেখকের পৌরাণিকগল্পগুলো নিছক পুরাণ-নির্ভর কাহিনি নয়, বাঙালি এবং তার সমাজজীবনের বাস্তবচিত্রও। গল্পগুলোতে মানবজীবন আর দেবজীবন একাকার। এখানে আছে দেবতার দুরাচারিতা, আছে দানবের মহানুভবতা। সুর ও অসুরের মিলন-দ্বন্দ্বের কথা গল্পগুলোর পরতে পরতে। উচ্ছিষ্ট, যমুনাজলে বিবর সন্ধান', 'তুমি কে হে বাপু', কুন্তীর বস্ত্রহরণ', 'দূর দিগন্তে অন্ধকার', 'ব্যর্থ কাম', সহোদর', 'উপেক্ষিতা', 'দেউলিয়া'-এসব গল্পে মানবদানব-দেবতার প্রাপ্তি-বেদনা, ক্ষরণ-লোভ, রিরংসাজিঘাংসা, প্রেম-অপ্রেমের কথা খুলেমেলে ধরেছেন লেখক। প্রতিটি গল্প বিষয়ে ও ভাষায় স্বতন্ত্র। সব লেখাতে যেমন, এখানেও হরিশংকর জলদাসের ভাষা সহজ ও মনোরম।
Harishankar is a promising Bangladeshi author. The most significant point to notice is that all the four novels produced from Harishankar's pen sketch the life of the downtrodden, some of whom are from among fisherfolks, some from among prostitutes and some others are the 'harijons' or 'methors'.
হরিশংকর জলদাসের এই সংকলনে পৌরানিক গল্পগুলো কেবল পৌরানিক গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মহাভারতের পাতা ফুঁড়ে উঠে আসা মৎস্যগন্ধ্যা, দ্রৌপদী, কর্ণদের পাশাপাশি এই যুগের সত্যবতী, ব্যাসদেব কিংবা অর্জুনদেরও আমরা দেখতে পাই গুণী লেখকের সুনিপণ কলমের আচড়ে। কিছু গল্প চেনা গল্পগুলোকে অন্যভাবে দেখতে শেখাবে, বুঝতে শেখাবে।
পৌরাণিক আর বর্তমানের মিলমিশে লেখকের এক অসাধারণ সৃষ্টি। বেশির ভাগ পৌরাণিক চরিত্রের নাম শোনা থাকলেও জ্ঞান ছিল স্বল্প, সেই সব চরিত্র নিয়ে এত দারুন দারুন প্লট এক্সিকিউশন দেওয়ার ব্যাপার টা সত্যিই দারুন ছিল।
পুরানে পরানখানি জুড়ানো শব্দ কল্প বা বিকল্প হিসেবে পাতায় পাতায় নিবদ্ধ দেশকাল যুগপাত্রভেদে সেসব মুখপাত্রের হোক না সে মনগড়া কিংবা সত্য স্তোত বাক্য,শির থেকে শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ জাগানিয়া সেই অনুভূতি কিশোরী বেলার প্রথম প্রেমের মতো অনাঘ্রাত আকাঙ্ক্ষিত পরমাধ্য আজো ।
হরিশংকর যেন কষ্টিপাথর ঘষে কয়লা থেকে ময়লা বাদে হারিয়ে যাওয়া হীরেমানিক বর্তমানের সুতোয় বেঁধে ভবিষ্যতের পথের পানে যাত্রাখানি জম্পেশ সব যুগলবন্দী জানিয়ে গেছেন বইয়ের পাতায় স্মৃতির খাতায়।
পড়ুন ,জানুন,বুঝুন পরাবাস্তবের পর্দা ছেড়ে পুরান এখন বড্ড বাস্তবঘেষা বিষয়মাত্র।
লেখক হরিশংকর জলদাস বইটির নাম 'পৌরাণিক গল্প' দিলেও বইটির গল্পগুলো মহাভারত ও রামায়ণ মহাকাব্যের উপর লিখিত। এখন তর্ক জুড়ে দেয়া যেতে পারে এই দুটি মহাকাব্য পুরাণের অন্তর্গত কিনা কিন্তু লোকজ উপাদান (ইতিহাস) আর বৈদিক সংস্কৃতির উপস্থিতির জন্য এই দুটি মহাকাব্যকে সরাসরি পুরাণে স্থান দেবার সুযোগ আছে কিনা এটা আমার জিজ্ঞাস্য।
হরিশংকর জলদাসের যতগুলো মহাভারত রামায়ণ ভিত্তিক লেখা আছে সেগুলোর একটিও পড়ার আগে এই দুটি মহাকাব্যের মূল ভার্সন ভাল করে পড়া বা ধারণা নেয়া ভীষণ জরুরী। কারণ উনি এইসব গল্প উপন্যাসে ব্যক্তিগত অভিমান আর আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। যার ফলে এমন অনেক কিছু তার রি-টেলিং এর ভেতর চলে আসে যার সাথে মূল মহাকাব্যে ঘটা ঘটনার বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটিয়ে দেয়।
