নলিনী বেরার জন্ম পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গোপীবল্লভপুরের নিকট বাছুরখোয়াড় গ্রামে। ছোটবেলা থেকে দারিদ্রের সাথে লড়াই করে পড়াশোনা করেছেন তিনি। তাঁর শিক্ষা সম্পন্ন হয় মেদিনীপুর কলেজে ও পরে নকশাল আন্দোলনের কারণে ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে। ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের আধিকারিক হিসাবে চাকরিতে ঢোকেন।
কবিতা লেখা দিয়ে তাঁর সাহিত্য জীবন শুরু। ১৯৭৯ সালে নলিনী বেরার প্রথম গল্প 'বাবার চিঠি' দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি পল্লীপ্রকৃতি নিয়ে সমাজসচেতন সাহিত্যরচনায় পারদর্শী। তাঁর উপন্যাসগুলি হল শবরচরিত, কুসুমতলা, ফুলকুসমা, দুই ভুবন, চোদ্দ মাদল, ইরিনা এবং সুধন্যরা, এই এই লোকগুলো, শশধর পুরাণ ইত্যাদি। চার দশকের সাহিত্যচর্চায় অজস্র ছোটোগল্প ও উপন্যাস লিখেছেন।
২০০৮ সালে বঙ্কিম পুরস্কার পান নলিনী বেরা তাঁর শবরচরিত উপন্যাসের জন্য। সুবর্ণরেণু সুবর্ণরেখা উপন্যাসের জন্য ১৪২৫ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হন তিনি। পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্ত ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা ছাত্রা ছাত্রীদের জন্য দান করেন এই সাহিত্যিক।
কথাসাহিত্যিক নলিনী বেরা দীর্ঘদিন ধরে নীরবে, নিভৃতে বঙ্গভাষায় সরস্বতীর আরাধনা করে চলেছেন। 'আনন্দ পুরস্কার' সহসা তাঁকে ফেসবুকের ফোকাসে নিয়ে এলেও মানুষটির লেখা তথা লেখনীর সঙ্গে আমাদের পরিচয় খুব একটা গভীর নয়। তবে যাঁরা তাঁর লেখা পড়েছেন, তাঁরাই মানবেন যে ছোটোগল্প, কবিতা, এমনকি উপন্যাসেও সিদ্ধিলাভ করেছেন এই লেখক। কিন্তু প্রবন্ধ বা নিবন্ধ তিনি কেমন লেখেন? কৃতি (কারিগর প্রকাশনার একটি ইমপ্রিন্ট) থেকে প্রকাশিত এই রুচিশীল ও পরিচ্ছন্ন সংকলনটি গড়ে উঠেছে লেখকের নন-ফিকশন নিয়েই। তাতে এই লেখাগুলো পেলাম~ ১. গুণিন বৃত্তান্ত ও ভূতপুরাণ ২. 'আধা-ভদরিয়া' ৩. রং-চটা টিনের জিভ ৪. 'শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে...' ৫. মরি মরি কী মাধুরী ৬. সাহিত্যের একটি অসম্পূর্ণ পাঠ ৭. 'ফুলের মালা হৈল বাসি' ৮. অনার্য ভারতকথকতা ও অধিকার চর্চা: প্রসঙ্গ 'শবর চরিত' ৯. বনভুজনি ১০. 'মাটির জাহাজ' মাটির জাহাজই বটে ১১. আরও বেশি করে 'ট্যাঁসা', 'ঢেপচু', 'ক্যারকেটা' আসুক ১২. হায় সার্কাস! তোমার দিন গিয়েছে ১৩. সুবর্ণরৈখিক নদী-মানুষের উৎস সন্ধানে ১৪. শাল পিয়াল মারাংবুরু ১৫. 'বোর্হেস' ও সুকুমার রায় ১৬. 'যাও পাখি বলো তারে' ১৭. রসকথা