এই গল্পগ্রন্থে মোট তেরোটি গল্প সংকলিত হয়েছে। বেশিরভাগ মহাভারত থেকে। এগুলোর ভেতর অনার্য অর্জুন, আজকের দ্রোপদী, যমুনাজলে বিবর সন্ধান, তিতাসপাড়ের উপখ্যান এবং কুন্তীর বস্ত্রহরণ ভাল লেগেছে। বিশেষ করে আজকের দ্রৌপদী গল্পটা। এই গল্পে পাঠককে মনে করিয়ে দেব মানুষকে শতভাগ বিশ্বাস করার যুগ ফুরিয়েছে।
কিছু কিছু গল্পে উনি আধুনিক সময় ও চরিত্রের সাথে মহাভারতীয় সময় ও চরিত্রকে প্যারালালভাবে বর্ণনা করে গেছেন। এইজন্য ঐ গল্পগুলো আমার কাছে বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল।
তবে এই গল্পগ্রন্থটির আরেকটি বিশেষ গুরুত্ব আছে। সাধারণত লেখক হরিশংকর জলদাস তথাকথিত নীচুজাতির মানুষের উপর ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের দমন, নিপীড়ন, অবহেলা নিয়ে বেশি লিখেছেন। তিনি নিজেই একজন বর্ণাশ্রম প্রথা নামক সামাজিক ব্যাধির ভুক্তভোগী। কিন্তু এই গল্পগ্রন্থে উনি এই ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরোধিতার সাথে সাথে সংখ্যালঘু নির্যাতনেরও বিরুদ্ধেও কলম চালিয়েছেন। বিশেষ করে তিতাসপাড়ের উপখ্যান গল্পে ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণাবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালঘুদের (জাতিতে মালো) উপর পাশবিক নির্যাতনের কথা উল্লখে করেছেন। আর কুন্তীর বস্ত্রহরণ গল্পটিতে এই ব্যাপারে উনার লেখায় এক ধরনের তীব্রতা ছিল।
তবে ওনার ব্রাহ্মণবিদ্বেষ বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ব্যর্থ কাম গল্পটিতে। এই গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র ব্রাহ্মণ এক ভদ্রলোক। যেখানে সে ব্যাংকের ম্যানেজারকে ফাঁসিয়ে নিজে একটা বড় পরিমাণের টাকা হাতিয়ে চাকুরী ছেড়ে চলে আসে।
মোটের উপর ভাল লেগেছে আবার লাগেওনি। মহাভারত আর রামায়ণকে উনি সবসময় একপেশে দৃষ্টি নিয়ে লেখেন। যদি এই দুটি মহাকাব্যের বহুমুখী দিক আছে। শুধু পুরাণ বা মহাকাব্য নয় যেকোন ঘটনা আর কাহিনীকে যদি মূল ভার্সনের সাথে খানিকটা বিচ্যুতি ঘটিয়ে এক পাক্ষিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয় তবে ভ্রান্তি ছড়ায়। আর এইজন্য গল্পগ্রন্থটি ভাল লেগেও পুরোপুরি লাগেনি।
মহাভারত এর সহজ অনুবাদ পড়েছি, মহাভারত এর বিভিন্ন ক্যারেকটার নিয়েও অনেক অনেক লেখা পড়েছি। কিন্তু হরিশঙ্কর জলদাস এর “পৌরাণিক গল্প” একসাথে অনেকগুলো নতুন জানালা খুলে দিলেন, চারিদিক থেকে অচেনা অবাধ বাতাস বিভ্রান্ত করে তুললো আমাকে। বইয়ের প্রতিটা পাতা পরের পাতার দিকে নিয়ে গেছে মোহবিষ্ট্ করে। নতুন করে অনেক কিছু পড়তে হবে এখন।
বইটিতে মোট ১৩ টি গল্প আছে।
১. উচ্ছিষ্টঃ এই গল্পটি আবর্তিত হয়ে অসুররাজ রাবন এর প্রধান স্ত্রী মন্দোদরী কে ঘিরে। এই গল্পে লেখক যেন প্রশ্ন করছেন মন্দোদরী কে এবং তার উত্তরের মাধ্যমে উঠে আসছে মন্দোদরী এর কাহিনী। মন্দোদরী ছিলেন অসুরদের মধ্যে সেরা স্তাপত্য শিল্পী ময়দানব ও অপ্সরা হেমার কন্যা। রাবন কে দেখে বিমোহিত হয়ে ময়দানব তার কন্যা মন্দোদরীর সাথে রাবনের বিয়ে দেয়। কিন্তু তাহলে গল্পের নাম উচ্ছিষ্ট কেন?
রাবন যখন সীতা হরন করে তখন রামের তো মাথা খারাপ অবস্থা। কিভাবে উদ্ধার করবে সীতাকে। এসময় উপায় বাতলে দেয় বিভীষণ। ঘরের শত্রু বিভীষণ নামে খ্যাত রাবনের ভাই বিভীষণ। অসুররাজ্য লঙ্কার দখল নিজের করে নিতে বিভীষণ রাম কে বলে দেয় রাবন বধের উপায়। ফলাফল লঙ্কার পরাজয় ও রাবন বধ। পুরস্কার সরুপ রাম বিভীষণের হাতে তুলে দেয় লঙ্কা ও রাবনের প্রধান স্ত্রী মন্দোদরী কে। এক ভাইয়ের স্ত্রী যখন আরেক ভাইয়ের সম্পত্তি তখন তো তাকে উচ্ছিষ্টই বলা হবে। তবে এই গল্প আপনার মহাভারতের প্রতি এতদিনের যে দৃষ্টিভঙ্গি তাকে একেবারে দুমড়ে মুচরে দিবে।
২. অনার্য অর্জুনঃ পরলোকে দেখা হয়ে একলব্য এর সাথে অর্জুনের। হ্যা মহাভারতের সেই দুর্ভাগা একলব্য, তবে এই অর্জুন কিন্তু পঞ্ছ পাণ্ডবের অর্জুন না, নরসিংদির অর্জুন। অবশ্য পাঁচ এই অর্জুনরাও পাঁচ ভাই আর অর্জুন ও তৃতীয় সন্তান। জীবন সংগ্রামের ঘানি টানতে টানতে একদিন ঢাকায় বাসের নীচে পরে মারা যায় অর্জুন। কাটা পরেছিল ডান হাত।
মহাভারতে একলব্য তার ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুল হারায় অর্জুনের জেদের কারণে, কারণ একলব্য অর্জুনের থেকে ভালো তীরন্দাজ ছিল, কিন্তু একজন অনার্য হয়েও একলব্য অর্জুনের থেকে ভালো তীরন্দাজ এটা অর্জুন মেনে নিতে পারেনি।
গল্পে পরলোকে এই একলব্য ও নরসিংদীর অর্জুনের মধ্যে কথোপকথনের মাধম্যে লেখক কাহিনী এগিয়ে নিয়েছেন। শেষটা দুর্দান্ত ছিল। শেষ দুতিনটা লাইন তুলে ধরলাম-
কেন? আমি কে অনার্য ব্যাধ। আমি তো অনার্য ছিলাম না! ছিলে তো! দরিদ্ররা যে অনার্য ব্যাধের ও অধম!
৩. দেউলিয়াঃ এই গল্পে লেখক দেবরাজ ইন্দ্র ও ঋষি গৌতমের স্ত্রী অহল্যার অবৈধ সম্পর্ক কে তুলে এনেছেন। গল্পের শেষে অহল্যা যখন বলে “স্বর্গসুখের চেয়ে দেহসুখ লোভনীয়। আরেকবার অপার দেহ তৃপ্তির বিনময়ে আরও সহস্র বছর পাষাণ হয়ে থাকতে আমার আপত্তি নেই ঋষি গৌতম“- তখন ঋষি গৌতমের নিজেকে দেউলিয়া ছাড়া আর কিই বা মনে হবে?
৪. তুমি কে হে বাপুঃ এই গল্পে লেখক যে মহাভরতের রচয়িতা ব্যাসদেব কে মর্গের টেবিলে ফেলে পোস্ট মরটেম করেছেন। শল্য চিকিৎসকের ভুমিকায় রেখেছেন অদ্বৈত মল্লবরধন কে।
এর বেশি কিছু লেখা ঠিক হবে না। বইটি অবশ্যই পড়ুন। আপনার চিরচেনা মহাভারত কে অন্যরকম লাগবে। তবে মহাভারত না পড়া থাকলে অবশ্যই বলবো আগে মহাভারত পড়ে নিন। নাহলে কিন্তু বুঝতে বেশ কষ্ট হবে।
পৌরাণিক গল্পের প্রতি বরাবরই আমার অসীম আগ্রহ। তাই বইয়ের প্রচ্ছদে লেখা "পৌরাণিক গল্প" নামটা সহজেই আমার দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে। এবং লেখক যখন হরিশংকর জলদাস তখন ইন্টারেস্টিং কিছু পড়তে যাচ্ছি সে ব্যাপারে আমি শিওর ছিলাম।
মোট ১৩ টি গল্প নিয়ে এই বইটি সাজানো। রামায়ণ আর মহাভারতের সব পরিচিত জনপ্রিয় আর ঘৃণিত চরিত্রগুলোর গল্প এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে মিলিয়ে দিয়ে।
মোটে ১৪৪ পৃষ্ঠার এই বই পড়তে আমার অনেকদিন লেগে গেলো গল্প বলার ধরনের জন্য। উনার বই পড়লেই অদ্ভুত সব খেয়াল আসে আমার। যে কোন একটা ঘটনা এক পক্ষ থেকে দেখে বা শুনে আমরা খুশি হয়ে যাই। কিন্তু সেখানেও আবার আরেক পক্ষ আছে। ইতিহাস সবসময় বিজয়ীরা লেখে। বিজিতের দিকটা আর দেখা হয় না। যদি দুই পয়েন্ট অফ ভিউ থেকেই দেখি তাহলে সবার সব কাজ জাস্টিফাইড আবার জাস্টিফাইড না।