প্রথমেই লিখি, নাগরিক মনন এবং কৃত্রিমতা থেকে আলোকবর্ষ দূরের লেখা এগুলো। এদের বিষয়বস্তু, স্বাদ, গন্ধ— সবই একেবারে অন্যরকম। এর সর্বাঙ্গে মাখামাখি হয়ে আছে টাঁড়ের ধুলো আর সারল্য, অন্ধকার আর চোখের জলের শুকনো দাগ, নিরানন্দের মাঝেও অমৃতের সন্ধান করে বেঁচে থাকার উদগ্র বাসনা। দ্বিতীয়ত, এইরকম সরস ও সজল লেখা আপনি পত্রপত্রিকায় কিছুতেই পাবেন না। গ্যারান্টি দিতে পারি এ-বিষয়ে। তাও, শুধু মুখের কথায় বিশ্বাস করবেন কেন? তাই একটা নমুনা দিই। "মা-মাসিরা কোলে-কাঁখে বাচ্চা নিয়ে যাত্রা-টাঁড়ে আসত যাত্রা দেখতে। সঙ্গে আসত মাটির 'গাড়ু'। এই জন্য যে, — ছোটোদের 'ছোটো বাইরে' পেলে যাতে ঘনঘন উঠে বাইরে যেতে না হয়, উপর্যুপরি বাইরে যাওয়ায় পাছে যাত্রা দেখায় বিঘ্ন ঘটে যায়! পায় যদি তো তারা গাড়ুতেই ছরছর করে করুক না! খেল খতম পয়সা হজম হয়ে গেলে মাটির গাড়ু ছুড়ে ফেললেই হবে।" (মরি মরি কী মাধুরী)
আরও একটা হোক। "সন্ধ্যা হতে না হতেই কাঁকড়ার খোঁজে খালে-বিলে ভ্রাম্যমাণ দু-চাট্টা শিয়াল 'হু-উ-উ' করে ডেকে ওঠে। সারা রাত ধরে মাকড়সার জালে জমতে থাকে বিন্দু বিন্দু 'কাঁকর'। অর্থাৎ শিশিরের জল৷ ভোর না হতেই দিগন্তে ব্যাপ্ত ঘোর কুজ্ঝটিকা। রোদ উঠলেই পড়ি-কি-মরি ইস্কুল ডাঙায়। রোদ পোহাতে যত না, তার থেকেও বেশি দেখতে— 'তারা' এল কি না।" (হায় সার্কাস! তোমার দিন গিয়েছে)
আর না! তবু... এই শেষ কিন্তু! "গ্রামসভায় জরুরি মিটিং ডাকা হল, 'ডাকুয়া' ঘর ঘর গিয়ে ডাক দিয়ে এল, 'দশ-গেরামের পাঁজ্জনকে বিচারে ডাকা হচ্ছে, বিড়ি-তামুক খেতে একবারটি হরিমন্দিরে আসুন।' হরিমন্দির লোকে লোকারণ্য! গ্রামসভার অধ্যক্ষ বিচারে কাঁদো কাঁদো হয়ে, চোখে জল আসছিল না তাই আড়ালে থুতু লেপটে, বলল, 'ছিল না ছিল না, এত বড়ো একটা উপকারী জিনিস বুকের রক্ত দিয়ে গড়ে তোলা হল, দশগেরামের পাঁজ্জন মানুষের সাহায্য না পেয়ে তা বন্ধ হয়ে যাবে? তোমরা এত বড়ো একটা জিনিসকে বন্ধ হয়ে যেতে দেবে চোখের সামনেই?' ('যাও পাখি বলো তারে')
এভাবে চলতে থাকলে বিপদ হবে। কারিগর-এর রাশভারি প্রকাশকেরাও আমাকে কপিরাইট আইন ভাঙার দায়ে নোটিস ধরাবেন। তাই অল্প করে শুধু একটিই কথা বলে বক্তব্য শেষ করি। যদি এমন সহজিয়া গদ্যে সহজ চোখে লালমাটির ওই দেশ আর মানুষদের দেখতে চান, তাহলে এ-বই একেবারে অবশ্যপাঠ্য।