দৃষ্টিকোণ বা পয়েন্ট অফ ভিউ একেকজনের একেকরকম। আমি যা দেখছি বা ভাবছি বা করছি সেটা আমার পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে যা হবে তা অন্য আরেকজনের একই হতেও পারে আবার নাও পারে। মানে আপাতদৃষ্টিতে আমরা যা দেখি তা সবসময় সঠিক দেখি তা সত্য নয়। সত্যের ভেতরেও আরও সত্য থাকে। কখনও কখনও মিথ্যাও থাকে।
হরিশংকর জলদাসের লেখাগুলোতে সেই আদিকাল থেকে হয়ে আসা অনার্য সম্প্রদায়ের বঞ্চনার ইতিহাস জ্বলজ্বল করতে থাকে। তাঁর গল্পে খলনায়করা নায়ক হয়ে উঠে। ইতিহাসের পাতায় থাকা বীরদের বীরত্ব গাঁথার আলোর নিচে যে অন্ধকার আছে তার সমালোচনা করতে তিনি ছাড়েন না। খুব সুন্দরভাবে দেখিয়ে দেন মহাপুরুষেরা আসলে দুধে ধোয়া তুলসীপাতা নন।
জানিনা কেন কয়েকটা গল্প পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো লেখক তাঁর জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আর্যদের প্রতি।
মানুষের বিশ্বাস ভক্তি ও আধ্যাতিকতার সাথে সম্পর্কযুক্ত পৌরানিক কাহিনিগুলোয় বরাবরই আগ্রহ আছে আমার। তবে সাধারনের মত ভক্তি ও আধ্যাতিকতার উর্ধ্বে গিয়ে বাস্তবতার নিরীখে সেই কাহিনিগুলোর চরিত্র বিশ্লেষন ও তৎকালিন আর্থসামাজিক বাবস্থাপনা বিষয়ে জানার প্রতিই ঝোকটা বেশি। বিতর্কিত হবার আশংকায় এইসব নিয়ে খুব একটা লেখালেখি হয়না, হলেও লেখকরা খুব সাবধানি হন। হরিশংকর জলদাস সেদিক থেকে বেশ সাহস নিয়ে পৌরানীক গল্প বইটি লিখেছেন।
বইটিতে রামায়ন ও মহাভারতের বেশ কিছু বিখ্যাত চরিত্রের গল্পের মাধ্যমে ব্যাবচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রাচীন এই দুটো পৌরনিক কাহিনীর চিরিত্র গুলোর প্রতি সাধারনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আরেকবার ভাবতে বাধ্য করবে বইটি।
মহাভারত, রামায়ণ নিয়ে আগ্রহ নেই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। অসংখ্য চরিত্রের সমাগম এই গ্রন্থে। এই অগুনতি চরিত্রের মধ্যে কিছু চরিত্র কারো প্রিয়,আবার কিছু চরিত্র কারো ভীষণ অপ্রিয়।এই চরিত্রদ্বয়ের কিছু কাজ কারো ভালো লাগে তো কারো লাগে না৷ লেখক হরিশংকর জলদাস এই চরিত্রদ্বয়ের গল্প বা বিভিন্ন ঘটনাগুলোকে বর্তমান সময়ের সাথে মিলিয়ে তৈরি করেছেন পৌরাণিক গল্প। গল্পগুলো ভীষন চিত্তাকর্ষক।
হরিশংকর জলদাসের লেখার কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। ভীষণ ভালো,ভীষণ। আমার খুবই প্রিয় একজন লেখক। তার লেখনীতে মোহময়তা আছে,তা পাঠককে আকৃষ্ট করে দ্রুত। আমার সব থেকে দারুণ লাগে উনার গল্প বলার ধরন। সব দারুন একজন লেখক।
Book 12: পৌরাণিক গল্প (হরিশংকর জলদাস) =============================== Rating: 3.5/5
হরিশংকর জলদাসের 'পৌরাণিক গল্প' শিরোনামের মধ্যেই রয়েছে এক ধোঁয়াশা। বইটি পুরাণের গল্প বলতে এসে বেছে নিয়েছে মহাভারত ও রামায়ণের চরিত্রদের—যাদের নিয়ে তর্ক থাকতেই পারে এগুলো 'পুরাণ' কি না। ১৩টি গল্পের এই সংকলনে জলদাস শুধু পুনর্কথন নয়, চিরাচরিত মূল্যবোধকে নিয়ে উল্টোপথে হাঁটেন।
হরিশংকর জলদাসের 'পৌরাণিক গল্প' শিরোনামের মধ্যেই রয়েছে এক ধোঁয়াশা। বইটি পুরাণের গল্প বলতে এসে বেছে নিয়েছে মহাভারত ও রামায়ণের চরিত্রদের—যাদের নিয়ে তর্ক থাকতেই পারে এগুলো 'পুরাণ' কি না। ১৩টি গল্পের এই সংকলনে জলদাস শুধু পুনর্কথন নয়, চিরাচরিত মূল্যবোধকে নিয়ে তিনি নতুন পথে হাঁটেন।
'পৌরাণিক গল্প'-এর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো চিরপরিচিত চরিত্রদের মাধ্যমে আধুনিক সামাজিক ইস্যুগুলোকে মেলে ধরা। 'অনার্য অর্জুন' গল্পে একলব্য ও অর্জুনের কথোপকথনে লেখক জমিদারি প্রথা ও দারিদ্র্যের যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তোলেন।
'দেউলিয়া' গল্পে অহল্যার মুখ দিয়ে লেখক বলিয়েছেন, "স্বর্গসুখের চেয়ে দেহসুখ লোভনীয়।" এখানে নারীর কামনা-বাসনাকে পৌরাণিক নৈতিকতার জায়ির থেকে মুক্ত করা হয়েছে। আবার 'তিতাসপাড়ের উপখ্যান' বা 'কুন্তীর বস্ত্রহরণ'-এ সংখ্যালঘু নির্যাতনের কাহিনী যুক্ত হয়েছে মহাভারতীয় রূপকের সাথে।
'ব্যর্থ কাম' গল্পে ব্রাহ্মণ চরিত্রটির একমাত্রিক চিত্রায়ন (ব্যাংক ম্যানেজারকে ফাঁসিয়ে দেওয়া) ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে জলদাসের ব্যক্তিগত ক্ষোভকেই প্রাধান্য দেয়। মূল মহাকাব্যের বহুমুখী দ্বন্দ্ব এখানে অনুপস্থিত।
জলদাসের গল্পগুলোর মূল অভিযোগ হলো মহাভারত-রামায়ণের সাথে অসামঞ্জস্য। 'উচ্ছিষ্ট' গল্পে মন্দোদরীকে বিভীষণের 'সম্পত্তি' হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা মূল রামায়ণের ঘটনাপ্রবাহের সাথে সাংঘর্ষিক। আমার মনে হয়েছে মূল কাহিনীর জ্ঞান ছাড়া এই রি-টেলিং ভ্রান্ত ধারণা দিতে পারে। তবে বলা যেতে পারে দিলেও কি! তাও সমালোচনার খাতিরে বলা আরকি।
অন্যদিকে, 'আজকের দ্রোপদী' গল্পে কর্ণ-দ্রৌপদীর অসম্পূর্ণ প্রেমের আখ্যানকে আধুনিক প্রেক্ষাপটে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চমৎকারভাবে। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন ওঠে; মহাভারতের বহুস্তরীয় চরিত্রায়ন কি শুধু 'নারীর আক্ষেপ' দিয়ে সংকুচিত করা যায়?
কিছু গল্পে আধুনিক ও প্রাচীন সময়ের সমান্তরাল বর্ণনা পাঠককে নতুন চোখ দেয়। কিন্তু "মহাভারত না পড়ে থাকলে এই বই বৃথা"—লেখকের এমন মন্তব্য নিজের সৃষ্টিকেই সীমিত করে ফেলে।
'পৌরাণিক গল্প' এর শক্তি ও দুর্বলতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ইতিহাসের জটিলতা কাটছাঁট করে শুধু 'ব্রাহ্মণবিদ্বেষ' বা 'ক্ষোভ'-কে কেন্দ্রীভূত করায় গল্পগুলো কখনো কখনো প্যামফ্লেটের দিকে হেলে পড়ে। আমিও ব্রাহ্মণ্যবাদকে সমালোচনার পক্ষেই ঠাই নিই তবে সমালোচনা আরও দ্বিপাক্ষিক তরীকায় করা যেত।। তবুও, এই বই পাঠককে ভাবাবে যে পুরাণ কি শুধু অতীতের গাঁথা, নাকি বর্তমানের আয়না?
হরিশংকর জলদাসের ‘পৌরাণিক গল্প’ বইয়ে মোট ১৩টি গল্প আছে যেখানে রামায়ণ ও মহাভারতের সাথে বর্তমান সমাজের মিল-অমিল সবকিছুই তিনি তুলে ধরেছেন।তবে পরামর্শ হলো, আপনি বইটি পড়ার আগে যদি রামায়ণ ও মহাভারতের সকল ঘটনা জেনে থাকেন তবেই আপনি শুধুমাত্র এই বইয়ের প্রত্যেকটি গল্পকে উপলব্ধি করতে পারবেন অন্যথায় বইটি পড়া আপনার জন্য বৃথা হতে পারে। শুভকামনা। (১) ১৩টি গল্পের প্রথমটি হলো একজন শ্রোতা ও রাবণের স্ত্রী মন্দোদরীর মধ্যকার গল্প। এই শ্রোতা একে একে প্রশ্ন করছিলেন এবং মন্দোদরী সেগুলোর উত্তর ঘটনা আকারে বলছিলেন।গল্পটিতে আপনি দেখতে পাবেন মন্দোদরী কিভাবে বিভীষণের উচ্ছিষ্ট হলেন তা নিয়ে বলা হয়েছে।রাবণের স্ত্রী মন্দোদরীর নাম রেখেছিলো বাল্মীকি।যে নামটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যার জঠর বা গর্ভ খারাপ।অর্থাৎ মন্দোদরীর পুত্র মেঘনাথকে নিয়েও এখানে বলা হয়েছে।রাবণ,কুম্ভকর্ণ আর বিভীষণ এরা তিনভাই।অনেক সময় দেখা যায় যে বলা হয় তুই ঘরের শত্রু বিভীষণ আসলে এই বিভীষণ আসলেই ঘরের শত্রু কারণ রাম-রাবণের যখন যুদ্ধ চলছিলো তখন এই বিভীষণই রাবণের মৃত্যুবাণের সন্ধান রামকে দিয়েছিল এবং রাবণের মৃত্যুর পর বিভীষণ রাক্ষস রাজ্যের রাজা হয় সাথে সে মন্দোদরীকেও জোর করে বিয়ে করে। আরো অনেক ঘটনা আপনি এই গল্পে পাবেন তবে এখানে রামায়ণের একটি চরিত্রকে নিয়েই গল্পটি আসলে। যেখানে মন্দোদরী তার ভাগ্যের কোথা বর্ণনা করেছেন যেখানে তিনি আসলে বিভীষণের উচ্ছিষ্ট স্ত্রী হয়েছিলেন। গল্পটির একটি কথা আমার ভালো লেগেছে ,সেটা হলো- “ঋণ,অগ্নি ও ব্যাধি এদের যেমন রাখতে নেই তেমনি শত্রুকেও বাঁচিয়ে রাখতে নেই।শত্রুরও মৃত্যু নিশ্চিত করতে হয়।” Please Join: পাঠক Facebook Group (২) এই গল্পে মোট ফোকাস চরিত্র ৬টার মতো।দুইজন প্রতিবেশি ধরবাবু ও সেনবাবু।সেনবাবুর ৩জন ছেলে ও একজন মেয়ে আর ধরবাবুর শুধু একটাই ছেলে প্রভাস যে বিসিএস দিয়ে মহিলা কলেজে চাকরি করে।আর প্রতুল বাবুর ছেলে কল্যাণ চুয়েট থেকে পাশ করে আপাতত কিছু করছে না। গল্পটিতে দেখবেন প্রভাসের বয়স যখন উনত্রিশ তখন আসলে তাঁর বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে যাওয়া হয় কিন্তু এখানে একটা ঘটনা ঘটায় সেনবাবু।যে ,এয়েকে দেখতে যায় তাঁর নাম অহনা যাকে আসলে সেনবাবু তাঁর ছেলের জন্য পছন্দ করে ফেলে এবং শেষে একটু কলকাঠি করে বিয়ে করিয়েও ঘরে নিয়ে আসে। অহনা তাঁর স্বামীর ঘরের সুখে থাকা সত্ত্বেও সে সবসময় বাড়ির দোতলার ছাদে উঠে প্রভাসের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠিক এই একই গল্প মহাভারতেও দেখা যায় সেখানে দেখা যায় পাঞ্চাল রাজের কণ্যার স্বয়ংবর সভায় কর্ণ সকলের শ্রেষ্ঠ বল,বীর্যশালী হওয়া সত্ত্বেও সে ্সূতপুত্র হওয়ার কারণে ধনুক দিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে দেওয়া হয়নি। পরে ক্ষত্রিয় অর্জুন সেটাকে সম্ভব করেন এবং পাঞ্চাল কন্য দ্রৌপদীকে বিয়ে করে আনেন ঠিকই কিন্তু তাদের মাতা কুন্তীর কোথা রাখতে গিয়ে পঞ্চপান্ডব এক বছর বাদ করে করে দ্রুপদীর সাথে সংসার করেন। শেষে দেখা যায় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে যখন কৌরব ও পান্দব যুদ্ধে পান্ডবরা জয়লাভ করেন তখন তারা রাজ্য শাসনের পর পরীক্ষিতের হাতে রাজ্যভার দিয়ে যান । তো স্বর্গে যাওয়ার পথে আসলে দ্রৌপদীর অকাল মৃত্যু হয় যেখানে দ্রৌপদী কর্ণকে শেষ দেখার আক্ষেপ নিয়ে মৃত্যু বরণ করেন কারণ দ্রৌপদী কিন্তু কর্ণেরই হওয়ার কোথা ছিলো,শুধুমাত্র সূতপুত্র হওয়ার কারণে তাদের মিল হয়নি। এই গল্পেও দেখা যায় অহনা প্রসবা অবস্থায় নিশ্চিত হয়ে যায় সে বাচবেনা।তখন সে কল্যাণকে একা পেয়ে একবার প্রভাসকে দেখতে চাওয়ার প্র্যাস জানায়। তো? কি বুঝলেন আপনারা? আজকের বর্তমান সমাজেও এমন অগণিত দ্রৌপদী ঘরে ঘরে রয়েছে।যারা কিনা হয়তো নিরুপায় হয়েই স্বামী সংসারে মনোনিবেশ করছে। (১০) কুন্তীর বস্ত্রহরণ গল্পটিও মহাভারতের দুর্যোধনের ভাই দুঃশাসন কর্তৃক পান্ডবপত্নী দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের ঘটনার সাথে সম্পূর্ণ মিল।সেখানে দেখা যায় একসময়কার রাজাকার গ্রামের বর্তমান চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের ইন্ধনদাতা ফখর গ্রামের শ্মশানে অজয় মন্ডলকে পোড়াতে আসা সবাইকে মেরে ফেলে।এবং সবশেষে ওই শ্মশান ঘাটে কুন্তীর বস্ত্র অনাবৃত করে। Copyright: Ananda Mohan Host: AM Club
মহাভারতের সাথে প্রতিদিনের জীবনকে মিলিয়ে এক নতুন জগৎ তৈরী করেন তিনি প্রতিটি গল্পে, লেখক হরিশংকর জলদাস ৷ এতো মুগ্ধ হয়ে কারো লেখা আমি কমই পড়ি । লেখকের প্রজ্ঞা এবং জ্ঞান আমাকে বারংবার বিস্মিত করে, আন্দোলিত করে, ভাবতে শেখায় নতুন করে ৷
পৌরাণিক গল্প বলতে যে শুধু পুরাণের কথাগুলো এনে তুলে ধরা, তা কিন্ত নয় ৷ তার সাথে মিশিয়ে দিতে হয় মানবজীবনকেও । বাংলাদেশে পৌরাণিক গল্প নিয়ে কাজ হয়েছে কম, যারা এইক্ষেত্রে কাজ করছেন, তাদের মধ্যে "হরিশংকর জলদাস" একজন প্রিয় মুখ ৷ তার মতো করে দেবতা আর মানুষকে একসাথে মিলিয়ে দিতে বোধ করি কেউওই পারেন না ৷
বইটিতে মোট গল্প তেরোটি, এর মধ্যে দু'টি গল্প আগেই অনার্য অর্জুন গল্পগ্রন্থে পড়েছি । হরিশংকর জলদাসের গল্পগ্রন্থের ক্ষেত্রে কোন বিশেষ গল্প নিয়ে কথা বলা মুশকিল ৷ প্রতিটি গল্পই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র । তবু বলি, দূর দিগন্তে অন্ধকার, তিতাসপাড়ের উপাখ্যান, যমুনাজলে বিবর সন্ধান - এই তিনটি গল্পের ধারণা এবং ঘটনাপ্রবাহ এতো চমৎকার যে বলার মতোন নয় ! লেখকের মহাভারত নিয়ে পড়াশোনা বিস্তর, সেইসাথে দৈনন্দিন জীবনকে তিনি দেখেন গভীর জীবনবোধ এবং দর্শনের মধ্যে দিয়ে । এই দুইয়ের সাথে তার সহজাত গল্প বলার মনোরম ভঙ্গি তার লেখাকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা ৷
এই ভদ্রলোকের প্রতি আমি একটু পক্ষপাতদুষ্টই বলা চলে । নামের জন্যে কিনা জানি না, ছোট থেকেই নানান বিষয়ে চিন্তা করতে আমি ভালোবাসি ৷ আর সেই থেকে নানান বিষয়ের প্রতি নানান রকম মত, বিরুদ্ধ মত নিয়ে পড়তে পড়তে, ভাবতে ভাবতে নিজের মধ্যে অনেক প্রশ্ন আসতো যার উত্তর কেউ দিতে না পারলেও ধমক দিয়ে আমাকে থামিয়ে দিতে কসুর করতেন না ৷ হরিশংকর জলদাস আমার সব প্রশ্নের উত্তর না দিলেও আমার চিন্তা জগৎকে আরো উসকে দিয়েছেন তার গল্প এবং গল্পের পেছনের চিন্তাগুলো দিয়ে ৷ মাঝেমধ্যে তার লেখা একটু একপেশে মনে হয়, মনে হয় শুধু ক্ষোভ আর বঞ্চনার কথাই লিখে যাচ্ছেন । কিন্ত যেই জীবন তিনি নিজে যাপন করেছেন, যেই জীবন যাপন করেছেন তার অগ্রজ পূর্বজরা, সেই জীবনের ইতিহাস এতোটাই নির্মম নিষ্ঠুর, যে আমাদের কাছে তা একপেশে মনে হতে বাধ্য !
এই বইটি বারবার আমাকে স্তব্ধ হয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। হরিশংকর জলদাসের লেখা আরো কয়েকবার পড়েছি। বর্ণবৈষম্যের স্বীকার দরিদ্র নরনারীর জীবন সংগ্রামই তার লেখার মূল উপজীব্য। এই বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন, এই বৈষমাই বঞ্চনা আসলে অতি সাম্প্রতিক কোন ব্যাপার নয়, বরং আমাদের ইতিহাস, আমাদের পুরান , আমাদের সংস্কৃতিতেই এই বিষ মিশে আছে। অত্যাচারীরা ইতিহাসকে এমনভাবে কুলষিত করেছে যে তাদের পাপগুলা আমাদের চোখে আর ধরা পড়ে না, কিছু ক্ষেত্রে সে পাপের জায়গায় পূণ্যবাসনা জায়গা ক্করে নিয়েছে। লেখক বইতে এমন অনেক অন্যায়ের দিকে আংগুল তুলেছেন যেগুলো ভক্তি ও অজ্ঞানতার পর্দায় সুরক্ষিত ছিল এতকাল।
পাঠককুলে এই বইটি আরো অনেক সাড়া তুলবে এই আশা ব্যক্ত করি।
তেরোটি গল্পের কতকটিতে মহাভারত-রামায়ণের চরিত্ররা তাদের গল্প বলছে। সমান্তরালে বর্তমান সময়ে সেই গল্পের পুনঃমঞ্চায়ন চলছে। আবার কতকটিতে পুরোনো গল্পের 'মহান' চরিত্রগুলোর ধোঁকা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হচ্ছে অন্য POV থেকে।
ইন্টারেস্টিং হলো, দুইটা গল্পে অদ্বৈত মল্লবর্মণও পৌরাণিক চরিত্রের মত চলে এসেছেন। বোঝাই যায়, হরিশংকর কতটা শ্রদ্ধা করতেন অদ্বৈতকে।
রামায়ণ আর মহাভারত এর বিভিন্ন চরিত্রগুলো নিয়ে ছোট ছোট গল্প। লেখকের লেখনী দারুণ, উপেক্ষিতা,উচ্ছিষ্ট, একটি হাত,ডান হাত এই গল্পগুলো বিশেষ করে ভালো লেগেছে।
পুরাণবৃত্তান্তে পাওয়া পুরাণকাহিনীকে বর্তমান মানবজীবনের সঙ্গে মিলিয়ে, আর আধুনিক পাঠকের জন্য পাঠযোগ্য করে মোট ১৩টি ছোটগল্প দিয়ে সাজানো হরিশংকর জলদাসের বই ─ পৌরাণিক গল্প।
পৌরাণিক কাহিনীগুলোর সাথে পৌরাণিক চরিত্রদের নিয়ে কিছু narrative প্রচলিত থাকে আমাদের মধ্যে। প্রচলিত narrative এর বাইরে গিয়ে রোজকার খবরের কাগজও যেখানে আমরা পড়িনা, সেখানে সহস্র বছরের প্রাচীন পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে পরিচিত narrative এর বাইরে ভাবি কি করে? লেখক হরিশংকর জলদাস সেই প্রচলিত narrative subvert করে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন। যেখানে আমরা পাই অনার্যদের, আর বিশেষ করে নিপীড়িত নিগৃহীত কৈবর্তদের perspective থেকে মহাভারত আর রামায়ণের interpretation. ছোটবেলায় বইতে পড়া বা কার্টুনে দেখা মহাভারতে রামায়ণে যাদের নায়ক হিসেবে দেখতাম তাদের নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যাবে, আর যাদের নাম-ও মনে রাখতাম না ─ তাদের কন্ঠে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে রামায়ণ মহাভারত চিনতে পারবো।
বইয়ের প্রথম গল্প "উচ্ছিষ্ট", বইয়ের শুরুতেই একটা gut punch. খলনায়কের প্রতি একটা অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে যাদের মধ্যে তারা রাবণকেও নিশ্চয়ই দারুন কিছু মনে করতো ─ লঙ্কাধিপতী মহাপরাক্রমী রাবণ! কিন্তু তার মহিষী মন্দোদরীকে আর ক'জনা মনে রাখে। মন্দোদরীর গল্পে ডুব দিয়ে তাই অন্যরকম স্বাদ নিয়ে ফিরে আসবে পাঠক, পুরনো narrative-এ অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মনকে মানিয়ে নিতে বেগ পেতে হবে। কারণ অসুরদের গল্প যে অসুরেরা লেখে না, গল্প লেখে বিজয়ীরা ─ সুরেরা, দেবতারা। তাদের হাত দিয়েই তো শ্লোক-শাস্ত্র লিখিত হয়েছে। অসুর ময়দানবের কন্যা মন্দোদরীর গল্পে তাই বইয়ের অসাধারণ আরম্ভ।
পরবর্তী আরো অন্যান্য গল্পগুলিতেও পাঠক ঘুরপাক খাবেন। "অনার্য অর্জুন", "দেউলিয়া", "যমুনা জলে বিবর সন্ধান", "সহোদর", "একটা হাত, ডান হাত", "উপেক্ষিতা", "কুন্তীর বস্ত্রহরণ" ─ ইত্যাদি গল্প পাঠককে ভাবাবে। একলব্য নিজের অবচেতনে লুকনো বাস্তবতার সম্মুখীন হবে এক অনার্য অর্জুনের প্রশ্নের পাল্লায়। "কি পেলে যুধিষ্ঠির?" ー ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির এমনকি শ্রীকৃষ্ণ অবধি হিমসিম খাবেন কুন্তীর বাক্যবাণে। তেমনি আরেক অর্বাচীন কুন্তীর করুণ পরিণতি পাঠককে পীড়া দেবে। সরমার গল্পটা পাঠককে ফিরিয়ে নেবে মন্দোদরীর কাছে, পাঠক দেখবেন এক বিশ্বাসহন্তাকে যে নিজেকে ছাড়া আর কাউকে সুখী করতে পারলো না।
যমুনাজলে ঘূর্ণায়মান একটি নৌকায় অসহায়ের মতো চিৎ হয়ে শুয়ে থাকবে দ্বিধান্বিত মৎসগন্ধ্যা ─ সে কি হারালো আর কি পেল? সে কি মৎসগন্ধ্যাকে হারিয়ে পুষ্পগন্ধ্যাকে পেল? নাকি যা পাবার তা পেয়েছে পরাশর? যার ব্রাহ্মণত্ব চির অটুট।
এভাবেই পৌরাণিক গল্পগুলো আর বাল্মিকীর, রামের, যুধিষ্ঠিরের হয়ে থাকবে না ─ গল্প হবে অনার্যদের, অসুরদের, ব্যাধেদের, কৈবর্তদের, নারীদের আর বঞ্চিতদের, যারা কখনো গল্পে নিজেদের মর্যাদা পায়নি।
সব গল্পের শেষে বইটা পাঠককে আরেকটি কাজে উৎসাহ দিয়ে যাবে ─ পাঠক হয়তো বা অদ্বৈত মল্লবর্মণের "তিতাস একটি নদীর নাম" উপন্যাস পড়তে আগ্ৰহী হবেন।